হোম চিত্রকলা ও প্রেম, ও রঙতুলির ট্র্যাজেডি

ও প্রেম, ও রঙতুলির ট্র্যাজেডি

ও প্রেম, ও রঙতুলির ট্র্যাজেডি
506
0
11119669_987997194574464_208854798_n
Modigliani & Jeane

প্রেমিকের চরম দুর্দিনেও জেন তাঁকে ছেড়ে যান নি। তা অনেকেই করেন। কিন্তু মোদি-জেন শিল্পী জুটির প্রেমের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়

“আমি মোদিগ্লিয়ানি। একেকটা স্কেচ মাত্র পাঁচ ফ্রা। আমি মোদিলিয়ানি। মাত্র পাঁচ ফ্রাতে পাচ্ছেন একটা স্কেচ!”

rsz_111256487_987997407907776_464639922_n
Rose Caryatid Audace

একজন শিল্পী নিজের নাম বলে এভাবেই প্যারিসের রাত্রিকালীন ক্যাফেতে স্কেচ বিক্রি করতে চাইছেন। কিন্তু কেউ কিনছে না! বিরক্ত হচ্ছে। আর সেই ব্যক্তিকে অনুসরণ করছে এক লোক। হতাশ হয়ে শিল্পী বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। তাঁর চোখ-মুখ দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে লোকটা রোগগ্রস্ত। চোখে ঝাপসা দেখছেন। যে কোনো সময় রাস্তায় পড়ে যাবেন। শিল্পীর পেছন পেছন হাঁটছেন ক্যাফেতে তাঁকে অনুসরণ করা লোকটা। কেউ তাঁকে অনুসরণ করছে তাও বুঝতে পারছেন না শিল্পী। হঠাৎই লোকটা বলে উঠল, ‘হাই! পাল!’ শিল্পীর জিজ্ঞেস, কে? আগন্তুক উত্তর দিলেন, একজন বন্ধু! শিল্পীর প্রত্যুত্তর, ‘ওহ! চিনতে পারছি না। শুভ সন্ধ্যা বন্ধু।’

খানিক হাঁটার পর রাস্তায় পড়ে গেলেন শিল্পী। তাঁকে দেখা গেল হাসপাতালে। চিকিৎসকরা ওই আগন্তুককে জিজ্ঞেস করলেন, সন্ধ্যার মধ্যে ওনার ঠিকানা যোগাড় করে দিতে পারবেন? তিনি জানালেন, চেষ্টা করবেন। বাইরে বেরিয়ে গাড়ি চালককে একটা বাড়ির নম্বর বলে সেখানে যাবার নির্দেশ দিলেন তিনি। সেই বাড়িতে মৃত্যুপথযাত্রী শিল্পীর জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁর স্ত্রী। লোকটা শিল্পীর বাসায় এসে নিজেকে আর্ট ডিলার হিসাবে পরিচয় দিয়ে নগদ অর্থে বেশ কিছু ছবি কেনার প্রস্তাব দেন। মোদিলিয়ানি অনেক অনুপ্রাণিত হবে এতে, জানায় স্ত্রী। লোকটা একের পর এক ছবি বাছাই করতে থাকে।

11245333_987996161241234_1136058493_nএকটি চলচ্চিত্রের কয়েকটি দৃশ্য উল্লেখ করলাম। ছবি বাছাই করার দৃশ্যেই ছবিটা শেষ হয়। লেখার শুরুতে যে বর্ণনা দিয়েছি, ওখান থেকেই ছবিটা আমি দেখেছি। গত সপ্তায় টিভির রিমোটের বোতাম চাপতে চাপতে ফরাসি চ্যানেল টিভি ফাইভ মন্ডেতে একজন শিল্পীর ওভাবে স্কেচ বিক্রি করতে চাওয়ার দৃশ্যে চোখ আটকে যায়। ছবি শেষ হবার পর খুব জানতে ইচ্ছে হলো, কে এই মোদিলিয়ানি? এটা কি শুধুই একটি চলচ্চিত্র, নাকি কোনো চিত্রশিল্পীর জীবনচিত্র? কৌতুহল থেকে গুগলে সার্চ দিতেই পেয়ে গেলাম মোদিলিয়ানিকে।

ইতালির লিভর্নোতে ১৮৮৪ সালের ১২ জুলাই এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী ইহুদি পরিবারে তাঁর জন্ম। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯২০ সালের ২৪ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। মোদির জীবন আসলে সিনেমাকেও হার মানায়। অল্প সময়ে কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিকে জানতে তাঁকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র দেখা বা তাঁর জীবনী পড়ার চেয়ে ভালো উপায় আর হয় না। মোদিলিয়ানি নামটাই জেনেছি তাঁকে নিয়ে চলচ্চিত্র দেখে। তাই ছবি দেখেই তাঁকে জানার ইচ্ছা হলো। এ যুগে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের জ্বিন গুগলে সন্ধান করেই জানলাম, মোদলিয়ানিকে নিয়ে দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। ১৯৫৮ সালে ফরাসি ভাষায় Les Amants Montparnasse বা মোন্তপারনাসের প্রেমী, আর ২০০৪ সালে মোদিলিয়ানি । দ্বিতীয়টি ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্র দুটি সংগ্রহ করে এক রাতের মধ্যেই দেখে ফেললাম। ১৯৫৮ সালে নির্মিত ছবিটির শুরুতেই দর্শককে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে, এটি জীবনী নয়। এই ছবি মূলত মোদিলিয়ানি আর জেন ইবুতেরনার প্রেম নিয়ে। তাতে আমেদেও মোদিলিয়ানির জীবনের শেষ দুটি বছর হালকাভাবে এসেছে।

11267278_987994857908031_1546292708_n
Female Nude (Iris Tree)

এই ছবিতে একটা দৃশ্য আছে, যেখানে শিল্পী মোদিলিয়ানির আত্মসম্মানবোধ বেশ ভালো করে বোঝা যায়। একজন আমেরিকান শিল্পপতি প্যারিসে এসেছেন ছবি কিনতে। মোদিকে কয়েকটি ছবিসহ তাঁর কাছে নিয়ে যান বন্ধু জবোরস্কি। অন্য এক শিল্পীর ল্যান্ডস্কেপ দেখিয়ে সেই শিল্পপতি মোদিকে বললেন, ‘এটা একটা মাস্টারপিস। সমালোচকরা বর্ণনা করে বলেছে।’ মোদির উত্তর, “পেইন্টিং কখনো বর্ণনা করা যায় না। সমালোচকরা যেসব ব্যাখ্যা দেন, তা স্টুপিডিটি ছাড়া কিচ্ছু নয় মশাই!”

ওই শিল্পপতি শূন্য চোখের একটা ছবি পছন্দ করেন। যে ছবিতে চোখের অবয়ব আছে, কিন্তু চোখ নেই। নীল রঙে সেই জায়গাটা ভরাট করা। ক্রেতা জানায়, ওই ছবি লেবেল হিসাবে ব্যবহার করে ব্লু ওয়েভস নামে একটা পারফিউম বাজারে ছাড়বেন! পোস্টার করে দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হবে। পকেটে একটা পয়সা নেই। তবু নিজের শিল্পকর্মের অবমাননা হয়, তেমন কিছুতে রাজি হন নি মোদি। প্রচুর অর্থযোগ হবার সম্ভাবনা সত্ত্বেও না।

২১ বছর বয়সী সুন্দরী স্ত্রীকে মোদি বারবার বলেছেন, আমার সঙ্গে তোমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ঠিক মতো দুবেলা রুটিও দিতে পারব না তোমাকে। শখের কোনো কিছু তো বহুদূরের ব্যাপার। এই বোহেমিয়ান জীবন তোমাকে ভালবাসাও দিতে পারবে না। আমাকে যদি ভালোবাসো, যদি সত্যিও ভালোবাসো আমাকে তাহলে চলে যাও। এসবের জবাবে জেন শুধু বলেছে, তোমার হাতটা আমাকে শক্ত করে ধরতে দেবে? প্রেমিকের চরম দুর্দিনেও জেন তাঁকে ছেড়ে যান নি। তা অনেকেই করেন। কিন্তু মোদি-জেন শিল্পী জুটির প্রেমের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে ২০০৪ সালে নির্মিত মোদিলিয়ানি  ছবিটার উপর আলো ফেলতে চাই।

তখন সিনেমার চতুর দর্শক মাত্রই বুঝে যাবেন, জেনকে কানে কানে নিজের ছবির মডেল হবার শর্ত দিয়েছেন পিকাসো

মোদিলিয়ানি চলচ্চিত্রেও শিল্পীর জীবনের শেষ কয়েকটা বছর আলোকপাত করা হয়েছে। প্যারিসে মোদির জীবনসংগ্রাম, জেনের সঙ্গে প্রেম ও পাবলো পিকাসোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের তিক্ততাই এ ছবির মূল উপজীব্য। মোদি বিশ্বাস করতেন, শিল্পকলার ভবিষ্যৎ নারীদের মুখ। একশ বছর পরের এ সময়ে তাঁর এই বিশ্বাস কতখানি সত্য হয়েছে তা চিত্রকলা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন।

11263737_988598424514341_1660866979_n
Le Grande Nude

এই মুভির শুরুর দিকেই দেখা যায়, একটা পার্টিতে গোলাপের তোড়া নিয়ে পিকাসোর কোলে বসে মোদি জিজ্ঞেস করছে, ‘পাবলো, তুমি আমাকে মিস করো?’ পিকাসোর পাল্টা প্রশ্ন, ‘তুমি আমাকে এত ঘৃণা করো কেন?’ ছবির বেশিরভাগ জুড়েই এই দুজনের শত্রুতা দেখানো হয়েছে। অনেক দিন মোদির কোনো ছবি বিক্রি হচ্ছে না। অন্যদিকে পিকাসোর অবস্থা রমরমা। অনেক ধনী এই শিল্পী। মোদিকে না জানিয়ে পিকাসোর কাছে গিয়ে সহায়তা চান জেন। তাঁর অনেক ছবি বিক্রি হয়। আর্ট ডিলার বা পেইন্টিং সংগ্রাহকরা এলে যেন মোদির ছবি কেনার কথাও বলেন পিকাসো। এই ছিল অনুরোধ। পিকাসো সাহায্য করবেন, তবে একটা শর্ত দেন জেনকে। কানে কানে কিছু একটা বলার আগে বলেন, ‘আমি তোমাকে অমরত্ব দিতে পারি।’ তখন সিনেমার চতুর দর্শক মাত্রই বুঝে যাবেন, জেনকে কানে কানে নিজের ছবির মডেল হবার শর্ত দিয়েছেন পিকাসো। প্রথমে রাজি না হলেও, সংসারের দুরবস্থার জন্য পিকাসোর মডেল হন জেন। মুখোমুখি প্রদর্শনীতে সেই ছবিটা দেখে ক্রোধে নিজের আঁকা ছবি সবার সামনেই নষ্ট করে ফেলেন মোদিলিয়ানি।

রাজার হালে জীবনযাপন করা পিকাসো মোদিকে ডাকতেন Matador (ঘাতক) বলে! দুজনের পার্থক্য করতে গিয়ে মোদিলিয়ানিকে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার আর আমার মধ্যে একটাই পার্থক্য, সাফল্য।’ একটা ষাঁড়ের দেহে মোদিলিয়ানির মুখ; এরকম একটা ছবি এঁকেছিলেন বিখ্যাত এই শিল্পী। মস্তিষ্কের ঝিল্লিপ্রদাহে যক্ষা মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে মোদিকে। আর তিনি স্বপ্ন দেখছেন, প্রিয় বন্ধুর কফিনে ইঁদুরের ছোটাছুটি। স্বপ্নে পিকাসোকে বলছেন, don’t fuck my works! don’t fuck my works!! মুভিটিতে আরো দেখানো হয়েছে, মস্তিষ্কে যক্ষার জীবানু বাড়ার কারণে মোদি হ্যালুসিনেশনে ভুগতেন। কিশোর মোদির সঙ্গে গল্প করতেন বড় মোদি, একা একা কথা বলতেন মায়ের সঙ্গে।

জীবিত মোদিলিয়ানির একটাই প্রদর্শনী হয়েছিল, যা আয়োজন করেন মোদির পোলিশ কবি বন্ধু ও আর্ট ডিলার লিওপল্ড জবোরস্কি। ১৯১৭ সালে প্যারিসে প্রদর্শনীর প্রথম দিনেই ন্যুডিটির অভিযোগে পুলিশ তা বন্ধ করে দেয়। সেই প্রদর্শনীর বেশ কটি ছবি ছিল ন্যুড। ওই বছরের শুরুর দিকে নিস-এ বেড়াতে গিয়ে প্রদর্শনীর বেশিরভাগ ছবি এঁকেছিলেন মোদি। ওই ছবিগুলোই পরে অনেক বিখ্যাত হয়। প্রদর্শনীটি শুরুর আগেই বেশ সাড়া ফেলেছিল। চলচ্চিত্রে আমরা দেখি, প্রদর্শনী বন্ধ করতে আসা পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে আছেন পাবলো পিকাসো! মুভিতে এমনও দেখা যায়, মোদির প্রদর্শনীর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে পিকাসোর কাছের মানুষেরা! অবসাদ কাটিয়ে ফুরফুরে মেজাজে ফিরছিলেন মোদি, প্রদর্শনীর মাধ্যমে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্নও ছিল তাঁর। কিন্তু হলো না।11257688_987995551241295_1136815643_n

তবু এক সময়ের বন্ধুকে ক্ষমা করে দেন মোদি। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় নাম লেখান একসঙ্গে। যাতে জিতলে পাবেন পাঁচ হাজার ফ্রা। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে মোদির শ্বশুর একমাত্র শিশুকন্যাকে কেড়ে নিয়ে সরকারের জিম্মায় দিয়েছেন। মেয়েকে ফিরে পেতে ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন মোদি। মোদি এঁকেছিলেন গর্ভবতী স্ত্রীর ছবি। পিকাসো বেশ বড় ক্যানভাসে আঁকেন মোদিকে! প্রতিযোগিতায় সবার ছবি প্রদর্শিত হবে, জবোরস্কি নিয়ে গেছেন বন্ধুর আঁকা ছবি। অপেক্ষায় হলভর্তি মানুষ আর প্রতিযোগী শিল্পীরা। কখন রাত আটটা বাজবে! ওদিকে শিশু জেন মোদিলিয়ানিকে কাস্টডি থেকে ছাড়িয়ে এনে মায়ের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন মোদির শাশুড়ি। সারাদিন বিবাহ রেজিস্ট্রি অফিসে কাটিয়ে নিজের বিয়ের কাগজপত্র নিয়ে ফিরছেন মোদি। তাঁর আনন্দ এই ভেবে যে, এতদিন পর একটু হলেও হাসি ফুটবে জেনের মুখে। এমন উপলক্ষে মদ পান করা চাই।

দেখা গেল, দুটি চলচ্চিত্রে মোদিলিয়ানির মৃত্যু দুইভাবে এসেছে

rsz_111263703_987997354574448_1468342168_n
Jeane

পানশালায় বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে মোদি ছুটছেন প্রতিযোগিতার দিকে। ওদিকে এক জনের পর আরেকজনের ছবি উন্মোচিত হচ্ছে। কিছুদূর যাবার পর কয়েকজন আততায়ী ঘিরে ধরে মোদিকে। তাঁকে আঘাত করতে থাকে। যন্ত্রণায় রাস্তায় পড়ে যান শিল্পী, আততায়ীরা কাজ শেষ মনে করে চলে যাচ্ছে আর ওদিকে স্ত্রীকে নিয়ে আঁকা মোদির ছবিটা দেখে ‘মোদি…মোদি’ বলে চিৎকার করছে প্রতিদ্বন্দ্বীরাও। তালি দিচ্ছেন পিকাসো। জেনের মুখে গর্বের হাসি ভালবাসার মানুষের জন্যে। সেই মানুষটি মৃত্যুমুখে পতিত, তা তিনি জানেন না। এমনই ট্র্যাজেডি চলচ্চিত্রে। মোদিকে হাসপাতালে নেন দুই বন্ধু। কিন্তু বাঁচাতে পারেন নি। হাসপাতালে জেনের কোলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই শিল্পী। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে। সেই শোকে পরদিন দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে নিয়েই পাঁচতলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন ২১ বছর বয়সী জেন ইবুতেরনা।

দেখা গেল, দুটি চলচ্চিত্রে মোদিলিয়ানির মৃত্যু দুইভাবে এসেছে। সিনেমায় নাটকীয়তা আনতে গিয়েই হয়তো চিত্রনাট্যকার আর পরিচালক বেশ সচেতন ছিলেন। আর মোদিকে নিয়ে কিংবদন্তিতুল্য সব মিথ এখনো ফাইন আর্টস জগতে প্রচলিত। সেসব মিথ দ্বারাও প্রভাবিত হতে পারেন চলচ্চিত্রকাররা। মোদি-জেনের প্রেম মূল বিষয় হলেও প্রথম ছবিটিতে এই যুগলের শেষ ট্র্যাজেডির পরিণতি তুলে ধরা হয় নি। সেটা ইতিবাচক অর্থেই। একজন আর্ট ডিলার মোদির ছবি বাছাই করে চলেছেন; এই দৃশ্যে মুভি শেষ করে হয়তো ভবিষ্যতের চিত্রটাই রূপক অর্থে বোঝাতে চেয়েছেন পরিচালক। ২০০৪ সালে নির্মিত ছবিটিতে দেখা যায়, মোদির মৃত্যুর পর বিধ্বস্ত জেন ইবুতেরনা গেছেন পিকাসোর কাছে। তাঁকে বলছেন, “দেখো পাবলো, পৃথিবীতে সামনে যত দিন আসবে, মোদি শুধু বিখ্যাতই হবে। মোদি অমর হবে।”

যত দিন যাচ্ছে আমেদেও মোদিলিয়ানি ততই বিখ্যাত হচ্ছেন। এই যে তাঁর মৃত্যুর ৯৫ বছর পর ঢাকায় বসে একজন তরুণ মোদিকে নিয়ে লিখছি, এটাও তো সেই ছড়িয়ে পড়ারই উদাহরণ। মোদির আঁকা ৪৮২টি ছবির বেশিরভাগই পোর্ট্রেট। তাঁর ছবি আর ভাস্কর্যের মূল বিষয় ছিল পোর্ট্রেট ও মানুষের পূর্ণ অবয়ব। সেসব ছবি এখন পৃথিবীর সব বিখ্যাত জাদুঘরে। ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা ছবিগুলো বিক্রি হয় শত মিলিয়ন ডলারে। অথচ অর্থের অভাবে তিনি ধুঁকে ধুঁকে মরেছেন! ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ২১৪ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে মোদির ‘Doomed Lover’ ছবিটি! যে ছবিটা আঁকার পর মডেল জেন শিল্পীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমার চোখ কোথায় মোদি?’ ২০১০ সালে মোদিলিয়ানির ভাস্কর্য ‘তেতে’ বিক্রি হয় পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামে—৫৯.৫ মিলিয়ন ডলার।

rsz_111257617_987997411241109_178583696_n
Study of Head

১১ বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিলেন মোদি। আর ১৬ বছর বয়সে মস্তিষ্কের ঝিল্লিতে বাসা বাঁধতে থাকে যক্ষার জীবাণু। মেডিকেল সায়েন্সে যার নাম tubercular meningitis. এই রোগটি ধীরে ধীরে মোদিকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে। তবে ১৯১৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগের তিন বছর নিদারুণ কষ্টের জীবন আর চিকিৎসাহীনতা প্রতিভাবান এই শিল্পীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। শরীরের ব্যথা কমাতে ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোদি ড্রাগ আর অ্যালকোহল নেয়া শুরু করেন ১৯১৪ সালে।

মোদি যে শিল্পীই হবেন, তা বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর মা। ১১ বছর বয়সে অসুস্থ মোদিলিয়ানিকে নিয়ে যাপিত সময়ে মা ডায়েরিতে লিখেন, ‘ছেলেটা বখে যাওয়া বাচ্চাদের মতো আচরণ করে, কিন্তু খুবই বুদ্ধিমান। অপেক্ষা করছি, ওর ভেতর কী আছে তা দেখতে। সম্ভবত ছবিই আঁকবে ও!’ মায়ের আশকারা পেয়েই শিল্পী হবার পথ সহজ হয় মোদির। ফ্লোরেন্সে ফাইন আর্টস পড়ে ১৯০৬ সালে চলে যান প্যারিসে। প্যারিস তখন পৃথিবীর সব স্বপ্নবান শিল্পী-সাহিত্যিকদের বিচরণস্থল। ওখানে গিয়ে অনেক বন্ধুও জুটিয়ে ফেলেন। স্বভাবে বোহেমিয়ান মোদি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে আরও ভবঘুরে হয়ে যান। তবে ছবি আঁকা কমান নি। প্যারিসে শুরুর দিনগুলোতে সারাদিনই ছবি আঁকতেন। দিনে একশোর উপরেও স্কেচ এঁকেছেন। যার বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে আর শিল্পী নিজে নষ্ট করেছেন এই বলে, ‘ওগুলো ছিল শিশুর বুদবুদ। যখন নোংরা বুর্জোয়া ছিলাম, তখন এঁকেছি।’ জার্মান দার্শনিক ফ্রেডেরিখ নিটশে দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন মোদি। নিটশের Thus Spoke Zarathustra থেকে নিয়মিত উচ্চারণ করতেন তিনি।

বড় হয়ে সেই মেয়েটিই ১৯৫৮ সালে লিখেন বাবার জীবনী Modigliani : Man & Myth

এবার মোদিলিয়ানির প্রেম প্রসঙ্গে আসা যাক। মাত্র পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার সুদর্শন পুরুষ ছিলেন তিনি। তবে তাঁর জীবনে নারীর অভাব হয় নি। প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, তুখোড় বুদ্ধিমত্তা আর শিল্পীসত্তার কারণে নারীমহলের কাছে মোদি ছিলেন পরম প্রার্থিত। তাঁর প্রথম সিরিয়াস প্রেম রাশান কবি আনা আখমাতোভা। ১৯১০ সালে। যদিও আনা ছিলেন বিবাহিতা। দুজনে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। এক বছর পর আনা স্বামীর কাছে চলে যান। এরপর ইংরেজ কবি আইরিস ট্রির সান্নিধ্যে এসেছিলেন। ট্রির ন্যুড এঁকেছেন কয়েকটি। সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বৃটিশ পেইন্টার নিনা হামেন্ট ও কবি বিয়াট্রিস হ্যাস্টিংসের সঙ্গেও। বিয়াট্রিসের প্রচুর ন্যুড এঁকেছেন মোদি। যেগুলোর বেশিরভাগই পরে বিখ্যাত হয়েছে। জেন ইবুতেরনা মোদির জীবনে আসার আগ পর্যন্ত এই ইংলিশ কবি ছিলেন শিল্পীর প্রেমিকা। ছায়ার মতো তাঁর পাশে ছিলেন বিয়াট্রিস। শুধু হৃদয় আর প্রেমেই নয়, অর্থ দিয়েও।

11225891_988599974514186_469270619_n
Liegender-Akt-Nu-allongé

মোদি-ভক্তরা আরো দুজনের কাছে ঋণ স্বীকার করেন। লিওপল্ড ও আনা জবোরস্কি দম্পতির কাছে মোদিলিয়ানি আর জেনের ঋণের শেষ নেই। ১৯১৬ সালে পরিচিত হবার পর ভবঘুরে মোদিকে তারা নিজের অ্যাপার্টমেন্টে স্টুডিও করে দিয়েছেন, হাত খরচের অর্থ দিয়েছেন, ছবি আঁকার উৎসাহ দিয়েছেন, ছবি বিক্রি করার জন্য চেষ্টা-তদবির করে গেছেন অবিরাম। জবোরস্কি পরিবার এর সবই করেছে বন্ধুত্বের টানে, মোদিলিয়ানির প্রতিভাকে সম্মান দিয়ে।

11101157_988597397847777_1828252385_n
Doomed Lover

তবে সব প্রেম আর বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে গেছে জেন ইবুতেরনার সঙ্গে মোদিলিয়ানির সম্পর্ক। ১৯১৭ সালের শুরুর দিকে আর্ট স্কুলের অষ্টাদশী ছাত্রী জেনের সঙ্গে যখন পরিচয় হয়, প্রথম দেখাতেই দুজন দুজনকে হৃদয় দিয়ে দেন। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব মোদির কাছে থেকেছেন জেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। বাবা যখন জেনকে বলেছেন, ‘বিশৃঙ্খল জীবন ছাড়া ওর তো কিছুই নেই। ও তোমাকে কিছুই দিতে পারবে না,’ জবাবে জেন বলেছে, ‘ওর কিছু নেই বলেই তো আমি আছি। আমাকে ওর দরকার, তাই ওর কাছে থাকব আমি’। বাবা-মায়ের কাছে একমাত্র শিশুকন্যাকে রেখে প্রেমিকের সঙ্গে কষ্টের সময়গুলিতে ছিলেন তিনি।

প্রেমিকাকে মোদি এতই ভালবাসতেন, কন্যার নাম রেখেছিলেন তার নামেই—জেন মোদিলিয়ানি। আফসোস করে জেনকে কতবার বলেছেন, ‘আমার কিছুই নেই। তোমাকে দেবার মতো কিচ্ছু নেই। এমনকি দুধের শিশুটিকেও বাবার স্নেহ দিতে পারি না আমি। চলে যাও। তুমি অন্তত মেয়ের পাশে থাকো। বাবা-মা’র কেউ যদি পাশে না থাকে, মেয়েটার প্রতি অবিচার হবে।’ তবু অসহায় মোদিকে ছেড়ে যান নি জেন। স্বামীর মৃত্যুর পর চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আত্মহনন তো মুখের কথা নয়। কতটুকু ভালোবাসলে এমন কিছু করা যায় তা বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ মাত্রই অনুধাবন করতে পারবে। শুধু শিল্পী মোদিই তো অমর হন নি, বেঁচে আছে মোদি-জেন প্রেমকাহিনিও। আসলে সত্যিকার শিল্পীর যেমন কখনো মৃত্যু হয় না, তেমনি অমরত্ব পান তার ভালোবাসার মানুষও। এ দুজনের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ১৪ মাস বয়সী কন্যা জেন মোদিলিয়ানির ঠাঁই হয় নানা-নানির কাছে। খানিক বড় হলে ফ্লোরেন্সে নিয়ে যান ফুপু। বড় হয়ে সেই মেয়েটিই ১৯৫৮ সালে লিখেন বাবার জীবনী Modigliani : Man & Myth.

11130529_987997261241124_923290324_n
Modi & Jeane’s graveyard

মোদিলিয়ানিকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে পাবলো পিকাসোর সঙ্গে যে বিরূপ সম্পর্ক চিত্রায়ণ করা হয়েছে তা যে পুরোপুরি সত্য নয় এ কথা হলফ করেই বলা যায়। তবে পুরোপুরি মিথ্যাও নয়। না হলে মৃত্যুর সময় পাবলো পিকাসোর মুখ দিয়ে শুধু একটিই শব্দ—’মোদিলিয়ানি’ উচ্চারিত হতো না। এটাও এক গূঢ় রহস্য আর ট্র্যাজেডি বটে!

১৩.০৫.২০১৫
মিরপুর
রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়

Latest posts by রুহুল মাহফুজ জয় (see all)