হোম চলচ্চিত্র সোলানাসের ‘স্যুর’

সোলানাসের ‘স্যুর’

সোলানাসের ‘স্যুর’
458
0

Movie: Sur, 1988
Director: Fernando E. Solanas

১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ১২৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই আর্জেন্টেনিয়ান সিনেমাটি নিয়ে লিখতে বসার মূল কারণ হলো, এর চিত্রনাট্য ও কাহিনির ব্যতিক্রমী বিস্তার। কিভাবে একটি কাহিনিকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে পুনরায় তাকে জুড়ে দিয়ে করে তোলা হচ্ছে বিশাল থেকে বিশালতর এবং সব সমেত আমরা কত অনায়াস এটে যাচ্ছি সেই পরিধির মধ্যে-তারই অনবদ্য আখ্যান সোনালানের এই সিনেমাটি। ১৯৮৩ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক অভ্যুত্থান ও তার ফলে জন-জীবনে নেমে আসা দুর্ভোগ ও অশুভতার ছায়াতেই আলোকসম্পাত করতে চেয়েছেন সোলানাস, যেখানে তিনি একাধারে তুলে এনেছেন জীবনের টানাপোড়েন, রাজনীতি, নিপীড়ন, প্রেম, প্রতারণা, অস্তিত্বসংকট এবং নতুন আশা। সবগুলো এত চমৎকারভাবে একে অপরের সাথে এখানে মিশেছে যে, এই সিনেমাটিকে ডিসেকশন করতে গেলে কোনো একক সত্তা পাওয়া মুশকিল। কোনো বিশেষ চরিত্র বা অধ্যায়ের দিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ তৈরি করে না এর চিত্রনাট্য, আর সোলানাস এতে নিজের মেধা ও মনন যোগ করে তাকে তুলে নিয়ে গেছেন সেই পর্যায়ে, যেখানে যাবার জন্য অনেক পরিচালককেই আমরা বেরিয়ে আসতে দেখেছি প্রথাগত চলচ্চিত্র নির্মাণের অবস্থান থেকে এবং নিজস্ব সৃষ্টিশীলতায় নির্মাণ করেছেন এমন সব চলচ্চিত্র, যা আমরা স্মরণ করি আজও এবং করব, বহু বছর।

সোলানাসের সাথে আমার পরিচয় ঘটে ১৯৬৮ সালে তাঁর নির্মিত ডকুমেন্টরি, ‘দি আওয়ার অব দ্য ফারনাসেস’-এর মাধ্যমে এবং সেটা দেখে মুগ্ধ হয়েই শুরু করেছিলাম তার ছবি সংগ্রহ করতে। এটি তাঁর তৃতীয় নির্মাণ এবং তিনি খুব ভালোভাবেই পেরেছেন আমাদের সামনে নিজের সৃষ্টিশীল মননের পরিচয় সুচারুভাবে তুলে ধরতে। যদি আমি সিনেমাটিকে চারটি মূল অংশে ভাগ করি, যেমন— চিত্রনাট্য, পরিচালনা, সঙ্গীত ও অভিনয়। তবে নিশ্চিতভাবেই প্রতিটি অংশই দাবি রাখে তাদের স্ব স্ব সৃষ্টিশীল অনন্যতার জন্য যথাযথ প্রশংসা। বিশেষ করে এর চিত্রনাট্য সিনেমাটিকে দিয়েছে এমন এক মাত্রা যে, যারা দেখবে, তারা ষোল আনাই টের পাবে, কিভাবে একটি চিত্রনাট্য বারবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে এবং আপনা-আপনিই জুড়ে গিয়ে সম্পূর্ণ একটি কাহিনির অনবদ্য অবয়ব গড়ে তুলছে কোনো রকম অসুবিধা ছাড়াই। বস্তুত এর কাহিনি, একের ভেতরে অসংখ্য মানুষের গল্প, যা পর্যায়ক্রমে রূপ নিয়েছে একটি সমাজ, জাতি তথা দেশ, এমনকি মানবজীবনের বাস্তব গল্প হিশেবেও।

ছবিটির শুরু হয় এক সন্ধ্যায়, রবার্তো নামের মধ্যবয়স্ক এক পুরুষের জেল থেকে প্রত্যাবর্তনের মধ্যে দিয়ে, যেখানে সে সাজা শেষ করে ফিরে আসে নিজ মহল্লায় এবং নিজের পরিচিত অবস্থানে ফিরে এসে এক এক করে স্মরণ করতে থাকে সেই সব উজ্জ্বল দিন, সঙ্গী-সাথি অথবা প্রিয়মানুষদের, যারা আজ আর নেই। সে আবেগতাড়িত হয় এবং নিজের ঘরে ফিরে না গিয়ে ঘুরতে থাকে মহল্লার রাস্তায় রাস্তায় আর খোঁজ করতে থাকে তাদের, যারা একসময় ছিল খুব কাছের ও প্রিয়। পুরোনো সব স্মৃতি তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে থাকে বারবার আর সে হাঁটতে থাকে উদ্ভ্রান্তের মতো। অতীতের প্রিয়-অপ্রিয় সমস্ত ঘটনাই মনে পড়তে থাকে এক এক করে আর সেই সব ঘটনায় সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ফিরে আসতে থাকে তার সামনে, বাস্তবরূপে। নায়কের এই নির্মম স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়েই চিত্রনাট্যের বিস্তার ঘটতে থাকে ক্রমশ, যা কিনা পর্যায়ক্রমে তুলে আনে সামরিক অত্যাচার, বিপ্লব, নিপীড়ন, হত্যা, প্রেম, প্রতারণা, হতাশা, ঘৃণা ইত্যাদি, এবং শেষ হয় নতুন আশার মধ্যে দিয়ে। এক সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত একটিমাত্র রাতের পটভূমিতে আমাদের সামনে আঁকা হয় সেই বিশালতম ক্যানভাস, যাতে ফুটে ওঠে জীবন ও বাস্তবতার বহুবিধ রং, যেখানে জীবিত বা মৃত উভয়ই এসে জড়ো হয়েছে আর কথা বলে গেছে একে অপরের সাথে, এমনকি, হয়তো, অলক্ষ্যে আমাদের সাথেও।

সবগুলো দিক থেকেই সোলানাস সিনেমাটিকে অনবদ্য করে তোলার প্রয়াস চালিয়েছেন। সঙ্গীত, আলোকসম্পাত—বিশেষ করে যারা ট্যাংগো ভালবাসেন তারা অবশ্যই মুগ্ধ হবেন প্রায় পুরো সিনেমা জুড়েই অ্যাস্তর পিজোলা ও রবার্তো গোয়েনচের মতো খ্যাতিমান ট্যাংগো শিল্পীদের অনবদ্য সঙ্গীত শুনে। এছাড়াও মুগ্ধ হবেন সিনেমাটির স্মৃতিচারণ বা আত্মকথন বর্ণনাতেও, যেখানে মৃত ব্যক্তিরা ফিরে আসছে এবং বাস্তব চরিত্রের মতো নায়কের সাথে কথপোকথনে বলে যাচ্ছে নিজেদের করুণ ও মর্মান্তিক পরিণতির কথা, আর তাকে মায়াবী কুহকতা দিতে সোলানাস ধোঁয়া, নীল রং, পরিমিত আলো, অসংখ্য টুকরো টুকরো কাগজ আর বাতাস যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে সিনেমাটি সত্যি-সত্যিই হয়ে উঠেছে স্মৃতির সেই মর্মান্তিক কবরস্থান, যেখানে আমাদের দর্শক সারিতে বসিয়ে রেখে, সোলানাস কমিউনিকেট করাচ্ছেন সেইসব আত্মার সাথে, যারা কোনো না কোনোভাবে হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনেরও অংশ।

সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য এই সিনেমা, যেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে নিপুণ দক্ষতায় বোনা হয়েছে জীবনবাস্তবতা ও প্রেমকে। মানুষের সামজিক জীবন ও নির্মম বাস্তবতাকে প্রায় সব কোণ থেকেই সোলানাস দেখিয়েছেন এই সিনেমাতে, সৃজনশীলতার উৎকর্ষ সহকারেই।

 

ফুল মুভি : স্যুর

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য