হোম চলচ্চিত্র মনপুরা ২০০৯ : গিয়াস উদ্দীন সেলিম

মনপুরা ২০০৯ : গিয়াস উদ্দীন সেলিম

মনপুরা ২০০৯ : গিয়াস উদ্দীন সেলিম
728
0

বাঙালির অ্যাপ্রিসিয়েশন বড়ই অদ্ভুত।

কথাটি বলেছিলেন একজন সিনিয়র লেখক এবং বিগত কয়েক বছরে এই রূঢ় বাস্তবতার সাথে পরিচয় ঘটল বারবার। কেন জানি ‘মনপুরা’ সিনেমাটির রিভিউ করতে বসে কথাটি মনে পড়ে গেল। হয়তো সাম্প্রতিক সময়ে ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে লিখতে বসে বিষয়টি মাথায় এসেছিল আর খুব অল্প সময়েই সিনেমাটি নিয়ে দর্শকের উচ্চ প্রশংসা ও ভূরি ভূরি রিভিউ এর বিপরীতে দীর্ঘ সাত বছর অতিবাহিত হবার পরও ‘মনপুরা’র একটি ভালো রিভিউ তন্ন তন্ন করে খুঁজে না পাবার কারণেই বাক্যটি বোধ করি আমার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। বস্তুত, ‘মনপুরা’ আমার কাছে সেই অনবদ্য অভিজ্ঞতা ও ভালো লাগার মতো ধরা দিয়েছে, যা হয়েছিল বেশ কিছু বছর আগে নীলক্ষেতে হঠাৎ পাওয়া সম্পূর্ণ অপরিচিত এক লেখকের বই কিনে পড়ার পর, এবং এতগুলো বছর যেমন ওয়াংকার ওয়াই এর ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ সিনেমার ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারি নি, তেমন ‘মনপুরা’র ঘোর থেকেও বেরুতে পারব না আরও কিছু বছর। নীলক্ষেতে কেনা বইটির নাম ছিল প্রদোষে প্রাকৃতজন, শওকত আলীর লেখা।


‘মনপুরা’ একটি সার্থক সিনেমার সবগুলো এলিমেন্টসহ এতটাই বলিষ্ঠভাবে বর্তমান যে, পরিচালক গিয়াস উদ্দীন সেলিমের সিনেমা-জ্ঞানের তারিফ না করে পারা যায় না।


নিতান্তই ভালো লাগা থেকে যে ‘মনপুরা’র রিভিউ লিখতে বসেছি তা নয়, বরং এমন একটি সিনেমার ভালো রিভিউ না থাকার যে দায়বদ্ধতা সেটা অনেক বেশি কাজ করেছে আমার মধ্যে, যা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছি না, কারণ কাহিনি বিন্যাস, পরিচালনা, সম্পাদনা, সংগীত, সংলাপ, চিত্রায়ণ যে কোনো বিষয় থেকেই এই সিনেমার রিভিউ শুরু করা যেতে পারে, আর একদম শুরুর দৃশ্য থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ‘মনপুরা’ একটি সার্থক সিনেমার সবগুলো এলিমেন্টসহ এতটাই বলিষ্ঠভাবে বর্তমান যে, পরিচালক গিয়াস উদ্দীন সেলিমের সিনেমা-জ্ঞানের তারিফ না করে পারা যায় না। যেখানে তিনি আমাকে কেবল আমাদের মুগ্ধতার সীমার মধ্যেই আবদ্ধ রাখে নি, বিস্মিতও করেছেন। একজন পরিচালক প্রথম সিনেমাতেই কিভাবে এতটা পারফেক্ট?—প্রশ্নটি বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে, কারণ গত এক দুই দশকে সিনেমা শিল্প লাগাতারভাবে এমন কিছু উল্লেখযোগ্য সিনেমা আমাদের দেয় নি, যার দরুন ভাবা যেতে পারে, বাংলাদেশে ‘মনপুরা’র মতো একটি কমপ্লিট সিনেমা তৈরির পরম্পরা তৈরি হয়েছে, অথচ হঠাৎ করেই জনাব সেলিম তার প্রথম প্রয়াসেই আমাদের উপহার দিলেন ‘মনপুরা’র মতো একটি সিনেমা, যা কেবল দেশীয় পরিমণ্ডলেই নয় বরং আন্তর্জাতিকভাবেও আমাদের সিনেমা শিল্পকে নেতৃত্ব দিতে পারে, দৃঢ়ভাবে।

একদম শুরুর দৃশ্য থেকেই ‘মনপুরা’ তার চিত্রায়ণে মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছে আর সমগ্র সিনেমা জুড়েই তা ক্রমশ ব্যাপ্ত ও বিস্তৃত হতে হতে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, একটি সিনেমার চিত্রায়ণ কোন পর্যায়ে উন্নীত হলে তা বিশ্বমানের হয়ে ওঠে। নিতান্তই গতানুগতিক কিংবা সাধারণ মানের একটি গল্পের পরও ‘মনপুরা’ দর্শকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবার ক্ষেত্রে এর শুরুর দুটি অধ্যায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে এবং দর্শককে কাহিনির সাথে একাত্ম হতে সহায়তা করেছে। কাহিনির নাটকীয় শুরু ও সোনাইয়ের (নায়ক) মনপুরায় নির্বাসন, এই দুটো অধ্যায় দর্শক মনে সমূহ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে আর সোনাইয়ের মনপুরায় আগমনের সাথে সাথে দর্শক নিজেও কাহিনির বিকাশে এগিয়ে যাবার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। দর্শক মনে সিনেমার কাহিনির এমন প্রয়াস বা ক্রিয়া একটি সার্থক সিনেমার জন্য অনেক বেশি জরুরি আর পরিচালকের জন্য তখন গল্প বলার বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে ওঠে, যা এই সিনেমার ক্ষেত্রে একদম শুরুর দৃশ্য থেকেই ঘটেছে, বা বলা চলে, পরিচালক তা ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। শুরুর দৃশ্যর কথাই ধরা যাক, বিজলি চমকানো বর্ষণমুখর রাত, ফ্লোরের কাছাকাছি থেকে শ্যুট করা দৃশ্য, যেখানে একটি লোহার শিকল পড়ে আছে, সামনে চাদরে আবৃত ঘুমন্ত মানুষ ও তার হঠাৎ ঘুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে জেগে উঠার পর অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে ক্যামেরার অন্য দৃশ্যে সরে যাওয়া ও বিজলির আলোয় মুহূর্তের জন্য হাঁ করা সিংহমূর্তির মুখ থেকে বৃষ্টির মধ্যে অনড় দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরুষে স্থির হবার পরপরই নতুন বিস্ময়ের মতো আমরা যখন পুরুষটির সামনে নিথর পড়ে থাকা একটি নারীদেহ আবিষ্কার করি, তখন এই সিনেমা বা এর কাহিনির সাথে আমাদের একাত্মতা জরুরি নয়, অনিবার্য হয়ে পড়ে, কেননা যে দৃশ্যগুলো ততক্ষণে আমাদের দেখানো হয়েছে, বা বলা চলে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তাতে আমাদের বুদ্ধিমত্তা আপনা-আপনি ক্রিয়া শুরু করে, যেখানে একদম শুরুর দৃশ্য’র লোহার শিকল যেমন মাথার মধ্যে রয়ে যায়, তেমন বৃষ্টির মধ্যে একটি পুরুষের সামনে পড়ে থাকা নারী শরীরের নিথর অস্তিত্ব আমাদের মধ্যে অনেকগুলো সিদ্ধান্তের জন্ম দেয়, যার মধ্যে এই সিদ্ধান্তটি প্রথমেই নিয়ে ফেলি যে, সেটি একটি খুন, আর এর পরপরই ক্রিয়াশীল মস্তিষ্কে নতুন প্রশ্ন জাগে, ‘নারীটি কে?’

বস্তুত, কাহিনি শুরুর এই প্রয়াসটুকু ‘মনপুরা’র জন্য ছিল অনেক বেশি জরুরি, যা হয়তো পরিচালক অনুধাবন করেছিলেন আর নিজ দক্ষতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই বোধ করি তিনি তার সৃষ্টিশীলতা থেকে সরে না এসে প্রশ্নটিকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন রহিমা নামের সেই মৃত নারীটির পরিচয় উল্লেখ না করে। আমরা তখন নিজেরাই আপাতভাবে সিদ্ধান্ত নিই নারীটি কে, আর এই সিদ্ধান্ত নেবার সময় গাজী সাহেব (গ্রামের জমিদার) ও তার স্ত্রীর শলা-পরামর্শ ও মৃত নারীটির মুখের এক ঝলক থেকে নিজেদের আবিষ্কার করি নদী বিস্তৃত নৈসর্গিক পটভূমিতে, যেখানে পূর্বের ঘটনার কোনো প্রকার সমাপ্তি বা সিদ্ধান্ত না টেনেই আমাদের নিয়ে আসা হয় ভিন্ন পটভূমিতে। আমাদের মধ্যে তখনও পূর্ববর্তী ভাবনা-চিন্তার রেশ রয়ে যায়, আর গাজী সাহেব ও সোনাইয়ের কথোপকথন থেকে জানতে পারি, পূর্বের রাতে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো পরিচালক তখনও আমাদের জানান নি মৃত নারীটি কে, এমনকি গাজী সাহেব ও তার স্ত্রীর মধ্যে যে শলা-পরামর্শ হয়েছিল এবং সেখানে সোনাইকে যে খুনের দায়ে ফাঁসানো হবে, তার সম্পর্কেও আভাস দেন না, বরং আবারও আমরা নিজেরাই আন্দাজ বা উপলব্ধি করে নিই ঘটনার বৃত্তান্ত। কাহিনির বিকাশে দর্শকের এই যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তা নিতান্তই কাকতালীয় নয়, বরং পরিচালকের মুন্সিয়ানারই প্রকাশ বটে, ফলে একদম শুরু থেকেই ‘মনপুরা’ আমাদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয় সোনাইয়ের সাথে সাথে মনপুরায় গমন করতে ও কাহিনির গতির সাথে সাবলীল হয়ে উঠতে।

‘মনপুরা’র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর আরেকটি হলো এর লোকেশন নির্বাচন। লোকেশন হিশেবে এই সিনেমা ও কাহিনির জন্য মনপুরা কেবল অসাধারণ নয়, বরং এর চেয়ে ভালো লোকেশন এই সিনেমার জন্য খুঁজে পাওয়া দুরূহের। আর এখানেও প্রশংসা পরিচালকের জন্যই বরাদ্দ, কেননা তিনি ‘মনপুরা’র জন্য সত্যিকারের এক নৈসর্গিক লোকেশন নির্ধারণ করেছেন, যা একদিকে যেমন কাহিনির দাবি পূরণ করেছে, তেমন আবহমান গ্রাম-বাংলার চিরাচরিত রূপকে অনেক বেশি বিস্তৃত করে তুলেছে সিনেমার পটভূমিতে, যার জন্য একরাশ মুগ্ধতাই বরাদ্দ কেবল। এক কথায় ‘মনপুরা’র সামগ্রিক যে চিত্রায়ণ অথবা যেভাবে ‘মনপুরা’র দৃশ্যাবলী আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, তেমনটা খুব বেশি দেখেছি বলে মনে পড়ে না, সে জন্য পরিচালকের সাথে সাথে সিনেমাটোগ্রাফার কামরুল হাসান খসরুকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে হয় বিশেষভাবে। প্রতিটি শট-ই তিনি অনেক যত্নের সাথে নিয়েছেন, যেখানে একধারে দক্ষতা, মননশীলতা ও পেশাদারিত্বের ছাপ ষোলো আনাই বর্তমান।

গত দুই তিন দশকে বাংলাদেশে যতগুলো সিনেমা নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে যে কয়েকটি সিনেমা আমাদের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে, ‘মনপুরা’ সেগুলোর অন্যতম। “কেন ‘মনপুরা’র এই দাবি”—এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কেননা মনপুরা ছাড়াও তো অন্যান্য ভালো সিনেমা রয়েছে, তবে কেন শুধু ‘মনপুরা’র জন্যই এই বিশেষ মনোযোগ? সত্যি বলতে ‘মনপুরা’ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কোনো সিনেমা নয়, বরং বলা যায়, আমাদের দেশীয় সিনেমার যে চিরকালীন প্রেক্ষাপট, ‘মনপুরা’ তার বলিষ্ঠ রিপ্রেজেন্টেশন মাত্র। তারপরও ‘মনপুরা’ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে এর পরিচালনার জন্য। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের পরিচালকরা মেধাবী, কিন্তু যথেষ্ট মনোযোগী নয়, আর অধিকাংশ সময়ই তাদের সিনেমা দেখার পর মনে হয়, কোথাও যেন খেই হারিয়ে ফেলেছেন। সেখানে ‘মনপুরা’ একটি কমপ্লিট নির্মাণ, সবগুলো দিক থেকেই, আর সে জন্যই ‘মনপুরা’র এই বিশেষ মনোযোগ দাবি। যদি এর চিত্রায়ণের কথা বলি, তবে ‘মনপুরা’র নৈসর্গিক যে দৃশ্যাবলী তা এমনিতেও মনোহর, তবে তাকে অনবদ্য করে তোলার দায়িত্ব ছিল চিত্রগ্রাহকের, যা তিনি সফল ভাবেই করতে সক্ষম হয়েছেন। এরপর কাহিনি বিন্যাস বা এর গতি, নাটকীয়তার সমাবেশ, চরিত্রের জন্য কলাকুশলী নির্ধারণ ও অভিনয়, সংগীত সংযোজন, আবহ সংগীত (যদিও দুএকটি দৃশ্যে আবহ সংগীত অস্বস্তিকর, দীর্ঘ ও ভারি মনে হয়েছে) ও বাস্তব শব্দের অপূর্ব সমাবেশ, পরিমিত সংলাপ ও সম্পাদনা, সবগুলো বিষয়-ই তো ‘মনপুরা’তে অপরাপর সিনেমার চেয়ে পারফেক্টলি করা হয়েছে আর সে জন্যই এমন একটি সিনেমা আপনা-আপনিই বিশেষ মনোযোগের দাবিদার হয়ে ওঠে, সমসাময়িক তো বটেই, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও।


গানগুলোই হয়ে ওঠে সিনেমাটির অন্যতম বিজ্ঞাপন


প্রায়শই আমার এ কথা মনে হয় যে, আমাদের দেশের সিনেমা পরিচালকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় সম্পাদনা, কারণ যখন তারা সিনেমা বানান তখন তাদের মাথায় ভিন্ন কোনো চিন্তা না থাকলেও, সম্পাদনার সময় এ চিন্তা অবশ্যই মাথায় থাকে যে, সিনেমাটি বাংলাদেশে নির্মিত এবং তা বাংলাদেশি দর্শক দেখবে। বিষয়টি ভয়াবহ নিঃসন্দেহে আর আমার এমন কথা মনে হবার কারণ, ‘মনপুরা’র রোমান্টিক দৃশ্যগুলো খুব মোলায়েম ও সাবধানতার সাথে শ্যুট করা হয়েছে, যেখানে রোমান্টিক আবেগের বাড়াবাড়ি নেই বললেই চলে, যেন সবকিছুই সেখানে স্বর্গীয় সুন্দর, নির্মল ও বিশুদ্ধ, এমনকি নায়ক যখন নায়িকাকে প্রচণ্ড আবেগে নিজের দিকে টেনে নেয়, আলিঙ্গন করে, তখনও সেখানে রয়ে গেছে আবেগহীনতার লক্ষণ আর দুটো শরীর গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হবার পরিবর্তে, সাবধানী দূরত্ব থেকেই যেন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, একজন পরিচালক কোনো আবেগঘন আলিঙ্গন দৃশ্য এভাবে শ্যুট করতে পারে, কারণ প্রেমের আবেগঘন বাস্তব আলিঙ্গন তা গ্রাম হোক অথবা শহর, সবখানেই আবেগের প্রাবল্যতায় জর্জরিত, অথচ ‘মনপুরা’র আলিঙ্গন বা প্রেমের আবেগঘন দৃশ্যগুলো যে কেবলমাত্র বাংলাদেশের, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও বিষয়টি দুঃখজনক, তারপরও ‘মনপুরা’ই শেষ পর্যন্ত জিতে গেছে, কারণ শুরু থেকেই এটি একটি কমপ্লিট সিনেমা অভিজ্ঞতার দিকে আমাদের নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, ফলে সেখানে যাই ঘুটক না কেন তা আমাদের জন্য অবাস্তব, অস্বস্তিকর কিংবা অসামঞ্জস্যমূলক ছিল না, মোটেও। ‘মনপুরা’ নিয়ে আমার প্রশংসা এ জন্যই আরও অধিক যে, সিনেমাটি দর্শক গ্রহণ করে নি, বরং সিনেমাটিই দর্শককে বাধ্য করেছে তা গ্রহণ করতে এবং শুধুমাত্র তা করেই ক্ষান্ত থাকে নি, দর্শককে অবলীলায় এর বাতাবরণে টেনে এনেছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। ‘মনপুরা’র সুন্দর হয়ে উঠার পরিসর ছিল ব্যাপক আর সেই বিশাল পরিসরের দিকে পরিচালক আমাদের টেনে নিয়ে গেছেন সুষম গতিতে। আহা, আমরা কেউ-ই আসলে টের পাই নি ‘মনপুরা’র নদীটি কোন সে মাদকতায় সাঁতরে পার হয়ে এসেছি সোনাইয়ের সাথে সাথে।

‘মনপুরা’ নিয়ে একজন লিখেছেন যে, ‘সিনেমা মুক্তির আগেই এর গানগুলো লোকজনের মুখে মুখে ফিরছিল এবং মুক্তির পর এই গানগুলোই হয়ে ওঠে সিনেমাটির অন্যতম বিজ্ঞাপন’—মন্দ বলেন নি, কারণ ‘মনপুরা’ ট্র্যাজিক লাভ স্টোরি হিশেবে যত না বেশি হিট করেছে, তার অধিক মিউজিক্যাল লাভ স্টোরি হিশেবে হিট করেছে। সংগীত ‘মনপুরা’র সফলতম দিক ও মিউজিক্যাল অ্যালবাম হিশেবেও দারুণ সফল। বাংলাদেশি সিনেমার ক্ষেত্রে এমনটি সচরাচর ঘটতে দেখা যায় না। এছাড়া এর আবহ সংগীতও বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। আমার তো এখনও মস্তিষ্কের মধ্যে সোনাইকে ‘মনপুরা’য় নামিয়ে দেবার সময় আবহ সংগীতে হারমোনিকার ব্যবহার ক্রিয়াশীল রয়েছে, কান পাতলেই শুনতে পাই যেন। যদিও এই পার্টিকুলার মিউজিকটি আমার পূর্ব পরিচিত ও জীবনে সবচেয়ে বেশিবার দেখা সিনেমা ‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড, অ্যান্ড দ্য আগলি’র আবহ সংগীত থেকে নেওয়া মনে হয়েছে। তারপরও খারাপ লাগে নি, কারণ যথার্থ দৃশ্যেই মিউজিকটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা কাহিনির বাতাবরণকে আরও করুণ ও গ্রহণীয় করে তুলেছে। সিনেমায় সংযোজিত সবগুলো গানই অসাধারণ, বিশেষ করে ফজলুর রহমান বাবুর গাওয়া ‘নিথুয়া পাথারে’ গানটি আমি একটানা অনেকদিন শুনেছি। ‘যাও পাখি বলো তারে’ গানটিও অসাধারণ, তবে এতে দিলারা জামানের ঠোঁট মেলানো নিতান্তই বেমানান লেগেছে। আমার একটা বিষয় মাথায় ঢোকে না কিছুতেই, সিনেমাতে পরিচালক যদি নিতান্তই গান সংযুক্ত করতে চান, তবে করুক, কিন্তু সেই গানের সাথে চরিত্রের ঠোঁট মেলানোর বিষয়টি দেখাতে হবে কেন? আবহ সংগীত যদি ব্যাক গ্রাউন্ডে সফলভাবে সংযুক্ত হতে পারে, তবে গান কেন পারবে না? গান ছাড়া কি সিনেমা পৃথিবীতে তৈরি হয় নি বা হচ্ছে না, কিংবা গান ছাড়া সিনেমা কি বাঙালিরা দেখে অভ্যস্ত নয়? তবে কেন উপমহাদেশে গান ছাড়া সিনেমার কল্পনা করা সম্ভব নয়?

‘মনপুরা’র অভিনয় নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, কেননা মামুনর রশীদ কিংবা ফজলুর রহমান বাবু শক্তিশালী অভিনেতা হিশেবে নিজেদের অনেক পূর্বেই প্রমাণ করছেন। তবে পাগল চরিত্রে মনির খান শিমুলের অভিনয় নিয়ে আমার অভিযোগ আছে। এখানে তার পাগলামো পাগলের হয় নি বরং অভিনেতা শিমুলের হয়েছে আর তিনি যে চরিত্রটির সাথে সফলভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছেন, তা মানতে নারাজ। পরিচালকের এই একটি ব্যাপারে আমি সত্যিকার অর্থেই হতাশ হয়েছি। এই পাগল চরিত্রটি নিয়ে কি আরেকটু ভাবা উচিত ছিল না? এমন কোনো চরিত্র, যা অন্তত উচ্চতায় আরেকটু খাটো হলে মন্দ হতো কি? আজীবন ধরে যত পাগল আমরা দেখেছি, তারা এত সুদর্শন ও লম্বা কখনোই ছিল না। চরিত্র গ্রহণের বিষয় না হলেও, চরিত্রের করা অভিনয়ের সাথে একাত্ম হতে হলে আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই যেতে হয় বৈকি। বিষয়টি তো আর এমন নয়, আপনি শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির জাপানিজ ট্রেনে চড়ে বেমালুম বাংলাদেশি ধীরগতির ট্রেনে চড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা ভুলে গেলেন। এটা ঠিক যে দ্রুতগতির ট্রেন আপনাকে নতুন অভিজ্ঞতা দেবে, তাই বলে আপনার অতীত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই তো আপনাকে সেই নতুন অভিজ্ঞতার দিকে যেতে হবে, সেখানে আপনি যদি আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতাকে ইগনোর করে বসেন কিংবা নতুন অভিজ্ঞতা যদি আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, তখন অস্বস্তি বোধ করবেন, যা আপনাকে সাবলীল ও সহজ হতে দেবে না কিছুতেই। তাই ‘মনপুরা’র পাগল চরিত্রে আমি যেমন শিমুলের অভিনয় পছন্দ করি নি, তেমন তাকে সেই চরিত্রে গ্রহণ করতেও সম্পূর্ণরূপে নারাজ।

আরও একটি বিষয় আমাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে। যদিও তা পরিচালকের মুন্সিয়ানার ছাপই বহন করে, তারপরও বিষয়টি নিতান্তই সিনেমার বাতাবরণ ও আমাদের অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায় আর এখানেও পরিচালক সেই পূর্বের দোষেই আরোপিত। যদিও তা উৎকর্ষতার দিক থেকে মোটেও নেগেটিভ নয়, তারপরও বিষ খাবার পূর্বে পরীর (নায়িকা) দুঃস্বপ্নের যে চিত্রায়ণ, তা আমাকে চমকে দিলেও আমি তাকে ‘মনপুরা’র দৃশ্য হিশেবে গ্রহণ করতে নারাজ, ফলে ঐ বিশেষ দৃশ্যায়নটি অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। এখানেও পরিচালক মনোযোগী হতে পারতেন এবং যেভাবে তিনি দৃশ্যটি চিত্রায়ণ করেছেন, সেখানে বিষয়টি আমার কাছে গ্রাম-বাংলার রাক্ষস-খোক্কস কিংবা জিন-ভূতের প্রচলিত চিন্তার পরিবর্তে হুট করে দুমাথাওয়ালা ড্রাগন কিংবা এলিয়েনের চিন্তার মতো আবির্ভূত হয়েছে, ফলে আপাদমস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা ঐ মানুষগুলো সিনেমার পরিমণ্ডলে খাপ না খেয়ে নিতান্তই এলিয়েন হিশেবে ধারা দিয়েছে, যা সরল, সাধারণ একটি গ্রামের মেয়ের মৃত্যুপূর্ব দুঃস্বপ্ন বা হ্যালুসিলেশন হিশেবে আবির্ভূত হওয়া অসম্ভব এবং ‘মনপুরা’র সামগ্রিক বাতাবরণে নিতান্তই বেমানান। আশা করি পরিচালক তার সামনের সিনেমায় এই বিষয়গুলোর প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হবেন।

এবার আসি চঞ্চল চৌধুরী প্রসঙ্গে। শুরুতেই বলেছি গিয়াস উদ্দীন সেলিম নিঃসন্দেহে একজন গুণী পরিচালক এবং তার সিনেমা জ্ঞান অবশ্যই গভীর আর সে জন্যই বলা যায়, ‘মনপুরা’র চঞ্চলকে হয়তো খুঁজে বের করা কোনো পরিচালকের জন্য কষ্টকর ছিল না, কিন্তু ‘মনপুরা’র জন্য চঞ্চলকে সোনাই করে তোলা পরিচালক ও অভিনেতা কারোর জন্যই সহজ ছিল না, অথচ কাজটি জনাব চঞ্চল করতে সক্ষম হয়েছেন দারুণভাবে। এ কথা অনায়াসেই বলা যায়, ‘মনপুরা’র সোনাই এখন পর্যন্ত চঞ্চল চৌধুরীর সেরা অভিনয়, যদিও এই অভিনেতা এখনও তার ক্ষমতার প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তবে একদিন তিনি সমর্থ হবেন বলেই বিশ্বাস করি।


‘মনপুরা’র এমন সমাপ্তি, পরিচালকের সাহসিকতারই পরিচয় বহন করে


নায়িকা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিচালক যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন এবং ফারহানা মিলি পরী চরিত্রটির জন্য আমার কাছে যথাযথ নির্বাচন মনে হয়েছে। যদিও এ কথাটি না বললেই নয়, মিলি আমার দেখা সবচেয়ে অসুন্দরী নায়িকা, যার মোহনীয় ঘোর থেকে বের হওয়া সত্যিকার অর্থেই অসম্ভব। এর মানে এও নয়, তিনি কুশ্রী বা অসুন্দরী, বরং সরাসরি বলতে গেলে, আমরা সচরাচর যে সমস্ত নায়িকার দ্বারা ঘোরগ্রস্ত হয়েছি, সেখানে তিনি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তার সুগোল, শান্ত মুখটি ‘মনপুরা’র বাতাবরণের সাথে মিলেমিশে গেছে। যদিও তার উপস্থিতি থেকে শহুরে গন্ধ একদম উবে যায় নি, তারপরও তাকে গ্রহণ করে নিতে বেগ পেতে হয় নি, তাই ‘মনপুরা’ আমাদের মনে হয়তো তার কারণেও দীর্ঘদিন এক সুগভীর ক্ষত তৈরি করে রাখবে, কেননা ‘মনপুরা’র সোনাই চরিত্র থেকে আমরা নিজেদের ততদিন ভিন্ন করতে পারব না, যতদিন আমাদের মধ্যে শাশ্বত প্রেমের আবেগ বর্তমান থাকবে আর সেখানে এমন একটি প্রেমিকার বিয়োগ আমাদের ব্যথিত না করে পারে না।

নায়িকা বা নায়কের মৃত্যু, অর্থাৎ মৃত্যু ট্র্যাজেডি দিয়ে শেষ করা সিনেমাগুলো সবসময়-ই চ্যালেঞ্জের মতো হয়ে ওঠে ব্যবসায়িক সাফল্যের ক্ষেত্রে, কেননা দর্শক দুই তিন ঘণ্টা ধরে একটা কাহিনি দেখার পর হল থেকে করুণ বা অশ্রুসিক্ত হয়ে বের হয়ে আসবে, এটা বোধকরি কখনোই কাম্য নয়, ফলে সুখকর সমাপ্তি সিনেমার জন্য এক ধরনের অলিখিত নিয়ম হিশেবেই উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সেখানে ‘মনপুরা’র এমন সমাপ্তি, পরিচালকের সাহসিকতারই পরিচয় বহন করে, যেখানে তিনি আমাদের মতো আবেগী জাতির সামনে এমন বিয়োগান্তকভাবে শেষ করা একটি সিনেমা তুলে ধরেছেন, আর কেবল তা করেই ক্ষান্ত থাকেন নি, দারুণ মুন্সিয়ানার সাথেই শেষ দৃশ্যটির চিত্রায়ণ করেছেন, যেখানে এরিয়েল শটে দেখানো বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে ভাসতে থাকা দুঃখ বিহ্বল সোনাইয়ের অসহায় অস্তিত্ব, যার সাথে আমরাও একাত্ম বোধ করি ও কষ্টবোধে জর্জরিত হয়ে ওঠি আর বিশাল জলরাশির মধ্যে ভাসমান দিগ্‌ভ্রান্ত মানুষের মতো সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘক্ষণ বা দীর্ঘদিন ধরে যেমন ব্যথিত হই, তেমন আনমনে মনের মধ্যে ভেসে উঠা পরীর নির্মল মুখখানা ভেবে প্রেম বোধে সুখী হয়ে ওঠি, ফলে সোনাই ও আমাদের মধ্যে কিংবা তার সীমাহীন দুঃখবোধের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারি না, তাই ‘মনপুরা’ বরং হয়ে উঠে আমাদেরই কাহিনি কিংবা নিজস্ব দুঃখ বোধ, যার ফলে দারুণ বিয়োগান্তক এই কাহিনিকে গ্রহণ করার জন্য আমাদের নতুন কোনো প্রস্তুতির দরকার পড়ে না কিংবা তার জন্য আমাদের ভালো লাগার জায়গাটুকু আলাদাভাবে বরাদ্দ করতে হয় না।

পরিশেষে পরিচালক গিয়াস উদ্দীন সেলিমের সিনেমা জ্ঞানের প্রতি পুরোপুরি আস্থা রেখেই বলতে পারি, এই পরিচালক সামনের দিনগুলোতে আমাদের আরও ভালো কিছু সিনেমা উপহার দেবেন এবং তার আগামী সিনেমা ‘স্বপ্নজাল’ ‘মনপুরা’র মতো সাফল্য পাক বা না পাক, অন্তত বাংলাদেশি চলচ্চিত্র প্রেমিদের ভালো চলচ্চিত্রের প্রতি যে তীব্র ক্ষুধা, তা কিছুটা হলেও মেটাবে।

আন্তরিক শুভকামনা রইল জনাব সেলিম আপনার জন্য এবং ‘স্বপ্নজাল’ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম।

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য