হোম চলচ্চিত্র সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’

সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’

সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’
1.02K
0

রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। এই উপন্যাস নিয়ে সত্যজিৎ রায় ‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমা নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসটি নিখিলেশ, বিমলা এবং সন্দীপ এই তিনটি চরিত্র এবং সেই সময়ের ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে ঘটনাপ্রবাহ বর্ণিত হয়েছে।

‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমা নিয়ে আলোচনার একটা তাগিদ বোধ করি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্যেও। একটি ধারাবাহিক মিল খুঁজে পাই উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে যারা রাজনৈতিক গুটি চালান বা ফায়দা পেতে চান তাদের সাথে।

বিমলা সে যুগের গৃহবন্দি নারী। যার স্বামী নিখিলেশ উদার শিক্ষিত যুক্তিপ্রিয় একজন জমিদার। নিখিলেশের ছাত্রকালীন কোলকাতার বন্ধু সন্দীপ, যিনি স্বদেশি আন্দোলনের একজন বড় কর্মী।

নিখিলেশ বিমলাকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন এবং সেই সাথে ইংরেজদের শিল্প-সংগীতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যাতে বিমলা মুক্তমনের একজন নারী হিসেবে নিজেকে বিকশিত করতে পারেন।

নিখিলেশ এবং সন্দীপ দুজনের স্বভাব এবং আদর্শগত মিল না থাকলেও নিখিলেশ সন্দীপের বন্ধুত্ব বেশ ভালো।

সন্দীপ স্বদেশি করেন। জমিদার নিখিলেশের আতিথ্য নিয়ে তার বাড়িতে থেকে সেই গ্রামে তার স্বদেশি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।

সত্যজিৎ রায় ঘরে-বাইরে নিয়ে সিনেমা করার পরিকল্পনা অনেক আগেই করেছিলেন। বিমলা নিখিলেশ এবং সন্দীপ—এই তিনটি চরিত্র উপস্থাপন করার জন্য তিনি পারফর্মার খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বিশেষ করে বিমলা চরিত্রের জন্য। শোনা যায় সুচিত্রা সেনকে সত্যজিৎ রায় চেয়েছিলেন এই চরিত্রটি করার জন্য। কিন্তু সুচিত্রা সেন রাজি হন নি। পরে স্টেজ-পারফর্মার স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত বিমলা চরিত্রে অভিনয় করেন।

রবীন্দ্রনাথ নিখিলেশকে দিয়ে বলিয়েছেন, হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে ছিল। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের উগ্র জাতীয়তাবাদ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কৌশলে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।

একটি ফায়দা হাসিলের রাজনীতি হিসাবে স্বদেশি আন্দোলনকে দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। যেখানে কোমলমতি দুর্দান্ত ট্যালেন্ট যারা, তারা সব ছেড়ে দেশমাতৃকার জন্যে ‘বন্দে মাতরম’ দীক্ষা নিয়েছে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে। যেমন মেধাবী ছাত্র অমল স্বদেশি আন্দোলন করে নিজেকে বিসর্জন দিতেও রাজি। সে বিমলার সাথে পরিচিত হয়ে চেতনার সুরে বলতে থাকে, ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’—শরীরের মৃত্যু হলেও আত্মার মৃত্যু নেই। কী অসাধারণ নেশাগ্রস্ত বাণী দ্বারা উদ্বেলিত যুবসমাজ!

সাথে সাথে মনে পড়ে গেল, আমাদের এই যুগের মেধাবী যুবকদের মাঝে অনেকে আছে এমনিভাবে মনে করে এই দুনিয়া কিছুই নয়। মৃত্যুর পরে তুমি সত্যিকার অনন্তকালের সুখভোগের দুনিয়া পাবে। এও তো একটি নেশা ধরিয়ে দেওয়া মন্ত্র। তাহলে পৃথিবীর সব চরমপন্থির লক্ষ্য এক আর তরিকা ভিন্ন?

সন্দীপকে ক্ষণকালের জন্য মানুষ দেখানো হয় নি। সবসময় তাকে ভিলেন দেখানো হয়েছে। সামন্ত চরিত্র নিখিলেশ এখানে নায়ক। বিবেচক দয়াবান ব্যক্তি। নিখিলেশ বলেন, ভারতবর্ষে মুসলমান আছে এবং থাকবে। এটাই বাস্তব সত্য। তাহলে কি মুসলমানরা স্বদেশিতে বিশ্বাসী ছিল না? কিংবা উল্টো করে বললে স্বদেশিরা মুসলমানদের মেনে নেয় নি?

ভারতবর্ষে প্রায় এক হাজার বছর মুসলমান-শাসন ছিল। তারা বসবাস করেছে, এই দেশ নিজের দেশ মনে করেছে। তাদের বাদ দিয়ে ভারতবর্ষ নয়। এই বোধ স্বদেশিদের মাঝে ছিল কিনা সেটি প্রশ্নবিদ্ধ।

বিমলা ঘরের বাইরে পা রেখে সন্দীপের মতো একজন ধান্ধাবাজের কবলে পড়েছে। তার মোহে মুগ্ধ হয়েছে। আবার ভুল বুঝতে পেরেছে। আবার স্বামীর কাছে ফিরে এসেছে। নিখিলেশ মানব-মনের এই দুর্বলতাকে সহজেই মেনে নেন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ‘বন্দে মাতরম’ শ্লোগান হিন্দুস্তানের সব ধর্মের মানুষের শ্লোগান হিসাবে মেনে নেওয়া হয় নি। রবীন্দ্রনাথ নিজেও সায় দেন নি।

স্বদেশিদের আত্মত্যাগ এবং স্বদেশি রাজনীতি—দুটোর সমন্বয় কখনো নেতারা ঘটাতে পারেন নি। জাতি দ্বিধাবিভক্ত। বাংলার মুসলমানদের ন্যায্য পাওনা পেতে হলে দেশ-বিভাগ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে নি। এই সত্য অনুভব করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

বিমলার সাথে কথোপকথনে নিখিলেশের উক্তি—‌’স্বদেশী জিনিসটা যাদের পয়সা আছে তাদের। গরীবদের জন্য নয়।’ নিখিলেশ রবীন্দ্রনাথের নিজের চরিত্র হয়ে উঠেছে, এটি পাঠক দর্শকদের বুঝতে দেরি হয় নি। সামন্ত প্রভুগণ কতটুকু জনগণের স্বার্থ দেখেছেন, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ করে মানুষকে। পূর্ববাংলার জমিদারি দেখাশোনা করতেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি ভালোভাবেই জানতেন এই দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা।

স্বদেশি আন্দোলন মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশগ্রহণে বিপ্লবের এক্সপেরিমেন্ট বলা যায়। তখন মুসলমানরা সবে ইংরেজি শিক্ষা শুরু করেছে। পূর্ববাংলার মুসলমান সংখ্যাগুরু কৃষকদের বেশির ভাগ জমিদার ছিলেন হিন্দু। রবীন্দ্রনাথ তাদেরই একজন। তিনি নিজেকে পোট্রেট করেছেন ঘরে-বাইরে উপন্যাসে। স্বদেশির মতো একটি চেতনাকে বাস্তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণির করে তোলা যায় নি। যারা কিনা গরিব কৃষক, তাদেরকে আন্দোলনের মূলধারায় কখনো আনা যায় নি।

‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমায় তৎকালীন শিক্ষিত সামন্ত সমাজের প্রতিনিধি নিখিলেশের চোখ দিয়ে দৃশ্যপট বর্ণিত হয়েছে। যেখানে বারবার ব্যক্তি-রবীন্দ্রনাথের ছায়া পরিলক্ষিত হয়।

বর্তমান রাজনীতির সাথে অনেক সাজুয্য মেলে ‘ঘরে-বাইরে’র সন্দীপ চরিত্রটির মধ্য দিয়ে। ছবিটিতে নিখিলেশ চরিত্রে ভিক্টর ব্যানার্জি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনবদ্য অভিনয় করেছেন। সন্দীপ চরিত্রে সৌমিত্র মানানসই। বিমলা চরিত্রে স্বাতীলেখা কখনো অসাধারণ অভিনয় করেছেন, আবার কখনো মনে হয়েছে যেন কিছু বাদ পড়ে গেছে। বাকি সবার অভিনয় যথাযথ—সত্যজিতের ছবিতে যেমনটি হয়।

‘ঘরে-বাইরে’ সত্যজিৎ রায়ের একটি কঠিন শ্রমনিষ্ঠ কাজ। পোশাক নির্বাচন থেকে গৃহশয্যা প্রায় নিখুঁত। গ্রামের হাট, মোল্লাদের ওয়াজ, দূর থেকে ভেসে আসা গ্রামের দৃশ্যপট—সব কিছু স্বাভাবিক মনে হয়েছে। তবে ঘাট থেকে বিলেতি দ্রব্য লুণ্ঠনের দৃশ্য দেখালে দর্শক আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারত বিষয়টি। এই ছবিতে স্টেজ থিয়েটারের মতো সংলাপের ওপর নির্ভর করে তবে বুঝে নিতে হয়। সেই কাজটি ভিক্টর ব্যানার্জি পরিপূর্ণভাবে দেখিয়ে দিতে পেরেছেন।

Shirin Osman

শিরিন ওসমান

জন্ম ৩১ মে, সিলেট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বি এ। পেশা ব্যবসা।

ই-মেইল : shirin.osman31@gmail.com
Shirin Osman