হোম চলচ্চিত্র কার্ল থিওডর ড্রায়ার : ডেনিশ সিনেমার আদিগুরু

কার্ল থিওডর ড্রায়ার : ডেনিশ সিনেমার আদিগুরু

কার্ল থিওডর ড্রায়ার : ডেনিশ সিনেমার আদিগুরু
225
0

কার্ল থিওডর ড্রায়ারের [৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৯-২০ মার্চ ১৯৬৮] ধোঁয়াশা ঘেরা ও ব্যক্তিগতভাবে খুঁজে বেড়ানো শৈশবের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ডেনিশ রেজিস্ট্রি অফিসে, কার্ল নিয়েলসেন—ভদ্রস্থ নামটি ধারণ করার মধ্য দিয়ে। নবজাতক এই শিশুটি ইয়োসেফিন বের্নহার্ডিন নিলসন নামের এক অবিবাহিতা সুইডিশ গৃহপরিচারিকার সন্তান—যে নারীকে এই শিশুটি জন্মানোর মাত্র কয়েকদিন আগে কোপেনহেগেনের একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাসায় রহস্যময়ভাবে জায়গা দিয়েছিলেন মেয়েটির চাকরিদাতা, কার্লস্রো অঞ্চলের ভূপতি ও ঘোড়া-খামারি জেন্স ক্রিশ্চিয়ান টর্প। দুই বছর বয়স পর্যন্ত, স্থায়ী আশ্রয় পাওয়ার আগে, দুটি বাড়িতে লালিত-পালিত হতে থাকেন শিশু নিয়েলসেন। অবশেষে ডেনিশ লুথারান টাইপোগ্রাফার কার্ল থিওডর ড্রায়ার ও তার স্ত্রী ইঙ্গার মারির সংসারে জায়গা পান তিনি। দত্তক বাবার হুবহু নামেই নতুন নামকরণ করা হয় শিশু নিয়েলসেনের; অর্থাৎ, হয়ে যান—কার্ল থিওডর ড্রায়ার। অবশ্য, এই দত্তক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগে, অবিবাহিতা নিলসন আবারও অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেলে, গর্ভপাত প্রক্রিয়ায় ভুলক্রমে ফসফরাসের মারাত্মক ওভার ডোজ গ্রহণের কারণে মারা যান। সুতরাং, শিশু কার্লকে দত্তক নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ সম্মানী নিলসনকে দেওয়ার কথা ছিল, তা কখনোই যথাযথভাবে শোধ করতে পারে নি ড্রায়ার-পরিবার। যদিও নিজের জন্ম পরিচয় ঘিরে থাকা পরিবেশ-পরিস্থিতির আসল রহস্য আবিষ্কার ঠিক কখন করতে পেরেছিলেন ড্রায়ার—তা নিশ্চিত করে বলা যায় না; কেননা, এই সত্যের লক্ষণ এই ভদ্র, বিনম্র ও শ্রদ্ধাভাজন ফিল্মমেকারের জীবনে অমোচনীয় চিহ্ন হিশেবে যে গভীর দাগ টেনে দিয়েছিল, সেটিকে তিনি একান্ত নিজের ভেতরই গোপন রেখে গেছেন। জনসমক্ষে ও সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের প্রভাব ও পিতৃমাতৃক প্রসঙ্গ বরাবরই এড়িয়ে গেছেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একজন সহজাত মেধাবী ছাত্র ড্রায়ার নিজের বেসিক স্কুল কোর্স সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করার পর, ১৯০৬ সালে দত্তক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। সাংবাদিকতার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও সহজাত প্রতিভা আবিষ্কার করার আগে, একে একে বেশ কয়েকটি দাপ্তরিক চাকরিতে যোগ দেওয়া ও কিছুদিন যেতেই তা আবার ছেড়ে দেওয়া—এমনটা চলতে থাকে তার জীবনে। ‘বার্লিংস্ক টিন্ডেন্ড’ [ইংরেজিতে বার্লিন’স টাইমস; ডেনমার্কের সবচেয়ে পুরনো দৈনিক পত্রিকা] ও ‘পলিটিকেন’সহ [দেশটির দ্বিতীয় প্রাচীনতম দৈনিক পত্রিকা] বেশকিছু প্রভাবশালী সংবাদপত্রে রিপোর্টার হিশেবে কাজ করার পর, ১৯১০ সালে, ২১ বছর বয়সে যোগ দেন একদল তরুণ ও আদর্শবাদী রিপোর্টারের প্রতিষ্ঠা করা, স্বল্পায়ুর সংবাদপত্র ‘রিগেট’-এ।


প্রথম সিনেমায়, ন্যারেটিভ মেরিটের চেয়ে বরং লজিস্টিক্যাল উপযোগিতার বিচারে নির্বাচিত একটি নগণ্য মেলোড্রামাকে বেছে নেন ড্রায়ার।


Day of Wrath
‘ডে অব রাথ’ ছবির একটি দৃশ্য

ড্রায়ারের আভিযাত্রিক মানস তাকে সম্ভাবনাময় অ্যাভিয়েশন সমাজের প্রথম সারিতে জায়গা এনে দেয়। এ সেক্টর নিয়ে অনবদ্য ও টেকনিক্যালি সুসম্পন্ন আর্টিক্যাল লেখার কারণে নরডিস্ক ফিল্ম কোম্পানির কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি, এবং সেখানে একজন হট-এয়ার বেলুন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার হিশেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘রিগেট’ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে, পলিটিকেন-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান—’এক্সট্রা ব্লাডেট’ নামের ট্যাবলয়েড পত্রিকাতে চাকরি পান ড্রায়ার। এখানে কাজ করার সূত্রে সদ্য গড়ে উঠতে থাকা ডেনিশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে দিনে দিনে যোগাযোগ বাড়তে থাকে তার। ১৯১৩ সালে নরডিস্ক ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে একটি বড় ধরনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করার আগে, টাইটেলিং ও ফিল্ম স্ক্রিপ্টরাইটিংয়ের কাজ অকেশনালি করতে থাকেন তিনি। এর দুই বছর পর, ড্রায়ার হয়ে ওঠেন নরডিস্কের একজন ফুল-টাইম চাকরিজীবী। এখানে ফিল্ম এডিটিং অন্তর্ভুক্ত করা পর্যন্ত দায়িত্ব বাড়ে তার [এ ক্ষেত্রে তিনি তার অভিনব ও অবিস্মরণীয় দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন], এবং নরডিস্কের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর উইলহেল্ম স্টেরের উৎসাহ ও অভিভাবকত্বে ড্রায়ার ফিল্ম ডিরেকশনের প্রতি মনোনিবেশ করেন।

প্রথম সিনেমায়, ন্যারেটিভ মেরিটের চেয়ে বরং লজিস্টিক্যাল উপযোগিতার বিচারে নির্বাচিত একটি নগণ্য মেলোড্রামাকে বেছে নেন ড্রায়ার। ফিল্মের নাম, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট’। নরডিস্কে কর্মরত স্ট্যুডিও অ্যাক্টরদের বদলে বরং নিজের আর্টিস্টিক প্রজ্ঞাকে অনুসরণ করে, যে চরিত্রগুলোতে তারা অভিনয় করবেন—তাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি ও মনস্তাত্ত্বিক অবয়বকে গুরুত্ব দিয়ে, পেশাদার ও অপেশাদার অভিনেতাদের বেছে নেন ড্রায়ার নিজেই। নিজের সিনেমাগুলোতে ‘নরমালিটি’ ও ‘রিয়েলিজম’কে অর্জন করার প্রচেষ্টায়, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই, কসমেটিকস ও অরনেটলি ডেকোরেটেড সেটের আর্টিফিসিয়ালিটিকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সজাগ ছিলেন তিনি।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট’-এর সাবজেক্ট ম্যাটারটি ড্রায়ারের সঙ্গে ব্যক্তিভাবে সম্পর্কযুক্ত : বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া এক শিশুর প্রতি শিশুটির বায়োলজিক্যাল বাবা-মার নৈতিক দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ এটি। ফিল্মটিতে নিজের সদ্যপ্রসূত সন্তানের হত্যাকারী হিশেবে অভিযুক্ত হয়ে আদালতে বিচারের মুখোমুখি হওয়া, অবৈধ সম্পর্কে জড়ানো গভার্নেস ভিক্টোরিনকে [অল্গা রাফায়েল-লিন্ডেন অভিনীত] তার নিয়তির ব্যাপারে রায় জানাতে বাধ্য হয় তারই সুপ্রতিষ্ঠিত ও শ্রদ্ধাভাজন বিচারক পিতা [হালভার্ড হফ অভিনীত]। পরিহাসের ব্যাপার [তা সম্ভবত ইচ্ছেকৃতভাবেই] হলো, নিজেরই পাপিষ্ঠ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন চাকরিদাতার প্রলোভনের শিকার যে ভিক্টোরিনের মতো একজন ভদ্রমহিলা হয়েছে—সেটি ড্রায়ারের পিতৃবংশের একটি তীর্যক যুক্তিসঙ্গত তত্ত্বকে জাহির করে।


ড্রায়ার ও তার নায়িকারা


The Passion of Joan of Arc 4
‘দ্য প্যাশন অব জোয়ান অব আর্ক’ ছবির একটি দৃশ্য

নিজের জন্মদাত্রী মা ইয়োসেফিনের অকালমৃত্যু এবং দত্তক মা ইঙ্গার মারির সঙ্গে আবেগিক দূরত্বই সম্ভবত ড্রায়ারকে অনমনীয়ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে তার সিনেমায় কঠোর ন্যায়পরায়ণ, আত্মবিসর্জনকারী ও নিপীড়িত নারীর উন্নততর আদর্শ [এবং আদর্শবাদী] বৈশিষ্ট্যকে তৈরি করতে। এমনকি যে সিনেমাটি নির্মাণের পর থেকে তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় থিমগত আর্ট সিনেমার ডিরেক্টর হিশেবে অবিরাম ও বিভ্রান্তিকরভাবে ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়ে থাকে, সেই ‘দ্য প্যাশন অব জোয়ান অব আর্ক’ নির্মাণের আগে থেকেই, তার প্রথমদিকের সিনেমাগুলোতেও নারীর সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তার চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় : বিদ্রূপাত্মক সোশ্যাল কমেডি “দ্য পারসন’স উইডো”তে একঘেয়ে জীবনচক্রকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ডেম মার্গারেটেরে [হিলডুর কার্লবার্গ অভিনীত] মেনে নেওয়া; “লিভস ফ্রম সাটান’স বুক”-এর ফিনিশ বিপ্লব এপিসোডে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন প্রণোদনার প্রতি সিরির [ক্লারা পন্টোপিডান অভিনীত] দেওয়া ট্রাজিক রেসপন্স; বাণিজ্যিক সাফল্য পাওয়া ডোমেস্টিক স্যাটায়ার ফিল্ম ‘মাস্টার অব দ্য হাউস’-এ স্বামীর নিষ্ঠুরতার প্রতি ইডা ফ্রেন্ডসেনের [অ্যাসট্রিড হোম অভিনীত] সক্ষম ও আত্মরক্ষামূলক উপস্থিত বুদ্ধির হাজিরা। যদিও ‘মাস্টার অব দ্য হাউস’কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি পুরুষবাদী ফিল্মের উদাহরণ হিশেবে ধরা হয়ে থাকে; তবে এখানে নিজের স্ত্রী ইডা, নিজের গভার্নেস বা গৃহপরিচারিকা ম্যাডস [ম্যাথিলডে নিয়েলসেন অভিনীত] ও নিজের কিশোরী কন্যা ক্যারেন [কারিন নেলিমোসে অভিনীত]—নিজ জীবনের এই তিন নারীর প্রভাবে নিন্দনীয় স্বামী ভিক্টর [ইয়োহেনেস  মায়ার অভিনীত] যে প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বিনম্র ও কুসংস্কারমুক্ত হয়ে উঠেছে—তা সিনেমাটিতে ঘটিয়েছে ড্রামা ও হিউমারের প্রবাহ। ‘দ্য প্রেসিডেন্ট’কে একজন পুরুষ মুখ্যচরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো হলেও সেটির কেন্দ্রস্থলে ছিল অপরাধীকন্যা ভিক্টোরিনের দুরাবস্থা। আসলে, নারীর যন্ত্রণাভোগ ও নিপীড়িত হওয়ার প্রতি ড্রায়ারের দুঃখবোধ ও সহজাত মনোযোগের ছাপ তার ক্যারিয়ার জুড়েই পড়তে দেখা যায় : ‘দ্য প্যাশন অব জোয়ান অব আর্ক’-এ জোয়ানের মর্মান্তিক বিচার; ‘ডে অব রাথ’-এ আনের আবেগ-বর্জিত দাম্পত্যজীবন; এবং ‘গার্টরুড’-এ আদর্শ ভালোবাসার প্রতি গার্টরুডের দুর্বোধ্য অনুসন্ধান।


জনৈক ধর্মান্ধ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে প্রেমের কারণে নিজের বাবা যার উপর ক্ষুব্ধ।


ড্রায়ারের ফেমিনিন আদর্শের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ সম্ভবত অক্ষয় দৃঢ়তা ও অসাধ্য আদর্শবাদের জোয়ান কিংবা গার্টরুড নয়; বরং ‘ওর‍্যাথ’-এ দেখা মেলা বোর্গেন পরিবারে ইঙ্গার [বির্গিট ফিডারস্পিল অভিনীত] চরিত্রটি—যে কিনা মাতৃত্বমূলক অথচ আবেদন-জাগানিয়া; মরমী অথচ বাস্তববোধসম্পন্ন; ব্যক্তিগত বিশ্বাসে অটল, অথচ মিশুক ও সহিষ্ণু। নিজের শুভ নীতিবোধের মধ্যে আদর্শগত ও আবেগাত্মক বিভক্তিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তার বাস্তবধর্মীতা, আধ্যাত্মিকতা ও উষ্ণ পরিচর্যা পরিবারটিকে একসঙ্গে গেঁথে রেখেছে ঠিকই, অথচ তাকে ঘিরে থাকা পুরুষদের দিকে তাকালে দেখা যায় স্বামী মিকেল [এমিল হ্যাস ক্রাইশ্চেনসেন অভিনীত] একজন অ্যাগনোস্টিক বা অজ্ঞেয়বাদী; মিকেলের ভাই ইয়োহানেস [প্রেবেন লারডর্ফ রি অভিনীত]—যে কিনা থিওলজির ছাত্র, যে কিনা ভয়ানক মানসিক রোগে ভুগছে, সে বিশ্বাস করে—সে নিজেই যিশু; ইঙ্গারের নির্দয় ও ধার্মিক শ্বশুর মর্টেন [হেনরিক ম্যালবার্গ অভিনীত]—যে কিনা নিজের ছেলেদের অবক্ষয় ও ভ্রান্তবিশ্বাসের প্রতি ভীতশ্রদ্ধ; এবং মর্টেনের ছোট ছেলে অ্যান্ডার্স [কে ক্রিস্টিয়ানসেন অভিনীত]—জনৈক ধর্মান্ধ পরিবারের মেয়ের সঙ্গে প্রেমের কারণে নিজের বাবা যার উপর ক্ষুব্ধ।


রিয়েলাইজড মিস্টিসিজম বা উপলব্ধ মরমিবাদ


ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথের শৈল্পিক ও মহাকাব্যিক সিনেমা ‘বার্থ অব অ্যা নেশন’ [১৯১৫] ও ‘ইনটলারেন্স’ [১৯১৬] থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, ম্যারি কোরেলির ‘দ্য স্যরোজ অব সাটান’ উপন্যাস অবলম্বনে, লার্জ-স্কেলের প্রোডাকশন “লিভস ফ্রম সাটান’স বুক” নির্মাণ করেন ড্রায়ার। ‘ইনটলারেন্স’-এর মতোই স্ট্রাকচার ও থিমেটিক প্রেজেন্টেশন জাহির করা এই সিনেমা ধারণ করে আছে চারটি ঐতিহাসিক ঘটনার বিধ্বংসী ঘটনাক্রম : যিশু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়া, স্প্যানিশ ইঙ্কুইসিশন বা ধর্মীয় বিচারালয়, ফরাসি বিপ্লব, এবং রুশ-ফিনিশ যুদ্ধ [এই অংশটি ড্রায়ারের নিজের সংযুক্ত করা; কোরেলির উপন্যাসটিতে এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না]। সমালোচক মহলের বিরাগভাজন হওয়ার ফলশ্রুতিতে, ক্রুশবিদ্ধের এপিসোডটির আপসকামী পরিসমাপ্তির অসন্তুষ্টি নিয়ে, আপাদমস্তক নিখুঁতচারী ড্রায়ার, নাজারেথের যিশুর জীবনকে রি-শুট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন; আর সেটি ‘জিসাস ফিল্ম’ নামে পরিচিত, কখনোই মুক্তি না পাওয়া এপিসোডটির প্রতি ড্রায়ারের আচ্ছন্নতার জন্য সুপরিচিত হয়ে আছে। এ কথা উল্লেখ করা জরুরি, “লিভস ফ্রম সাটান’স বুক” শিরোনামটিতে ক্রুদ্ধ ও ধর্মীয় ইনফারেন্স বা অনুমিতির উপস্থিতি সত্ত্বেও, এটি অনিবার্যভাবে একটি ঐতিহাসিক সিনেমা—যেখানে অনুসন্ধান করা হয়েছে মানবিক বিষয়-আশয়ের উপস্থিতি ও পরিচিতিকে।

Gertrud af Carl Th. Dreyer. Palladium, DK, 1964. På billedet ses Ebbe Rode og Nina Pens Rode.
‘গার্টরুড’ ছবির দৃশ্য

ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে সিনেমায় পুনর্সৃষ্টি করার প্রতি ড্রায়ারের আগ্রহ, নিঃসন্দেহে সাংবাদিক হিশেবে তার পুরনো ক্যারিয়ারেরই একটি ফলশ্রুতি; যা কিনা ‘মাস্টার অব দ্য হাউস’-এর বাণিজ্যিক সাফল্যের পর একজন ‘ধর্মীয় ফিল্মমেকার’ হিশেবে তার খ্যাতি চিরস্থায়ী করে দেয়। এর ফলে ড্রায়ারের কাছে ফ্রান্সের প্রোডাকশন কোম্পানি স্যোসিয়েত জেনারেল দো ফিল্মস প্রস্তাব নিয়ে আসে কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণের; আর ক্যাথরিন দ্যু মিদিসিস ও মারি আঁতোনেতের [যিনি কিনা “লিভস ফ্রম সাটান’স বুক”-এর কল্যাণে হয়ে উঠেছিলেন যিশুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব] তুলনায় বরং জোয়ান-অব-আর্ক হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্যারিয়ারের প্রথম পর্যায়ের সিনেমাগুলোতে ড্রায়ারের বেসিক কৌতূহল ছিল মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগকে ধারণ করা। জোয়ানের [রেনি মারি ফালকোনেতি অভিনীত] ট্রাজিক ও আপসহীন চূড়ান্ত আত্মবিসর্জনের সহজাত ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকভাবে অত্যুৎকৃষ্ট বর্ণনার সঙ্গে মনুষ্য আবেগেরও যে রূপান্তর ড্রায়ার ঘটিয়েছেন, তাতে একটি ধর্মান্ধ সমাজে নারীর উপর নির্বিচার উৎপীড়নের একটি সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক ও ভৌতিক প্রতিফলনও ঘটেছে ‘দ্য প্যাশন অব জোয়ান অব আর্ক’-এ।


কাহিনি-বিন্যাস ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার গুণকে অনুসন্ধান করেছেন ড্রায়ার


Vampyr 3
‘ভ্যাম্পায়ার’ ছবির দৃশ্য

তাছাড়া, বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে ফিল্মটিকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে, জোয়ানের অবদমিত পারিপার্শ্বিকতা ও অপরিহার্য নিয়তি নিখুঁতভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে এই সিনেমায়। জোয়ানের মানসিক অগ্নিপরীক্ষার শারীরিক প্রতিবিম্বের প্রতিরূপের উপর মনোযোগ দিয়ে, ‘সেন্ট’ বা ‘দেবদূত’ জোয়ানের দুর্লভ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ধার্মিকতাকে ‘মানুষ’ জোয়ানের যাতনা ও দুর্ভোগের প্রতি পরদুঃখকাতরতার সহজবোধ্য পরিভাষায় অনূদিত করার মাধ্যমে, মেটাফিজিক্যাল ও ফিজিক্যালের মধ্যে সেই সহাবস্থান ও প্রতীকী সম্পর্ককে ড্রায়ার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন—যেটিকে তিনি ‘রিয়েলাইজড মিস্টিসিজম’ হিশেবে অভিহিত করতেন।

একই রকম পর্যবেক্ষণ থেকে, ‘ওর‍্যাথ’কে যদি আপাদমস্তকই ধর্মবিশ্বাসের একটি বিশুদ্ধতম সাক্ষ্য হিশেবে অভিহিত করা হয়, অবিশ্বাসী মিকেল ও বিশ্বাসভাজন ইঙ্গারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কটির বর্ণনায় তাহলে সহজাত কারনালিটি বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা হিশেবে কিভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব? ক্যা মুঙ্কের যে মঞ্চনাটক অবলম্বনে এ সিনেমা বানানো হয়েছে, সেটির গভীরতর ধর্মীয় সাবটেক্স থেকে আলাদা করে, ড্রায়ারের ‘ওর‍্যাথ’ হয়ে উঠেছে মানব অস্তিত্বের স্বভাবচরিত্রের প্রতি এই ফিল্মমেকারের বাস্তবিক মনোভাবের সুপরিকল্পিত ও সংবেদনশীল এক প্রতিফলন [বিশেষ করে ইঙ্গারের প্রসবকালীন নিবিড় ও দীর্ঘায়িত দৃশ্যটিতে এর প্রমাণ বিদ্যমান]। অনুরক্ত অথচ আধামনা জোহানেসের জায়গায় পৃষ্ঠপোষক ও বাস্তববাদী ইঙ্গারের চরিত্রায়নের মাধ্যমে শরীর ও আত্মার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও ব্যক্তিগত সামঞ্জস্যের প্রয়োজনীয়তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন ড্রায়ার। এক কথায় বললে, কাহিনি-বিন্যাস ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার [জিসাস অব নাজারেথ, জোয়ান অব আর্ক, ইঙ্গার বোর্গেন] গুণকে অনুসন্ধান করেছেন ড্রায়ার—আর তা করেছেন দৈহিকতার ভেতর সম্পৃক্ত করে।


সাইকোলজিক্যাল রিয়ালিজম


ধর্মীয় সিনেমার নির্মাতা হিশেবে নিজের পরিচিতিকে দূরীভূত করতে, ‘ভ্যাম্পায়ার’-এর বিস্ময়কর রকমের আবহ ও অপার্থিব ল্যান্ডস্কেপ সম্ভবত ড্রায়ারের আত্মিক ব্রহ্মাণ্ডের কোনো আমূল ব্যতিক্রম হিশেবে ধরা দেয় নি; বরং হয়ে উঠেছে নিরীক্ষার প্রতি তার স্বভাবসিদ্ধ ঝোঁকের একটি প্রতিফলন। তিনি যখন ফ্রান্সে বসবাস করছিলেন, সে সময়েই দেশটিতে বিস্তার ঘটতে থাকা পরাবাস্তববাদী শিল্প-আন্দোলনের আংশিক প্রভাবিত হয়ে, এবং একজন ‘সাধু ফিল্মমেকার’ হিশেবে যে দাগ নিজের নামের সঙ্গে সেঁটে গিয়েছিল—সেটি থেকে পুরোদস্তুর পালাতে, দূরবর্তী, বহুখণ্ডিত, নিরাবেগ, আবেগবর্জিত বৈশিষ্ট্যের ‘দ্য প্যাশন অব জোয়ান অব আর্ক’-এর একটি এন্টিথিসিস—’ভ্যাম্পায়ার’ বানানো প্রয়োজন ছিলই ড্রায়ারের। তবু, বিদেশে সৃষ্টিশীলতা ও শৈল্পিকতার জন্য সুনাম অর্জন করা সত্ত্বেও, বাণিজ্যিক বিচারে ব্যর্থ হয় ‘ভ্যাম্পায়ার’, এবং তার প্যারিসভিত্তিক প্রোডাকশন কোম্পানি ‘ফিল্ম প্রোডাকশন-কার্ল ড্রায়ার’-এর আয়ু স্বল্প সময়েই ফুরিয়ে আসা তরান্বিত করে। এই ফিল্মটি ড্রায়ারের ক্ষেত্রে মোহমুক্তি ও ব্যক্তিগত সংকটের কাল হিশেবে চিহ্নিত হয়ে আছে—যা কিনা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। এরপর, ১৯৪০ সালের আগে আর ফিল্মমেকিংয়ে ফিরতে পারেন নি ড্রায়ার। অতঃপর ‘গুড মাদারস’ নামে একটি শর্টফিল্ম নির্মাণ করেন তিনি। তারপর কাজ শুরু করেন হান্স ওয়েইয়ের্স-জেনসেনের মঞ্চনাটক আন্না পেদার্সদোতে অবলম্বনে, ‘ডে অব রাথ’ শিরোনামে সিনেমার—যেখানে অবদমন, ধর্মীয় ভণ্ডামি ও ধর্মান্ধতার বিষয়-আশয়কে প্রকাশ করেছেন এই ফিল্মমেকার।


ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী ড্রায়ার ১৯৬০ দশক জুড়ে আইডিয়া ডেভেলপমেন্ট অব্যাহত রাখেন


১৯৫০ সালের ২৩ অক্টোবর, ‘নিউ পার্সপেক্টিভস অন দ্য আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স’-এর জন্য দেওয়া এক রেডিও সাক্ষাৎকারে, ‘দ্য প্যাশন অব জোয়ান অব আর্ক’-এ ক্লজট্রোফোবিক বা আবদ্ধতাজনিত উদ্বিগ্নতার স্থায়ীত্বের জন্য নিজের সৃষ্টিশীল খুঁত-ত্রুটি এবং রিয়ালিজমের দোহাইয়ে তার যত্নবান অনুরাগের প্যারাডক্স সংক্রান্ত সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে অনুভূতির অকৃত্রিমতা ও অনুষঙ্গের অকৃত্রিমতার মধ্যে একটা সামঞ্জস্য নিশ্চয়ই রয়েছে’। ‘নিখাদ’ বাস্তবতাকে ক্যাপচার করার মাধ্যম নয়, বরং ‘উপলব্ধ’ বাস্তবতাকে সুস্পষ্ট করার এক তাৎপর্য হিশেবে সিনেমার ভূমিকাকে চিহ্নিত করা ড্রায়ার, ভ্যাম্পায়ার হিশেবে অ্যালান গ্রের [জুলিয়ান ওয়েস্ট অভিনীত] অবচেতন সত্যের অদ্ভুত পরাবাস্তববাদকে শুধু সামঞ্জস্যপূর্ণ করেন নি, বরং আন্নার সম্ভাব্যতাকে গ্রহণ করেছেন ‘ডে অব রাথ’-এ অতিপ্রাকৃতকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে, ‘ওর‍্যাথ’-এ অলৌকিকতার অস্তিত্ব, এবং ‘গার্টরুড’-এ গার্টরুডের [নিনা পেন্স রোদ অভিনীত] বৈষয়িক ও আত্মিক অস্তিত্বকে রিট্রিট করেছেন একটি উপলব্ধি-ঊর্ধ্ব ও অপারেটিকেল সুবৃহত্তর আবেগাত্মক আদর্শে—চরিত্রগুলোর ‘সাইকোলজিক্যাল রিয়ালিটি’র কনটেক্সটের মধ্যে যুক্তিযুক্ত ও ‘ন্যাচারাল’ ফেনোমেনা করে তুলে। এক কথায় বললে, ডকুমেন্ট রিয়েলিটির অনুসন্ধান করেন নি ড্রায়ার; বরং সেটির ভেতরের সত্যের ক্ষণস্থায়ী ‘নির্যাস’কে ক্যামেরাবন্দি করে গেছেন।

quote-nothing-in-the-world-can-be-compared-to-the-human-face-it-is-a-land-one-can-never-tire-carl-theodor-dreyer-82-33-87
পরিচালক কার্ল থিওডর ড্রায়ার

১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, কোপেনহেগেনের সম্ভ্রান্ত ড্যাগমার থিয়েটার পরিচালনা করার একটি ব্যাপক আকাঙ্ক্ষিত ও মেধা-নির্ধারিত ম্যানেজমেন্ট লাইসেন্স লাভ করেন ড্রায়ার। ফিল্মমেকিংয়ের বাণিজ্যিক দিক এড়িয়ে, আর্থিক স্বাধীনতার অধিকার লাভ করে, ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী ড্রায়ার ১৯৬০ দশক জুড়ে আইডিয়া ডেভেলপমেন্ট অব্যাহত রাখেন; আর তাতে উইলিয়াম ফকনারের ‘অ্যাজ আই লে ডাইং’, ইউজেন ও’নিলের ‘মৌর্নিং বিকামস্ ইলেক্ট্রা’ ও ইউরিপিদিসের নাটক ‘মেদিয়া’র একটি ফিল্ম অ্যাডাপটেশনসহ, ড্রায়ারের করা এ সময়ের কাজগুলোতে নারীর মর্যাদা ও যৌগিক ভূমিকার প্রতি এই ফিল্মমেকারের মনোভাবের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। বলাবাহুল্য, শেষোক্ত কাজটির ডেভেলপমেন্ট পরবর্তী সময়ে করেছিলেন ড্রায়ারের ভক্ত ফিল্মমেকার লার্স ফন ত্রিয়া; ১৯৮৭ সালে, ডেনিশ টেলিভিশনের জন্য। অবশ্য, ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে ‘ওর‍্যাথ’ ও ‘গার্টরুড’—কেবল এই দুটি ফিচার ফিল্ম দিয়েই ড্রায়ারের আপসহীন আর্টিস্টিক পূর্ণতার রেজাল্টকে উপলব্ধি করা সম্ভব। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে, ইতোমধ্যে অসুস্থতায় কাবু হয়ে যাওয়া ড্রায়ার, পশ্চাদ্দেশের হাড় ভাঙা থেকে আরোগ্যলাভ করার পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। সে বছরেরই ২০ মার্চ সকালে মৃত্যুবরণ করা এই মানুষটি চিরঘুমে শায়িত আছেন ফ্রেডেরিকসবার্গ সিমেটারিতে।


সূত্র :  

সেন্সেস অব সিনেমা। ফিল্ম জার্নাল। অস্ট্রেলিয়া। সংখ্যা ২১। জুলাই ২০০২।

rudraarif@gmail.com'

রুদ্র আরিফ

জন্ম ২৭ জানুয়ারি, ১৯৮৪; এখলাছপুর, উত্তর মতলব, চাঁদপুর।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা [ঐতিহ্য, ২০০৯]
র‌্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্চপ [ভাষাচিত্র, ২০১২]
হাড়ের গ্যারেজ [চৈতন্য, ২০১৫]

সিনেমা (সম্পাদনা/ অনুবাদ)—
তারকোভস্কির ডায়েরি [ঐতিহ্য; ২০১০]
আন্তোনিওনির সিনে-জগৎ [ভাষাচিত্র, ২০১৩]
কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা [ভাষাচিত্র, ২০১৭]
ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার [ভাষাচিত্র, ২০১২]
ফিল্মমেকারের ভাষা : ইরান পর্ব [ঐতিহ্য, ২০০৯]
ফিল্মমেকারের ভাষা : লাতিন পর্ব [ঐতিহ্য, ২০১০]
ফিল্মমেকারের ভাষা : আফ্রিকা পর্ব [ঐতিহ্য, ২০১১]
ফিল্মমেকারের ভাষা : কোরিয়া পর্ব [ঐতিহ্য, ২০১৪]
সিনেঅলা [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
সিনেঅলা-২ [ভাষাচিত্র, ২০১৫]

মিউজিক (অনুবাদ)—
আমার জন লেনন (মূল : সিনথিয়া লেনন) [ভাষাচিত্র, ২০১৬]

সম্পাদনা—
অনলাইন ফিল্ম-জার্নাল : ফিল্মফ্রি [www.filmfree.org]

ই-মেইল : rudraarif@gmail.com
rudraarif@gmail.com'