হোম চলচ্চিত্র ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট : থিও অ্যাঞ্জিওপুলাস

ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট : থিও অ্যাঞ্জিওপুলাস

ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট : থিও অ্যাঞ্জিওপুলাস
185
0

আধুনিক গ্রিক সিনেমা সম্পর্কে কতটুকু জানি—এমন প্রশ্নই মূলত গ্রিক সিনেমার প্রতি আপনার আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা কিনা অনায়াসেই আপনার পরিচয় ঘটিয়ে দিতে পারে বিশ্ব-সিনেমার অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্র পরিচালক ও তাদের নির্মাণের সাথে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আধুনিক গ্রিক সিনেমার গৌরবোজ্জ্বল সময়ের সাথে আমাদের যেমন পরিচয় ঘটে নি, তেমনি খুব কম সংখ্যক গ্রিক চলচ্চিত্র-পরিচালক রয়েছেন, যারা ইউরোপিয়ান পরিমণ্ডলের বাইরে সুপরিচিত নন, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারেন থিও অ্যাঞ্জিওপুলাস নিজেই, যাকে কেবল গ্রিস নয়, বরং বিশ্ব-সিনেমায় গণ্য করা হয় সিনেমা মেকিংয়ের মাস্টার হিশেবে। অথচ অবাক লাগে, ১৯৮৮ সালে তার নির্মিত এই সিনেমাটি যখন একই বছরে ‘গোল্ডেন লায়ন’ ও ‘বেস্ট ইউরোপিয়ান ফিল্ম’-এর পুরস্কার জিতে নেয়, তখন সেই সিনেমাটিরই প্রায় দুই দশকের অধিক সময় লেগে যায় আমেরিকান দর্শকের কাছে পৌঁছাতে? হয়তো এমন কিছু কারণেই গ্রিক সিনেমা আমাদের কাছে রয়ে গেছে অপরিচিত, অথচ পৃথিবীতে অ্যাঞ্জিওপুলাস একমাত্র পরিচালক যিনি একটি দুটি নয়, চার চারটি ট্রিলজি (ট্রিলজি অব হিস্ট্রি, ট্রিলজি অব সাইলেন্স, ট্রিলজি অব বর্ডারস ও দ্য  ট্রিলজি অন মডার্ন গ্রিস) নির্মাণ করেছেন, যা কিনা আধুনিক গ্রিক সিনেমা তথা ইতিহাসের অনবদ্য দলিল হয়ে আছে, যার একেকটি খণ্ড ইতোমধ্যে মহাকাব্যিক বিন্যাস ও পরিসরেই নির্মাণ করা হয়েছে।


১৯৯০ সালের কলকাতা উৎসবে সিনেমাটি দেখানো হয় এবং এই সিনেমাটি সম্পর্কে লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় নিজেও খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন এবং এর প্রধান দুই শিশু চরিত্রকে আখ্যায়িত করেছিলেন গ্রিসের ‘অপু-দুর্গা’ হিশেবে


থিও অ্যাঞ্জিওপুলাস সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই, কেন না আধুনিক গ্রিক সিনেমায় আমরা যে ক’জন পরিচালকের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে পারি, অ্যাঞ্জিওপুলাস তাদের অন্যতম এবং গত অর্ধ শতাব্দীতে আন্তজার্তিক পরিমণ্ডলে যে কয়েকটি গ্রিক সিনেমা দারুণভাবে সুনাম অর্জন করেছে বা দর্শকদের সমীহ ও মনোযোগ আদায় করে নিয়েছে, তার অধিকাংশই অ্যাঞ্জিওপুলাস নির্মিত। ১৯৭০ সালে সিনেমা নির্মাণে ক্যারিয়ার শুরু করার পর অনেকগুলো অনবদ্য সিনেমা তিনি আমাদের উপহার দিলেও, মূলত ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’ তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অধিক সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করে তোলে, আর আমার ক্ষেত্রে এই সিনেমাটি ছিল রীতিমতো হিপনোটাইজি-এর মতো বিষয়, যা কিনা পরবর্তিতে আমাকে বাধ্য করে তার অন্যান্য সিনেমা যেমন : ‘দ্য উইপিং মিডো’, ‘ইটারনিটি অ্যান্ড আ ডে’, ‘ইউলিসিস গেজ’, ‘দ্য বিকিপার’, ‘দ্য ডাস্ট অব দ্য টাইম’, দ্য ট্রাভেলিং প্রেয়ারস’, ‘ভয়েজ টু সিথেরা’ ইত্যাদিতে প্রবলভাবে আগ্রহী হয়ে উঠতে।

সত্যি বলতে অনেক দেরিতেই আমার পরিচয় ঘটে এই পরিচালকের সাথে এবং বিস্ময়াভূত হয়ে লক্ষ করেছি এই পরিচালকের টেকনিক, যেখানে তিনি একাধিক লং শট নিতে পছন্দ করেন এবং কোনো প্রকার কাট ছাড়াই শটটি শেষ করেন। ক্যামেরা খুব কম সময় চরিত্রদের কাছে আনেন, বরং তিনি আমাদের একের পর এক অনবদ্য সব ল্যান্ডস্কেপিক দৃশ্যায়নের সাথে অভিজ্ঞ করে তোলেন, যেখানে পরিসর এত বিশাল থাকে যে, দর্শক হিশেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করে তোলা বা সেই পরিমণ্ডলে নিজেকে সহজেই হারিয়ে ফেলা সহজতর হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের কলকাতা উৎসবে সিনেমাটি দেখানো হয় এবং এই সিনেমাটি সম্পর্কে লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় নিজেও খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন এবং এর প্রধান দুই শিশু চরিত্রকে আখ্যায়িত করেছিলেন গ্রিসের ‘অপু-দুর্গা’ হিশেবে—যা আমাদের সিনেমাটির অনবদ্যতা সম্পর্কে আবছা ধারণা দিতে সক্ষম হলেও, আসলেই সিনেমাটি কতটা অনবদ্য তা না দেখলে বোঝা যাবে না এবং সিনেমার একদম শুরুর দৃশ্য থেকে কুয়াশা ঢাকা প্রান্তরে শেষ হওয়া পর্যন্ত ১২৭ মিনিট পর্যন্ত পরিচালক কেবল আমাদের নিয়ে সুবিস্তৃত ভ্রমণেই বের হন নি, বরং দুই ভাই-বোনের অনির্দিষ্ট যাত্রায় এমন সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করেছেন, যেখানে সমসাময়িক গ্রিস যেন তার খণ্ড খণ্ড ঐতিহাসিক পটভূমি সমেত বর্তমান। তাই এই যাত্রা কেবল দুই ভাই-বোনের তাদের বাবার সাথে মিলনের উদ্দেশ্যেই ছিল না, বরং ছিল সমসমায়িক গ্রিসের মধ্যে দিয়ে দূরদর্শী কোনো তীর্থযাত্রার মতো, যেখানে দুই শিশু তাদের চেনা-জানা জগতের বাইরে এসে ক্রমশ জানতে শুরু করে শ্রম, অর্থ, ভালোবাসা ও নৃশংসতার মতো বিষয়গুলো।

একদম শুরু থেকেই সিনেমাটি আমাদের ঘোর লাগাতে সক্ষম হয় এবং সমগ্র সিনেমা জুড়েই ধূসর কুয়াশাঘেরা শান্ত বাতাবরণ আমাদের ভেতরে ভেতরে নিঃস্তব্ধ করে তোলে, যেখানে একেকটি অনবদ্য লং শট আর ধীর গতিতে ক্যামেরার এগিয়ে চলা, আমাদের আবদ্ধ করে কাব্যিক কোনো সুরে এবং অধিকাংশ সময়ই অজানা এক বিষণ্নতা আমাদের গ্রাস করতে থাকে, যেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা অনবদ্য সব মিউজিক কম্পোজিশন এই বিষয়টিকে এত প্রবল করে তোলে যে, হতবিহ্বলের মতো আমরা এগিয়ে যেতে থাকি দুই ভাই-বোনের সাথে আর নিমগ্ন হয়ে শুনতে থাকি পর্দার ওপার থেকে পাঁচ বছর বয়সী আলেকজান্দার (মিখালিজ জেকে) ও বারো বছরের ভুলার (তানিয়া পালিয়োলোগু) মনে মনে তাদের বাবাকে লেখা চিঠির এই লাইনগুলো, যার সাথে একটু একটু করে মিশতে থাকে ট্রেন চলার মৃদু শব্দ—‘প্রিয় বাবা, তোমাকে লিখছি কারণ আমরা তোমার কাছে আসতে ও তোমাকে দেখতে চাই। আমরা কখনোই তোমাকে দেখি নি, কিন্তু তোমাকে আমাদের দরকার। আমরা সবসময় তোমার কথা বলাবলি করি। আমাদের এই পালিয়ে যাওয়ায় মা কষ্ট পাবেন, কিন্তু ভেবো না তা আমাদের থামাতে পারবে। আমরা জানি না তুমি দেখতে কেমন। আলেকজান্দার তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। সে তার স্বপ্নে তোমাকে দেখে। তোমাকে আমাদের খুব দরকার। যখন আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরি, তখন পেছনে তোমার পায়ের শব্দ শুনি, কিন্তু যখন ফিরে তাকাই, তখন সেখানে কেউ থাকে না, ফলে আমার প্রচণ্ড একাকী বোধ হয়। আমরা তোমার বোঝা হতে চাই না, শুধু তোমাকে দেখতে চাই আর তারপর আমরা ফিরে আসব। যদি তুমি আমাদের উত্তর দিতে চাও, তাহলে ট্রেনের এই শব্দের সাথে দাও, টা-টান, টা-টান, টা-টান…’


কী অদ্ভুত নির্মাণ এই সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম এবং খুব ধীর অথচ সুষম কাব্যিক গতিতে এগিয়ে যাওয়া এই সিনেমা কেবল প্রশংসার দাবিদার নয় বরং সিনেম্যাটিক বিউটির উৎকৃষ্ট উদাহরণ।


1
চলমান ট্রেনে ঘুমন্ত ভুলা ও আলেকজান্দার।

মূলত এখান থেকেই সিনেমাটি তার গতি পায়, যেখানে দুই ভাই-বোন বেরিয়ে পড়ে তাদের বাবার খোঁজে। জন্ম পরিচয় লুকাতে তাদের মা এই মিথ্যায় তাদের বড় করে তোলে যে তাদের বাবা জার্মানিতে থাকে, যা জানার পর শিশু দুটি তাদের বাবাকে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠতে থাকে। ফলে তারা রোজ রাতে স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নিশ্চুপ দেখতে থাকে  জার্মানি যাওয়ার ট্রেন কিভাবে তাদের সামনে দিয়ে চলে যায়, যেন-বা এই ট্রেনটিই একমাত্র উপায় তাদের প্রিয় বাবার সাথে মিলিত হবার। প্রত্যেকবার-ই তারা স্টেশনে আসে এবং চেষ্টা করে ট্রেনে ওঠার, কিন্তু পারে না আর শেষ পর্যন্ত যখন উঠে পড়ে তখন চলমান ট্রেনের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ‘আমরা পেরেছি’ বলে আনন্দে দু’ভাইবোনের একে অপরকে জড়িয়ে ধরার খুশির রেশ দর্শক হিশেবে আমাদের মনকেও দোলা দিয়ে যায় যেমন, তেমনি চলমান ট্রেনের মৃদু শব্দে মনে মনে বাবাকে লেখা ভুলা বা আলেকজান্দারের চিঠির প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, আমাদের বিমূঢ়, উদাস ও দুঃখ-ভারাক্রান্ত করে তোলে। বস্তুত, ছবিতে মনে মনে বাবাকে লেখা ওদের চিঠিগুলো আমার কাছে একেকটি হৃদয়-বিদারী কবিতা মনে হয়েছে এবং ভুলা যখন তার চিঠিতে বাবাকে জানায় যে, ‘আলেকজান্দার নাকি তাকে প্রায় স্বপ্নে দেখে এবং তার সম্পর্কে নানারকম কথা বলে’, তখন কোথা থেকে কিছু জল এসে জমা হয় চোখের কোণে। কী অদ্ভুত নির্মাণ এই সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম এবং খুব ধীর অথচ সুষম কাব্যিক গতিতে এগিয়ে যাওয়া এই সিনেমা কেবল প্রশংসার দাবিদার নয় বরং সিনেম্যাটিক বিউটির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সিনেমাটিতে প্রতিটি চরিত্রই যেন ভাসমান, যারা কিছু একটা খুঁজে চলেছে, যা হয়তো তারা হারিয়ে ফেলেছে কিংবা অাদৌ যার কোনো অস্তিত্বই নেই। কিন্তু ক্যামেরা যখন শিশুসুলভ আকুতিতে সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বা পটভূমির দিকে এগিয়ে যায়, তখন পরিচালক বরং আমাদের এই বোঝাতে চান, এটাই বুঝি চিরন্তন এগিয়ে চলা কিংবা মানবীয় প্রথা। যে কোনো দর্শকের মনে এই সিনেমা অনায়াসেই সুগভীর ছাপ ফেলতে পারে, যা কিনা মোহগ্রস্তের মতো দীর্ঘদিন তাকে আটকে রাখতে পারে অ্যাঞ্জিওপুলাস বলয়ে।

2
মৃতপ্রায় ঘোড়ার সামেন ভুলা ও ক্রন্দনরত আলেকজান্দার।

সিনেমাটিতে এমন কিছু অনবদ্য দৃশ্য আছে যেগুলো না চাইলেও মনের ভেতরে গেঁথে যায় এবং তীব্র একটা কম্পন আত্মার কোনো না কোনো কোটরে টের পাওয়া যায়। যেমন রাতের বেলা বিবাহ পরবর্তী অনুষ্ঠানে মত্ত একটা বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা হৈ-হুল্লোড় এবং গানবাজনার আওয়াজ শুনে দু’ভাইবোন সেখানে দাঁড়ায় এবং কেউ একটা মুমূর্ষু ঘোড়াকে ট্রাক্টর দিয়ে টেনে বরফের উপর রেখে গেলে, ওরা ঘোড়াটির কাছে ছুটে আসে। ভুলা ঘোড়াটির শরীরে হাত বুলায় আর আলেকজান্দার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। যখন ভুলা তার ভাইকে জানায় যে ঘোড়াটি মারা যাচ্ছে, তখন ভুলা ও মুমূর্ষু ঘোড়াটির পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আলেকজান্দারের যে নিষ্পাপ কান্না এবং তাদের পেছনে বিবাহ পরবর্তী গান-বাজনায় মত্ত মানুষের দল বেঁধে ফিরে যাওয়া, তাতে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে—মনে হয় বিশ্বমানবতার নিভৃত কান্না আলেকজান্দারের কান্নার স্বরে ভেসে এসে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের মর্মমূলে।

3
শহের তুষারপােতর মধ্যে উল্লাসিত দুই ভাই-বােনের ছুেট চলা।

এছাড়া লরি ড্রাইভার কর্তৃক ভুলার ধর্ষণের যে চিত্রায়ণ, তাকে অবহিত করা হয় আধুনিক সিনেমার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী চিত্রায়ণ হিশেবে, যেখানে এমন নির্মম ও হৃদবিদারী ঘটনা পরিচালক কোনো প্রকার নৃশংসতা না দেখিয়েই অনবদ্য সৃষ্টিশীলতায় অধিক শক্তিশালী হিশেবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, যেখানে আমরা পুরো ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকলেও প্রকৃত অবস্থা বুঝে উঠতে পারি না, কিন্তু ধীরে ধীরে হতবিহ্বল ভুলা যখন লরির ভেতরে থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে পা ঝুলিয়ে বসে, তখন তার দু’পায়ের ফাঁক বেয়ে গলগলিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত, যা দিয়ে সে লরির দেয়ালে আনমনে আঁকিবুঁকি করে, তখন আমাদের কারোর-ই কোনো মুখোশ থাকে না! আমাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে ঐ নিষ্পাপ হাতে লেগে থাকা লাল, তরল, যা কিনা তার অমোচনীয় দাগ এঁকে দিয়ে যায় সভ্যতার নির্মম দেয়ালে। আমরা চমকে উঠি এবং বিবশ একটা বোধে ঢুকে পড়ি নিজেদের আরও গভীরে!


সঙ্গী হিশেবে প্রিয় কোনো বইয়ের মতো অনায়াসেই একমাত্র কাম্য হয়ে উঠতে পারে এই সিনেমা।


4
লী ড্রাইভার-কর্তৃক ধর্ষণের পর ভুলার হতবিহ্বল বসে থাকা।

এমন অনন্য সাধারণ দৃশ্য ঘুরে ফিরেই আসতে থাকে সিনেমা জুড়ে। যেমন হঠাৎ শহরে তুষারপাত শুরু হলে লোকজনের পাথরের মূর্তির মতো যার যার অবস্থানে অনড় দাঁড়িয়ে থাকা ও দুই ভাইবোনের হাত ধরা-ধরি করে উল্লসিত তুষার-পাতের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে যাওয়া, এতটাই অনবদ্য ও মনোমুগ্ধকর হয়ে ধরা দেয়া যে, দর্শক-সারি থেকে উঠে গিয়ে আমার নিজেরও ইচ্ছে করছিল সেই তুষার-পাতের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াতে। কিংবা রাতের নদী পার হয়ে পরবর্তী সকালে ঘন কুয়াশায় ঢাকা শাদা স্ক্রিনের ওপার থেকে আলেকজান্দার যখন ভুলাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য ডাকে, ‘উঠো, এখন ভোর, আমরা জার্মানিতে পৌঁছে গেছি’, তখন এতক্ষণ স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা আমাদেরও যেন ঘুম ভাঙে এবং ঘন কুয়াশা ভেদ করে দুই ভাইবোনের সাথে ধীর গতিতে এগিয়ে গিয়ে খোলা প্রান্তরে আবিষ্কার করি একটা গাছ। ওদের মতো আমরাও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি সেখানে, তারপর এক পা দুই পা করে সামনে এগুতে এগুতে গাছটি স্পষ্ট হয়ে উঠলে ওদের মতো আমারও দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি গাছটিকে। গাছটি ধরেই থাকি, ছাড়ি না এবং সিনেমাটি শেষ হয়ে যায়। এছাড়াও সিনেমাটির যে দৃশ্যটির কথা না বললেই নয়, সেটা হলো সমুদ্রতীরে বসে থাকা নায়ক ‘অস্টিসের’ সামনে হঠাৎ ভেসে ওঠা বিশাল একটা হাত, যেটা হেলিকপ্টার দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও দৃশ্যটি ফেলিনির ‘লা দোলচে ভিটা’র হেলিকপ্টারে ঝোলানো যিশু মূর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, কিন্তু দৃশ্য দুটির চিত্রায়ণে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, তা যে কোনো সাধারণ দর্শকেরও দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না এবং আমার মনে হয়েছে, রূপক হিশেবে এই হাতের উপস্থিতি বরং সর্বগ্রাসী কোনো শক্তিশালী থাবার মতোই পরিচালক আমাদের তুলে ধরতে চেয়েছেন।

5
পানিতে ভেসে ওঠা হাত হেলিকপ্টার দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া।

দুঘণ্টা সাত মিনিট ধরে প্রাণের উপরে ছেয়ে থাকা অন্যরকম ঘোর যেমন আমরা কাটিয়ে উঠতে পারি না, তেমনি পারি না সিনেমা শেষ হয়ে যাবার পরও গাছকে আলিঙ্গনরত ভাইবোনের উচ্ছ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে। সিনেমার অদ্ভুত এই পরিসমাপ্তি আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে পৌঁছে না দিলেও, আমরা শেষ পর্যন্ত হতাশ বা বিমুখ হয়ে উঠি না, বরং কুয়াশা-আবৃত দিগন্তে একটিমাত্র নিঃসঙ্গ গাছের দিকে দুই ভাই-বোনের দৌড়ে যাওয়া ও তাকে আলিঙ্গন—বোধ করি সিনেমায় এই ছিল আমাদের পরিভ্রমণ ও গন্তব্য। সমগ্র সিনেমায় কোথাও একটিবারের জন্যও মনে হয় নি বিন্দুমাত্র অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে বরং অন্যরকম এক নিস্তব্ধতা যেন সবসময় ঝরে পড়েছে সিনেমা জুড়ে, যার সম্পর্কে জনাব সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :

এ সেই ব্রহ্মাণ্ডহারা নিঃসঙ্গ গ্রহের ছবি, যা কোনো সূর্যশাসিত নয়। বস্তুত, ছবিতে বারেকের জন্যও, সূর্য ওঠে নি। বা, অস্ত যায় নি। কোনো চরিত্রের ছায়াই পড়ে নি কখনও এ ছবিতে। সূর্য যদি উঠে থাকে, তার উদয় হয়েছিল মধ্যরাতে। মধ্যরাত্রির সূর্যের ম্রিয়মাণ আলো সারাক্ষণ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল ছবিটির, আহা, সর্বাঙ্গে’।

6
কুয়াশা ঘেরা প্রান্তরে দুই ভাই-বোনের গাছের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

এর চেয়ে ভালো এই সিনেমাটি সম্পর্কে আর কিছুই বলা যায় না। খুব কম সিনেমাই আছে যেগুলো বার বার দেখা যায়। ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’ তেমন-ই একটা সিনেমা, যা শুধু বার বার নয়, অজস্রবার দেখা যায় এবং যে কোনো দ্বীপান্তরের সঙ্গী হিশেবে প্রিয় কোনো বইয়ের মতো অনায়াসেই একমাত্র কাম্য হয়ে উঠতে পারে এই সিনেমা।

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য