হোম চিত্রকলা শেষ পর্যন্ত শিল্পী, যবনিকায় পিকাসো

শেষ পর্যন্ত শিল্পী, যবনিকায় পিকাসো

শেষ পর্যন্ত শিল্পী, যবনিকায় পিকাসো
413
0

‘জীবনে যদি তুমি দেওয়াল লক্ষ্য করে একটা বলকে ছোঁড় এবং ভাবো যে বলটা তোমার কাছে ফিরে আসবে, তবে ভুল করবে। তুমি যে বন্ধুদের দেওয়াল ভেবে বলটা ছুঁড়ছ, হতে পারে তারা ভেজা চাদর। সেই ক্ষেত্রে বলটা আর কিছুতেই তোমার কাছে ফেরত আসবে না।’ -পাবলো পিকাসো

‘যদি তুমি জীবনে একটা ছবি নাও আঁকতে, তবু দার্শনিক হিশেবে সবাই তোমাকে চিনত।’ -ফাঁসুয়াজ জিলো

জিলোর সাথে প্রথম পরিচয়ের পরপরই জিলো পিকাসো সম্পর্কে এমন কথা বলেন। জীবনবোধে আকীর্ণ পাগলাটে পিকাসো সত্যিই দার্শনিক হলে আমরা পেতাম না ‘রঙের আলোর সন্ধান’। “Colours, Like features, follow the changes of the emotions”  রঙ হলো অনুভূতির পরিবর্তনের খেলা অথবা প্রতিফলিত হয়ে যে আলো আমাদের চোখে পড়ে। শুধু রঙ নয় তিনি পুরোজীবনটাই খেলেছেন তার বোধে আর শিল্পের খেলায়। জেনেভিয়েভ লিখেছিলেন, ‘পিকাসো ছিলেন সূর্যের মতো, আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ। তিনি জ্বলে উঠতেন, পুড়তেন, অন্যকে পোড়াতেন এবং তার নিকটবর্তী হয়েছে এমন সবাইকে ছাইয়ে পরিণত করতেন।’


মেয়েদের কুকুরের সঙ্গেও তুলনা করতে দ্বিধা করেন নি পিকাসো। এক কুকুর থেকে আরেক কুকুরে কোনো তফাৎ নেই। সেরকম এক নারী থেকে অন্য নারীতেও কোনো ভিন্নতা নেই।


পিকাসো নামক এই অগ্নিগোলকের জন্ম স্পেনের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর মালাগায় ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর পাবলো পিকাসো (Pablo Picasso)। তার পিতার নাম ছিল খোসে রুইজ ব্লাস্কো এবং মাতার নাম মারিয়া পিকাসো লোপেজ। তার নামের শেষাংশ তার মায়ের নামের মধ্যাংশ থেকেই নেয়া। তার পূর্ণ নাম ২৩টি শব্দ দিয়ে গঠিতপাবলো দিয়েগো খোসে ফ্রান্সিসকো দে পাউলা খোয়ান নেপমুসেনো মারিয়া দে লস রেমেদিওস সিপ্রিয়ানো দে লা সান্তিসিমা ত্রিনিদাদ মার্টির পাট্রিসিও ক্লিতো রুইজ ই পিকাসো’’।

পিকাসোর ছবি আঁকার হাতেখড়ি একেবারে শৈশবে শিক্ষক ও চিত্রকর পিতার তত্ত্বাবধানে। শিশু পিকাসোর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রথম শব্দটি ছিল “পিজ”। পিজ শব্দটি লাপিজ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। স্পেনের ভাষায় লাপিজকে পেন্সিল বলা হয়। মাত্র ৯ বছর বয়সে পাবলো পিকাসো তার জীবনের প্রথম তৈলচিত্রের কাজ সম্পূর্ণ করেন।

“এল পিকাদোর” (১৮৯০) যে অশ্বারোহী ষাঁড়ের লড়াইতে বল্লম দিয়ে ষাঁড়কে বিদ্ধ করে। ১৯ বছর বয়সে ছবি এঁকে তিনি প্রথম শিল্প সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। ১৯০৪ সালে পিকাসো স্থায়ীভাবে প্যারিসে চলে যান এবং আমৃত্যু তার শিল্প সাধনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে প্যারিস নগরী। প্যারিসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে তিনি বিত্তের মুখ দেখেছিলেন তা নয়। চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধার সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে ধাপে ধাপে তিনি শিল্পী হিশেবে খ্যাতি ও সুখের মুখ দেখেছিলেন।

চরিত্র্রে নিষ্ঠুর প্রকৃতির পিকাসো নামক অগ্নিগোলকে ঝলসেছিলেন অনেক নারী। তার নিষ্ঠুরতার স্বরূপ ফ্রঁসোযার কথায় বুঝতে পারি আমরা, ‘‘পিকাসো পুরনো কোনো কিছু ফেলে দিতেন না, এমনকি পুরনো কোনো ম্যাচ বাক্স, যার আর কোনো প্রয়োজন নেই, তবু। আমি পরে ক্রমশ বুঝতে পেরেছি, মানুষের ব্যাপারেও পিকাসোর দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। তার কাছে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি এ-কথা কিছুতে সহ্য করতে পারতেন না যে, তার নারীদের কারো নিজস্ব কোনো জীবন থাকবে। অতএব, তাদের প্রত্যেককেই তিনি আঁকড়ে থাকতেন, নিজেকে কণা মাত্র বিতরণ না করে।’

মেয়েদের কুকুরের সঙ্গেও তুলনা করতে দ্বিধা করেন নি পিকাসো। এক কুকুর থেকে আরেক কুকুরে কোনো তফাৎ নেই। সেরকম এক নারী থেকে অন্য নারীতেও কোনো ভিন্নতা নেই। এ-কথা তিনি ফ্রাঁসোয়াকে বলেছিলেন। ক্ষিপ্ত পিকাসো একবার ফ্রাঁসোয়ার মুখে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরেছিলেন, তাকে বেশ্যার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেন নদীতে তাকে ছুড়ে ফেলার কথাও বলেছিলেন। পিকাসো নিজের প্রতিভা সম্বন্ধে পূর্ণ সচেতন ছিলেন, কিন্তু নিজের শারীরিক অপূর্ণতা বিষয়েও অনবহিত ছিলেন তা নয়। সম্ভবত এই সচেতনতা থেকেই পিকাসো বরাবর দৈর্ঘ্যে তার চেয়ে খাটো এমন মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কোনো সম্পর্ক স্থায়ী হোক, পিকাসো তা কখনই চান নি। কারণ তার নিজের ব্যাখ্যায়, যেই মুহূর্তে তিনি নতুন কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেন, আগের নারীর সকল চিহ্ন, সকল স্মৃতি তিনি মুছে ফেলতেন। “আমি যখনই স্ত্রী বদল করি, তখন আগের স্ত্রীকে একদম পুড়িয়ে মারতে চাই। তাদের রাহু থেকে মুক্ত হওয়ার এ হলো একমাত্র উপায়। হয়তো এই মুক্তির ভেতর দিয়েই আমি নিজের যৌবনকে পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হব।”

তার নিকটবর্তী সকল নারীকে পিকাসো ব্যবহার করেছেন তার মডেল হিশেবে। মেয়েদের কখনও দেবী কখনও পাপোশ ভাবা এই অগ্নিগোলকের শিল্পীজীবনে সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এসেছে প্রধানত মেয়েদের কাছ থেকেই। সারাজীবন পিকাসো সবচেয়ে যা বেশি এঁকেছেন তা হলো নারীর মুখ ও শরীর। ‘সুন্দর’ বলতে প্রথাগতভাবে যা বোঝায়, এমন নারী চিত্র যে পিকাসোর নেই তা নয়, কিন্তু তার অধিকাংশ ছবি স্মরণীয় নারীদেহের সৌন্দর্য চিত্রণের জন্য, অথবা তার বাস্তবমুখিনতার জন্যও নয়, বরং তার বিকৃতির জন্য। ভাবা হয়, এই বিকৃতির—ডিসটরশনের এক উদ্দেশ্য দর্শককে চমকে দেওয়া, তাকে ঝাঁকুনি দেওয়া। কিন্তু অন্য উদ্দেশ্য, নারীদেহের প্রতি গভীর লালসাপূর্ণ কামনার নির্মাণ। কামজ চেতনাই সে চিত্রণের মুখ্য প্রকাশ, যদিও মনস্তত্ববিদেরা সে-চেতনার অন্তরঙ্গ অর্থ উদ্ধারে অবচেতন ও অধচেতনের নানা স্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে চেষ্টায় পাণ্ডিত্য আছে, কিন্তু প্রকৃত শিল্পবোধের প্রকাশ নেই।

তার ছবিতে নারীদেহের এই কামজ প্রকাশ নিয়ে পিকাসো নিজে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জেনেভিয়েভকে। ১৯৫১ সালে পিকাসো বলেছিলেন, ‘আমি নিজে একজন নারী। শুধু আমি নই, প্রতিটি শিল্পী আসলে নারী এবং অন্য নারীর প্রতি তার স্বাদ মনে থাকতে হবে। যারা সমকামী তাদের পক্ষে শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়, কারণ তারা পুরুষদের ভালোবাসে।’ অন্যত্র, কোনো এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে জেনেভিয়েভকে বলেছিলেন, তিনি কাঠ, প্লাস্টার, পাথর, এমন কিছু নেই যে মাধ্যমে কাজ করেন নি। সে-কথা শুনে জেনেভিয়েভ ফোড়ন কেটেছিলেন, ‘এবং নারী’। প্রীত হয়ে পিকাসো বলেছিলেন, ‘ব্যাপার কী জানো, ছবি আঁকার চেয়েও অনেক বেশি জটিলতা আমার জীবনে সৃষ্টি হয়েছে নারীর জন্য। কে একজন আমাকে বলেছিল, তোমার হৃদয় হচ্ছে সুলতানের মতো, তোমার দরকার একটা আস্ত হারেম।’ কথাটি ঠিক, ‘আমি আরব বা প্রাচ্যের মানুষ হলে বেশ হতো।’ বিচিত্র স্বভাবের এই মানুষটি যেন ছবি আঁকেন নি, ছবি দিয়ে রীতি মতো আত্মজীবনী লিখে গেছেন। তিনি নিজেই বলছেন : “কেউ কেউ যেমন আত্মজীবনী লেখে, আমিও তেমনি ছবি আঁকি কোনো ঘটনা বা কাহিনি কবে কার মনে ঢেউ তুলবে তা কি কেউ বলতে পারে? হয়তো আত্মজীবনীর কোনো বিশেষ পাতা বা আমার অর্ধেক সমাপ্ত একটা ছবি কাউকে উন্মনা করে দিতেও তো পারে। ভবিষ্যৎ একমাত্র বলতে পারে কোনটা ঠিক। সময় মতো দ্রুত পায়ে আমাকে পেরিয়ে চলেছে। নিজেকে মনে হয় বহতা একটা নদীর মতো। পাড় উপড়ে পড়া গাছপালা বা আবর্জনা বয়ে নিয়ে চলেছে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। এক লক্ষ্য থেকে আরেক লক্ষ্যে তাই লাফ দিয়ে যাই। আমি যখন গাছের ছবি আঁকি, বাস্তবের গাছের সঙ্গে তার হয়তো বা মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমি সেই গাছই আঁকি, যে গাছের ছায়া আমি মানস চোখে দেখতে পাই।’’


পিকাসোর সৃষ্টিশীলতা ছিল বাঁধনহারা, সব সময়ই নতুন কিছু খোঁজার চেষ্টা করতেন। যদিও উনি নিজে বলতেন, ‘আমি কিছু খুঁজি না, আমি পেয়ে যাই।’


পিকাসোর আঁকা ভূচিত্র (ল্যান্ডস্কেপ) খুব কম, কিন্তু কেন? পিকাসোর জবাব ছিল, ‘কারণ খুব বেশি ভূচিত্র আমার দেখা হয় নি। আমি সারাজীবন নিজের ভেতরেই বাস করেছি। আমার অন্তর্গত ভূচিত্র এমন সুন্দর, এমন বৈচিত্র্যময় যে, প্রকৃতিতে এমন সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব’। সোজাসুজি প্রকৃতিকে সামনে রেখে পাবলো কখনও ছবি আঁকেন নি। ছবির টানাপোড়েন তাকে সবসময়ই আনন্দ দিত। ডান আর বাঁ চোখ যে ছবির এক তাতে তিনি আনন্দ পেতেন না। দর্শকের আবিষ্কারের এর জন্য নতুন কিছু রেখে দেয়াই ছিল তার শিল্পের আনন্দ। প্রকৃতি যেমন তার সৃষ্টি নকল করে না, তেমনি তিনি মনে করতেন একজন শিল্পীর দুটো শিল্প এক হওয়া উচিত নয়, বস্তুর মধ্যে গতিময়তা আনা ছিল তার শিল্পের আসল উদ্দেশ্য। আর গতিময়তার জন্য প্রয়োজন বিপরীত সংঘর্ষ, পরস্পরবিরোধী শক্তির। শক্তি বপন করে গতির বীজ, প্রাণের সঞ্চার। যার উভয়টাই পিকাসোর রক্তে ছিল। তার মা তাকে বলতেন, “তুমি যদি সৈনিক হও পাবলো, শেষ হবে জেনারেলে, আর সন্ন্যাসী হলে পোপে। পাবলো শেষ পর্যন্ত হয়েছিলেন শিল্পী, আর শেষ হয়েছিলেন পিকাসোতে।

ক্যানভাসের সামনে তিন চার ঘণ্টা একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে ক্লান্তিহীন পাবলো ছবি আঁকত। কখনও সকাল বেলায় বসত, ক্যানভাস ছেড়ে উঠত সন্ধ্যাবেলায়। ছবিটা শেষ করে। পাবলোকে তার ছবি আঁকার এই শ্রম আর কৌশল নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, ক্লান্তি আসে না, আর এই জন্যই শিল্পীরা বেশিদিন বাঁচে। কারণ আমি যখন কাজ করি, আমার শরীর তখন দরজার বাইরে থাকে। হ্যাঁ, যেমন করে মুসলমানরা মসজিদে ঢোকার আগে জুতো খুলে রাখে দোড়গোড়ায়। দেখো, চিন্তা যেমন হঠাৎ আমার মাথায় আসে, হাত দুটো্‌ তেমনি দ্রুত চালাতে হয়। নইলে চিন্তা-বিদ্যুতটা তো হারিয়ে যাবে। ছবি আঁকি আমি অন্তরের আলোয় আর অভিজ্ঞতায়।’’ অসম্ভব জীবনীশক্তি নিয়ে জীবনের শেষ দিন অবধি বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা, নানাভাবে ছবিকে ভাঙার কাজ করে গেছেন। দর্শক যখন ছবি দেখে, সে তো শুধু বিষয়বস্তু দেখে না। কাজের মধ্যে শিল্পীর যে এনার্জি রয়েছে, যে মন এবং নান্দনিক বোধ রয়েছে, তাকেও অনুভব করে। এই বিষয়ে তিনি বলেন, “ছবি নিয়ে বোঝার আবার কী আছে? ছবি কি অঙ্ক নাকি যে তা আঁক কষে বোঝাতে হবে? ছবি নিয়ে ব্যাখ্যারও কিছু নেই। ছবির একমাত্র কাজ, তা দেখে মানুষের মন, তার হৃদয় যেন আন্দোলিত হয়, তার ভাবাবেগ জাগে। কোনো ছবি দেখে মানুষ উদাসীন থাকবে, তা হবে না। ছবি এমন হবে না যেন তার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় কেউ মাত্র একবার অনাগ্রহী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে যাবে।” আরও বলেন, “(ছবি দেখে) দর্শকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবে, সেই উত্তেজিত-বোধ করবে, শিল্প নির্মাণে উৎসাহী হবে, আর কিছু না হোক তার কল্পনা সঞ্জীবিত হবে। শিল্পী অবশ্যই দর্শককে তার নির্জীবতা কাটাতে সাহায্য করবে, তাকে আন্দোলিত করবে, তাকে খামচে ধরে বোঝাবে, যে পৃথিবীতে সে বাস করে তার চেহারা কেমন। তবে সে সাফল্য অর্জন করতে হলে শিল্পীকেও তার শিল্পকর্মের বাইরে পা বাড়াতে হবে।” মানুষের মুখ, চেহারা, ল্যান্ডস্কেপ পিকাসোর যে কোনও ছবি আমরা যখনই দেখি, তার সেই প্রচণ্ড শারীরিক এবং মানসিক এনার্জি উপলব্ধি করা যায়। এই এনার্জির সঙ্গে মিশেছিল নন্দনতত্ত্ব।

চিত্রকর হিশেবে পিকাসোর জীবন বেশ কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ব্লু পিরিয়ড’, প্রথম মহাযুদ্ধ ও তার অন্তর্বর্তীকাল ‘রোজ পিরিয়ড’, ‘নিগ্রো পিরিয়ড’, ‘কিউবিস্ট পিরিয়ড’। একেবারে গোড়ার দিকে বাস্তবধর্মী ছবি। পরের পর্যায়টি ‘ব্লু পিরিয়ড’। তখন তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। রেস্তোরাঁয় খেতে আসা রুগ্‌ণ, জীর্ণ চেহারার গরিব মানুষের ছবি আঁকতেন। এ ছবিগুলো ছিল মূলত নীল রঙে আঁকা। তখন থেকেই তিনি পরিচিত হতে শুরু করেন। শিল্পমাধ্যমের ওপর তার ক্ষমতা, প্রতিভা স্বীকৃতি পেতে থাকে। এর পরে ‘রোজ পিরিয়ড’। স্প্যানিশ সার্কাসের হার্লেকুইন, কলাকুশলী, ক্লাউন, রিঙের খেলা হয়ে ওঠে তার ছবির বিষয়বস্তু। এই পর্যায়ের ছবিতে দেখি রঙের প্রাচুর্য। পিকাসোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তিনি প্রত্যেক পর্যায়ে তার আগের পর্যায় থেকে সরে এসেছেন, এক-একটা পর্যায়কে ভেঙে আর একটা পর্যায়ে গিয়েছেন। যেটা অনেক বড় বড় শিল্পীর মধ্যেও আমরা পাই না। যেমন, ভ্যান গখ সারা জীবন ধরে প্রায় একই ধরনের সুন্দর সুন্দর এক্সপ্রেশনিস্ট ছবি এঁকেছেন। কিন্তু পিকাসোর সৃষ্টিশীলতা ছিল বাঁধনহারা, সব সময়ই নতুন কিছু খোঁজার চেষ্টা করতেন। যদিও উনি নিজে বলতেন, ‘আমি কিছু খুঁজি না, আমি পেয়ে যাই।’

পিকাসো তার ছবিতে ‘কিউবিস্ট পিরিয়ড’ এ কিউবিজমের সঙ্গে নিজস্ব স্টাইল জুড়ে নিরীক্ষা শুরু করলেন। এক সময় আফ্রিকান মুখোশ দেখে ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বিখ্যাত ছবি লে দ্যমোয়াজেল দা’ভিয়ঁ (Les Demoiselles d’Avignon) এ সময়ই আঁকা। অ্যাভিঁয়-র দেহোপজীবিনীরা এ ছবির বিষয়বস্তু। আফ্রিকান মাস্ক-এর প্রভাব ছবিতে স্পষ্ট। ছবিতে তাদের মুখচোখশরীর প্রচলিত দৃষ্টিতে এমন ‘বিকৃত’, ছবিটি দেখে অনেকেই বলতে শুরু করলেন, পিকাসো নষ্ট হয়ে গিয়েছেন। বহু বছর ধরে ছবিটি স্টুডিওতে পড়ে ছিল। মজার কথা হলো, এটা পিকাসোর সর্বশ্রেষ্ঠ ছবিগুলির একটি। সেই সময় ছবিতে এই ধরনের নান্দনিক শারীরিক বিকৃতি অন্য কেউ আনতে পারেন নি। আসলে পিকাসো নিজে জানতেন, কখন সৃষ্টিশীলতার কোন ঝোঁক প্রয়োগ করলে ছবি অসামান্য হয়ে উঠবে।

সোভিয়েত ধাঁচের ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার’ অনুসারী পিকাসো কখনই ছিলেন না, তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি ব্যারিকেডের পেছনে, জনতার সঙ্গে, এ-কথাও কখনো গোপন করেন নি। নাৎসিবাদকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। যুদ্ধ—যে-কোনো ধরনের যুদ্ধ—তাঁকে আহত করত। যুদ্ধের সময় পিকাসোর প্যারিসে অবস্থান ছিল সাহসের পরিচায়ক। কারণ হিটলার তার ছবিকে শিল্প জগতের অবক্ষয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবত না।

যদিও পিকাসো নিজে মার্কসবাদ সম্বন্ধে কোনো দীক্ষা গ্রহণ করেন নি, এ নিয়ে কোনো পাঠাভিজ্ঞতাও ছিল না। তবুও বলা যায় কমিউনিস্ট পার্টিতে তার সদস্যপদ গ্রহণ আকস্মিক ছিল না। তিনি রাজনীতিক নন, যে-ধরনের ছবি তিনি আঁকেন, তাও কোনোভাবেই কোনো ধরনের আদর্শগত প্রচার-প্রচারণার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। বস্তুতপক্ষে, আধুনিকতার যে-ধারণার সঙ্গে তার সম্পৃক্তি, তাকে যদি কোনো আদর্শগত মোড়কে ফেলতে হয়, তাহলে তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার বিপরীত মেরুতে তাকে স্থাপন করতে হয়। এই বৈপরীত্যের কারণে পিকাসো ফরাসি এবং বিশেষত সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবর্গের প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। পিকাসো একজন কমিউনিস্ট, এর পেছনে যে প্রচারগত গুরুত্ব আছে, শুধুমাত্র সে কারণেই তিনি পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন নি।


আমার নিজের মতো করে আমি যা সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে সুনিপুণ ও সর্বোত্তম তাই প্রকাশ করতে চেয়েছি। আর সকল মহৎ শিল্পীমাত্রই জানেন, সেরকম শিল্পকর্ম সবচেয়ে সুন্দরও বটে।


তা সত্ত্বেও পিকাসোর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্য লোকদেখানো এবং খামখেয়ালি কোনো ব্যাপার ছিল না। তবু কেন কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন তার ব্যাখ্যা পিকাসো নিজে নিউইয়র্কের বামপন্থি সাময়িকী নিউ মাসেসের পল জিলারডের কাছে দেন এই ভাবে : ‘আমি লেখক নই, চিত্রকর। কথায় না বলে ছবি দিয়ে আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়া সহজ। কিন্তু তারের মাধ্যমে আমার রং আপনার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়, অতএব কথায় বলার চেষ্টা করছি। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান আমার সমগ্র কর্মজীবন ও সকল চিত্রকর্মের এক যৌক্তিক পরিণতি। আমি কখনই চিত্রকলা মনোরঞ্জক বা হালকা আনন্দের মাধ্যমে এমন এক শিল্প মনে করি নি। যে রেখা ও রং আমার হাতিয়ার, আমি সবসময় তাকে ব্যবহার করেছি বিশ্ব ও মানবজাতি সম্পর্কে আমার বোধ ও বিবেচনা সম্প্রসারিত করতে, যাতে এই উপলব্ধি আমাদের সবাইকে অধিক মুক্তির সন্ধান দিতে পারে, সে-লক্ষ্যে। আমার নিজের মতো করে আমি যা সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে সুনিপুণ ও সর্বোত্তম তাই প্রকাশ করতে চেয়েছি। আর সকল মহৎ শিল্পীমাত্রই জানেন, সেরকম শিল্পকর্ম সবচেয়ে সুন্দরও বটে।

হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি, আমার ছবির মাধ্যমে একজন প্রকৃত বিপ্লবীর মতোই আমি লড়াই করেছি। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পেরেছি, সেই লড়াই-ই যথেষ্ট নয়। যে অভাবনীয় নির্যাতনের ভেতর দিয়ে গত কয়েক বছর আমাদের যেতে হয়েছে তা থেকে আমি বুঝেছি, শুধু আমার শিল্প দিয়ে নয়, আমার সকল অস্তিত্ব দিয়ে আমাকে লড়তে হবে। আর সে কারণেই আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছি সর্বান্তকরণে, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া। পার্টির সঙ্গে আমি আগাগোড়াই যুক্ত ছিলাম। আরাগঁ, এলুয়ার, কাসু, ফুগেরঁ ও আমার অন্যান্য (কমিউনিস্ট) বন্ধু সে-কথা খুব ভালো করেই জানেন। আমি যে আগে দলে যোগ দিই নি তা সম্ভবত আমার সরল মানসিকতা, আমি ভাবতাম, আমার শিল্পকর্ম ও আমার হৃদয় তো দলের জন্য নিবেদিত রয়েছেই, এই দল তো আমার নিজের দল। এ-কথা কি সত্য নয়, কমিউনিস্ট পার্টির অন্য আর সকলের তুলনায় বিশ্বকে বোঝার ও তাকে বদলাবার জন্য সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রম করে? বিশ্বের মানুষ যাতে স্পষ্টভাবে সবকিছু অনুধাবন করতে পারে, যাতে সে মুক্ত ও সুখী হতে পারে? কমিউনিস্টরাই কি সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স বা আমার স্পেনে সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রমী নয়? তাহলে দ্বিধার প্রশ্ন ওঠে কিভাবে? আমি অঙ্গীকারবদ্ধ হব, সেই ভয়? কিন্তু (দলে যোগ দেওয়ার পর) আমি এর চেয়ে অধিক মুক্তি ও অধিক সম্পূর্ণ কখনই বোধ করি নি। আমি নিজের জন্য পুনরায় একটি দেশ খুঁজে পেতে প্রবল রকম উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি বরাবরই নির্বাসিত ছিলাম, কিন্তু এখন আর নই। যতদিন আমি স্পেনে ফিরে না যেতে পারি, ততদিন ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি আমাকে আশ্রয়ের দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দলে আমি তাদের পেয়েছি, যাদের আমি সবচেয়ে শ্রদ্ধা করি, যাদের মধ্যে রয়েছেন সেরা বিজ্ঞানী, সেরা কবি, রয়েছে সেই সব উজ্জ্বল মুখ, যাদের আমি আগস্ট মাসে প্যারিসে (নাৎসি প্রতিরোধে) জ্বলে উঠতে দেখেছি। আমি পুনরায় আমার ভাইদের খুঁজে পেয়েছি, আমি তাদের সঙ্গে রয়েছি।’  কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্যপদ গ্রহণের বড় কারণটি তিনি নিজেই জেনেভিয়েভকে জানিয়েছিলেন সেই ১৯৪৪ সালে। ‘আমি ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে। আমার এই বিরুদ্ধতা প্রকাশের একমাত্র উপায় কমিউনিস্ট পার্টিতে অংশগ্রহণ এবং সে-কথা সবাইকে জানানো।’ স্পষ্টতই ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধাচরণের একটি বড় প্রমাণ তিনি দিয়েছিলেন—তার ‘গের্নিকা’। সে ছবি ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে এক প্রবল ঘৃণার উচ্চারণ হিশেবে অনন্তকালের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্যারিসে তার স্টুডিওতে সে-ছবি দেখে একজন জার্মান সৈনিক জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এ তোমার কাজ?’ জবাবে পিকাসো বলেছিলেন, ‘না, তোমাদের।’ পিকাসো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না হলেও বরাবরই নিজেকে মানবিকতার পক্ষে একজন সৈনিক বিবেচনা করতে ভালোবাসতেন। আমাদের এ-কথাও মনে রাখা ভালো যে, যাদের সঙ্গে পিকাসো তার তরুণ বয়স থেকে ওঠাবসা করেছেন, তারা সবাই প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চার অন্তর্গত ছিলেন।

২৫ আগস্ট ১৯৪৪ সালে দীর্ঘ চার বছরের অবরোধ শেষে প্যারিস অবশেষে জার্মান বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে শহরে প্রবেশ করলেন জেনারেল শার্ল দ্য গল। সেদিন সন্ধ্যায় এক বেতার ভাষণে তিনি সহর্ষে জানালেন : ‘প্যারিস মুক্ত। ভিভা প্যারিস।’ অবরুদ্ধ হলেও সে-শহরে প্রায় গতানুগতিক প্রাত্যহিক জীবন যাপন করেছেন অনেকেই। মোড়ে মোড়ে জার্মান টহল ছিল, কোনো কোনো ভবনে তারা এসে তালা ঝুলিয়ে দেয়, কিন্তু এর বাইরে প্যারিস মোটের ওপর অপরিবর্তিতই ছিল। খাবারের কমতি ছিল না, হোটেল-রেস্তোরাঁ জমজমাট, নাটক অপেরা, সেও খোলা। এমনকি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জঁ ককতোর নাটক অভিনীত হয়েছে, সার্ত্রের বই মুদ্রিত হয়েছে। পিকাসোর ছবি আঁকাতেও কোনো বাধা ছিল না, যদিও তার ছবি প্রকাশ্যে প্রদর্শনীর অনুমতি ছিল না। নাৎসি সরকার পিকাসোকে ‘ডেঞ্জারাসম্যান’ এই নামে অভিযুক্ত করেছিল, মুখ্যত তার ‘গের্নিকা’ ছবির জন্য। যুদ্ধের পর, মুক্ত প্যারিসে, যে-কজন নায়ক বলে অভিষিক্ত হলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন পিকাসো।

১৯৩৭ সালের শেষ এপ্রিলের সুন্দর একটি বিকেল। যেখানে যেমন থাকার স্পেনের বাস্ক প্রদেশের ছিমছাম ছোট্ট শহর গোয়ের্নিকাতে ছিল তাই-ই। হঠাৎ কেঁপে উঠল গোয়ের্নিকার আকাশ-বাতাস। আকাশ ছেয়ে গেল ডানা মেলা ক্ষুধার্থ শকুনের মতো একপাল বিমানে। মৃত্যুর পরোয়ানা প্রসব হলো বিমানের পেট থেকে, নির্বিচারে। তাৎক্ষণিক মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যে নারী আর শিশুকুল বাঁচার শেষ চেষ্টায় রাস্তা কিম্বা খোলা মাঠে পলায়নপর; বিমানের মেশিনগানের গুলি তাদের পাখির মতো শুইয়ে দিল মাটিতে। গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত স্পেনের গোয়ের্নিকার সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ডানা মেললো এক ফিনিক্স পাখি “গোয়ের্নিকা”। একটি ছবি । কেবল ১১ ফুট উচ্চতা আর ২৫.৬ ফুট প্রস্থ নিয়েই ছবিটি ব্যাপ্ত নয়। সকল দেশ-কাল-পাত্রকে ছাড়িয়ে গেছে এর ব্যাপ্তি। গোয়ের্নিকা শুধু ছবি নয়, তাবৎ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক সবল প্রতিবাদ। পাবলো পিকাসোকে না-জানলেও বা না-চিনলেও ছবিটি দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে—“দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে….” এমনিই গোয়ের্নিকার বাস্তবতা। চিত্রকার নয়, চিত্রের বৈচিত্র্যময় আর ধ্রুপদী আবেদন দেশে দেশে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে একটিই মাত্র মন্ত্রে—“যুদ্ধ নয়”। ১৯৩৭ সালের ১লা মে তার সে ঘৃণা তিনি উগরে দিতে শুরু করলেন ক্যানভাসে, স্বপ্রণোদিতভাবে। অন্ধকারের কোনও রঙ থাকে না। মানবতার ইতিহাসে মাইলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গোয়ের্নিকা হত্যাকাণ্ডও তো এক অন্ধকারের নাম। তাই তিনি বেছে নিলেন কালো, শাদা আর ধূসর তেল রং। ক্যানভাসে ফুঁটে উঠতে থাকল নারী, শিশু, সৈনিক, ষাঁড় আর ঘোড়ার মুখ। এক একটি যন্ত্রণার ছবি। চিত্রকর্মটির বিভাজনগুলো খুবই সূক্ষ্ম এবং পরিষ্কার। চিত্রটিতে রং আছে তিনটি। শাদা, কালো ও ধূসর। এই তিনটি রং ব্যবহার করার কারণ মূলত একধরনের বিবর্ণতা, বিষাদ ফুটিয়ে তোলা। ম্যুরালাকৃতির এই পেইন্টিংটি তেলরঙে করা বিশাল ক্যানভাসের বা-পাশের উন্মুক্ত জায়গাটুকুতে মর্মভেদী চীৎকারে শিশুর লাশ নিয়ে প্রসারিত হাতের এক নারীর ঠিক উপরে আছে চোখগরম করা এক ষাঁড়ের প্রতিকৃতি। মাঝখানটি জুড়ে আছে বর্শাবিদ্ধ যন্ত্রণা-কাতর এক ঘোড়ার আকুতি। ঘোড়ার শরীরের পার্শ্বদেশে বড়সড় একটি ক্ষত। মানুষের মাথার একটি খুলি ঘোড়াটির শরীরের উপরে প্রচ্ছন্ন রয়েছে। একটি ষাঁড় যেন নিচ থেকে ঘোড়াটিকে ক্ষতবিক্ষত করতে মুখিয়ে আছে। আর ষাঁড়টির মাথা তৈরি হয়েছে মূলত হাঁটু মুড়ে থাকা ঘোড়াটির সামনের পা জুড়ে। ঘোড়াটির বুকে রয়েছে ষাঁড়ের একটি শিং। ষাঁড়ের লেজটি তৈরি করেছে এক অগ্নিশিখার আকৃতি। মৃতপ্রায় ঘোড়াটির নিচে একটি ছিন্নবিচ্ছিন্ন সৈনিকের দেহ, যে দেহের ছিন্ন হাতটি তখনও ধরে আছে ভাঙা এক তলোয়ার। আর সেই ভাঙা তলোয়ারের ভেতর থেকে উদ্‌গত হয়েছে একটি ফুল। শয়তানের চোখের মতো একটি জ্বলজ্বলে বৈদ্যুতিক বাল্ব যন্ত্রণাকাতর ঘোড়াটির মাথার উপরে। ঘোড়াটির ডানদিকে আর উপরে ভয়ার্ত এক নারীমূর্তি। প্রজ্বলিত এক বাতি নিয়ে তার হাতটিও যেন ভেসে আছে জ্বলজ্বলে বৈদ্যুতিক বাল্ব এর কাছাকাছি এক সাংঘর্ষিক অবস্থানে। ভাসমান নারীর নিচে ভয়ার্ত আর এক নারী শূন্যদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে জ্বলজ্বলে বাতিটির দিকে। ষাঁড়টির জিহ্বা আঁকা হয়েছে একটি ছুরি হিশেবে। আর্তনাদকারী এক নারী, ঘোড়া, আতঙ্কিত একটি পাখি সম্ভবত একটি ঘুঘু। সর্বডানে রয়েছে আতঙ্কে দু’হাত উত্তোলিত একটি মূর্তি, মনে হবে যেন আবদ্ধ হয়ে পড়েছে আগুনের মাঝে। ম্যুরালটির ডান প্রান্তের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে খোলা দরজা নিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি দেয়াল। পিকাসোর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী এ ছবির প্রথম ঠিকানা হয় মাদ্রিদের প্রাডো মিউজিয়ামে। পরে সংরক্ষণের অসুবিধার কারণে ১৯৮৫ সালে গোয়ের্নিকাকে সরিয়ে আনা হয় পাশের “রেইনা সোফিয়া” মিউজিয়ামে আর আজ গোয়ের্নিকার স্থায়ী ঠিকানা এটাই।


ভাবতে ভালো লাগছে যে যখন আমি থাকব না, তখনো এমন কেউ থাকবে যে আমাকে ভালোবাসবে, আমার সম্বন্ধে সত্যি কথা বলবে, বানানো কথা নয়।


গোটা পিকাসোর অস্তিত্বই যেন এ ছবিতে জড়িয়ে আছে। বিমূর্ত আঙ্গিকের হলেও ড্রয়িং ও প্রয়োগ শৈলীর সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্মতা ‘গোয়ের্নিকা’ ছবিটিকে এক বিশেষ ক্ল্যাসিক গভীরতা এনে দিয়েছে। এর ধূসর রং অনেকটা দলিলি ফটোর একটা রূপ তুলে ধরেছে।

গোয়ের্নিকার এই শিল্পী প্রথম শব্দ পেনসিল উচ্চারণ করে অনিবার্যভাবে শেষ পর্যন্ত শিল্পী হলেও যবনিকায় পিকাসো হয়েছিলেন। সেন্ট ট্রপিজে এক বিকালে জেনেভিয়েভ তেমন কিছু না ভেবেই একদিন বলে বসেন, ‘ভাবুন তো, এখন থেকে পঞ্চাশ বছর পর আমি আমার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের বলতে পারব যে, আমি আপনাকে চিনতাম। আরো অনেক কথাই তাদের আমি বলব।’ জবাবে পিকাসো বলেছিলেন, “আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। ভাবতে ভালো লাগছে যে যখন আমি থাকব না, তখনো এমন কেউ থাকবে যে আমাকে ভালোবাসবে, আমার সম্বন্ধে সত্যি কথা বলবে, বানানো কথা নয়।”

জেনেভিয়েভ তার সে বিশ্বাস বিনষ্ট করেন নি, ১৯৭২ সালে লেখা তার সানশাইন অ্যাট মিডনাইট গ্রন্থ সে-কথার প্রমাণ। পিকাসো মারা যান ৮ এপ্রিল ১৯৭২, তখন তার বয়স ৯২। জেনেভিয়েভ তার বই লিখে শেষ করেন পিকাসোর মৃত্যুর ছয় মাস আগে। অসীম মমতায় তার রেখাঙ্কন করেছেন সে-বইয়ে। তিনি লিখেছেন : ‘পাবলোর এখন ৯২ বছর বয়স, হয়তো এ-বছরই মৃত্যু তাকে আঘাত করবে। জীবনের স্ফুলিঙ্গ একসময় নিভে আসে আমাদের অলক্ষ্যেই, যা রয়ে যায়, তার নাম স্মৃতি। ‘স্মৃতিই লাফিয়ে বেড়ায় গাছের শাখা থেকে মানুষের মুখে, প্রশাখা থেকে চন্দ্রালোকে, প্রস্তর থেকে কাগজের ওপর আঁকিবুঁকিতে।

পিকাসোতে নিঃশেষ হবার আগে শিল্পী পাবলো তার শিল্পবোধ সর্ম্পকে বলেন, “আর্ট, তা যে প্রকারেরই হোক না কেন, তার প্রতি একজন মানুষকে পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বাধ্য করবে, কোনো সংশয় ছাড়া নিজেকে উজাড় করে দিতে উৎসাহী হতে হবে। ‘সৌন্দর্য’ অবশ্যই সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি পথ, একধরনের মনো-অনুভূতি, যার মাধ্যমে সে লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষের আত্মাকে জাগাতে হবে। আত্মা যদি না জাগে, তাহলে সেখানে পলি জমবে। কাদামাটি হলো গতিহীন, অন্যদিকে জলস্রোত হলো স্বচ্ছ ও শুদ্ধ। সাহিত্যে তো তোমরা ‘রিয়েলিস্ট’ ধারা মানো, তাই না? সেখানে তো সবসময় গৎবাঁধা সৌন্দর্যের কথা বলা হয় না, জীবনের নোংরা, কদর্য দিকও তুলে ধরা হয়, যেমন তুলে ধরেছেন বালজাক, জোলা ও সাম্প্রতিক সময়ে অঁরি ত্রোয়া। তোমরা কি বোঝ না যে, কদর্যতার ভেতরেও সৌন্দর্য রয়েছে? সাহিত্যে যা গ্রহণযোগ্য, ছবির বেলায় তা হবে না কেন? নিজের মন দিয়ে যা স্বীকার করো, হৃদয় ও অনুভূতিকে তা থেকে কেন বাদ দেবে? সবার আগে যা দরকার তা হলো তোমার কল্পনাশক্তিকে মুক্ত রাখা। তারুণ্যের এই দান, তোমরা খুব সহজেই হারিয়ে ফেল। আমার চেষ্টা তোমাদের মধ্যে এই কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে রাখা। মনে রাখবে, এই কল্পনাশক্তির জোরেই ঘোড়ার জিন আর এক জোড়া হাতল দিয়ে বৃষের শিং বানাতে পারি, অথবা দেখাতে পারি দুই ছাদের মাঝখানে এক ফালি আকাশ, তার ঘন নীল অসীমতা।

তার বিমূর্ত শিল্পের জন্য খ্যাত পিকাসো এমন এক শিল্পধারার কথা বলে গেলেন, তা একদিকে যেমন বাস্তবমুখী, তেমনি মানব অভিজ্ঞতার নিকটবর্তী। তিনি যেন শেষ হইয়াও হইল না শেষ।

আঁখি সিদ্দিকা

আঁখি সিদ্দিকা

জন্ম ১৭ অক্টোবর, মানিকগঞ্জ। বাংলায় স্নাতকোত্তর।
পেশা : চাকরি; কর্মকর্তা, আইসিবি।

প্রকাশিত বই—

ছায়াচর
বালক
নক্ষত্রের জলে কয়েকটি তারা
বিষণ্ন সরাইখানা
বই-চড়ুইয়ের সাদা ডিম ভাঙ্গা দুপুরে (২০১৬)

ই-মেইল : ankheesiddika@Gmail.com
আঁখি সিদ্দিকা