হোম চলচ্চিত্র দ্য লাঞ্চ বক্স

দ্য লাঞ্চ বক্স

দ্য লাঞ্চ বক্স
440
0

ইলা একজন সুন্দরী অথচ অসুখী হাউস ওয়াইফ—যার স্বামীর অন্য একটি মেয়ের সাথে অ্যাফেয়ার চলছে। তাদের ছয়-সাত বছরের একটি মেয়ে আছে। ইলা জেনেও চুপ থাকে, ঝগড়া করে ঘরের পরিবেশ নষ্ট করতে ইচ্ছুক নয়। কারণ এই মুম্বাই শহরে তার মেয়েকে নিয়ে কোথায়ই-বা যাবে ইলা? ইলা দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো করতে নিজ হাতে স্বামীর পছন্দ মতো খাবার রেঁধে পাঠায়—এতে সহায়ক ও পরামর্শক হলেন ওপর তলার আন্টি। যার স্বামী পনের বছর ধরে কোমায় পড়ে আছে এবং তিনি স্বামীর সেবা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

ইলা ও আন্টি কথা বলেতেন। আন্টিকে দেখা যেত না, কিন্তু বিভিন্ন রান্নার দ্রব্যাদি ঝুড়িতে করে দড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে দিতেন। প্রথম দিনে ডাব্বা ভুলক্রমে ঠিকানা বদল হয়ে ফার্নান্দেসের কাছে চলে যায়। সজন ফার্নান্দেস সরকারি অফিসের একাউন্টেন্ট। বিষয়টি ইলা চিঠি লিখে লাঞ্চবক্সের ভেতর ঢুকিয়ে সজনকে অবহিত করেন।

1
অনেকের মাঝে সজন ফার্নান্দেস

ফার্নান্দেজ স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মানুষের সাথে মেলামেশা এড়িয়ে চলে। ইলার স্বামী অন্য নারীর সাথে অ্যাফেয়ারে ব্যস্ত। ডাব্বা ইলার স্বামীর কাছে যাচ্ছে না রিষয়টি ইলা বলতে গিয়ে আটকে যায়। ইলার স্বামী তখন তার প্রেমিকার সাথে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

লাঞ্চবক্সে ইলা ও সজনের মাঝে চিঠি আদান-প্রদান হয় প্রতিদিন। ছোট করে লেখা চিঠি কিন্তু দুজনের মাঝে এতে করে একটি রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে।

এদিকে সজন সেই মাসে চাকরি থেকে অবসর নিবে। নতুন অ্যাসিসটেন্ট আসেন, নাম আসলাম শেখ—সৌদিতে কাজ করত। দেশে ফিরে সজনের সহযোগী হিসাবে চাকরিটি পেয়ে যায়। প্রথমে বিরক্ত হলেও একসময় তাদের ভালো বন্ধুত্ব হয়। অনাথ কলিগ আসলামের বিয়েতে সজন বিশেষ বন্ধু হয়ে খুশি মনে যায়। মুম্বাই রাস্তায় ছবি আঁকিয়েরা সারিবদ্ধভাবে ছবি এঁকে বিক্রি করে—সজন ছবিগুলো দেখে একটি ছবি পছন্দ করে কিনে নেয়। বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীর পছন্দের সিরিয়াল দেখে, যা আগে কখনো দেখত না। কথাগুলো চিঠির মাধ্যমে ইলার সাথে শেয়ার করে।

2
দুই ডাব্বাওয়ালা

লাঞ্চবক্সের মাধ্যমে খাবারের রসায়নের সাথে ধীরে ধীরে সজন আর ইলার মাঝে প্রেমের রসায়ন মিশে যায়। ইলা সজনকে জানায়, মেয়েকে নিয়ে ভুটান চলে যাবে কারণ সেখানে জীবন যাপনের খরচ কম। সজন ইলার সাথে ভুটান যাবার আগ্রহ প্রকাশ করে। ইলা তখন সজনের সাথে দেখা করতে চায়। রেস্টুরেন্টে গিয়ে ইলা যখন সজনের জন্য অপেক্ষা করে তখন রেস্টুরেন্ট গিয়ে সজন ইলাকে দেখে নিজের বিবেকের কাছে আশ্রয় নেয়—ইলা যুবতী এবং সুন্দরী, তখন নিজের পড়ন্ত বয়সের দিকে তাকিয়ে সজন ইলার সাথে দেখা না করেই চলে আসে। পরের দিন রাগ করে ইলা খালি বক্স পাঠায়।

এদিকে হঠাৎ খবর আসে দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভোগে ইলার বাবা মারা গেছেন। ইলা মাকে জড়িয়ে ধরে, মা জানায়, দশটি বছর কিভাবে অসুখী জীবন কাটিয়েছেন। ইলার মন বিষাদে ভরে যায়। এদিকে সজন জানায় কী কারণে সে ইলার সাথে দেখা করে না। ইলা ডাব্বাওয়ালাকে জানায় বক্স তার স্বামীর কাছে যাচ্ছে না। ডাব্বাওয়ালার কাছে ঠিকানা নিয়ে সজনের অফিসে গিয়ে আসলাম শেখ জানতে পারে সজন নাসেস চলে গেছে। আসলাম শেখ থেকে ঠিকানা নিয়ে ইলা চিঠি লিখে সজনকে। চিঠিতে জানায় ইলা গয়না বিক্রি করে মেয়েকে নিয়ে ভুটান যাবে। সজন আবার মুম্বাই শহরে ফিরে আসে। ইলার মেয়ের স্কুলে গিয়ে অপেক্ষা করে । চিঠিতে লেখা ছিল স্কুল থেকে মেয়েকে নিয়ে ভুটান যাবে। দর্শক জেনে যায়, ইলা ও সজনের প্রেম পরিণতি পায়।

3
সজন ফার্নান্দেস ও ইলা

গল্পের অনেকটাই জানাতে হলো। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন মাত্র চার জন। কিন্তু সিনেমার যে বিষয়টি আমাকে টেনে নিয়ে গেছে, সেটি হলো মুম্বাই শহরের ‘ডাব্বাওয়ালা’। ওদের কাজের একাগ্রতা, তাদের চলাফেরা, ট্রেন, বাস, মুম্বাইয়ের ক্রাউড এসব দৃশ্য-ধারণ ক্যামেরায় যথাযথ ফোকাস হয়েছে। ডাব্বাওয়ালারা, অফিসের পরিবেশ, ট্রেন-বাসের আরোহীদের, বালকেরা কিভাবে রাস্তায় ক্রিকেট খেলে, ট্রেনে হিন্দি গান গেয়ে গেয়ে চলে।

ইরফান খান, নওয়াজুদ্দীন সিদ্দিকী এবং নিমরাত কাউর তাদেরকে পিপল ক্রাউডের সাথে থেকে চরিত্রে অভিনয় করে যেতে হয়েছে। চরিত্রের বাইরে তাদের অভিনেতা হিসাবে চেনার উপায় নাই। তাই বলে ডকুমেন্টটারি মুভি নয়, ‘দ্য লাঞ্চ বক্স’-এ সিনেমার ভাষা অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। এই সিনেমা, শব্দ গ্রহণ এত অসাধারণ হয়েছে সেটি না দেখলে বোঝানো যাবে না—কী ইনডোর কিংবা আউট ডোর। স্পঞ্জের স্যান্ডেলের শব্দ আর চামড়ার জুতার শব্দ পাশাপাশি স্পষ্ট কানে লাগে। সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার হয় ইলা আর সজনের রোমান্টিক অনুভূতি বোঝাতে। পত্র পাঠ কিংবা বিশেষ মুডে। ব্যস্ত মুম্বাই শহরের কোলাহল, ট্রেন বাস রাস্তার জ্যাম আশ-পাশ মানুষের আওয়াজ এসবের শব্দ গ্রহণ অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে অবলোকন করে ধারণ করা হয়।

4
সজন ফার্নান্দেস ও শাইখ

পরিচালক  রিতেশ বাটরা এই কাজগুলো খুব কম দিনেই শেষ করতে পেরেছেন। এই ছবির এডিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিনেমা অনেক সময় ছন্দহীন হয়ে পড়ে যথার্থ এডিটিং না হলে। এই ছবি দেখে অভিনয় শিল্পীদের শেখার অনেক আছে—যদি কেউ শিখতে চায়।

ছবিটি ভারত ও ভারতের বাইরে ব্যবসা সফল ছবি হিসাবে নাম করেছে। সব ধরনের দর্শক ছবিটি উপভোগ করেছেন। বিদেশি দর্শকের কাছে ছবিটির বিশেষত্ব পেয়েছে ডাব্বাওয়ালাসহ মুম্বাই জনপদ যথার্থভাবে তুলে ধরার কারণে। তারা এর আগে এই বিষয় নিয়ে কোনো ছবি দেখে নি। ছবিটিকে অস্কার নমিনেশনে পাঠানো হয়েছিল। বিভিন্ন একাডেমি পুরস্কারসহ ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় ‘দ্য লাঞ্চ বক্স’। মুব্বাই ছবিপাড়া বহু বছর পর এমন একটি ছবি উপহার দেয়। ২০১৩-তে ছবিটি মুক্তি পায়। এর পরে লাঞ্চবক্সের মতো প্যারালাল ছবি আর চোখে পড়ে নি।

ছবির প্রতিটি দৃশ্য বদল, অভিনয়, ক্যামেরা যথা সময়ে স্পটেট করা বলে খুব সুন্দরভাবে চোখে পড়েছে। ডাব্বাওয়ালাদের অভিনব কর্মসংস্কৃতি ছবিতে দেখানো হয়েছে সজন ও ইলার রোমান্টিকতার সাথে। এর মাঝে মানুষের বিবাহিত জীবনের জটিলতা দর্শকদের কাছে বাস্তবসম্মতভাবে পরিচালক তুলে ধরেছেন। ‘দ্য লাঞ্চ বক্স’ ছবির বিশষত্ব এটাই। কোনো মেসেজ কিংবা ইমোশন হাইলাইট করা হয় নাই। ডাব্বাওয়ালারা অল্পক্ষণের জন্য স্তিমিতভাবে সময় কাটায় নাই। হাততালি দিয়ে তাদের ফোকলোরগুলো যখন গাইছিল, তখন ভারতীয় একটি বিশেষ এথনিক রূপ প্রকাশ পায়। ইরফান খান, নিমরাত কাউর এবং নওয়াজুদ্দীন সিদ্দিকীর সমৃদ্ধ অভিনয় এবং পরিচালক রিতেশ বাটরার সুদক্ষ নির্মাণে ‘দ্য লাঞ্চ বক্স’ স্মরণীয় ছবি হয়ে থাকবে।

Shirin Osman

শিরিন ওসমান

জন্ম ৩১ মে, সিলেট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বি এ। পেশা ব্যবসা।

ই-মেইল : shirin.osman31@gmail.com
Shirin Osman