হোম নাটক কাকে বলে থিয়েটার

কাকে বলে থিয়েটার

কাকে বলে থিয়েটার
90
0

[১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, গারসিয়া লোরকা’র ‘ইয়েরমা’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। উপস্থিত দর্শক, নাট্যবোদ্ধা সকলেই সেদিন একমত হন যে, লোরকা’র এই নাটকটি স্পেনের নাট্যমঞ্চে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করল। রাতে, ইয়েরমা’র শো শেষে থিয়েটার সম্পর্কে তার চিন্তা ও স্বপ্নের এক ধারাভাষ্য দেন, গারসিয়া লোরকা। তার সেই বক্তৃতাটি হিস্পানি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ক্রিস্টোফার মোরের। অনূদিত হয়েছে মোরেরের সম্পাদনা ও অনুবাদে গারসিয়া লোরকা’র গদ্য সংগ্রহ ‘গভীর গান ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ থেকে।]


প্রিয় বন্ধুগণ,
কিছুক্ষণ আগে আমি একটি কঠিন প্রতিজ্ঞা করেছি। সকল প্রকার ভোজ, বক্তৃতাদানরত অবস্থায় ভূরিভোজন আর আমার সুহৃদ বন্ধুদের দেওয়া স্বজন সমাবেশের আয়োজনকে অত্যন্ত কঠিনভাবেই প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ, প্রথমত আমি উপলব্ধি করেছি যে, এ ধরনের আয়োজনগুলো অন্য আরেকজনের সাহিত্যিক সমাধির উপর আরও কিছু ইট তুলে দেয়! দ্বিতীয়ত, একজনের কথা শুনে অন্য যে কেউ খুব বেশি নিরাশ হতে পারে। একজনের বলা কথা-তে সমাবেশের মুহূর্তগুলো বিষণ্ণ হয়ে উঠতে পারে, যদিও বক্তা খুব আন্তরিক থাকেন আর সকলেই তার কথায় করতালি দেন।


থিয়েটার হলো একটি দেশের মনন-বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।


তারচেয়েও বড় আর গোপন কথাটি, যা আমি বিশ্বাস করি—লোমওয়ালা ভেড়ার চামড়ার পোশাক আর ভূরিভোজ হলো এক ধরনের অভিশাপ, শয়তানের দৃষ্টি। যে-মানুষটি সবাইকে অভ্যর্থনা জানালেন, তার জন্য এই লোমওয়ালা পোশাক আর শয়তানের সম্মোহন এক অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি করে; যা আসে সেইসব উদাসীন বন্ধুদের কাছ থেকে, যারা ভাবেন—যাক, অবশেষে আমরা তার বক্তৃতা শুনছি।

বক্তৃতা উপলক্ষে আয়োজিত ভূরিভোজ হলো পেশাদার লোকজনের এক সমাবেশ, যেখানে আমরা একসঙ্গে খাবার খাব। যারা আমাদের সঙ্গে খেতে বসবেন… এটা আসলে ঝামেলার ব্যাপার, বিচিত্র প্রকৃতির লোকের রকমারি সমাবেশ, যারা—তাদের জীবনে আমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে খুব অল্পই শ্রদ্ধা থাকে।

আর, প্রশংসাজ্ঞাপক ভোজসভার চেয়ে আমি যদি নিজেই, কবি আর নাট্যকারদের নিয়ে একটি সভার আয়োজন করি, তখন নানান সমস্যার সম্মুখীন হবো। আমাকে আক্রমণের শিকার হতে হবে—দেখি কী করতে পার; আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে তোমার একটি চরিত্রও নিজের ভিতর দিয়ে সমুদ্রের যন্ত্রণাকে প্রকাশ করতে পারবে না; আমি খুব সাহস করেই বলছি সৈনিকের হতাশার কথা, যে নিজেই ছিল যুদ্ধের বিরুদ্ধে। চাহিদা, লড়াই, ভালোবাসার গভীরতা; একসঙ্গে মিলে একজন শিল্পীর আত্মাকে বিক্ষুব্ধ করে। আত্মাকে যেন নতুন গড়নে তৈরি করে। সহজলব্ধ খ্যাতি আর গুণকীর্তন তাকে তরল করে দেয় এবং একসময় ধ্বংস করে, থিয়েটার যদিও উপচে পড়ে উষ্ণ-উদ্যানের গোলাপশোভিত মুকুটপরা অজস্র মেকি মোহিনী নারীতে। দর্শকরা করাত দিয়ে কেটে ফেলা তাদের হৃদয়ের গুঁড়ো দিয়ে করতালি বাজায়, কিছু মিথ্যা সংলাপে মত্ত হয়। নাট্যকার-কবিকে অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না (যদি তিনি নিজেকে বিস্মরণ কিংবা অচেতন অবস্থা থেকে রক্ষা করতে চান) সেই পাথরভূমির কথা। পাথর গড়িয়ে নামছে নিচে, পিচ্ছিল… জমির মানুষ পাথর খুঁড়তে খুঁড়তে ক্ষত-বিক্ষত। রহস্যময় এক ব্যাধের কারণে আহত সেই পায়রাটিকে কখনোই ভুলে যাবেন না। পায়রাটি ধীরে ধীরে মরছে শরের আঘাতে। কেউই তার যন্ত্রণায় ফোঁপানো কান্না শুনতে পাচ্ছে না!

গোলাপের মুকুটপরা নারীদের চলে যাওয়া, শুভেচ্ছা, অভিনন্দন আর সব মিথ্যা কণ্ঠস্বরের ভিতর দিয়ে ইয়েরমা’র প্রথম প্রকাশ্য প্রদর্শনীর পর, প্রশংসাজ্ঞাপক নৈশভোজ আমি মনেপ্রাণে প্রত্যাখ্যান করছি। তবে নাট্যকার হিশাবে আমার এই বৃত্তি গ্রহণের ব্যাপারটাকে মনে করছি সুখের এক মহত্তম অনুভব। কারণ, আমি এটাই দেখেছি যে, মাদ্রিদের প্রখ্যাত থিয়েটার-পরিবার মারগারিতা জিরগু (তিনি এমন একজন অভিনয় শিল্পী, যার আছে শুচিশুদ্ধ শিল্পিত অতীত, স্পেনের মঞ্চের এক জ্যোতিষ্ক; প্রধান চরিত্রের একজন দক্ষ কলাকার) এবং তার কোম্পানি এক তাৎপর্যপূর্ণ অভিনয়কলা প্রদর্শন করেছেন।

থিয়েটারে, যতটা কৌতূহলের সাংকেতিক লক্ষণ আর আগ্রহ আমি এখানে দেখেছি, তাতে সকলকেই বিনীত আর আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আজকের রাতে এই যে এখানে আমি বলছি, তা কোনো নাট্যকারকে নয়, কবিকে নয়, এমনকি মানবজীবনের বিচিত্র প্যানারোমা শিখতে আসা কোনো শিক্ষানবিশকেও বলছি না, তবে, হ্যাঁ, সামাজিক ক্রিয়াকলাপের অংশ হিশাবে প্রবল উৎসাহী থিয়েটার কর্মীদের, নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের কাছেই চাইছি আমার কথাগুলোকে পৌঁছে দিতে।

থিয়েটার হলো একটি দেশের মনন-বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। অস্বীকৃতিকে, প্রত্যাখ্যানকে পরিমাপ করার এক ব্যারোমিটার। একটি সংবেদনশীল থিয়েটার সমস্ত কিছুর সঙ্গেই যেন সম্পর্কবন্ধন করতে পারে—ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে যতটুকু বিচিত্রতা তার আছে। কিভাবে মাত্র কয়েকটি বছরের ব্যবধানে একজন ব্যক্তির সংবেদনশীলতা বদলে যায়, যখন এক অবক্ষয়ী থিয়েটার পশুর খুরের মতো জায়গা করে নেয় পাখির ডানাকে সরিয়ে দিয়ে আর পুরো জাতিকে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়!

থিয়েটার হলো হাসি আর বিলাপের এক পাঠশালা। এক উন্মুক্ত আদালত। মানুষ যেখানে তার অতীতের কীর্তিকে ঘটনাবলীর ভিতর দিয়ে দেখে দেখে পুনর্বিচার করে আর তার হৃদয়ের চিরন্তন মূল্যবোধগুলোকে প্রকাশ করবার জন্য, ব্যাখ্যা করবার জন্য আজকের দিনের উদাহরণগুলোকে ব্যবহার করে।


বাণিজ্যিক প্রমোটারদের হাতে বন্দি নাট্যকার আর অভিনয়-শিল্পীরা


মানুষ যখন তার নিজস্ব থিয়েটারকে সযত্নে লালন করে না, বিকাশে সহায়তা করে না ঠিক তখনই থিয়েটার মরতে শুরু করে কিংবা বলা যায় যে, সে মৃত। তখন তার সামাজিক আর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীকে, তার মানুষের জীবনের নাটকীয়তাকে, তাদের উল্লাস আর কান্নাকে, তাদের চেতনা আর মননভূমি, ল্যান্ডস্কেপের প্রকৃত রূপকে ধরতে থিয়েটার ব্যর্থ হয়। আর তাই, তাকে আর থিয়েটার বলবার কোনো অধিকার থাকে না। তাকে বরং জুয়াঘর কিংবা ‘সময় নষ্ট করবার’ ভয়ানক ব্যবসা বলা যায়। আমি এখানে নির্দিষ্ট কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছি না। কাউকে সামান্য আঘাতও করতে চাচ্ছি না। আমি আমাদের এই সময়কার জাজ্বল্যমান জীবন বাস্তবতা নিয়েও কথা বলছি না, কথা বলছি আমাদের অতীতের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিয়ে।

প্রিয় বন্ধুরা, প্রতিদিনই আমি থিয়েটারের নানান সংকটের কথা শুনছি আর ভাবছি যে সমস্যা বা অসুস্থতা যদি বলি তাহলে প্রথমেই আমাদের চোখের পরিচর্যা করতে হবে। সমস্যাগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে। এটা আসলে অতিক্রান্ত হতে থাকা অসুস্থতা নয়, কুশীলবদের কাজের ত্রুটি নয়,—এ হচ্ছে সংগঠিতকরণের বা সংগঠনের এক মৌলিক রোগ। বাণিজ্যিক প্রমোটারদের হাতে বন্দি নাট্যকার আর অভিনয়-শিল্পীরা যতদিন যেকোনোরকমের শর্ত ও অঙ্গীকার থেকে বের হতে না পারবেন, নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে না পারবেন, ততদিন লেখক, শিল্পী আর পুরো থিয়েটারের দল একটু একটু করে ডুবতে থাকবে। প্রতিদিন। পরিত্রাণ কিংবা পাপমোচনের আর কোনো উপায় থাকবে না!

অত্যন্ত স্থূল আর খুব মজাদার প্রহসন, সমসাময়িক ঘটনাভিত্তিক গীতি-নৃত্যনাট্য থেকে শুরু করে এ-ধারার আরও যা কিছু আছে; তার সবকিছুকেই খুব আগ্রহ আর আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করছি। মনে হচ্ছে এরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে, টিকে থাকতেও পারবে। কিন্তু যে-থিয়েটারের মূল হবে কাব্য, ঐতিহাসিক ঘটনাবলী কিংবা তথাকথিত চরম কমেডি আর সেই জমকালো হিস্পানি যারযুয়েলা (ক্ষুদে গীতিনাট্য), তা যেন দিনে দিনে খালি পেছনের দিকেই যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘরানাগুলো দাবি করছে সত্যিকারের প্রবর্তনা, পরিবর্তন, নূতন রীতি; কর্তৃত্ব আর ত্যাগস্বীকারের চেতনাশক্তিকেই দরকার সেই দর্শককূলের উপর আরোপ করা, যারা খুব অনুগত, যারা একেবারে নিষ্প্রাণ। তাদের সামনে অস্বীকারকে, বিরুদ্ধমতকে তুলে ধরতে হবে আর আঘাতের পর আঘাত করতে হবে। অর্থাৎ থিয়েটারকে দর্শকদের উপর চাপিয়ে দেয়া, দর্শককে থিয়েটারের উপর নয়। আর এই কাজ করতে গিয়ে রচয়িতা আর অভিনেতাকে নিজের রক্ত পানি করতে হবে। থিয়েটার দেখতে-আসা লোকদের মনে করতে হবে তারা সবাই স্কুলপড়ুয়া শিশু। তারা শ্রদ্ধা করবে কঠোরতা আর অনমনীয়তাকে, নীতিপরায়ণ স্কুলশিক্ষক যিনি ছাত্রদের কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সবক দেন; কিন্তু কার্যত তারা এসব কিছুই করেন না, তারা নিষ্ঠুর সুচ ফুটিয়ে দেন আসনগুলোর উপরে। তাদের আত্মা খালি তোষামোদ করে, তারা তাই কিছুই শেখাতে পারেন না, এমনকি অন্য কাউকেও শিখাতে দেন না।

জনগণকে—দেখুন, আমি কিন্তু কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষকে বোঝাচ্ছি না, আমি বলছি যে—জনগণকে, বোঝানো যাবে। আমি জানি তারা আগ্রহী। তারা আসলে জনগণ! বেশ কয়েকবছর আগে, দেবুসি আর রেবেলকে নিয়ে তাদের অবজ্ঞা সম্পর্কে আমি জেনেছি আর এটাও জেনেছি যে, বেশ কয়েক বছর পর, সাধারণ দর্শকরা এই দু-জনের কাজকে খুব আগ্রহ নিয়েই দেখেছে আর তুমুল করতালিতে মুখর হয়েছে। এই দুজন রচয়িতা তাদের সূক্ষ্ম সচেতনতা দিয়ে, প্রভাববিস্তারি ক্ষমতা দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। এখন যেমন জার্মানিতে উইডকিন্ড, ইতালিতে পিরান্দেল্ল; এবং আরও অনেকে।

থিয়েটারের উন্নতির জন্য, তার রূপদান, ব্যাখ্যাদান, চমৎকারিত্ব আর স্তরবিন্যাসের জন্য আমাদেরকে কাজ করতে হবে। এজন্য আমাদের অবশ্যই উঠে দাঁড়াবার একটি মহত্তম ভঙ্গি বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই আত্মবিশ্বাস, যাতে একাধিকবার আমাদের অভিনয়কলা পুরস্কৃত হয়। আবার অন্যভাবে বললে, অন্যদিক থেকে দেখলে, দৃশ্যের অন্তরালে থেকে উত্তেজিত করা আর সমস্ত অলীক কল্পনাকে মেরে ফেলা, আর ইমাজিনেশন, আর থিয়েটারের মর্যাদা প্রদান—সব সময়, সব সময়েই তা শিল্প। নিখাদ শিল্প। অভিজাত শিল্প হিশাবে যা সব সময়েই চলমান থাকতে চেয়েছে। তবে, একটি সময়ে এমনও হয়েছে, যখন এই শিল্পকে, তার পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে খুব সস্তা করে ফেলা হয়েছিল, তার কাব্যকে ধ্বংস করা হয়েছিল, মঞ্চ যেন শুধুই এক মঞ্চ, যা ইচ্ছা তা-ই করার মঞ্চ—এই সবই হয়েছিল শিল্প শব্দটিকে প্রয়োগ করার মাধ্যমে, যা কিনা সকলের কাছেই সুখের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, আমোদের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়; সকলের কাছে ভালো লাগার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়!


থিয়েটারের জন্য আপনাদের মতো আমিও সেই একই ভালোবাসায় দগ্ধ হচ্ছি; আমাকে আপনারা এখানেই খুঁজে পাবেন।


হ্যাঁ, থিয়েটার অবশ্যই, পরমভাবেই মহাপ্রাণ শিল্প, আর আপনারা—প্রিয় অভিনয় শিল্পীরা, আপনারা সকলেই, প্রত্যেকেই শিল্পী। পুরদস্তুর শিল্পী। আপনারা পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিল্পী। শিল্পী না হলে কেন শুধু শুধু যন্ত্রণাকাতর হয়ে জেগে উঠবেন? কৃত্রিম আর চতুর এই পৃথিবীতে নিজেকে মঞ্চে তুলে ধরবেন? পেশাগত দিক থেকেও আপনারা শিল্পী আর আপনাদের সমস্ত বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাতেও শিল্পী। ‘শিল্প’ শব্দটিকে অডিটোরিয়াম আর সাজঘরের ভিতরে লিখিত হওয়া উচিত। কিন্তু তার আগেই আমরা ‘ব্যবসা’ শব্দটিকে লিখে ফেলেছি; আরও কিছু শব্দ আছে যা বলতে এখন সাহস পাচ্ছি না! শিল্পের সঙ্গে থাকতে হবে—শৃঙ্খলা, স্তরবিন্যাস, আত্মত্যাগ আর ভালোবাসা।

আমার সারাটা জীবন দিয়ে হলেও, যতদিন বেঁচে আছি, প্রিয় অভিনেতাগণ, আমার আশা যে আপনারা আমার সঙ্গে থাকবেন, এবং আমিও থাকব আপনাদের সঙ্গে। থিয়েটারের জন্য আপনাদের মতো আমিও সেই একই ভালোবাসায় দগ্ধ হচ্ছি; আমাকে আপনারা এখানেই খুঁজে পাবেন। আমাদের সেই শিল্পিত উন্মাদনা, যার জন্য আমরা কাজের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে আছি—একটি মঞ্চ। যে-মঞ্চ আপনাদের ত্যাগের মধ্য দিয়ে দিনে দিনে ভালো থেকে আরও উৎকর্ষের দিকে যাবে, সেই মঞ্চের মুক্তির জন্য আমি লড়াই চালিয়ে যাব। এই লড়াই আমাকে হয়তো রক্ষা করবে, কিংবা হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করবে মিথ্যা বিবৃতি, অভিশংসন, ভয় প্রদর্শন এবং শেষে ভয়ানক সানবেনিতো পরিয়ে আমার দেহটাকে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। আমি হয়তো সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিব চাষিদের মতো প্রবল অট্টহাসিতে, যে-হাসিকে এখন আমি আমার ভিতরে লুকিয়ে রেখেছি, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য।

আসলে আমি এখানে কাউকেই কিছু শিখাতে চাইছি না। এই হলাম আমি, যাকে আপনারা নিজেদের একজন বলে গ্রহণ করবেন। আমার বলা কথাগুলো প্রবল উৎসাহ থেকেই নিবেদিত হচ্ছে। আত্মবিশ্বাস থেকে নিবেদিত হচ্ছে। না, আমি স্বপ্নদর্শী নই, নই কল্পনাবিলাসী। আমি যা বিশ্বাস করি তা-ই গভীরভাবে চিন্তা করি। ধীর শান্ত হয়ে সেই বিশ্বাসের পথ ধরেই হাঁটি। একজন খাঁটি আন্দালুসিয়ানের মতোই আমি শান্ত, ধীর; স্থির হয়ে থাকবার গোপন মন্ত্র আমার জানা আছে, কেননা বহু প্রাচীন রক্তের আমি বাহক। আমি খুব ভালো করেই জানি যে, ‘সত্য’ সেই মানুষটির সঙ্গে নেই, যে-মানুষ আগুনের পাশে বসে তার রুটিটিকে খেয়ে ফেলেছে আর তারপর চিৎকার করছে—’আজ’, ‘আজ’, ‘আজ’; সত্য সেই মানুষটির সঙ্গে আছে, সে এমন একজন মানুষ যে খুব প্রশান্ত মনে দেখেছে দূরবর্তী আলোর প্রথম রশ্মিটিকে যা ময়দানে প্রতিভাত হয়েছে! আর আমি জানি, ডানপাশের এই যে মানুষগুলো, শুধু তারাই আসল নয়, যারা টিকিটঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে দ্রুত তাকাচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে—’এখন’, ‘এখন’, ‘এখন’; আসল মানুষ আসলে তারাই, যারা আগামীকালের কথা ভাবছে, আর এই বোধে স্থির হয়েছে যে একটা নতুন জীবন খুব শীঘ্রই এই পৃথিবীতে ডানামেলা একটা পাখির মতো উড়ে উড়ে নেমে আসতে থাকবে!

এমদাদ রহমান

গল্পকার ও অনুবাদক
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; বাদেসোনাপুর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল স্টাডিস অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প [গল্প, চৈতন্য, ২০১৪]

ই-মেইল : emdadrahman777@gmail.com

Latest posts by এমদাদ রহমান (see all)