হোম চলচ্চিত্র রেইনকোট : বৃষ্টিকাব্যের ছবি

রেইনকোট : বৃষ্টিকাব্যের ছবি

রেইনকোট : বৃষ্টিকাব্যের ছবি
399
0

যে কোনো চলচ্চিত্রেরই প্রাণ এর গল্প এবং চিত্রনাট্য। সেই গল্প এবং চিত্রনাট্যের ছবি ঠিকঠাক তুলে (হোক ৩৫ মি.মি. বা যে কোনো ক্যামেরায়) সুসম্পাদনা পেলে ছবি ভালো হতে বাধ্য। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এসব কিছুকে বাড়তি পূর্ণতা দেয়। রেইনকোট ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম বলিউড চলচ্চিত্র। ঋতুভক্ত মানেই জানেন এর আগেই নিজরাজ্য বাংলায়, পুরো ভারতে এবং ফিল্মি দুনিয়ায় তিনি নাম করেছেন। টলিউডের ছোট জগৎ থেকে বলিউডের বিশাল ক্যানভাসে গিয়ে ঋতুপর্ণের মাথা ঘুরে যায় নি। তিনি নিজস্বতা বিসর্জন দেন নি। প্রাত্যহিক জীবনের খুঁটিনাটি দৃশ্য ও দর্শন, যেসব সাধারণত মানুষ খেয়ালও করে না, সেসব দেখিয়ে দর্শকের মগজে অনুরণন তুলে দেয়া ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ঋতু ছিলেন তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী, সাবলীল। পর্দায় নিজস্ব গল্প বলার ভঙ্গি তাকে পরিচালক হিসেবে আলাদা করে দেয়। রেইনকোট ব্যতিক্রম নয়।


ছবি দেখা শুরু করার আগে দর্শক যে পরিস্থিতি বা জগৎ থেকেই আসুক, মিনিট তিনেকের মধ্যে তা অতীত এক জগৎ হয়ে যাবে।


ছবি শুরুর পরপরই ঋতুপর্ণ দর্শককে একটা মিউজিক্যাল পোয়েট্রির জগতে নিয়ে যান। যা দর্শকের মন, মনন ও মস্তিষ্কের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি দেখা শুরু করার আগে দর্শক যে পরিস্থিতি বা জগৎ থেকেই আসুক, মিনিট তিনেকের মধ্যে তা অতীত এক জগৎ হয়ে যাবে। শুরুতেই দর্শককে সার্বিকভাবে এই যে ছবির জগতের বাসিন্দা বানিয়ে ফেলার কৌশল, তা রেইনকোট ছবিতে ঋতু করেছেন একটা গান দিয়ে। স্বপ্না মুখার্জির গলায় ঋতুপর্ণের নিজের লেখা ‘সুবহা সুবহা’ গানের কথা, সুর ও মিউজিক দর্শককে রেইনকোট ছবির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। ছবি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে বের হওয়া সম্ভব না।

‘সকাল সকাল হঠাৎ হলো কি খেয়াল
মথুরার রাজা, তোমার গ্রাম ছেড়ে কোথা যাও?
মথুরা নগরপতি তুমি গোকুলে যেও না
রাজদণ্ড ছেড়ে কোথা ফের বাঁশরী বাজাও?’

গানটার কয়েক লাইন হিন্দি থেকে বাংলায় তর্জমা করলে এরকমই হয়। পোয়েটিক এই গান চলছে, ছবিতে কার কি অবদান সেসব লেখা উঠছে পর্দায়, গ্রাম-গঞ্জের পরিচিত দৃশ্যের জন্ম দিয়ে ট্রেন চলছে—কলকাতায়। দর্শকের মনও ট্রেনের গতিতে ছবির দৃশ্যে কোলাজ হয়ে যাচ্ছে।

আমরা বেডরুমে কাপড় বদলানোর সময় আন্ডারওয়্যার বাদে বাকী পোশাক ন্যাংটো শরীরে বউয়ের সামনেই পরি। মফস্বলের বাঙালি মেয়ে প্রেমিকের সঙ্গে অ্যাডাল্ট ছবি দেখতে যাবার বায়না ধরতে পারে। বলতে পারে, “আমার সঙ্গে অ্যাডাল্ট পিকচার দেখার সময় তুমি কাকে ভয় পাবে, নিজেকে না মহল্লাবাসীকে?” উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের পর্দায় এই স্বাভাবিকতা দেখানোর জন্যে পরিচালকের সাহসের সততা লাগে। ঋতু তার নির্মাণে অতটাই সৎ ছিলেন। মধ্যবিত্ত জীবনের সংকটে বন্ধু বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। বন্ধুপত্নীও খুব সহজে বন্ধু হয়ে যায়। বাঙালি মেয়েরা বিয়ের দিন কাঁদে, শুধু মা-বাবার জন্য, না অন্য কোনো গোপন দুঃখ থেকে? সুপরিচালক এই প্রশ্নের উত্তর তার ছবির চরিত্রের মুখ থেকে দেবেন না। ঋতুও দেন নি। স্নানঘরে কান্না পুরুষের অভ্যাসে থাকে না, নারীদের থাকে। এই কান্না লুকিয়ে রাখতে শাওয়ার অন রাখতে হয়। মেয়েদের কাছ থেকে এরকম খুঁটিনাটি কিছু শেখার আছে। রেইনকোট ছবির শুরুর দিকে মনোজ আর তার বন্ধুপত্নীর আলাপচারিতায় আমরা তা দেখতে পাই।

রেইনকোট বানানো হয়েছে ও হেনরির একটি গল্পের ছায়া অবলম্বনে। কিন্তু ছবিতে ও হেনরির টিকিটাও নেই। ছবিটা পুরোপুরি ঋতুপর্ণ আর কলকাতার হয়ে গেছে। কারো ছায়া নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ছায়াটাকে পেলে-পুষে নিজের করে নেয়া বিরাট ব্যাপার। খুব বৃষ্টি হবে। ছবি শুরুর দিকেই তা জানা যায়। বৃষ্টি দেখানোর আগেই ছবির বৃষ্টিতে একাত্ম করতে দর্শক মনকে প্রস্তুত করেন ঋতুপর্ণ। তারপর উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়ি আর রাস্তার মধ্যে হাতেটানা রিক্সা ও বৃষ্টির দৃশ্যে নিয়ে যান। অপরূপ সেই বৃষ্টি! মনোজের সঙ্গে সেই বৃষ্টিতে যেন দর্শকও ভিজে যায়।


শাড়িতে ঢাকা ঐশ্বর্যের যে দেহলীলা ঋতু দেখিয়েছেন, তা ধুম-টুমের হাফপ্যান্ট আর টপস পরা ঐশ্বর্যের মাঝে দেখা যায় না।


ঐশ্বর্য রায় তার ক্যারিয়ারে অনেক বড় পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু ঐশ্বর্যের নারী-সৌন্দর্য কেউই ঋতুর মতো করে দেখাতে পারেন নি। ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে নীরুর চোখ-মুখ দেখে যেন বিদ্যুদাভা ঝলকে ওঠে। ভারি মেকাপ নেই। ছোট্ট কালো টিপ, চোখে হালকা কাজল, সিঁথিতে সিঁদুর, হালকা গোলাপি লিপস্টিক (কিন্তু লিপস্টিক আছে বোঝা মুশকিল) মেরুন ব্লাউজের উপরে গোলাপি পাড়ের শাড়ি, নীরুরূপে ঐশ্বর্যের যে অবতার ঋতুপর্ণ সৃষ্টি করেছেন, তা হিন্দি সিনেমায় বিরল। শাড়িতে ঢাকা ঐশ্বর্যের যে দেহলীলা ঋতু দেখিয়েছেন, তা ধুম-টুমের হাফপ্যান্ট আর টপস পরা ঐশ্বর্যের মাঝে দেখা যায় না। সঞ্জয়লীলা বানসালিদের বলিউডে যেখানে নকল চাকচিক্যের জয়গান, সেখানে নীরুরূপ একটা বিদ্রোহ। ঐশ্বর্য রাই আর অজয় দেবগন রেইনকোট ছবিতে এতটাই নিজেদের ঢেলে দিয়েছিলেন যে, নীরু ও মনোজকে একবারও মনে হয়নি তারা শুধুই রুপালি পর্দার চরিত্র। ছোট ছোট বাকি চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও নির্দ্বিধায় একথা বলা যায়।

রেইনকোট মূলত জীবনের রূঢ়তার সঙ্গে লড়াই করা দুজন মানুষের গল্পের চিত্রায়ণ। তারা শৈশবের প্রেমিক-প্রেমিকা। প্রেমিক তেমন প্রতিষ্ঠিত নয়। শহরের বড় ঘর থেকে হঠাৎ আসা বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করে মেয়ের পরিবার, মান-অভিমানের ভেতর প্রণয়ের পরিণয়স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি। মধ্যবিত্ত ভীরুপ্রেম কি ফুরিয়ে যায়?

ছবিটাকে থ্রিলার বা রহস্য বিভাগে ফেলা হয়েছে। ছবির গল্প সরল, টানটান উত্তেজনা নেই। রেইনকোট তথাকথিত থ্রিলার ধাঁচের নয়, তবে বড় একটা রহস্যময়তা আছে। কলকাতায় এসে সাবেক প্রেমিকা নীরুকে দেখতে আসে মনোজ। দুজনে গল্পের ঝুড়ি খুলে দেয়। পাল্লা দিয়ে একের পর এক মিথ্যে বলতে থাকে একে অপরকে। দুজনেই খুব সুখে আছে, শান-শওকতে ভরপুর জীবনের মিথ্যেগুলি বেশ অকপট। মনে হয় কখনো কখনো মিথ্যে জায়েজ। উৎসবের রাতে হৃদয়ভাঙা মানুষের মুখের মিথ্যেগুলি সত্যের মতো শোনায়। মনোজের মিথ্যেগুলি দর্শক জানে, নীরুর মিথ্যে জানে না। এটা একটা রহস্য। ওদিকে বাইরে বৃষ্টির শব্দ, বজ্রপতনের শব্দ। মনোজ আর নীরুর হৃদয়ে চলমান বৃষ্টি আর বজ্রপাতও বেশ বোঝা যায়। বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে গান ‘ভালবাসা, তুমি বলো না আমি তোমার জীবন’। বিচ্ছেদের এত বছর পরেও দুজন দুজনকে কতটা ভালবাসে, পরিচালক তা স্পর্শের আকুলতা দেখানো ছাড়াই বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। আর্টফিল্ম হাউজের নির্মাতারা সাধারণত এমন বর্ষণসমৃদ্ধ প্লটে যৌনতাকে দর্শক টানার টুলস হিসাবে ব্যবহার করে। ঋতুপর্ণ সেই সুড়সুড়ির পথে হাঁটেন নি।

দিন-দুপুরে বাড়ির সব দরজা-জানলা বন্ধ, বারবার কলবেল বাজলেও নীরু কেন দরজা খোলে না, সেসব মিথ্যার বাইরে তার করুণ জীবনযাপনের সত্যিটা মনোজের সামনে প্রকাশ হয়। এই প্রকাশটুকুর জন্য পরিচালক বেশি নাটকীয়তার আশ্রয় নেন নি। যে কারণে সিনেমাটাও সত্যি মনে হয়। নীরুদের বকেয়া ছ’মাসের বাড়িভাড়া, নিজের সংকট সমাধানের জন্য বন্ধুদের কাছ থেকে হাত পেতে আনা টাকা দিয়ে মনোজ তিনমাস কমিয়ে দেয়। ওদিকে মনোজকে বন্ধুপত্নীর দেয়া রেইনকোট নিয়ে নীরু খাবার আনতে গেছে। নীরু জানে না, তার গোপন প্রকাশ হয়ে গেছে।

এই নাটকীয়তায় ‘কিসি মাওসুমকা ঝাওকা থা, জো ইস দিওয়ালকা লাটকি হুয়ি তাসবির, তু সিকা গিয়া হ্যায়…’ গুলজারের কবিতার সঙ্গে স্বপ্না মুখার্জির গানের সংযোগ ব্যাকগ্রাউন্ডে—ওদিকে নীরুর সম্ভ্রান্ত মিথ্যেগুলির পর্দা মনোজ উন্মোচন করে ফেলেছে। হৃদয় তার কাঁদছে, খুব বৃষ্টি ঝরার মতন কাঁদছে।


কে জিতলো এতে—নীরু নাকি মনোজ? জয়টা প্রেমের।


মনে হতে পারে, মনোজ ব্যাপক প্রতিশোধ নিয়ে নিলো। যে নীরু তাকে কাঁদিয়ে এক আগন্তুককে বিয়ে করেছিল, তার অজান্তে হেনস্তার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে এল নিজের পুঁজিটুকু দিয়ে। প্রেম তো কাউকেই জেতায় না। রেইনকোটের পকেটে অপর বন্ধুদের কাছে মনোজের দুরবস্থার কথা এবং এ থেকে উত্তরণের জন্য সহায়তা চাওয়ার চিঠি নীরুর হাতে পড়ে। নেশাগ্রস্ত স্বামীর অত্যাচার, অভাব-অনটনের মধ্যেও নীরু যা হাতছাড়া করেনি, প্রেমিকের বিপদের দিনে বিয়ের স্মৃতি সেই গয়না রেইনকোটের পকেটে দিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে ছোট্ট একটা চিঠি।

কে জিতলো এতে—নীরু নাকি মনোজ? জয়টা প্রেমের। ঋতুপর্ণের গল্প বলার মুন্সিয়ানাও জিতেছে। ঋতু খুব চেনা আর সরল একটা গল্প চিত্রায়ণ করেছেন নিজস্ব ঢঙে। ছবিতে বিন্দুমাত্র বাহুল্য নেই। সংকট-পতিত দুজন মানুষের জীবনের মেঘাতুর সময় দৃশ্যায়ন করতে গিয়ে, বলা যায় ঋতুপর্ণ সেলুলয়েডের ফিতায় এক ঘণ্টা সাতান্ন মিনিটের একটা কবিতা নির্মাণ করেছেন। যে কবিতার রূপক বর্ষা। বর্ষা রোমান্টিসিজম জাগায় বটে, একই সঙ্গে বেদনাভারও বয়ে বেড়ায়। ছবিটির প্রধান দুই চরিত্র বেদনার মেঘভারে নুয়ে পড়া। এই বৃষ্টিকাব্যে চমকের ঘনঘটা নেই। কিন্তু বোঝা যায় নির্মাতার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা বিপুল এবং প্রভাব বিস্তারকারী। নাচ-গান ফর্মুলার বাইরে স্বল্প বাজেটে শুধু গল্প দিয়েও ছবি বানিয়ে যে দর্শকের হৃদয় জেতা যায়, ঋতুপর্ণ তা ২০০৪ সালে করে দেখিয়েছেন। বলিউড এখন ওদিকেই দৌড়াচ্ছে।

রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়

Latest posts by রুহুল মাহফুজ জয় (see all)