হোম নাটক আখ্যানকাব্য রুধিররঙ্গিণী

রুধিররঙ্গিণী

রুধিররঙ্গিণী
446
0

প্রথম কথন
(কন্যা ও জননী)


: সিঁদুর রক্তের মতো, তবু রক্ত নয়, সিঁদুর জীবন, জীবনের ডাক আসে তার কাছে গলে যাবে বয়ে যাবে স্রোতে আর স্রোতে, সিঁদুর তো রক্ত নয়, সিঁথিতে সিঁদুর কথা কয়, লজ্জা লাগে, আমি সেই কথা শুনি, অন্ধকারে মানুষ ঘুমায়া পড়ে, জেগে থাকে দুখিনী নিশ্বাস, তড়পায় হাড্ডি শিরা ভিতরে ভিতরে, একা একা করি গান, মাথার ওপরে চাঁদ জ্বলে, আকাশ ভাসায়া নেয় নীলে, মাথার এ সরু পথ লালে লাল, আহারে আমার সিঁথির ওপরে লাল লাল জীবন ছুটেছে আমি দেখি… তবু থেমে যায়, খালি থেমে যায়…

চুল মোরে বাঁধতে বলো না, তারা ধুলায় লুটাক, মানুষের পায়ে পায়ে জড়িযে জড়িয়ে তারা কাঁদুক গো মা, এই চুড়ি শাঁখা ভেঙে ভেঙে গাছের ঝরা পাতার লগে সই পাতে ফাল্গুনি হাওয়ায়, আমারে ঘুমাতে দাও, মাগো, সিঁদুর যে জ্বলে আছে আগুনের মতো এই মাথার ওপরে, যদিও দেখি না তারে আমি!

: স্বামী মরে এম্নে? পোড়ামুখি! এম্নে মরে স্বামী? একবার জলে ডুব্যা গেল, তখন আশ্বিন মাস, তুই কোস কাশফুল, হাওয়ায় হাওয়ায় নাচে, শাদা নীল কত্ত মেঘ উড়তেছে আকাশে আকাশ, তুই কোস আশ্বিনে বিপদ নাই, ঝড় জল বান সব বর্ষায় আষাঢ়ে হাওনে, মেঘ তার ভাণ্ডখানি খালি কইরা শুয়া পড়ছে, উঠব না ম্যালাদিন আর…

: তাই তো মা। আশ্বিন শরৎকাল, গাঙের পানির বুকে নীল শাদা ছ্য়াা ছায়া মেঘ ভাসে, প্রেম উছলায়, ভালোবাসা রঙে রঙে চৌদিকে ছড়ায়, জলে কার জিহ্বা ফের রাক্ষসের মতো কারে চাইটা পুইটা নিতে যাইব কও? ভুল তো বলি নি কিছু আমি।


শরীর বেক্কল, তার চেয়ে বেক্কল নয়ন, মনের কথারে বাঁধি ছল করে নিজের কথায় বলে আসল আসল কথা সব।


: কোস নাই ভুল। ভুল তোর পুরোটা জীবন। ভুলের ভিতর দিয়া তোরে আমি গর্ভনাড়ি চির‌্যা আনছি দুনিয়ার ভুলের মাঝারে। রক্তে রক্তে ভাসায়া আনলাম, মাথায় আমার সেই পরাণসুখের দাগ, সেই লাল নারীর নিশান, মুইছ্যা দিলি তুই! আসিল খবর, তোর বাপ, গ্রামের পইলা যে গাছ, হাত পাও ভাঙা ভাঙা মাথার দুইদিকে যার আওলা জাওলা ডাল, খটখইট্যা, সেই গাছের তলায় পুইড়া গেছে খাক, একবারে ছাই হয়া গেল মানুষটা আমার। তোর ভুল নাই। তোর ছিল জন্মভুল। বাপের দেহের ছাই ঐ জীবনে মাখাইছস তুই। মেরেছিস আমারেও তার লগে লগে।

: সেকথা কয়ো না গো মা। আমার কী দোষ। আমি যে তোমার মধ্যে ছোট্ট এক দানা হয়া নড়াচড়া করেছি প্রথম, তুমি না আনন্দে চুপে হেসেছিলে, তুমি না তোমারে নিয়া সক্কলের চোখের আড়ালে পেটের ওপরে দুই হাত বোলায়া বোলায়া ডেকেছ, ও সোনা!

: ভুল ডাকছি, ভুল!

: ভুল। মানুষ কখনো ভুল করে না গো মা। জীবন ভুলের দায় সময় সময় কেবল চাপায়া দেয় মানুষের ’পর।

: তখন আশ্বিন মাস। আকাশ রাঙিলা ঠিক, তবু রঙে তার ভান ছিল, মেঘের শাদার কোন ভিতরে গোপনে কালা কালা রাক্ষসের দাঁত নখ দেখেছি আমি তো। বলেছি, দূর গাঙে আর নাই যাওনের কাম। জামাইরে ধইরা রাখো, পিঠা করো, খাওয়াও, আমি তারে পায়েস খাওয়ামু… হাইস্যা কইলি তুই, বুড়ি, তুমি পায়েস বানাতে পারো, এখন ক্যামনে, চোখে তোর ছানি… আমি হাসি, খায়াই দেখুক, আর তোর হাতের খাবার মুখে তার ঢুকবে না কোনো।

: কইছলাম, আহা মাগো সেই সন্ধ্যাবেলা, তোমারে কেমন জানি বড়োই সুন্দর লেগেছিল।

: ছেলেটা নিজেও বলেছিল, মন আজ গাঙে যাইতে চায় না গো মা। গাঙের জলের ’পরে ভেলা নিয়া যাইতে বড়ো মন কাঁদে। মনে হয় জীবন কেন যে খালি ভাস্যা ভাস্যা যায়, জীবনের ঠিকানা কোথায়!

: এ কথাই বলেছিল জানি।

: আমারে আপন মায়ের মতো জড়ায়া সে ধরে, ভাঙা ভাঙা গলায় কইল, আমার মা নাই, আপনেরে মা বইলা জানি, গাঙে যদি মইরা যাই, আমার কবর দিও আপনে গো বাড়ির পিছনে, বাঁশঝাড়ে, মরণের পরে একা একা থাকতে ভয় করে।

: আহা রে জীবন।

: আমি কই, যাইবা না বাপ, তুমি যাও ঘরের ভিতর, বিছানার ’পরে দুইপা তুইল্যা বসো, দেখো ক্যামনে হাসিখুশি হয়া ওঠে ভালো ভালো এই নিশিখান। তুমি কইলা, না গো মা, আজ যে যাওয়াই তারে লাগব ঐ গাঙে, মহালদারের বাঁশ, দশ তলা, ভাইসা আসব উজানের বন্দরের থিকা, তারেই চালান নিতে হবে জামাইরে তোমার। হু! কত্ত জানো ব্যবসায়, মাইয়া মানুষ, তবু ব্যাটামানুষের সব জানে ক্যামনে মুখপুড়ি। পায়েস খাওয়ার পরে ঘুমায়া পড়ছিল আহা জামাই অকালে পেরেশান, প্রতিদিন কত কাজ করে, আহা তার ঘুমের মুখখান, আমার তো ছেলে নাই, হয়েছিল, মরা, আমি ডাকি সোনা, মানিক আমার, জন্মের আগেই তার মরণ হয়েছে খোদ পেটের ভিতর, শিলার নালির প্যাঁচে প্যাঁচে মরণ যে তারে আগেই তুইলা নিছে নিজ কোলে, তাই সে তো পুত্র ছিল জামাইয়ের আগে।

: তারপর আমি তারে জাগায়া তুলেছি, উঠো উঠো, ঘুমাইছো খুব, বেলা যায়, জীবন ভাসায়া দেও গাঙের ওপার। হায় হায়। আমিই তো তারে পাঠায়া দিয়েছিলাম।

: তুই।

: হ গো মা। দেখতে দেখতে আশ্বিনের শাদা নীল আসমান কোথায় লুকায়া গেল, মুখ কালো সর্বনাশী গোটা গোটা মেঘ ভিড়াইল পুরোটা আসমান, গেল যে তারে তো আর ডাকার উপায় নাই, গেল যে রাতের আঁধারে তারে কে ডাকব বলো, দাগ নাই চিহ্ন নাই, গন্ধ ছিল ঝরা ঝরা শিউলিফুলের মতো, সেই গন্ধ গাঙের পানিতে বুঝি যাইবার আগে মিশায়া দিছিল, ভেলাখানি নড়ে ওঠে, ভেবেছিল বুঝি মাগো, হাওয়ার আদরে ভেলা দুলিতেছে আনন্দে মায়ায়, জলের দুবাহু তারে ভেলার দুদিকে ছড়িয়ে ছড়িয়ে বুঝি আগলায়া ধরেছিল, একবার ভালো করে দেখি নাই মুখ, তাও তুমি ছিলা, জড়ায়া সে শেষবার বুঝি শেষবার পরাণে যে তার পরশিতে চেয়েছিল মা গো, তখন জলের মইধ্যে জল ফুলে উঠিতেছে কী এক আক্রোশে!

: বিয়ার সাপ্তা না ফুরাতেই মুছল তোর মাথার সিঁদুর। অভিশাপ লাইগা গেল সিঁথিতে নারীর। অভিশাপ।

: বলো না গো মা। যে কাটা দাগের জ্বালা ভেতরে ভেতরে মোর শরীর পোড়ায়, তাকে আর খুচিয়ে খুচিয়ে লাল করো না দোহাই।

: তারপর ধর্ম আইল, নীতি আইল, সমাজ ফুসিয়া আইসা কানের পর্দায় কত সব বলেকয়ে গেল, যে মেয়ে হারায় পতি, দু’বার সিঁথিতে তার সিঁদুরর দাগ মস্ত বড়ো পাপ।

: তারপর আমিও তা মানি। আধাআধি সাত দিন, তার স্মৃতি মনের পিঞ্জরে বাঁধি ভাষা দেই, বলি গান করো, পোষা পাখি সে যে, ভিতরে ভিতরে চুপে একাই আমারে কত গান আড়ালে শোনায়। তবু মা গো, শরীরের ভেতরে যে মাংস আছে, আপন দোসর সে যে ভালো বোঝে, রাত্রিবেলা তুমি তো শুইতা আগরাতে, মাঝরাতে শব্দ নাই, মাটির ওপরে মানুষের পায়ের ঠুকঠুক কোনো তাল নাই, নিশ্বাস চোরের মতো সন্তর্পণে বুকের ভিতর দিয়া ঢোকে আর বার হয় শুধু, এই যে শরীর মা গো, রক্ত আর মাংসের আকার বিকার, নাড়ি আছে শিরা আছে হাড্ডি আছে চাম আছে, কত শত যন্ত্রপাতি চলে তার আপন নিয়মে। হঠাৎ কে আমার ভিতর চোরা পোড়ামুখি পিনপিনায়ে গান করে, গান নয় চোখের পানির ছলাছল, ভিজে গেছে বিছানা বালিশ, পানিতে লবণে আমি কতরাত মরে গেছি বেঁচে উঠছি আবার নতুন।

: পোড়ামুখি। বুঝি আমি বুঝি। তোর চোখে আমি তো দেখছি সেই নতুন খায়েস। শরীর বেক্কল, তার চেয়ে বেক্কল নয়ন, মনের কথারে বাঁধি ছল করে নিজের কথায় বলে আসল আসল কথা সব।

: না গো মা! সেরকম না তো। আমি তো তখনও তার স্মৃতি বুকের ভিতরে বড়ো অমূল্য ধনের মতো আগলে রেখেছি।

: তবু তোর চোখ ছিল বেহায়া, অস্থির, এদিক সেদিক ফেরে, আমারে দেখলে সাজে ভিখারি কাঙাল।

: চোখ যে পবিত্র অঙ্গ, তারে নিয়ে এইসব কয়ো না গো মা।

: জানি জানি। তারপর অনেক বছর। দিলাম তোমারে বিয়া সবাইরে অস্বীকার করি। মেয়ে তো আমার। শুনেছি অতীত কালে পতির চিতায় যেত নারীর জীবন। তাও ভালো। গঞ্জনা লাঞ্ছনা নাই স্বামীহারা নারীর জীবনে। কিন্তু এ যে অন্য জ্বালা, ত্যক্ত করে মারে।

: কয়ো না গো মা, এমন কয়ো না। আমার যন্ত্রণা ছিল, ব্যথা বড়ো বুকে ছিল, সোনামুখি সুঁইয়ে সুঁইয়ে সেলাই দেওয়ার কাঁথা, বিষমাখা, শরীরে জড়ায়ে আমি নিয়েছি নিদ্রায়। তবু আমি পতি যারে বলেছি জীবনে, আরবার তার স্থানে অন্য কেউ সেই ডাক ক্যামনে পায় কও! পতি তো জীবনস্বামী, জীবন সে নিয়া নেয়, প্রাণের ধুকধুক বুঝি তার তালে বাজে। এই মতো ছিল মা গো সে-পুরুষ জীবনে আমার। মাত্র সাত দিন, আধাআধি, তারই মধ্যে দুই রাত পাই নাই তারে, এক রাত কারা জানি ধরল তস্কর, ডাক পড়ে, সে যে সবার আগেই গেল ছুটে, তস্করের প্রাণখানি কোনো মতে বাঁচিয়ে ফিরেছে, আমি কই চোরের পক্ষের লোক তুমি? না, সে কইল, অপরাধ বিচারে উঠুক, অপরাধী কেন আগে মরব, সেও তো মানুষ। অন্য রাতে, গঞ্জে গিয়ে ফেরে নাই। মাত্র পাঁচ রাত। তবু মাগো মনে হয় কত রাত। কত রাত কাটিয়েছি দুজনে জাগর, দুই পাশে, জানালার গরাদ ভাইঙা জোছনা পড়েছে ঢুকে, জড়ায়া ধরেছে দুই মানবশরীর। যে জীবনে আশা নাই, এক রত্তি আলো নাই, সে জীবনে রাত্রিবেলা প্রেমের জোছনা আইসা ছলে ছলে কত্ত রঙ্গ করেছিল মাগো।

: তবু তো করলি বিয়া।

: করেছি গো মা। কিন্তু সে যে শরীরের দায় নয়, কেবল শরীর আর ডাকে নাই নতুন দোসর। প্রাণের মনের ভাব কে বোঝে সে ঠার। বুকের ভিতর এক খাঁচা থাকে, সেইখানে পাখি এক ভিন্ন গান করে, অচিন সুরের গান, তার এক অন্য ধারা আছে, তার ধর্মে চলে মানুষেরা। সেইখানে বার্তা এক আসিল সহসা। তুমি সব জানো মাগো, জেনে শুনে তবু করো প্রশ্ন এত এত।

: জানি বলে নিজে আজ কপাল চাপড়ে মরি।

: জীবন অচল ছিল, এক দিন দুই দিন কাঁধে তুলে পার করে নিয়ে গেছি শুধু। একদিন ভাবিলাম, আরেকটা পথ আছে জীবনের। সে হলো মরণ। মরণ মরণ নয়, জীবনের বাঁচিবার সহজ উপায়। ভাবলাম, চোখ যদি বন্ধ হয়ে যায়, যদি আর খাঁচার ভিতর সেই পাখি তার গান বন্ধ করে, হাওয়া যদি এ দেহে চোরের মতো আসা-যাওয়া না করে নিয়মে, জীবনের যে অবাক দশা হবে, সেই দশা মৃত্যু। তাকে দেখিবার বড়ো লোভ হলো মা গো। সন্ধ্যাবেলা একা একা দাঁড়ালাম পুবের রাস্তায়। মাটি নাই কাদা নাই, ইটপাথরের বাকল জড়িয়ে আছে রাস্তার শরীর। ছোট গাড়ি বড় গাড়ি, ঝাঁকে ঝাঁকে পিদিম জ্বালিয়ে ছোটে, যেন তারা কাউরে বেড়ায় খুঁজে, নিয়ে যাবে চাকায় শরীর বেঁধে অন্য কোনো পথে, মা গো তখন ভেবেছি, একবার বাপের কথাও, দেখি নাই, আমারে ছাইড়া দিয়া গর্ভের আঁধারে সে তো মিশে গিয়েছিল দূরে আগুনের চকমকি শিখায় শিখায়, মনে হলো তোমার মুখখান, কত মায়া, আঁকাবাঁকা কত রেখা তোমার মুখের, ভাঁজে ভাঁজে মায়া আছে, আমার বয়স যায় একটা বছর আর দুইটা বছর, তোমার তো সামনে সে কাল আর নাই, দিন যায় বানের পানির মতো, রাইখ্যা যায় পলি কাদা, স্মৃতির গন্ধের ঘের, সেইখানে পইড়া থাকে এই জীবনের যত আকুলি-বিকুলি করা মনের খায়েস, আহা!

: বাদ দে এসব কথা। মিছেমিছি এখন এসব কেমন কথার জের বলি!

: মা গো শোনো, সেইদিন রাস্তার কিনারে, দাঁড়ায়াছিলাম, আবছা আঁধার ভুরু কুচকায়া জানি মতলব ভাজতেছিল আমার সঙ্গেই, গাড়ি যায় গাড়ি আসে, চাকার তলায় উদাম রাস্তার বুক পিষ্যা যায়, রাস্তার কি প্রাণ আছে মাগো? কত গাড়ি কত ঘোড়া হাতি যায়, মানুষের লাশ পড়ে রক্তে ভেজে গাও, তারপর সবাই ঘুমায়া গেলে মাঝরাতে সুনসান কান্না হয় তার, কাঁদে এই রাস্তা, সব পথ, ঘর থিকা মাঝে মইধ্যে শুনছি সেই স্বর, মিহি সুরে কেমন যে গান করে যায়!

: আহা রে মরণ!

: সন্ধ্যায় সেদিন, আমি ওই রাস্তার মায়ায় পড়ে গেছিলাম জানি, ভাবলাম শুয়া পড়ি, একবার পাতি কান তার বুকে, জানি প্রাণ নাই, তবু কোনো আওয়াজ যদি-বা পাই, গাড়ি যায় গাড়ি আসে, চাকায় চাকায় চক্র এক ঘোরে, আন্ধারে চোখের সামনে দিয়া পাও চলে, গাও টলে, মাথা নাই ঠিক, না না ঠিক ছিল, সব মনে আসতেছিল যে মা, তোমার দুধের ঘ্রাণ, তোমার বুকের ওম, জড়ায়া জড়ায়া সেই ছোটকালে চোখের লবণজলে ভাসায়া দিয়েছ, সেই ঘ্রাণ রাস্তার কিনারে কোন পথ দিয়া য্যান লাগতেছিল নাকের ডগায়, রাস্তা ডাকে, আসো আসো কান পাতো বুকে, এখানে আরাম আছে, শান্তি তুমি পাইবা দেদার, গেলাম রাস্তার ধারে, গাড়ি যায় গাড়ি আসে, গাড়ি কাঁদে গাড়ি হাসে, চাকায় চাকায় জীবনমরণ ঘোরে, শরীর অবশ হয়ে আসছিল মা আমার, পায়ে বল নাই, হাত কাঁপে, চোখের সম্মুখে দেখি চমকি চমকি ওঠে মায়াবি আলোর লতাগুলা, আমারে পেচায়া নিব আকাশের কোলে।

: আহা রে মরণ।

: মরণ মরণ। মরণ ক্যামনে আসে পইলা যে মানুষের মাথার ভেতর, তারপর ধীরে ধীরে শরীরে ছড়ায়, এক এক সব খায়া লয়, বুঝেছি তখন। শুয়া আমি পড়লাম রাস্তায়। গাড়ি আসে, গাড়ি আসে, চাকায় চাকায় ঠিক মরণই তো হাসে এইবার। হঠাৎ তখন তোমারে একবার মা গো দেখার বাসনা জেগেছিল, সেই দুধফোঁটা মুখে দিতে, সেই ওম গায়ে মাইখ্যা নিতে, দুইটা আলোর লতা চাকায় চাকায় গতি পায়, আসছিল আমার দিকে মায়াবি আলোর লতা, শুয়া আছি যখন রাস্তায়।

: থাম তুই থাম। মোর আর শোনার বাসনা নাই মনে।

: শোনো মা গো, আলোর দুইটা লতা হঠাৎ নিভিয়া গেল, চাকাগুলা দাঁতে দাঁত চাইপা হলো স্থির, ভেবেছি মরণ আসবে কাছে, কই হঠাৎ চিক্কর মারে বেগানা জীবন। বলে, ওঠো।

: হায় ভগবান!

: ভগবান বুঝি মানুষের রূপ নিয়া ঘোরে। হইতেও পারে মা গো। আঁধারে তো মুখ দেখি নাই। সে কি কালা নাকি দলা, চোখের মণিতে তার কতখানি আলো, সে ক্যামন হাসে, নিশ্চয় হাসির মধ্যে তার শাদা শাদা কাশফুল ফুইটা ওঠে, ঝইরা ঝইরা পড়ে।


মা গো, তুমি কেন মারো এত কথার চাবুক! যে মরে আপন বিষে, কেন তারে জ্বালা দাও আঘাতে আঘাতে!


: হায় ভগবান!

: ভগবান আইসা মাগো সামনে দাঁড়ায়, হাত ধরে মারল এক টান, কখন যে দাঁড়াইছি রাস্তার ওপর, কতক্ষণ মুখোমুখি, কথা নাই, কথা সব উইড়া গেছে অন্ধকারে অন্ধকারে, শরীর বুইঝা লয় অন্য এক শরীরের বোবা যত ঠার, চুপচাপ, গাড়ি আসে গাড়ি যায়, কে জানি তখন তার হইব দোসর, টর্চ মেরে দ্যাখে সেই আলো পড়ে তার মুখে, ঐ যে একটুক দেখা রাতের রাস্তায়, ফেরা পথে আঁধারে সে দেখার ঝিলিক জ্বাইলা দিল আতর সুবাস, থোকা থোকা চাঁপাফুল দুইধারে ওড়ে ভাসে, বুকের ভেতরে পাখি নাচে গায়, কোন ঠারে বুঝি নাই, আমার বোঝার বড়ো দূরের ভাষায় শুনি আমার আপন পাখি লীলাপালা করে।

: ভগবান? কোন ভগবান? যে তোর শাপের বিষে নীল হয়া আকাশে মিলায়?

: মা গো, তুমি কেন মারো এত কথার চাবুক! যে মরে আপন বিষে, কেন তারে জ্বালা দাও আঘাতে আঘাতে!

: বলেছি, কী দরকার! যেমন রয়েছ থাকো সেই মতো। আমি আছি। মানুষ বিরোধে যায়, ধর্ম মানে নাই, নীতিরীতি সবকিছু কঠিন পাথর হয়া সামনে খাড়ায়… বলেছি না কত বার, শান্ত হ মা, স্মৃতি নিয়া থাক, যে গেছে গাঙের জলে, তারে আনো ডাইকা ডাইকা নিশুতির ঘুমের ভিতর, সে আইসা শুইব পাশে, আমি আছি কোনো মতে, আমি তো এখন রাতে, যখন জাগে না কেউ, কত রাইতে দেখি তারে, হাইসা হাইসা শুয়া পড়ে, বুকে রাখে হাত, আকুলি বিকুলি করে, খইসা যায় বাকল বসন, কালের বাকল সরায়া সরায়া কোনখানে পইড়া আছে এতটুকু রস, সে তা ধইরা আসে হাতের আঙুলে, নিজে খায়, জিভে দেয় আমারও খানিক, আমি কই, মেয়ে আছে নিকটে তোমার, সে যে কই, তা তো জানি, কিন্তু আমি ভুখা জানো কতকাল আছি! কেউ টের পায় নাকো এমন সঙ্গম! তারপর দুইজনে এক হয়া এক এক বিন্দু হয়া রাতের তারার মতো জ্বইলা থাকি সাধের বিছনায়।

: আহা মা গো, শুনলেই পরাণ খুইল্যা যায়, মাটিতে বাঁধানো নদীর বাঁধের মতো, খলখলিয়া নামে জল ঢলে আর ঢলে…

: তোকে না বলেছি আমি, মেয়ে তুই, নারী তুই, নিজের বাসনা কর ভ্রমরার মতো বন্দি মনের কৌটায়, খুইলা খুইলা চুপি চুপি দ্যাখ, মাঝে মাঝে চাইলে তড়পাস, কিন্তু সে বাসনা সাপ, বিষদাঁত দিস না মা তারে, পইলা সে ছোবল মারবে ঠিক আপন জন্মের নাভিমূলে।

: আমি ও তো পেরেছি, বলেছি সেদিন সন্ধ্যাবেলা, গেল সব ঘটনা বেজার! ভেলায় যে ডুইবা গেল জলের ভিতর, ভাইস্যা সে উঠল যেন অন্তরের নয়া চক্ষুজলে… ঝিকিমিকি জ্বইলা ওঠে চোখের তারায়… আমার যে বাল্যসখা, সেই সই, দেখে বলে, এই এই মরেছিস আনন্দী এবার, চোখের ভিতরে এক রং, চোখ থিকা ছড়ায়া পড়েছে দ্যাখ আকাশ বাতাস।

: পুড়ামুখি!

: হ্যাঁ গো মা, মুখখানি পুড়েছি আমার। মরম কোথায় যায়, শুধু স্বপ্ন দেখি, অজানা রাস্তায় আমি দাঁড়ায়া রয়েছি, অবাক সে রাস্তা মাগো, রুপায় বাঁধানো পুরা, দুই দিকে ময়ূরের পেখম যে ওড়ে, শূন্যে শূন্যে, বড় বড় পাখিগুলা ডানা দুই বিছায়া বিছায়া রাখে মাথার ওপর, সেই পথে আমি আছি ঘুমিয়ে একাই, শ্বাসে শ্বাসে ফুলে বুক, তড়পায়, শীত করে, সুখশীত, হঠাৎ চাকার শব্দ, চাকা নাই, হঠাৎ কষেছে গাড়ি ব্রেক, গাড়ি নাই, কেউ যেন আসে পায়ে পায়ে, কেউ নাই, রাস্তায় রয়েছি শুয়ে, একা একা, তবু আমি দেখি স্বপ্নে আমার ভিতরে কেউ মিশে গেছে রক্তে একাকার, আমার নাভির থিকা করবীগাছের চারা বাইর হয়, সে পুরুষ আমারে সুধায়, এই চারা একদিন বড় হবে বৃক্ষ হবে, তার ছায়াতলে দুইজনে কাটাব জীবন।

: হতভাগী!

: ঠিক মাগো, হতভাগী মেয়েটা তোমার, মরার পেটের থিকা বাইর হয়, ফের যে রচনা করে মরণ-কপাল।

: সিঁদুরের খায়েস যে তোর! মাথায় সিঁদুর তোর টেকে না যে বড়ো, একবারে সেই কথা বুঝিস নি তুই?

: সিঁদুর মন্ত্রের দায়, রীতি করে এঁকে দিছে মানুষ মাথায়, তার হাত দিয়ে, কিন্তু মা আমার কাছে সিঁদুর সিঁদুর নয়, সিঁদুর রক্তের মতো, তবু রক্ত নয়, সিঁদুর জীবন, জীবনের ডাক আসে তার কাছে গলে যাবে বয়ে যাবে স্রোতে আর স্রোতে, সিঁদুর তো রক্ত নয়, সিঁথিতে সিঁদুর কথা কয়, লজ্জা লাগে, আমি সেই কথা শুনি, অন্ধকারে মানুষ ঘুমায়া পড়ে, জেগে থাকে দুখিনী নিশ্বাস, তড়পায় হাড্ডি শিরা ভিতরে ভিতরে, একা একা করি গান, মাথার ওপরে চাঁদ জ্বলে, আকাশ ভাসায়া নেয় নীলে, মাথার এ সরুপথ লালে লাল, আহারে আমার সিঁথির ওপরে লাল লাল জীবন ছুটেছে আমি দেখি… তবু থেমে যায়, খালি থেমে যায়…

: ছি ছি! তুই মেয়ে আমার আপন। ভাবতেও ঘেন্না হয় মনে।

: ঘেন্না করো, ঘেন্না তাও জীবনের সয়, কণ্ঠ ছাপায়া ওঠে যে মরা-তিয়াস, তারে কও কে আছে মিটায়!

: হ, তিয়াস, তিয়াস খাইছে তোরে। তিয়াস তো গিল্যা খাইছে উল্টা তোরে পুরা। তারপর? কী হইল তারপর? যে গেছিল তারে ফের পাইতে গিয়া কিভাবে দ্বিগুণ তারে হারাইলি শেষে।

: জীবন হারায় শুধু, জীবনের দায় নাই কোনো যে পাওয়ার।

: নামধাম পরিচয় কিছু তার জানি নাই, তবু তোর একটা কথায় গেলাম খুঁইজা তারে আনতে তোর কাছে।

: মাগো…

: মারি তোরে, থুতু দেই, করি অপমান, মাথা মোর হেট হয়া যায়, তবু তো পারি না ফেলে দিতে, তবু তোর বুকের ভিতর থিকা দীঘল দীঘল শ্বাস লতার মতন আইসা পেচায় আমারে পইলায়।

: মাগো, তুমি তো আমার প্রাণ, তোমার জীবন থিকা পাইছি আমার এই জীবনের দায়।

: ছাড় ছাড়। সমাজের রীতির নীতির সব বাধা সরাইছি, তাও যদি সুখ আসত জীবনে আমার! সুখ যায় বারবার চিতায় অঙ্গার।

: মানুষ সে ছিল বড়ো মা গো।

: কিসের মানুষ! সাপের ফণার নিচে জান রাখে যে বেকুব, তারে কি মানুষ কওয়া যায়?

: বড়োই সাহস ছিল তার।

: লড়াই করার জিনিস তো সাপ নয় বোকা, সাপের যে হাত নাই পাও নাই, কোন হাতিয়ারে তার সঙ্গে তুই করবি লড়াই, কেবল রয়েছে তার জিভ, বিষদাঁত, বুঝবি যখন তোর শত্রুর সমান নাই তোর মতো শরীরের অঙ্গ উপচার, বুঝবি তখন সে শত্রু ভয়ানক, অসম্ভব তার মোকাবেলা, সেই বোকা বুঝে নাই কিছু।

: এত সে বোঝে নি ঠিক, তবু মা গো বুঝেছিল জীবনের ম্যালা অর্থ হয়। পিছন সইর‌্যা গেলে মানুষের অপমান হয়, পলায়ন কইরা গেলে মানুষই তো তুচ্ছ হয়া যায়, তাই সে দাঁড়ায়াছিল সাপের সম্মুখে, নয় তো সে সাপ মাগো গ্রামের সে ছোট্ট ছেলেটারে ছোবল মাইরা দিত ঠিক।

: এখন সে মারছে ছোবল নিজে সাপ হয়ে, এই হতাভাগা জীবনের এক্কেরে সিনায়। হাড্ডিসার কইরা দিল সাধের জীবন।

: তবু মাগো দেখেছিলে সেদিনও আন্ধারে, পিদিমের এক রত্তি আলোয় সাপের ক্যামনে দাঁড়িয়েছিল সম্মুখে একাই।

: বোকা!

: বোকা হোক, তবু, একবার মনে কইরা দ্যাখো মাগো, চৌদিকে আঁধার, একখানা পিদিম জ্বলছে, তার আলো পইড়া হলো সাপের শরীর ঝিকিমিকি রূপালি ছলনা, কত ছল ঢেউ খেলে আঁকাবাঁকা শরীরে যে তার, তবু সে দাঁড়াল টানটান, এদিক সেদিক তার কোনোদিকে চাওয়া-চাওয়ি নাই, চোখে য্যান আগুনের শিখা জ্বইল্যা ওঠে, তোমার সেয়ানা সব মানুষ তখন চৌদিকে দাঁড়ায়াছিল, পিটপিট কইরা চোখে, সকলে তখন বুঝি দেখতেছিল মরণের আগাম আভাস, তবু হোক মরণ, কার কি আসে যায়, বরং সাপের লগে বোকা এক হাদারাম ক্যামনে লড়াই করে সে ঘটনা সাক্ষী হয়া থাকি!

: মানুষ চতুর। গা বাঁচায়া চলে। তোমার ঐ স্বামী, সে ছিল বুদ্ধির ঢেকি, হতভাগা।

: তবু মা কেমন যুদ্ধ হলো সাপে আর মানুষে রাত্তিরে, সাপ মেলে ফণা, হাতে হাতে সে বানায় ফণার ছলনা শত শত, এদিকে সেদিকে সেই হস্তফণা তুলে তুলে সাপেরে ফালায়া দেয় মহা পেরেশানে, দেখে সাপ শত শত আজব সাপের দল ঘিরে ফেলে তারে, এই মতো জাদু দিয়ে শরীর বাঁকিয়ে মাগো শরীরের শত কসরতে বিষধর সাপটিরে হাতের কব্জায় এনেছিল।

: হু! হাতের কব্জায়!

: হ্যা গো, মা। নিজের চোখেই আমি দেখেছি সে আজব লড়াই। সাপ হয় ভোঁতা, মানুষের কৌশলের এত এত সাপ তারে ঘিরিয়া ঘিরিয়া করে নাগিন-নর্তন, সাপ খালি মাথা নাড়ে, ফণায় তখন তার জোর নাই, বিষ বুঝি ভয়ে তার ভিতরে লুকায়, খেলা চলে, মানুষ অবাক, আমার তখন মাগো মনের ভিতর সাত নদী সমুদ্রের জোয়ার উপচায়, জোয়ারের ফণায় তোমার মেয়ে যে তখন করে নাচ, মাতঙ্গিনী নাচে আনন্দের জোয়ার-ফণায়, কাঁপে দেহ, পুলকে পুলকে চোখে রূপালি নদীর ঢেউ ভাসায়া ফেলেছে যেন আঙিনা পুরাই।

: তারপর কী হইল, ক!

: হ্যা গো মা। তার দোষে নয়। যা হইল আমার দোষেই। যুদ্ধে যে সৈনিক খাড়া হয়া যায়, তার সামনে রূপের ভণিতা নিয়া তামাশা করার নাম তার শক্তিক্ষয়। মেরুদন্ড বাঁকা হয়া যায়, মনোযোগ অন্যদিকে সরে। আন্ধারের মাঝখানে একখানা লন্ঠন নিয়াই আমি খাড়ায়া ছিলাম। দেখল সে দূর থিকা, হাছা মা গো, কাছে ভিড়ি নাই, যদি তার মন ফির‌্যা যায় সাপেরে মারণ থিকা… যেই দেখে লন্ঠনের আবছা আলোয় আমার মুখের হাসি, হাইসা ওঠে মৃদু সেও, হাতের ফণাটা তার সাপ নয়, মানুষের হাত হয়া যায়, প্রেমের রক্ত যে তার শিরায় শিরায় বয়, উছলিয়ে ওঠে, আর সাপ, বুঝে ফেলে ছলনা যে তার, আমার মোহের কাছে পরাজিত সে সৈনিক, দেখল গো মা, ক্যামনে মুহূর্তে আসি বিষের ছোবল লাগল পায়ে যে তার, আ! মাগো, বিষ মাগো, এত এত বিষ, পরাজয়ে পিঠ ঠেইকা গেছিল বেড়ায়, সেই সাপ, তার ক্রোধ তখন সকলবিষ শরীর থিকাই বুঝি উগড়ায়া দেয়, ক্রোধে আর ছলানার রূপ ধইরা ফেলে, হায় মাগো, চোখে আমি দেখলাম সেই দৃশ্যখানি, রাতের আন্ধার পুরা ভইরা গেল নীলে আর নীলে, লন্ঠন ভাইঙা গেল, চিৎকার আহাজারি… চৌদিকে আলোর ছিটেফোঁটা নাই, লোকজন ভয়ে সইরা যায়, আন্ধারে তখন আমি তারে খুঁজি, কই পইড়া গেল, খুঁজতে খুঁজতে লাগল সময় বেশ, তার মধ্যে উঠানের মটিতে অসাড় পইড়া আছে মানুষটা মাগো, গায়ে হাত দিতেই দেখলাম ঠান্ডা হয়া গেছে, এত এত বিষ, এতটুকু বোঝার ফুরসত দেয় নাই, সাপ, এমন মরণ, যেন বিষ নয়, বিষদাঁতে পাঠায়েছে মরণ সে সাপ। গলায় কী যেন লাগে হাতে। চেইনখানা। দিনভর রাস্তায় রাস্তায় চক্রযানে ঘোরে, চোখে ধাঁধা নিয়ে, গায়ে মুখে ঘামনুন ঝরিয়ে ঝরিয়ে পাওয়া সামান্য সম্বল, তা-ই থেকে কোনো মতে সঞ্চয়ে বাঁচানো ধন, সে-ই থেকে আমারে সে দিয়াছিল বিয়েতে প্রেমের উপহার, আমি তারে কোনো এক রাইতের আড়ালে ফিরায়া দিয়েছি, পরায়ে দিয়েছি তার গলায়, বলেছি, আমি আজি কণ্ঠহার তোমার নিকটে। ভালোবাসা এ-ই।


ভালোবাসা বিষ হয়া ঢোকে সে পরাণে, মধু হয়া বাইর হয়া যায়; কাঁটা হয়া ফোটে সে পরাণে, ফুল হয়া সুবাস ছড়ায়


: দুই দুইটা স্বামী খাইলি তুই! একখানা বাপ।

: মানুষ ক্যামনে খায় মানুষেরে মাগো! মানুষ তো মইরা যায় আপনজনের লগে একটু একটু কইরাই।

: ওইসব রাখ। কে মরে কে বাঁচে তার হিশাব শোনার নাই প্রয়োজন কারও। কপালে আমার মানুষের ঘৃণা, থুতু লাইগা আছে, তার লগে বেদনা যন্ত্রণা থরে থর… পেটে আমি ধরেছি তো তোরে, কী পাপে ঈশ্বর এই গর্ভে তোর বীজ দিয়েছিল পুরে, জানিত ঈশ্বর এভাবেই একে একে তিয়াাসে আগুনে সব খাক কইরা ছাইড়া দিবি তুই।

: না গো মা, পরাণ অবাক। তার কোনো ছিদ্র নাই। ভইরা রাখে জীবনে খোয়বে। কোন ছিদ্র দিয়া তুমি পরাণের হা হুতাশ খোঁজো। পরাণ অবাধ মাগো। ভালোবাসা বিষ হয়া ঢোকে সে পরাণে, মধু হয়া বাইর হয়া যায়; কাঁটা হয়া ফোটে সে পরাণে, ফুল হয়া সুবাস ছড়ায়; মৃত্যু হয়া বাঁধে পরাণেরে, জীবন তাহারে তুলে আনে নিশিভাঙা ভোরের মতন।

: খায়েস যে কত। এখনো মিটে না তোর মনের তিয়াস।

: যেদিন জন্মেছি মাগো, লোকে কয়, সেদিনই পিপাসা এই মুখে ছিল লেগে, চুকচুক মিছে জল আমি চেখেছি এ জিভে।

: কারা কয়?

: লোকে কয়। আমিও তা জানি। পিপাসা আমারে শেষ করে দেবে জানি। তবু পিপাসার জল নানা রঙে নানা ছাঁচে চৌদিকে বসায়া রাখে রসের সাগর।

: লজ্জা নাই। মুখপুড়ি। মেয়েমানুষের এত পিপাসা পাইতে নাই। জীবন আগুন যার, ক্যামনে মিটাবে ক এত এই পিপাসার দায়!

: মাগো সত্য কই, সাপের ছোবলে যার প্রাণ গেল, নিয়া গেল আমার সে পুরোটা অর্ধেক। সে আমারে জীবনের কী অর্থ শিখায়াছিল। বলেছিল, শোনো, বাঁইচা থাকন মানে বাঁচায়া রাখন। তোমার বাঁচার মানে হইল অন্যদেরও বাঁচায়া রাখার চেষ্টা করা। নিরন্তর।

: বাহ্ ! কথা একখান বাছা খাঁটি বলেছিল। হু!

: হ গো মা, কোথাও কে বিপদে পড়েছে, বিছানায় শুয়া শুয়া টের পাইত ঠিক, পেশি তার ফুইলা উঠত, সিনা হত টানটান। হাত ধরলে হাতে আমি টের পাইছি কেমন কঠিন এক শক্তি খেলা করত তার হাতের মুঠিতে।

: তোর বাপটাও শোন আছিল তেমন। মানুষ যেদিকে নাই, সেইদিকে গিয়া খালি ফুঁইসা দাঁড়ায়। মানুষ ছাইড়া দেয় ঘৃণা কইরা যারে, সে গিয়া ধরত তার হাত, অভয় যে দিত তারে খালি।

: সত্য কি মা! না দেখা বাপের ছায়া তার মইধ্যে খেলা করত খুব। পূর্ণিমায়, গাছের পাতার ফাঁক দিয়া চান্দের ঐ ভাঙাচোরা আলো তার মুখে আইসা যবে লুকোচুরি খেলত, তখন, এক একদিন বড়ো মমতার, বড়ো ভরসার অন্তরের আপন অন্তর হয়া হাইসা উঠত ওই তার মুখ। হাসে মৃদু, কোনোদিন শব্দ কইরা হাসতে শুনি নাই। কইত, শোনো, আমিই তোমারে ছায়া দিয়া রাখমু গো বউ, কিন্তু তুমি ঘুমায়া পড়বা না, ছায়া হউক, তুমি যাইবা রোদে, আগুনে, পুইড়া পুইড়া আমাগো এ জীবনেরে চিন্যা নিতে হইব। এরপর পেরেশান হইলে আমি আছি, তোমার মাথার ওপর তো আছি ছায়া, আছি, আহা রে জীবন!

: তারেও ভুইলা গেলি তুই! আবার কি চাস ক তো তুই! সত্যই কী চাস!

: এইভাবে কয়ো না গো মা। আমি যে বাইন্ধা রাখি বাসনা আমার। দুই দুইবার, প্রতিবার, চিতা ওই দগদগে জ্বলবার সঙ্গে সঙ্গে তারে আমি পুইড়া ছাই কইরা দিছি চিতার আগুনে। বাসনা, কামনা, ইচ্ছা… হায় মাগো, মন্দিরে গিয়েছি আমি, পণ্ডিতের পুরিতের শক্ত শক্ত কত কথা করেছি শ্রবণ, জীবনে বাসনা থাকতে নাই, কামনা বাসনা সব পরিত্যাগ করে তবে পাব ঈশ্বরের রাতুল চরণ, কত গান শুনেছি পালায়, মনেরে ধইরা রাখতে গোপন কোঠায়… মাগো, সত্য কথা, যদি তুমি পাগলা ঘোড়ার মতো ছুইটা বেড়াও, এটারে তো দৌড় বলে, জীবন বলে না। কিন্তু মাগো, আমি স্থির থাকি, আমি মাগো চিতার আগুন চোখে নিয়া ছাই মাইখা বরফের মতো ওই শীতল শয্যায় মরণচাদরে মুইড়া রাখি এই দেহ, তারও মইধ্যে কোনোখানে চুপচাপ ঘুম পাড়ায়া রাখি এই মন, তবু মা হঠাৎ দেখি, সে উইঠা ছুইটা গেছে খালি করে আমার পিঞ্জিরা, কত শক্ত শিকল দিয়েছি, ভাইঙা খানখান কইরা নীরবে ক্যামনে জানি বাইর হয়া যায়, আমি ডাকি, আমারে সে ঘণ্টা দেখায়।

: ছি ছি! এইজন্য তোরে আমি নিয়া যাই ধর্মকথা শুনতে আসরে! এইজন্য মন্দিরে মন্দিরে নিয়া কপাল ঠোকায়া দিয়া ঈশ্বরের পায়ে তোরে করাই ভক্তির প্রণিপাত?

: মানুষ যে কী জিনিস মা গো! তারে বড়ো চিনতে মন চায়। তারে আমি বিছানায় দেখি, মাঠে গিয়া কাজ করে, রাস্তায় সে গাড়িও চালায়, সাপের সামনে গিয়া সিনা উঁচা কইরা নেয় মরণেরে টানি, আমার কপালে চুমু দিয়া কয়, এ জনমে তোমার মতন কেউ সুন্দর দেখি নি! তারে বড়ো কাছ থিকা ফির‌্যা ফির‌্যা চিনতে মন লয়। বাসনা আমার এই মতো ছুইটা বেড়ায় গো মা। তুমি যারে বিয়া কও, আমি তারে বলি পথবান্ধা। বান্ধা পথে হয় গো মিলন শোনো মানুষে মানুষে। তারপর তারে চিন্যা লওয়া।

: মর! মর মুখপুড়ি! হতচ্ছাড়ি!

: মরণে আমার ডর নাই। মরণ দেখেছি আমি কেমন সহজ, যেমন পরম যত্ন কইরা ভয়ে ডরে কচুপাতা টলটল পানি, যেন হাতের আঁজলায় জল ধইরা রাখা, তুমি ভাবছ জল আছে, ধইরা রাখছ তারে, কোনদিকে চুয়া চুয়া পইড়া গেছে সব, হাত হইল খালি। এই মতো ফাঁকি দিয়া মরণের কারবার। তার কাছে ইন্দুরের মতো হুড়োহুড়ি করে লাভ নাই। তার লগে হাতখানা মিলানোই ভালো।

: মিলা গিয়া। আমার সামনে থিকা যা।

: ক্যান চটো মা! তোমার ওই মরণ যে তামাশা কইরা গ্যাছে জীবনে আমার, তার শোধ এম্নে এম্নে নিমু! একবার তারে আমি ঠিক বুইঝ্যা নিমু। শেষ তারও দেইখ্যা নিতে চাই।

: মরণের কোনো শেষ নাই। সে ধরে বাহন মেয়ে নতুন নতুন। তারে দিয়া কাজ করে, তার কোনো ক্ষয় নাই, লয় নাই, তৈয়ার বিনাশ কিছু নাই।

: আছে মাগো আছে। মরণেরও শেষ কিছু আছে। যারে নিয়া খেলে, সে যদি বুঝে না আর মরণ ক্যামনে আসে জীবনে তাহার, তাইলেই মরণের শেষ আছে জেনো।

: কী! কী কইলি তুই! হায় ভগবান। কী বলে পাগলী এই মেয়েটা আমার। তার মানে তুই নিজে ডেকে নিবি… হায়! না না! আয় মা গো, মায়ের বুকেই আয় তুই। কেমন কথার শেল বিঁধালি এ পরাণে আমার। আমি তোর কথার অর্থ বুঝেছি! হা কপাল। শেষতক তুই!

: এখনই করো না ভয়, এখনো জীবনে আমার আরও কিছু দেখা বোঝা বাকি। এখনই সে আসল লড়াই আমি করি নাই শুরু।

: মা রে, বেলা বয়ে যায়, এইসব অপচিন্তা বাদ দিয়া চল ক্ষেতে যাই, এবার জমিতে হবে ধান, রাতদিন খাইটা খাইটা ওই ধানের সবুজ চারা রোপন করেছি ক্ষেতে, এবার ফসল এসে লুইটা পড়ব আমাদের গোলায় দেখিস। মা রে, অভাগার কাছ থিকা ফসলও পালায়। কত ইচ্ছা করে, ফসলে ফসলে ভইরা যাইব আমাদের জমি, হাত ভইরা নিবি ধান, পাতে ভইরা থাকব ভাত, শাদা শাদা ভাত, আশ্বিনের মেঘের লাখান।

: ভাত শাদা-আশ্বিনের-মেঘ। হায় রে তোমার খিদা খালি ওই ভাতের ওপর!

: হ হ ভাত। ভাতই তো জীবন।

: না গো মা। জীবন অনেক বড়। জীবন ঐ ভাতে আর আকাশের শাদা মেঘে মেঘে থাকে।

: শোনো রে মেয়ের কথা, জীবন নাকি ঐ মেঘে থাকে? মেঘ থিকা কী পাস রে তুই? জল?

: মাগো ! আমার যে কী হইছে মা, মনে হয় কে একজন খালি কোথাও ডাইকা নিতে চায়। আমি হাতড়াই। খুঁইজা ফিরি। তারে আমি পাই না কোথাও।

: পরপুরুষের লাইগা তোর খায়েস মিটে না! মরণ এবার তোরে নিজে ডাইকা নিব।

: পরপুরুষের নাম কেন কও তুমি? কও না মানুষ। মানুষেরে ভালো মতো দেখতে চাই, বুঝতে আমি চাই। আমার শরীর জুইড়া মানুষ করব লীলাখেলা। মানুষের সঙ্গ নিতে এখনও এ মনপ্রাণ আকুলি-বিকুলি করে। তুমি যারে বিয়া কও, সে আমার মানবসঙ্গের খেলা।

: কে তোরে কইল এ কথা?

: বলেছে মা মস্ত কবি এক। সুরে সুরে কথা বলে বাঁশের বাঁশিতে। বলে সে মানবসঙ্গ হলো আসল সাধন। আমি কই ক্যামনে হয় তা যে! সে বলে, মানুষকে মনে নিলে দেহে নিতে হয়, মন আর দেহ মিলে হয় যে সাধন, তার নাম সঙ্গ।

: ছি মেয়ে ছি। তোরে আমি অলুক্ষণে পেটে ধরছি এই। তুই সব খাইছিস আমার।

: হ্যা গো মা এবার বোধহয় আমি নিজেরেই খাব। দেইখো একদিন আমার পেটের ভিতর ঢুইকা গেছি আমি। হি হি হি।

: হায় ভগবান। এ মেয়েরে ক্যামনে সামলাই আমি আজ।

: ধরো, আমি অবাক পরাণ এক, ভুল করে ঢুকছিলাম গর্ভে মা তোমার।

: কী কইলি!

: হ্যাঁ গো মা, আমার জন্মের কথা ছিল গর্ভে আকাশের। শরতের শাদা-শাদা মেঘ হয়া জন্ম নিতাম গো যদি!

: চুপ কর। একদম চুপ। পাগল হইছস একেবারে। লোকে শুনলে কইব, ডাকো কবিরাজ, ঝাড়ফুক দিতে হইব। এতসব সামলাব ক্যামনে আমি হায়!

: ভয় নাই মাগো। ভয় নাই। তোমার অবলা মেয়ে অবলাই থাকব তোমার। আমার তো আচানক স্মৃতি আছে। সঙ্গী ছিল দুজন দু’বেলা। মাত্র কিছুদিন। বুক জুড়ে রাইখা গেছে স্মৃতি। লাল নীল হলুদ সবুজ স্মৃতি। অঙ্গে অঙ্গে স্মৃতি নাচে, স্মৃতি খায় পুইড়া আমারে, স্মৃতির ফণায় দোলে বাসুকী নাগিনী, স্মৃতি এ শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বীণ গো বাজায়, আচানক বীণ, লোম খাড়া হয়া যায়, শিরায় শিরায় ওঠে আজব নাচন।

: আমার কী সর্বনাশ হয়া গেল প্রভু! এক মাত্র মেয়ে, সে-ও হলো ছন্নছাড়া, তারেও এখন ভূতে ডাইকা নিতে চায়!

: বাঁশিওয়ালা সব সুর জানে। সে এক আজব বাঁশিওয়ালা। এর আগে সাহসী পুরুষ পাইছি, ভেলায় ভেলায় জীবন ভাসাইন্যা এক উদাসীন পুরুষও পাইছি জীবনে। কিন্তু মা এ বাঁশিওয়ালা, ক্যামনে পেয়েছি তারে আমিও জানি না। তার সাথে দেখা হইল শঙ্খনদীতীরে।

: শঙ্খনদী?

: হ্যা মা, শঙ্খনদী। এমন সে নদী, তার জলে শঙ্খ শুধু ডুইবা ভাইসা থাকে, তার জলের স্রোতের গতি শঙ্খের মতন ঘোরে, সেইখানে ডুব দিতে হয়, ডুব দিলে ভাইসা ওঠে জীবনের বাসনা মধুর।

: শঙ্খনদী? কবে গেলি তুই?

: গেছিলাম মা। তুমি তো তখন ঘুমে। হঠাৎ কে ডাক দিল, আমি একা পায়ে পায়ে গেছিলাম পথ ধইরা মাঠের ভিতর দিয়ে আল ধইরা হাঁটতে হাঁটতে… তুমি তো তখন ঘুমে, আমি শুধু যাই, মাঠের ভিতর দিয়া, আল আসে আল ভাইঙা যায়, জলে জলে ভইরা যায় সবুজ সবুজ ধান, পায়ে পায়ে পলির আঁশটে গন্ধ, আমি চলি তবু এক আশ্চর্য বাঁশি যে বাজে দূরে দূরে।

: কে বাজায় পোড়া বাঁশি ওই? কোন সে হারামি?

: কেউ তার নাম যে জানে না। আমিও জানি না। শুধু বাঁশি বাজে। শঙ্খনদীতীরে। বাঁশির সুরের তোড়ে শঙ্খনদীটির জল উছলায়া ওঠে। বাঁশির সে সুর এসে ঢুইকা যায় আমার এ শরীরের রক্তমাংস দিয়া বড়ো গোপনে গহিনে…

: ছি ছি!


বাঁশি কথা জানে। মানুষ-ঠকানো কথা। মানুষকে ছলনায় ডাকে সে যে শঙ্খনদীতীরে।


: না গো মা। এ কোনো পাপের কথা নয়। এ এক অদ্ভুত লীলা। দূরের বাঁশির সুর মানুষের শরীরের ভেতরে ঢুইকা পড়ে সাপের মতন, সাপ যে-মতন ঢুুকে মাটিতে সুড়ঙ্গ করে, পৌঁছে যায় গহিনে গভীরে… বাঁশির সুরের মধ্যে গতি আছে, মনে হইল আমি আর হাঁটি না কোথাও, সুর হাঁটে, আমি তার পিঠে পিঠে হয়েছি সওয়ার।

: সব কথা কেমন আবাক লাগে। তুই মেয়ে আমার তো জানি। এতসব কোনদিকে পায়া আসলি তুই !

: বাঁশি কথা জানে। মানুষ-ঠকানো কথা। মানুষকে ছলনায় ডাকে সে যে শঙ্খনদীতীরে। শঙ্খনদী তোমার আমার সবার নিকটে থাকে মাগো। আমরা অনেকে তারে দেখি প্রতিদিন। ভুল কইরা তার জলে দেই না তো পা। জল তার পান করি নাকো। শঙ্খনদী আমাদের চোখের সামনে থাকে জেনো। সাঁতার কাটতে পারি ইচ্ছা মতন। শুধু তার জলে ভালো সাঁতার শিখি না। তোমারে শিখাব বলো এমন সাঁতার?

: ছাড় ছাড় ! শিখাইব সাঁতার। তোর মরণ হইব আমি জানি।

: শঙ্খনদী যে পেয়েছে, যে গিয়েছে তার ঘাটে, মরণ কপালে নাই তার। মরণের বুকে চইড়া শঙ্খ নাচে ঘুরিয়ে পেচিয়ে, হাসে শঙ্খনদী। শঙ্খনদী মানুষের ভিতরেও থাকে। তারে তুমি চিনো নাই শুধু।

: ওইসব বানাইন্যা খোয়াবি কথার প্যাঁচ রাখো। মুখপুড়ি। চলো ক্ষেতে যাই। ধান হয়া আসে সোনা। সোনায় সোনায় গোলা ভরবে এইবার। ধানের গন্ধের ওমে মায়ে ঝিয়ে ঘুমাব শান্তিতে।

: ধান ধান, ওই এক কথা! ধানে নাই প্রাণ, আছে? ধানে নাই শরীরের আনন্দের ঘ্রাণ, আছে? ধানে নাই অন্তরের মরিয়া সে টান, আছে?

: ধান হয় চাল, চাল থিকা ভাত, ওরে হতচ্ছাড়ি, সেই খেয়ে ভরে পেট, তারপর ঘুমাবার স্থান পাবি তুই, মায়ে ঝিয়ে জড়ায়ে কাটাব বাকিদিন।

: জীবনের তাতেই কি সব চুকে যায়?

: জীবন! জীবন! জীবন কিছুই নাই, জীবন বাওকুড়ানি, ধূলি নিয়া উড়ায়া উড়ায়া ঘোরে ছল করে এখানে সেখানে, সবাই ভাবে রে আহা কী জানি উড়ছে, সে তো ধূলি ছাই।

: মাগো তবু শঙ্খনদীতীরে তার বাঁশি বাজে… সে আমারে ডেকেছে কেবল।

: শোন শোন হতভাগী কী বলে এসব! মা রে, অবাধ্য হোসনে মায়ের, জন্মের সময় তোর ডেকেছিল কুকুর শিয়াল, দাই উঠেছিল হেঁকে, হারামজাদার দল, আর ডাকবার তোরা পাসনে সময়। দাই তেড়ে গিয়েছিল আতুর ফালায়া—দুর দুর। সেইদিন বাপ তোর, আহা মানুষটা, গঞ্জে গিয়েছিল, কি জানি কী কাজে, ছাই হয়া দাঁড়াইল গাছের তলায়। শোন শোন তোর জন্মকালে। এইসব। সেইদিনই রানুমাসি, গ্রহ নক্ষত্রের কথা সকলই সে জানে। কানে কানে মুখ রেখে বলেছিল, এ মেয়ে তোমার অনেক নক্ষত্রদোষ দেহে বেন্ধে পৃথিবীতে এসেছে তা জেনো। জন্মের রাতেই কুকুর শিয়াল বিগড়ায়, বাপ ছাই হয়া যায়, এ মেয়েরে চোখে চোখে রেখো।

: হায় মা গো, মানুষের কত যে ফিকির! অবুঝ যে বোঝে না কিছুই, মাত্র এক মাংসের দলা সে খালি ভেতরে ধুকপুক নাচে, এক প্রাণ, চোখে তার আলো ফোটে নাই, কেবল ভরসা তার তোমার—মায়ের—বুকের গরম ওম, দুধের মায়াঘেরাণ, তোমারই চামড়ার মিঠা ভাপে শরীরে জীবন নড়ে ওঠে যার অফোটা অফোটা মাগো, তারে কেন দেও দায় কাল-আকালের।

: হয় হয় এই মতো হয় পৃথিবীতে। এই দেশে কতকিছু ঘটে। কথা তুমি শোনো নাই, কী আজব ঘটনা ঘটেছে, তোমারও বহুৎ বহুৎ কাল আগে, এইসব ঘটনা ঘটেছে। মনে আছে চাঁদ সদাগরের কাহিনি? বেহুলার লগে পুত লখাইয়ের বিয়ে নিয়ে কোন কথা রটে আগে আগে? লোহার বাসরঘর বানাল পিতা সে চাঁদ, কই, পারল বাঁচাতে? মনসার রোষে বিষে নীল হলো অভাগা লখাই।

: কিসসা তো সেখানেই শেষ হয় নাই।

: কী আর রয়েছে বাকি পর?

: বেহুলার কী হলো তখন?

: বেহুলা বিধবা হলো। স্বামীরে খাইল হতভাগী বিবাহের রাতে।

: বেহুলা বিধবা হয় নাই।

: স্বামী গেল মারা, আর তুই কোস… তোর মগজের মধ্যে কার জানি আছড় পড়েছে, লাগে ভয়।

: বেহুলা লখিন্দররে নিয়ে গেল ঘাটে ঘাটে। একটাই লক্ষ ছিল তার মরা স্বামীরে বাঁচাবে। মরণের সঙ্গে জানি লড়াই করতে চেয়েছিল বেহুলা একাই।

: কিন্তু কী রইল তার কপালে অন্তিমে। খালি অপবাদ অপমান, ছি ছি! ভাবতেও গা রি রি করে।

: বেহুলার নাচাড়ি যে তার খুলেছে বসন, সে তার বসন খালি নয় মাগো, নারীরে মিথ্যা করি ঢাকিয়া রেখেছে যে পোশাক, ছলনার বস্ত্র দিয়া আড়ালের অনেক আড়ালে যে যন্ত্রণা রাখিছে সে ঢেকে, তারে খুলে দিল বেহুলা গো মা, বেহুলা উলঙ্গ হয়, মানুষের চোখে চোখে দর্পণে দর্পণে নিজ কায়াটি দেখায়ে দিতে, দেখো দেখো, এইভাবে ভিতরে ভিতরে রয়েছে তোমাদের বাসনার মাংসভরা ক্ষেত, ঘাটে ঘাটে ছলনাশত্রুরে জয় করে বেহুলার শেষ পথে দাঁড়ায় যে নয়া পরাজয়, নতুন দাবিতে তারে উলঙ্গ করার বাসনায়। মরণেরে মহান করেছে বেহুলাই, জীবনের দায়ে দায়ে ভেলায় ভাসিয়ে আপনার সঙ্গে, মরণেরে অপমাণ করেছে দেবতা, পুরুষ, তার দায়ে বাসনারে উলঙ্গ বানিয়ে।

: হ হ, তুই তাইলে বেহুলা-ই হ।

: আমি মা বেহুলা নই। আমি হই বেহুলার নতুন ভাসান। নতুন নতুন প্রাণ নিয়া।

: কী কইল, ভাসান, মানে কি তুই জলে জলে—!

: বেহুলা কপালে তার মরা স্বামীরেই ভাগ্য মেনে জীবন বাসনা করে ফিরেছে যে কত ঘাটে ঘাটে, আমি কোনো এক লখাইয়ের দায় নিয়ে জীবন ভাসাতে নাহি বাঞ্চা করি জীবনের স্রোতে। জীবনের ঘাটে ঘাটে আমি নিজে ভেসে যাব, মরণ আমার সঙ্গে ঘাটে ঘাটে ফেরে, এক লখিন্দর নয়, লখিন্দর একা নয় আসবে আমার। লখাই জীবনসাথী, বাঁকে বাঁকে ফেরে, তারে আমি পাব না দীঘল কাল। ক্ষণে ক্ষণে পালাবে সুদূর। তবু আমি ধরব যে তারে, এই হাতে, মরণের ফাঁদ পাতা সংসারের জীবনপঙ্খিরে  আমি ধরব গো হাতে, ঘাটে আর ঘাটে, ছল-ধরা শত লখিন্দরে। শত শত জীবনের কষ্ট-ছলনারে।

: হায় ভগবান, কেন এ মেয়েরে তুমি গর্ভে এনেছিলে!

: আমিও জানি না মাগো। কার কোন দায় নিয়ে প্রাণ কাঁদে প্রাণ হাসে প্রাণ নাচে প্রাণ ভাসে জোয়ারে ভাটায়। বাঁচা-মরা শরীরের রক্ত স্রোতে শিরাপথে মাংসমজ্জায় আর ঘেরানে ঘেরানে। আমারে যাইতে দেও মাগো। শঙ্খনদীতীরে জানি বেলা হয়া আসে। বাঁশিওয়ালা ওই যে বাজায় পোড়াবাঁশি।

: আবার আবার তুই! শোন তবে আরেকটা কথা আমি লুকায়ে রেখেছি তোর কাছে।

: কোন কথা মাগো!

: একদিন তোরে কোলে নিয়ে আমি ঘুমাতেছিলাম দ্বিপ্রহর। হঠাৎ স্বপ্নের মাঝে, হা হা স্বপ্নেই হবে, শুকপঙ্খি এক ডানা ঝাপ্টায়ে ঝাপ্টায়ে এসে উঠানের চাঁপাগাছে আইসা বসে ডালে, ঠোঁটে তার রুপার ঝিলিক, বলে, আমারও এক সারি ছিল, সাধের সংসারে। একদিন সঙ্গমের কালে মানুষের বন্দুকের গুলিতে মরেছে পাখি মোর, সখি প্রাণপাখি! তারপর থেকে একা একা ঘুরি আমি। তোমার পুতুলি ওই, আদরেরে কন্যা যে তোমার, বলো তারে, প্রেমপরিণয় ভাগ্য হবে নাকো তার, প্রাণের পুরুষ তার বিচ্ছেদের আগুনে যে ছাই হয়ে যাবে নিষ্ঠুর মাটির সঙ্গে মিশে। আমি কই ওহে শুক-পাখি, তোমার সারিরে মেরেছে যে লোকে, দুষ্ট তারা, শিকারি নেশার, কিন্তু মেয়ে আমার অবুঝ, কী তার হয়েছে দোষ, সে পাপের ভার নেবে কাঁধে তুলি? শুক কই, যে মেরেছে, সে তার আত্মীয় হয়। আত্মীয়? ক্যামনে! সে তার পূর্বপুরুষ কোনো! রক্তে তার বয়ে যায় তারই বংশধারা। হায় পাখি! কারও না কারোকে নিজে বংশের পাপের ভার তুলে নিতে হয়। সে ভার পড়েছে ওই মেয়েতে তোমার! তাই বলি, বলো শুধু মেয়েরে তোমার, যেন পরিণয়ে কখনো না বাঁধে সে নিজেরে কোনোদিন। পুরুষের ভাগ্য তার জীবনে নিষ্ফল।

: কখনো দেখেছ স্বপ্ন সেইখানা মাগো?

: তোর মাত্র নয়ন মেলেছে যেইদিন।

: তবু কেন বলো নি এতটা কাল যেতে? আজ এসে বলছ আমায়!

: আমি তার প্রমাণ চেয়েছি পেতে। শুক পাখি, কত তার খোয়াবি কথার জোর? তুচ্ছ করি মানি নাই মনে মনে তারে। আজ এসে সেই কথা সত্য হয়ে বাজে। কেন না বিগত রাতে সেই স্বপ্ন ফের আমি দেখেছি যে সোনা।

: সব তুমি বানিয়ে বলছ, এই কথা জানি। তুমি মাগো মিথ্যারে সহায় করো ভুলে, বারবার , কেন মা গো কেন?

: এই তোর গা-ছুঁয়ে বলছি শোন, ভোররাতে ফের আমি দেখেছি খোয়াব। আরও কই তোরে, শুক কয় সেই কথা, আর ওম্নি দেখি ভরা যুবতী যে তুই, সিঁথিতে সিদুর, কী অবাক সেই রূপ, সিদুর হঠাৎ রক্ত হয়া গড়ায়া গড়ায়া পড়ে, আমি চেপে ধরি, রক্ত আর থামে না মোটেই, তোর মাথা চিরে রক্ত যে সিদুর হয়ে ঝরে! মা গো, তবু আরও একটি কারণ ছিল, যে-কারণে আমি তোরে দুইবার শুক-কথা লঙ্ঘন দিয়েছি করবার।

: কী কারণ?

: সে কথা বলতে বড়ো লজ্জা করে। আমি মা সংকোচে পড়ি। সেকথা জানার নাই প্রয়োজন তোর।

: কও মা আমারে কও সেই কথাখানি।


যাই মাগো আমি। শঙ্খনদী জোয়ারে মেতেছে। বাঁশিসুর বৈঠা হয়ে অপরূপ নৌকা দেয় উজানে ভাসায়ে।


: তুই নারী, তবু নারী ক্যামনে নিজেরে চিনে পুরুষসঙ্গের গুণে, সেই জ্ঞান নিতে তোরে দিয়েছি সুযোগ দুইবার। খালি জানি নাই, এত আগে, এত আগে হবে তোর বিচ্ছেদ আবার। তাই বলি, তুই থাম। আর নয়, তুই থাম একটু এবার। দুই বার তোরে আমি স্বামীর ভিটার থিকা ফিরায়ে এনেছি, যে গৃহে প্রাণের পতি নাই, সেইখানে থাকিবি ক্যামনে, প্রাণ বিনা কিসে হয় বাস! তাই তোরে কারও হাতে দেবো নাকো আর! লুকায়া রাখব এই মায়ের বুকের কাছে… আয়! কী জেদ রে তোর, দৈবের লিখন তুই মুইছা ফেলতে চাস! শুকপঙ্খি কার বার্তা স্বপ্নে আসি করেছে প্রচার, একবারও ভাবলি না তত্ত্বখানি তার?

: শুক-পাখি তবে সেই সাপ, বেহুলার কাল ছেড়ে আমার নিকটে আসিয়াছে?

: আসিয়াছে, আসিয়াছে। স্বপ্নে আসিয়াছে। তাও ভালো, স্বপ্নে থেকে সাবধান করেছে সে তোরে। থাম বলি থাম।

: আমি তো বেহুলা নই মাগো। ঘাটে ঘাটে এক মরাপ্রাণ নিয়ে ফিরব না জানো তুমি ভালো। ঘাটে ঘাটে আমি আরো খুঁজে নেব নতুন লখাই, নতুন জীবন।

: দুই দুইবার তুই বুঝেছিস সেসুখ কপালে নাই তোর।

: না না মা, সে সুখ নয়, সুখ আমি করি না বাসনা। প্রেম। প্রেম এই জীবনে কিভাবে আসে, কিভাবে ছড়িয়ে যায় শরীরে অন্তরে আর মাংসে মজ্জায়, শোনো মা বেজেছে বাঁশি শঙ্খনদীতীরে। তার নাম প্রেম। যারে তুমি বিসর্জন দিয়ে দিছো গাছের তলায় অপঘাতে ছাই হওয়া শরীরের রক্ত স্রোতে। আমি তারে ফিরে ফিরে হাতে নিতে চাই। আমারে তুমি না নিছো পুঁথিপাঠে, গীতের আসরে, পালায় লীলায়… দেখেছি আমারে মাগো ক্যামনে যে মরি কালে কালে, এক পুরুষের মন, হায় এক পুরুষের মন, খালি ওই এক পুরুষের মন তাই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সকলি ছেড়েছি জীবনের, আগুনে দিয়েছি ঝাঁপ, পুড়েছি অন্তরআগুনের শিখায় শিখায়, সব সঁপে দিয়ে তবু বিরহের আগুনে পুড়েছি, রাধা তার নাম, আমি মা গান্ধারি হয়ে চক্ষুখানি বেঁধে অন্ধ হয়ে রইলাম বৃথা, থামল না প্রেমের পতন, প্রেম ঠিকই হিংসার পথ ধরে আমার হৃদয় থেকে হয়েছে পৃথক, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হত কি মা, ধৃতরাষ্ট্র রাজা যদি গান্ধারির শুনিত বচন? এইসব কত কিসসা শুনিয়েছ আমারে মা নিয়ে নিয়ে সেসব আসরে। নিজেরে চিনেছি মা গো আমি।

: নিজেরে? সেসব পুরাণ কথা তুই কি কইতে চাস …

: নিজেরে, নিজেরে, মাগো। নিজেরে দেখেছি ফিরে ফিরে। কথার দর্পণ আসে সামনে খাড়ায়। সেইখানে যে মুখ দেখেছি আধফোটা আমিও তোমার মতো, ধরো সে খোয়াবে, সে মুখ আমার। নিজেরে দেখেছি।

: হায় হতভাগ্য মা সে আমি, তিল তিল করে এক অভিশাপ এ গর্ভে ধরেছি।

: মাগো!

: আমি সেই হতভাগ্য মা যে নিজের মজ্জায় বাঁধে, লালন পালন করে নিজের মরণ। হতভাগী, আত্মজার মরণ কি নয় মৃত্যু জননীর?

: শেষবার দেখব এবার, মাগো অনুমতি দাও, নিজের ভাগ্যের কথা। ভাগ্য জেতে নাকি জিতি আমি নিজে শেষবার করব পরখ।

: তোরে যদি হারাই জীবনে!

: আমার যে গন্ধ পাও, সেই গন্ধ লেগে র’বে মায়ার বাতাসে। আমার যে মেঘ বড়ো ভালো লাগে, সেই মেঘে তুমি দেখে নেবে আমার গায়ের রং, শরতের শাদা কাশফুল। দীঘিতে যে পদ্ম ফোটে, সে যে কতোদিন আমার পরশ নিয়ে জলের ওপর চুপচাপ ঘুমিয়েছে, সেই পরশন তুমি নেবে তার কাছে। বাছুরের লোমে লোমে আমার চুমুর দাগ লেগে আছে, হাত দিলে আঙুলে আঙুলে উঠে আসবে সে দাগ। তোমার মাথার চুলে বিলি কেটে দিয়েছি যে কত, সেই আঁচড়ের নরম নরম দাগ পরশিলে আমারে যে পাবে মাগো তুমি।

: হে হতভাগিনী, বোকা, জেদী, হতচ্ছাড়ি মেয়েটি আমার!

: তুমি দেখো শুকপঙ্খি, আমি দেখি বেহুলারে। ঘাটে ঘাটে দাঁড়ায়, কেবল ফিরে তাকায় আমার পানে, চোখে চোখে ঠারে ঠারে ডাকে সে আমায়, বলে পাব কি আমার প্রেম ফিরে? আমি বলি, প্রেমের একটা খালি রূপ নিয়ে তার দায় ভেসে ভেসে বেড়াও যে বোকা মেয়ে তুমি। প্রেমের কত-না রূপ পুরুষের বেশ ধরে তোমার হাতের আশপাশে নড়াচড়া করে। পুরুষ পুরুষ নয় শুধু। নারী অঙ্গে ডুবলে পুরুষ সেও নারী হয় যে অর্ধেক। যেমন নারীও হয় অর্ধেকপুরুষ। এই আধাঅঙ্গ রূপকথা তুমি জানো নাই, আমি জানি, তাই আমি হারায়ে হারায়ে তবু ফিরে পেতে চাই। জীবন আসিয়া ঢোকে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গহনে গহনে মাগো আমার অন্দরপানে, খুঁজে নিতে ফসলের বীজ, সেই মৌসুমের চাষবাস দেখে মরি তবু ভালো, মরে মরে বেঁচে থাকা এ জীবন ছেড়ে।

: ঈশ্বর, আমার কলিজার টুকরো, আমার মায়াপুতুল, আমার জাদুর প্রাণভোমরা, ঈশ্বর, বাঁচাও হে তারে।

: শঙ্খনদী ডাকে মাগো বাঁশির উছিলা ধরে, ঘুরিয়ে বাঁকিয়ে জল রঙ্গ করে নদীতে ভীষণ, আমারে সে ডাকে, পুরাতন ফাঁদ জানি, আবার ঠেলিয়া দেবে হয়তো-বা, জলের নিঠুর গ্রাসে, জোয়ারের থাবার ভেতর এ শরীরখানা ডুবে হবে ঝিনুকের মতো ছোট্ট, মুখখানি ঢুকে যাবে দেহের ভিতরে, এত এত ফাঁদ তবু যাবো আমি শঙ্খনদীতীরে, শুকপঙ্খি বেঁচে থাক, তোমার স্বপ্নের চাঁপাগাছে, তোমারে কথার ঠারে পাগল কইরা মিছে ঘুরিয়া বেড়াক, আমি যে এবার পাই নদীর জলের ছলাছল, বাঁশি ডাকে, বাঁশিওয়ালা সুরে সুরে জীবন ভাসায় মাগো শঙ্খনদীতীরে।

: মারা যাবে বাঁশিওয়ালা, জানো না নচ্ছার মেয়ে? কী সে হয় অন্তঃকালে! কী লিখন আছে তোর শাপের কপালে।

: এবার আমি যে তারে বাঁচায়ে রাখব মাগো, নিজের জীবন দিয়ে আমি বাঁচাব পতিরে।

: পতি?

: হ্যাঁ, পতি মোর। যাকে আমি প্রাণে ধরি সে-ই পতি মোর। মন্ত্র তারে কিংবা আমারে না ছুঁলো তো কী-বা আসে যায়।

: যাস নে গো মা আমার। সর্বনাশ চৌদিকে নখর মেলে ঝাপটে ধরবে তোকে, দেখি আমি, এখন পষ্টই বুঝি সর্বনাশ কেমন সে অলক্ষণ করে আগে আগে, পষ্টই দেখেছি আমি সর্বনাশ তোরে বাঁশির সুরের ছলনায় ডাকে ওই। সুরে সুরে খাদ আছে। যাস নে গো মা।

: যাই মাগো, যাই। যদি আর না আসি নিকটে তোমার কোনোদিন, বেঁচে আমি থাকব নিশ্চয়, তোমার ঘৃণায় অপমানে অভিশাপে মহা যন্ত্রণায়, জানি। যতবার ঘৃণায় তোমার জ্বালা হবে বুকে, আমি এসে পুড়ব ভেতরে। যাই মাগো যাই।

: মা রে, সোনা, মায়ার পুতুলি, মায়ের বুকের থেকে দূরে গেলে ছায়া নাই, কে তোরে বাঁচাবে আড় করে, ফিরে আয়।

: যাই মাগো আমি। শঙ্খনদী জোয়ারে মেতেছে। বাঁশিসুর বৈঠা হয়ে অপরূপ নৌকা দেয় উজানে ভাসায়ে। তারে আমি নিয়ে যাবো ভাটি থেকে উছল উজানে। রক্তের ভেতর মোর, আজ ফের হাড়ে হাড়ে মজ্জায় মজ্জায় বাঁশি হয়ে ঢুকে যায় বংশীপুরুষ। বাঁশি নাকি সে-ই ভাসে সুরে সুরে শ্বাসের ভেতর। জানি না জানি না। ডাকে সে আমারে, এসো, সঙ্গ করি দুই জীবনের। জানি আমি জীবনে জীবনে কোনোদিন মাগো হয় নাকো সঙ্গ কারো, জীবনে মরণে হয় সঙ্গ। মরণ কেবল ধরে জীবনের রূপ। বাকল যখন যায় খুলে, মরণ উঁচায় মুখখানা। সেও এই ফাঁদ ধরে আমারে যে ডাকে, জানি। তবু তারে দেখে নেব, হাতে নেব, নেব দেহে পাঁজরে পাঁজর, ভাটার দীঘল শ্বাস উড়ায়া সুদূরে উজান আনবো মোরা শরীরে শরীর, শঙ্খনদী উছলায়, শঙ্খনদী মাগো এই শরীরের চক্র ধরে নিজেরে জাগায়, আমি যাই, আমি নদী হয়া যাই, শঙ্খনদী আমি হই, বাঁশিওয়ালা নৌকা হয়ে করবে পারাপার। আমারে মা ক্ষমা করো। শুকপঙ্খি আবার আসে বা যদি স্বপ্নেও তোমার, কয়ো মা গো, তার কিসসার ফাঁদ ছিড়্যা আমি ভাসি শঙ্খনদীজলে, সে যেন আইসা দেখে নদীর ওপর জীবনমরণ করে আজব সঙ্গম। নারী বা পুরুষ হয় তারা, পুরুষ বা নারী হয় তারা, শঙ্খ ডোবে শঙ্খ ভাসে, ঝিনুক লুকায়, মুক্তা লুকায় গোপনে, জলে আর জলে খেলে জীবন-মরণ।

: আয় ফিরে আয় মাগো।

: যাও মা, ডেকো না আর। শেষবার দেখে নেব, ক্যামনে বিধির লেখা কাঁটারক্তে লাল হয়ে অঙ্গে অঙ্গে বিঁধে। যাও মাগো যাও…


দ্বিতীয় কথন
(কন্যা ও পুরুষ)


 : এই সেই শঙ্খনদী, শঙ্খের মতন জল ঘুরিয়ে পেচিয়ে ছোটে স্রোতে আর স্রোতে। এইখানে দেখা পাব সেই বাঁশিওয়ালা। বাঁশিতে বাঁশিতে ডাকে আমারে সে নতুন বাসরে। কত মন্ত্র পাঠ কইরা কত যে শোলোকে আমি গিঁট বেঁধে নিয়েছি দোসর, রইল না কেউ, গাঙের তলায় যায়, সাপের ফণায় যায়, কেউ আর রইল না জীবনের আপন বান্ধব, এইবার মন্ত্র আর পাঠ নয় কোনো, এইবার বাঁধিব না সমাজের শাস্ত্রের আচারে, বাঁশিওয়ালা যেমন ডেকেছ তুমি সকলের দূরের ভাষায়, খালি সুর, বনের গাছের পাতায় পাতায় পাখিদের গীতে, মেঘরাঙা মনের কথায়, যে ভাষা পেয়েছ তুমি, সে-ভাষার মতো আমি দাগরেখাশূন্য এক অচিন ভাষায় তোমারে বরণ করে নেব আমার ভিতর। কোথায় আছ গো তুমি, আমি তো এসেছি ফেলে মায়ার শিকল, জননী—জন্মের ভাগী—নাড়িডোরে বেঁধেছিল আপন জঠরে, কী ওমে দিয়েছে তাপ শীতল শরীরে, তারপর যন্ত্রণার নাড়িভুড়ি ছিঁড়ে সে দিয়েছে জন্ম পৃথিবীর মাটিতে আমারে, পিতৃহীন সন্তানের সব দায় বয়ে নিয়ে সে আপন কান্ধে করে জীবনের কত-না লড়াই, নিজে না খেয়ে যে মুখে মোর তুলে দিল অন্ন, নিজের চোখের জলে দিয়েছে করিয়ে স্নান ধুলার শরীর, সেই জননীরে ফেলে এসেছি তোমার কাছে, কারণ আমার জীবনের অনেক অনেক দায় মিটে নাই আজও। মরণ কেন সে আসে আমার সম্মুখে শুধু ষড়যন্ত্র করি মনে কেড়ে নিতে জীবনের প্রেমের দোসর, কেন সে তাহার গ্রাসে টেনে নেয় জীবনের সুখরস সবকিছু, এক এক ছলে কিবা নিঠুর কৌশলে।


কেঁদো নাকো আর, তোমার কান্নার সুর তোমার বাঁশির মতো করুণ গো সখা। আমি তো এসেছি রসে সুরে প্রাণবায়ু খুঁজে নিতে, আমার যে শ্বাসহারা জীবন গো বাঁশিওয়ালা।


কই তুমি কেন এত দেরী? আমি তো এসেছি এইখানে সব টান ছিন্ন করে তোমার সুরের লগে কথা হয়ে মেলাতে নিজেরে। আমার বুকের মধ্যে ধুকপুক বাজে ছন্দ, সেই তালে বান্ধো নয়াগান ওই বাঁশিতে তোমার, কই তুমি বাঁশিওয়ালা…

ওই যে এসেছে ধীরে ধীরে, আহা, রঙ তার শ্যামের মতন, যমুনার তীরে এই কালা বুঝি রাধা-বশ করে তার মোহের বাঁশিতে, সেই কালা, পুড়ে পুড়ে কালো সে শরীরে বড়ো, এ জীবন দহনের জানি, তাই বলে কেন এত পুড়েছ গো তুমি!

: তুমি যে এসেছ বাহিরিয়ে, একা, কই যাবো নিয়ে আমি এখন তোমারে! জীবন আমার নাই। আমার কেবল বাঁশি আছে। এ বাঁশি মরণবাঁশি, জীবনের সুর তার শেখা নাই কোনো।

: কেন তুমি ওমন কথা যে বলো, বুক ফেটে যায়। জীবন আমারে শুধু করে পরিহাস। ছোটবেলা বাপহারা, পাই নাই ভরসার আঙুল গো আমি, কার হাত ধরে যাব দুনিয়ার বাজারে রাস্তায়, চিনব মানুষ আর বুঝব বেসতি, কিছু বুঝি নাই, মাঠেঘাটে কার লগে গিয়ে গিয়ে শিখে নেব জমির হিশাব, মাটির অন্তর কোন সুরে কখন যে কাঁদে, কার সঙ্গে গিয়ে কান পেতে শুনব সে ঠার, মায়ের গতর গেছে ঘামের দামেই বেচে খানিক খানিক, তবু সে গতরে নিয়ে আমার জীবনভার কত কষ্টে করেছে যে পার জীবনের দিন। কিছু আমি পাই নাই। নাও তুমি আমারে এবার। বাঁশিওয়ালা, সেদিন বৈকালে, সখি এক ডেকে ডেকে এনেছিল শঙ্খনদীতীরে, বলেছিল এইখানে পরাণ খুইলা যায়, নদীর জলের মতো, ছলাছল বয়ে যায়, এইখানে মিলিবে আনন্দ, সুখ জীবনের। সেদিন প্রথম তোমার বাঁশির সুর শুনি, তোমারে দেখেছি, তাও দেখি নাই, দূর থেকে, বাঁশি-শেষে মুছেছিলে কপালের ঘাম বড়ো পুরনো গামছায়, তারপর নদীর জলের দিকে তাকিয়েছিলে গো তুমি উদাস উদাস, সেইদিন থেকে আমি করি মনে বাঁশি-সহবাস, আমি তো কপালপোড়া হতভাগী মেয়ে, আমার কি সাধ্য আর চাই মনে অন্য কোনো মানুষেরে করি আপনার। তবু তুমি হেসেছিলে, একবার, সহসা নদীর জলে লাল নীল হলুদ সবুজ রং ঢেউয়ে ঢেউয়ে দুলে ওঠে নানান প্রকার, বলেছিলে—

: আমার তো কিছু নাই আর, আমিও হারানি লোক, হারাতে হারাতে কোনোমতে এ-বাশি পেয়েছি, কাঁচা এ বাঁশের বাঁশি, সাতখানা ছিদ্র করে একদিন মন ভুলে ফু দিতে ফু দিতে দেখি, নদীর জলের ’পরে রং ধরে, ঢেউ কাঁপে, পাড়ে পাড়ে বাতাস দুলিয়া যায় বাতাস নাচিয়া যায়, আমি দেখি কেউ দেখেনিকো, আর তুমি একদিন দেখেছিলে, তোমার সখির সঙ্গে একদা নদীর বালুচরে পা টেনে পা টেনে তুমি মিশেছ আমার কাঁচা বাশিসুরসঙ্গে, আমিও অনাথ, মেয়ে, আমার মা ছিল বলি রাতের নর্তকী, গীতসঙ্গে নৃত্যরঙ্গে মাতিয়েছে রাতের আসর, আহা মাগো, কখন কী ছিদ্রপথে ঢুকে চোর তার শরীরের মানখানি করে চুরি চোখের সামনে সমাজের, কালি মেখে দিল তার নারীপরিচয়ে, সেই কৃষ্ণমেঘছায়ে হিম হওয়া গর্ভে জেনো আমার ঠিকানা ছিল নির্জনে আমি সেই ঘৃণাগর্ভ থেকে একদা এসেছি রক্তক্লেদে মাটির ওপরে, অনাদরে অবহেলাভরে, কেউ তুলে নেয়নিকো প্রথমে আমায়, মায়ায় আপন কোলে, বুকের মমতাওমে ঠাঁই মেলেনিকো, আমার আপন মাতা, আমারে দেখিত ঘৃণাভরে, যেন গলা টিপে মেরে ফেলে, হয়তো বা কত রাতে দুই হাত বাড়িয়েছে আমার গলার দিকে, চেপে ধরে শ্বাসরোধ করবে আমার এক লহমায়।

: না না, প্রিয়, কেন এই কথা বলো, কেন এই অপবাদ দাও জননীরে, জননী সে জন্মদাত্রী, কত কষ্ট যন্ত্রণাতে গর্ভে করে ধারণ সে আপন সন্তানে, বাঁচায়ে রাখে সে নিজ রক্তমাংস দিয়ে, গহিন জঠরে…

: আহা সে জননী, তারে অপবাদ দেই নাকো। জননীর দোষ নাই জানি। দোষ তো এ জন্মের আমার। যে তস্কর বীজ হয়ে ঢুকেছিল মায়ের জমিনে, করেছে গোপনে চাষ—অদ্ভুত ফসল, মানুষ সে ফসলেরে দেখে বমি করে, থুতু ফেলে, বিষ বিষ বলে শুধু পিছু হটে যায়, আহা! প্রলয়বাণের জলে কেন ভেসে গেল না ফসল, কেন কেটে কেটে শেষ করে নি ইঁদুর, অথবা ঝড়ের তোড়ে মাটিতে যায় নি মিশে, সখি। তাও ভালো, একদিন দেখতে হতো না সেই দৃশ্যখানি আর।

: কোন দৃশ্য প্রিয়!

: দেখিলাম, যখন কেবল বুঝি জন্ম কি মরণ, জন্ম হলো সুখের চিৎকার, বেঁচে থাকা নিশ্বাস প্রশ্বাস, হাসি-কান্না, চোখ খোলা, স্বপ্ন দেখা… আর মরণ নিথর হয়ে মাটির মতোই চুপচাপ মাটির ওপর, শ্বাস নাই, প্রাণ নাই, তাপ নাই দেহে, শীতল শীতল সেই অসহ মরণ, যখন কেবলি বুঝি এই সব ফারাক এ দুনিয়ার, তখন একদা, ঝড় বয়, বাজ পড়ে এখানে সেখানে, রূপালি বিজুরিলতা তুলে নেয় গোপনে গাছের প্রাণ, জলে জলে ডুবে যায় সংসারের সাজানো বাগান, পথ দেখা যায়নাকো আন্ধারে আন্ধার, চমকে চমকে ওঠে পথহারা সময় নিজেও, এমন রাত্তিরে, সখি, দেখিলাম সেই, জননী আমার—

: জননী তোমার!

: জননী আমার, সখি, নড়াচড়া নেই, চোখে জ্বলেনিকো তারা, হাত দুটি পড়ে আছে বালির চড়ায়, শরীরের দুইদিকে, পায়ের পাতাও আছে অবশ অসাড়, চুলখানি ভিজে ভিজে লেপ্টে আছে মুখে কানে নাকে, আঁধারে যায় না চেনা প্রথমে সঠিক, খুঁহে খুঁজে গিয়ে দেখি জননী আমার, আমারই সে মা, ভেসে আছে শঙ্খনদীজলে, পা দুখানা বুকে আমি জড়িয়ে নিলাম, কী শীতল, বরফের চাক যেন, বুকে তাও জড়িয়ে নিলাম, মাগো তোর সন্তানের ওমে যদি তাপ পায় শরীর তোমার, জগো মাগো, জাগো, আমি তো তোমার পাশে বসে বসে ঝিমোই শয্যায়, উঠে দেখি তুমি নাই, ঘরে দোরে আঙিনায় কোথাও যে নাই তুমি, এইখানে এসে মাগো পেরেশানে ঘুমায়ে পড়েছ, নিজের সন্তান রেখে দূরে কী আয়েসে তুমি ঘুমায়েছো মাগো…

: কেঁদো নাকো আর, তোমার কান্নার সুর তোমার বাঁশির মতো করুণ গো সখা। আমি তো এসেছি রসে সুরে প্রাণবায়ু খুঁজে নিতে, আমার যে শ্বাসহারা জীবন গো বাঁশিওয়ালা।

: বাঁশিতে কাঁদি যে আমি, সুরে সুরে ঝরে পড়ে অশ্রু আমার, কাকে আমি কিভাবে বাঁচাব! নাই হয়ে আছি এই পৃথিবীতে আমি। নারী আমি দেখি নি জীবনে। কেবল সে মা, একাকিনী মা আমার, তারে আমি দেখেছি নয়নভরে। যদিও সে তাকায় নি আমার নয়নে কোনোদিন। তাকিয়েছে, হয়তো বা আমার ঘুমের মুখপানে, ঘৃণা করে, চোখের পানিতে ভিজে ভিজে। নারীর হৃদয়ে কত ভালোবাসা লীলা করে খেলা করে জানি নাকো আমি, সেদিন কেবল আমি তোমারে দেখেছি, নদীজলে পা ডোবালে আলগোছে, জলের ওপর ঝরে পড়েছিল তোমার মুকুর—হাসির প্রেমের, আমি ভয় পেয়ে ফিরে যেতে তুমি ডেকে ছিলে, ডাকো নাই, হয়তো-বা, বলেছিলে আমারে কি নিবা? কারে আমি কোথায় বা নেব, আমি তো ঠিকানাহীন, ঘর বড়ো হারিয়েছি আগে…

: তোমার আপন পিতা? তার কী-বা হয়েছিল জানি না তো কিছু।

: আমার পিতাকে আমি দেখি নাই এ জীবনে কভু, কবে কোন চাষের মৌসুমে বীজখানি রোপন করেছে এক বেগানা জমিনে, তারপর সে নিষ্ঠুর চলে গেছে আরেক মৌসুমে। খালি আমি পেয়েছি যে তারে কখনো কখনো মায়ের উদাস চোখে, হন্যে হয়ে কখনো কখনো খুঁজত মা তারে, ঘৃণা আর অপমানে, হয়তো ভালোবাসায়, ভালোবাসা বড়ো আহাম্মক, ঘৃণা যারে করে তারে ভেতরে ভেতরে কাছে চায়, কাছে কাছে রেখে রেখে আরও যেন ঘৃণা করতে পারে, সে-ই ভালোবাসা!

: সে-ই ভালোবাসা?

: বোধ হয়।

: তারপর?

: তারপর আসি আমি শঙ্খনদীতীরে। বাঁশের বাগানে ঢুকে বাঁশি আমি তৈয়ার করেছি, সাতখানা ছিদ্র আছে বাঁশিতে আমার। সাত ছিদ্রে সাতটি মরণ, সুরে সুরে মিথ্যা করে বানায় জীবন। আমি তা-ই আকাশে বাতাসে দেই ছড়িয়ে গো সখি, তুমি তাই ভেবেছ আনন্দ।

: আনন্দ, আনন্দ আছে, এ জীবনে এখনো আনন্দ আছে, সখা, যখন ভোরের কালে আধো আলো পৃথিবীর মাটির ওপর ঠিকরিয়ে আসে, যখন নিজের বাসা ছাড়ি পাখি যায় উড়ে তার ঠিকানাবিহীন ঠিকানায়, যখন গোয়ালে গাভী ওলানে ওলানে মায়া মেখে রাখে বাছুরের লাগি, যখন ধানের শীষে বাতাস আসিয়া দোল দেয়, যখন নদীর বুকে ভরা বরষায় নারীর যৌবনসম জোয়ার উছলে পড়ে ফির বারবার, যখন স্বামীর বুকে মাথা রেখে ঘুম যায় বউ, আনন্দ এখনো আছে, সে আনন্দ খুঁজব দুজনে। বাঁশির সুরের মতো ছন্নছাড়া জীবনের শূন্য হাওয়ায় আনন্দের পথ এঁকে এঁকে যাব কোনো আনপথে চলে, শুধু এই আমরা দুজনে—

: আমার উপায় নেই বাঁচার যে আর। মরণ নিয়েছে পিছু, যতদিন বাঁচি তাই সুরে সুরে জীবন সাজাই, শোনো ভালো মতো, অন্তে তার মরণের রাগিনী বিস্তার।

: সখা!

: হ্যা, সে সত্য আমি বলছি তোমাকে। মরণ আমার পিছু পিছু ঘোরে, কুকুরের মতো লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে। পাগলা কুকুর। ভাব ধরে শান্তশিষ্ট সে যে। একদিন ঠিকই দেবে কামড় বসিয়ে।

: কী সব যে কও তুমি, কী হয়েছে তোমার হে সখা!

: শোনো তবে, করেছি মানুষ হত্যা। সেই দায়ে মরণ ধরবে আমাকেও।

: না না! কী সে রঙ্গ করো তুমি আমার সঙ্গে হে সখা!

: হ্যাঁ আমি করেছি হত্যা মানুষ—মানুষ । কী সহজ মানুষের খুন। কী সহজ প্রাণের বিনাশ।

: হায় ভগবান!

: ভগবান পারে নি বাঁচাতে তাকে, আমি তাকে শান্ত হাতে হত্যা করে রাতের আন্ধারে ভাসায়া দিয়েছি এই নদীজলে। যে জলে করেছে গ্রাস মায়েরে আমার, সে জলেই ডোবায়েছি তাকে।

: এই নদীজলে? আহা, কোন পরিহাস, শঙ্খনদীজলে! যে নদীতে ভাসাব করেছি স্থির জীবনের ভেলা আমি তোমার সঙ্গেই।

: যে নদীতে আমার জীবনকাঁটা ছুঁড়েছি চিরকালের জন্য, সে নদীতেই প্রেম খুঁজে ফিরবে আশ্রয়।

: তোমার জীবনকাঁটা?

: একদিন এ নদীর বুকের বজরায় সে মানুষ, ঠিক তারই কণ্ঠ আমি শুনেছি আন্ধারে!

: তোমার সে না দেখা পিতা!

: পিতা নয়, কেবল ঔরস। নিশুতি আসরে চোখে ধাঁধা লাগা ঘোরে, ঔরস যে অভিশপ্ত করে, বীজের অন্যায় দিয়া, বীজের বেঠিক অর্থ দিয়া।

: তারে তুমি তাই বলে হত্যা করলে সখা?


জীবন শঙ্খের মতো ঘোরানো পেঁচানো, সে এক চক্রের মতো, ঘুরে ঘুরে পরিণয় ফিরায়ে ফিরায়ে করে শোধ।


: হ্যাঁ, হত্যা আমি করতে গিয়েছি তারে, করেছিও, সে আমার পিতা নয়। দুনিয়ায় এরকম শত শত পিতা টেনে আনে বীজের চক্রের নানা প্যাঁচ থেকে পরিচয়-হারানো সন্তান। অভিশাপে অভিশাপে দগ্ধ হওয়া কত যে জীবন। যে-জীবনে মায়া নাই, স্নেহ নাই, ভালোবাসা নাই, চোখের ভাষায় খালি কটাক্ষ বিদ্রূপ, কেউ হাত ধরে না আগায়ে, পায়ে পায়ে লাত্থি মারে, কুকুরের লোমের মতোই আলগোছে অবিরল ঝরে যায় জীবনের সব রস কষ, রক্তের ক্ষরণ নামে তুফানে তুফানে শিরা-নালি ধরে, অপমাণ, অভিমান, সখি বুঝি নাকো… জীবনের ছদ্মবেশে রাতের খায়েশে যে অধম মরণ দিয়েছে উপহার চিরতরে এ আমারে, তারে আমি মরণের দায়ে সখি করেছি উদ্ধার, মরণে মরণে কাটাকাটি, সোজা কথা বেশ, শঙ্খনদী তারে পেটে নিল, তখন যে ভরা বর্ষার মৌসুম, ফুঁসে ওঠে বোবা জল দারুণ ওষ্মায়, যেন নিতে চায় একে একে দুষ্টুসব মানুষেরে গ্রাস করি জোয়ারের খলবলানো পেটে, সে-মতন কালে আমি বিজুলি-চমকানো রূপালি রূপালি রাতে তার পেটে ঢুকিয়ে দিয়েছি সেই দেহ, আমারে মরণ দেয়া জীবন্তমরণ দায়ে ভারবওয়া এ জীবন দেয়া সেই দুষ্টু মানুষেরে আমি ঢুকায়েছি নদীগ্রাসে, জলের আড়ালে, রূপালি মায়াবি মরারাতে।

: হায় শঙ্খনদী!

: হায় শঙ্খনদী! জানো তুমি, তার নাম রেখেছি আমিই! শঙ্খের মতন আছে চক্ররীতি তার। খেয়েছে আমার মাকে, তারই গ্রাসে পাঠিয়েছি তাকে, যার বীজ বিষ হয়ে শেষ করে ফেলেছিল মাকে। হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তারে দিয়েছি নতুন পরিচয়। শঙ্খ যে চক্রের মতো, যারে নিল গ্রাসে সে একদা নষ্ট করেছিল কোনো এক নারীর গর্ভের শঙ্খসম দেহটি শিশুর। ভেবে দেখো, শিশু তো মায়ের গর্ভে থাকে এক শঙ্খের মতো পেঁচিয়ে একাকী, সেই গর্ভ অভিশপ্ত করে দিল যে নিষ্ঠুর ইতরমানুষ, তারে খেয়ে নিজে হলো শঙ্খপরিচয় সেই নদী; জীবন শঙ্খের মতো ঘোরানো পেঁচানো, সে এক চক্রের মতো, ঘুরে ঘুরে পরিণয় ফিরায়ে ফিরায়ে করে শোধ। যা তুমি করেছ, তারই শোধ নিতে হবে গুনে।

: আহা !

: এত বেশি ছিল না সহজ তারে পাওয়া। ততদিনে দুনিয়া ভাসিয়া গেছে শত শত অমাবশ্যা আর পূর্ণিমায়। কত যে আন্ধারে গেছে ঢুকে কত রঙিলা মানুষ, আবার জোছনালোকে ভেসে ভেসে উঠেছে সহসা। ভাসা আর ডোবার খেলায় কত মুখ বদলে গেছে এই মানুষের। তারই মধ্যে খুঁজে আমি বের করি তারে! অসম্ভব ছিল যেন পইলা পইলাই।

: তারপর?

: তবু আমি পাগলা কুত্তার মতো ঘুরেছি, একা একা, যখন হয়েছি পেরেশান, বাঁশি বাজিয়েছি, বাঁশির সুরের লগে মিলায়েছি ক্লান্তি শরীরের, তারা হাওয়ায় হাওয়ায় মিহি সুরের সুতোয় উড়ে গেছে শূন্য থেকে শূন্যে।

: তারে কই পেলে?

: পেলাম যে তারে আমি নিশিজলসায়, অথবা কেবল আমারই চেনার লাগি সংসার সাজায়েছে সেই লীলা, যেন সত্যি লীলা এক, যেমনটা দেখি মোরা আসরে আসরে, চিৎকার ভেসে আসে আরেক নারীর, কী যন্ত্রণা! আর্তনাদ। ভেঙেছে নূপুর পায়ে, ঝনঝন ভেঙে যায় চূড়িগুলো হাতে… শরীরের গ্রন্থি সব ভেঙেচুরে যায়, কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে থাকে বাঁচার সকল প্রতিরোধ। আমি সে হাসির স্বর চিনেছি ভেতরে, নারীর কণ্ঠকে মুক্ত করে তার কণ্ঠ রুদ্ধ আমি করেছি দুহাতে, সব শক্তি দিয়ে। গলগল রক্ত ভেসে ওঠে সাঁজোয়া বজরায়। গলগল রক্ত ঝরে শঙ্খনদীজলে।

: কেউ জানে! কেউ কি দেখেছে সে-ঘটনা?

: জানি না কিছুই তার, শুধু জানি, মরণের পিছে পিছে আসে যে মরণ পালে পাল। যে মরণ নিজে আমি রচনা করেছি, তার প্রেত কেন খালি ছাড়বে আমারে!

: হ্যাঁ হ্যাঁ, খুনিরে তো খুঁজবে আইন, খুনের কে করে যে বিচার, খুনি পেলে জগতের হয়, খুন তার কে করে বিচার বুঝে সুঝে।

: জানি নাকো সত্য কী, কোথায় থাকে। শুধু জানি মৃত্যু সত্য নয়, হত্যা দিয়ে হয় নাকো ন্যায়ের বিচার।

: কেন!

: শঙ্খনদী বলেছে আমারে চুপি চুপি, ঢেউয়ে ঢেউয়ে, সখি, —আমার ভেতর যার বেড়ে ওঠা, আমি যার বীজের বিস্তার, তারে আমি কিসে করি খুন! সে কি খুন হয়! সে তো বাঁচে রক্তে-রক্তে মাংসে-মাংসে মজ্জায়-মজ্জায়… কারে আমি খুন করে ভাসিয়েছি জলে! শঙ্খনদী করে পরিহাস।

: হায় ভগবান! জীবন কী নিদারণ অভিশাপ এক। তিন মৃত্যু দিয়া মোরে করেছে পাপিষ্ঠা হতভাগী… ছলনা কৌশল ভরে আজ ফের দাঁড় করাল মরণের চক্রে এক ভীষণ ধাঁধায়।

: তুমি যাও, শুধু আমি বাঁশির সুরের টানে ডেকেছি একথা বলবার, মানুষ জীবনে কোনোদিন পায় নাকো দেখা সত্য শঙ্খনদীতীর, তুমিও পাবে না; তোমার জীবন আমি শুনেছি বুঝেছি, মন এক অন্ধ ঘোড়া, পিঠে যার চাবুক মারিয়া চলে বাসনামনিব, আর ছুটে খালি ছুটে শেষ দেখতে চায়, শেষ কিছু নাই, শেষ বলে যা কিছু জগতে আছে, আগে থেকে শেষ হয়ে আছে, তুমি তার রূপ শুধু উল্টেপাল্টে দেখো।

: প্রিয়তম সখা হে আমার, ভাগ্যাহত জীবনের পরম দোসর, আমি যে এসেছি ফেলে সংসারের সীমানা সকল। আমি যে তোমার লগে এক হয়ে যাব বলে এসেছি এখানে, তোমার বাঁশির সুরে মেশাব নিশ্বাস, সেই সুর থেমে গেলে শ্বাসহীন প্রাণহীন পড়ে র’ব শঙ্খনদীজলে, তুমি আমি, আশা নাই, দেহপ্রাণসঙ্গ করে জীবন চেনার কোনো সাধ নাই, মরাসব সাধস্বপ্ন বুকে জড়ো করে পুড়ে খাক হওয়া এক ভাগ্য শুধু রাখি বাঁধবে আমাদের লগে, এজন্য এসেছি এইখানে। আমারে দিও না তুমি ফিরায়ে, হে সখা।

: যাও তুমি, এই ভুল করো না আবার। আমার কপালে লেখা মরণস্বাক্ষর। কেবল দর্পণ নাই এখনো সম্মুখে, তারে পেলে শান্তিতে মুদবে চোখ সব দেখা শেষে।

: না না সখা, ফিরে আমি যাব না যে আর, বরং বাঁচাব আমি তোমাকে… আমাকে… বাঁচাব বাঁচাব… জীবনে পুরুষ আমি পুরাটা পাই নি টের আমার শিরায়, পাওয়ার আগেই গেছে মৃত্যুর উদরে, তুমিও জীবনে শেষ পুরুষ আমার, যাদের পেয়েছি আগে এ জীবনে আমি, শেষ তারা করতে পারে নি খেলা মরণের লগে, তুমি সে পুরুষ শুধু এক মৃত্যু নিজে দিয়ে নেবার অপেক্ষা করে আছ আর-মৃত্যু নিজে। ভাগ্যের লগেই তুমি করেছ লড়াই বাঁশিওয়ালা। আমি তা চেয়েছি, আমিও তা চাই। তাই দৈব ছল সব মিথ্যা বলি আমি প্রমাণ করিব এইবার তুমি আমি বাঁচিয়াছি ভাগ্যের সকল দায় ছিন্ন করি।

: তুমি ফিরে যাও। শঙ্খনদী ডাকে জানি ভেতরে ভেতরে, যে রক্ত ভাসিয়ে আমি উঠেছি দাঁড়ায়ে, সে রক্ত আমারও ভেতর, আমিও মিশিয়া যাব সেই একই লয়ে ঢেউয়ে, এ আমার পরিণাম জানি।

: আমি আর যাব নাকো ফিরে। ধরেছি তোমার হাত, যাব আমি স্রোতে স্রোতে ভেসে, বেহুলার ভেলার মতন। আমাদের হতভাগ্য প্রাণ জলের ওপরে রূপালি জোছনার মতো যেন ভাসি ভাসি ওঠে।

: যাও ফিরে, যাও।

: যাব নাকো ফিরে। আমারে ফিরায়ো না হে সখা। ধরো হাত। বান্ধো প্রাণে প্রাণ।


তৃতীয় কথন
(কন্যা, পুরুষ ও জননী)


: মরণশমন থেকে বাঁচাব পুরুষ মোর, আছি আমি এইখানে, লয়ে তারে, কতকাল হলো, মানুষের সাথে আর হয়নাকো দেখা, ভুলেছি মায়ের মুখ, আবছায়া আবছায়া, শুধু সে পুরুষ, বাঁশিওয়ালা, সঙ্গে আছে মোর, হাতে তার বাঁশের বাঁশরী, ধরেছে ক্ষয়ের রোগ সে বাঁশিতে তার, সুরও যেন ক্ষয় হয়া গেছে, জনমানুষের চিহ্ন নাই এমন অঞ্চলে লুকায়ে রয়েছি আমি তারে নিয়ে, যেন এ জীবন মোরা কোনোমতে প্রেমে আর সঙ্গকামে পার করে দেই, যেন আর কিছুই না দাঁড়ায় সম্মুখে আসি, যেন নাহি বলে, ‘তোমার তা অধিকারে নয়, তুমি শুধু বিচ্ছেদের দায় নিয়ে এসেছ জগতে’, তাই আমি আমার অর্ধেক দিয়ে তার দেহে তার অঙ্গে তারও আধাখানি নিয়েছি নিজের করে, আধায় আধায় চুপি হয়েছে মিলন, এই বড়ো সাধের আড়ালে, কেউ নাই, আমরা দুজন। বাঁশিওয়ালা ভয় নাই আর, বাজাও না বাঁশি একবার, ক্ষয়ের বাঁশিতে যেন নতুন প্রাণের সুর বেজে ওঠে, শুনি!

: (নীরবতা)

: হার তুমি মেনে আছ জয়ের পরই, এ কেমন জয়ের নেশা গো সখা। হত্যা করে বিষকেউটেরে, তারপর থেকে তুমি মাথায় নিয়েছ মেনে মরণের ভার!

: (নীরবতা)


আমাদের মিলনেও বয়ে যাবে মোহনা রক্তের, অশ্রুর, প্রেমের… ওঠো তুমি, নেমে আসে অন্ধকার ধীরে, প্রেমের তুফান ফের আজ উঠবে বালির শয্যায়!


: সবকিছু পরিত্যাগ করে ফেলে টান মমতা অপার, ফেলে জননীর ডাক, সকল দৈবের বিধিবাণী, আমি তো এসেছি তোমাসনে, এইখানে, কত পথ পেরিয়ে এসেছি, ওড়ে ধূলি, মাতে হাওয়া, ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেল কত, বানে বানে একাকার পথ, সাঁতরে সাঁতরে তবু দুইজনে মরণের শমন পেরিয়ে এসে এইখানে বেঁচেছি হে সেখা, দেহে ছিল ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুইজনে নিবৃত্ত করেছি, নিশিভর শরীরের চাক ভেঙে ভেঙে মধু নিয়ে দুই হাতে মেখেছি গলেছি পরস্পর, সঙ্গ আমি প্রাণভরে পেয়েছি প্রথম, জন্মের অভিশাপের হাত ছিন্ন করে নিয়ে গেছে এ দেহের এ প্রাণের সঙ্গের দোসর, আধফোটা কামপুষ্প খসে গেছে পাপড়ি সমেত সংসারের বাগানে বাগান, শুধু তুমি, শুধু সখা তোমারে পেয়েছি আমি, এ প্রথম দীর্ঘকাল, শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরশন লেখে ভাষা হাজার হাজার, পরশনে পরশনে মায়ের বিলাপ কিবা দৈবের বচন, জন্ম-অভিশাপ সব ভেঙে দিছি শিৎকারে চিৎকারে চেয়েছি তো আমি, আমি যে বেহুলা নই, সখা, তুমি নও কৃষ্ণ, কর্মের দায়ের কথা তুলে বাঁশি ফেলে অ-সুর চলিয়া যাও একা মথুরায়, তুমি কৃষ্ণ নও সখা, রাধারে বিরহে ফেলে অপার্থিব কর্মভার তুলে নিয়ে চলে যাও ফিরে চিরতরে, তোমার বাঁশিতে খালি অপার পরম প্রেম দোলে নাকো সখা, তোমার বাঁশির সুরে রক্তে আর মাংসে ফোটে ফুল, মাটি আর আঁশটে ঘ্রাণ সে-ফুলে ছড়ায়, সে-ফুলে বাাঁচার এক লড়াইয়ের তাকত জড়িয়ে আছে সখা, আমিও বেহুলা নই, নও কৃষ্ণ তুমি, তুমি যাও নাই ফেলে আমাকে বিরহে ঠেলে অসহায় অবহেলা-ছাওয়া বৃন্দাবনে।

: (নীরবতা)

: আহা, দেহে বল নাই। খাবার পাও নি কত বেলা, জলও নাই চারিধারে, সব যেন নিমেষে শুকায়, তাই কণ্ঠে ভাষা নাই, মুখে নাই কথা, ঘুমায়ে রয়েছ দিনমান, মরণের শমন পড়েছে তোমা ’পরে, মানুষের সমাজে হে সখা ক্যামনে যাই কও, তবু কাঁচা লতা-পাতা, বরিষার জল তাই খেয়ে পার মোরা করেছি অনেক কাল, তবু বাঁশি ধরে নাও হাতে, রেখেছি তোমারে আধাচাপা দিয়ে ওই বালির ওপর, কে যেন দূর থেকে না দেখে নির্জনে সে-পুরুষ, হন্তারক, তুমি আছ বালির ভেতর আধাখানি ডুবে, কষ্ট হয়, তবু নিশিকালে সেই আকাঙ্ক্ষায় যখন শীতল দিন, আমরা জড়িয়ে ধরি পরস্পরে, চুমু খাই, অঙ্গে অঙ্গে বেঁচে উঠি নতুন উত্তাপে। ধৈর্য ধরো সখা, পতি, পরাণ আমার, রাত্রি হলে বালির ভিতর থেকে উঠে এসে ঘুমাবে আমার মধুবালির ভেতর। একটু সবুর করো সখা।

: (নীরবতা)

: কথা কও তুমি। বোবা আর থাকিও না সখা। বেলা যায়, সন্ধ্যা হয়ে আসে। আর একটুক্ষণ গেলে আমরা আবার জেগে উঠব সর্বঅঙ্গ নিয়ে। নদী আর সাগরের মিলনে যেমন হয় জলের মোহনা, আমাদের মিলনেও বয়ে যাবে মোহনা রক্তের, অশ্রুর, প্রেমের… ওঠো তুমি, নেমে আসে অন্ধকার ধীরে, প্রেমের তুফান ফের আজ উঠবে বালির শয্যায়!

: (নীরবতা)

: ঘুমাও ঘুমাও সখা, ক্ষুধায় তৃষ্ণায় জানি কত্ত পেরেশান। এ জীবন যাতনার দায়। তবু ভাবি, আহা, তোমারে বাঁচিয়ে আমি এনেছি মৃত্যুর হাত থেকে; শুধু কি তোমারে? আমারেও কামনার বাসনার প্রেমের মৃত্যুর ফের-ফের দায় থেকে বাঁচায়েছি আমি। শত ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে তবে এসেছি এখানে। ঘুমাও ঘুমাও! ফের কে সে ফিসফিস করে? কী সে বলে নদীপাড়ে, হাওয়ায় হাওয়ায়? কোন ষড়যন্ত্র করে শুরু!

: শঙ্খনদী বলেছে আমারে চুপি চুপি, ঢেউয়ে ঢেউয়ে। সখি—আমার ভেতর যার বেড়ে ওঠা, আমি যার বীজের বিস্তার, তারে আমি কিসে করি খুন! সে কি খুন হয়? সে তো বাঁচে রক্তে-রক্তে মাংসে-মাংসে মজ্জায়-মজ্জায়… কারে আমি খুন করে ভাসিয়েছি জলে! শঙ্খনদী করে পরিহাস।

: পরিহাস মনে আর রেখ নাকো, সখা। তুমি শুদ্ধ, তুমি নিজে অপরক্ত দিয়া হাত করেছ পবিত্র। কেন মিছে পাপের সে দায় নিতে চাও। ঘুমাও ঘুমাও।

: শঙ্খনদী বলেছে আমারে চুপি চুপি, ঢেউয়ে ঢেউয়ে। সখি—আমার ভেতর যার বেড়ে ওঠা, আমি যার বীজের বিস্তার, তারে আমি কিসে করি খুন! সে কি খুন হয়? সে তো বাঁচে রক্তে-রক্তে মাংসে-মাংসে মজ্জায়-মজ্জায়… কারে আমি খুন করে ভাসিয়েছি জলে! শঙ্খনদী করে পরিহাস।

: পরিহাস কানে তুমি নিও না গো সখা। এই আমি, অভাগিনী, জীবনে পাই নি পরিণয়, পরিণয় মুহূর্তের হাসিরঙ্গ করে শেষে বিচ্ছেদের ছুরির তলায় বিদ্ধ হয়ে মরে, দুই দুইবার, তৃতীয় এবং শেষ, এ আমার অন্তিম পরীক্ষা জীবনের, এবার আমার পরিণয় চিরতরে আমরণ বাঁধিবে তোমার সঙ্গে দেহে-দেহে অঙ্গে-অঙ্গে পরাণে পরাণ, ঘুমাও ঘুমাও। রাত হলে আমি এসে জাগাব তোমাকে। শরীর ছড়িয়ে যাবে শরীরের কণায় কণায়।

: শঙ্খনদী বলেছে আমারে চুপি চুপি, ঢেউয়ে ঢেউয়ে। সখি—আমার ভেতর যার বেড়ে ওঠা, আমি যার বীজের বিস্তার, তারে আমি কিসে করি খুন! সে কি খুন হয়? সে তো বাঁচে রক্তে-রক্তে মাংসে-মাংসে মজ্জায়-মজ্জায়… কারে আমি খুন করে ভাসিয়েছি জলে! শঙ্খনদী করে পরিহাস।

: বুঝেছি ও নদীপাড়ে হাওয়ার চক্রান্ত! তোমার মনের যত কুচিন্তা তাতিয়ে দেয়… ও তুমি শোনো না সখা, ঘুমাও ঘুমাও। হা ঈশ্বর! একি দেখি আমি! অন্ধ তুমি করো নাই কেন? কেন তুমি বাঁচিয়ে রেখেছ এ নয়ন! এই দেখিবারে! এ কী দেখি! হা নিষ্ঠুর! হা পুরুষসখা, যে বাঁশি বাজাতে প্রাণের সুরে, রক্তে রক্তে দুলে ওঠা জীবনের ক্ষোভে অভিমানে, সে বাঁশি—ছুরি তো নয়—তবু ছুরি আজ, বসিয়েছ ঠিক ওই হৃদয়ের পর’! রক্তে ভাসে সাতছিদ্র জাদুবাঁশি ওই! এ কী মরণের রূপ, সখা হে আমার, প্রেমের বাঁশিকে তুমি আত্মঘাতী করেছ নিষ্ঠুর হাতিয়ার। বাঁশিওয়ালা, মরণবিজয়ী শেষ পরিণয়-পুরুষ আমার! তুমি কই, কোথায় হে সখা, বাঁচাতে না পারলাম তোমাকেও শেষে, পরিণয় ফের বিচ্ছেদের ছুরির তলায় রক্তে রক্তে ভেসে গেল এই নিরালায়, একা একা। হা রে হতভাগী!

তবে আর কেন! আর কেন তৃষ্ণা জীবনের, কিসের বাসনাক্ষুৃধা দেহে মনে জাগে! থরে থরে কাটা মাংস ঝুলে দাঁতে মুখে; নখে নখে মাংস রক্ত, হাড্ডি; চোখ দুটো নখে গাঁথা হও; রক্তে ভাসো বালুচর; আপন হাতের নখে দাঁতে আপন মাংস-রক্ত খুবলে খুবলে দেব যে মাখিয়ে। আহ্ শান্তি! এবার অপার শান্তি! অন্ধ করে দাও হে ঈশ্বর! নিজেরে খেয়েছি আমি, কী ঘৃণায়! এ কেমন ক্ষুধা! এ কেমন পিপাসা আমার! নিজেরে করছি পান কণা কণা, টুকরো টুকরো, ফোঁটা ফোঁটা… নিজেরে যে খাচ্ছি আজ, মাগো! আমার তিয়াস ক্ষুধা, আমার বাসনা যত বন্দি হলো মৃত্যুডোরে এই শেষবার, আমার আপন হাতে, আমার আপন নখে-দাঁতে, আমার আপন পানে, আমার আপন গ্রাসে, কণা কণা ফোঁটা ফোঁটা আমার তিয়াস ক্ষুধা, আমার বাসনা যত বন্দি হলো মৃত্যুডোরে এই শেষবার…

(মা) : আনন্দী, আনন্দী সোনা মানিক আমার, দূর থিকা কণ্ঠ শুনি চিনছি সঠিক, ওরে মুখপুড়ি, মা যে আমি তোর, যে-মূলে দাঁড়ায় গাছ, তার থিকা দূরে গিয়া ক্যামনে সে বৃক্ষ করে জীবন বিস্তার, রে পাগলী, যে-গর্ভে ধরেছি তোরে, দশবছরের নাড়িডোরে বান্ধিছ আকুল মমতায়, ক্যামনে করিবি ছিন্ন তার টান পলায়া কোথায়, ঠিকই তোর পদছাপ চিন্যা চিন্যা হাওয়ায় হাওয়ায় তোর গন্ধ শুঁইকা শুঁইকা শত ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়া কোনো মতে শ্বাসখানি প্রাণে ধইরা পাইছি তোর ঠিকানা রে সোনা, মায়ের বুকের ধন, অভাগী আমার, আয় সোনা, মায়ের এ বুকে আয়, খা খা করে বুকখানি, কবে যে বুকের ওমে শুয়েছিলি শেষবার, মনে নাই, আকাশে ঘনায়া আসে ঝড়, বিজুলি চমকায়, আয় মা পরাণে মোর, চুপ ক্যান চায়া চায়া দেখিস আমারে, মায়েরে কী ভয়, মায়েরে কী লাগে তোর অচিন অপরিচয়, বোকা, আয় বুকে আয়… হায়! মা রে! হা ঈশ্বর! এ কে! এ কোন আনন্দী দাঁড়ায়েছে! ছিঁড়া হাত ছিঁড়া মুখ, নখে নখে মাংস-রক্ত ঝুইলা আছে, ওকি! হা পাষাণী, করেছিস কী তুই রাক্ষসী! নিজেরে নিজেই খেয়েছিস! হা আনন্দী, হা পাষাণী, হা পরাণমানিক আমার…

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com