হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য অভিধানের আপন ও পর

অভিধানের আপন ও পর

অভিধানের আপন ও পর
1.54K
0

আজকের দিনে, আমাদের বাংলাদেশে, বাই ডিফল্ট, নতুন একটি ভাষা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা ঐ একশ বছরের চলিত ভাষাটাই। মানে প্রমথ- ও রবীন্দ্র-লালিত ভাষা

‘সবুজ পত্র’ পত্রিকায় গত শতকের দ্বিতীয় দশকে যে ভাষা-আন্দোলনের সূচনা প্রমথ চৌধুরীর হাতে, নিজের রচনায় ষোল আনা এস্তেমাল করার আগেই তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। লিখেছিলেন ‘ভাষার কথা’ প্রবন্ধটি। সেখানে তিনি বলছেন :

যখন বঙ্গবিভাগের বিভীষিকায় আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়াছিল তখন আমাদের ভয়ের একটা প্রধান কারণ ছিল এই যে এটা রাজনৈতিক ভূগোলের ভাগ নয়, ভাষার ভাগকে আশ্রয় করিয়া বাংলার পূর্ব-পশ্চিমে একটা চিত্তের ভাগ হইবে। সমস্ত বাংলাদেশের একমাত্র রাজধানী থাকাতে সেইখানে সমস্ত বাংলাদেশের একটি সাধারণ ভাষা আপনি জাগিয়া উঠিতেছিল। তাহা ফরমাশে গড়া কৃত্রিম ভাষা নহে, তাহা জীবনের সংঘাতে প্রাণলাভ করিয়া সেই প্রাণের নিয়মেই বাড়িতেছে। আমাদের পাকযন্ত্রে নানা খাদ্য আসিয়া রক্ত তৈরি হয়, তাহাকে বিশেষ করিয়া পাকযন্ত্রের রক্ত বলিয়া নিন্দা করা চলে না, তাহা সমস্ত দেহের রক্ত। রাজধানী জিনিসটা স্বভাবতই দেশের পাকযন্ত্র। এইখানে নানা ভাব, নানা বাণী এবং নানা শক্তির পরিপাক ঘটিতে থাকে এবং এই উপায়ে সমস্ত দেশ প্রাণ পায় ও ঐক্য পায়। রাগ করিয়া এবং ঈর্ষা করিয়া যদি বলি প্রত্যেক প্রদেশ আপন স্বতন্ত্র পাকযন্ত্র বহন করুক তবে আমাদের হাত-পা বুক-পিঠ বিধাতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়া বলিতে পারে আমাদের নিজের নিজের একটা করিয়া পাকযন্ত্র চাই। কিন্তু যতই রাগ করি আর তর্ক করি, সত্যের কাছে হার মানিতেই হয় এবং সেইজন্যই সংস্কৃত বাংলা আপনার খোলস ভাঙিয়া যে-ছাঁদে ক্রমশ প্রাকৃত বাংলার রূপ ধরিয়া উঠিতেছে সে-ছাঁদ ঢাকা বা বীরভূমের নয়। তার কারণ নানা প্রদেশের বাঙালি শিখিতে, আয় করিতে, ব্যয় করিতে, আমোদ করিতে, কাজ করিতে অনেক কাল হইতে কলিকাতায় আসিয়া জমা হইতেছে। তাহাদের সকলের সম্মিলনে যে এক-ভাষা গড়িয়া উঠিল তাহা ধীরে ধীরে বাংলার সমস্ত প্রদেশে ছড়াইয়া পড়িতেছে। এই উপায়ে, অন্য দেশে যেমন ঘটিয়াছে, তেমনি এখানেও একটি বিশেষ ভাষা বাংলাদেশের সমস্ত ভদ্রঘরের ভাষা হইয়া উঠিতেছে। ইহা কল্যাণের লক্ষণ। অবশ্য স্বভাবতই এই ভাষার ভূমিকা দক্ষিণ বাংলার ভাষায়। এইটুকু নম্রভাবে স্বীকার করিয়া না লওয়া সদ্-বিবেচনার কাজ নহে। ঢাকাতেই যদি সমস্ত বাংলার রাজধানী হইত তবে এতদিনে নিশ্চয়ই ঢাকার লোকভাষার উপর আমাদের সাধারণ ভাষার পত্তন হইত এবং তা লইয়া দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা যদি মুখ বাঁকা করিত তবে সে বক্রতা আপনিই সিধা হইয়া যাইত, মানভঞ্জনের জন্য অধিক সাধাসাধি করিতে হইত না।

নিজের মুখে যাতে বেশি কথা বলতে না হয়, সেজন্যে বড় একটা উদ্ধৃতি-অংশই গ্রহণ করলাম। এখন আর আমার মুখ ফুটে বলার দরকার নেই যে, ঢাকা যেহেতু স্বাধীন বঙ্গদেশের রাজধানী, সেহেতু নতুন একটি ‘মানভাষা’ গড়ে উঠবার পাঁয়তারা ইতিহাসের নিজস্ব নিয়মেই এখানে চলবে, চলতে থাকবে। অন্তত রবীন্দ্রভাষ্য তাই বলে। সেক্ষেত্রে বাধাটা কোথায়? একশ বছর আগে চলিত/প্রাকৃত ভাষা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা ছিল সংস্কৃত। আর আজকের দিনে, আমাদের বাংলাদেশে, বাই ডিফল্ট, নতুন একটি ভাষা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা ঐ একশ বছরের চলিত ভাষাটাই। মানে প্রমথ- ও রবীন্দ্র-লালিত ভাষা। বাধা কিন্তু প্রমথ বা রবীন্দ্র স্বয়ং নন, বরং তাদের রচনা আমাদের মধ্যে ইমানি তাকত যোগায় মানুষের মুখের ভাষার দিকে কেবলা ঠিক করে নিতে।

কিন্তু কেন? কেন নতুন একটি ভাষার আদল গড়ে ওঠা জরুরি বলে মনে হয়? কিংবা আশলেই কি জরুরি? ক্রিয়াপদ আর সর্বনামের ক্ষেত্র ছাড়া ডমিন্যান্ট ঢাকাই বুলি চলিত বাংলার সঙ্গে কতটুকু ফারাক করে? নাকি দুই বাংলার ইতিহাস-ঐহিত্য এত দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে যে, তার আছর পড়ে বদলে যাচ্ছে ভাষার খোলনলচে? আমরা এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যাব না। বঙ্গবিচ্ছেদের বেদনায় কোনো সাম্প্রদায়িকতার হদিসও নেব না। তবে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বেশ বড় একটা ব্যবধান যে তৈরি হয়েছে দুই ভূগোলের মানুষের মনে অর্থাৎ বাংলার পূর্ব-পশ্চিমে প্রকৃত অর্থেই ‘চিত্তের ভাগ’ যে ঘটেছে এবং একশ বছরেও তাতে মেলাবার প্রয়াস যে দেখা যায় নি, সেই দুঃখের দলিল অস্বীকার করি কেমন করে? এই দলিল ঘাঁটলেই বেরিয়ে আসবে কার দায় কতটুকু এবং কোনখানে।

খুব ছোট এবং পরিচিত পরিসরেই একটি জরিপ আমরা চালাব। দুই বাংলার প্রতিনিধিত্বশীল দুটি অভিধানের মধ্যেই আমরা চেষ্টা করব দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে।


যবন ও মালাউন শব্দের প্রায়োগিক অর্থ একই—বিধর্মী।


অভিধান বা শব্দকোষ অনেক রকম হতে পারে। আমরা মূলত শব্দার্থ ও শব্দোৎস অনুসন্ধানের জন্য বেছে নিয়েছি দুটি গুরুত্বপূর্ণ অভিধান। গুরুত্বপূর্ণ বলছি এ কারণে যে, এ দুটি বই-ই বেশি পাঠকের হাতে পড়ে ধন্য। এর একটি ঢাকাই, অন্যটি কোলকাত্তাই। ঢাকার অভিধানের নাম ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’, আর কোলকাতারটি ‘সংসদ বাংলা অভিধান’ (পূর্বনাম ‘সংসদ্ বাঙ্গালা অভিধান’)।

নামেই চরিত্রের কিছু আভাস আছে। কোলকাতার ওই কিতাবটির নাম ছিল বেশ রাশভারি—প্রথম দুটি শব্দই, কি বলায় কি লেখায়, আজ আর দেখা যায় না। প্রথমত, ‌‘সংসদ’ বানানে হসন্ত উৎখাত হয়েছে অনেক আগেই। দ্বিতীয়ত ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি ‘বাংলা’ হয়েছে সেই কবে, যেদিন প্রমত্তা পদ্মাকে দেখে মানিক বন্দ্যোপাধায় লিখেছিলেন—‘পদ্মা তো কখনও শুকায় না।…গতিশীল জলতলে পদ্মার মাটির বুক কেহ কোনোদিন দেখে নাই, চিরকাল গোপন হইয়া আছে’—তারও কিছুকাল আগে। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, সেই যখন তিস্তার জলে বাঙাল ও বাঙালির রিশতা অটুট ছিল, তার প্রায় অর্ধশত বছর আগে। যা হোক, অভিধানটি আজ নিজের বাহ্যিক রূপটা অন্তত পাল্টে নিয়েছে।

তবু অনুমান তো করাই যায়, কোলকাতার অভিধানটির মর্মে আছে প্রাচীনতা, অপ্রচলতা এবং প্রাকৃত বাংলার প্রতি উপেক্ষা। এবং আরও একটি গুরুতর সমস্যা। সেটি হলো, বাঙালির প্রধান একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক চিহ্ন উদ্ধারে উদাসীনতা। বলছি মুসলমানি সংস্কৃতির কথা।

যেমন কিছু শব্দ—

আজরাইল, আজাজিল, আসর, আস্তাগফিরুল্লা, ইনশাল্লা, ইন্নালিল্লা, ইবলিশ, ইয়ানাফসি, এতেকাফ, এবাদত, এশা, ওয়াজ, গিবত, গোমরাহি, জাকাত, জোহর, তাহাজ্জুদ, দাফন, নফল, নসিহত, নাউজুবিল্লা, নাজায়েজ, নাফরমানি, ফেতরা, ফেরকা, বেদাতি, মকরুহ, মজহাব, মুসল্লি, মস্তাহাব, মাগরেব, মিলাদ, মোনাজাত, মোনাফেক, মোহাদ্দেস, রাহেলিল্লা, রুকু, রোকন, লানৎ, লিল্লা, শবে কদর, শাফায়াত, শিরক, সালাত, সুবহানাল্লা, সেহেরি, সোয়াব, হাশর, হেদায়েত, হেফ্জ।

এগুলো ধর্মীয় পরিভাষা। এসব আমাদের গল্পে-গানে-কথায় এমনভাবে উঠে এসেছে, এদের সাহিত্যিক মূল্যও তৈরি হয়ে গেছে এতদিনে। সাহিত্যের কথা বাদ দিলাম, কোনো মুসলমানের পক্ষে তার প্রাত্যহিকতায় শব্দগুলি এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই। এরা ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ঠাঁই পেলেও সংসদ বাংলা অভিধানে আজও অপাঙ্‌ক্তেয়।

ধর্মীয় পরিভাষা শুধু নয়, মুসলমানদের পারিবারিক সম্পর্কবাচক শব্দগুলিতেও গরবর আছে মনে হয়। উদাহরণত বলতে পারি, পূর্বের সংসদ্ ‘খালা’ (মাসি) শব্দের স্ত্রীরূপ লিখেছিল খালী। বর্তমানে এটি সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু জুড়ে দেয়া হয়েছে গোত্র পরিচয়। বলা হয়েছে ‘মুসলমানি’ শব্দ। কিন্তু ‘মাসি’ শব্দের পাশে লেখা হয় নি ‘হিন্দুয়ানি’ শব্দ। ‘ননাস’ (স্বামীর বড় বোন) শব্দটি তো খুঁজেই পেলাম না। খুঁজে পেলাম ‘মামদো ভূত’ মানে মুসলমান ভূত (!)। আছে ‘যবন’ ও ‘ম্লেচ্ছ’। অথচ ‘মালাউন’ নাই। যবন ও মালাউন শব্দের প্রায়োগিক অর্থ একই—বিধর্মী। মুসলমানরা হিন্দুদের মালাউন এবং হিন্দুরা মুসলমানদের যবন ঠাউরে থাকে। ব্যুৎপত্তি যাই হোক না কেন, ব্যবহারের দিক থেকে শব্দদুটি গালিবিশেষ।

12571409_1057604877615358_723798115_n
ঢাকা থিয়েটার আয়োজিত সেমিনার

এখানে আমরা অসংস্কৃত (আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও দেশি) শব্দের একটা ফর্দ তুলে দিচ্ছি, যাতে আশা করি সংসদ বাংলা অভিধানের ঊনতা ধরা পড়বে চট করে, তার মর্জিসমেত। জানিয়ে রাখা ভালো, বাছাইকৃত শব্দগুলি খুব সুপরিকল্পিত নয়, বলা চলে র‌্যান্ডম সিলেকশন বা চকিত চয়ন। যথা :

আকিক [আরবি] = মূল্যবান পাথর। (কালো আকিকের মতো নিকষ দরিয়ার বুক : ফররুখ আহমদ)

আকিকা [আরবি] = নবজাত শিশুর নামকরণ, চুল কামানো এবং সেই উপলক্ষে ছাগল প্রভৃতি জবাই করে উৎসব অনুষ্ঠান। (আসিল আকিকা উৎসবে প্রিয় বন্ধু স্বজন যত : কাজী নজরুল ইসলাম)

আজাব [আরবি] = শাস্তি, সাজা। (দোজখের আজাব হতে রেহাই কি চাও? : জসীম উদ্দীন)

আজিজি [আরবি, বাংলা প্রত্যয়ান্ত] = অনুনয়। (আজিজি করিনু তব না রাখিলা বাত : সৈয়দ হামজা)

আসর/আছর [আরবি] = প্রভাব, চিহ্ন।

ইজাফা [আরবি] = বেশি/অধিক। (তিন সন ইজাফা দিয়াছি রাজকরে : ঘনরাম চক্রবর্তী)

ইত্তেহাদ [আরবি] = ঐক্য/বন্ধুত্ব। (সব দরিয়াকে বাঁধবে তোমার ইত্তেহাদ : ফররুখ)

ইমতেহান/এমতেহান [আরবি] = পরীক্ষা। (এমতেহান লওয়ার সুযোগ কারো হয় নাই : মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন)

উফর-ফাঁফর [দেশি/তদ্ভব] = অস্থির। (উফর ফাঁফর চিত্ত নিঃশ্বাস ছাড়এ : দৌলত উজির বাহরাম খান)

উম্মত [আরবি] = শিষ্য, অনুচর, জাতি। (নিখিল ব্যথিত উম্মত লাগি এখনও তোমার অশ্রু ঝরে : ইসমাইল হোসেন শিরাজী)

উম্মি [আরবি] = নিরক্ষর, অজ্ঞ। (আমরা উম্মি মানুষ; লেখাপড়াও জানি না : মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন)

উয়ারি, উয়ারী [দেশি] = বহির্বাটি (ঢেকা মারি কৈল নিয়া বাহির উয়ারী : শেখ ফয়জুল্লাহ), বৈঠকখানা (শীতল যে সিংহাসন শীতল উয়ারী : দৌলত উজির বাহরাম খান)।

এরেম [আরবি] = স্বর্গোদ্যান। (এরেম উদ্যানে যথা আনন্দে মাতিয়া : ইসমাইল হোসেন)

কহর [আরবি] = অভিশাপ, বিপদ, অত্যাচার। (শহরে কহর এত আপনি করিলা : ভারতচন্দ্র)

খানকা [আরবি] = পিরের আস্তানা, বৈঠকখানা। (পুরানো সেই খানকা এখন মলিন মুখে কাটায় দিন : গোলাম মোস্তফা)

খাসলত/খাসলতি [আরবি] = স্বভাব। (খাসলতি কিসে ধুবা : লালন)

গোমতল্লাশ [ফারসি+আরবি] = গুপ্ত জিনিশ খোঁজা। (আমরা এখানে গোমতল্লাস করিব : প্যারীচাঁদ)

গোরবত [আরবি] = দারিদ্র্য। (আমি গরিব কথায় দুনিয়াবী গোরবৎ বুঝাই নাই : আবুল মনসুর আহমদ)

চাশনাই [ফারসি] = লবণ, মরিচ, তেল, পেঁয়াজ দিয়ে চটকানো সিদ্ধ মাছের সঙ্গে ডাল, আলু, বেগুন বা অন্যান্য সবজির ভর্তা; চাটনি।

জারেজার/জারজার [ফারসি] = দরবিগলিত ধারায়। (কান্দে জারেজার)

তখল্লুস [আরবি] = কবিসাহিত্যিকের ছদ্মনাম। (কায়কোবাদ তাঁর তখল্লুস : সৈয়দ মুজতবা আলী)

তজদিগ, তযদিগ [আরবি] = সাক্ষ্য, প্রমাণ, যাচাই। (এ ব্যাপারে আমি আপনের নিজের তযদিগ চাই : আবুল মনসুর আহমদ।

তজল্লি, তাজাল্লি [আরবি] = আলো, জ্যোতি। (নূরের তাজাল্লি যেথা : ফররুখ আহমদ)

তফরা [আরবি] = তড়পানো, আছাড়-পিছাড়। (প্রলয়তুফানে জেলেডিঙ্গির তফরা খাওয়ার মত : কালীপ্রসন্ন সিংহ]

তসল্লি [আরবি] = সান্ত্বনা, প্রবোধ। (কত সে ক্লান্ত বেদনা-দগ্ধ মুসাফির এরই মূলে বসিয়া পেয়েছে মা’র তসল্লি : নজরুল)

তহ [ফারসি] = খরচ, খাজনা। (আমি ত বাজারীদের তিন বৎসরের তহ মাফ করিয়া দিতেছি : গোপাল হালদার)

তাহজিব [আরবি] = ভব্যতা, ভদ্রতা।

তাহজিল/ তাহশিল [আরবি] = লাঞ্ছনা, শাস্তি, অসম্মান, অপমান। (না দিলে জওয়াব করিবে তাহশিল : সৈয়দ হামজা)

তৌফিক [আরবি] = সামর্থ্য, সম্পদ। (তৌফিক থাকলে রাজী হতেই হবে : মুফাখখারুল ইসলাম)

নওরাতি [মিশ্র] = উৎসবরাত্রি। (শোহরত দাও নওরাতি আজ : নজরুল)

নওশা [ফারসি] = বর, নতুন বাদশাহ। (নওশার বেশে সাজাও বন্ধু মোদের পুনর্বার : নজরুল)

নগিনা/নগীনা [ফারসি] = আংটির পাথর, মণি। (হেন সুন্দর বহুমূল্য নগীনা : মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)

নজদিক(গ) [ফারসি] = নিকট, সম্মুখ। (আন্দাজ হয় মৌত নজদিগ : প্যারীচাঁদ)

নন্নরে [দেশি] = নড়বড়ে।

নাজাই [ফারসি] = যে খরচের উল্লেখ নেই, যার কৈফিয়ত নেই। (দুজনে সংগীত-রসিকদের গান-বাজনা শুনিয়ে নাজাই টাকা রোজগার করবেন : প্রমথ চৌধুরী)

নাজাত [ফারসি] = মুক্তি। (নাজাত পথের আজাদ মান নেই কিরে কেউ বাঁচা : নজরুল)

নাজিল [আরবি] = অবতরণ, উপস্থিত, আবির্ভাব। (আয়াত নাজিল হওয়া)

নাদান [ফারসি] = বোকা, নির্বোধ। (কাপড়চোপড় দেখে বড়ই নাদান বলে মনে হয় : আসকার ইবনে শাইখ)

নানখাতাই [ফারসি] = মিষ্টান্ন বিশেষ। (নানখাতাই, মিঠা, নেমকি, পরটা এ সকল সুখাদ্য স্বহস্তে প্রস্তুত করিয়াছেন : মীর মশাররফ)

নাফানী [তদ্ভব/দেশি] = যৌবনগর্বিতা। (সে বলে নাফানী আলা না জান আপনা। চাঁদে দেখি দেখিয়াছি তোর সতীপনা : ভারতচন্দ্র)


পণ্ডিতদের অনুচর একদিকে ফারসিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে উদ্যত, অন্যদিকে মুন্সিদের গুপ্তচর সংস্কৃতকে হটিয়ে দিতে মশগুল


পায়রবি [ফারসি] = অনুসরণ/শিষ্যত্ব। [মিথ্যারে যদি মিথ্যা জেনেও করো তার পায়রবি : তালিম হোসেন]

ফাতেহা [আরবি] = কোরআনের প্রথম সুরা, মৃতব্যক্তির আত্মার জন্য সুরাফাতিহা ইত্যাদি পড়ে দোয়া ও ফকির খাওয়ানো অনুষ্ঠান। (করিব ফাতেহা আদি কান্দিব বিস্তর : হেয়াত মাহমুদ)

বদস্তুর [ফারসি] = যথারীতি/ নিয়মানুসারে। (কাননগো দপ্তর সাবেক বদস্তুর আমাদের খুড়া মহাশয়ের : রামরাম বসু)

বনোসা [ফারসি] = নীল রঙের ফুল বিশেষ। (নার্গিস আর গুলবনোসার দেখবে যেথায় সুনীল দল : নজরুল)

বাওয়ালি [তদ্ভব/দেশি] = যিনি বাঘকে বশ করার মন্ত্র জানেন। (আমাদের পবন বড় জবরদস্ত বাওয়ালী : শেখ হবিবুর রহমান সাহিত্যরত্ন)

বেওফা [ফারসি] =অকৃতজ্ঞ, নিমকহারাম। (বেওফা বদজাত এরা খারাবি করিল তেরা : সৈয়দ হামজা)

বেচইন [ফা+হি] = অস্থির।

বেতাব [ফারসি] = অশান্ত, ব্যাকুল। (বেতাব আমি বিমারির হালে : ফররুখ)

বেদাতি/বদিয়তী [আরবি] = মন্দ কাজ। (একে দুঃস্বপ্ন তায় দেবতার এই বদিয়তী : কেদারনাথ মজুমদার)

বেরন [ফারসি বিরিয়ান] = ভাজি/ভাজা।(বেগুন বেরন)

বেরন [ফারসি বেরুন] = ধান কাটার মজুরি হিশেবে মজুরকে প্রদেয় ধানের ভাগ।

বেশরা [ফা+আ] = শয়িরত বা বিধান মানে না এমন। (বেশরা ফকির)

মউজ, মৌজ [আরবি] = ঢেউ (দরিয়ার বড় মৌজ হইয়াছে : প্যারীচাঁদ), বিভোরতা (মৌজ করে শারাব পিউ : নজরুল), আনন্দ, ফুর্তি।

মউত, মৌত [আরবি] = মৃত্যু। (তবে বুঝি মউত হতো খুব সুখের : মুফাখখারুল ইসলাম)

মকসেদ [আরবি] = উদ্দেশ্য, গন্তব্যস্থান।

মনসুখ [আরবি] = বাতিল।

মরতবা/মর্তবা [আরবি] = গুণ, মর্যাদা। (বাদশাহ বাইচ্যা থাকতে হারি বাবার মাজারের মরতবা নষ্ট করে কোন ব্যাডা : আবু ইসহাক)

মসরুফ [আরবি] = নিয়োজিত, ব্যতিব্যস্ত। (দুনিয়ার ফেকেরে মসরুফ আছি : আবুল মনসুর আহমদ)

মসলত [আরবি] = উপদেশ, পরামর্শ। (এনার মসলতে কাম করলে মোদের দফা রফা হইত : প্যারীচাঁদ)

মসিবত/ মুসিবত [আরবি] = বিপদ, যন্ত্রণা।

মসিহ/ মসীহ [আরবি] = হজরত ঈসা বা যিশু। (আসিল কি ফিরে এতদিনে সেই মসীহ মহামানব : নজরুল)

মসিন/মসীন [অজ্ঞাত] = উৎপীড়ন। (মসীন করিবে রাজা : মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)

মাইয়াত [আরবি] = মৃত ব্যক্তি। (কেউ মাইয়াতের গোছলের ব্যবস্থা করে : ইব্রাহিম খাঁ)

মাসায়েল [আরবি] = প্রশ্ন, সমস্যা, বিধান।

মিসমার [আরবি] = সর্বনাশ, চূর্ণবিচূর্ণ, সম্পূর্ণ ধ্বংস। (নাসারা চায় আমাদের সব আস্তানা মিসমার করে দিতে : আবু জাফর শামসুদ্দীন)

মুরশিদ/ মুর্শিদ [আরবি] = গুরু, পথপ্রদর্শক। (যে মুর্শিদ, সেই তো রাসুল : লালন)

মুসাফা [আরবি] = সাক্ষাৎকালে করমর্দন।

মুহাজের [আরবি] = দেশত্যাগকারী, উদ্বাস্তু।

রইঘর [তদ্ভব] = নৌকার ছই (রইঘর চাপিয়া বসিয়া সদাগর : মুকুন্দরাম চক্রবর্তী), পুকুরের মধ্যস্থ গভীরতম গর্ত।

রওজা [ আরবি] = সমাধি, কবর।

রাহাবর/রাহবর [ফারসি] = পথপ্রদর্শক।

রেজালা [ফারসি] = জায়ফল, যইত্রি ও শাহি জিরাসহ অন্যান্য মশলা দিয়ে রান্না তরকারি।

রেহেল [আরবি] = (কাঠনির্মিত) বইধারক—যাতে রেখে সাধারণত কোরআন পড়া হয় ।

রোখসত/রুখসত [আরবি] = কাজ শেষে লেনদেন মিটিয়ে বিদায়। (এক্ষুনি বলে রোখসত হই : আবু জাফর শামসুদ্দীন)

রোজানা [ফারসি] = পারিশ্রমিক। (অবশ্য সেইজন্য রোজানা দিতে হইবে : গোপাল হালদার)

রোনাজারি [হিন্দি+ফারসি] = কান্না। (ও কি রোনাজারি ক্ষুধিতের : ফররুখ)

রোসেমাৎ [আরবি] = মুসলিম প্রথা অনুযায়ী বিয়ের পর বর-কনের পরস্পর প্রথম দর্শন ও আচারাদি।

লেহাজ [আরবি] = লজ্জা-শরম, শিষ্টাচার। [বিপরীত—বেলেহাজ]

লোকমা [আরবি] = গ্রাস। (দুই চার লোকমা খেয়েছি : ইব্রাহিম খাঁ)

শমসের [ফারসি] = তলোয়ার। (তুমি এস বীর হাতে নিয়ে শমসের : নজরুল)

শাদিয়ান/শাদিয়ানা [ফারসি] = আনন্দোৎসব, বিয়ের বাদ্য। (হঠাৎ সাদিয়ানা বাদ্য বাজিয়া উঠিল)

শান [আরবি] = মাহাত্ম্য, মর্যাদা। (আল্লাহর শান)

শাফা [আরবি] = আরোগ্য। (খোদা যাকে শাফা না দেয় তাকে কে ভাল করিতে পারে : আবুল মনসুর আহমদ)

সখাওত/ সাখাওত, সাখাওতি [আরবি] = দান, দাতা, দান-দাক্ষিণ্য। (হাতেম পাইয়া দান করে সাখাওতি কাম : সৈয়দ হামজা)

সয়ানি [তদ্ভব] = কিশোরী, চতুরা। (ইহ কো কহে সয়ানি : বিদ্যাপতি)

সরাফত/শরাফত [আরবি] = ভদ্রতা, আভিজাত্য।

সরপেচ [ফারসি] = রেশমি বা জরির ফিতাবিশেষ। (সরপেচ মোরছা কলসী নিরমল : ভারতচন্দ্র)

সরাবত [আরবি] = হাঙ্গামা। (হয়তো কোন বেশ্যার বাটিতে গিয়া সোরসরাবত করিয়া তাহার কেশ ধরিয়া টানেন বা মশারি পোড়ান : প্যারীচাঁদ)

সরেওয়ার [আ+ফা] = সাজিয়ে গুছিয়ে। (সে ব্যক্তি সরেওয়ার কিছু বলিতে পারিল না : প্যারীচাঁদ)

সরো [ফারসি] = সাইপ্রেস গাছ। (সরোর মতন সরল তনু টাটকা তোলা গোলাপ ফুল : নজরুল)

সরোকার [ফারসি] = সম্বন্ধ, দাবি, অধিকার। (তাদের কি সরোকার আছে আমায় যা তা বলবার : নজরুল)

সলুপা, সুলফা [দেশি] = শাকবিশেষ।

সহিসালামত [আরবি] = শান্তি, নিরাপত্তা।

সহুর [আরবি] = বোধবুদ্ধি। (জেলেখা বলেন মোর হইল সহুর : ফকির গরীবুল্লাহ)

সাদিক [আরবি] = সত্যবাদী, বিশ্বস্ত।

সানি [আরবি] = দ্বিতীয় বার। (এই মোকদ্দমায় সানি তজবীজ আবশ্যক : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর)

সায়েল [আরবি] = ফকির, মিসকিন। (লক্ষ দিরহাম তুমি দেবে লক্ষ সায়েলের হাতে : ফররুখ)

সারানি (নী) [দেশি+হিন্দি] = ভাটার সময়ে পানির হ্রস্বতা। (ভাটার সারানি পড়ল : প্যারীচাঁদ)

সালেক/সালিক [আরবি] = সুফি সাধক।

সাহাবি [আরবি] = হজরত মুহম্মদের জীবৎকালের বন্ধু।

সিদ্দত/সেদ্দত [আরবি] = দুঃখকষ্ট, দুঃখ দেওয়া (যতেক সেদ্দত মোরা করিয়াছি তারে : গরীবুল্লাহ)

সুবহে সাদেক [আরবি] = ভোর, ব্রাহ্মমুহূর্ত (আলঙ্কারিক)।

সেনি/ছেনি [ফারসি] = ডেকচির ঢাকনা।

সেমিতি [আরবি] = হজরত নুহের পুত্র সাম-এর বংশধর প্রাচীন জাতি, তাদের ধর্ম। (তুলনীয় ইং semitic)

সেলাপচি [অজ্ঞাত] = চিলমচি, হাত ধোয়ার পাত্র।

সেহেরা/সিহারা [ফারসি] = ফুল বা জরির তৈরি টোপর। (খুনের সেহেরা পরাইয়া দাও হাতে বাঁধি হাতিয়ার : নজরুল)

সোবে/শোবা [আরবি] = সন্দেহ, সংশয়। (সেই মুখই বটে, তবু সোবে হয় যায় নাকো ঠিক চেনা : মোহিতলাল)

সোয়াতি [তদ্ভব] = স্বস্তি, শান্তি। (জনম অবধি না পাই সোয়াতি : চণ্ডীদাস)

হরকিসিম/হরকিসম [ফা+আ] = নানা রকম।

হাজাম [আরবি] = ক্ষৌরকার, যে খতনা করে। (সুন্নত করিয়া নাম বোলাল্য হাজাম : মুকুন্দরাম)

হায়াত = জীবন, পরমায়ু। (রহিবেন জেন্দা জাহানে হায়াতে : অবনীন্দ্রনাথ)

11004846_904008106310978_2141090927_n

আজ থেকে দুশো বছর আগে ‘পণ্ডিত’ ও ‘মুন্সি’ দুটি পদ তৈরি করেছিল ইংরেজরা। সংস্কৃত-জানা ও ফারসি-জানা লোক যথাক্রমে এই দুই পদের অধিকারী। ইতিহাসের দেরাজ খুললে বাংলা গদ্যের দলিলপত্র যা পাওয়া যায় তাতে ইনাদেরই হাতে লেখা বাংলা ভাষার সাফ-কওলা। সেই থেকে বাংলার দখল নিয়েছে সংস্কৃত আর ফারসি।

পরবর্তীকালে দেখা গেল, পণ্ডিতদের অনুচর একদিকে ফারসিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে উদ্যত, অন্যদিকে মুন্সিদের গুপ্তচর সংস্কৃতকে হটিয়ে দিতে মশগুল। প্রথম পক্ষের উৎপাত পুরো উনিশ শতক জুড়েই। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ১৮৩৮ সালে ‘পারসীক অভিধান’ নামে যে সংকলনটি করেন জয়গোপাল তর্ক্কালঙ্কার, তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভাষায় যে সব বিদেশি (ফারসি) শব্দ ব্যবহৃত হয় তা চিহ্নিত করা। যাতে এসব শব্দ পরিহার করে শুদ্ধ বাংলা চর্চায় লেখকরা সচেতন হয়ে ওঠেন। [উৎস : মোহম্মদ আজম, বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ]। দ্বিতীয়পক্ষের আবির্ভাব ঘটে বিশেষত বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বর্তমান বাংলাদেশের পাকিস্তান পর্বে। সে আলোচনায় যাব পরে। লক্ষণীয়, এরা কেউই চাষাভুশার বয়ান থেকে শব্দ কুড়াতে তেমন আগ্রহী নয়। এটা কি দুই সংস্কৃতির লড়াই শুধু, ইংরেজের ইন্ধন ও আস্কারায়? তা মনে হয় না। এ সংকট বা সংঘাত আগেও ছিল, তবে একটু ভিন্নভাবে। তার কিছু আভাস পাই আবদুল হাকিমের কবিতায় :

যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

এরও একশো বছর পর ভারতচন্দ্র লিখছেন :

প্রাচীন পণ্ডিতগণ গিয়াছেন কয়ে।
যে হৌক সে হৌক ভাষা কাব্য রস লয়ে।।

… … …

না রবে প্রসাদগুণ না হবে রসাল।
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।।


হিন্দু দেবদেবীর নাম দেখলে রাগ করা যেমন অন্যায়, হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে নিত্য-প্রচলিত মুসলমানি শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়


সেদিনের ভাষা-সংকটকে তারা মোকাবেলা করেছেন নিজেদের সৃজনশীলতার নিরিখে। বলা যায়, আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে স্বগোত্রীয় পাঠকশ্রোতাকে কেবল ধমক মেরেই দেয়াল টপকে গেছেন তারা। কিন্তু ব্রিটিশ-আমলে সমস্যাটা যখন টনটনে রাজনৈতিক হয়ে উঠল, বিশেষত বঙ্গভঙ্গ রদের পর কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের টানাপড়েনে বাঙালি ইন্টেলিজেন্সিয়া যখন দ্বিধাবিভক্ত, তখন লেখকের কণ্ঠস্বর আপ্‌সে নিচু হয়ে এল, তাকে এগুতে হলো যুক্তিতর্কের পথ ধরে, অনেক হিশাব কষে।

এই সময়ের আঁচ সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায় কাজী নজরুল ইসলামে। হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় অনুষঙ্গ তাকে দুই হাতে একই সাথে আগলাতে হয়েছে : ‌‘তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার হিম্মতহ্রেষা হেঁকে চলে’। কবিতা বা গান লিখেই ক্ষান্ত হন নি, কৈফিয়ত দিতেও বাধ্য হয়েছেন যেন :

বাংলাসাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য। এতে হিন্দু দেবদেবীর নাম দেখলে রাগ করা যেমন অন্যায়, হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে নিত্য-প্রচলিত মুসলমানি শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এ-সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু-দেবদেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্যে অনেক জায়গায় আমার কাব্যের সৌন্দর্যহানি হয়েছে। তবু আমি জেনেশুনেই তা করেছি।

এর কিছুকাল আগে বঙ্গীয় সারস্বত সমাজ মুখরিত হয়ে উঠেছিল বাবু বাংলা ও প্রাকৃত বাংলার কলহে। মনে রাখা দরকার, সংস্কৃত ভাষা ও ব্যাকরণের আধিপত্যকে উৎপীড়ন হিশেবে চিহ্নিত করার কাজটি শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে শুরু হলেও, প্রতিরোধ গড়ে উঠল এই প্রথম। এবং সেটাও বেশ দলবদ্ধভাবে। প্রমথ চৌধুরী তামাশার সুরেই আলাপটা শুরু করলেন :

…শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের বিশ্বাস যে, আদিশূরের আদিপুরুষ যখন গৌড়ভাষা সৃষ্টি করতে উদ্যত হলেন, তখন তাঁর সংকল্প ছিল যে, ভাষাটাকে বিলকুল সংস্কৃত ভাষা করে তোলেন, শুধু গৌড়বাসীদের প্রতি পরম অনুকম্পাবশত তাদের ভাষার গুটিকতক কথা বাংলা ভাষায় ব্যবহার করতে অনুমতি দিয়েছিলেন। এখন যাঁরা সংস্কৃতবহুল ভাষা ব্যবহার করবার পক্ষপাতী, তাঁরা ঐ যে গোড়ায় গলদ হয়েছিল তাই শুধরে নেবার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়েছেন। আমাদের ভাষায় অনেক অবিকৃত সংস্কৃত শব্দ আছে, সেইগুলিকেই ভাষার গোড়াপত্তন ধরে নিয়ে, তার উপর যত পার আরো সংস্কৃত শব্দ চাপাও—কালক্রমে বাংলায় ও সংস্কৃতে দ্বৈতভাব থাকবে না।

(কথার কথা)

তিনি আমাদের মনোযোগ ফেরালেন ইতিহাসের দিকে :

‘ফোর্ট উইলিয়মের পণ্ডিত মহাশয়েরা যে গদ্য রচনা করে গিয়েছেন তাতে ফারসি-আরবির স্পর্শমাত্র নেই। তাঁদের ঐ তিরস্করণী বুদ্ধির প্রতাপে বাংলা ভাষা থেকে শুধু যে আরবি-ফারসি বেরিয়ে গেল তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য তদ্ভব কথাও সাহিত্য হতে বহিষ্কৃত হল।…শুধু অসংখ্য কথা যে বেরিয়ে গেল তাই নয়, ভাষার কলকব্জাও বদলে গেল।…ফলে বাঙালির মুখে যা ছিল active, বাঙালির লেখায় তা passive হয়ে পড়ল।

(আমাদের ভাষা-সংকট)

লক্ষণীয়, প্রমথ চৌধুরী জোর দিচ্ছেন বাঙালির জবানের ওপর, মানে মুখের বুলিকে আশ্রয় করতে বলছেন। সে কারণে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ও ‘হুতোম প্যাঁচার নক্শা’কে বলেছেন ‘বিদ্রোহের দুটি লাল পতাকা’।

এবারে শোনা যাক তাঁর পরমাত্মীয় ঠাকুর মহাশয় কী বলছেন :

বাংলা গদ্য-সাহিত্যের সূত্রপাত হইল বিদেশীর ফরমাশে, এবং তার সূত্রধার হইলেন সংস্কৃত পণ্ডিত, বাংলা ভাষার সঙ্গে যাঁদের ভাসুর-ভাদ্রবউয়ের সম্বন্ধ। তাঁরা এ ভাষার কখনো মুখদর্শন করেন নাই। এই সজীব ভাষা তাঁদের কাছে ঘোমটার ভিতরে আড়ষ্ট হইয়া ছিল, সেইজন্য ইহাকে তাঁরা আমল দিলেন না। তাঁরা সংস্কৃত ব্যাকরণের হাতুড়ি পিটিয়া নিজের হাতে এমন একটা পদার্থ খাড়া করিলেন যাহার কেবল বিধিই আছে কিন্তু গতি নাই। সীতাকে নির্বাসন দিয়া যজ্ঞকর্তার ফরমাশে তাঁরা সোনার সীতা গড়িলেন।…

যদি স্বভাবের তাগিদে বাংলা গদ্য-সাহিত্যের সৃষ্টি হইত, তবে এমন গড়াপেটা ভাষা দিয়া তার আরম্ভ হইত না। তবে গোড়ায় তাহা কাঁচা থাকিত এবং ক্রমে ক্রমে পাকা নিয়মে তার বাঁধন আঁট হইয়া উঠিত। প্রাকৃত বাংলা বাড়িয়া উঠিতে উঠিতে প্রয়োজনমত সংস্কৃত ভাষার ভাণ্ডার হইতে আপন অভাব দূর করিয়া লইত।

কিন্তু বাংলা গদ্য-সাহিত্য ঠিক তার উল্টা পথে চলিল। গোড়ায় দেখি তাহা সংস্কৃত ভাষা, কেবল তাহাকে বাংলার নামে চালাইবার জন্য কিছু সামান্য পরিমাণে তাহাতে বাংলার খাদ মিশাল করা হইয়াছে। এ একরকম ঠকানো।

(ভাষার কথা)

কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এইসব আলোচনা যখন চলছে, ঠিক তখনই শান্তিনিকেতনে বসে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি করে চলেছেন তার মহাগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। নাম ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’। এ অভিধান খুললে পাঠকের বিভ্রান্ত হবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, এটি সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি কিনা। অত্যন্ত নিষ্ঠা বা পরহেজগারির সঙ্গে তজ্জ ও তৎসম শব্দের ধনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক চেহারা এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। চকিতে মনে হতে পারে, এটি সম্ভবত বাঙালি ব্রাহ্মণের সংস্কৃতে অভিপ্রয়াণ। যেমন, অভিধানের প্রথম অক্ষর (শব্দাংশ বা উপসর্গ) হচ্ছে ‘অ’। এটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হরিচরণ শরণ নিয়েছেন পাণিনির। বিসমিল্লাতেই খোলাশা হয়ে গেছে এই অভিধান কিসের বা কার পায়রবি করবে।

‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। এর দুবছর আগে বেরোয় ‘চলন্তিকা’। সংকলক রাজশেখর বসু। তিনি হরিবাবুকে সাধুবাদ জানিয়ে লেখেন :

কেহই শ্রীযুক্ত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের ন্যায় বিরাট কোষগ্রন্থ সংকলনের প্রয়াস করেন নাই। বঙ্গীয় শব্দকোষে প্রাচীন ও আধুনিক সংস্কৃতেতর শব্দ (তদ্ভব দেশজ বৈদেশিক প্রভৃতি) প্রচুর আছে। কিন্তু সংকলয়িতার পক্ষপাত নাই, তিনি বাঙলা ভাষায় প্রচলিত ও প্রয়োগযোগ্য বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দের সংগ্রহে ও বিবৃতিতে কিছুমাত্র কার্পণ্য করেন নাই। যেমন সংস্কৃত শব্দের ব্যুৎপত্তি দিয়াছেন, তেমনি অসংস্কৃত শব্দের উৎপত্তি যথাসম্ভব দেখাইয়াছেন। এই সমদর্শিতার ফলে তাঁহার গ্রন্থ যেমন মুখ্যত বাঙলা সাহিত্যের প্রয়োজনসাধক হইয়াছে, তেমনি গৌণত সংস্কৃত সাহিত্য চর্চারও সহায়ক হইয়াছে। সংস্কৃত মৃত ভাষা কিন্তু গ্রিক লাটিনের তুল্য মৃত নয়। ভাগ্যবতী বঙ্গভাষা সংস্কৃত শব্দের অক্ষয় ভাণ্ডারের উত্তরাধিকারিণী, এবং এই বিপুল সম্পৎ ভোগ করিবার সামর্থ্যও বঙ্গভাষার প্রকৃতিগত। আমাদের ভাষা যতই স্বাধীন স্বচ্ছন্দ হউক, খাঁটী বাঙলাশব্দের যতই বৈচিত্র্য ও ব্যঞ্জনা-শক্তি থাকুক, বাঙলা ভাষার লেখককে পদে পদে সংস্কৃত ভাষার শরণ লইতে হয়। কেবল নূতন শব্দের প্রয়োজনে নয়, সুপ্রচলিত শব্দের অর্থপ্রসার করিবার নিমিত্তও। অতএব বাঙলাঅভিধানে যত বেশী সংস্কৃত শব্দের বিবৃতি পাওয়া যায় ততই বাঙলা সাহিত্যের উপকার। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় এই মহোপকার করিয়াছেন। তিনি সংস্কৃত শব্দের বাঙলা প্রয়োগ দেখিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, সংস্কৃত সাহিত্য হইতে রাশি রাশি প্রয়োগের দৃষ্টান্ত আহরণ করিয়াছেন। এই বিশাল কোষগ্রন্থে যে শব্দসম্ভার ও অর্থবৈচিত্র্য রহিয়াছে তাহাতে কেবল বর্তমান বাঙলা সাহিত্যের চর্চা সুগম হইবে এমন নয়, ভবিষ্যৎ সাহিত্যও সমৃদ্ধিলাভ করিবে।

সংকলয়িতার পক্ষপাত আছে কি নেই, সে নিয়ে বৃথা বাক্যব্যয় করবো না আর, শুধু অশনি-সংকেত হিশেবে এই কথাটায় নোক্তা দিয়ে রাখা যাক : ‘বাঙলাঅভিধানে যত বেশী সংস্কৃত শব্দের বিবৃতি পাওয়া যায় ততই বাঙলা সাহিত্যের উপকার।’ আমাদের মত ঠিক তার উল্টো না হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংস্কৃতের প্রতি বাঙালির এই রাধাভাব আজ অব্দি বাংলা ব্যাকরণকে তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেয় নি।

রামকমল বিদ্যালঙ্কারের ‘প্রকৃতিবাদ অভিধান’, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’—এই তিনটি সংকলন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিঃসন্দেহে। তা সত্ত্বেও সেকালে সকল বাঙালির দাবি পূরণে যথেষ্ট ছিল না। ছিল না বলেই কাজী আবদুল ওদুদ নতুন একটি অভিধান সংকলনে এগিয়ে আসেন। তাঁর অভিধানের নাম ‘ব্যবহারিক শব্দকোষ’। অভিধানের ভূমিকায় তিনি লিখছেন :

বাংলা ভাষা তার বিচিত্রমূল সাধারণ ও অ-সাধারণ শব্দ ও শব্দ-সংশ্লেষ নিয়ে বর্তমানে যে বিশিষ্ট রূপ ধারণ করছে, ক্ষেত্রবিশেষে করতে যাচ্ছে, সে-সবের সঙ্গে প্রধানত শিক্ষার্থীদের যথাসম্ভব অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটানো ‘ব্যবহারিক শব্দকোষে’র উদ্দেশ্য।…

বাংলার মুসলমান-সমাজে প্রচলিত অথচ বাংলা অভিধানে সাধারণত অচলিত শব্দগুলোও সংকলন করতে চেষ্টা করা হয়েছে। মুসলমান-সমাজের চিত্র বাংলা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে অঙ্কিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সবের প্রয়োজনীয়তা সহজেই বৃদ্ধি পাবে।

আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষা থেকে আগত শব্দগুলোর প্রতিবর্ণীকরণ যথাসম্ভব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করতে চেষ্টা করা হয়েছে।

সমস্ত বিদেশি s ধ্বনি ‘স’-এর দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে।

বঙ্গীয় শব্দকোষে তৎসম শব্দগুলির বাক্যপদীয় দৃষ্টান্ত হিশেবে বেদ, উপনিষদসহ সংস্কৃতকাব্য-নাট্য মন্থন করে তুলে আনা হয়েছে শ্লোকসমুচ্চয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, আরবি-ফারসি শব্দ কিছুবা যা-ও আছে, তাদের বাক্যনজির হাজির করতে কেন কোরান-হাদিস-গজল টেনে আনা হলো না?

ভাগ্য ভালো, মুসলিম লীগপন্থিরা সে উদ্যোগ নেয় নি। নেয় নি, তাইবা বলি কেমন করে? আরও একটা বীভৎস ব্যাপার তারা ঘটাতে চেয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর। চেয়েছিল বাংলা বর্ণমালার ক্ষেত্রে আরবি হরফের প্রতিস্থাপন। যে চেষ্টা হালে পানি পায় নি। কিন্তু তাদের মেহনত অনেকটাই ফলদায়ী হয়েছিল ভিন্ন একটি দিকে। আরবি-ফারসি শব্দের আকছার ব্যবহার বাংলা ভাষার বদন খানিকটা বদলে দিয়েছিল।


সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার মর্মবাণী না হলো তবে সে সাহিত্য আমার সাহিত্য হয় কিরূপে?


এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা রাখে ‘পূর্ব পাকিন্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’। এর প্রথম অধিবেশন বসে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে কোলকাতায়, মুসলিম ছাত্রলীগের ঘাঁটি ইসলামিয়া কলেজ মিলনায়তনে। এ অধিবেশনে আবুল মনসুর আহমদের পেশ করা ইশতেহারের কয়েকটি বক্তব্যে নজর বুলানো যাক :

পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা ভারতের অন্যান্য জাত থেকে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ধর্মীয় ভ্রাতাদের থেকে একটা স্বতন্ত্র আলাহিদা জাত।…

পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলা ও আসামের সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি তা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুব উন্নত সাহিত্য। তবুও এ সাহিত্য পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য নয়। কারণ এটা বাংলার মুসলমানের সাহিত্য নয়। এ সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোনো দান নেই, শুধু তা নয়, মুসলমানদের প্রতিও এ সাহিত্যের কোনো দান নেই। অর্থাৎ এ সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ কোনো প্রেরণা পায় নি এবং পাচ্ছে না। এর কারণ আছে। সে কারণ এই যে, এই সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়। এর বিষয়বস্তু মুসলমানী নয়, এর স্পিরিটও মুসলমানী নয়, এর ভাষাও মুসলমানের ভাষা নয়।…সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার মর্মবাণী না হলো তবে সে সাহিত্য আমার সাহিত্য হয় কিরূপে? আমার ঐতিহ্য আমার ইতিহাস আমার ইতিকথা এবং আমার উপকথা যে সাহিত্যের উৎস নয়, সে সাহিত্য আমার জীবন-উৎস হবে কেমন করে?…

বস্তুত, বাংলার মুসলমানের যেমন একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, তেমনি তাদের একটা নিজস্ব সাহিত্যও আছে। সে সাহিত্যের নাম মুসলমানী বাংলা সাহিত্য বা পুঁথি সাহিত্য। পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য রচিত হবে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মুখের ভাষায়। সে ভাষা সংস্কৃত বা তথাকথিত বাংলা ব্যাকরণের কোনো তোয়াক্কা করে না। বাংলা ভাষার কথা বলতে গেলেই হরফের কথাও এসে পড়ে। আমি শুধু এইটুকু বলে রাখছি যে বাংলার বর্তমান বর্ণমালার আবর্জনা আমরা রাখব না।

রেনেসাঁ সোসাইটির এই সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে আবুল কালাম শামসুদ্দীন বলেন : ‘…অনাবশ্যক অক্ষর বাংলা বর্ণমালায় ভিড় করে আছে।…সংস্কৃত ভাষার প্রতি অতিরিক্ত মোহবশত স্বভাবত রক্ষণশীল হিন্দু সাহিত্যিকদের এ ব্যাপারে কুণ্ঠা হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলমান সাহিত্যিক জানেন বাংলা ভাষা একটা মিশ্রভাষা—সংস্কৃতের সাথে এর কোনো যোগ নেই। শুধু তাই নয়, পরোক্ষ যোগও অত্যন্ত ক্ষীণ। কাজেই অনাবশ্যক অক্ষরের মোহ তার থাকতে পারে না।’

অক্ষর-বিতাড়ন আন্দোলন এতটাই উগ্র হয়ে উঠেছিল যে, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ কবিও আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেন। তাদের যুক্তি ছিল দুটি। এক, আরবি হরফে লিখতে সময় লাগে কম। দুই, আরবি মুসলমানের ধর্মীয় ভাষা।

তবে উল্লেখ্য যে, ফররুখ আহমদ এই দলে ছিলেন না। কিন্তু অপবাদ ও অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। কংকর সিংহ তার ‘বঙ্গভঙ্গ রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশ’ বইতে লিখেছেন, ‘কবির পাকিস্তান সৃষ্টির পর পর বাংলাকে তালাক দিয়ে উর্দুকে নিকাহ করার বাসনা ছিল, বাংলা ভাষার হরফ পরিবর্তন করে আরবি হরফ গ্রহণ করার বাসনা।’ কংকরবাবু প্রমাণ হিশেবে দাখিল করেছেন ফররুখের একটি কবিতাংশ :

দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন
বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকেই করিয়াছি নিকা।

দুঃখজনক যে, কংকর সিংহ ব্যঙ্গাত্মক কবিতাটি হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছেন শোচনীয়ভাবে। কবিতার ‘আমি’কেই শনাক্ত করেছেন ‘কবি’ বলে। তিনি যদি আরেকটু খোঁজখবর নিতেন তবে জানতে পারতেন, ভাষা-আন্দোলনের অনেক আগেই ফররুখ ‘সওগাত’ পত্রিকায় লিখেছিলেন : ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ চলছে। আর সবচাইতে আশার কথা এই যে, আলোচনা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তাই হয়, তা হলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’

তারপরও এ কথা স্বীকার করতেই হবে, পাকিস্তান-আন্দোলনের সমর্থক প্রায় সকল কবিসাহিত্যিকেরই অন্তরে আরবি-ফারসির প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। এ ভালোবাসা বাংলাভাষার প্রতি কিছুটা অত্যাচারও বটে।

8163_10208122309317584_7364559389268644176_n
সেমিনারে আলোচনা পর্ব

আলোচনাটা এবার গুটিয়ে আনা যাক। আমরা আভাসে দেখাতে চাইলাম, ‘পণ্ডিত’ ও ‘মুন্সি’দের অনুচর ও গুপ্তচরেরা উভয় দিক থেকে বাংলাভাষার ওপর জবরদস্তি করেছেন। এখন আমাদের দাবি এ নয় যে, বাংলা ভাষা থেকে সংস্কৃত বা আরবি-ফারসি শব্দ খেদাও। আমরা অভিধান থেকে কোনো শব্দই ফেলে দেয়ার পক্ষপাতী নই। বাঙালির আড়াআড়ি ও রাগবিরাগের প্রত্নচিহ্ন হিশেবে সে সব থাক বরং, যদি অপ্রচলিতও হয়।

একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা অভিধান দরকার এই মুহূর্তে, যাতে ফুটে উঠবে বাঙালির যথার্থ পরিচয়। ঢাকার অভিধানটিতে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কৃত শব্দের অনুপস্থিতি আছে, যেন তা হীনম্মন্যতামুক্ত। তাই ‘হীনম্মন্য’ শব্দটাই অভিধানে নাই। ‘উদ্ভ্রম’ আছে, ‘উদ্ভ্রান্ত’ নাই, ‘যূথ’ আছে, ‘যূথবদ্ধ’ নাই, ‘ভূগোল’ আছে, ‘ভৌগোলিক’ নাই। ‘পরাগায়ন’ বলে কোনো ব্যাপারই নাই। তবে, এ সমস্ত শূন্যতা পূরণ করা দুঃসাধ্য নয় মোটেও। অন্যদিকে কোলকাতার অভিধানে আরবি-ফারসির অনুপস্থিতি ব্যাপক। এ ব্যাপারে সেখানকার তরুণ কবিরা এতটাই আনপড়, সাধারণ বাক্যালাপে এ বঙ্গের অনেক কথার মানে বুঝতেই বেগ পেতে হয় তাদের। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বললাম কথাটা। প্রসঙ্গক্রমে আরও একটি কথা বলে রাখা দরকার, লোকমুখে ব্যবহৃত অনেক শব্দ সাহিত্যে ঢুকে পড়লেও এখনও অভিধানের গোলায় উঠতে পারে নি। যেমন পারে নি এ ভূখণ্ডের অবাঙালি নৃ-গোষ্ঠীর বহুল পরিচিত, প্রায়শ উচ্চারিত অনেক শব্দ।

এক্ষেত্রে করণীয় একটাই, আকেলমান লোকসমবায়ে একটি বৃহৎ শব্দকোষ তৈরি করা, যার অভিমুখ হবে মরা মানুষের জাবেদাখাতা নয়, জ্যান্ত মানুষের মুখের জবান। কারণ, প্রমথবাবু বলে গিয়েছেন, ‘বাংলা ভাষার অস্তিত্ব প্রকৃতিবাদ অভিধানের ভিতর নয়, বাঙালির মুখে।’

পরিশেষে বাংলাদেশের একটা সংকটের দিকে মনোযোগ আনতে চাই পাঠকদের। আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, বাংলা একাডেমি প্রণীত অভিধানটির নাম ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’। প্রথম প্রশ্ন, এটা কার জন্য ব্যবহারিক? সাধারণের জন্য কি? তা বলা যাচ্ছে না। কারণ এতে এমন অনেক শব্দই পাওয়া যাচ্ছে, যেসবের অস্তিত্ব প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের বাইরে কোথাও নাই। অর্থাৎ এ অভিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য সাহিত্যিক ও সাহিত্যপাঠক। সেক্ষেত্রে অভিধানের ওপর আরও কিছু দাবি তৈরি হয়ে যায়। কী সেই দাবি?

একটি কবিতা শোনানো যাক :

এতটাই মরে গেছি তোমাকে মনে পড়ে না

তুমি নেই, কেউ নেই তোমাকে স্মরণ করার

ভোরের প্রতিটি লাল সূর্যের মতো তোমার আবির্ভাব
পাহাড়চ‚ড়ায় ফোটাতো অজস্র মোন-ফুল।
তুমি নেই—ফোটে না সে ফুল
নিয়তির রাজ্যে উড়ে যায় রমণীর খাপছাড়া চুল
মানুষের বুকে জ্বলে না আশার দীপ
মৃত্যুপুরীর অচেতন জুমে বেঁচে থাকি রিপরিপ
… … …

কত পাহাড় নীরবে দাঁড়িয়ে, বেঁকে গেছে কত নদী চেনা পথ হারিয়ে
তবুও খুঁজেছি একটি আদিবাসী আদাম যৌথ জীবনের স্বপ্নচূড়ায় দাঁড়িয়ে।

এটাকে একটা খাঁটি বাংলা কবিতাই মনে হচ্ছে। শুধু বাধ সাধছে নিচে-দাগ-দেওয়া শব্দগুলি। কবিতাংশটি নিয়েছি ‘হুচ্’ নামে একটি ছোটকাগজ থেকে। যার সম্পাদক কবি আলোড়ন খীসা। ‘হুচ্’ চাকমা শব্দ, এর মানে চিহ্ন। এই কবির নাম হেগা চাকমা। পত্রিকা থেকেই জানতে পারি, রিপরিপ কথাটার মানে নিভু নিভু। আর আদাম হলো গ্রাম।


আমার বক্তব্য এই যে, বাংলা ভাষায় অনেক নতুন শব্দ ঢুকে পড়ছে—বাঙালি ও আদিবাসী উভয়েরই মাধ্যমে।


বর্তমানে এই বাংলাদেশে আদিবাসীদের উদ্যোগে বেশ কিছু দ্বিভাষিক সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা লিপিতে। রাঙামাটি কিংবা খাগড়াছড়ি থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে রেঙ (ধ্বনি), রানজুনি (রংধনু), কাজলী (অনুরোধ), রেগা (সেতুবন্ধন) ইত্যাদি। এসব পত্রিকার মধ্যে বাস্তবিক অর্থে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে একটা সেতুবন্ধনের প্রয়াস দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের তরফে সে প্রয়াস কোথায়?

এইখানে এসে আমাকে স্মরণ করতে হচ্ছে সেলিম আল দীনকে। একটি ‘মারমা রূপকথা’র ভূমিকায় তিনি লিখছেন :

১৯৮৬ সালে ঢাকা থিয়েটার আয়োজিত জাতীয় নাট্যমেলায় আমরা এদেশে বিভিন্ন ভাষাভাষী নৃগোষ্ঠীসমূহের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সাধনের সংকল্প উচ্চারণ করি।…

বাংলাদেশে বাঙালি ব্যতিরেকেও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নিবাস। কেউ আদিবাসী—কেউবা পরবর্তীকালে বসতি স্থাপনকারী সম্প্রদায়। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি এদের উপর চলেছে রাজনৈতিক নিপীড়ন।…

একটি মারমা রূপকথা নির্বাচনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে এদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষীদের পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া এবং অন্যদিকে এর মাধ্যমে মারমা সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক-নৃতত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের ঔৎসুক্য জাগ্রত করা।… রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা—রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা অর্থনৈতিক নিপীড়নের যে দায় শতবর্ষের—তার খানিকটা অন্তত বহন করুক আমাদের কালের শিল্প। এ কথা কে না জানে শিল্পের সংসারে থাকে দিব্যমানব—শিল্পের হাড়েই গঠিত হয় কালাকালের বজ্র।

সেলিম আল দীনের আদিবাসী-নাট্যপ্রয়াসের দুটি ধাপ আমরা লক্ষ করি। প্রথম ধাপে তিনি আদিবাসীদের নাট্য-আঙ্গিক বাংলা নাটকে সাঙ্গীকৃত করার সুযোগ খুঁজেছেন। দ্বিতীয় ধাপে তাদের বিষয়ে ও ভাষায় প্রবেশ করেছেন। প্রথমটি লক্ষণীয় মঞ্চে, দ্বিতীয়টি টেক্সটে। দ্বিতীয়টির উদাহরণ হিসেবে বনপাংশুল, ধাবমান, ঊষাউৎসবস্বপ্নরমণীগণ-এর কথা বলা যায়। বিশেষত আমরা বলব, উষাউৎসবস্বপ্নরমণীগণ। তার আগে স্মরণ করা যাক মহাশ্বেতা দেবীর অরণ্যের অধিকার উপন্যাসটির কথা। এখানে মহাশ্বেতা মুণ্ডা ভাষার কিছু গান জুড়ে দিয়েছেন বিভিন্ন চরিত্রের মুখে। এবং বন্ধনীর মধ্যে রেখেছেন গানটির বাংলা অনুবাদ। ফলে ভাববস্তু অনুধাবন করা যায় ঠিকই, কিন্তু শব্দগুলোর যথার্থ মানে বের করা মুশকিল। এই উপন্যাসটি পড়ার সময় ‘উলগুলান’ শব্দটি আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। বিশেষত অরণ্যের ভেতর আগুন জ্বালাবার একটা ইমেজ আমাদের মনে ভেসে ওঠে। যদিও এ শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে কোনো ধারণাই পাই না আমরা।

সেলিম আল দীন কিন্তু উল্টো কাজ করেছেন। তিনি লিখেছেন বাংলা গানই, তাতে গ্রহণ করেছেন মারমা বা মান্দি ভাষার কিছু শব্দ। এর ফলে পাঠক হিসেবে ঐ শব্দগুলির প্রতি আমাদের এক ধরনের ঔৎসুক্য জাগে বৈকি। তিনি পাঠকের এই কৌতূহলও নিবারণ করেছেন গ্রন্থশেষে শব্দার্থ ও টীকা জুড়ে দিয়ে। চমৎকার কিছু শব্দ এখানে তুলে দিচ্ছি :

আস্কি = নক্ষত্র
তাতারারাবুগা = নিরাকার প্রধান ঈশ্বর
আসা, মালজা = দুই অপদেবতা
দাহালা = পাহাড়
ব্রিংনি বিবাল = বুনো ফুল
ছু = পানীয় বিশেষ
মিখখাম = বজ্র
সেলগানি = আকাশ
ছিমছিরি = সোমেশ্বরী
দকমান্দা = মান্দি নারীদের পোশাক
হ্রলয় = ঢেউ

উদাহরণ দিয়ে আপনাদের আর ভারাক্রান্ত করতে চাই না। আমার বক্তব্য এই যে, বাংলা ভাষায় অনেক নতুন শব্দ ঢুকে পড়ছে—বাঙালি ও আদিবাসী উভয়েরই মাধ্যমে। আমরা জানি, জুম্ম সাহিত্য আর বাংলা সাহিত্য একাকার হবার নয়, তবু বাংলা সাহিত্যেরই দোহাই যদি দেই, আমাদের অভিধানগুলি কি এসব শব্দের ব্যাপারে মৌনব্রত পালন করেই যাবে? প্রসঙ্গত বলি, মামুনুর রশীদের ‘রাঢ়াং’ নাটকের কথা আপনারা সবাই জানেন। আমাদের অভিধান জানে কি?


ঢাকা থিয়েটারের সেমিনারে ‌’একটি হৃদয় দুইটি অভিধান’ শিরোনামে পঠিত 
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব