হোম চলচ্চিত্র ইরানি চলচ্চিত্রের গুলিস্তানে

ইরানি চলচ্চিত্রের গুলিস্তানে

ইরানি চলচ্চিত্রের গুলিস্তানে
90
0

এই সময়ের ইরান বলতে রাজনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ একটা দেশের প্রতিচ্ছবি ভাসে। এই রাজনৈতিক অবরুদ্ধতায় যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ এইসব নামের সঙ্গে যুদ্ধের দামামা কিংবা হুংকারও মাঝে মঝে শোনা যায়। এইসব কর্মকাণ্ড দিয়ে ইরানকে পুরোপুরিভাবে পরিচিত করানো যাবে না। ইরান এক সমৃদ্ধ ইতিহাস পৃথিবীর বুকে লালন করে। পারস্য সভ্যতার এই ইতিহাসের সঙ্গে ধর্ম-শিল্প-সাহিত্য জড়িয়ে আছে। প্রাচীন ইরানীয় ধর্মগুরু জরথ্রুস্ট, সুফিবাদ এসব বিষয়-আশয় দিয়ে যেমন ইরানের ধর্ম আর দর্শনের একটা আবহ পাওয়া যায় তেমনি ফেরদৌসি, শেখ সাদী, রুমি, হাফিজ এই নামগুলো দিয়ে পাওয়া যায় পারস্য সাহিত্যের খোঁজ। ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য এসব ছাড়াও ইরানের চলচ্চিত্রের একটা নিজস্ব প্রেক্ষাপট আছে। তবে ইরানি চলচ্চিত্রের ইতিহাস খুব বেশি পুরানা নয় যেমনটা এর ধর্ম, দর্শন কিংবা সাহিত্যের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। তবুও ইরানের চলচ্চিত্রের নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এই নিজস্বতার দরুন ইরানি চলচ্চিত্র খুব দ্রুতই বিশ্বচলচ্চিত্র জগতে প্রভাব তৈরি করেছে। ইরানি চলচ্চিত্রের এই প্রভাবটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

২.
ইরানের চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে ধরার জন্য এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। তখন চোখ ফেরাতে হবে প্রায় এক শ বছর আগের ইরানের দিকে। সেই সময়ে মার্কিন মদদপুষ্ট শাসকেরা ইরানের সরকার ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে পার্লামেন্টারি ভোটাভুটিতে যখন রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতা পান ঠিক তখনই ইরানি চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। যদিও এই সময়টা ছিল ইরানি চলচ্চিত্রের জন্য একটা কঠিন সময়। কারণ মার্কিন মদদপুষ্ট পাহলভি সরকার সবসময় পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট ছিল ফলে বিদেশি চলচ্চিত্র খুব সহজে ইরানে প্রদর্শিত হতে থাকে। কিন্তু ইরানের দেশীয় চলচ্চিত্রকে নানারকম বিধিনিষেধ আর সেন্সরের যাতাকলে বন্দি রাখা হয়। এইরকম প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইরানের প্রথম নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আবি ও রাবি’ মুক্তি পায়। এর ঠিক তিন বছর পর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘লরের মেয়ে’ মুক্তি পায়। কিন্তু সময়টা ছিল ইরানের সংস্কৃতি অঙ্গনের ঔপনিবেশিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ কাল। ফলে হলিউডের আমদানি করা ওইসব সিনেমার কাছে ইরানের এই সিনেমাগুলো টিকতে পারে নি। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও সমানতালে পরিলক্ষিত হয়। ফলে এইসব প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ে।


ইরানে এক তরুণ নির্মাতার আবির্ভাব ঘটে যার নাম দারিউস মেহেরজুই। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মেহেরজুই নির্মাণ করেন ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি।


এইসময় পশ্চিমের আধুনিকতার ধরন ও মার্কিনিদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সুসম্পর্ক থাকায় ইরানের সব প্রেক্ষাগৃহ হলিউডের দখলে চলে যায়। শুধু হলিউড নয়, এ-সময় বলিউডের সিনেমাতেও ভরপুর হয়ে উঠে ইরানের প্রেক্ষাগৃহগুলো। ফলে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক জুড়ে ইরানের জনগণ দেখতে থাকে বাণিজ্যিক ধারার বস্তাপচা সব ছবি। তবে এ-সময় ইরানের পরিচালকরা যে-একেবারে বসে ছিল তা নয়, হলিউডি মারপিট আর বলিউডি নাচ-গানে ভরা ছবির অনুকরণে তারা নির্মাণ করে চলচ্চিত্রের বিশেষ এক ধরন ফিল্ম জাহেলি।১

এইসব ঘটনার মধ্যে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পরিচালক ফারুক জেফারি নির্মাণ করেন ‘সাউথ অব দ্য সিটি’। আর এই সময়ে ইতালির নিও-রিয়ালিজমকেন্দ্রিক সিনেমার প্রভাব পড়ে ইরানের মধ্যেও। আর তাতে ইরানি চলচ্চিত্রকারদের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায়ও মনে হয়েছিল যেভাবেই হোক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। ওই সময়ে নির্মিত উল্লেখযোগ্য ইরানি চলচ্চিত্র হলো : ‘জেফারের দ্য নাইট অব দ্য হ্যান্স ব্যাক’ (১৯৬৩), ‘অসাউদ কিমায়ির ঘেউসার’ (১৯৬৬)। তখনও ইরানি চলচ্চিত্র সঠিক দিশা পায় নি। আর ইরানিদের মধ্যে একধরনের অস্থিরতাও বিরাজ করছিল। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় শাসন-শোষণ জনগণের মনে জীবন নিয়ে বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। আর তখন অনেকেই আত্মহত্যার মতো ব্যাপারের দিকে ধাবিত হতে থাকে। এমনই পরিস্থিতিতে ইরানে এক তরুণ নির্মাতার আবির্ভাব ঘটে যার নাম দারিউস মেহেরজুই। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মেহেরজুই নির্মাণ করেন ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রটি পরবর্তীকালে অনেক স্বাধীন নির্মাতাকে চলচ্চিত্র নির্মাণে স্বপ্ন দেখায়। যার পথ ধরে আব্বাস কিয়ারোস্তামি, হাজির দারউস এদের আবির্ভাব ঘটে। এই সময়টা ইরানি চলচ্চিত্রের জন্য খুব তাৎপর্যপূর্ণ এই অর্থে যে, ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর শোষণের প্রেক্ষাপটটা বিভিন্নভাবে পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্রে আনার একটা চেষ্টা চালাতে থাকে। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে শাহ মোহাম্মদ রেজা সরকারের পতনের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে যে-ইসলামি বিপ্লব ঘটে তা ইরানের চলচ্চিত্রকে আরেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে।

বিদেশি ছবির প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়। নারীকে ঢাকা হয় বোরকার কালো সন্ত্রাস দিয়ে। উদার মানবিক মূল্যবোধের মানুষ, বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের ওপর নেমে আসে ধর্মের খড়্‌গ। বিপ্লব পরবর্তী কয়েক বছর চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় বছরে চার-পাঁচটি। এত দমন ও নিপীড়নের পরও ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয় নি। বছরের পর বছর যতই গড়াতে থাকে অবস্থা ধীরে ধীরে হলেও পাল্টাতে থাকে। বিদেশি ছবি নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশীয় ছবির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ দেখা যায়। ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই সুযোগ নিতে একটু কার্পণ্য করেন নি।২

ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতারা যে-সুযোগ নিতে কার্পণ্য করেন নি সেই বিষয়টা আলোচনার দরকার আছে। আর এই বিষয়টা আলোচনার জন্য ইরানের তিনজন নির্মাতা দারিউস মেহেরজুই, আব্বাস কিয়ারোস্তাামি ও জাফর পানাহি-র প্রসঙ্গ টানা দরকার। বিশেষ করে পশ্চিমা অবরোধ, ধর্মীয় রাজনীতির কট্টর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ইরানি নির্মাতারা তাদের চলচ্চিত্রকে বিশ্বচলচ্চিত্র দরবারে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপন করেছে। তো ইরানি চলচ্চিত্রের বিষয় নিয়ে কথা বলা যাক। কিংবা কথা বলা যাক, ইরানের বাইরে ইরানি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় হওয়া এবং পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপার নিয়ে।

৩.
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত দারিউস মেহেরজুই-এর ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে বলা যায়, সমকালীন ইরানে মানবিকতার যে-অবক্ষয় তারই বিপরীতে একটি পশুর (গাভী) প্রতি একজন মানুষের আত্মিক টান তিনি চলচ্চিত্রটিতে তুলে ধরেন। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র মানুষের প্রতি নির্মম হয়ে ওঠে তখন একজন মানুষ তার গৃহপালিত পশুটির প্রতি যে-মমত্ববোধ করে তা সেই শোষক রাষ্ট্রকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সম্পর্কের দিকগুলো। চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ছেলেটি মানে হাসান একদিন কাজে বাড়ির বাইরে থাকলে তার গরুটিকে গ্রামবাসী মৃতাবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তারপর তারা হাসানের অনুপস্থিতিতে গরুটিকে দাফন করে। হাসান ফিরে আসার পর তার গরুটিকে না-দেখতে পেলে গ্রামবাসী বলে, গরুটি পালিয়ে গেছে। কিন্তু হাসান ঠিকই বুঝতে পারে তার প্রিয় গরুটি আর নেই। আর তারপর থেকে সে তার গরুটির কবর খুঁজতে থাকে। কবর খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে কষ্টে সে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়। যদিও তার বন্ধুরা তাকে ওই পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। সংক্ষেপে এটাই ‘দ্য কাউ’-এর কাহিনি। তো ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি রাষ্ট্রীয় অনুদানে নির্মিত প্রথম ইরানি চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও এতে ইরানের শাসন ব্যবস্থার প্রতি কটাক্ষ করা হয়েছে। এটা ছিল একধরনের প্রতিবাদ। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে এমন অজুহাতে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়। এই চলচ্চিত্রটি দিয়েই ইরানি চলচ্চিত্রের শক্ত পথে চলা শুরু হয়। ইরানের রাজনৈতিক শাসন আর নিপীড়নের প্রেক্ষাপটকে পরবর্তী সময়ে নানাভাবে চলচ্চিত্রের বিষয় করে পর্দায় তুলে ধরা হয়। যদিও অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণের পরপরই সেন্সরবোর্ডে আটকে দেওয়া হয়। কারণ এই সেন্সরশিপ নির্ধারণ করে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় শাসক দ্বারা যেন শাসকবিরোধী কোনো বক্তব্য না থাকে। তো মেহের জুউয়ের ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি এক বছর নিষিদ্ধ থাকার পর ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে আবার মুক্তি পায়। আর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে সরকারকে ফাঁকি দিয়ে গোপনে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো হলে আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার লাভ করে। আর পরেরবছর চলচ্চিত্রটির প্রধান অভিনতো ইন্তেযামি শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করে। ইরানি চলচ্চিত্রের এইসব পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন উঠতে পারে—ইরানি চলচ্চিত্র ইউরোপ কিংবা আমেরিকাতে পুরস্কার পায় কেন? কিংবা কী আছে ইরানি চলচ্চিত্রে? পুরস্কারের ব্যাপারটার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত আছে কি-না? বর্তমান সময়ের ইরান সরকার আর মার্কিন সরকার ব্যবস্থার সম্পর্ক বৈরিভাবাপন্ন। ফলে মনে করা হতে পারে যে, ইরান-সরকার যেহেতু শিল্প-সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে কট্টর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তাই ইরানের চলচ্চিত্রকে আমেরিকা কিংবা ইউরোপে পুরস্কার দিলে তাদের সরকারকে একটা জবাব দেওয়া হয় কিংবা চলচ্চিত্রের বিষয়-আশয় এমন থাকে যাতে অবরুদ্ধ ইরানের চিত্র বাইরে প্রকাশিত হলে তা ইরান-সরকারের জন্য চাপের হতে পারে। তো এসব ব্যাপার কতটা ভিত্তিসম্পন্ন কিংবা আদৌ তেমন বাস্তবতা বিরাজমান কি-না এটার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহির দিকে নজর দেওয়া যাক। জাফর পানাহি নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। শুরুটা করেছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামির সহকারী পরিচালক হিশেবে। তারপর ইরানি চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রভাবশালী নির্মাতা হয়ে ওঠেন। তার এই প্রভাবের জায়গাটা ইরানি সমাজকেন্দ্রিক নানারকম বিষয়-আশয় যা প্রকট সংকটপূর্ণ হতে পারে আবার অনেক সময় প্রচ্ছন্ন সমালোচনামূলক ব্যাপারও হতে পারে যা তিনি চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন। ফলে ইরান সরকারের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সবসময় ছিল। যার ফলস্বরূপ তাকে বেশ কয়েকবার কারাবন্দি থাকতে হয়েছে।


ইরানে ষাটের দশকে যে নবতরঙ্গ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল আব্বাস কিয়ারোস্তামি সেই ধারার একজন। কিয়ারোস্তামির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য রিপোর্ট’ ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় এবং ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ হয়।


২০১০ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ছিলেন কারগারে। সেখানে অনশন করেন, পরে মুক্তি পান জামিনে। একই বছর ইরান সরকার দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ করার অভিসন্ধি নিয়ে সমাবেশ ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত হওয়াসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অভিযোগ তোলে পানাহির বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর পানাহির বিরুদ্ধে ছয় বছরের কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত। একইসঙ্গে আগামী ২০ বছর সিনেমা নির্মাণ, চিত্রনাট্য লেখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।৩

তো এখানে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় যখন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে ২০ বছর চলচ্চিত্র নির্মাণ, চিত্রনাট্য লেখার ব্যাপারে নিষিদ্ধ করা হয় আদালতের আইনের দ্বারা যা সরকার কর্তৃক দুরভিসন্ধিমূলক। এই ব্যাপারটা ঘটে মাহমুদ আহমেদিনেজাদ সরকার যখন ক্ষমতায় সেই সময়ে। ওই সমাজ, সময় এবং সরকার ব্যবস্থা নিয়ে জাফর পানাহি বলেন :

আমি ওই সমাজেরই অংশ। আমারও কিছু না কিছু সমস্যা আছে। চার বছর ধরে আমার সিনেমা তৈরির কোনো অধিকার ছিল না। আমি ভেবেছিলাম তারা আমাকে অতি শিগ্গির সিনেমা বানাতে দেবে। এর ঠিক দেড় বছর পর আমি উৎসবে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম সবার সামনে যাওয়া ও আমার অনুভূতি প্রকাশের এটাই উপযুক্ত সময়। আমার মতো ইরানের অনেক নির্মাতাই এখন সিনেমা বানাতে পারছেন না। আমরা এরকম হাজারখানেক নির্মাতা তেহরানের রাস্তায় নেমেছিলাম যাদের প্রত্যেকে সিনেমা বানানোর পর সেটা সেলফোনে অনলাইনে ছেড়ে দিতে পারত।৪

এ-প্রসঙ্গে জাফর পানাহির ‘The Circle’ (২০০০) চলচ্চিত্রটির দিকে নজর দেওয়া যাক। এটি ইরানের সমসাময়িক ঘটনার ওপর নির্মিত একটি প্রতীকী চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি নিয়ে ২০০৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পানাহি বলেন :

এটাকে ৩০ বছর আগের সাথে তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ এখন ইরান শাসন করছে গোঁড়া মতবাদে বিশ্বাসী সরকার। স্বৈরশাসন এর চেয়ে অনেক ভালো। কারণ গোঁড়া মতবাদে বিশ্বাসী সরকারের স্বৈরাচারী স্বভাবের সঙ্গে থাকে ধর্মীয় আদর্শ। যার ফলে তারা তাদের স্বৈরশাসনকে সহজেই ব্যবহার করে জনগণের ওপর জুলুম ও নিপীড়ন চালাতে পারে।৫

যখন একটি চলচ্চিত্র এমন বিষয়ের ওপর নির্মিত হয় যেখানে থাকে শাসক গোষ্ঠীর নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তখন সেটা শুধু বিনোদন মাধ্যমের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। তা একইসঙ্গে জনগণকে উদ্বুব্ধ করে। আর নির্মাতা হয়ে উঠেন একজন এক্টিভিস্ট। পানাহির ২০০৬-এ নির্মিত ‘অফসাইড’ চলচ্চিত্রটিতে বন্দিদশা থেকে নারীমুক্তি প্রসঙ্গটা উঠে এসেছে। ‘অফসাইড’  চলচ্চিত্রটি পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়ে নারীদের মাঠে উপস্থিত হয়ে খেলা দেখার ঘটনা নিয়েই কাহিনি। জাফর এখানে মূলত প্রচলিত ইরানি গৃহবন্দি দশা থেকে নারীদের মুক্তির কথাটা বলেছেন। আর এইসব বিষয়-আশয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে জাফর নিজেই হয়ে পড়েন গৃহবন্দি। আর এই বন্দিবস্থায় তিনি নির্মাণ করেন ‘দিস ইজ নট অ্য ফিল্ম’। সেটি ২০১১ খ্রিস্টাব্দে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের জন্য একটি কেকের ভেতর পেন-ড্রাইভে করে ইরানের বাইরে পাঠানো হয়েছিল। কী ছিল ‘দিস ইজ নট অ্য ফিল্ম’-এর কাহিনি যা বন্দিবস্থায় নির্মাণ করা সম্ভব হলো আর কেনই-বা এত কৌশলে এটাকে ইরানের বাইরে পাঠানো হলো? এটার কাহিনি পানাহির গৃহবন্দিত্ব নিয়ে। পানাহি নিজেই অভিনয় করেছেন এবং ফোনে কথোপকথন দিয়ে তুলে ধরেছেন তার বন্দিত্ব, বিচার নিয়ে। একইসঙ্গে এই চলচ্চিত্রে তিনি তার আরেকটি চলচ্চিত্রের কাহিনিকে তুলে ধরেছেন। যে-কাহিনিতে মরিয়ম নামের একটি মেয়ের বন্দিত্ব তুলে ধরা হয়েছে। মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে ভর্তি হতে চায় কিন্তু তার বাবা-মা তাতে রাজি নয়। মেয়েটি তার বাবা-মা-কে না-জানিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেয়েটির পত্রিকায় নাম আসে। এটা দেখে বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। ‘দিস ইজ নট অ্য ফিল্ম’-এ মরিয়ম এবং নির্মাতা উভয়ই বন্দি। এই চলচ্চিত্রটি তখন একটি মেয়ের এবং একজন নির্মাতা উভয়ের বন্দিদশাকে তুলে ধরে। জাফর পানাহির এইসব চলচ্চিত্র শাসকগোষ্ঠী কিংবা তথাকথিত বিধানকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর তাই শাসকগোষ্ঠী জাফরকে বন্দি করে। আর এই ধরনের চলচ্চিত্র ইরানেও প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু জাফর মনে করেন :

সিনেমা এমন একটি মাধ্যম যা বাস্তবতা তুলে ধরতে পারে এবং জনগণ তাতে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে এ কারণেই সরকার এতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।৬

জাফর পানাহির এই কথাগুলো ধরে তার পূর্বসূরি আরেকজন ইরানি চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির খোঁজ করা যাক। ইরানে ষাটের দশকে যে নবতরঙ্গ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল আব্বাস কিয়ারোস্তামি সেই ধারার একজন। কিয়ারোস্তামির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য রিপোর্ট’ ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় এবং ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে নিষিদ্ধ হয়। চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ হওয়ার সময়টা ইরানের ইসলামি বিপ্লব কাল। কিন্তু আব্বাস দমে যান নি। বরং তিনি ধীরে ধীরে নির্মাণ করেছেন তার চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি। তখন বলা যায়, আব্বাস ভেঙেছেন চলচ্চিত্রের প্রথাগত ব্যাকরণ কৌশল। তখন প্রশ্ন আসে কী আছে আব্বাসের চলচ্চিত্রে? কিংবা তার স্বকীয়তার জায়গাটা আসলে কোথায়? তখন আব্বাসের কথা শুনতে হয় :

সিনেমা তৈরিতে আমার লক্ষ্যই হচ্ছে, আমরা যা দেখি কতটুকু না দেখিয়ে না বলে করা যায়। আমরা দর্শকের কল্পনাকে কত বেশি ব্যবহার করতে পারি। বাহ্যিকভাবে আমরা যা দেখি তার বাইরেও তুমি কল্পনা করতে পারো, কারণ তুমি কোনো এক বাস্তবতার মাত্র একটি অংশ দেখ।৭


ইরানি চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য বিচার করতে গেলে দেখা যায় যে, ইরানি চলচ্চিত্রে একটা রাজনৈতিক এবং দার্শনিক ভাবনা থাকে।


আব্বাস কিয়ারোস্তামির এই কথাগুলো যেমন দার্শনিক ভাবাপন্ন তেমনি ইরানের রাজনৈতিক অবস্থাকেও নির্দেশ করে। ইরানের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি যার প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই একটি বিশেষ জায়গায় শেষ হয়ে যায় কিংবা বলা যায় অসমাপ্ত থেকে গেল। তিনি কেন এমন করেন সেটা একটা প্রশ্ন? আব্বাস মনে করতেন, ‘চলচ্চিত্রের গল্পটা দর্শক শেষ করুক যে-যার মতো করে।’৮ আর এটা করতে গিয়ে তিনি বাস্তবতাকে ধরতে চেয়েছেন তার চলচ্চিত্রে এমন একটা আঙ্গিক দিয়ে যেখানে তার চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পীরা বেশিরভাগই অপেশাদার। এই অপশেদার অভিনয় শিল্পী ব্যবহার করার বেলায় তিনি চরিত্রটি যে-পেশায় অভিনয় করবে সাধারণত সেই পেশাজীবীকে বাছাই করেন। আর এতে তিনি মনে করেন যে, এই অপেশাদার অভিনেতারা তার চিত্রনাট্য ঠিক করে দেয়। ফলে চরিত্ররা ঘটনার গভীরে খুব সহজে প্রবেশ করে। কিন্তু আব্বাসের চলচ্চিত্রের কাহিনি সহজে উন্মোচিত হয় না। কিংবা তিনি চান না এটা হোক। এটা নিয়ে আব্বাস বলেন :

অনেক দর্শক অতৃপ্তি নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হয়ে আসতে পারে কিন্তু তার পরেও তাদের পক্ষে ছবিটা ভোলা সম্ভব নয়। আমি জানি তাদের খাবার টেবিলে তারা ওটা নিয়ে কথা বলবে। আমি আমার ছবির দ্বারা তাদের একটু অস্থির করে দেই; যাতে তারা নিজেদের মধ্যে কিছু খোঁজার চেষ্টা করে।৯

কিয়ারোস্তামির এইকথাগুলো শুধু তার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই খাটে তা কিন্তু নয়। ইরানের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার লক্ষ করা যায়। এইসব বিষয়-আশয় ধরে ইরানি চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য বিচার করতে গেলে দেখা যায় যে, ইরানি চলচ্চিত্রে একটা রাজনৈতিক এবং দার্শনিক ভাবনা থাকে। চলচ্চিত্রগুলোতে একধরনের কাব্যিক সংলাপ পরিলক্ষিত হয়। কাহিনিতে সহজ সরল ভাবনার ভেতর দিয়ে একটা রূপকাত্মক পরিস্থিতির উপস্থিতি ঘটে। এসবের বাইরেও অনেক কথা থেকে যায়, কারণ ইরানে মাজিদ মাজিদি, মোহসেন মাখমলবাফ, সামিরা মাখমলবাফ-এর মতো আরও অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা আছেন যারা ইরানের চলচ্চিত্রের একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি করেছেন। যে-জগৎ কেবল ইরানেই পাওয়া যায়। ফলে পশ্চিমা পুরস্কার কিংবা তিরস্কার কোনওটাই ইরানি চলচ্চিত্রের গুলিস্তান কব্জা করতে পারে নি।


তথ্যসূত্র :

১. আশফাক দোয়েল; ‘আলো হাতে মেহেরজুই সঙ্গে দ্য কাউ’; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদনা—কাজী মামুন হায়দার; দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, জানুয়ারি-২০১৩, পৃ. ৮০, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
২. প্রাগুক্ত; আশফাক দোয়েল; (২০১৩ : ৮১)।
৩. রুবেল পারভেজ; ‘সিনেমা সংশ্লিষ্ট লোকদের মুখোমুখি হওয়া সহজ হবে না’; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদনা—কাজী মামুন হায়দার; প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, জুলাই-২০১১, পৃ. ১৩৮, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
৪. প্রাগুক্ত; রুবেল পারভেজ; (২০১১ : ১৩৯)।
৫. প্রাগুক্ত; রুবেল পারভেজ; (২০১১ : ১৪১)।
৬. প্রাগুক্ত; রুবেল পারভেজ; (২০১১ : ১৪৩)।
৭. রফিক, মনিস (২০০৯ : ৩৪); ক্যামেরার পেছনের সারথি; রোদেলা প্রকাশনী, ঢাকা।
৮. তাসনিয়া মিন্নি; ‘মৃত্যু মৃত্যু খেলায় জীবনরে জয়গান’; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদনা—কাজী মামুন হায়দার; সংখ্যা-১২ জানুয়ারি-২০১৭, পৃ. ১৯।
৯. প্রাগুক্ত; রফিক; (২০০৯ : ৩২)।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj