হোম চলচ্চিত্র মানবিক বোধের সিনেমাকার ইনারিতু

মানবিক বোধের সিনেমাকার ইনারিতু

মানবিক বোধের সিনেমাকার ইনারিতু
271
0

শিল্পের যতগুলো শাখা আছে তার মাঝে সবচে আধুনিক শাখা চলচ্চিত্র। আবার চলচ্চিত্রকেই অনেকে সৃজনশীল শিল্প হিসেবে গণ্য করতে চায় না। বলে, এইটা অন্য মাধ্যমগুলো থেকে উপাদান ধার করে চলে। এইসব তর্ক বহু পুরনো ও বলা যায় আপেক্ষিক। তাই এইসব প্রসঙ্গ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় যেতে হলে মাথায় রাখতে হয় সিদ্ধান্ত। যাতে তর্কের সমাধান আসতে পারে। অবশ্য তর্কের সমাধানও যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা কিন্তু না। ফলে, আপেক্ষিক বিষয়টা একটা দূরবর্তী গোলপোস্টের মতো হয়ে থাকুক। আমরা সে প্রসঙ্গে না যাই। আমরা বরং যে কথা বলতে চাই তা-ই বলি। আমরা বলতে চাই মেক্সিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা আলেজান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু নিয়ে। বিশ্বচলচ্চিত্রে মাত্র ৬টা ছবি দিয়ে ইনারিতু তার জাত চিনিয়ে দিয়েছে। তার ধর্ম-ধরন সিনেমা প্রেমীদের চেনা। এই যে ইনারিতুর স্বাতন্ত্র্য তার প্রমাণ দিতে তার খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি। প্রথম ছবি মুক্তির পরই সিনেমাবোদ্ধাদের মগজে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছেন, তিনি ড্রয়িং রুমেরই সিনেমা নির্মাতা নন। তার মাঝে সবচে বেশি যে বিষয়টা পাওয়া যায়, তা হলো শিল্পের মানবিকীকরণ।

অল্প কথায় সারাংশ বলে দিলাম। এখন বাকোয়াজের পালা। পৃথিবী এই রকম যে পুঁজির পিছনেই মানুষ, আর মানুষকে নিয়ন্ত্রণও করে পুঁজি। এই সমান্তরাল জীবনচিত্রের মাঝ দিয়ে ইনারিতু তার জীবনকে উপস্থাপন করছেন এক এক রূপে। আর তাতে পুঁজিই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে না, পুঁজির পিছনেও মানুষ ছোটে না। এর বাইরেও পৃথিবী আছে, সেইটা ইনারিতুর সিনেমায়ই প্রত্যক্ষ।


ভাবতেছিলেন, ছবিটা কি এতই কঠিন হইয়া গেল, যে কেউ দেখতেই আগ্রহ পাইতেছে না!


‘ডেথ ট্রিলজি’ আনঅফিসিয়াল শিরোনামের যে ইনারিতুর প্রথম তিনটা ছবি, এই ছবিগুলোতে সে এত প্রত্যক্ষ জীবনরে তুলে আনছে, যেইটা কোনো কোনো সময় খুবই সাদামাটা। আবার কখনো ক্রাইম জোনের এক রোমহর্ষক গল্প। অথচ আপনি যখন ‘অ্যামেরস পেরোস’ দেখবেন, শুরুতে আপনার কিছুই মনে হবে না। মনে হবে আর দশটা মেক্সিকান ড্রামা ক্রাইম থ্রিলারের আশপাশেই থাকবেন আপনি। কিন্তু ধীরে ধীরে ছবি যখন শেষ হয়ে যায়, তখন আপনার মনে এক জটিল অঙ্কের সরল সূত্র হাতে ধরাইয়া দিবেন এই মেক্সিকান।

শোনা যায় (এইটা বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শোনা কথা, কোথাও পড়ি নাই। যারা বলছে, তারা হয়তো পড়ছে), কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যখন এই ছবি প্রিমিয়ার হয় তখন অর্ধেক ছবির পর নাকি একটা ব্রেক ছিল। বেচারা ইনারিতু ব্রেকের সময় সিনেমার দর্শকদের উঠে চলে যাওয়া দেখে নাকি খুব মন খারাপ করে কানের সমুদ্র সৈকতে হাঁটাহাটি করতেছিলেন। ভাবতেছিলেন, ছবিটা কি এতই কঠিন হইয়া গেল, যে কেউ দেখতেই আগ্রহ পাইতেছে না! এদিকে ছবি শেষ হওয়ার পরে নাকি ইনারিতুরে সৈকত থেকে খুঁজে ধরে আনা হয়। তখন ছবির রেসপন্স দেখে উনি নাকি খুবই আশ্চর্য হইছিলেন! অথচ ছবিটা বানানো হইছে মাত্র এক বছরে। মাত্র বলতেছি এই কারণে, আমাদের দেশে সরকারি টাকা নিয়া কত ছবি যে ১২ বছরেও শেষ হয় না!

ইনারিতুর সবচে বেশি এক্লেইমড বা প্রশংসিত ছবি ‘অ্যামেরোস পেরোস’। টোমেটো ছোড়ার (রোটেন টমেট্যো) সূত্রমতে তার এই ছবি ৯২% ফ্রেশ (আল্লাহ্ জানে ১০০% ফ্রেশ ছবি কোনডা)। একশ ১১টা রিভিউয়ের মাধ্যমে যার রেটিং পয়েন্ট ৭.৮/১০। কোনো কোনো ছবি এরচে বেশি রেটিং পয়েন্টেরও আছে। তবে সেগুলো এইটার সমান মাপেরই ছবি। কিন্তু ইমোশনাল কারণে বোধকরি ঐগুলোর রিভিউ বা রেটিং একটু বেশি হয় আর কি।

20101026-alejandro-gonzalez-inarritu-masterclass-16x9
আলেজান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু (জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৬৩, মেক্সিকো)

‘অ্যামেরস পেরোস’ থেকে যে নির্মাতার আবির্ভাব হয়, সেই নির্মাতার হলিউডি সিল-ছাপ্পর লাগতে বেশি সময় লাগার কথা না। কিন্তু ইনারিতু আমেরিকায় থাইকা, আমেরিকান বাজারে কাজ কইরা আবারও মেক্সিকান সিনেমাই বানাইছেন। আরও মজার বিষয় হইল, নিয়মিত বিরতিতে তিনি শর্ট ফিল্ম বানাইছেন। এইটার মাধ্যমে একটা প্রতিষ্ঠান বিরোধী বা স্বাধীন নির্মাতার জাত চেনা যায়। আলেজান্দ্রো এইখানে দেখাইছেন উনি ঠিক কোন রক্তের। অবশ্য তার রক্তের মূল গুণাবলির মধ্যে আরও শক্তিশালী যে দিকটা আছে তার কথা শুরুতে এক বাক্যে বলছি। এইগুলোর প্রভাব তার ‘ডেথ ট্রিলজি’র পরের ছবিগুলোতে আরও তীব্র। এই ক্ষেত্রে আমার প্রিয় ছবি ‘ব্যাবেল’। ‘ব্যাবেল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ঠিক এক শব্দে কোনো কিছু দাঁড়ায় না। ইংরেজিতে যেইটারে বলে, a confused noise made by a number of voice । ব্যাবেল সিনেমাটাও এই রকমই। একটা সামষ্টিক জীবনের বিচ্ছিন্ন রূপ। যা কিনা আদতে বিচ্ছিন্ন রূপ মনে করলেও আদতে বিচ্ছিন্ন না, একই সূত্রে গাঁথা। এইবার ছবিটার একটু ভেতরে তাকাই। দেখি মরক্কোর এক মরুভূমি থেকে শুরু হইল ছবি। তারপর? তারপর আর কী, একবারে বলতে হইলে এইটা হইল কান। এই কানে টান পড়তেই আমাদের হাতের কাছে মেক্সিকো, জাপান ও আমেরিকা সব আইসা হাজির। পুরো সিনেমার দায়িত্ব উঠে আসলো এই মরক্কান বন্দুক বিক্রেতার কাছে। যে কিনা মরুভূমির কৃষকের কাছে একটা জাপানি বন্দুক বিক্রি করতে আসে। গল্পের ঘুড়ি যে এইখান থেকে উড়তে শুরু করল, আর গোত্তা খায় নাই। পতপত করে উড়ছে। গল্পের ভেতর থাকা যত উপাদান সবকিছুরই শেষ পর্যন্ত একটা মানবিক তাড়না ছিল, ছবিতে এইটা প্রমাণিত হইছে বারবার। তবুও শেষ দৃশ্যে জাপানি পিতা-কন্যার সেই দৃশ্য দেখে বুক হু হু করে উঠে। মনে হয়, এত অর্থবিত্ত আর প্রতিপত্তি এসব আসলে খুবই ঠুনকো। যে কোনো সময় কাচের টুকরোর মতো ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু আস্থা, মানবিকতা, প্রেম ভেঙে পড়ার বিষয় না। আর প্রতিটা পরিবারই সদস্যদের জন্যে সেরা আশ্রয় এ কথা তো আর বলতেই হয় না। এইখানেই ইনারিতুর মুন্সিয়ানা। যেই ছবিটা একটা অসাধারণ রাজনৈতিক ছবি হিসেবেও বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু সব বিচারেই তার মানবিক বোধ সবার ওপরে। যেমন এই ছবির প্রসঙ্গেই আবার আসি। ছবিটা ইনারিতু তার দুই সন্তানকে উৎসর্গ করছেন। উৎসর্গপত্রে লিখছেন, To my children,  Maria Eladia and Elisco… For the brightest lights in the darkest night.


যেন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পৃথিবীতে তিনি নিজের ইচ্ছা আর স্বাভাবিক জীবনরে বিসর্জন দিয়া যাপন করতেছেন।


ইনারিতুর অন্য আরেকটা পরিচয়ও আমরা ভাবতে পারি। সেইটা হইল শিল্পী মন। প্রতিটা শিল্পীই যে স্বাধীন ও চরমভাবে স্বতন্ত্র তার পরিচয়ও তিনি তার সিনেমা দিয়াই দিছেন। এই পরিচয় স্পষ্ট হয় তার প্রথম হলিউডি ছবি ‘বার্ডম্যান অথবা দ্যা আনএক্সপেক্টেড ভার্চু অব ইগনোরেন্স’। আমেরিকায় সাধারণত প্রডিউসারস সিনেমাই সারা বছর প্রডিউসড হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্মাতারা যখন হলিউডে গিয়া ছবি বানায়, তখন অধিকাংশই থাকে প্রডিউসার-নিয়ন্ত্রিত। (বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি অবশ্য এই জিনিসের এক পার্সেন্টও কখনো দেখাইতে পারে নাই। সে প্রসঙ্গ থাকুক। অন্য কোথাও, অন্য সময় আলাপ করা যাবে।) ইনারিতু কিন্তু এই মিছিলে যোগ দেন নি। তিনি নিজেই তার সিনেমার ওয়ান অব প্রডিউসার। ফলে তার ছবি সে অর্থে আর প্রযোজক-প্রভাবিত না। বার্ডম্যান ছবিতে রিগানের চরিত্রটারে প্রায়ই মনে হইছে ইনারিতু নিজে। যেন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পৃথিবীতে তিনি নিজের ইচ্ছা আর স্বাভাবিক জীবনরে বিসর্জন দিয়া যাপন করতেছেন। এর মাঝখান থেকে যে মুক্তির উপায় আছে, ছবি জুড়েই সেই পথ খুঁজে গেছে রিগান থমসন চরিত্রে অভিনয় করা মিচেল/মাইকেল কেটন। এই ছবিরেও আলেজান্দ্রো বানাইছে অনেকটা মঞ্চ কায়দায়। ছবিতে অভিনয়ের পরে এম্মা স্টোন যা বলছে তা রীতিমতো উল্লেখযোগ্য। বাংলা করতে গিয়া আর তার সৌন্দর্য নষ্ট না করে এম্মার কথাই সরাসরি পড়া যাক—“I know Alejandro is very adamant about kind of keeping the rabbit in the hat and not being super specific about how it was shot, but I will say it took a lot of rehearsal and it was very specific… There was no luxury of cutting away or editing around anything. You knew that every scene was staying in the movie, and like theater, this was it, this was your chance to live this scene.” একটা সিনেমা সাথে আপোসের বিন্দুমাত্র সুযোগ দেয় নি নির্মাতা। শিল্পের সাথে তো শিল্পীরও কিছু দায়বোধ থাকে, এইটা টের পাওয়া যায় এইসব কার্যকলাপে।

আমি বারবার ভাবি, সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্বচলচ্চিত্রে মানুষের মনের ভিতর থাকা যে সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো, সেগুলো কার কাছে সবচে বেশি গুরুত্ব পায়? একেকজন হয়তো একেক রকম করে ভাববে, কারো কাছে হয়তো ল্যাটিন আমেরিকান (ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার স্বাধীন নির্মাতারা গুরুত্ব পাইতে পারে), কারো কাছে ইরান, কোরিয়ান, ফরাশি বা স্প্যানিশ নির্মাতাদের ছবিও এই ভাবনায় আসবে। তবে অন্য সবার চেয়ে আমি মনে করে ইনারিতু এইখানে একটু আগায়া। আপনি একবার ভাবেন তো, ‘বিউটিফুল’ সিনেমার হ্যাভিয়ের বারদেম-এর চরিত্রটার কথা একবার ভাবুন তো, উত্তরটা পেতে কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আবার তাকেই ভাবুন। এবার আরেকটু সহজ হচ্ছে বোধহয়। এই জন্যেই ইনারিতুরে আমার মানবিক বোধ সৃষ্টিকারী একজন নির্মাতা মনে হয়।

ইলিয়াস কমল

জন্ম ০৯ মার্চ। ময়মনসিংহ, ঢাকা।

কবি।

শিক্ষা : স্নাতকোত্তর।

পেশা : সাংবাদিকতা।

eliauskomol@gmail.com.