হোম চলচ্চিত্র ধর্মকারী ও ধর্মহীনের পাঁচালি

ধর্মকারী ও ধর্মহীনের পাঁচালি

ধর্মকারী ও ধর্মহীনের পাঁচালি
2.46K
0

বড় ভালো লোক ছিল। না, সৈয়দ হকের কথা বলছি না। বলছি তার চিত্রনাট্যের কথা। স্কুল-বয়সে এই সিনেমাটি দেখেছিলাম। বিটিভিতে। এক কথায়, দেখেই মুগ্ধ। কি গানে, কি সংলাপে, কাহিনির বুননে, নাটকীয়তায়—অপার আনন্দ পেয়েছিলাম, যাকে বলে পরিতৃপ্তির সুখ। যদিও আমার শরিয়তি মন কবরপূজার গন্ধ পেয়ে খানিকটা ভড়কে গিয়েছিল।

কিন্তু আজ এতদিন পরও দেখি সেই গোপন মুগ্ধতাবোধ রয়ে গেছে। এখন এই পরিতৃপ্তিকে কলাবোধেরই তৃপ্তি বলা যেতে পারে। আমার তো মনে হয়, এই ছবিটি বাংলাদেশের সেরা ছবিই শুধু নয়, সত্যিকার অর্থে প্রাণের ছবি। কেমন করে, সে কথা আমি অবশ্যই ব্যাখ্যা করব। কিন্তু অবাক লাগে, কেন এই ছবিটি নিয়ে তেমন লেখালেখি হয় নি কিংবা হলেও কিভাবে নজর এড়িয়ে গেল? কে এই ছবির পরিচালক—মোহাম্মদ মহীউদ্দিন—তাকে ঠিক চিনিও না। তিনি কি বেঁচে আছেন?

চিত্রনাট্যে সৈয়দ বংশের লেখক হক সাহেব অনেকগুলো বিষয় ‘ডিল’ করেছেন। অবলীলায়, প্রায় বিনা ক্লেশেই পার পেয়ে গেছেন—মানে, সমন্বয় করতে পেরেছেন নিখুঁতভাবে। যে বিষয়গুলো তিনি টেনে এনেছেন—খুব সন্তর্পণে, সচেতন অসচেতনতায়—তা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় চিন্তা-সম্পদ।

শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বস্তুবাদী মন অতীন্দ্রিয় ভাব-জগতের সঙ্গে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে তার একটা ফয়সালা যেন এই ছবিটিতে আছে। যুক্তিবাদী মনকে অপমান বা আহত না করে এবং ভাববাদিতাকে কোথাও ক্ষুণ্ন হতে না দিয়ে গল্পকথক উভয়কে যে বিন্দুতে এনে দাঁড় করালেন—যেখানে প্রত্যেকেই নিজ নিজ দিশা খুঁজে পেল, সেই দিশারি ইনসিডেন্ট হলো ‌’মুক্তিযুদ্ধ’। ফলে এই মুক্তিযুদ্ধ ঠিক অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের যুদ্ধ নয়। এখানে মঞ্চস্থ হলো যুদ্ধের এক নতুন বয়ান।

পুরো ছবিটিতে একটা মৃত্যুর ঘটনা—খুব সাধারণ একটা দুর্ঘটনা—আবহ সংগীতের মতো আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। মৃত ব্যক্তিটি জীবিতের চেয়েও কার্যকরী ভূমিকা নিয়ে সমস্ত কাহিনির ইন্ধন হিশেবে নেপথ্যে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যায়। দুএকবার তাকে আমরা দেখতেও পাই—ফ্ল্যাশব্যাকে, কল্পনায়, স্বপ্নে।

এবং আমরা খানিকটা বিরক্তও হয়ে উঠি, ঘাতক ট্রাক-ড্রাইভারকে খুঁজে পেতে এবং তাকে শাস্তি দিতে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইয়াছিন মিয়া এত উদ্ব্যগ্র কেন? আর গ্রামবাসীই-বা কেমন! কেন তারা এটা ভাবতে প্ররোচিত হয় যে, নিছক এ দুর্ঘটনা নয়, বরং হত্যাকাণ্ড? মানুষের যুক্তিবাদী মনও যে অপরিমেয় দুঃখে, অপূরণীয় ক্ষতিতে প্রায়শই আবেগের কাছে নতজানু, এটা যেন তারই নমুনা। এইখানে আমাদের মনে একটা তর্ক উপস্থিত হয়।

কেন একজন দরবেশ বা কামেল পীরকে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মরতে হলো? আর সেই কামেল পীর এত জনের এত ‘উজ্জ্বল উদ্ধার’, অথচ নিজেই অন্ধ। কেন নিজের নিরাময় জানা নেই তার?

বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ইয়াছিনের যুক্তিবাদী মন তার অলৌকিক ক্ষমতাকে স্বীকার করে না। তাকে সে ‘কো-ইনসিডেন্স’ বলেই মানে। কিন্তু বিস্ময়কর কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাকে এমনই বশ করে ফ্যালে যে, ওই অলৌকিকত্বের ভার আর বইতে পারে না সে।

অবশেষে তাকে আশেকানের দরকারে হাজির হতে হয়। এখানে ফকিরের সাথে ইয়াছিনের গানে গানে ভাবের বিনিময় খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা দৃশ্য। যেখানে আপাতদৃষ্টে মনে হবে যুক্তিবাদী মন সমর্পিত হলো ভাববাদে।

Capture2
ভাববাদ ও বস্তুবাদ যখন মুখোমুখি

আমি চক্ষু দিয়া দেখতেছিলাম জগৎ-রঙ্গিলা,
মওলা তোমার নুরানি তির হঠাৎ মারিলা।
মওলা আন্ধা করিলা।

জমিদারের মতো আমি মজায় আছিলাম,
তুমি আমার জমিদারি করিলা নিলাম।
ও মওলা নিলাম করিলা।

ছিল আমার জরির জামা, কত ঝলমইলা—
মওলা তুমি কাইড়া নিয়া ছালা পিন্দাইলা।
ও মওলা ছালা পিন্দাইলা।

রাস্তা বড় লম্বা দেইখা কান্দি জারেজার,
মওলা তুমি কান্ধে নিয়া করবা না কি পার?
ও মওলা পার করিবা।

নিজের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করবার ঠিক পর-মুহূর্তেই ইয়াছিন পর্যবসিত হয় ক্ষমতাহীনে। ক্ষমতা হারানোর বেদনা ও লাঞ্ছনায় তার উন্মাদ-দশাটিও লক্ষণীয়। এই বিপর্যয়ের মুখে সক্রিয় হয়ে ওঠে সেই আশেকানে দরবারের ফকির। ব্যাখ্যাতার ভূমিকা গ্রহণ করে সে। কিন্তু ফকিরি ব্যাখ্যার আগেই দর্শক নিজ দায়িত্বে এই সংকট বুঝে নিয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ ব্যক্তিগত ‘পাপবোধ’—যে পাপবোধের উৎস যৌনতা। যৌন-ঈর্ষার সূত্রপাত কিন্তু নগরেই ঘটেছিল। ইয়াছিন তার বান্ধবীকে হারিয়েছিল তারই এক সহপাঠী বন্ধুর কাছে। সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যেন সে এবার তৎপর হয়ে উঠল ভিন্ন পটভূমিতে। কাম, লোভ, ঈর্ষা ও অন্যায় প্রতিশোধস্পৃহাই যে তাকে ক্ষমতাহীন করে ফেলেছে, ঘটনা-পরম্পরায় তা আমরাও বুঝতে পারি। বুঝতে পারি পরীকে কেন্দ্র করে ইয়াছিন ও লোকমানের দ্বান্দ্বিক অবস্থানের প্রেক্ষিতে।

মনের এই ‘ইতরপনা’ থেকে বেরিয়ে আসার যে ফকিরি দীক্ষা তার নাম ‘সদিচ্ছা’ বা ‘গুড উইল’। এতক্ষণে বোঝা গেল এর তেজটাকেই আশলে গায়েবি শক্তি হিশেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই ‘সদিচ্ছা’র সামনে ধর্মকারী সম্পদ্রায়, সমাজ-বিপ্লবী সকলেই মাথানিচু, বিনম্র ও সশ্রদ্ধ। এমনকি সেই ভোগবাদী প্রেমিক যুগল—যারা নগরের বাইরের জীবনকে ট্যুুরিজম আর পিকনিক স্পটের অতিরিক্ত কিছু মনে করে না, যারা আসে প্রমোদবিহারে, লং ড্রাইভে, রিরংসা উদ্‌যাপনের নিভৃত রিসোর্টে—তারাও অনুতপ্ত এই সদিচ্ছার অনুধাবনে।

কিন্তু সকলেই এখানে তর্কহীন, তা বলা যাবে কি? ব্যক্তির সদিচ্ছা রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুশাসনে কতটুকু প্রশ্রয় বা গুরুত্ব পাবে? এক ফোঁটা অশ্রুর ওপর একটা জাহাজ ভাসানোর আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি? ব্যক্তিগত সদিচ্ছা, কেরামতি কিংবা রুহানি শক্তি চিরদিনই রাষ্ট্রশক্তির কাছে তুচ্ছ, তৃণসম। এসবের কোনো মূল্যই নেই যদি না কোনো সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। আর তাই পাক-বাহিনীর আগ্রাসনে, নিজগৃহের প্রতিরক্ষায় পীর-ফকির কত শোচনীয়ভাবে অসহায়!

তবু, পরাজিত বলা যায় না। ‘সদিচ্ছা’ তাই আত্মত্যাগের মধ্যেই তার ট্র্যাজিক সমাধান খুঁজে পায়। কাহিনির শেষাংশে পীর-বাবার হন্তারক লোকমান ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইয়াছিন দুই প্রান্ত থেকে এসে যুদ্ধে শামিল হয়। ইয়াছিনের দিক থেকে বলা যায় সমস্ত অলৌকিক বিশ্বাস, ক্ষমতা, অধ্যাত্মবোধ যুক্তিসিদ্ধ বস্তুতান্ত্রিক পথেই তার চূড়ান্ত সিদ্ধির দিকে অাগুয়ান। দেশমাতৃকার সাহসী সৈনিক লোকমানকে ইয়াছিন রক্ষা করে নিজের প্রাণের বিনিময়ে। এই যুদ্ধ একটা উছিলা তার জন্য, আত্মতা থেকে বেরিয়ে আসার। এখানে আত্মত্যাগই হয়ে ওঠে—বস্তুবাদী, অধ্যাত্মবাদী, সর্বোপরি মনুষ্যত্বের—মুক্তির উপায়। সংগ্রাম, ত্যাগ ও মমতার মোহনায় এসে মিলে যায় বিপরীতমুখী দুটি চেতনার ধারা। ঘটনাটি এমনই অনিবার্যতায় সম্পন্ন হয়, এই পরিণতিতে দর্শকের মন সামান্যতম বিদ্রোহ করবার ফুরসতটুকুও পায় না।

তারপরও আমাদের সেকুলার বাঙালি ছবিটি নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে উৎসাহ পায় নি সম্ভবত এর অাধ্যাত্মিক বহিরাবণের কারণে। পক্ষান্তরে শরিয়তপন্থিরাও খুশি হতে পারে নি মসজিদের দরোজায় ইয়াছিনকে দেখা যায় না বলে, যতটা দেখা যায় কবরের পাশে, আশেকানের দরবারে। কিন্তু এই ছবিটির মর্মে আছে এমন এক সত্য যা হয়তো ধর্মহীন ও ধর্মকারী উভয়েরই নাগালের বাইরে—অথচ যেখানে পৌঁছুতে চাইছে তারা সকলেই।

আমার কবিমন যা দেখে উৎফুল্ল হয় আজও—সমস্ত ঘটনাটি ঘটছে একটা গ্রামে—দৃশ্যত হাইওয়ের ধারে ছোটখাট একটা বনের মধ্যে। কী নেই সেই বনে—বুদ্ধিমতী বেশ্যা, কানন-শোভিত শুঁড়িখানা, বাজার, সিনেমা হল, রিসোর্ট, মাজার, বাউলদের আখড়া—গোটা বাংলাদেশ। এত ছোট পরিসরে, প্রায় যেন অদৃশ্য মঞ্চের ওপর দুএকটি সাজেশনে ফুটিয়ে তোলা। কোনো আড়ম্বর নেই, নেই কোনো চিৎকার, দাবি-দাওয়া। এক আশ্চর্য পরিমিতিবোধ—আপন সংকল্পে সংহত।


সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব