হোম চলচ্চিত্র হালদা, শুধুই সিনেমা নয়

হালদা, শুধুই সিনেমা নয়

হালদা, শুধুই সিনেমা নয়
602
0

‘হালদা’ সম্পর্কে অনেকের ভালো-মন্দ আলোচনা শুনে ‘হালদা’ নিয়ে কিছু লেখার আগ্রহ জন্মাল। ‘হালদা’ শুধুমাত্র একটা সিনেমাই না, ‘হালদা’কে সাহিত্যের আঙ্গিকে বিচার করতে হবে। তাহলেই এর রস আস্বাদন করা যাবে।

প্রথমে অভিযোগ নয় প্রতিবন্ধকতা দিয়ে শুরু করব—মাত্র ২২দিনে ছবিটির শুটিং শেষ করার কারণে তৌকীর আহমেদ ‘হালদা’র স্পর্শকাতর জায়গাগুলোকে দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করাতে কিছুটা হলেও ব্যর্থ হয়েছেন।

যদিও আমি এটাকে ব্যর্থতা বলব না। এটাও এক ধরনের সফলতা। কারণ হাটহাজারীর অন্তর্গত হালদা নদী পারের মানুষ ও দর্শনার্থীর ভিড়ের মধ্যে কোনো সমস্যা ছাড়াই এত অল্প সময়ে শুটিং সফলভাবে শেষ করাও চাট্টিখানি কথা নয়।


হালদার মা-মাছ ধরার অপরাধে সাপের কামড়ে মরতে দেখি হতভাগা জেলে নিবারণকে—এ যেন তার পাপের শাস্তি। 


অনেকেই মনে করেন ‘হালদা’ জমাতে পারে নি। এক্ষেত্রে আমি বলব সবার সবকিছু উপলব্ধি করার ক্ষমতা থাকে না। ‘হালদা’ ছবির বিষয়গুলোকে আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা উপলব্ধি করতে পারি কিনা দেখা যাক :

১. নদী-কেন্দ্রিক জেলে জীবনের আর্তি।

২. দরিদ্র খাকার কারণে অপরাধমূলক কাজ করলেও দারিদ্র্যের অনুশোচনাবোধ।

৩. ডাকাতের কবলে পড়ে জেলেদের নিঃস্ব হওয়া।

৪. জেলেপাড়ার জেলেদের জীবনাচরণ।

৫. শোষকশ্রেণির নারী ও অর্থলিপ্সার মাধ্যমে জীবনসংকটে উপনীত হওয়া।

৬. কুসংস্কার ও লোকবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে জীবন বাস্তবতার প্রকাশ।

৭. সবকিছু ছাপিয়ে ভালোবাসার স্বর্গীয় প্রবর্তনা।

৮. অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিবাদ ও প্রতিশোধ।

৯. পুরুষশাসিত সমাজে নারী-নির্যাতন ও অবহেলিত জীবন।

১০. সত্য ও ন্যায়ের জয়।

১১. অন্যায় ও সমাজ-বিবর্জিত কাজের সত্য পরিণতি।

হালদা নদী-তীরবর্তী মানুষের জীবনাচারণই হলো ‘হালদা’ ছবির প্রেক্ষাপট। নদীর দুপারের একপারে অবস্থিত জেলে সম্প্রদায় এবং অন্যপারে শোষকশ্রেণি নাদের চৌধুরীর মতো মানুষরা—যারা কোনো না কোনো ভাবে শোষণ করে জেলেদের। তাই তো দেখা যায়, ডাকাতরা নাদের চৌধুরীর প্রতিপালিত।

অন্যদিকে জেলেদের একমাত্র ভরসা মাছ শিকার। সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে না পারলে জীবন চলে না। আবার সাগরে মাছ ধরাও সহজ না। সেখানে ওত পেতে থাকা জলদস্যুদের হাত থেকে তাদের নিরাপদে থাকতে হয়। জীবন হয়ে উঠে পেটের চিন্তা ও বাঁচার চিন্তায় আবিষ্ট। এভাবেই ‘হালদা’ ছবিটি গতিময় হয়ে ওঠে।

photo-1509442309
বদিউজ্জামান বদি রূপে মোশারফ করিম ও হাসু রূপে তিশা

ছবির শুরুতেই দেখা যায়, মনু মিয়া ও বদিউজ্জামানরা সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দস্যুদের কবলে পড়েও নিশ্চিত মৃত্যু থেকে ফিরে আসে। জীবিত ফিরে আসলেও তারা বেঁচে যায় না। দস্যুদের হাতে হারানো নৌকা, জালের চার লাখ টাকা মনু মিয়াকে পরিশোধ করতে হবে। তাই জমি বিক্রি করতে চায়। এদিকে ওপারের নাদের চৌধুরীর ১ম স্ত্রীর সন্তান হয় না বলে ২য় বউ ঘরে তুলবে। অর্থাৎ সে চায় আবার বিয়ে করবে এবং সেই বিয়ে ঠিক হয় মনু মিয়ার মেয়ে হাসুর সাথে—বিনিময়ে নাদের চৌধুরী মনু মিয়াকে চার লাখ টাকা দিবে। যদিও হাসু এ বিয়েতে রাজি হয় না, কারণ বদি ও হাসু একে অপরকে পছন্দ করে। বদি হচ্ছে বদিউজ্জামান যে মনু মিয়াকে দস্যুদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, তাই মা-বাপহীন ছেলেটিকে মনু মিয়া ও তার স্ত্রী ঘরে আশ্রয় দেয়। বদিও তাদের ভালোবাসা গ্রহণ করে থেকে যায় এবং একপর্যায়ে হাসুর সাথে তার প্রণয় তৈরি হয়।


যা কিছু অন্যায়, যা কিছু সমাজ বিবর্জিত তার কোনোকিছুকে স্বীকৃতি দেন নি পরিচালক তৌকীর আহমেদ। এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।


শেষ পর্যন্ত টাকার জন্য নাদের চৌধুরীর সাথে হাসুর বিয়ে হয়। বিয়ের পর হাসু সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়। কারণ নাদের চৌধুরী সন্তানদাতা হতে অক্ষম। যদিও সন্তান জন্ম না হওয়ার সমস্ত দায় পড়ে হাসুর উপর। এভাবেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের সকল অসামর্থ্য নারীর ঘাড়ে চাপে। কিন্তু সন্তানে ব্যাকুল হয়ে হাসু যখন ভিন্ন পথে গর্ভধারণ করে তখনও নাদের চৌধুরী নিজের অপারগতার শোধ তোলে হাসুকে লাঠিপেটা করে ।

এর আগে হালদা নদীর বিশেষত্ব তুলে ধরেন তৌকীর আহমেদ। হালদা নদী মাছের ডিম সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ স্থান। এখানে ডিমওয়ালা মা-মাছ ধরা পাপ এবং স্থানীয় মানুষের কাছে ঘোরতর অপরাধ। তাই তো অভাবের তাড়নায় মনু মিয়া হালদা থেকে মা-মাছ ধরার পর সে অপরাধবোধে ঘুমাতে পারে না। মনু মিয়ার মেয়ে হাসু এ কথা শোনার পর বাবার উপর রাগ করে। মা-মাছ তথা হালদা নদীকে নদী-পারের জেলেরা শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও ধনী-শ্রেণির কাছে তা ভোগ ও বিলাসিতার বস্তু। মনু মিয়া বাজারে মা-মাছ বিক্রি করতে গেলে তাকে অপরাধী বলে তাড়িয়ে দিয়ে নিজেই মাছটা হাতিয়ে নেয় নাদের। আবার হালদার মা-মাছ ধরার অপরাধে সাপের কামড়ে মরতে দেখি হতভাগা জেলে নিবারণকে—এ যেন তার পাপের শাস্তি। আবার নদী পারে ইট ভাটার কারণে নদী যে নাব্যতা হারাচ্ছে, মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে এসব বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে ছবিটিতে। নদী রক্ষা কমিটির মধ্য দিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি লোকরা যে ঘুষ খেয়ে আইন অমান্য করে ইট ভাটা চালু রাখে সেই দৃশ্যও দেখানো হয়।

মোদ্দাকথা, হালদা নদীর গুরুত্ব ছবিটিতে পুরোপুরি তুলে ধরেছেন তৌকীর আহমেদ। এই ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোনোকিছুকে অস্বীকার না করা, যা পরিচালক তৌকীর আহমেদ ও গল্পকার আজাদ বুলবুলকে স্বকীয়তা দিয়েছে। অর্থাৎ নদী পারের মানুষের জীবনের কোনোকিছুকে অস্বীকার করা হয় নি।

তাই তো বিবাহিত হাসু নাদের চৌধুরীর ঘরে অসুখী হয়ে বা নাদের চৌধুরীর সন্তান জন্ম দেয়ার অক্ষমতাকে বুঝতে পেরে বদিউজ্জামানের সাথে মিলিত হয়। এবং তার সন্তানই নিজের পেটে ধারণ করে। এমন অনৈতিক ও পরকীয়ার ফল হলেও ভালোবাসার অমোঘ সত্য তুলে ধরেন।

‘সন্ধ্যার সময় কাক ডাকা বিপদের লক্ষণ’ এমন লোকবিশ্বাসকে তুলে ধরেন কাহিনির প্রয়োজনে। ‘ধনী পরিবার গরীব ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে দুটি কারণে—বউ দেখতে হবে পরীর মতো আর খাটতে হবে দাসীর মতো।’

‘বিয়ের পর একটি মেয়ে তার আসল পরিচয় ভুলে যায় অর্থাৎ তার নিজস্বতা থাকে না। নিজের নামটা পর্যন্ত মনে রাখে না কেউ। সে কারো কাছে হয় বউ, কারো কাছে বউমা, কারো কাছে অমুকের স্ত্রী বা অমুকের ছেলের বউ, কারো কাছে অমুকের মা ইত্যাদি।’ নিজের পরিচয় হারিয়ে এমন আর্তনাদে যখন দিলারা জামান ওরফে সুরৎ বানু কেঁদে উঠে তখন আমার মন না কেঁদে পারে না।

এমন সব ডায়লগের মধ্য দিয়ে আমাদের চিরদিনের দেখাকে ভাষায় রূপান্তরিত করে আমাদের সামনে হাজির করার পরও কিভাবে বলি তৌকীর পারেন নি।

1510242641_4
নাদের চৌধুরী রূপে জাহিদ হাসান ও হাসু রূপে তিশা

সতীনের মাঝে স্বার্থপরতার যে চিরায়ত চিত্র তা আঁকতেও ছবিটিতে কোনো পক্ষপাতিত্ব দেখি নি। নাদের চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী যেমন স্বামীর ভাগ দিতে পারে নি, তেমনি হাসুও চাবিগোছা নিজের আঁচলে নিতে দেরি করে নি। বরং প্রথম স্ত্রীর ষড়যন্ত্রে বাড়ি থেকে গিয়ে ফিরে আসার পর প্রথমেই চাবিগোছা নিজের কাছে নিয়েছে এবং তাকেও বাড়ি থেকে তাড়াতে কুণ্ঠাবোধ করে নি। অথচ চাইলেই ক্ষমা করে দিতে পারতো। কিন্তু তৌকীর কোনোকিছুই অস্বীকার করেন নি।

সবকিছু ছাপিয়ে আমরা যেটা দেখতে চাই, প্রেমের শুভ পরিণতি। কিন্তু পরিচালক সেটাও দেখান নি। বদি ও হাসু পালিয়ে গিয়েছিলেন প্রেমের টানে। তারা সুখের সংসারও করেছিল। কিন্তু তাদের সংসার কি সমাজ স্বীকৃত নাকি ধর্ম স্বীকৃত?

না কোনোটাই না। তাই পরিচালকও তাদের প্রেমের স্বীকৃতি দেন নি। যা কিছু অন্যায়, যা কিছু সমাজ বিবর্জিত তার কোনোকিছুকে স্বীকৃতি দেন নি পরিচালক তৌকীর আহমেদ। এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।


নাদের চৌধুরীর পরিণতি, হাসুর পরিণতি, বদিউজ্জামানের পরিণতি, জেলে নিবারণের পরিণতি এবং ইটভাটার পরিণতি সবকিছুই যেন সত্যের শেষ অবস্থা।


একথা বলতে কারোরই দ্বিমত থাকার কথা না যে, ‘হালদা’তে কোনোরকম অন্যায় তৌকীর মেনে নেন নি। অন্যায় তা যেমন হোক একদিন না একদিন, কোনো না কোনোভাবে সত্যের কাছে পরাজিত হবেই। তাই নাদের চৌধুরীর পরিণতি, হাসুর পরিণতি, বদিউজ্জামানের পরিণতি, জেলে নিবারণের পরিণতি এবং ইটভাটার পরিণতি সবকিছুই যেন সত্যের শেষ অবস্থা।

ছবিটিতে অভিনয় করেছেন  জাহিদ হাসান (নাদের চৌধুরী), মোশারফ করিম (বদিউজ্জামান বদি), তিশা (হাসু), ফজলুর রহমান বাবু (মনু মিয়া) দিলারা জামান (সুরৎ বানু) ইত্যাদি প্রধান চরিত্রগুলো নিজ নিজ স্থান থেকে প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন। যদিও তাদের অনেকের মধ্যে ভাষাগত সমস্যা দেখা গিয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা হওয়ায় দর্শকেরও বুঝতে মুশকিল হয়েছে মাঝে মাঝে। জাহিদ হাসানের মুখে আঞ্চলিক টানটা পুরোপুরি আসে নি তবে অভিনয়ে তা পূরণ করে দিয়েছেন তিনি। বাবু, তিশা, মোশারফ এদের কথা আর কী বলব, সবার অভিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখেছি।

গল্পের এত এত বিষয়কে দুই ঘণ্টা সতের মিনিট ফর্মে আবদ্ধ করা ছিল দুঃসাহসিক কাজ। তাই পরিবেশ, সময় আর প্লটের মাঝে কিসের যেন একটা অভাব ছিল। এ কারণে মনে হচ্ছিল কাহিনি একই জায়গায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে আরও সময় নিয়ে শুটিং করলে হয়তো এই অভাববোধ থাকতো না।

গল্পকার আজাদ বুলবুলকে প্রশংসা জানাতেই হয় এত সুন্দর মৌলিক গল্পের জন্য। আর তৌকীর সেই গল্পটাকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে আমাদের তথা বাংলা সিনেমায় আরও একটি মৌলিক সাহিত্যশৈলী ছবি যোগ করেছেন।

আমাদের হালদা নদী হয়ে উঠুক মৎস্য উৎপাদনের নিরাপদ বাসস্থান এই কামনায় ‘হালদা’ ছবির সাথে জড়িত সবাইকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ।

হালদা-নিউজ-২-picsay
হালদা পরিবার

 

নীল রফিক

জন্ম ৯ মে, ১৯৯৩; বুড়িঘাট, নানিয়ারচর, রাঙ্গামাটি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় (শেষ বর্ষ) অনার্স করছেন।

ই-মেইল : neelrafique5@gmail.com

Latest posts by নীল রফিক (see all)