হোম চলচ্চিত্র বিভূতির নয়, সত্যজিতের বর্ষা

বিভূতির নয়, সত্যজিতের বর্ষা

বিভূতির নয়, সত্যজিতের বর্ষা
267
0

বৃষ্টি বা বর্ষা নিয়ে পৃথিবীর অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে বাংলা ভাষাতেই সাহিত্য রচনা হয়েছে বেশি। কেবল রবীন্দ্রনাথই বর্ষা নিয়ে এত কবিতা আর গান লিখেছেন, তা নিয়েই বড় আকারে গবেষণা করা যায়। উপন্যাসেও বৃষ্টি বা বর্ষা কম আসে নি। তা নিয়েও গবেষণা করলে সেখান থেকেও বিস্তর বর্ষাবন্দনা চোখে পড়বে। কবিতা, উপন্যাসের চেয়ে সিনেমা অনেক বেশি কার্যকর ও জনসংযোগমুখী একটা শিল্প। অথচ বাংলা সিনেমায় বর্ষা নিয়া তেমন কিছুই নাই বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, বাংলা সিনেমায় বর্ষার প্রসঙ্গ আসলে দুইটা বিষয় সবার আগে মনে পড়ে। প্রথমত বৃষ্টির মধ্যে পাতলা কাপড় পরে নাচতেছে নায়ক-নায়িকা, আর দ্বিতীয়টা নায়ক অনন্ত জলিলের বউ নায়িকা বর্ষা। সিনেমা হলের দর্শকদের চোখে এর চেয়ে বেশি বর্ষা আসলে স্মৃতিতে নাই। আমিও যেহেতু সাধারণ মানুষের কাতারেই পড়ি, তাই এই স্মৃতিগুলোই আমারও মনে পড়ল।


মানিক বাবু তার প্রথম সিনেমাতেই বাংলার বর্ষার যে বাস্তব চিত্র দেখাইছেন, তা এরপর আর কোনো নির্মাতা এমন করে দেখাতে পারে নাই।


এর বাইরেও নিশ্চয়ই একটা পৃথিবী আছে। সেই পৃথিবীতে বর্ষা আসলে কেমন? বৃষ্টিতে নায়ক-নায়িকা ভিজে গান গাওয়ার সাথে একটা মধ্যবিত্তের কল্পনার ব্যর্থতার ব্যঙ্গাত্মক রূপ পাওয়া যায়। কিন্তু এইটা তো কল্পনার একটা অকাল্পনিক রূপ, বাস্তব রূপ আসলে কোনটা? এইখানেই আসলে ডুব দেয়ার মতো একটা ঘটনা বা সাক্ষী আছে। সেইটা আমাদের মধ্যবিত্ত শিল্পমানসে এঁকে দিয়ে গেছেন বাংলা সিনেমার প্রবাদ-পুরুষ সত্যজিৎ রায়। হ্যাঁ, এই মানিক বাবু তার প্রথম সিনেমাতেই বাংলার বর্ষার যে বাস্তব চিত্র দেখাইছেন, তা এরপর আর কোনো নির্মাতা এমন করে দেখাতে পারে নাই। এরপর বেশ কিছু ছবিতেই বর্ষার বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রূপ উঠে আসছে, কিন্তু এমন একদম শাদামাটা জীবনের মতো করে আর কোথাও নাই।

হ্যাঁ, প্রথমত আমি ‘পথের পাঁচালী’র সেই বিখ্যাত বৃষ্টির দৃশ্যের কথাই বলছি। একবার চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যের শুরুটা মনে করি। গ্রামের খোলা আকাশ, এর উপর দিয়ে অতিথির মতো করে মেঘ আসছে আকাশ কালো করে। ঝিলে ফোটা পদ্মপাতায় মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির আগে আসা বাতাস। আর সেই বাতাসে উল্টে যাচ্ছে হাজারো পদ্মপাতা। তারপর? উঠোনে শুকোতে দেয়া কাপড় তুলতে দৌড়ে আসছেন মা। এই দৃশ্য যদি সিনেমায় না থাকত তবে কি আপনি আপনার শৈশবের একটা দৃশ্য হিশেবে তাকে চালিয়ে দিতে পারতেন না? শিল্প আসলে সেখানেই সফল, যেখানে নিজের ভাবনার জগৎ অন্যের জগৎকেও ছুঁয়ে যায় বা ধারণ করে। এইখানেই শেষ না বর্ষার দৃশ্য, আরও ডিটেল ও আরও প্রাণবন্ত বর্ষা রয়েছে এই একটা সিনেমাতেই। কারণ প্রকৃত জীবন আসলে অল্পতে তুষ্ট না। তাই এই আকাশে মেঘের ডাক শুনেই ছোট ভাই অপুকে নিয়ে ছুটেছেন দুর্গা। এমন সময় ঝিলে মাছ ধরতে যাওয়া এক টেকো ব্যক্তির মাথায় পড়ল বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা। ঝিমুতে থাকা মানুষটার ঘুম ভেঙে দিল বর্ষা। পৃথিবী এইখানে কত রূঢ় আর ধ্রুব, ভাবতেই ভালো লাগে। এই বৃষ্টিতে অপুর স্নান-দৃশ্যের কথা যখন মনে হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—যে বাঙালি কিশোরী কখনো বৃষ্টিতে ভিজে নাই তার মনে কি প্রেম আছে? এই নিয়া সন্দেহ তৈরি করে দেয় এমন কাব্যিক বর্ণনার মতো দৃশ্য।

এই বৃষ্টির পরই দুর্গার মৃত্যু, আর হরিহরের জীবনে পরিবর্তন ঘটে। যা কেবল বর্ষার সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও একটা বড় কারণ বলে দেখি আমরা। এই জীবনের চিত্র এঁকেছিলেন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার উপন্যাস অবলম্বনেই তো সত্যজিতের এই কালজয়ী সৃষ্টি। কিন্তু একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাইতেছিল, এই যে বৃষ্টির দৃশ্য—এইটা কি বিভূতিভূষণের না সত্যজিতের? বিভূতি তার উপন্যাসে বর্ষার প্রসঙ্গ অবশ্যই লিখছেন। কিন্তু সেই বর্ষার সাথে সিনেমার বর্ষার পার্থক্য যে রাত আর দিন, এই বর্ষার দৃশ্য কেবলই সত্যজিতের। বর্ষার এই দৃশ্যের সাথে তারকোভস্কির সিনেমার কুয়াশার দৃশ্যের সাথে তুলনা করতে পারি। হ্যাঁ, যেমন যে কোনো সময়ই কুয়াশায় মাখা গ্রাম বা সিনেমায় কোনো দৃশ্য দেখলেই তারকোভস্কির কথা মনে আসে। আর বাংলা সিনেমায় বর্ষার কথা মনে হলেই মনে হয় ‘পথের পাঁচালী’র কথা।


বর্ষার সাথে কিছুটা হলেও পরিচিত আমাদের নাগরিক জীবন। কিন্তু অপু-দুর্গার যে বর্ষা তা আমাদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও শৈশব কৈশোরের এক পরিচিত ঘ্রাণ।


কেন এই বর্ষাকে বিভূতির না বলে সত্যজিতের বলছি, এর পেছনে আরও একটি কারণ আছে। আর তা হলো, বিভূতির অপরাজিততেও বর্ষা ছিল। কিন্তু সত্যজিতের ‘অপরাজিত’তে বর্ষা নাই। সত্যজিতের কাছে এই বর্ষার গুরুত্ব ততটা ছিল না। কিশোর অপুর জীবনের সিনেমাটিক চরিত্রের সাথে তাই বর্ষা ঠিক যায় না। কিন্তু গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত—সব ঋতুই যায় যুবক অপুর সাথে। যৌবনের অপুর জীবনে যে বর্ষা জরুরি তাও কিন্তু অনায়াসেই এসেছে। যদিও এসেছে পরিমিত আকারেই। আর এই পরিমিত বোধের জানালায় ধরা পড়েছে কলকাতার শহরতলির এক চিলেকোঠায় বর্ষার চিত্র। এই বর্ষার সাথে কিছুটা হলেও পরিচিত আমাদের নাগরিক জীবন। কিন্তু অপু-দুর্গার যে বর্ষা তা আমাদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও শৈশব কৈশোরের এক পরিচিত ঘ্রাণ। তাই এই বর্ষা সত্যজিতেরই, বিভূতির নয়।

ইলিয়াস কমল

জন্ম ৯ মার্চ; ময়মনসিংহ। শিক্ষা : স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

ই-মেইল : eliauskomol@gmail.com