হোম চলচ্চিত্র হালদা নিছক কোনো বিনোদনমূলক সিনেমা নয়

হালদা নিছক কোনো বিনোদনমূলক সিনেমা নয়

হালদা নিছক কোনো বিনোদনমূলক সিনেমা নয়
492
0

বরাবরের মতো চট্টগ্রামের আলমাস হলের ঝাপসা পর্দায় সিনেমা দেখা হলো। এই হলে সিনেমা দেখা বিরক্তি থাকা সত্ত্বেও ‘জয়যাত্রা’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘অজ্ঞাতনামা’ নির্মাণকারী তৌকীরের সিনেমা দেখার জন্য দর্শকদের ভিড় ছিল হল জুড়ে।

চট্টগ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে বহমান হালদা নদী এবং নদীকে ঘিরে মানুষের জীবনযাপনের নানা টানাপোড়নের সম্পর্ক, বাস্তবিকতা এবং নদীর উপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শোষণ, মাছ নিধন, এসব থেকে নিস্তারে হালদা-পারে বসবাসকারীদের প্রতিবাদ যা সব ছিল প্রধান উপজীব্য। কাহিনি সংলাপে সিনেমার ধারাবাহিকতা আমার কাছে বেশ জোরাল মনে হয়েছে। বদির আর হাসুলির প্রেম, হালদা পারে তাদের ঘর করার স্বপ্ন, হালদার বুকে বাঁচার চেষ্টা। সিনেমার গভীরে গেলে বুঝা যায়, হালদা নদী যেটা একটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র যা এখন আমরা ধ্বংস করছি কত সহজে, জেনে শুনে এবং সেই সাথে নদীর মাছ না হওয়ার কারণ যে কী সেই প্রশ্নটি এখানে ছুড়ে দেয়া হয়। নাদের চরিত্রটি এখানে বেশ জোরাল, যে কিনা স্বার্থান্বেষী মহলের হয়ে হালদা ধ্বংস করে যাচ্ছে।


প্রায় পুরো সিনেমা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত। যার মধ্য দিয়ে সিনেমার প্রকৃত স্বকীয়তা ফুটে ওঠে 


যাই হোক, এখানে তৌকীরের গল্প বলার সহজ উপস্থাপনে নতুনত্ব দেখা গিয়েছিল, কিন্তু গল্পের প্রেমের কাহিনিতে খুব বেশি নতুনত্ব ছিল বলে মনে হয় নি—যা সচরাচর, এরকম আগেও আমরা দেখেছি। নদী এবং নারীর জীবন, সেই সাথে মানুষের বাঁচার সংগ্রাম নদী রক্ষার্থে এর সাথে প্রেমের উপস্থাপন একটা নতুন আবহ সিনেমার প্রকাশভঙ্গিতে দেখা যায়। প্রায় পুরো সিনেমা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত। যার মধ্য দিয়ে সিনেমার প্রকৃত স্বকীয়তা ফুটে ওঠে এবং গ্রাম বাংলার আবহের চরিত্রগুলোয় সিনেমার প্রকৃত প্রাণ খুব সাবলীলভাবে তৌকীর তুলে ধরতে পেরেছেন বলে মনে করি। যদিও অভিনেতাদের আঞ্চলিক টানে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল। তারপরও তিশা আর মোশাররফ করিমের চেয়ে জাহিদ হাসান, ফজলুর রহমান বাবুর কিছুটা টান ঠিক মনে হয়েছে। তবে সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে অতি মাত্রায় আঞ্চলিকতার ডায়ালগে সিনেমা সব রকম দর্শকের কাছে পৌঁছানটাও বিবেচনার ছিল, যা পরিচালক রপ্ত করেছিলেন।

মুভির মূল চরিত্রগুলোতে অভিনয়ে ফজলুর রহমান বাবু, মোশারফ করিম, তিশা, রুনা খান এবং জাহিদ হাসান এরা সবাই বড় মাপের অভিনেতা। হাসুলি চরিত্রে তিশাই বেস্ট, এই চরিত্রে তিশার মতো শক্তিশালী অভিনেত্রী আর কারো পক্ষে সম্ভব কিনা আমার জানা নেই। জেলে চরিত্রে বাবুর সহজ সরল প্রকৃত জেলের ভূমিকা জোরাল ছিল। যদিও-বা সিনেমায় তার চরিত্রে খুব বেশি গুরুত্ব ছিল না। এই সময়ে, আমার কাছে বাবুকে সেরা অভিনেতা বলে মনে হয়। সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি আমার কাছে ছিল নাদেরের চরিত্র, আর এই চরিত্রে অভিনেতা জাহিদ হাসান খুব যথাযথভাবে তার কাজটি করেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে নেগেটিভ ভূমিকায় সিনেমার গভীরতাকে আরো জোরাল করেছে তার এই অভিনয়। এই সিনেমার সেরাটা সে দিতে পেরেছে বলে মনে করি।

এই সিনেমায় চট্টগ্রামের অনেকেই বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাদের মধ্যে রবিউল আলম, জাঙ্গাঈর কবীর, খালেদ হেলাল, নাসির উদ্দীন খান-সহ আরো অনেকেই যারা চট্টগ্রামের থিয়েটার মঞ্চ অভিনেতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে জড়িত।

মুভির সিনেমাটাগ্রাফি অসাধারণ ছিল, রিয়েলিস্টিক আইডিয়ার মেটাফোর। হালদা পারের দৃশ্যগুলো, নৌকা আর আকাশের ভিজ্যুয়াল ইফেক্টগুলো চমৎকার।


 এই সিনেমায় নির্মাণশৈলীতে তৌকীর বেশ সফলভাবে  আরও একধাপ এগিয়েছে বলে মনে হলো।


সেই সাথে বজ্র আর মেঘের দৃশ্যায়নটা দারুণ—হাসু যখন গভীর রাতে বাড়ির উঠোনে বসে তার বাবাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল ডিমওয়ালা মাছ মারার শোক ভোলাতে গভীর রাতে বাড়ির উঠোনে, দৃশ্যটা দারুণ। চিত্রগ্রাহক এনামুল হক আলো-ছায়ার খেলাতে কাহিনির সাথে যে যোগসূত্র, উপলব্ধিটা ক্যামেরার ফ্রেমে বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন। এই সিনেমার জন্য যতটুকু তার করণীয় ছিল তা এসেছে বলে মনে করি। পিণ্টু ঘোষের গান মুভির সৌন্দর্যকে আরো বর্ধিত করেছে, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও চমকপ্রদ। এছাড়াও পালা গান ছিল। গ্রাম বাংলার নদীর পারের মানুষের জীবনযাপনের সিমটম্পসগুলোতে বেশীরভাগই স্বচ্ছতা পরিলক্ষিত হয়।

হালদা সিনেমার মূল কাহিনি লিখেছেন চট্টগ্রামের আজাদ বুলবুল। এই সিনেমায় নির্মাণশৈলীতে তৌকীর বেশ সফলভাবে আরও একধাপ এগিয়েছে বলে মনে হলো। গ্রাম বাংলার নদী পারের মানুষের প্রকৃত আবহ সহজভাবে সিনেমায় আনতে পেরেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে সামাজিক মেসেজ মানবিক-অমানবিক দিকগুলো উপযোগ্য করে তুলেছেন। এমনকি মূল চরিত্রগুলোতে শিল্পী বাছাই-এ তার কোনো ত্রুটি ছিল বলে মনে হয় নি। নির্মাতা হিশেবে তৌকীর উপস্থাপন, ভঙ্গিমা, মিউজিক সাউন্ড সব কিছুর সমন্বয়ে শক্তিশালী নির্মাতার পরিচয় দিলেন আরেকবার। সব মিলিয়ে হালদা দর্শকের কাছে নিছক কোনো বিনোদনমূলক সিনেমা নয়, এটি একটি অনুভবনীয় ধারণার ছবি। অবশ্যই দর্শক হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখবেন। আনন্দের বিষয় এই প্রথম তৌকীরের সিনেমা ৯০ টি হলে রিলিজ পেয়েছে। হয়তো দর্শকের কাছে পরিচালক হিশেবে তৌকীর আহমেদ সেই মাত্রার বাণিজ্যধারার নির্মাতা হিশেবে পৌঁছাতে পারেন নি। কিন্তু আমি বলব তৌকীর আহমেদ এদেশের সিনেমার একজন সফল পরিচালক, যার কাজে সিনেমার প্রকৃত শৈল্পিক উপলব্ধিটা খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাকে অনুভব করা যায়। যা আমরা তার অন্যান্য সিনেমাতেও দেখেছি। একদিন দর্শক সেই মাত্রায় গিয়ে পৌঁছাতে পারবে বলে আশা রাখি।

দেবাশীষ ধর

কবি, গল্পকার, গদ্যকার ও অনুবাদক। জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৯; চট্টগ্রাম।

শিক্ষা : গণিতে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : গণিতের শিক্ষক, মীপস পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, চট্টগ্রাম।

সম্পাদক :
বাঙাল, ঘুণপোকা [ছোট কাগজ]

প্রকাশিত বই :
ফসিলের কারুকাজ [কবিতা, অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : debdhar121@gmail.com