হোম পুনর্মুদ্রণ অম্ল-মধুর সিকদারনামা

অম্ল-মধুর সিকদারনামা

অম্ল-মধুর সিকদারনামা
2.36K
0

সিকদার ভাইয়ের সহিত আমার সম্পর্ক পহেলা অম্ল আছিল। সিকদার ভাই মানে ৬০ দশকের আধুনিক কবি সিকদার আমিনুল হক। অম্ল থাকিবার কারণ চিন-পরিচয় হইবার আগে উনি আমার ১ কি ২ কবিতা লইয়া দুই চারি বাক্য ব্যয় করিয়াছিলেন প্রয়াত আজকের কাগজের সুবর্ণরেখায়। প্রশংসার সহিত নিমনিন্দা করিয়াছিলেন কবিতার। উনার নিন্দার তির আছিল আমার কবিতার ভাষা লইয়া। তাই তাঁহার উপর খানিক উষ্ণ হইয়া ছিলাম, অল্পদিন। উনি আমার ‘মারণাস্ত্র’ নামের কবিতার প্রশংসা করিয়াছিলেন। সেই কবিতা পরে মোস্তফা জামানের ইংরাজি তরজমায় মাইকেল আলবার্টের ‘জিনেট ক্রিয়েটিভ’ ওয়েবজিনে ছাপা হইয়াছিল। আর নিমনিন্দা করিয়াছিলেন ‘এলা হি বরষা’ নামের এক টুকরা কবিতার। যাক!


অচিন সিকদার ভাইকে ফোনে বলিয়াছিলাম—আপনার লেখা পড়িলাম। কিন্তু ভালো লাগে নাই। কহিলেন, কেন? রুদ্র কণ্ঠে বলিলাম, ‘আপনি তো এসিরুমে হিটার জ্বালাইয়া কবিতা লিখেন। আর আমি পথে পথে, ঘুইরা ঘুইরা কবিতা লিখি।


উনার লিখা পড়িয়া মেজাজ খানিক খাট্টা। কিন্তু উনাকে কিছু বলিব তো ফোন নম্বর নাই। পরে ফোন নম্বর জোগাড় করি। ওইদিন সন্ধ্যায় ফোন দেই। অচিন সিকদার ভাইকে ফোনে বলিয়াছিলাম—আপনার লেখা পড়িলাম। কিন্তু ভালো লাগে নাই। কহিলেন, কেন? রুদ্র কণ্ঠে বলিলাম, ‘আপনি তো এসিরুমে হিটার জ্বালাইয়া কবিতা লিখেন। আর আমি পথে পথে, ঘুইরা ঘুইরা কবিতা লিখি। ফলে আপনার চিন্তার সহিত আমার চিন্তা অম্ল হইবে।’ উনি ওই সময় টেলিফোনে কবিতা বিষয়ক অনেক সবক দিয়াছিলেন। এবং কহিলেন, ‘প্রতীক ছন্দ ভাষা-সংশ্লেষে কবিতা হয়। কবিতা ভাষার গিমিক না।’ আমি কইলাম, ‘ভাষার গিমিকের কারণে চলতি প্রতীক পুরাতন হইয়া পড়ে, নতুন প্রতীক সৃষ্টি হইতে পারে তো! ভাষা তো খালি ভাষা না, চিন্তা তো আছে। তা আপনি মানেন কি-না?’ কইলেন, ভাবনার বিষয়। এলিফ্যান্ট রোডের বাসার ঠিকানা দিয়া কহিলেন, আসেন একদিন কফি খাই। বলিলাম, আসিব।


তার দিন দুই কি তিন বাদে উনার বাসাই যাই। কল সুইচ টিপি। কাজের লোক দরজা খুলিয়াছেন। মানে মহিলা ভদ্রলোক আসিয়া কহিলেন, কার কাছে আইছেন? কহিলাম, সিকদার ভাইয়ের কাছে। আমার নাম আর জিগাইলেন না। তো ভদ্রলোক এমনভাবে দরজা শাট-আপ করিলেন মনে হইল, আমি ভুল জায়গায় আসিলাম। মিনিট এক কি দুই বাদে সিকদার ভাই দরজা খুলিলেন। বলিলাম, আমি টিপু। বলিলেন, ও আচ্ছা সাখাওয়াত টিপু, আসেন আসেন! গিয়া দেখি এলাহি কাণ্ড।

বিশাল ড্রইং রুম। জিজ্ঞাস করিলেন, কী খবর? কহিলাম, ভালো! তবে আপনার ওপর আমার মেজাজ বিগড়াইয়া আছে। বলিলেন, তাহলে তো আমার লেখা ভালো হয়েছে! আমি নাছোড়বান্দা। আমার কবিতা বিষয়ক মত উনার ওপর প্রয়োগ করি। আর উনি ঠান্ডা মাথায় হেসে হেসে জবাব দিচ্ছিলেন। শেষে বলিলাম, আপনার গদ্যে সমস্যা আছে। কইলেন, কী? আপনার এই কবিতা বিচার তিরিশি দশকের বাইরে না! রুচিও রবীন্দ্রশাসিত। দেখি উনি নড়িয়াচড়িয়া বসিলেন। কইলেন, কবিতা নিয়া তো তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। তবে উনার সাথে আড্ডায় বুঝিলাম, উনিশ শতকের ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতার প্রতি উনার প্রেমের অন্ত নাই। মনে হইল উনি গত শতকের ফরাসি কবিতা খুঁটিয়া খুঁটিয়া পড়িয়াছেন।

ওইদিন নানা কথার ফাঁকে কহিলেন, আপনি কি রাজনীতি করেন? কহিলাম, বাম রাজনীতির সাথে উঠাবসা আছে। বাম বুদ্ধিজীবীদের সাথে উনার বেশ জানাশোনা আছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর বিপদে-আপদে উনি অনেক বাম নেতারে সহযোগিতা করিয়াছিলেন। এমন একটা ঘটনার কথা কইলেন, রাষ্ট্রীয় হয়রানির কারণে কমরেড মনি সিংহ একবার উনার বাসায় আত্মগোপনে দিন গুজরাই ছিলেন। আমি খানিকটা টেলিফোনে উচ্চকিত কণ্ঠের লাগিয়া লজ্জিত হই! কহিয়াছিলাম, সিকদার ভাই, আমি বড় গলার জন্য লজ্জিত। তবে কবিতা বিষয়ে আমার মতের জন্য লজ্জিত না। সিকদার ভাই কহিলেন, দ্যাটস ওকে। নতুন কবিরাই তো সবকিছু অস্বীকার করবে!


একবার সাপ্তাহিক খবরের কাগজের পহেলা বৈশাখের বিশেষ সংখ্যায় উনার কবিতা লই নাই। পত্রিকা হাতে পাইয়া উনি ফোন করিয়া ছিলেন। গম্ভীর স্বরে কহিলেন, আমারে কবি তালিকা থেকে বাদ দিলেন নাকি?


পরে সিকদার ভাইয়ের সাথে যাওয়া-আসা চলিত। মাঝে-সাঝে আজকের কাগজ হাউসে আসিতেন। সম্পর্ক মধুর হইয়া ওঠে আস্তে আস্তে। একটা ঘটনা বলি। একবার সাপ্তাহিক খবরের কাগজের পহেলা বৈশাখের বিশেষ সংখ্যায় উনার কবিতা লই নাই। পত্রিকা হাতে পাইয়া উনি ফোন করিয়া ছিলেন। গম্ভীর স্বরে কহিলেন, আমারে কবি তালিকা থেকে বাদ দিলেন নাকি? কহিলাম, বাদ দিমু কেন? মনে হইল সিকদার ভাই খুব কষ্ট পাইলেন। এরপর থেকে নিয়মিত খবরের কাগজে কিছু কলাম লিখিয়া ছিলেন। তো সিকদার ভাইয়ের হাতের প্রসাদগুণ ভালো। ব্লাডিমেরি বানাইতেন ভালো। ভালো ভালো খাইতেন। উনার সাথে আড্ডা দেওয়া আনন্দের আছিল। উনার রুচিগুণ সাধারণের পর্যায় আছিল না। উঁচুতলা ভাবাপন্ন। আমার ধারণা—চিন্তার সাথে মিলুক বা না মিলুক, যাহারে পছন্দ করিতেন তাহার সাথেই মিশতেন বেশি। স্বভাবটা এমন, উনি কবিতাময় জীবন কাটাইতেন বা কাটাইয়াছেন। যেন কবিতাই শুরুদিন আর কবিতাই অন্তদিন।


২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনা। ব্রাত্য রাইসু তখন প্রথম আলোর সাময়িকী দেখেন। একদিন ফোনে কহিলেন, সিকদার ভাইয়ের একটা ইন্টারভিউ কইরা দেন। রাজি হইলাম। সিকদার ভাই তখন গুলশানের বাসিন্দা। তো ফোন করিয়া ঠিকানা লইলাম বাসার। গুলশান গিয়া আর বাসা খুঁজিয়া পাইতেছি না। অনেকক্ষণ রাস্তা রাস্তা ঘুরিয়া ফোন দিলাম। এইবার বলিলেন, সিকদার নামে মেডিকেলের কাছে বাসা। শেষে খুঁজিয়া পাইলাম। বাসায় ঢুকিব ঢুকিব এমন সময় একটা ঘটনা ঘটে।

দরজা খোলার পর পর একটা সাদা পশমি কুকুর আমার দিকে তাড়াইয়া আসিল। দেশি না, বিদেশি। লম্বা শুভ্র কেশ। কান লম্বা। থলথলে শরীর। ধবল কুকুর দেখি আমার জিন্সের প্যান্ট কামড়াইয়া ধরতে চায়। ভিতরে ভিতরে ভয় পাইলাম। কিন্তু দেখাইলাম না। হেরপর সিকদার ভাই কি জানি ইংরাজি নাম কহিয়া কুকুররে ডাকিলেন। আর কুকুর দেখি ভদ্র হইয়া গেল। ইংরাজি কুকুরের ভদ্রতাজ্ঞান বেশ টনটনে মনে হইল। সিকদার ভাই আপন সন্তানের মতো সেইটারে কোলে তুইলা আদর করিতে লাগিলেন। যাউকগা!

সোজা রাস্তা খুঁইজা পাইলেন না, সিকদার ভাইয়ের প্রশ্ন! কহিলাম, সমস্যা আছে একটা? উনি চমকায়লেন, কী! দেখেন ভাই, ঢাকার শহরের আর্কিটেকচার ভালো না। গুলশানের প্রায় সব বিল্ডিংয়ের স্ট্রাকচার একই মনে হয়। হাইসা কইলেন, এইভাবে তো ভাবি নাই কোনোদিন! যাহাই হোক, নাস্তা খাইলাম চার কি পাঁচ পদের। লগে কফিও। টেবিলে দেখলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আর ফ্রানজ কাফকার গল্পের বই। বলিলাম, গল্প লিখিতেছেন কি? বলিলেন, হ! আর পড়ে দেখছি। মে বি, জয় গোস্বামীরও একটা কবিতার বই ওই দঙ্গলের মধ্যে আছিল। তবে সিকদার ভাইয়ের লেখা কোনো গল্প ইহকালে পড়ি নাই।


সিকদার ভাই এই দাবিও করিয়াছিলেন, আমাদের সময়ের ২/১ জন কবির কবিতায় তার ছাপ আছে।


ওইদিন সিকদার ভাই উনার বাইপাস সার্জারির গল্প বলতেছিলেন বারবার। উনার বলার ভঙ্গি সুন্দর। কারণ উনি ধীরে বলতেন। নিচু গলায়। যেন মরা মানুষের সহিত জীবিত মানুষের কথোপকথনের গল্প শুনছি সিকদার ভাইয়ের কণ্ঠে। বস্তুগত জীবনের বাহিরে মানুষের অবস্তুগত জীবন কেমন, সেইরূপ। সে এক অদ্ভুত বয়ান! সেদিন কথার ফাঁকে একটা কবিতার বইও দিয়াছিলেন। নাম বাতাসের সঙ্গে আলাপ। ব্লাঙ্কভার্সে লেখা কবিতা।

সিকদার ভাই এই দাবিও করিয়াছিলেন, আমাদের সময়ের ২/১ জন কবির কবিতায় তার ছাপ আছে। তো ইন্টারভিউ লইলাম। ছাপা ইন্টারভিউ থিকা মূল সাইজটা বড় আছিল। পাতার মাপে তাহা ছাপা হইয়াছিল! বাকি টুকরা হারাইয়াছি আমার ছন্নছাড়া দোষে। ছাপা হওয়ার দিনকয় বাদে চিরতরে না দেখার দেশে চইলা গেলেন তিনি। খুব খারাপ লাগিয়াছিল। মৃত্যু এমনই, না চাইলেও চলিয়া যাওয়াকে মানিতে বাধ্য করে।

সিকদার আমিনুল হকের জন্ম ৬ ডিসেম্বর ১৯৪২। গত হন ১৭ মে ২০০৩। তাঁর বইয়ের সংখ্যা ১৮টির অধিক। দূরের কার্নিশ (১৯৭৫), তিন পাপড়ির ফুল (১৯৭৯), আমি সেই ইলেক্ট্রা (১৯৭৯), বহু উপেক্ষায় বহুদিন অনধিকারে (১৯৮২), এক রাত্রি এক ঋতু (১৯৯১), সতত ডানার মানুষ (১৯৯১), সুপ্রভাত হে বারান্দা (১৯৯৩), কাফকার জামা (১৯৯৪), সুলতা আমার এলসা (১৯৯৪), লোরকাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেল (১৯৯৭), বিমর্ষ তাতার (২০০২) উল্লেখযোগ্য।


সিকদার আমিনুল হক বললেন
মৃত্যু আমাকে বিস্মিত করেছে


সাখাওয়াত টিপু

আপনার অন্য কবিতার বই থেকে বিমর্ষ তাতার বইটির কোনো আলাদা ব্যাপার আছে কি? থাকলে কী রকম?

সিকদার আমিনুল হক

এটা ঠিক আলাদা কি-না আমি বলতে পারব না। পাঠকই ভালো বলতে পারবে। বইটিতে বেসিক্যালি ছন্দের কাজই বেশি। অক্ষরবৃত্ত এবং মাত্রাবৃত্ত।

সাখাওয়াত টিপু

আপনি তো ব্ল্যাঙ্ক ভার্সেও কবিতা লিখেছেন…

সিকদার আমিনুল হক

মাত্রাবৃত্তে কবিতা আমি কম লিখেছি। অক্ষরবৃত্তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি বেশি। আবদুল মান্নান সৈয়দ একবার লিখেছিলেন, অক্ষরবৃত্ত সিকদার আমিনুল হকের কবিতার দাস। তবে ছন্দের কবিতায় বেশি কথা বলা যায় না। বক্তব্য উহ্য থাকে অনেকাংশে। ব্ল্যাঙ্ক ভার্সেই কবিতায় অনেক কথা বলা যায়। মূলত বক্তব্যই প্রধান।

সাখাওয়াত টিপু

আপনি তাতার গোষ্ঠীকে বিমর্ষ বলছেন কেন?

সিকদার আমিনুল হক

তাতাররা মধ্য এশিয়ার যাযাবর গোষ্ঠী। এরা দস্যুবৃত্তি ও যুদ্ধ করত। ওই যে শিরোনামের কবিতা ‘বিমর্ষ তাতার’ একটা গল্প। একজন বৃদ্ধ তাতার সারা জীবন সংগ্রাম করার পর সে এখন ক্লান্ত, অবসন্ন। বয়সের অপরাহ্ণ বলে এমনটা বলা যেতে পারে। বিমর্ষতার সঙ্গে এত মেলানো দেশ ও সমাজের প্রভাব। সব মিলিয়ে এই ধরনের পরিবর্তন। সাহিত্যের পরিবর্তন পূর্বপরিকল্পিত নয়। সতত ডানার মানুষ কিংবা কাফকার জামা বইয়ের সঙ্গে দেখুন, এই বইয়ের মিল নেই। সময়ের সঙ্গে আমরা পাল্টাচ্ছি। এটা স্বাভাবিক এবং প্রকৃতিগত।

সাখাওয়াত টিপু

কী রকম?

সিকদার আমিনুল হক

আমি আল্লাহ বিশ্বাস করি। মৃত্যুর পর কিন্তু ওই যে অনন্তকাল বলে একটা কথা আছে, বিস্ময়টা সেখানেই। এই যে সুন্দর পৃথিবী, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে মরতে হয়। একদিন পৃথিবী ছেড়ে সবাইকে চলে যেতে হয়। পরকালে। অপার বিস্ময়! আরেকটা জিনিস দেখেন, আমার যারা বন্ধু ছিল, তারা অনেকেই নেই এখন। মৃত্যু আমাকে বিস্মিত করেছে।

সাখাওয়াত টিপু

সিকদার ভাই, আপনার কবিতার মধ্যে যে মৃত্যুচিন্তা দেখি, তাতে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আছে। দেখবেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার পর অর্থাৎ যেইখানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের শেষ, সেইখানে অবসাদ…

সিকদার আমিনুল হক

একজন কবির মৃত্যুভাবনা থেকে সাধারণ মানুষের মৃত্যুভাবনা আলাদা। রবীন্দ্রনাথও ঠিক তাই। জীবনকে ভালোবাসি বলেই আমি মৃত্যুকে অস্বীকার করি। মরতে হবে, এটাই সত্য।


হাসপাতালের বেডে আমি দেখেছি, কতগুলো লোক আমার লাশ নিয়ে কবরের দিকে যাচ্ছে। আমার ছেলেরা কাঁদছে। স্ত্রী কাঁদছে। মৃত বান্ধবরা আমার সঙ্গে গল্প করছে। ঠিক বলে বোঝানো যাবে না!


সাখাওয়াত টিপু

ভয়টা কোথায়?

সিকদার আমিনুল হক

অই যে পরকাল নিয়ে। এটা অনেকটা বাইপাস সার্জারির মাতা। আমার বাইপাস সার্জারির সময়কার কতগুলো দৃশ্য বারবার মনে পড়ে। হাসপাতালের বেডে আমি দেখেছি, কতগুলো লোক আমার লাশ নিয়ে কবরের দিকে যাচ্ছে। আমার ছেলেরা কাঁদছে। স্ত্রী কাঁদছে। মৃত বান্ধবরা আমার সঙ্গে গল্প করছে। ঠিক বলে বোঝানো যাবে না!

সাখাওয়াত টিপু

একাকিত্বের কারণে এটা হয়েছে?

সিকদার আমিনুল হক

মানুষ সবসময় নিঃসঙ্গ। বড় একা। এটা বেশি ধরা পড়ে ভিড়ের মধ্যে। ঠিক সে সময় বোঝা যায় মানুষের একাকিত্ব।

সাখাওয়াত টিপু

সিকদার ভাই, আপনার কবিতায় কিন্তু বাংলার প্রকৃতিটা কম।

সিকদার আমিনুল হক

বেশি পশ্চিমা। আমার কবিতায় সা ঝঁ পার্স, হুইটম্যান, হিমেনেথ, র‌্যাঁবো—অনেকেরই প্রভাব আছে।

সাখাওয়াত টিপু

হ্যাঁ। আপনার কবিতা পড়লে মনে হয় বাইরে তুষার পড়ছে, ঘরে হিটার জ্বলছে। চিত্রকল্প, অনুষঙ্গ আবহগুলিও তাই।

সিকদার আমিনুল হক

দেখুন, আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা কম। তদুপরি আমার জন্ম শহরে। বেড়ে উঠেছি শহরে। আমার পরিবেশটাও শহরের। আমি ওভাবে গ্রাম দেখি নি। তাই আমি গ্রাম নিয়ে লিখি নি। যেই জিনিস আমি দেখি নি সেইটা নিয়ে লেখা কি ঠিক?

সাখাওয়াত টিপু

কিন্তু বাংলার নাগরিক জীবন কি এতে পাওয়া যায়?

সিকদার আমিনুল হক

জীবনানন্দ দাশও তো অনেক দেশে যায় নি। তবুও তো তাঁর কবিতায় অনেক সঙ্গ-প্রসঙ্গ-অনুসঙ্গ এসেছে। তিনি কিন্তু বিশ্বকে বরণ করেছেন। এটা তার কল্পনা। আমার ঠিক তাই। একটা বিষয় এতে যোগ করা যায়, আমার কবিতায় এগুলো এসেছে বিদেশি সাহিত্য পড়া থেকে।


তরুণদের কাছে আমি অহঙ্কারী হতে চাই। এবং বলতে চাই, আমার কবিতাই আমার পরিচয়। তার জন্য কারো দয়া বা অনুকম্পা দরকার নেই।


সাখাওয়াত টিপু

এটাকে কি তিরিশি কবিতার খারাপ প্রভাব বলব?

সিকদার আমিনুল হক

এটা স্বীকার করাতে দোষ নেই, বুদ্ধদেব বসুই আমাদের প্রথম পশ্চিমা সাহিত্য চিনিয়েছেন। তাই বলে আমরা বুদ্ধদেব বসুর মতো কবিতা লিখি নি। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে তিরিশের পঞ্চজনই বাংলা কবিতা শাসন করেছে। জীবনানন্দ দাশের প্রভাব শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, শামসুর রাহমান—যাই বলেন না কেন, কি কারো মধ্যেই নেই।

সাখাওয়াত টিপু

তাহলে ষাটের কবিতা তিরিশি কবিতারই সম্প্রসারণ?

সিকদার আমিনুল হক

ষাট দশকের কোন কবির কবিতায় এদের প্রভাব নেই। তবে আমরা খুব বেশি এদের অতিক্রম করতে পারি নি বলে আমার ধারণা। জীবনানন্দকে কেন্দ্র করেই সবকিছু হয়েছে।

সাখাওয়াত টিপু

এই বইটিতে ‘তরুণ কবি’ বলে একটি কবিতা আছে। সেখানে আপনি লিখেছেন, ‘এখন আমরা নেই, খাতাপত্রে অন্যদের দিন। বোকাদের ঢিলে জামা, কাঁধে ব্যাগ, প্রায়শই চট/ কবিতা ধার্মিক কাজ কবে হলো। আগে বাড়ি কর।/… লেখা সম্পর্কিত তর্ক, বাজে কাজ, করি না কখনও/ জলে থাকি, কুমিরের সঙ্গে ভাব, খুব ভালো বুঝি।’ এখানে ‘খাতাপত্রে অন্যদের দিন’ বলতে আপনি কাদের দিন বোঝাচ্ছেন?

সিকদার আমিনুল হক

তরুণদের দিন বোঝাচ্ছি। এই প্রজন্মের তরুণদের। যে তরুণরা আমাদের অস্বীকার করতে চায়, তাদেরই বোঝাচ্ছি। অস্বীকারের মধ্যে একটা ভিন্ন সম্ভাবনার ব্যাপার আছে। যেটা স্থান চায়। তরুণদের কাছে আমি অহঙ্কারী হতে চাই। এবং বলতে চাই, আমার কবিতাই আমার পরিচয়। তার জন্য কারো দয়া বা অনুকম্পা দরকার নেই। মোটকথা তরুণদের সঙ্গে আমার যুদ্ধ, শিল্প নিয়ে যুদ্ধ। আমার সংঘর্ষ শিল্প-দর্শন নিয়ে। এটা ব্যক্তিসম্পর্কের বাইরের ব্যাপার। আমরা যে এত দশক বিভাজন করে দাঁড়িয়ে আছি, এই জায়গাটা ভুল। এটা একটা সংক্ষিপ্ত দাঁড়ানোর চেষ্টা। ৯০ দশকের একজন কবিকেও শামসুর রাহমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। আরো অগ্রসর হয়ে এমনকি জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে’র সময়-পরিধিতে দাঁড়িয়ে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। এ বিভাজনের জন্য সমালোচকরা কিছুটা দায়ী। এতে নিজেদেরও একটা সুবিধা হয় যে, ওই দশকের আমি একজন প্রধান কবি প্রমাণের জন্য। কিন্তু কাল তো সেটা মানবে না। সেই সত্য সবাইকে গ্রহণ করতে হয়।


আমি মনে করি, ছন্দ হচ্ছে কবিতার শক্তি। এটার এখনো প্রয়োজন ফুরোয় নি।


সাখাওয়াত টিপু

‘বিমর্ষ তাতার’ বইটি বুদ্ধদেব বসুর কবিতার ভঙ্গিতে লেখা। বিশেষ করে ছন্দের ভঙ্গিগত দিক ও বিষয়ের দিক থেকে। কেন এই ভঙ্গিতে লিখলেন?

সিকদার আমিনুল হক

আমার জ্ঞাতসারে মনে হয় নি এতে বুদ্ধদেব বসুর প্রভাব আছে। ছন্দ অটুট থাকার কারণে কিংবা নিখুঁত ব্যাখ্যার জন্য আপনার সন্দেহ বা প্রশ্ন উঠতে পারে। এতে বিষয়ের কোনো মিল নেই। তবে তিরিশের কবিরা ছন্দকে মেনে চলেছেন। এবং এই ধারা ৫০ থেকে ৬০ দশক পর্যন্ত প্রবাহিত। পরবর্তীকালে ছন্দ নিয়ে নানা আপত্তি-প্রশ্ন-সন্দেহ এগুলো উঠেছিল। আমি মনে করি, ছন্দ হচ্ছে কবিতার শক্তি। এটার এখনো প্রয়োজন ফুরোয় নি। প্রত্যেক ভাষার একটা বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব একটা চাল আছে। যেমন, অমিয় চক্রবর্তী, স্পার্ম রিদম আছে। সেটা কিন্তু টেকে নি। অমিয় চক্রবর্তী পরবর্তীকালে সেটা স্বীকার করেছেন। এটা ভাষার ওপর অবিচার। আমি চাই কবিতায় ছন্দ টিকে থাকুক।

সাখাওয়াত টিপু

আপনার কবিতা নিয়ে অভিযোগ আছে, ইউরোপের জলবায়ু আসবাব অনুষঙ্গ নিয়ে আপনি কবিতা লেখেন। আপনার কী মত?

সিকদার আমিনুল হক

এটা আমি ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে পারব না। এটা আমার মেজাজ। পঠন-পাঠন থেকে এগুলো এসেছে। এটা আরোপ করা কোনো জিনিস না। একটা অচেতন থেকে এগুলো আমার ভেতরে এসেছে। এটা এক ধরনের অ্যাবসার্ডিটি। যেটা আমার কাফকার জামা বইটিতে আছে। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, পঠন-পাঠনও আমাদের অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু ভাই, নিজের কবিতা নিয়ে এত কিছু বলা কি যায়!

সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু

জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। লেখক ও চিন্তাবিদ।


প্রকাশিত বই :
কাব্যগ্রন্থ—
১. এলা হি বরষা
২. যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে
৩. শ্রী চরণে সু
৪. বুদ্ধিজীবী দেখ সবে
৫. কার্ল মার্কসের ধর্ম


সম্পাদনা ও গবেষণা—
১. জাতীয় সাহিত্য (ভাষা ও দর্শনের কাগজ)
১. চাড়ালনামা (নাসির আলী মামুনসহ যৌথ)


ই-মেইল : shakhawat.tipu@gmail.com
সাখাওয়াত টিপু