হোম চিত্রকলা আসমা সুলতানার সাম্প্রতিক কাজ : অজাত শিশুর প্রতি চিঠি

আসমা সুলতানার সাম্প্রতিক কাজ : অজাত শিশুর প্রতি চিঠি

আসমা সুলতানার সাম্প্রতিক কাজ : অজাত শিশুর প্রতি চিঠি
844
0

আসমার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পেইন্টিংসহ শিল্পকর্মে নিজের চুলের ব্যবহার। হ্যাঁ, চুল। নিজের মরা কোষে তিনি ধরতে চান পরিপার্শ্ব ও নিজের অন্দরের চেতন-অবচেতনকে। 


আসমা সুলতানা। ডাকনাম মিতা। বাংলাদেশের মেয়ে। থাকেন সুদূর কানাডায়। ড্রইং এবং পেইন্টিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে স্নাতক করার পর ২০০৪-এ প্রবাস জীবন শুরু লন্ডনে। বেশ কয়েকটি একক এবং যৌথ প্রদর্শনী হয় সেখানে। সেন্ট্রাল সেন্ট মার্টিন-ইউনিভার্সিটি অব আর্টস লন্ডনে পড়াশোনা করেন শিল্পকলার ইতিহাস বিষয়ে। তারপর প্রবাসজীবনের কানাডা অধ্যায়। পড়াশোনা করেন টরেন্টো স্কুল অব আর্টসে। পাশ্চাত্য শিক্ষা আর প্রাচ্যের মনন—এই দুয়ে মিলে এগিয়ে যাচ্ছেন মিতা। তার শিল্পকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পেইন্টিংসহ শিল্পকর্মে নিজের চুলের ব্যবহার। হ্যাঁ, চুল। নিজের মরা কোষে তিনি ধরতে চান পরিপার্শ্ব ও নিজের অন্দরের চেতন-অবচেতনকে। হয়তো মানবদেহের এই প্রাকৃতিক শেকল ‘চুল’ দিয়ে তিনি ধরতে চান মূর্ত ও নশ্বরতাকে।

দেশে-বিদেশ এখন পর্যন্ত ২২টি সলো এক্সিবিশন হয়ে গেছে মিতার। ২০১৩ সালে তার একটি প্রদর্শনী হয়েছিল ‘My Baby is growing outside of my body’ শিরোনামে। যেখানে আমরা দেখি একটি শিশুকে ঘিরে মায়ের স্বপ্নের জাল বোনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। সেখানেও ছিল চুলের ব্যবহার। এই প্রদর্শনীর পর আরও প্রদর্শনী হয়েছে মিতার। কিন্তু এই প্রদর্শনীটির কথা উল্লেখ করার কারণ, এই মানবিক স্থিতির আরেকটু এক্সটেনশন আমরা দেখব তার নতুন প্রদর্শনীতে। যারা কানাডায় আছেন আশা করি তার এই প্রদর্শনীতে যাবেন। আর যারা বাংলাদেশসহ দূরে আছেন তারা আসমার কাজ সম্পর্কে একটি ধারণা পাবেন।- মাজুল হাসান, পরস্পর


লেটার টু মাই আনবর্ন চাইল্ড
শিল্পী আসমা সুলতানার একক শিল্পকলা প্রদর্শনী
(নভেম্বর ২৩ থেকে ডিসেম্বর ৪, ২০১৬)
গ্যালারি ফিফটি, ৫০ গ্ল্যাডস্টোন অ্যাভেনিউ, টরোন্টো
গ্যালারির সময় বুধবার থেকে রোববার ( দুপুর ১ থেকে বিকাল ৫ )
উদ্বোধন : ২৬ নভেম্বর, শনিবার (দুপুর ২ থেকে সন্ধ্যা ৬)


অজাত শিশুর প্রতি চিঠি, একটি প্রদর্শনী


‘Letter to my unborn child–আমার অজাত শিশুর প্রতি চিঠি’ শিল্পী আসমা সুলতানার সাম্প্রতিক আঠাশটি শিল্পকর্ম নিয়ে এই একক প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে কানাডার টরোন্টোর প্রখ্যাত আর্ট গ্যালারি ‘গ্যালারি ফিফটি’। এই প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ২৩ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর অব্দি। আসমা সুলতানা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে ওঠা সেই শিল্পীদের একজন, যার শিল্পকর্মের মূল ভাবনা আত্মজৈবনিক। শিল্পী হিশাবে বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক পরিবেশে নিজের পরিচয় খুঁজে নেবার সংগ্রাম, মানুষ হিশাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার নিরন্তর যুদ্ধ, অপমান, বঞ্চনা আর আত্মত্যাগের নানা আখ্যান প্রতীকী রূপ খুঁজে পেয়েছে তার ক্যানভাস, প্রিন্ট এবং স্থাপনা শিল্পে। চলমান জীবনের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছেন তিনি তার শিল্পে, নিজের জীবনটাকেই একান্ত নিজের করে নিয়ে সৃষ্টিতে আত্মমগ্ন হয়েছেন, যেখানে নিজের অস্তিত্ব-মানচিত্রে জায়গা পেয়েছে শিল্পীর যাপিত জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতার স্মারক। নিজের আত্মপরিচয় খোঁজার প্রত্যয়ে তার শরীরেরই অনন্য অংশ, যেমন তুলিকে প্রতিস্থাপিত করেছে আঙুলের ছাপ, মাথার চুল জায়গা নিয়েছে সুতার প্রতীকীরূপে আর বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে শিল্পীর জীবনের কোলাজে। অবশ্যই এই মহাকাব্য এখনও পরিণতি পায় নি, শিল্পী মনে করিয়ে দেন; আর তার সেই মহাকাব্যকে বুঝতে আমাদের সচেতন স্মৃতিতে ধরে রাখতে হবে মহাকাব্যের সূচনাটিকে। আর অতীত, অতীত হবার কারণে আমাদের কাছে যা অস্পৃশ্য রয়ে যায় চিরকালই–সময়ের ধ্বংসলীলায় টিকে থাকা অবশিষ্টাংশগুলোই কেবল টিকে থাকে সময়ের সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে পুনঃসৃষ্টি করার জন্য আর স্মৃতির সেই কথোপকথনের অনুরণন শিল্পীর সৃষ্টিতে প্রাণ খুঁজে পায়।

শিল্পীর অজাত শিশু শিল্পীরই শিল্পকর্ম, মায়ের জরায়ুতে যেমন করে মায়ের পুষ্টি নিয়ে বেড়ে ওঠে ভ্রূণ, শিল্পিমনের স্বপ্নে আর আশায় পুষ্ট হয় তার শিল্পকর্ম, যেন শরীরের বাইরে জন্ম নেয়া শিশু। যে শিশু শিল্পী গর্ভে ধারণ করেন নি, সেটি আসলে তারই মনের সৃষ্টি, আর সেটাই বাস্তব রূপ পায় তার নিজের হাতে বানানো শিশুর জামায়, কাপড়ে তোলা নকশি কিংবা আঙুলের ছাপে আঁকা ড্রইংয়ে। আরো বিস্ময় অপেক্ষা করে যখন দেখি শিল্পী পরম মমতায় সংগ্রহ করা নিজেরই মাথার পরিত্যক্ত চুলকে তার শিল্পকলার অংশ করে নিয়েছেন। আর এই ঝরে পড়া আর কিংবা শিকড়চ্যুত চুল প্রতীকী তাৎপর্যে অর্থবহ হয়ে ওঠে শিল্পী-জীবনের অভিজ্ঞতার নানা স্তরে। তার সেলাইয়ের কাজে সুতোকে প্রতিস্থাপিত করেছে চুল, আর এই চুল সংগ্রহ,পরিষ্কার ও তাদের সংরক্ষণ, সব কিছুই তার কাছে খুব সতর্কতার সাথে পরিকল্পিত ধারাবাহিক কোনো কাজের মতোই, যেন কোনো শিশুর প্রতিপালন। এভাবেই শিল্পী নিজের সাথে নিজের একটি সম্পর্ক গড়ে তোলেন, রূপান্তরিত হন তার নিজেরই জননী এবং সন্তানে।

শিল্পীর কথোপকথনের শব্দহীন অভিব্যক্তিগুলো কখনো রূপ পায় ছাদ থেকে মেঘের মতো ভেসে থাকা বারোটি শাদা জামা, কিংবা ছাদ থেকে মাটি স্পর্শ করা জরায়ুর দুটি হাতের রক্তাক্ত প্রতীকী ছাপসহ দীর্ঘ একটি জামা, যন্ত্রণার অস্বস্তিকর চুলসহ নকশিকাজের হৃদপিণ্ড, জরায়ুর বেশ কটি রূপ, ভ্রূণ, কাপড়ের খামে প্রজাপতির ভাঙা ডানা, কিংবা শুকনো বীজের একটি ডাল, সিল্কের ফিতায় চুল দিয়ে সেলাই করা সময়ের সাক্ষী হয়ে তাকিয়ে থাকা অষ্টাশিটি নক্ষত্রপুঞ্জ, কিংবা কাগজে হাতের আঙুলে ছাপে আঁকা অনুপস্থিত শিশুর জামায়।

লেটার টু মাই আনবর্ন চাইল্ড কল্পনার একটি প্রবেশ আর প্রস্থান বিন্দু, মাধ্যাকর্ষণমুক্ত বিষণ্নতার সাথে একটি ক্ষতকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস। সেলাই করে নকশি কাজকে নতুন করে উপস্থাপন করা, যাকে শিল্পী বিনির্মাণ করেছেন গল্প বলার গোপন শক্তিটির সম্ভাবতা যাচাই করার জন্য, সচেতন স্তরে সেটি শনাক্ত করার আগেই প্রথাগত উপস্থাপনায় সামাজিক মনস্তত্ত্ব আর আড়ষ্ট নিয়ম প্রায়শই যেখানে শুষে নেয় এর গল্প বলার আর স্বাধীন অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষমতা। ‘আমার অজাত শিশুর প্রতি চিঠি’র কাজগুলো শিল্পীর যে যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই জীবনে প্রবেশ করার দরজাটি সংবেদী কোনো দর্শকের মনে হতে পারে একটি ক্ষতচিহ্ন, যেখানে প্রবেশ আর বের হয়ে আসার পথেই শিল্পীর যন্ত্রণাময় শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতাটি প্রতিস্থাপিত হয় নন্দনতাত্ত্বিক সমীকরণের উভয় পাশেই। বিষণ্নতার নির্ভার সেই অনুভূতিগুলো আরো নিকটবর্তী করে শিল্পীকে আমাদের নিজেদের স্বীকৃতিহীন অনুভূতিগুলোর দুঃসহ বিলাপে।BeFunky Collage 01BeFunky Collage 02
শেষ কথা:

আসমা সুলতানা ছবি আঁকলেও মনটা কিন্তু কবির। কবিতাও লেখেন তিনি। যেখানে মূর্ত তার অধরাকে ধরার চিরবাসনা। হয়তো, মনে কবিতা না থাকলে, নৈঃশব্দ্যকে ধরার চেষ্টা না থাকলে, এভাবে মগ্ন থাকা যায় না। দূর দেশে বসেও মনে বাংলাকে ধারণ করা যায় না। মনে একটা শিশু অবয়ব ধারণ করে আছেন আসমা দীর্ঘদিন। এটা কখনো শব্দ, কখনো ছবি, কখনো মানবতা, কখনো স্বদেশ, কখনো স্মৃতি, কখনো শিল্পের উত্তরাধিকার। যে শিশু-জামা নিয়ে আসমার নতুন প্রদর্শনী, সেই বিষয় কিন্তু বেশ আগেই ঢুঁ মেরেছিল তার কবিতায়। দর্শকরা এই কবিতার সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন Letter to my unborn child প্রদর্শনীটি।

শব্দগুলো তখনো পায় নি কবিতার শরীর
অনুভূতিগুলো পায় নি নাম সেইদিনও, যাকে বলা যায় কবিতা
কবিতাগুলো তখনো অলিখিত, ছড়ানো ছিটানো ছিল
নক্ষত্রের বুদ্‌বুদে, জলের ঢেউয়ের কন্টুরে কন্টুরে,
আমার চুলের ক্লিপের দুই বাহুতে… আঙুলে…
তোমার হাতে বাধা সুইস ঘড়ির কাঁটায়,
শব্দগুলো ছিল; আমাদের হৃদয়ের বোতাম বন্ধ জামাগুলোতে
অক্ষরগুলো ছিল রূপকথার খাঁচায় পোরা
সোনার টিয়া পাখির হীরে বাধানো ঠোঁটের ভাঁজে—
কবিতাগুলো তখনো কবিতা হয়ে ওঠে নি
আমার জরায়ুর ভেতর তখনও ঘুমন্ত ভ্রূণের মতো ছিল,
শেষ হেমন্তের সন্ধ্যাবেলায়, কালপুরুষকে সাক্ষী রেখে…

(মার্গিক মূর্ছনা: আসমা সুলতানা)

আসমা সুলতানা

চিত্রশিল্পী

ই-মেইল : meetasultana3@gmail.com