হোম চিত্রকলা বব ডিলানের মনোমুগ্ধকর ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

বব ডিলানের মনোমুগ্ধকর ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

বব ডিলানের মনোমুগ্ধকর ভাস্কর্য ও চিত্রকলা
828
0
তার কন্ঠস্বরের মতন তার ব্রাশ স্ট্রোকগুলো; সরাসরি, শিশুসুলভ ও প্রায়শ ভঙ্গুর। তিনি শৈল্পিক পরিপূর্ণতায় বিশ্বাসী নন, কিন্তু তার প্রত্যাশা হলো বিশালতা, একটা মুহূর্ত, একটা অনুভূতি! এর অভিঘাত মনোমুগ্ধকর।—(নিউ ইয়র্ক টাইমস)

বব ডিলান একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার ও কবিই শুধু নন, তিনি একজন শক্তিমান চিত্রশিল্পী ও ধাতব ভাস্কর হিশেবে সমধিক পরিচিতি পেয়েছেন তার অাপন দেশে। পশ্চিমে। যদিও তার এই বিশেষ শিল্প ক্ষেত্রেটি পাশ্চাত্যের মতন আমাদের এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে সেভাবে প্রচার কীর্তন হয় নি। তার এই শিল্প মেধা বিস্ময়টি প্রায় অনুচ্চারিত থেকে গেছে গায়ক ও কবি প্রতিভার ব্যক্তিত্বের কাছে! প্রায়শ আমরা লক্ষ করে এসেছি কী সঙ্গীতশিল্পী, কথাসাহিত্যিক, কবি, চলচ্চিত্রকার তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রটি অতিক্রম করে এই সুকুমার শিল্পটি নিয়ে তেমন কেউ যেন আর বিশেষ আগ্রহী হন না, আগ্রহী হন না কোনো চিত্র সমালোচক, লেখক, সাংবাদিক এমনকি মিডিয়াবৃত্ত। আবার এইটাও লক্ষ্যযোগ্য যে প্রায়শ এই মাধ্যমে তাদের কাজগুলোকে অনেকটা আনাড়ি সুলভ প্রকাশভঙ্গী হিশেবে দেখে! ফলে তা জনসমষ্টির দৃষ্টিগোচর হয় না! কিন্তু কালেভদ্রে আমরা দেখেছি তার ব্যতিক্রমও ঘটতে! ফলে এই লুকায়িত মাধ্যমটি শিল্পীকে, শিল্পের, শিল্পী জীবনের সাথে আরো একটা অনুষঙ্গ যোগ করে।

Bob_Dylan_Two_Sisters_75657_No_Frame
বব ডিলানের আঁকা টু সিস্টার্স

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ বয়সের জলরঙের কাজগুলোর কথা বলা যেতে পারে। সেগুলো আধুনিক শিল্পকর্ম হয়ে উঠে এসেছিল। সেই প্রতিকৃতির ছবিগুলো, লোক চরিত্রগুলো যা কথা বলে ওঠে; আর কবিতার খাতার সেই হিজিবিজি কাটাকুটি তার সে ভয়ংকর রূপ যেন, মৃত্যু চিন্তার ব্যাখ্যা চলে অবিরাম। আমাদের সময়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকও চিত্রকর্মে মনোযোগ দিয়েছেন। তাদের এই চর্চার শিল্পমূল্য কতটকু তা যাচাইয়ের চেয়ে, আমার মনে হয় তাদের নিজস্ব জায়গায় তার মূল্য অপরিসীম। তেমনি আমাদের সমকালীন জার্মান কথাসাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের ছাপচিত্রের কাজ, যুক্তরাষ্ট্রের ঔপন্যাসিক কুর্ট ভনেগাটের চিত্রের কাজও অপূর্ব আধুনিক কাজ, যা ফর্মে, কী শৈল্পিক বিন্যাসে উজ্জ্বল।

Man On A Bridge' from Bob Dylan's Drawn Blank Series
ম্যান অন এ ব্রিজ, বব ডিলানের ব্ল্যাঙ্ক সিরিজ থেকে

তাদের দুইজনের ছাপচিত্রের কাজে দেখি অসাধারণ নির্মাণকৃতি। কিন্তু তাদের উভয়ের কাজের ফলশ্রুতিতে আমরা প্রায়োগিক শিল্প হিশেবেও দেখতে পেয়েছি, বইয়ের প্রচ্ছদ হিশেবে কিংবা বইয়ের ভেতরের পাতার অঙ্গবিন্যাসে। বব ডিলানের ক্ষেত্রে, আমাদের তার চিত্রকর্মকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

বব একাধারে চিত্রশিল্পী তেমনি একজন আধুনিক মেটাল বা ধতব ভাস্কর্য শিল্পকর্মের একজন একনিষ্ঠ শিল্পী। অন্তত তার সমসাময়িক স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী ও গীতিকার লিওনার্ড কোহেনের তুলনায়, এমন কী সমকালীন অনেক শিল্পীদের তুলনায়। কোহেন নিজেও একজন চিত্রশিল্পী, কিন্তু তার মোটা ও চিকন দাগের ইলাস্ট্রেশন কিংবা বিভিন্ন মুখাবয়ব নির্ভর প্রতিকৃতির ছবির মুনশিয়ানার চেয়ে বব’কে মনে হয়েছে অনেক উঁচু স্তরের শিল্পী (যদিও আমি কোহেনের লিথোগ্রাফির ছাপচিত্রের ভক্ত। ম্যাঞ্চেস্টারে সেই প্রদর্শনী দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল)। 


যুদ্ধবিরোধী কবি বব ডায়লান যেন এই অসম বিষয়কে ঐক্যবদ্ধ করেছেন অবিমিশ্র জ্যাজ সংগীতের মতন এই ধাতব রিলিফ ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে।


ভাস্কর্য: শিরোনামহীন ২, বব ডিলান
ভাস্কর্য: শিরোনামহীন ২, বব ডিলান

ধাতব শিল্প মাধ্যম তার জলরঙের ফিগারেশনে আছে এক অপূর্ব দক্ষতা আর পরিপক্বতা! তেমনি তার হাতের ওয়েলডিং আছে ফর্ম অন্বেষী ধাতব শিল্পকলার আধুনিক অনুরণন। আমরা এইখানে তার ফর্মের স্পেসে ভরে তুলতে দেখি বিবিধ পরিচিত ধাতব ব্যবহার্য জিনিশ পত্র। ববের হাতে অত্যন্ত শ্রমসাধ্য সেই অক্সি-অ্যাসিটিলিন গ্যাসের দুর্মর জোড়াতালির ধাতব ভাস্কর্যে নানাবিধ পরিত্যক্ত রসদের মেলবন্ধন গড়ে উঠে ঈর্ষান্বিত নান্দিকতায়। কখনো আনুভূমিক কখনো বর্গাকৃতি স্পেসে নানাবিধ বস্তুর সমাবেশ। এখানে সাইকেলের চেইন নিমিত্তে বৃত্তাকৃতির বোল্ট, কখন সাইকেলের চেইন, মেটাল স্প্রিং, প্লাস, কিমা তৈরির যন্ত্র, স্ক্রু ড্রাইভার, লোহার রড, ধাতব পাত কেটে আনেন নানা ফর্ম, স্টেইনলেস স্টিলের নানা উপকরণে সজ্জিত হয়। সবকিছু মিলেমিশে আছে সমন্বিত রূপে। আমার কাছে এই কম্পোজিশন জ্যাজ মিউজিকের মতন। জ্যাজ যদি অসম বাদ্যযন্ত্রের ঐক্যতান তৈরির অভিপ্রায়ে রচিত হয়, তেমনি আমাদের বিদ্রোহী সত্তা ও যুদ্ধবিরোধী কবি বব ডায়লান যেন এই অসম বিষয়কে ঐক্যবদ্ধ করেছেন অবিমিশ্র জ্যাজ সংগীতের মতন এই ধাতব রিলিফ ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে।

জার্মান শিল্প-উপস্থাপিকা ইংগ্রিড মোসেঙ্গারের পর্যবেক্ষণ : বব ভীষণ রকমের খেয়ালি মানুষ, নিজের খেয়াল খুশিতে তিনি প্রতিনিয়ত চলা ফেরা করতে ভালোবাসেন। এই শিল্পকর্ম নিয়ে তার কোনো উচ্চবাচ্য নেই। তার শেষ বয়সের এই শিল্পকৃতি প্রকাশিত হলেও যার স্ফুরণ সূচিত হয়েছিল ছাত্র অবস্থায়। এই বেলা শেষের শিল্প পর্বের নাম দিয়েছিলেন বব ‘ড্রন ব্ল্যাঙ্ক’ (শূন্য থেকে আঁকা) যা দৃষ্টিগোচরিত করে জার্মান শিল্প-উপস্থাপিকা ইংগ্রিড মোসেঙ্গার। ইংগ্রিড মূলত এই শিরোনামে অনেক গুয়াশ আর জলরঙের কাজের প্রতি আকৃষ্ট হন। এতে আরো আছে হাল আমলের ঈঙ্ক-জেটে ‘জিগক্লি’ (Giclee) গ্রাফিক্সের কাজ, ওতে নিখুঁত প্রিন্ট নেয়া যায়। এখানে বলে রাখি এই ভিন্নতর প্রিন্ট নেয়ার মূল হোতা হলেন ফরাসি শিল্পী জাঁক দুগ্যান। এটা তারই দেয়া নাম।

A-gallery-employee-poses-for-pictures-next-to-an-iron-gate-artwork-called-Untitled-VI-designed-by-US-musician-Bob-Dylan
বব ডিলানের শিরোনামহীন-৬ ভাস্কর্যের সামনে জনৈকা গ্যালারিকর্মী

প্রসঙ্গে ফিরে আসি, তিনি বব’কে একটা প্রদর্শনীর প্রস্তাব দিলেন জার্মানির কেম্নিৎজ শহরে তার কুন্সটালুগেন মিউজিয়ামে। ২০০৬ সালে বব প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে তা ইংগ্রিডকে যারপরনাই আহ্লাদিত করে। ইংগ্রিড আশা করেন নি এই নিউ ইয়র্কবাসী খেয়ালি মানুষটি এত সহজে সম্মতি দেবেন। এইটি কিন্তু ববের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী। তারপর আরো কিছু প্রদর্শনী হয় অস্ট্রেলিয়ায়, আরো কিছু দেশে। এভাবে শুরু হয় বব ডিলানের সিরিজ চিত্রমালা ‘ড্রন ব্ল্যাঙ্ক’ (শূন্য থেকে আঁকা)। বব নিজে খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন ইংগ্রিড তার ছবি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে। ববের ভাষায়- ‘আমি যেন মনের মধ্য একটা শক্তি খুঁজে পেলাম, অনুপ্রেরণা পেলাম।। বব বহুকাল আগে থেকেই ছবির প্রদর্শনীর কথা প্রায় ভাবতেন যা প্রচার পেয়েছে হালে। নিজের ছবির পেছনের অনুপ্রেরণা কি, সেটি ববের জবানিতেই তুলে ধরছি। বব বলছেন – I paint mostly from real life. It has to start with that. Real people, real street scenes, behind the curtain scenes, live models, paintings, photographs, staged setups, architecture, grids, graphic design. Whatever it takes to make it work.’


ববের জলরঙ এবং গুয়াশের কাজে তার মুক্ত সঞ্চারণার ব্রাশ স্ট্রোকে মূর্ত হয় বিবিধ আনুভূতিক সংবেদন। কখনো মনে ভেসে ওঠে ভ্যান ঘগের কথা।


BeFunky Collage 03

BeFunky Collage Rail
ছবিক্রম: উপরে বাম থেকে- রবিবারের বিকেল বেলা ও ডেডস রেস্টুরেন্ট। নিচে- রেল লাইন সিরিজের দুই ছবি

ডিলান ধাতব ভাস্কর্যের কাজ ছাড়া মূলত ছবি আঁকেন জলরঙের এবং গুয়াশের; যাতে উন্মোচিত তার চোখের সম্মুখের বাস্তবতা, সত্যিকার মানুষের অবস্থান, রাস্তার বাস্তব চেহারা, স্থিরচিত্র, স্থাপত্য শিল্প এবং সকল কিছুর উপস্থাপনা করে গ্রাফিক্স মিডিয়ার ‘জিগক্লি’ প্রক্রিয়ায়। ববের জলরঙ এবং গুয়াশের কাজে তার মুক্ত সঞ্চারণার ব্রাশ স্ট্রোকে মূর্ত হয় বিবিধ আনুভূতিক সংবেদন। আমরা যদি তার রেললাইন ট্র্যাকের ছবিগুলো প্রত্যক্ষ করি, তাতে দেখব বর্ণের প্রলেপ থেকে শুরু করে বর্ণের নির্বাচন আমাদের বিবিধ কালখণ্ডে নিয়ে যায়, ছুঁয়ে যায়। বব সাঁঝের অবস্থানে আকাশ রাঙিয়ে তোলেন কোমল কমলা রঙের বর্ণপ্রভায় যা ভূমিতেও ছড়িয়ে দেন, একটা পূর্ণ আবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে। তেমনি আঁধারের পরিবেশ রচনায় আনেন সেই গভীর ক্ষণের মেজেন্টা রঙের প্রগাঢ়তা। কখনো কখনো মনে ভেসে ওঠে ভ্যান ঘগের কথা। বিশেষ করে ববের ‘দ্য থ্রি চেয়ার্স’ ছবির মতন কিছু চিত্রকর্ম দেখতে এমনটা মনে হয়। ইতালি কিংবা মেক্সিকো নিয়ে আঁকা বরের ছবিতে আমরা যে কম্পোজিশন লক্ষ করি তাতে ঘরবাড়ি নদী কি সমুদ্রের অবস্থানগত পরিপ্রেক্ষিত কখন খর্ব হয় নি। বব’কৃত ‘রবিবারের বিকেল বেলা’ চিত্রে এবং জলরঙের উপস্থাপনাগুলোতে অপূর্ব ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের আশ্চর্য সুন্দর প্রভাব আমরা লক্ষ করি। যদিও তার বর্ণপ্রভায় উচ্চকিত করে শিশুসুলভ প্রলেপন, আনাড়ি নয় একেবারে, যা তার নিবিড় ভালোবাসা প্রকাশক। এই প্রয়াস আমরা ‘জেলে’, ‘মোটেল পুল’, ‘রেললাইন-ট্র্যাক ‘ ‘সাইড ওয়াক ক্যাফে’ প্রভৃতি চিত্রকর্মে প্রত্যক্ষ করি। মনে হয় ইমপ্রেশনিস্ট শিল্প আন্দোলনের প্রতি ববের কোথায় যেন একটা ভক্তি শ্রদ্ধা আছে, আছে একটা দেখার আনন্দ। তাই তো তার হাতে বিকশিত হয় অবচেতনায় ইমপ্রেশনিজম তথা অভিব্যক্তিবাদী শিল্পবোধের চলনরীতি। এই সাথে একটা কথা যোগ করতে চাই, পশ্চিমের তথা তার স্বদেশিয় বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদকে আমাদের স্বদেশিয় অনুর্বর কর্ষিত ভূমিতে সেই সকল আধুনিক পরাকাষ্ঠের মতো বব ডিলানের চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করেন নি, নিয়েছেন মূর্ত চিত্রকলার স্বকীয়তাকে আরাধ্যভূমি হিশেবে।

নিজ ওয়ার্কশপে ভাস্কর বব ডিলান

পরিশেষে একটা কথা না বললে নয় যে, বব ডায়লানের শিল্পানুষঙ্গ যতই বিস্তৃত হোক না কেন, যত ক্ষেত্রে প্রসারিত হোক না কেন—বব কবি পরিচয়কে বড় করে দেখেন, এমনকি সঙ্গীত শিল্পীর চেয়েও। তিনি বলেন : ‘I consider myself a poet first and a musician second. I live like a poet and I’ll die like a poet.’—এই বক্তব্যে প্রত্যক্ষ করি কবিসত্তার প্রতি বব ডিলানের অসীম শ্রদ্ধাবোধ এবং দৃঢ় অঙ্গীকার।

আলমগীর ফরিদুল হক

জন্ম :
ষাটের দশকে, চট্টগ্রাম।

ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাহিত্য ও চলচ্চিত্র সমালোচক, প্রাবন্ধিক।

সম্পাদনা করেন :
'লুক থ্রু', 'চলচ্চিত্র চিন্তা' ও 'ইন্টারকাট'

ই-মেইল : shopnosrote@yahoo.com

Latest posts by আলমগীর ফরিদুল হক (see all)