হোম চলচ্চিত্র সত্যজিতের ‘সদগতি’ এবং সনাতনধর্মীদের অচলায়তন

সত্যজিতের ‘সদগতি’ এবং সনাতনধর্মীদের অচলায়তন

সত্যজিতের ‘সদগতি’ এবং সনাতনধর্মীদের অচলায়তন
242
0

সত্যজিৎ রায় হিন্দি চলচ্চিত্র নিয়ে কখনো তেমন আগ্রহী ছিলেন না। হিন্দি চলচিত্রের ধারা কখনো তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। হিন্দি ছবি পরিচালক শ্যাম বেনেগাল যখন জীবনঘনিষ্ঠ কাহিনিভিত্তিক ছবি বানানো শুরু করলন, তখন থেকে তিনি হিন্দি অভিনয়-শিল্পীদের অভিনয় দেখে আকৃষ্ট হন। শ্যাম বেনেগালের সাথে তখন সত্যজিৎ রায়ের একটি বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি নাসিরউদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, সঞ্জীব কুমার, স্মিতা পাতিল, ওমপুরি এদের অভিনয় দেখে হিন্দি সিনেমা বানানোর চিন্তা তার মনে কাজ করতে শুরু করে। তিনি দুটি হিন্দি ছবি নির্মাণ করেন। একটি হলো ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’। অন্যটি দূরদর্শন পরিচালিত ‘সদগতি’। এই দুটি ছবি মুন্সি প্রেমচাঁদের কাহিনি অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেন।

সদগতি ছবিটি সত্যজিৎ রায় স্বাধারনত যেরূপ সিনেমা তৈরি করেন তার থেকে অনেকটা ব্যতিক্রম। পথের পাঁচালী, অশনি-সংকেত ছবিগুলোয় চিরায়ত গ্রামবাংলার চালচিত্র উঠে এসেছে। ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে, যেমনটি ঘটে থাকে। কিন্তু সদগতি ছবিটি এতই বাস্তব—ব্রাহ্মণদ্বারা সমাজজীবন কিরূপ কঠিন এবং নির্মমভাবে চলমান, যা দেখে দেখে হিন্দু সমাজের গা- সওয়া হয়ে গেছে। ক্লাস সিস্টেমের এই নির্মমতা প্রকাশে লেখক প্রেমচাঁদ কোনোরূপ বাড়াবাড়ি করেন নাই। একেবারে ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইটের মতো তরতর করে বর্ণনা করে গেছেন।


সুখিয়ার ছায়া দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে, এতে ব্রাহ্মণের অশুদ্ধি হয়েছে।


নিচুজাত সুখিয়া তার মেয়ের বিয়ে দিবে। নিয়মানুসারে ব্রাহ্মণ গৃহে এসে এই রসমটি পালন করে দিয়ে যান। সুখিয়া মাত্র জ্বর থেকে উঠেছে। ব্রাহ্মণের বাড়ি গিয়ে বলবে তার মেয়ের বিয়ে হবে, ব্রাহ্মণের চরণধূলি লাগবে। সুখিয়া বিষয়টি ব্রাহ্মণকে অবগত করে। ব্রাহ্মণ তখন সুযোগ বুঝে বিনা পয়সায় কামলার কাজে লাগিয়ে দেয়। তাকে দিয়ে এটা-ওটা কাজ করাতে থাকে। দুর্বল সুখিয়া ক্লান্ত বোধ করে। না খেয়ে আছে। ব্রাহ্মণ তার স্ত্রীকে বলে কিছু খাবার দিতে। স্ত্রী বিরক্ত হয়ে না করে দেয়। কারণ সুখিয়ার ছায়া দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে, এতে ব্রাহ্মণের অশুদ্ধি হয়েছে।

সুখিয়াকে একটি শক্ত কাঠের গুঁড়ি কেটে লাকড়ি বানাতে বলে। এত শক্ত কাঠ, কুঠার কোনোভাবেই কাজ করে না। অন্য আরেক চামার, যে সুখিয়ার পরিশ্রম দেখে কষ্ট পাচ্ছিল, সে তাকে নিয়ে যায়; হুঁকায় ছিলিমে টান দিলে কাজের দম পাবে, তাই। সুখিয়া কুঠার চালাতে থাকে। বৃষ্টি আর বিজলি ভরা আকাশ। কোনো শব্দ না পেয়ে ব্রাহ্মণ বাইরে এসে দেখে সুখিয়া মরে পড়ে আছে। গ্রামের লোকজন কেউ সুখিয়ার মরদেহ সৎকার করতে রাজি হয় না। তারা সকালে পুলিশ আসার অপেক্ষা করে। সুখিয়ার স্ত্রী ঝুরিয়া এসে স্বামীর মরদেহ দেখে বুঝে যায় কেন তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। সে আহাজারি করতে থাকে। তাদের মেয়ে ধানিয়া বাবার জন্য ঝর ঝর করে চোখের জল ফেলে। এই হলো অচ্ছুত সম্প্রদায়ের চিত্র। ব্রাহ্মণ সকাল হবার আগে দড়ি দিয়ে টেনে নদীর ঘাটে ফেলে দিয়ে আসে। সুখিয়ার সদগতি এভাবেই শেষ হয়। যাকে বলে শেষকৃত্য।

সত্যজিৎ রায় সদগতি ছবিটি পুরোপুরি অভিনেতা-অভিনেত্রীর ওপর ছেডে দেন। ব্রাহ্মণ সমাজের হাজার হাজার বছরের চালচিত্র। ভারতীয় সনাতনী ধর্মের বিভেদ। এই প্রথা আজো তারা মেনে চলে। ব্রাহ্মণ ছাড়া তাদের জীবন অচল। ওরা যা নির্ধারণ করবে সেটাই নিয়ম। সেটাই ধর্ম।

সত্যজিৎ রায় আর কোনো ছবিতে হিন্দু ব্রাহ্মণসমাজকে এভাবে খোলামেলা দেখান নি।

ওমপুরি, স্মিতা পাতিল যেভাবে চরিত্রগুলোকে তুলে ধরেছেন, মুহূর্তের জন্য মনে হয় নি এরা অভিনয় করছেন। ছবিটি দেখে স্তব্ধ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

ক’দিন আগে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অমর্ত্য সেন ভারতীয় জাতপাত নিয়ে তীব্র আক্রোশ প্রকাশ করেছেন। ভারতে অচ্ছুত সমাজ কিংবা ক্লাস সিস্টেম বজায় রেখে কোন মানবতা সাধন করবে? সেটি তাদের রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি কিংবা ব্রাহ্মণনীতি জানে। আমি এও জানি, একজন আইসিএস অফিসার যদি অচ্ছুত সমাজের হন তিনিও অন্যদের গ্লাসে পানি পান করতে পারবেন না। তার জন্য নির্দিষ্ট গ্লাস, পাত্র আলাদা করা থাকে। ভারতে জাতপাতের এতই প্রতাপ যে তারা আগে এসব থেকে বেরিয়ে আসুক। পৃথিবীর বায়ু বিশুদ্ধ করুক। মানুষকে মানুষ বলুক। ধর্মনিরপক্ষ নয়, মানুষের সমতার অধিকার বাস্তবায়ন করুক। ভারত পৃথিবীতে একটি আন্ধার জগতে এখনো বিদ্যমান।


ভারত থেকে, চাল, ডাল, চিন, তেল ইত্যিাদির সাথে হিন্দুত্বও এক্সপোর্ট হয়


সত্যজিৎ রায়ের ৫২ মিনিটের এই ছবিটি নিয়ে তেমন কোনো রিভিও বের হয় নি। ছবিটি নিয়ে কোনো প্রচার হয় নি। কারন ভারতীয় সমাজপতিরা এই নিয়ম বজায় রাখবেন যতদিন পৃথিবী চলবে।

ঢাকা লিট ফেস্টের একটি ছোট আলোচনা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। সেখানে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিগণ তাদের বক্তব্য দিচ্ছিলেন। নেপালি বক্তা জানালেন, নেপাল একটি হিন্দু রাস্ট্র। কিন্তু নেপালি জনগণ জাতপাত নিয়ে তেমন সমস্যায় নাই। ভারত থেকে, চাল, ডাল, চিন, তেল ইত্যিাদির সাথে হিন্দুত্বও এক্সপোর্ট হয়, যা কিনা নেপালি সমাজে শান্তি বিনষ্টির কারণ হচ্ছে। অডিয়েন্স তখন হুহু করে হেসে উঠেছিল। এটি আমার নিজের চোখে দেখা।

সদগতি ছবিটিতে যা দেখানো হয়েছে তা এখনো বহাল তবিয়তে ভারতে বিদ্যমান। মানুষ যেখানে মানুষের মর্যাদায় নেই, সেই সত্য তুলে ধরে সত্যজিৎ রায় একটি দায়িত্ব পালন করে গেছেন একজন চিত্রপরিচালক হিসাবে। হিন্দু সমাজের ব্রাহ্মণ্য প্রতাপের মুখোশ একেবারে উন্মোচন করে দিয়ে গেছেন। তার জন্য আমরা তাঁকে সাধুবাদ জানাতে পারি।

Shirin Osman

শিরিন ওসমান

জন্ম ৩১ মে, সিলেট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বি এ। পেশা ব্যবসা।

ই-মেইল : shirin.osman31@gmail.com
Shirin Osman