হোম চলচ্চিত্র ‘শঙ্খচিল’-এর কান্না কিংবা আমাদের ডানা গজানোর গল্প

‘শঙ্খচিল’-এর কান্না কিংবা আমাদের ডানা গজানোর গল্প

‘শঙ্খচিল’-এর কান্না কিংবা আমাদের ডানা গজানোর গল্প
53
0

বাঙালির ইতিহাসে দেশভাগ, বিশেষ করে বাংলাভাগ, একটি বিশাল বেদনা ও মনস্তাপের বিষয়। এই মর্মন্তুদ ঘটনা-পরম্পরার সত্তর বছর অতিক্রান্ত হলেও বিষয়টি আজও যেকোনো সচেতন, সংবেদনশীল ও স্বপ্নবান মানুষকেই তাড়া করে ফেরে। দেশভাগ নিয়ে ইতোমধ্যে বহু সাহিত্য রচিত হয়েছে, গান গাওয়া হয়েছে, নাটক অভিনীত হয়েছে, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। ঋত্বিক ঘটকের দেশভাগ বিষয়ে আমৃত্যু অবসেশন সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। তারপরও যখন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা গৌতম ঘোষ ঘোষণা করেন, দেশভাগই হবে তার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘শঙ্খচিল’-এর বিষয়বস্তু, তখন আমরা উন্মুখ হয়ে উঠি ছবিটি দেখার জন্য; চলচ্চিত্রের ভাষায় পুনর্নির্মিত ইতিহাসের সেই মহাসংঘটনাটিকে আরও একবার অবলোকন ও আত্মীকরণের প্রত্যাশায়।


ছবিটির সবচেয়ে বড় আদর্শিক পরাজয় অবশ্য ঘটে যখন তিনি বাংলােেদশের নাগরিক মুনতাসির চৌধুরীকে তার পরিবারের জন্মগত মুসলিম পরিচয়টিকে গোপন করতে বাধ্য করেন।


কিন্তু বাস্তবে রুপালি পর্দায় আমরা যা চাক্ষুষ করি তা যতটা না ইতিহাস ও বাস্তবতার বিনির্মাণ, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিচালকের একটি ব্যক্তিগত ইচ্ছেপূরণের গল্প হয়ে ওঠে; যা শেষ বিচারে স্রেফ একটি আইডিয়ার যান্ত্রিক অনুবাদে পর্যবসিত হয়, তা সে যত মহান ভাবনাই হোক না কেন। এই আইডিয়াটিকেই তিনি জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত ‘শঙ্খচিল’-এর প্রতীকে ধরবার প্রয়াস পান; কবিকল্পনার যে-পাখিটি তার ডানায় ভর করে যখন-তখন, ইচ্ছে মতন ভারত বাংলাদেশের মধ্যে আসা যাওয়া করতে পারে, সীমানাবিহীন আকাশপথে, মর্ত্যের মানুষদের মতো ভিসা, পাসপোর্টের তোয়াক্কা না করেই। গৌতম ঘোষ আমাদের আরও অনেকের মতোই প্রশ্ন তোলেন, কোন অপরাধে তবে, নিকট অতীতে এক এবং অবিভক্ত একটি দেশের নাগরিকেরা তা পারবে না? তিনি স্বপ্ন দেখেন, আরও অনেকেরই মতন, যে, একদিন আমরাও এই শঙ্খচিল পাখিটির মতোই অবাধে এপার-ওপার করতে পারব, কোনো প্রকার প্রশাসনিক নিষেধ, নিয়ন্ত্রণের বেড়া না ডিঙিয়েই। খুব ভালো কথা। খুব চমৎকার মানবিক একটি স্বপ্ন। কিন্তু এই ভাবনাটিকে একটি গল্পের আদলে, কিছু রক্ত-মাংসের চরিত্রের মধ্য দিয়ে, প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি এমন এক আষাঢ়ে কাহিনি ফেঁদে বসেন এবং এমন কিছু বানোয়াট চরিত্রের আমদানি করেন যা নেহাতই তার উর্বর মস্তিষ্কজাত কষ্টকল্পনার ফসল, বিদ্যমান ভূমি-বাস্তবতা থেকে যার অবস্থান বহুদূরে।


images (1)
প্রসেনজিৎ ও সাঁঝবাতি

ছবির কাহিনিসূত্র সামান্যই; বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তসংলগ্ন একটি এলাকার জনৈক স্কুল শিক্ষকের কন্যা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে, তাকে চিকিৎসার্থে অদূরবর্তী খুলনা কিংবা ঢাকায় না নিয়ে গিয়ে, ইছামতি নদীর ওপারে, নৌপথে, পশ্চিমবঙ্গের টাকি শহরের এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, বলা বাহুল্য অবৈধভাবে, ভিসা পাসপোর্ট ছাড়া। আর আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এই কাজে তাদের সহায়তা করে খোদ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ-এর মহাপ্রাণ সদস্যরা, যা কিনা বর্তমান বাস্তবতার ঠিক বিপরীত। ওপারে আরেক সদাশয় ডাক্তারের বদৌলতে কন্যাটির চিকিৎসারও সুব্যবস্থা হয়ে যায় অত্যন্ত মসৃণভাবে।

অবশ্য ছোট্ট একটি আত্মত্যাগের বিনিময়ে : পরিবারটিকে তাদের ধর্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে সাময়িকভাবে হলেও হিন্দুত্ব বরণ করে নিতে হয়। কিন্তু তাতেও যে শেষ রক্ষা হয় না! এক পর্যায়ে কলকাতার এক দামি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কন্যাটির আচমকা মৃত্যুর পর মৃত্যুসনদ গ্রহণকালে, স্কুল শিক্ষক পিতার মুসলমানত্বটুকু হঠাৎ করেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে তাদের প্রকৃত পরিচয় উদ্‌ঘাটিত হয়ে যায় এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে পুলিশের হাতে ধরে শ্রীঘরে গমন করতে হয় বাংলাদেশি দম্পতিটিকে। তবে আরও একবার আমরা মহানুভব বিএসএফ কর্তৃপক্ষের কল্যাণে তাদের প্রিয়তম কন্যা রূপসা-র মৃতদেহটিকে অত্যন্ত ঝকঝকে কফিনে করে, রীতিমত রাষ্ট্রীয় সম্মানে, নদী পারাপার হয়ে তাদের স্বজনদের হাতে হস্তান্তরিত হতে দেখি। তার মৃতদেহের পাশাপাশি আমরা অবশেষে একটি শঙ্খচিল পাখিকেও উড়ে এসে তাদের বসতবাটি সংলগ্ন বৃক্ষের ডালে বসতে দেখি; বুঝি তার করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় পাখিটির মতো মনুষ্যপ্রজাতিরও অবাধ ও সীমান্তস্পর্ধী উড্ডয়নের অধিকার!


Shankhachil-Prosenjit-and-Kushum-Shikder-1140x641
প্রসেনজিৎ ও কুসুম শিকদার

তো, এহেন একটি কষ্টকল্পিত সেন্টিমেন্টাল গল্পের যুক্তিটি যদি তর্কের খাতিরে আমরা মেনেও নিই, তার রূপায়ণে পরিচালক যে অবিশ্বাস্য, অবাস্তব ও হাস্যকর প্রেক্ষাপটটি নির্মাণ করেন এবং অযৌক্তিক ঘটনা পরম্পরার জন্ম দেন তা কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। ছবিটির সবচেয়ে বড় আদর্শিক পরাজয় অবশ্য ঘটে যখন তিনি বাংলােেদশের নাগরিক মুনতাসির চৌধুরীকে তার পরিবারের জন্মগত মুসলিম পরিচয়টিকে গোপন করতে বাধ্য করেন। অথচ, আমরা জানি ভারত সাংবিধানিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন বামশাসিত একটি তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল রাজ্য। তার ওপর, এখানকার এক চতুর্থাংশ অধিবাসী ইসলাম ধর্মাবলম্বী। সেই রাজ্যের অন্যতম অগ্রসর, আলোকিত শহর কলকাতার একটি আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াার জন্য যদি একজন রোগীকে ধর্মপরিচয় গোপন করতে হয় এবং সেটাও একদা-নকশাল গৌতম ঘোষ-এর মতো একজন যুক্তিবাদী, প্রগতিমনা পরিচালকের নির্দেশনায়, তাহলে তো খুবই পরিতাপের বিষয়।


ভারতভ্রমণের কালে সবারই একটুখানি ‘শঙ্খচিল’-এর ডানা গজায়, তাহলে সেটাই হবে এ-ছবির সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং দর্শক হিসাবে আমাদের একমাত্র প্রাপ্তিযোগ।


অন্যদিকে যদি ধরেও নিই যে, এটাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে তো তার মতো একজন সচেতন শিল্পী ও নাগরিকের উচিত ছিল এর প্রতিবাদে বহু আগেই রাস্তায় নামা। নিদেনপক্ষে, ‘শঙ্খচিল’-এর মতো শিশুতোষ রূপকথা না ফেঁদে এই অসভ্য, অমানবিকতার বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার, জোরাল, যৌক্তিক এবং বিশ্বাসযোগ্য কোনো একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে প্রতিবাদ করা। মুদ্রার অপর পিঠে, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী, রবীন্দ্রপ্রেমিক স্কুলশিক্ষক মুনতাসির চৌধুরীই-বা কেন হঠাৎ করে তার মুসলমান পরিচয়টুকুর জন্য এতটা ব্যাকুল ও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন সেটাও ঠিক প্রতিষ্ঠিত হয় নি ছবিটিতে। চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দিকগুলোও বেশ দুর্বল—এক রূপসা চরিত্রে রূপদানকারী, কিশোরী সাঁঝবাতি ছাড়া অন্যান্যদের অভিনয়, প্রসেনজিৎসহ, কৃত্রিম ও আড়ষ্ট লেগেছে। লায়লারূপী কুসুমের সংলাপ ও উচ্চারণ ছিল প্রবলভাবে গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট। সংগীত আহামরি কিছু নয়, দৃশ্যসজ্জা, ডিটেইলসও বেশ গোঁজামিলপূর্ণ। একমাত্র চিত্রগ্রহণ বা ক্যামেরার কাজেই কিছুটা পূর্ব সুনাম ধরে রাখতে পেরেছেন গৌতম ঘোষ।


images
প্রসেনজিৎ, কুসুম শিকদার ও সাঁঝবাতি

তবে মুহুর্মুহু সিনেমাটিক কৌশল ও সপ্রতিভ উপস্থাপনার কল্যাণে আর কিছু না হোক, ছবিটিকে তিনি বজরঙ্গি ভাইজান গোছের বলিউডি মেলোড্রামার একটি সফল বাংলা সংস্করণ করে তুলতে পেরেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সম্ভবত এই সাফল্যের সুবাদেই এটি ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্রের পুরস্কারেও ভূষিত হতে সক্ষম হয়েছে। এহ বাহ্য, আপাতত সে-দেশের সর্ব্বোচ্চ প্রশাসনের নেকনজরে পড়া এই ছবিটির কারণে যদি দূতাবাস ও সীমান্তকর্তৃপক্ষের কিঞ্চিৎ টনক নড়ে এবং আমাদের ভারতভ্রমণের কালে সবারই একটুখানি ‘শঙ্খচিল’-এর ডানা গজায়, তাহলে সেটাই হবে এ-ছবির সবচেয়ে বড় সাফল্য এবং দর্শক হিসাবে আমাদের একমাত্র প্রাপ্তিযোগ।


ঈদসংখ্যা ২০১৮

আলম খোরশেদ

জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৬০; কুমিল্লা। যন্ত্রপ্রকৌশলী, বুয়েট, ঢাকা। এই মুহূর্তে উনার কোনো পেশা নেই—পূর্ণকালীনভাবে, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিস্তার : চিটাগং আর্টস কমপ্লেক্স নামক উনার গড়া শিল্পসংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ—

জাদুবাস্তবতার গাথা : লাতিন আমেরিকান ছোটগল্প সংকলন [অনুবাদ/ সম্পাদনা; সাহিত্যপ্রকাশ, ঢাকা]
ভাবনাগুচ্ছ : হেনরি মিলার [অনুবাদ/ আত্মজৈবনিক রচনা; শুদ্ধস্বর, ঢাকা]
বোর্হেসের সঙ্গে কথোপকথন : ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো [অনুবাদ/ আলাপচারিতা; বিশদ বাঙলা, চট্টগ্রাম]
নিজের একটি কামরা : ভার্জিনিয়া উল্‌ফ [প্রবন্ধ; সংহতি, ঢাকা]
ত্রিশটি কবিতা : নোবেলবিজয়ী ভিস্লাভা শিম্বর্স্কা [অনূদিত কবিতা; অবসর, ঢাকা]
দূর দিগন্তের ধ্বনি [অনূদিত কবিতা; বিশাকা, ঢাকা]
নাগিব, বোর্হেস, চিনুয়া, মার্কেস ও অন্যান্যের গল্প [অনূদিত গল্প; আগামী, ঢাকা]
দ্বাদশ কাহিনি : সমকালীন বিশ্বের গল্প [অনুবাদ/ সম্পাদনা; চেতনা, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র]
মানবীমঙ্গল : নারীবাদী গল্প সংকলন [অনুবাদ; দেশ, ঢাকা) নির্জন নিশ্বাস : নারীবাদী কবিতা সংকলন [অনুবাদ; অবসর, ঢাকা]
দক্ষিণী ও লাতিন আমেরিকার অন্যান্য গল্প [অনুবাদ; বেঙ্গল, ঢাকা]
গির্জাবিয়ে : নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো [অনূদিত নাটক; দেশ, ঢাকা]
দ্বিতীয় লিঙ্গের পরে : সিমোন দ্য বোভোয়ার [অনূদিত সাক্ষাৎকার; সংবেদ, ঢাকা]
চলচ্চিত্রের কথকতা [নিবন্ধ; চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র, চট্টগ্রাম]
নাটক বিষয়ে [নিবন্ধ; দেশ, ঢাকা]
ন্যুয়র্ক-নিসর্গ [নিবন্ধ; সন্দেশ, ঢাকা]
অচেনা অক্ষর [নিবন্ধ; প্রগতি, ঢাকা]
পঠন-পাঠন [নিবন্ধ; প্রগতি, ঢাকা]
ভাষা, নারী, সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ [নিবন্ধ; পূর্ব-পশ্চিম, মন্ট্রিয়ল, কানাডা]
কাটা জিহ্বার কথা : বাংলাদেশের নারীবাদী গল্প-সংকলন [সম্পাদনা; খনা, চট্টগ্রাম]

ই-মেইল : bistaar@yahoo.com