হোম চলচ্চিত্র নিশান্ত, ধর্ষণ ও মেঘশিরীষকাণ্ড

নিশান্ত, ধর্ষণ ও মেঘশিরীষকাণ্ড

নিশান্ত, ধর্ষণ ও মেঘশিরীষকাণ্ড
231
0

তখন ৭০তম কান চলচ্চিত্র উৎসব চলছিল, আর প্রতিদিন নিয়ম করে লাল গালিচায় হাঁটছিলেন নায়িকা ও মডেলরা, চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন চলছিল পোশাকের বাহার দেখানোর প্রতিযোগিতা। অবশ্য গত কয়েক দশকে বিষয়টি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উৎসবগুলোতে চলচ্চিত্র নয়, পোশাকটাই মুখ্য হয়ে উঠছে। আর ঠিক এই কথাটিই নিজের টুইটে বলেন শাবানা আজমি, উৎসব চলাকালে। বলেন, তাদের সময়ে পোশাক নয়, চলচ্চিত্রটাই ছিল মুখ্য। তখন একটা সরলতাও ছিল সবকিছুতে। টুইটের সঙ্গে ছবিও দিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই অভিনয়শিল্পী। ছবিতে দেখা যায় শাবানা আজমি, স্মিতা পাতিল আর পরিচালক শ্যাম বেনেগাল কান উৎসবে দাঁড়িয়ে, সাল ১৯৭৬। সাদাসিধে পোশাক তিনজনের, ভঙ্গিতে নেই অহঙ্কারী ভাব। দেখলাম শাবানা আজমি লিখেছেন, তারা ‘নিশান্ত’(১৯৭৫)  ছবির প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছেন। জেনে রাখা ভালো ১৯৭৬ সালে ছবিটি কান উৎসবে স্বর্ণপত্রের জন্য লড়াই করেছিল। শাবানার টুইট, ছবি, কান ও ছবির নাম—সব মিলিয়ে মনে হলো ‘নিশান্ত’ ছবিটি দেখে ফেলা দরকার। পরেরদিনই আন্তর্জালে ছবিটির হদিস পাওয়া যায়।


ধর্ষক তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাই বিশ্বম (নাসিরুদ্দিন শাহ, এটাই তার প্রথম চলচ্চিত্র) আবার একটু শান্ত, তুলনামূলকভাবে কম লম্পট। যেহেতু তার স্ত্রী রয়েছে, তাই সে লাম্পট্য করতে পারে না মন খুলে।


ছবিটি শুরুর পর যে কোনো দর্শক পর্দায় গেঁথে যেতে বাধ্য। নিপুণ হাতে দৃশ্যমালা গাঁথেন বেনেগাল। গল্পের পরিপ্রেক্ষিত ১৯৪৫ সালের সামন্তবাদ। গল্প শুরু হয় মন্দিরের স্বর্ণালঙ্কার চুরির মধ্য দিয়ে। গায়ের জমিদারই (অমরিশ পুরি) আসলে ভাইদের দিয়ে চুরিটি করিয়েছে। চোর কে বা কারা, মন্দিরের পুরোহিত (সত্যদেব দুবে) ঠিকই ধরতে পেরেছেন, কিন্তু ভয়ে মুখ খুলতে পারছিলেন না। শুধু তিনি কেন, জমিদারের আতঙ্কে গ্রামের সকলেই ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। জমিদারের তিন ভাই। তাদের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। কখনো তারা কারো ক্ষেতের ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে, কখনো বাজার থেকে কলা, মুরগি, যখন যা ইচ্ছা নিয়ে নিচ্ছে, আর কখনো ইচ্ছে হলেই রাতে পাঠিয়ে দিতে বলা হচ্ছে গ্রামের মেয়েদের। জমিদার আর তার দুই ভাইয়ের ধর্ষণ যেন রোজকার ব্যাপার। তৃতীয় ও ছোট ভাইটি আবার বিবাহিত, সে অন্যসব খারাপ কাজে থাকলেও ধর্ষণে থাকে না। যদিও পরে আমরা দেখব সেও নারী লোলুপ হয়ে ওঠে। জমিদারি এই অত্যাচার গরিব ও ক্ষমতাহীন বলে গাঁয়ের মানুষ নীরবে সহ্য করে যাচ্ছিল। জমিদারের ক্ষমতার দাপটে স্থানীয় প্রশাসনও চোখ বুজে থাকে। সব মিলিয়ে অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ অসহায় ও জিম্মি হয়ে পড়েছিল জমিদার ও নখদন্ত-বিহীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এমন সময় গল্প মোড় নেয় নতুন দিকে।

18944658_1412005545524631_767996187_n
নিশান্ত-এ শিক্ষক (গিরিশ কনরাড) সঙ্গে স্ত্রী (শাবানা আজমি)

গ্রামের স্কুলে অন্য জায়গা থেকে এক শিক্ষক (গিরিশ কনরাড) আসে বদলি হয়ে, সঙ্গে স্ত্রী ও পুত্র। জমিদারের দুশ্চরিত্র পুত্রদের কুনজরে পড়ে শিক্ষকের স্ত্রী সুশীলাও (শাবানা আজমি)। যথারীতি এক রাতে যখন শিক্ষক ও তার পরিবার রাতের খাবার খাচ্ছিল তখন সুশীলাকে পরিকল্পনা করেই তুলে নিয়ে যায় জমিদারের বড় দুই ছেলে। স্কুলশিক্ষক প্রতিবাদ করেছিল, তবে অতটা জোরাল হয় নি সেই প্রতিবাদ; শঙ্কা ও ভয় কাজ করেছে তার মনে। এমনকি গ্রামবাসীও শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে এই সুশীলা হরণের দৃশ্য। সেই রাতেই জমিদারের বাড়িতে গিয়ে শিক্ষক শুধু দরজা ধাক্কাধাক্কি ও চিৎকার করে চলে যায় গ্রামের পুলিশের (কূলভূষণ খারবান্দা) কাছে। ভীরু শিক্ষকের নালিশ পুলিশ নেবে কেন? পুলিশও তো জমিদারের পোষ্য। এরপরের আরো দুই তিনদিন শিক্ষক সরকারি বহু অফিস ও আদালতে ফরিয়াদ নিয়ে ঘুরেছেন, কোনো লাভ হয় নি। সকলে জিজ্ঞেস করেন, তুলে নিয়ে গেছে, ধর্ষণ করেছে, কোনো স্বাক্ষী-প্রমাণ আছে? শুধু শুধু কেন গ্রামের ‘মানী’ লোকের মানসম্মান নিয়ে টানাটানি? শেষে সকল আশা ছেড়ে দিয়ে নিরালম্ব শিক্ষক বাড়ি ফেরে, আর প্রায় সময়ই গিয়ে বসে থাকে মন্দিরে। মানসিক প্রশান্তির খোঁজে।

ওদিকে জমিদারের ছেলেদের দ্বারা গণধর্ষণের শিকান হয় সুশীলা। টানা কয়েকদিন এমনটা চলার পর মুক্তি পাওয়ার সকল আশা ছেড়ে দেয় শিক্ষকের স্ত্রী। সে বোঝে ধর্ষণ যখন অনিবার্য তখন তাতে বাধা দেয়া বৃথা। তাই জমিদারের বাড়ির রীতিনীতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। মাঝে মধ্যে স্বামী-সন্তানের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করে। তবে স্বামী তাকে আর গ্রহণ করবে না, তাই তাকে ভুলে যাওয়াই শ্রেয়—এমন কুমন্ত্রণা দেয় জমিদারবাড়ির কাজের মহিলা। সুশীলাও ভাবতে থাকে, সমাজে সে এখন পতিত, ফিরে গেলেও স্বামী তাকে গ্রহণ করবে না, সন্তানকেও বা কী বলবে, আর এখান থেকে বেরিয়ে গেলে হয় তো তার স্থান হবে পতিতাপল্লীতে। ধর্ষক তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট ছেলে ভাই (নাসিরুদ্দিন শাহ, এটাই তার প্রথম চলচ্চিত্র) আবার একটু শান্ত, তুলনামূলকভাবে কম লম্পট। যেহেতু তার স্ত্রী রয়েছে, তাই সে লাম্পট্য করতে পারে না মন খুলে। ভেতরে ভেতরে অবশ্য সেই লালসা বেশিদিন আটকে রাখা যায় নি। প্রথমে তার চোখই পড়েছিল সুশীলার উপর। বিশ্বমের মনের খায়েস বুঝতে পেরে বড় দুই ভাই আনজাইয়া (অনন্ত নাগ) ও প্রসাদ (মোহন আগাশে) অপহরণ করে সুশীলাকে।

সপ্তাহ’র পর সপ্তাহ বন্দি থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিল সুশীলা। আর সে তো অন্য আর দশটা গ্রামের মেয়ের মতো অতটা গরিব ও অশিক্ষিত নয়। দেখতেও সুন্দরী। কাজেই বিশ্বম তার প্রতি প্রেমে নিবেদন করার চেষ্টা করতে থাকে। বিষয়টি নজরে আসে বিশ্বমের স্ত্রী রুকমানির (স্মিতা পাতিল)। স্বভাবতই স্বামীর পরস্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ সে ভালো ভাবে নেয় নি। কিন্তু যে বিশ্বম জমিদার বড় ভাইয়ের মুখের উপর চোখ তুলে কথা বলে নি কোনোদিন, সেই বিশ্বম একদিন মুখ খুলল সুশীলার জন্য। সুশীলা চেয়েছে সে আলাদা রান্না করে খাবে। এই দাবি নিয়ে অগ্রজের কাছে যায় বিশ্বম। বিষয়টি জমিদার সহজভাবে নেয় নি, কিন্তু মুখে বলল, ঠিক আছে, আলাদা খেতে চায়, খাক, কিন্তু ঘটনা যেন এরচেয়ে বেশি না বাড়ে। ঘরে বউ রয়েছে।


হিন্দি ‘নিশান্ত’ শব্দের অর্থ নিশির অন্ত। শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত এই ‘নিশান্ত’ ছবিতে শেষ পর্যন্ত জনতার জাগরণে রাত্রির আঁধার কেটে গিয়েছিল।


বিশ্বমের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে গাড়িতে করে মন্দিরেও যায় সুশীলা। সেখানেই দেখা হয়ে যায় শিক্ষক স্বামীর সাথে। ভর্ৎসনা করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে সুশীলার? স্বামীকে সে বলল, তার জায়গায় সে হলে হাভেলিতে আগুন ধরিয়ে দিত। টনক নড়ে স্বামীর। সে মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে। বলে, আপনি চোখ খুললেই অনেক কিছু সম্ভব। এরপর দুজন মিলে জমিদারের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের একাট্টা করতে থাকে, বিদ্রোহী করে তুলতে থাকে। কিন্তু এই দানা বাধতে থাকা বিদ্রোহের কথা জমিদার ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে না। হঠাৎ করেই জমিদারের পরিবার দেখল গ্রাম থেকে যেসব মানুষ তাদের বাড়িতে কাজ করতে আসে প্রতিদিন সকালে, তারা একদিন আর আসছে না। পরে লক্ষ করল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা আসছে হাভেলির দিকে। সে-সময়েও জমিদার পরিবার বুঝতে পারে নি কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। এক পর্যায়ে এই শোভাযাত্রা থেকেই পুরোহিতের ইশারায়, শিক্ষকের নেতৃত্বে জমিদার পরিবারের উপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী। জমিদারের দুই ছেলের প্রতিরোধ চেষ্টা খড়কুটোর মতো ভেসে যায় জনগণের ফুসে ওঠা জোয়ারের কাছে। এই উত্তাল জনতার ক্রোশে প্রাণ হারায় রুকমানি। বিশ্বম প্রাণে বাঁচতে পেছনের দরজা দিয়ে পালায়, সঙ্গে নেয় সুশীলাকে। সুশীলা আগ্রাসী জনতাকে দেখে ভয় পেয়ে বিশ্বমের সঙ্গে ছুটতে থাকে। কে জানে হয় তো আর কোনো আশ্রয় নেই ভেবে বিশ্বমকেই শেষ আশ্রয় ভেবেছিল সুশীলা। নয় তো, সে তো থেকেও যেতে পারতো হাভেলিতে। স্বামীকে খুঁজতে পারতো জনতার মাঝে। সেটা সে করে নি। বিশ্বমের উপরই ভরসা করে সে। প্রাণে বাঁচতে পাথুরে জমিনের দিকে দৌড়ায় তারা। কিন্তু জনতার হাত থেকে তারাও রেহাই পায় না। প্রাণ হারায় বিশ্বম, সঙ্গে সুশীলাও। শিক্ষক তার স্ত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি।

ছবির শেষ অঙ্কে দেখা যায় একটি বালক সেই সাবেক ভয়ঙ্কর হাভেলির ভেতর ঢোকে বিস্ময় নিয়ে, দেখে এখানে সেখানে গড়াগড়ি যাচ্ছে একসময়কার প্রতাপশালী, ঘৃণিত মানুষগুলোর লাশ। ওপরে উঠে সে দেখতে পায় রুকমানিও মরে পড়ে আছে, আর হতবিহ্বল হয়ে বসে আছে পুরোহিত। দৌড়ে বালকটি নিচে নেমে যায়। গ্রামের দিকে ছুট লাগায়। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় গ্রামের সকল ছোটছোট ছেলেমেয়ে আশ্রয় নিয়েছিল মন্দিরে। মানুষরূপী পশু হত্যার যজ্ঞ তারা প্রত্যক্ষ করে নি, বা তাদের করতে দেয়া হয় নি। এখানেই শেষ হয় ‘নিশান্ত’।

হিন্দি ‘নিশান্ত’ শব্দের অর্থ নিশির অন্ত। শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত এই ‘নিশান্ত’ ছবিতে শেষ পর্যন্ত জনতার জাগরণে রাত্রির আঁধার কেটে গিয়েছিল। পরিতাপের বিষয় এই অন্ধকার প্রকৃতি পরিচালিত পৃথিবীতে এখনো বিরাজমান, খুব বিশ্রি ভাবে। এখানে এখনো দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার চলে। এখনো প্রশাসন মাথা নত করে রাখে ক্ষমতাশালীদের কাছে। অবশ্য জনগণ জাগলে, কিছুটা হয় তো নিশি গলে আলোর দেখা পাওয়া যায়, কিন্তু সেই আলো এতটাই ক্ষীণ যে, পুনরায় অন্ধকার তাকে গিলে ফেলে।

বেনেগালের ছবিটি মোটা দাগে একদিকে সামন্ত জমিদার ও তার অত্যাচার, অন্যদিকে অত্যাচারিত জনগণের জেগে ওঠার গল্প হলেও, ছবির নাভি কিন্তু ধর্ষণ। সুশীলার মতো গ্রামের অন্য নারীদের ধর্ষণের মধ্য দিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন ও টিকিয়ে রাখার ব্যাপারটি এই ছবিতে দৃশ্যমান। পরিচালক বেশ খানিকটা সময় এই ধর্ষণের পেছনে ব্যয় করেছেন, শৈল্পিকভাবে, কোনো অতিরঞ্জন চোখে পড়ে নি তাতে, ঈক্ষণকাম (Voyeurism) বা চোখের মজা মারার সুযোগ বেনেগাল রাখেন নি। বরং আমরা চলচ্চৈত্রিক যাত্রার ভেতর দিয়ে অনুভব করতে পেরেছি, ধর্ষণের মধ্য দিয়ে কী করে জমিদার ও তার ছেলেরা একধরনের শীতল আতঙ্ক ছড়িয়ে রেখেছিল পুরো গ্রামে।

সেজন্যই সোমা এ. চট্টোপাধ্যায় তার বিখ্যাত সাবজেক্ট : সিনেমা অবজেক্ট : উইম্যান বইতে বলছেন, ধর্ষণ একটি রাজনৈতিক কর্ম। এটি হুমকি স্বরূপ, এই হুমকির মাধ্যমে চেষ্টা করা হয় যাতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধীন অবস্থা যেন চিরস্থায়ী হয়। এখন এই হুমকিটি দেয় কে? সকল শ্রেণির পুরুষ? আর এই হুমকিই বা জারি থাকে কোন শ্রেণির ওপর? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার হন সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে যারা দুর্বল, সংখ্যালঘু, যারা নিচু বর্ণ ও শ্রেণিতে অবস্থান করেন, সেইসব নারীরা। ধর্ষণ নারীকে করা হলেও সেই নারীর বাবা, স্বামী বা ভাইয়ের ইজ্জতও ধুলায় মিশে যায়, আমাদের সমাজে। সে কারণেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর সহজে ধর্ষিত নারীকে গ্রহণ করতে চায় না। সোমা চ্যাটার্জি এখানে উত্থাপন করেন একটি শব্দ বন্ধ—‘ইজ্জত লুটনা’—হিন্দি ও উর্দুর মিশেলে তৈরি এই কথাটির মানে ইজ্জত লুট করা, আর এই কথাটি ধর্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যেমন ব্যবহার করা হয় ‘বলাৎকার’ শব্দটি। বল প্রয়োগের মাধ্যমে এই ইজ্জত লোটা হয়। সোমা প্রশ্ন করছেন, ইজ্জতটি আসলে কার? তিনি বলছেন এই ইজ্জত ধর্ষিত মেয়েটির বাবার, স্বামীর অথবা ভাইয়ের।


ছবিতে গ্রামবাসীরূপী হনুমানরা সুশীলারূপী সীতাকে রাবন ওরফে জমিদারের কব্জা থেকে মুক্ত করলেও, পুরনো স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে নি।


18871042_1412005552191297_1024619639_n(1)
বিশ্বম (নাসিরুদ্দিন শাহ) ও রুকমানি (স্মিতা পাতিল)

ধর্ষণকাণ্ডের পেছনে যতটা না যৌন লালসা বা বলতে পারেন ফ্রয়েডের ‘লিবিডো’ থাকে, তার থেকে হাজার গুণ বেশি থাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে সহিংসতা ও ত্রাস সৃষ্টি করার মানসিকতা, এই মানসিকতার মাধ্যমে সমাজের উঁচু শ্রেণির পুরুষরা হুমকি ঝুলিয়ে রাখতে চায়, নারীদের উপর, এবং নারীদের মাধ্যমে, নারীর সঙ্গে সম্পর্কিত পুরুষদের উপর। কারণ কোনো পুরুষই চায় না তাদের ইজ্জত, তাদের নারী লুট হয়ে যাক। সমাজে ব্যক্তির অবস্থান থেকে যদি ধর্ষণকে বিচার করা যায় তাহলে দেখা যাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের মনে যে বলাৎকারের বাসনা তৈরি হয়, সেই বাসনায় জটিল আকারে হাজির থাকে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক, শ্রেণি অবস্থান ও নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।

‘নিশান্ত’ ছবিতে কর্তৃত্ব পরায়ন এই পুরুষের ছবিই চিত্রায়িত হয়েছে। যদিও অনেক চলচ্চিত্রেই ধর্ষণকে পুরুষের রাজনীতি হিশেবেই ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ ঈক্ষণকাম হিশেবে, যাতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর উপর, তথা নারীর হেফাজতকারী পুরুষদের উপর একটা হুমকি বজায় রাখতে পারে। আবার প্রত্যেক পুরুষও এই ধর্ষণ ভীতি বা বলাৎকারের হুমকি জারি থাকার সুবিধা আদায় করে, নারীকে নিজের কব্জায় বা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। কাজেই সেসব তথাকথিক ছবির, তথাকথির ধর্ষণ দৃশ্য নয়, বেনেগালের এই ছবিতে ধর্ষণ যেভাবে এসেছে সেটা নিয়ে কথা বলি।

এখানে চলচ্চৈত্রিক ভাষার মাধ্যমে ধর্ষণকে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম যে মেয়েটিকে হাভেলিতে ডেকে পাঠানো হয়, তার ক্ষেত্রে তো বটেই সুশীলার ক্ষেত্রেও। সুশীলার প্রথম রাতের ধর্ষণকে দেখানো হয় শুধু সুশীলার অবিন্যস্ত কাপড় ও শারীরিক কষ্টের অভিনয়ের মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার দুই ভাইয়ের ধর্ষণ ঘটনাটিকেও স্থূল পর্যায়ে নিয়ে যান নি বেনেগাল। তারপরও দর্শকের মনের ভেতর সুশীলার পরিণতির জন্য একটা চিনচিনে ব্যথা পরিচালক ঠিকই ছড়িয়ে দিতে পারেন। এখানেই পরিচালক হিশেবে স্বার্থক বেনেগাল। তার উদ্দেশ্য ধর্ষণ দেখানো নয়, তার উদ্দেশ্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সামন্ত জমিদার তথা শোষকের শোষণের হাতিয়ারকে ফর্সা করে মানুষের সামনে তুলে ধরা। সেটাতে ষোল আনাই সফল হয়েছেন বেনেগাল।

এর পাশাপাশি বেনেগাল কি রামায়নের রামচন্দ্রকেও এক হাত দেখে নিলেন? ছবির একটি ছোট জায়গায়, যখন সুশীলা অপহৃত, ভগ্ন হৃদয়ে শিক্ষকটি এপাড়া, ওপাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছেন, লোকজনদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলছেন, তখন একদিন গ্রামে রামলীলা মঞ্চস্থ হলো। সেখানে সীতা হরণ করল রাবণ। রাম তাকে উদ্ধার করতে পারে নি। তলব করতে হলো হনুমানকে। রামলীলার শেষ অঙ্কে যখন রাবনকে বধ করা হলো তখন উপস্থিত দর্শক আনন্দে হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। তাদের মাঝখান থেকে তখন ধমক দিয়ে ওঠেন পুরোহিত। বলেন, হাসছ যে? হেসে নিজেদের কাপুরুষতা ঢাকতে চাইছ? অত্যাচার করা পাপ, আর অত্যাচার সহ্য করা আরো বড় পাপ। সাহস থাকলে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হও। বেনেগাল যেন এই ধমকের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ফিসফিস করে বলে গেলেন, রামচন্দ্রও এই শিক্ষকের মতো, অনেক পুরুষের মতোই, কাপুরুষ আর ভীরু ছিলেন। সীতাকে উদ্ধার করতে তার সহায় হতে হয়েছিল হনুমান বাহিনীকে। রাম নিজে লঙ্কায় আগুন লাগাতে পারেন নি। মন্দিরে সুশীলা যে কথা বলেছিল শিক্ষককে, সেখানেও এই আগুন লাগিয়ে দেয়ার প্রসঙ্গ এসেছিল। সুশীলা বলেছিল, শিক্ষকের জায়গায় সে হলে, পড়তে পারেন, রামের জায়গায় সে হলে, নিজেই লঙ্কায় আগুন লাগিয়ে ছাড়খার করে দিত, হনুমানের উপর নির্ভর করত না।

ছবিতে গ্রামবাসীরূপী হনুমানরা সুশীলারূপী সীতাকে রাবন ওরফে জমিদারের কব্জা থেকে মুক্ত করলেও, পুরনো স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে নি। যেভাবে রামায়নে সীতা ধরণীকে ভাগ করে বিদায় নিয়েছিলেন রামের সংসার থেকে, অনেকটা সেভাবেই সুশীলাকেও বিদায় নিতে হয়েছিল। মৃত্যুর আগে তার মুখমণ্ডল পাঠ করলে সেখানে পাওয়া যায়—মৃত্যু? তবে তাই হোক। এই সংসার তো আর আমাকে গ্রহণ করবে না। এ যেন সীতার কথাই অনুবাদ হলো সুশীলার ওরকম অবশ, অবসন্ন, সমর্পিত মুখমণ্ডলে। সুশীলার দৃষ্টি এসময় সরাসরি ক্যামেরার দিকে হয়, বেনেগাল কি চতুর্থ দেয়াল ভাঙতে চাইলেন? দেয়ালের এপারে থাকা পুরুষরা কি নড়েচড়ে বসলেন একটু? এরপরের পরিণতি তো আগেই বর্ণিত হয়েছে। বাঁচতে পারে নি নিরাপরাধ সুশীলা। এই সমাজ তাকে ঠাঁই দেয় নি শেষ পর্যন্ত।


জনগণের এই জেগে ওঠার অপর নামই ‘নিশান্ত’। আমরা চাই এই নিশির অবসান হোক চিরতরে, নতুন সূর্যের রশ্মি আলোর ঝালর তৈরি করুক মেঘশিরীষের পাতায় পাতায়।


18983275_1412005548857964_1826296133_n
নিশান্ত

সমাজের চরিত্র চার দশক পরও পাল্টায় নি, ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালে। সেসময় বড় পর্দায় বেনেগাল বলেছিলেন এক সামন্তপ্রভুর কথা, এখন তারাই সমাজে পরিচিত বুর্জোয়াপ্রভু নামে। তারা সোনার ব্যবসা করেন। তারা নারীদের সোনার মতোই পণ্য মনে করেন। রেইনট্রির বাংলা মেঘশিরীষ, নামটি যতটুকু সুন্দর, ঠিক ততটুকু কুৎসিত ঘটনাই ঘটেছে বনানীর সেই রেইনট্রি নামক হোটেলে। ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ একই সঙ্গে গণধর্ষণ করা হয় দুই ছাত্রীকে, পরে পত্রিকায় প্রকাশ পায় একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয় আদতে চারজন। অন্য দুজন লোকলজ্জার ভয়ে অভিযোগ তো দূরে থাক, মুখে রা শব্দটিও করেন নি। যেমনটি করার সাহস পায় নি ‘নিশান্ত’ ছবির নারীরা। রেইনট্রিকাণ্ডেও ‘নিশান্ত’ ছবির মতো প্রথমে পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করতে চায় নি, কারণ ধর্ষণকারী সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষ, বুর্জোয়াপ্রভু, সোনার কারবার আছে তাদের। তারা মানী লোক। তাছাড়া কোন ধরনের মেয়েরা রাতের বেলা জন্মদিনের পার্টিতে যায়? নিচু শ্রেণির মেয়েরাই তো। এই ধরনের বক্তব্যের মধ্যে সোমা চট্টোপাধ্যায়ের বলা দুর্বলের ওপর সবলের বলাৎকারের রাজনীতিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ছবির কাহিনির মতো বাংলাদেশেও একের পর এক বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে। বাবা বিচার না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করছে, নির্যাতনের শিকার মেয়েটি বিষ পান করছে, অনেকে সমাজে টিকে থাকার জন্য সহ্য করে নিচ্ছে অত্যাচার, বেঁচে থাকছে মরার মতো, পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। কিন্তু রেইনট্রিকাণ্ডের বেলায় তেমনটি ঘটতে পারে নি, কারণ জনগণ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অপরাধীদের নাম-ঠিকুজি প্রকাশ করে দিচ্ছিলেন, সঙ্গে সোচ্চার ভূমিকা রাখছিলেন রাজপথেও। পরে পুলিশ বাধ্য হয়েই অপরাধীদের গ্রেফতার করে। অথচ যতদিন জনগণের চাপ তৈরি হয় নি, ততদিন অপরাধীরা দিব্বি ছিল নিজের ঘরেই, পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই তারা পালিয়ে যায় সিলেটে। শেষ রক্ষা হয় নি অপরাধীদের। তারা স্বীকার করেছে ধর্ষণের কথা।

জনগণের এই জেগে ওঠার অপর নামই ‘নিশান্ত’। আমরা চাই এই নিশির অবসান হোক চিরতরে, নতুন সূর্যের রশ্মি আলোর ঝালর তৈরি করুক মেঘশিরীষের পাতায় পাতায়।


দোহাই :

১. Soma A. Chatterji, Subject: Cinema, Object: Woman (A Study of the Portrayal of Women in Indian Cinema), Parumita Publication (1998), Calcutta.

২. ‘ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রী জবানবন্দি দিলেন’, আদালত প্রতিবেদক, প্রথম আলো (১১ মে ২০১৭)।

বিধান রিবেরু

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর; ঢাকা।

শিক্ষা : সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রে মোট দুটি স্নাতকোত্তর, এর আগে কম্পিউটারে স্নাতক।

প্রকাশিত বই—
চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা [রোদেলা, ২০১১]
চলচ্চিত্র বিচার [কথা, ২০১৪]
বলিউড বাহাস [চৈতন্য, ২০১৫]
উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা [কথা, ২০১৭]
শাহবাগ : রাজনীতি ধর্ম চেতনা [প্রকৃতি, ২০১৪]
বিবিধ অভাব : লিওনার্দো, লালন ও লাকাঁ [ঐতিহ্য, ২০১৫]
অনুভূতিতে আঘাতের রাজনীতি ও অন্যান্য [ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : bidhanrebeiro@gmail.com

Latest posts by বিধান রিবেরু (see all)