হোম চলচ্চিত্র কুশীলবের খোঁজে

কুশীলবের খোঁজে

কুশীলবের খোঁজে
558
0

জীবন একটা রঙ্গমঞ্চ। এখানে সবাই কুশীলব, যে যার মতো অভিনয় করে যাচ্ছে। এরকম কথা হরহামেশাই শোনা যায়। বিশেষ করে মানুষ যখন সংকটের মুখোমুখি হয়, আর অতিপরিচিত থেকে স্বল্পপরিচিত সবাই না চেনার ভান করে, তখন সেই সংকটের মুখে পড়া মানুষটি খোঁজে এই ভান করা মানুষের পূর্বের রূপ। পূর্বের রূপের সঙ্গে ভান করা রূপের মিল সে পায় না। আর তখনই মনে হয়, জীবনে সবাই এক একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী। জীবনের এই অভিনয়ের বাইরেও অভিনয় করে মানুষ। এই অভিনয় মঞ্চের, এই অভিনয় পর্দার, এই অভিনয় বোকা বাক্সের। ‘অভিনয়ের জন্য অভিনয়’ বললে, এইসব অভিনয়ের খোঁজ পাওয়া যাবে না। খোঁজ করতে হলে ইতিহাস, সভ্যতা ছাড়াও প্রাগৈতিহাসিকতার পথে হাল ঘুরাতে হবে।

২.
আদিম মানুষ দলবদ্ধভাবে আত্মরক্ষা বা অভিযোজন করতে চেষ্টা করেছে, দলবদ্ধভাবে আহরণ ও শিকার করেছে, দলবদ্ধ হয়ে অতিপ্রাকৃত শক্তিকে—দেব-দেবী ভূত-প্রেতদের তুষ্ট করবার জন্য অনুষ্ঠান করেছে, যৌথভাবে আনন্দ উপভোগ করেছে এবং দুঃখ-দুর্ভোগের বেদনা ভোগ করেছে। যেন ভিন্ন ভিন্ন দেহের ভিতর দিয়ে একটি মনই কাজ করে গেছে।


গ্রিক নাটকের উৎপত্তি হয়েছে ডাওনিসাস উৎসবে এবং ডাওনিসাস কাহিনি আশ্রয় করেই।


আদিম মানুষের এইসব চারিত্রিক বিষয়-আশয়ের মধ্যে একটা বিষয় খেয়াল করা দরকার, আর তা হলো—দলবদ্ধ হয়ে অতিপ্রাকৃত শক্তিকে—দেব-দেবী ভূত-প্রেতদের তুষ্ট করবার জন্য অনুষ্ঠান করার ব্যাপারটি। এখানে তাদের স্বাভাবিক জীবনের বাইরে যে ব্যাপারটি পাওয়া যায়, সেখানে তারা সামষ্টিক চেতনার (Collective Consciousness) পরিচয় দেয়। অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তুষ্ট করবার জন্য যে অনুষ্ঠান এটার মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় অভিনয়ের একটা প্রেক্ষাপট। যা পরবর্তীকালে মিশর, গ্রিক, ভারতে দেবতাকে তুষ্ট করতে নাট্যাভিনয়ের মধ্যে বিষয় হয়ে এসেছে। ‘আদিম সমাজে ব্যক্তির নৈয়ায়িক বুদ্ধির মাত্রা খুবই কম এবং কম বলেই, তারা প্রত্যেকে ঘটনার বা কার্যের কারণ হিশেবে অদৃশ্য ও অলৌকিক শক্তি কল্পনা করেছে, আত্মরক্ষার তাগিদে তাকেই নানা উপায়ে তুষ্ট করতে চেষ্টা করেছে…’, এই ‘তুষ্ট’ করার মধ্যেই অভিনয় ছিল। কিন্তু যেহেতু তাদের নৈয়ায়িক বুদ্ধি কম ছিল তাই তারা নিজেরাও সেটা উপলব্ধি করতে পারে নি। বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে উঠে আসে যখন মিসর, গ্রিক আর ভারতে নাটকের অভিনয়ের খোঁজ করা হয়। ‘খ্রিস্টের জন্মের দুহাজার বছর আগে, মিশরে নাট্যাভিনয়ের প্রচলন ছিল। জনৈক ইখার্নোফ্রেতের বিবরণ থেকে জানা যায়—তৃতীয় সেকোসট্রিসের (Secostries, 1887-1849 B.C.) সম্মুখে, তিনি প্রাচীন নাট্য থেকে সংগ্রহ করে ওসিরিসের কাহিনিটি অভিনয় করেছিলেন। ওসিরিস কৃষির অর্থাৎ শস্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা।’

গ্রিসে নাট্যাভিনয় এইস্কিলাসের বা থেসপিসের সময় থেকে আরম্ভ হলেও এই আরম্ভই নাট্যাভিনয়ের প্রথম আরম্ভ নয়। এর শত বা সহস্র বৎসর আগেও হয়তো নাট্যাভিনয়ের প্রথা প্রচলিত ছিল। গ্রিক নাটকের উৎপত্তি হয়েছে ডাওনিসাস উৎসবে এবং ডাওনিসাস কাহিনি আশ্রয় করেই। গ্রিক গোষ্ঠী সমাজের দীক্ষাবিধি থেকেই ক্রমে ডাওনিসাস-উপাসনা এবং তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে গ্রিক নাটকের। ডাওনিসাস নাটকটিও ‘কৃষি-ইষ্টি’ কথাকেই তুলে ধরেছে। অর্থাৎ ডাওনিসাস কৃষির অভিমানী দেবতা। আর ইন্দ্রোৎসবকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষে নাটকের জন্ম হয়েছিল।

প্রাচীন মিশর, গ্রিক ও ভারতে নাট্যাভিনয় ব্যাপারটির সাথে দেব-দেবতার তুষ্টি এবং ধর্মোৎসব বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। আর এই ব্যাপারটির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় আদিম সমাজের ওইসব মানুষের রীতির, যা তারা দলবদ্ধ হয়ে অতিপ্রাকৃত শক্তিকে—দেব-দেবী ভূত-প্রেতদের তুষ্ট করার জন্য করত। মিশরে কৃষির দেবতা ওসিরিসকে, গ্রিকে কৃষির অভিমানী দেবতা ডাওনিসাসকে আর ভারতবর্ষে ইন্দ্রকে নাট্যাভিনয়ের বিষয় করা হয়েছে। তাহলে বলা যায়, আদিম মানুষের অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তুষ্ট করার বিষয়টি একধরনের নাট্যাভিনয়। মানুষের এই অভিনয় প্রবণতা কিংবা ক্ষমতা তাহলে প্রাগৈতিহাসিক পর্যায় থেকেই ছিল।

৩.
একটা অতিপরিচিত গল্পের কথা ধরা যাক। এক রাখাল বালক বনের পাশে গরু নিয়ে যেত ঘাস খাওয়াতে। বন থেকে কিছুটা দূরে কিষানেরা মাঠে কাজ করত। দিনের কোনো একসময় রাখাল বালক বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করত। রাখালের চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করার জন্য ছুটে আসত কৃষক এবং গ্রামবাসী। কিন্তু তারা এসে দেখত আশেপাশে কোনো বাঘ নেই এবং রাখাল বালক তাদের ঠকিয়েছে। রাখালের এই পুরো ব্যাপারটি অভিনয় ছাড়া তো আর কিছুই নয়। কারণ তার সুনিপুণ অভিনয়ের দ্বারা লোকজন মানে যারা তার চিৎকার শুনত তাকে উদ্ধার করতে আসত। তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হতো, সত্যি রাখাল বালকটি বিপদে পড়েছে।

৪.
এবার আসা যাক চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীর দিকে। যেহেতু চলচ্চিত্র আবির্ভাবের পূর্বে নাটকের আবির্ভাব, তাই কিছুটা নাট্যাভিনয়ের ইতিহাসের জের টানতে হলো। ইউরোপে চলচ্চিত্রের উদ্ভব ঘটে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে আর ভারতবর্ষে তার ঢেউ লাগে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে। ‘উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে নাটক, নাচগান, যাত্রাপালার পাশাপাশি ঢাকাবাসীরা বিজ্ঞানের নব আবিষ্কার চলচ্চিত্রের প্রথম স্বাদ পায় ১৯৯৮ সালের ১৭ এপ্রিল তারিখে।’ এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা দরকার যে—ঢাকায় চলচ্চিত্র আবির্ভাবের পূর্বে নাটক, নাচগান, যাত্রাপালা বিনোদনের একটা বড়ো পরিসর জুড়ে ছিল। আর গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে পুতুল নাচ, পটের গানও উল্লেখযোগ্য। ঢাকায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে হলেও পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র তৈরি হতে বেশ সময় লেগেছিল। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল জব্বারের মুখ ও মুখোশ প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক বাংলা চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কাল হতে নির্মাণকালের এত দেরি হওয়ার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণও ছিল। তার মধ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ অন্যতম। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা রাজধানীর গৌরব হারায় আর কলকাতা আবারও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রের গুরুত্ব নেয়। ‘এ কারণে কোলকাতাই হয়ে পড়ে ছবি নির্মাণের ক্ষেত্র। ঢাকা মেতে থাকে নাটক, যাত্রাগান, পালাগান এবং বাইজিদের আসর নিয়ে।’ এই সময়ে ঢাকার নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীর অনেকে শখের বশে অভিনয় করত। ‘অনেক সময় অভিনেতা বা অভিনেত্রীরা আসতেন কোলকাতা বা অন্য কোনো স্থান থেকে।… পেশাদার নাটকে মেয়ে চরিত্রে যারা অভিনয় করতেন তাদেরকে কোলকাতা থেকে আনা হতো। আর অপেশাদার নাটকে ছেলেরাই মেয়ে সাজত। পরে পতিতা বা বাইজিদের নেওয়া হয়।১০ এখানে একটা বিষয় লক্ষ করার মতো যে, তখনো ঢাকায় অভিনয়ের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল না। বিশেষ করে নারী অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরো উল্লেখ করার মতো।

এসব তো গেল নাটক-থিয়েটারের কথা। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কী ঘটে? ১৯২৭-২৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা সুকুমারী নামের যে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তাতে নায়ক চরিত্রে পুরুষ পাওয়া গেলেও নায়িকা চরিত্রে কোনো নারীকে পাওয়া যায় নি। ফলে আব্দুস সোবহান নামের এক তরুণ নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেন। নায়িকা চরিত্রে নারী না পাওয়ার ব্যাখ্যা হিশেবে বলা যায়—সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রে বা নাটকে নারীর অভিনয় কোনো সহজ ব্যাপার ছিল না। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র দি লাস্ট কিস-এ নায়কের ভূমিকায় ছিলেন খাজা আজমল। আর নায়িকার ছিলেন লোলিটা। এই চলচ্চিত্রের আরেক অভিনেত্রী হলেন চারুবালা।

লোলিটা এবং চারুবালা পতিতা ছিলেন; তাদের পতিতালয় থেকে আনা হয়। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা দরকার আর তা হলো—চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে নারী চরিত্রে পতিতা কিংবা বাইজি এনে অভিনয় করানো হয়েছে, ফলে দর্শকদের মনে এটা এখনও গেঁথে আছে—চলচ্চিত্রে যে সব নারী অভিনয় করে তারা সামাজিকভাবে মেলামেশার উপযুক্ত নয়। আবার ছোটপর্দার অনেক অভিনেত্রীকে বলতে শোনা যায়—‘বাণিজ্যিক’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী নয়, তবে যদি ‘ভিন্ন ধারার’ চলচ্চিত্র হলে তিনি প্রস্তাব বিবেচনা করবেন। অভিনয়শিল্পীরা যদি নিজেরাই প্রশ্ন তৈরি করেন, তাহলে সাধারণ দর্শক যারা চিত্রজগৎ সম্পর্কে পুরোপুরি জানে না, তারা তো সেই তিরিশের দশকের ধারণা মাথায় রাখতেই পারে।


১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বনানী চৌধুরী নামে এক অভিনেত্রীর আবির্ভাব ঘটে কলকাতার চলচ্চিত্রে। তার আসল নাম আনোয়ারা এবং তিনি ছিলেন প্রথম বি এ পাশ মুসলমান অভিনেত্রী, যার জন্ম মাগুরায়।


যদিও এই শিল্পীদের কেউই ‘বাণিজ্যিক’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করলে তাদের কী জাত যাবে, সে বিষয়টা পরিষ্কার করেন না! তার মানে ব্যাপারটাকে অনেকখানি জোর করে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে—বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে যারা অভিনেত্রী তারা সেই লোলিটা কিংবা চারুবালার দলে। কিন্তু থিয়েটার কিংবা মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে কিংবা ছোটপর্দায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে তেমনটি শোনা যায় না। তবে এমন প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে বাঙালি মুসলমান সমাজের কিছু ব্যাপার ছিল। প্রথম বাঙালি মুসলিম অভিনেত্রী হিশেবে চলচ্চিত্রে আসেন রোকেয়া খাতুন। রোকেয়া খাতুন ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে তৎকালীন বাংলাদেশে অভিনয় করতে পারেন নি। অভিনয়ের জন্য তাকে চলে যেতে হয়েছিল সুদূর লাহোরে।

বিভিন্ন মুসলমান অভিনেতাকেও নাম পাল্টে হিন্দু নাম নিয়েও অভিনয় করতে হয়েছে। নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রে বাঙালি মুসলমান দলিল আহমদ অভিনয় করেন শ্যামল কুমার ছদ্মনামে, ওবায়েদ-উল হক করেন হিমাদ্রি চৌধুরী, ইসমাইল মোহাম্মদ করেন উদয়ন চৌধুরী, ফতেহ লোহানী করেন কিরণ কুমার ও কাজী খালেক করেন স্বপন কুমার ছদ্মনামে। এই সময় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বনানী চৌধুরী নামে এক অভিনেত্রীর আবির্ভাব ঘটে কলকাতার চলচ্চিত্রে। তার আসল নাম আনোয়ারা এবং তিনি ছিলেন প্রথম বি এ পাশ মুসলমান অভিনেত্রী, যার জন্ম মাগুরায়। ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেন। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ, এই সময়ের মধ্যে লোলিটা থেকে বনানী চেীধুরীর আবির্ভাব নারী অভিনেত্রীর ভিন্ন চিত্র প্রকাশ করে। বনানী চৌধুরীর শিক্ষা এবং সামাজিক অবস্থান থেকে বোঝা যায়, চলচ্চিত্রে নারী অভিনেত্রী সম্পর্কে যে প্রেক্ষাপট চালু ছিল তা অনেকটাই পাল্টেছে। যদিও এটা ঘটে কলকাতার চলচ্চিত্রে। কিন্তু অভিনেত্রী ছিলেন বাঙালি মুসলমান এবং উচ্চশিক্ষিত।

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পরিবর্তন আনে। তারই ধারাবাহিকতায় আবদুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’-এর জন্ম। ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করা হয় ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চ, বেতার ও শিক্ষায়তন থেকে। নির্মাতা আবদুল জব্বার খান নিজেও অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন আমিনুল হক। তার বিপরীতে নায়িকা হয়ে আসেন চট্টগ্রামের মঞ্চাভিনেত্রী পূর্ণিমা সেন। পূর্ণিমা এর আগে কোলকাতায় মঞ্চে নাচতেন ও গাইতেন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রামে এসে যোগ দেন ‘রঙ্গনাট্য’ দলে। চলচ্চিত্রটির অন্য দুই সহ-নায়িকা চরিত্রে নির্বাচিত হন জহরত আরা ও নাজমা (পিয়ারী বেগম)। এরা দুজনেই ছিলেন বান্ধবী, পড়তেন ইডেন কলেজে। জহরত আরা বেতারে নাটকও করতেন।১২ এত গেল ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কুশীলবের কথা। তারপর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন অভিনেতা অভিনেত্রীর আগমন ঘটতে থাকে। ‘আসিয়া’ (১৯৬০) চলচ্চিত্রের পরিচালক ফতেহ লোহানী চলচ্চিত্রের নায়িকা নিবাচন সম্পর্কে বলেন:

১৯৫৭ সালের মাঝামাঝি। ‘আসিয়া’ কাগজপত্রের কাজ শেষ করে ফেলেছি। একদিন একটি মেয়ে এলেন আমার বাসায় দেখা করতে। ছিপছিপে গড়ন। শ্যামলা রঙা অমায়িক হাসি ছড়িয়ে অভিবাদন জানালেন। বসতে বললাম। উনি বসলেন। কিছু কথা শুরু করবেন কি দিয়ে হয়তো তা ঠিক করতে না পেরে বড় বড় চোখ মেলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিছুটা যেন অসহায়ের মতো। আমি সেদিনের সেই দুটি স্বচ্ছ চোখে খুঁজে পেলাম ‘আসিয়া’কে। নাম শুধালাম। বললেন, হেনা, হেনা লাহিড়ী। আমি বললাম, উহ আজ থেকে আপনি সুমিতা। ছবির সত্যিকার প্রাণ সঞ্চার করেন যারা তারা হচ্ছেন ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রী। সেদিনকার সেই অনাড়ম্বর মেয়ে সুমিতার মধ্যে যথেষ্ট প্রতিভা লুকিয়েছিল। আমি ওকে শুধু সাহায্য করেছি মাত্র। এই অচেনা শিল্প মাধ্যমের সঙ্গে সুমিতার পরিচয় করিয়ে দিতে, দেখিয়ে দিয়েছি মাত্র কোন পথে এগিয়ে যেতে হবে। সুমিতা তার সমগ্র অনুভূতি দিয়ে চরিত্রকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন, রূপায়িত করেছেন। এতে ওর কোনো ক্লান্তি ছিল না বিরাম ছিল না।১৩

সুমিতা ছিলেন মাদারীপুরের রাজনৈতিক কর্মী অতুল লাহিড়ীর স্ত্রী।
‘মুখ ও মুখোশ’—এর পর থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ এপ্রিল ‘পূর্ব পকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’ বিল পাস হওয়া এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরায়’ অভিনয় করেন কাজী খালেক, আনিস (খান আতা) ও তৃপ্তি মিত্র। ‘আকাশ আর মাটিতে’ (১৯৫৯) অভিনয় করেন কলকাতার প্রবীর কুমার, রুপা মুখার্জী। মাটির পাহাড়-এ (১৯৫৯) রাজিয়া (সুলতানা জামান), রওশন আরা (ডেইজী), ইকবাল, কাজী খালেক অভিনয় করেন। রওশন আরা (ডেইজী) ছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। এ ‘দেশ তোমার আমার’-এ (১৯৫৯) অভিনয় করেন সুমিতা, আনিস (খান আতা), রহমান, সুভাষ দত্ত। চিত্রা ও রহমান অভিনয় করেন রাজধানীর বুকেতে (১৯৬০)। এছাড়া ‘যে নদী মরু পথে’তে (১৯৬১) রওশন আরা, আনিস (খান আতা), নাসিমা খান, হীরালাল, কল্যাণী দাশ গুপ্ত; ‘হারানো দিন’-এ (১৯৬১) রহমান, শবনম, মুস্তাফা, আজিম, সুুভাষ দত্ত; ‘তোমার আমার’-এ (১৯৬১) আমিন, চিত্রা, ইকবাল, আনােয়ার হোসেন, রবিউল, রানী সরকার; ‘কখনো আসেনি’তে (১৯৬১) সুমিতা, শবনম, খান আতা, সঞ্জীব দত্ত, নারায়ণ চক্রবর্তী; ‘সূর্যস্নান’-এ (১৯৬২) রওশন আরা, কাজী খালেক, ইনাম আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, নাসিমা খান; ‘চান্দা’য় (১৯৬২) শবনম, রহমান, মুস্তাফা, সুভাষ দত্ত, সুলতানা জামান, ইনাম আহমেদ, রাণী সরকার; কাঁচের দেয়াল-এ (১৯৬৩) সুমিতা, রাণী সরকার, খান আতা, আনোয়ার হোসেন, ইনাম আহমেদ, পূর্ণিমা সেন; ‘ধারপাত’-এ (১৯৬৩) আমজাদ হোসেন, নাসিমা খান, কাজী খালেক, সুজাতা, সালেহা, সিরাজ, হাসান ইমাম; সংগম-এ (১৯৬৪) রোজী, হারুন, সুমিতা, খলিল, বদরুদ্দীন, মায়া দেবী, রাণী সরকার, আনোয়ারা, জাভেদ, আবুল খায়ের; ‘সুতরাং’-এ (১৯৬৪) কবরী (মিনা পাল), সুভাষ দত্ত, বেবী জামান, মঞ্জুশ্রী, জেসমি, রাণী সরকার, ইনাম আহমেদ; ‘তানহা’য় (১৯৬৪) হারুন, শামীম আরা, সুমিতা, শবনম, নাসিমা খান, শেখ হাসান; ‘অনেক দিনের চেনা’য় (১৯৬৪) সুলতানা জামান, তন্দ্রা ভট্টাচার্য, হাসান ইমাম, সিরাজ, তুলিপ, কাপি খান, রবিউল, এহতেশাম এবং ‘নদী ও নারী’তে (১৯৬৫) রওশন আরা, কাজী খালেক, মাসুদ, সুভাষ দত্ত, মুস্তাফা অভিনয় করেন।

‘মুখ ও মুখোশ’-এর আগের ও পরের এই কয়েক বছরে নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট বেশকিছু বিষয়কে ইঙ্গিত করে: স্বল্পদৈর্ঘ্য’র ‘সুকুমারী’-তে অভিনয়ের জন্য কোনো নারী পাওয়া যায় নি। পুরুষকে দিয়েই নারী চরিত্রের চিত্রায়ন করা হয়। তারপর ‘দি লাস্ট কিস’-এ নারী চরিত্রের জন্য যে নারী আসে তারা যৌনকর্মী। এই দৃশ্যপট পাল্টে যায় ‘মুখ ও মুখোশ’-এ। আর এরপর তা আরো পাল্টে। উপরের চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীর তালিকা থেকে তা কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়। ‘আসিয়া’য় সুমিতার আবির্ভাব আরেকটি নতুন পথ তৈরি করে। আর তা হলো—সুমিতা ছিল বিবাহিত। সেক্ষেত্রে বিবাহিত সত্ত্বেও চলচ্চিত্রে অভিনয় করা তাও আবার পরিচালকের কাছে নিজে এসে পরিচিত হয়ে!

তবে এই কয়েকবছরে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তালিকা থেকে দেখা যায়, কিছু নামই ঘুরেফিরে এসেছে। নারীদের উপস্থিতিও আরেকদিক থেকে আশার সঞ্চার করে, তা হলো তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনেত্রী জহরত আরা ও নাজমা (পিয়ারী বেগম) ছিলেন ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী। পিয়ারী বেগম তার অভিনয়ে আসা নিয়ে বলেন:

‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করার সময় আমি ইডেন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। বাবা কিছুতেই অভিনয় করতে দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু জব্বার সাহেবের অনুরোধেই আসলে বাবা অনুমতি দিলেন।১৪


তারা নিজেরাই যে একটা বাণিজ্যিক পণ্য হয়ে মোবাইল ফোনের এসএমএস-এর মাধ্যমে অভিনয়শিল্পী হয়েছেন, সেটা তারা উপলব্ধি করতেও পারে না!


এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো, অভিনয়ে আসার জন্যে বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের অভিনেত্রীকে যেমন পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তেমনি এখনও অনেক অভিনেত্রীকে প্রতিষ্ঠা পাবার পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলতে শোনা যায়, অভিনয়ের শুরুতে তাদের পারিবারিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হবার কথা।

পারিবারিকভাবে বাধার এই কারণ আসলে কী? কিংবা যখন তারা প্রতিষ্ঠা পান, তখন কেন আর বাধা দেওয়া হয় না? কিংবা পারিবারিকভাবে বাধা দেওয়ার কথা বলাটা ফ্যাশন কিনা? ‘মাটির পাহাড়’-এর রওশন আরা (ডেইজী) ছিলেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। ওই কয়েক বছরে অভিনয়ে আসা কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী বেশ দাপটের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এরা হলেন—সুমিতা, শবনম, রহমান, মুস্তাফা, খান আতা, আজিম, সুুভাষ দত্ত, আনোয়ার হোসেন, বেবী জামান, আনোয়ারা, রাণী সরকার, খলিল, হাসান ইমাম, কবরী, সুচন্দা, সুজাতা, সাইফুদ্দিন, হাসমত প্রমুখ। এদের বাইরেও মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আরো নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীর আগমন ঘটে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, ববিতা, শাবানা, আজিম, এটিএম শামসুজ্জামান, আবদুল্লাহ আল মামুন, শওকত আকবর, প্রবীর মিত্র, আলমগীর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আহমেদ শরীফ, ইলিয়াস কাঞ্চন, ওয়াসিম, রাজীব, কবিতা, জাফর ইকবাল, টেলি সামাদ, নূতন, মায়া হাজারিকা প্রমুখ।

৫.
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’-এর রঙিন সম্প্রচার শুরু হয়। এই সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শিল্পী সংকটের পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় লক্ষ করা যায়। ওই সময়ে টেলিভিশনে নির্মিত নাটকের কলাকুশলীরা মঞ্চ নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন এবং তখন একটা পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে বেড়ে উঠার প্রেক্ষাপট ছিল। বিশেষ করে ঢাকায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে অংশটা শিল্পসংস্কৃতি চর্চায় যুক্ত ছিল তারাই টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রাঙ্গনে ছিল এর ঠিক বিপরীত দশা। শিল্পী সংকট ও অভিনয়শিল্পীদের বয়স বাড়ার কারণে বয়সানুযায়ী চরিত্রায়ন কষ্টকর হয়ে পড়ে।

তখন বিশেষ করে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে এফডিসি থেকে নতুন মুখের শিল্পী খোঁজার কার্যক্রম চালু হয়। নায়ক মান্না ছিলেন যার ফসল। এই নতুন মুখ কার্যক্রমে মুখ পাওয়া গেলেও তারা আসলে সংকট কাটোনোর মতো শিল্পী কিনা সেটা নিয়ে আরেক সংকট তৈরি হয়। শুধু গ্ল্যামার দিয়ে অভিনয় হয় না, এই বিষয়টা এফডিসির চলচ্চিত্র নির্মাতারা হয়তোবা মাথায় রাখেন নি কিংবা ইচ্ছা করেই করেন। যার ফল ভোগ করতে হয় দর্শককে। আবারও টানতে হচ্ছে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর নায়ক আমিনুল হকের প্রসঙ্গ—চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে ঢাকা বেতারের বেশকিছু নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পরও বেতার টেলিভিশন ও মঞ্চে প্রায়ই অভিনয় করতেন। আমিনুল হক মোট ৩৪টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।১৫ অর্থাৎ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে মঞ্চাভিনয়ের জগতে যুক্ত থাকাটা শিল্পী, শিল্প ও দর্শক সবার জন্যই সুখকর। কিন্তু এফডিসির নতুন মুখ সন্ধানে সেই সুখকর ব্যাপারটি ঘটে নি। তখন আরো কিছু ঘটনা ঘটে। চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশনের প্রচার-প্রসার বাণিজ্যের কাছে পরাজিত হতে থাকে যাত্রাপালা। যাত্রাপালা থেকে অনেক শিল্পীরও আগমন ঘটে চলচ্চিত্রে। এবং এক্ষেত্রেও অভিনয় দক্ষতার চেয়ে গ্ল্যামারকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। যদিও যাত্রার অভিনয় আর চলচ্চিত্রের অভিনয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। এ প্রসঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘বেদের মেয়ে’ খ্যাত নায়িকা অঞ্জু ঘোষ একটা উদাহরণ বটে। স্বাধীনতার আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরার হয়ে যাত্রায় নৃত্য পরিবেশন করতেন ও গাইতেন অঞ্জু ঘোষ। ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চট্টগ্রামের মঞ্চনাটকে জনপ্রিয়তার সঙ্গে তিনি অভিনয় করেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে ফোক-ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা এফ কবির চৌধুরী চলচ্চিত্রে আনেন তাকে। নির্মাণ করেন সওদাগর।১৬

এই সময়ে রুবেল, মান্না, চম্পা, দিতি, জসিম, রানী, বাপ্পারাজ এরা নায়ক-নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন। বিশেষ করে ইলিয়াস কাঞ্চন তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। ঠিক এমনই এক সময় ১৯৯১ সালে পরিচালক এহতেশাম নতুন একজোড়া জুটিকে চলচ্চিত্রে হাজির করেন ‘চাঁদনী’র মাধ্যমে। শাবনাজ-নাঈম জুটি সেসময় অভিনয় করেন বেশ কয়েকটি প্রেম-ভালোবাসার কাহিনি নির্ভর চলচ্চিত্রে। বিশেষ করে ওই সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে আমির খান, মাধুরী, সালমান, শাহরুখ, জুহি চাওলা কলেজে পড়ুয়া তরুণ-তরুণীর চরিত্র নিয়ে যে ধরনের চলচ্চিত্রে অভিনয় করত, শাবনাজ-নাঈম জুটিও সেরকম একটা আবহ তৈরি করেন।

আর এরই ধারাবাহিকতায় সালমান শাহ ও মৌসুমী জুটির আগমন ঘটে। তারপর আমিন খান, ওমর সানি, মেহেদী, শাবনূর, রিয়াজ, শাকিল খান, পপি, ফেরদৌস, পূর্ণিমা এদের আগমন। ইলিয়াস কাঞ্চনের বয়স বেড়ে যাওয়া, রুবেলের অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র, মান্নার সামাজিক অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের বাইরে ওমর সানি, মেহেদী, শাবনূর, রিয়াজ, শাকিল খান, পপি এরা অভিনয় করেন প্রেম-ভালোবাসার কাহিনি নির্ভর চলচ্চিত্রে। সালমান শাহ্-এর মৃত্যুর পর রিয়াজ, শাকিল খান, ওমর সানী তার জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করে। ওমর সানী-মৌসুমী, রিয়াজ-শাবনূর ও শাকিল-পপি জুটি বাধে। এদের পর বাংলা চলচ্চিত্রে ২০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুনমুন, ময়ূরী, পলির আগমন ঘটে। বাংলা চলচ্চিত্রে এই অভিনেত্রীরা ‘অশ্লীলতা’ নিয়ে আসেন বলে দাবি করা হয়।

একই সময়ে আগমন ঘটে শাকিব খানের। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘অশ্লীল’ চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলে রিয়াজ, শাকিল খান অনেকেই চলচ্চিত্রে অবস্থান হারান। এরপর ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে নায়ক মান্নার মৃত্যুর পর এফডিসির চলচ্চিত্রে শাকিব খানের দর বাড়ে। সেসময় শাকিব-অপু জুটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ছিল বেশ কিছু দিন। বর্তমান অবধি শাকিব খান এফডিসির সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতা। শূন্য দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দু-একটি টেলিভিশন চ্যানেল সুপারস্টার খোঁজার প্রতিযোগিতা চালু করে। এসময় লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার, ‘এটিএন বাংলা’র নায়িকা খোঁজা প্রতিযোগিতা, ‘এনটিভি’র সুপার হিরো সুপার হিরোইন প্রভৃতি নামে এইসব রিয়েলিটি শো চলতে থাকে।

তবে এসব ক্ষেত্রে গ্ল্যামারই মুখ্য ছিল। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে চেহারা যাচাই-বাছাই করে দুই-তিন মাসের মধ্যে নায়িকা হয়ে যাওয়া এবং চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। মম, বিন্দু, বাঁধন, মীম, নিলয় এরা এসব রিয়েলিটি শোর মধ্য দিয়েই পর্দায় আসেন। যদিও এইসব প্রতিযোগিতা থেকে আসা বেশিরভাগই প্রথমে চলচ্চিত্রে না এসে তারা টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেন। আর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রসঙ্গ উঠলে তারা ‘বাণিজ্যিক’, ‘অবাণিজ্যিক’, ‘এফডিসির চলচ্চিত্র’—এসব কথা বলে নাক সিটকানো ভাব দেখাতে থাকেন। কিন্তু তারা নিজেরাই যে একটা বাণিজ্যিক পণ্য হয়ে মোবাইল ফোনের এসএমএস-এর মাধ্যমে অভিনয়শিল্পী হয়েছেন, সেটা তারা উপলব্ধি করতেও পারে না! আবার এদের অনেকেই ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন কিন্তু সেটা দর্শক আদৌ চলচ্চিত্র হিশেবে গ্রহণ করে কিনা সেটাও তারা বোঝে না।


সবাই তো আর এহতেশাম-এর মতো পরিচালক ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না—যে চাইলেই নতুন নায়ক-নায়িকা হাজির করতে পারে।


৬.
বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীর হাল আমলের অবস্থা আরো নাজুক। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের কাহিনির গভীরতা না থাকায় নাচ-গান আর হিন্দি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্য থেকে নেওয়া কাহিনির অংশ দেখে অনেকে এখন অভিনয় করেন। এই সময়ে কাজী মারুফ, বাপ্পী চৌধুরী, মাহিয়া মাহি, নীরব, ইমন, আরেফিন শুভ, নিলয়, আনিসুর রহমান মিলন, সায়মন, শিপন, পরীমণি, ববি, আইরিন, প্রসূন আজাদ, অনন্ত জলিল, বর্ষা বাংলা চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করছেন। এদের অনেকেই আবার টেলিভিশন নাটকে কাজ করেছেন। ফলে এদের অনেকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে টেলিভিশন নাটকের সঙ্গে অভিনয়ের পার্থক্যটা ঠিক গুলিয়ে ফেলেন। আবার অনেকে অতি অভিনয় করতে গিয়ে সেটা যাত্রার ঢঙে ফেলে দেন। তখন সেটা না হয় চলচ্চিত্রের অভিনয়, না হয় নাটক কিংবা যাত্রা-অভিনয়।

এটা যেমন একটা সংকট, তেমনি চলচ্চিত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ব্যাপারটা একটা সংকট। আর যে কারণে ছোটপর্দায় অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত কুশীলবদের সঙ্গে বড়োপর্দার কুশীলবদের একটা পার্থক্য দেখা যায়। হয়তোবা এই প্রেক্ষাপটও বাংলা চলচ্চিত্রের দুরবস্থার জন্য একটা কারণ। আর এই কারণে ছোটপর্দার শিক্ষিত অভিনেত্রীরা কিংবা মধ্যবিত্ত দর্শকরা ঢাকাই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নাম শুনলে নাক সিটকায়। যদিও বড়োপর্দার সব কুশীলবের ক্ষেত্রে এই সংকটের কথা খাটে না।

যা-হোক অন্য আরেকটি সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে চলচ্চিত্রে। চরিত্রাভিনেতা মানে মা-বাবা, চাচা, শিক্ষক চরিত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংকট। এক সময় রাজ্জাক, শাবানা, ববিতা, আলমগীরকে এসব ভূমিকায় দেখা গেছে। আরো পরে এসব চরিত্রে কাজ করেছেন আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা, আবুল হায়াৎ, শওকত আকবর, প্রবীর মিত্র, ডলি জহুর, খালেদা আক্তার কল্পনা প্রমুখ। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এদের অনেকের মৃত্যু এবং চলচ্চিত্রে নিষ্ক্রিয়তার কারণে এসব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যে ধরনের অভিনেতা-অভিনেত্রী দরকার তা আর পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে কিছু কিছু চলচ্চিত্রে আলীরাজ, কাজী হায়াৎকে দেখা যাচ্ছে বাবা চরিত্রে। কিন্তু সেটা মোটেও প্রতুল নয়।

এর চেয়েও আরো ভয়াবহ সংকট হচ্ছে খল চরিত্রের অভিনতো-অভিনেত্রীর অভাব। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম খল অভিনেতাদের মধ্যে ছিলেন রাজীব, আহমেদ শরীফ, এটিএম শামসুজ্জামান, জাম্বু, খলিল, মিজু আহমেদ, নাসির খান ও হুমায়ুন ফরীদি। রাজীব, জাম্বু, নাসির খান, খলিলের মৃত্যু, হুমায়ুন ফরীদির নিষ্ক্রিয়তা অতঃপর মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রের খল অভিনেতার সংকট তীব্র করে। খল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যে ভয়াবহ দাপট আর বীভৎসতা নিয়ে তারা পর্দায় হাজির হতেন, পরে তেমন আর পাওয়া যায় নি।

বর্তমানে মিশা সওদাগর, রকি, শিবা সানু ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করছেন ঠিকই, কিন্তু তা ছকে বাধা অভিনয়ের বাইরে গিয়ে অনেকক্ষেত্রেই শিল্পিত রূপটা পায় নি। আবার, আহমেদ শরীফ, মিজু আহমেদ, সাদেক বাচ্চু এরা বয়স অনুযায়ী চরিত্র না পাওয়া ও অন্যান্য নানা কারণে চলচ্চিত্রে কাজ কমিয়ে দিয়েছেন। এই রকম একটা সময়ে ডিপজল তার ‘ভয়ঙ্কর’ চেহারা নিয়ে হাজির হন ‘তেজী’তে। অনেকদিন পর দর্শকেরা রাজীব, হুমাযূন ফরীদির পর কোনো ভিলেনকে গ্রহণ করে। তবে ডিপজল যখন ভিলেন হিশেবে তুঙ্গে, তখন বাংলা চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’ ও কাটপিসের সময় চলছিল। ফলে ডিপজল অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোতে‘অশ্লীলতা’ দেখা যায়। রাজীব কিংবা হুমায়ুন ফরীদি যে জায়গাটায় মুক্ত, ডিপজল সেখানে অভিযুক্ত হন।

‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে একদিকে রওশন জামিল আর অন্যদিকে সবাই। এই খল অভিনয় করে তিনি পুরো চলচ্চিত্রে নিজের দাপট বিস্তার করেন। তবে পরবর্তীকালে তাকে সেভাবে আর খল চরিত্রে না দেখা গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রে মায়া হাজারিকা, রীনা খানকে খল চরিত্রে দেখা যায়। বিশেষ করে দজ্জাল শাশুড়ি, ননদ এসব চরিত্রে এরা অতুলনীয় অভিনয় করেন। বর্তমানে এইসব খল নারী চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেত্রীরও সংকট রয়েছে। একইসঙ্গে বলা যায়, বর্তমানে নির্মিত চলচ্চিত্রে এমন চরিত্রও তৈরি হচ্ছে না। নায়ক-নায়িকা সর্বস্ব কাহিনিহীন চলচ্চিত্রে এইসব চরিত্র রাখা হচ্ছে না।

বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনেতার কথা বললেই সাইফুদ্দিন, হাসমত, রবিউল, টেলি সামাদ, দিলদার এদের নাম চলে আসে। এদের মধ্যে শুধু টেলি সামাদই জীবিত। ফলে চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনেতারও অভাব রয়েছে। বিনা কারণে মানুষ হাসাতে গেলে অভিনেতার মধ্যে রসবোধের উপস্থিতি থাকা দরকার। ‘পালাবি কোথায়’ চলচ্চিত্রে খলনায়ক হুমায়ুন ফরীদির হাস্যরসাত্মক অভিনয় মনে রাখার মতো।

৭.
অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই চলচ্চিত্রের প্রাণ। চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য ভালো হলেও যদি অভিনেতা-অভিনেত্রী ভালো অভিনয় না করে তাহলে তা দর্শকনন্দিত হয় না। চলচ্চিত্রের কাহিনি বাস্তবধর্মী, ফ্যান্টাসি, রোমান্টিক যাই হোক না কেন, যদি কলাকুশলীরা অভিনয় করে তা ফুটিয়ে তুলতে না পারে তাহলে চলচ্চিত্র এক অর্থে ব্যর্থ হয়। আরেকটি কথা মনে রাখা জরুরি, চলচ্চিত্র শুধু নায়ক আর নায়িকা এই দুই চরিত্র ঘিরেই হয় না। অনেকগুলো চরিত্র একটা ঐকতান সৃষ্টি করতে পারলেই তা সফল চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। তাই পর্দায় চরিত্রের স্থায়ীকাল স্বল্প হলেও এর সঙ্গে মিশে যাওয়াই গুণী কুশীলবের কাজ। আর এই জায়গাটাতেই বাংলা চলচ্চিত্র সংকটে পড়েছে।

চরিত্রানুযায়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী না পেয়ে যাকে খুশি তাকে দিয়ে চরিত্র রূপায়ন এবং গ্ল্যামার সর্বস্ব নায়ক-নায়িকা হাজির করে চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও তা শিল্পী সংকটের দুরবস্থাকেই হাজির করে। বিভিন্ন রিয়েলিটি শো-র মধ্য দিয়ে নায়ক-নায়িকা হয়ে যারা চিত্রজগতে আসেন তারা নায়ক-নায়িকা তকমা পান ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিনয়শিল্পী হয়ে উঠেন না। ফলে গ্ল্যামার দিয়ে নির্দিষ্ট একটা সময় চললেও যখন তা শেষ হয়ে যায়, তখন অন্য কোনো চরিত্রে অভিনয় করা আর তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। অভিনয়ের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের প্রবৃত্তি না থাকায় যখন তখন নায়ক-নায়িকা হাজির করে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করার জন্য পরিচালক এবং প্রযোজক উভয়ই দায়ী। সবাই তো আর এহতেশাম-এর মতো পরিচালক ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না—যে চাইলেই নতুন নায়ক-নায়িকা হাজির করতে পারে।

 


তথ্যসূত্র :

১. ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ১৫); নাট্যতত্ত্ব মীমাংসা; করুণা প্রকাশনী, কলকাতা।
২. প্রাগুক্ত; ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ১৬)।
৩. প্রাগুক্ত; ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ৩৫)।
৪. প্রাগুক্ত; ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ৩৭)।
৫. প্রাগুক্ত; ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ৩৮)।
৬. প্রাগুক্ত; ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ৩৯)।
৭. প্রাগুক্ত; ড. ভট্টাচার্য, সাধনকুমার (১৯৯৪ : ৪৮)।
৮. হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ১); বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস; বাংলাদেশ চলচ্চিত্রউন্নয়ন কর্পোরেশন, তেজগাঁও, ঢাকা।
৯. প্রাগুক্ত; হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ৫)।
১০.  প্রাগুক্ত; হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ৫)।
১১.  প্রাগুক্ত; হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ২২)।
১২. প্রাগুক্ত; হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ৪৪)।
১৩.  প্রাগুক্ত; হায়াৎ, অনুপম (১৯৮৭ : ৬৩)।
১৪. ‘মুখ ও মুখোশের তিন মুখ’; প্রথম আলো; ১৩ আগস্ট ২০০৯।
১৫. ‘ইতিহাসের নায়কের প্রস্থান’; কালের কন্ঠ; ১ আগস্ট ২০১১।
১৬. ‘ভালো নেই অঞ্জু ঘোষ’; বাংলাদেশ প্রতিদিন; ২২ এপ্রিল ২০১৫।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই :
জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj