হোম চলচ্চিত্র আয়নায় আয়নাবাজি

আয়নায় আয়নাবাজি

আয়নায় আয়নাবাজি
1.24K
0

সিনেমা দেখা এক ধরনের অভিজ্ঞতা এবং এই অভিজ্ঞতা একটি নির্দিষ্ট পরিক্রমা শেষে ঋদ্ধ হয়, আর তখন সেটা আর নিতান্ত বিনোদন থাকে না দর্শকের কাছে। দর্শক তখন স্বভাবতই যেমন তার দেখার তালিকা থেকে সিনেমা বাদ দিতে শেখে, তেমনই একটা সিনেমা দেখার সময় অনেক কিছুই বুঝতে পারে। আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টি এর ব্যতিক্রম নয়, তবে আমার প্রকৃত সিনেমা দেখা শুরু হয়েছিল একে আরও গভীরভাবে জানা ও তা নিয়ে লেখার আগ্রহ থেকে, ফলে বেশ ক’বছর আমাকে একটানা বিশ্বসিনেমা চষে বেড়াতে হয়েছে, যার দরুন একটি সিনেমাকে আমি যেমন সহজেই প্রশংসার দাবিদার বানাতে পারি না, তেমনি পারি না নিতান্তই বাজে অভিহিত করে ছুড়ে ফেলে দিতে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমার সাথে সবসময়-ই ঘটে, তা হলো, কোনো সিনেমা ভালো না লাগলে আমি সেই সিনেমাটি নিয়ে লিখি না, কেননা একটি সিনেমা নিয়ে লিখতে গেলে সিনেমাটি যেমন অধিক মনোযোগ দাবি করে, তেমনই সেটা নিয়ে অনেক পড়তে হয়, জানতে হয়। একটি সিনেমা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময় ধরে একটি কাহিনির চিত্রায়ণ নয়, বরং তারও অধিক কিছু, যেখানে থাকে পরিচালক ও কলাকুশলীর পর্দার আড়ালের বাস্তবতা, টেকনিক্যাল ও থিউরিটিক্যাল খুঁটিনাটি, যা অনেক অভিজ্ঞ দর্শকও মিস করে যেতে পারে।


আয়নাবাজি’র কাহিনি কতটা মৌলিক, সে তর্কে না গিয়ে এই কথাটি স্পষ্টভাবেই বলা যায়, আর যাই হোক অন্তত তা ‘টাম্বলউইড’র নকল নয়।


‘আয়নাবাজি’ সিনেমাটি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং বলতে দ্বিধা নেই, এটাই প্রথম সিনেমা যার সম্পর্কে আমি ভালো লাগা বা মন্দ লাগা থেকে লিখতে বসি নি, বরং এটি নিয়ে লিখতে বসার কারণ দুটো; এক. কিছুদিন আগে লক্ষ করলাম, এই সিনেমাটিকে বিশেষ করে এর কাহিনিকে এক শ্রেণির মানুষ মৌলিক নয় বলে দাবি করছে, যা কিনা ২০১২ সালে নির্মিত কোরিয়ান সিনেমা ‘টাম্বলউইড’ থেকে অনুকরণকৃত এবং এর সম্পর্কে পরিচালক কোনো দায় নেন নি বা স্বীকার করেন নি। দ্বিতীয় কারণ : চঞ্চল চৌধুরী। দেখতে চেয়েছিলাম, এই অভিনেতা নিজেকে ছাড়িয়ে আরেক ধাপ উপরে উঠতে পারল কিনা, পারল কিনা নিজের ক্ষমতার প্রতি সুবিচার করতে।

মূলত, এই দুটি কারণই আমাকে বাধ্য করছে ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে লিখতে এবং শুরুতেই জানিয়ে রাখছি, ‘আয়নাবাজি’র কাহিনি কতটা মৌলিক, সে তর্কে না গিয়ে এই কথাটি স্পষ্টভাবেই বলা যায়, আর যাই হোক অন্তত তা ‘টাম্বলউইড’র নকল নয়। তাছাড়া, কোরিয়ান সিনেমার সিরিয়াস দর্শক হিশেবে এ আমার পক্ষে সবসময়ই বিশ্বাস করা কষ্টকর যে, কোরিয়ান সিনেমার সার্থক রিমেক কিংবা তাদের কাহিনি নকল করে ‘দেশীয়’ করে তোলা সম্ভব। কারণ কোরিয়ান পরিচালকরা মুভি মেকিংকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছেন, যেখানে কোরিয়ান সিনেমা ঘরানা থেকে কোনো কোরিয়ান সিনেমাকে বের করে এনে তাকে এভাবে প্রেজেন্ট করা, আমাদের জন্য, বিশেষত কোরিয়ান সিনেমাপ্রেমিদের কাছে চরম বিরক্তির কারণ হয়ে উঠবে। অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে তা খুই নগণ্য, আর সেই নগণ্যদের মধ্যে সবচেয়ে সফলভাবে যিনি এই কাজটি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি ‘তিন ২০১৬’ সিনেমার পরিচালক রিভু দাশগুপ্তা। কোরিয়ান সিনেমার এমন সার্থক রিমেক অন্তত আমি আর দেখি নি।

তবে ‘আয়নাবাজির’ কাহিনির সাথে ‘টাম্বলউইড’-এর যে একেবারেই কোনো সামঞ্জস্য নেই তা বলব না, কেননা সেখানেও নায়ক জেলে যেত অন্যের হয়ে, আর এটুকুই যা মিল, বাকিটা দুই সিনেমার ভিন্ন, এমনকি জেনর অব্দি আলাদা। সুতরাং, ‘আয়নাবাজি’র প্রতি আরোপিত এই অপবাদটি ভিত্তিহীন। সর্বোপরি আমার নিজস্ব সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বলতে পারি নির্দ্বিধায়, ‘আয়নাবাজি’ যদি ‘টাম্বলউইড’ এর অনুকরণ বা ছায়াবলম্বনে বানানো হতো, তবে কোনোভাবেই তা বাংলাদেশি সিনেমা হয়ে উঠতে পারত না, আর দর্শকও তাকে গ্রহণ করত না।

দুই. চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়, তা নিয়ে কিছু বলার আগে জানিয়ে রাখি, ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে লিখতে বসার আগে আমাকে ‘মনপুরা’ সিনেমাটি দেখতে হয়েছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এবং বলতে বাধ্য হচ্ছি, চঞ্চল চৌধুরী ‘আয়নাবাজি’তে নয়, বরং ‘মনপুরা’তেই তার নিজস্ব ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে সক্ষম হয়েছেন। ‘আয়নাবাজি’তে তিনি তার সেই ক্ষমতা থেকে বরং অনেকখানি দূরেই সরে এসেছেন। হয়তো কোনো একদিন তিনি সক্ষম হবেন ‘মনপুরা’র চঞ্চলকে ছাড়িয়ে যেতে, তবে সেটা যে ‘আয়নাবাজি’তে নয়, তা কোনো প্রকার সংশয় ছাড়াই আমার মনে হয়েছে।

‘আয়নাবাজি’ সিনেমা হলে গিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল ভীষণ, কিন্তু টিকিট সংকটের কারণে তা হয়ে ওঠে নি। অবশেষে যখন দেখা হলো, তখন লিখতে বসে মনে হলো, একেকটি ভাগে আমি যদি সিনেমাটি নিয়ে লিখি, তাহলে বরং আমার জন্য বিষয়গুলো আরেকটু ভালোভাবে বলার সুবিধা হবে। সুতরাং দেখা যাক, ‘আয়নাবাজি’র বিভিন্ন দিকগুলো আমার কাছে কিভাবে ধরা দিয়েছে।


চরিত্র


দেশীয় সিনেমার চরিত্রগুলো সমসময়-ই আমার কাছে অনেক বেশি যৌথ পরিবারের মতো মনে হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় চরিত্রগুলো আলাদা আলাদা তুলে ধরে একটি যৌথ পরিবারের সার্বিক রূপদানই মুখ্য, সেখানে ‘আয়নাবাজি’তে একটি পার্টিকুলার চরিত্রকে হাইলাইট ও তাকে বিভিন্ন মাত্রা প্রদান করা হয়েছে, আর তার আড়ালে যে প্রকৃত মানুষটি খুব যত্ন সহকারে আগলে রাখা হয়েছে, যার দিক থেকে আমাদের মনোযোগ সরে যায় না বা আমরা কেবলমাত্র তার দিকেই আমাদের সকল মনোযোগ নিবিষ্ট রাখি, ফলে কাহিনি পরিক্রমায় আমরা বরং আয়নার দিকেই আরও বেশি ঝুঁকে পড়ি, যেখানে আয়না এক না থেকে অনেক হয়ে ওঠে, আবার অনেকের মধ্যে কেবলমাত্র আয়নাই রয়ে যায়। চরিত্রের এই ধরনের বিকাশ আমাদের সামনে খুব বেশি এসেছে বলে মনে হয় না, ফলে এমন নতুনত্ব আমাদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে সফলভাবে।

‘আয়নাবাজ’র চরিত্রগুলো কমবেশি খাপছাড়া ধরনের হলেও, বলা যায় গুছানো এবং এই চরিত্রগুলো নিয়ে পরিচালক যে স্ট্যাডি করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। লোকেশন তথা বাতাবরণের সাথে খাপ খাইয়ে যায়, এমন সব মানুষগুলোকেই তিনি হাজির করেছেন ক্যামেরার সামনে, বিশেষত প্রধান চরিত্র দুটিকে তিনি যথাযথই উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। ক্রাইম রিপোর্টারের চরিত্রে পার্থ বড়ুয়াকে আমার যুতসই মনে হয় নি, তেমনি নায়িকার বাবার চরিত্রকেও। কেমন যেন সিনেমার বাতাবরণের সাথে মিলেমিশে যেতে পারছে না, অনেকটাই খাপছাড়া। ‘সারাক্ষণ মদ খাওয়া কিংবা আধুনিক মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবার এমন রূপের সাথে আমরা কি অধিক পরিচিত?’—এমন প্রশ্নের উদ্রেগই বোধকরি চরিত্র দু’টোর সিনেমার পরিমণ্ডলে খাপছাড়া মনে হবার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

শিশুচরিত্রটি ও তার উপস্থিতি মন্দ নয়, বরং প্রশংসার দাবি রাখে। এক্ষেত্রেও বলতে হয়, এভাবে কোনো শিশুচরিত্রের উপস্থিতি, সেটাও আমাদের জন্য নতুনতর বটে। ‘আয়নাবাজি’র খল চরিত্রগুলো আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। মনে হয়েছে, এত দিনে বোধকরি বাংলাদেশি সিনেমা খলচরিত্র নির্বাচনে যত্নশীল পরিচয় দিলো। যদিও আমাদের সময়ের খলচরিত্রগুলো ছিল গুটিকতক মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যাকে বদলে দিয়েছিলেন হুমায়ুন ফরীদি, আর সেই বদলটাকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করেছেন ডিপজল, সেখানে ‘আয়নবাজি’র খলচরিত্রগুলো অবশ্যই আলাদা ও সময়োপযোগী। খুব বেশি সময় তাদের উপস্থিতি না থাকলেও, যে সামান্য সময়ের জন্য তারা পর্দায় উপস্থিত হয়েছেন, সেটুকু বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে গেছে।

তারপরও কেন জানি অনেক সময় মনে হয়েছে, চরিত্রগুলো ‘অভিনয়’ করছে বা ‘অভিনয়’ করার চেষ্টা করছে। এমনটা শুধুমাত্র নাবিলা ছাড়া সবার ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে, এমনকি চঞ্চল চৌধুরী নিজেও এই ‘আরোপ’ থেকে মুক্ত নয়। সিনেমায় যখন কোনো চরিত্রকে দেখে মনে হয় যে সে ‘অভিনয়’ করছে, তখন এত বেশি বিরক্ত লাগে যে, সিনেমা দেখার আগ্রহই নষ্ট হয়। তারপরও সব মিলিয়ে, ‘আয়নাবাজি’র অভিনয়, কম-বেশি উতরে গেছে।


সংগীত


সংগীত এই সিনেমার সফলতম এক দিক। বিশেষ করে আবহ সংগীত সংযোজনের ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট। এছাড়া আধুনিক বাংলা গানের সংযোজনও বেশ উল্লেখযোগ্য ও সময়োপোযোগী। যদিও সিনেমায় আমি গান শুনতে পছন্দ করি না একদম, কারণ কাহিনি বা অভিনয় থেকে আমার মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরে যায়। সংগীত আমার কাছে আলাদা শোনার বিষয়। তবে আবহ সংগীত বা দৃশ্য ভেদে শব্দের ব্যবহার, বিশেষ করে রিয়েল যে শব্দ বর্তমান সেটে, তা আমার কাছে অধিক আগ্রহের ও শক্তিশালী বিষয় মনে হয়, কারণ চরিত্র ও কাহিনির সাথে মিলেমিশে যাবার অভিজ্ঞতার দিকে ধাবিত করে। সুতরাং, যেহেতু আমি গান ছাড়া সিনেমা দেখতে পছন্দ করি, সেহেতু ‘আয়নাবাজি’র গান, এই বিষয়ে নিতান্তই প্রশংসা করা ছাড়া তেমন কিছু বলার নেই।


কাহিনি


‘আয়নাবাজি’র যে বিষয়টি দর্শককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে, তা এর কাহিনি। এভাবে সিনেমার কাহিনি আমাদের সামনে আসা, বিশেষত, আমাদের যে গতানুগতিক সিনেমার অভিজ্ঞতা, সামাজিক অবস্থা ও বোধ, সেখানে ‘আয়নাবাজি’র কাহিনি নতুনতর বটে। একজন মানুষ যে অন্যের হয়ে জেল খাটে, এই বিষয়টিই নতুন, যেখানে মানুষটি শুধুমাত্র টাকা নয় বরং এই কাজটির মধ্যেও শিল্প খোঁজে, কিংবা নিজেকে নতুন রূপ বা ভিন্ন রূপে দেখে নতুন জগতে প্রবেশ করার আনন্দ খুঁজে পায়—এভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা আমাদের জন্য আকর্ষক ও চমকপ্রদ। তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি দেশে যেখানে জনগণ প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে টিকে থাকার জন্য, সেখানে এমন একটি অপরাধমূলক কাজের মধ্যেও সাধারণ একটি মানুষ এভাবে নিজেকে খুঁজে পায়, তা আকর্ষণীয় ও নতুনতর বটে।


চঞ্চল চৌধুরী ‘আয়নাবাজি’তে নয়, বরং ‘মনপুরা’তেই তার নিজস্ব ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে সক্ষম হয়েছেন।


তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কাহিনির গতি খুবই শ্লথ এবং এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তা আমাদের এমন কোনো গতি বা ক্লাইমেক্সের মধ্যে নিয়ে যায় না, যেখান থেকে এর সাথে দর্শকের গতি সাবলীল ও সামনে এগিয়ে যাবার আগ্রহ তীব্রতর হয়ে উঠবে। বরং নিতান্তই সিনেমাটির পরিণতির দিকে যাবার জন্য আমাদের সার্বিক আগ্রহ ও গতি একঘেমেয়েমিতে পূর্ণ করে তোলে। সমসাময়িক বিশ্ব সিনেমায় দর্শকরা যেখানে কোরিয়ান সিনেমা দেখে অনেক বেশি অভ্যস্ত, পরিণত, সেখানে থ্রিলার সিনেমার কাহিনির গতি ও বিকাশ অবশ্যই হয়ে উঠতে হবে অনেক বেশি আকষর্ণীয়, গতিময় ও নানাবিধ বাঁক সম্পন্ন, যা দর্শককে কেবল মুগ্ধ নয়, বরং চঞ্চল ও উত্তেজিত করে তুলবে সামনে এগিয়ে যেতে। দুই ঘণ্টার অধিক সময় ধরে ‘আয়নাবাজি’র কাহিনির বিস্তার আমাকে বরং একমুখীতার দিকেই বেশি নির্দিষ্ট করেছে, যেখানে আমি অনেক আগে থেকেই অনুমান করতে সক্ষম হচ্ছিলাম, বা বলা চলে, কাহিনি নিজেই আমাকে ধারণা দিতে সক্ষম হচ্ছিল—সামনে কী ঘটবে বা এই গল্পের পরিণতি কী হবে, আর ঘুরে ফিরে আমাদের কেবল বদলি চরিত্রে আয়নার জেলে যাওয়ার জন্যই অপেক্ষা করতে হচ্ছিল, এমন।

সত্যি বলতে ‘আয়নাবাজি’ দেখার পর আমার নিজের মনে হয়েছে, সিনেমাটিকে যেভাবে বা যতভাবে ভিন্নমাত্রা প্রদান করা সম্ভব ছিল, পরিচালক তা না করে সুচারুভাবে একটি বিশেষ দিকেই তাকে এগিয়ে নিয়েছেন, ফলে আমার মতো দর্শক ছবির কাহিনির প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ বোধ করে নি। মূল কথা আমার কাছে মনে হয়েছে ‘আয়নাবাজি’ বাজিময় হয়ে উঠতে পারত, যদি এর সাথে সহজীকরণ বা সরলীকরণের প্রত্যক্ষ চেষ্টা করা না হতো। একজন গদ্য লেখক হিশেবে এই কথা দৃঢ়তার সাথেই বলতে পারি, থ্রিলার হিশেবে ‘আয়নাবাজি’তে উল্লেখ করার মতো কোনো বাঁক নেই, নেই কোনো উত্তেজনা কিংবা রহস্যময়তা, নিতান্তই এক রৈখিক একটা গল্প, যেখানে একজন মানুষের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় কিংবা বলা চলে অভিনয় দক্ষতা দেখার প্রয়াস চালানো হয়েছে। যখন ‘আয়নাবাজি’ অসাধারণ এক সম্ভাবনা নিয়েই শুরু হয়েছিল এবং একটি লাশের যে অবস্থান থেকে এই সিনেমার শুরু, সেখান থেকেই এই কাহিনির বিকাশ হলে দর্শক আরও বেশি এর গতির সাথে একাত্ম হতে পারত।


চিত্রায়ণ


এই সিনেমাটিকে হলে দেখার মতো করেই চিত্রায়ণ করা হয়েছে, যার প্রকৃত মজা ছোট স্ক্রিনে পাওয়া অসম্ভব। সিনেমাটির বিভিন্ন দৃশ্যে কালার ঠিক রাখার জন্য আলোর ব্যবহারে চিত্রগ্রাহক ছিলেন যথেষ্ট যত্নশীল। বরং এও বলা চলে, ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার সবচেয়ে পরিশ্রমী যে অংশ, তা হলো এর চিত্রায়ণ এবং তা বিশ্বমানের সন্দেহাতীতভাবে। যে অ্যারিয়েল শর্টগুলো আমরা উন্নত দেশের সিনেমাগুলোতে হরহামেশাই দেখতে পাই, ‘আয়নাবাজি’তে তেমন শটগুলো খুব ভালোভাবেই করা হয়েছে আর দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, পরিচালক কেবল আমাদের সিনেমার চিত্রায়ণ নয় বরং গোটা ঢাকা শহর যেমন, তেমনই ঢাকার জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুষঙ্গগুলোর দিকেও আমাদের মনোযোগ দাবি করেছেন, যা অনেক বেশি আমাদের, দৈনন্দিন ও প্রয়োজনীয়, যা হয়তো এভাবে তুলে আনার ফলে ‘আয়নাবাজি’ খুব বেশি করেই আমাদের নাগরিক জীবনের সাবলীল চিত্রায়ণ হয়ে উঠেছে যেমন, তেমনই হয়ে উঠেছে আমাদেরই প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবিক অংশ। লং শট, ক্লোজ শট, এমনকি মুভিং শটগুলো পর্যন্ত আমাকে মুগ্ধ করেছে। যে শটগুলোতে ক্যামেরার ভারসাম্য রক্ষা করার দিকে আমাদের পরিচালক বা চিত্রগ্রাহকরা মনোযোগী হন না, সেখানে মুভিং শটগুলো পর্যন্ত এখানে দারুণভাবে গতিশীল ও স্থিতিশীল অবস্থায় শুট করা হয়েছে। কিছু কিছু সময় নিজে নিজেই বলেছি, ‘বাহ, ক্যামেরার এই পজিশনটাই বেস্ট’। ফলে চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামান যেমন প্রশংসার দাবিদার হয়ে উঠেছেন, তেমন তিনি চিত্রগ্রহণের বিষয়টিকে যে সম্পূর্ণরূপে পেশাদারিভাবেই নিয়েছেন, সেটাও প্রমাণ করেছেন যথাযথভাবে। ‘আয়নাবাজি’র সাফল্যে তাই কেবল এর কাহিনি, চরিত্র বা অভিনয় নয়, বরং চিত্রগ্রহণও শক্তিশালী ভূমিকা নিয়েছে, যেখানে দর্শক কোনো প্রকার আফসোস ছাড়াই ফ্রেম টু ফ্রেম শটগুলো উপভোগ করেছে। যার সাথে মিলেমিশে একাকার ছিল আলোর ব্যবহার ও কালার সেন্স। সামনের দিনগুলোতে এই চিত্রগ্রাহকের আরও ভালো কাজ দেখার জন্য আমি অবশ্যই মুখিয়ে থাকব।


নিদের্শনা


‘আয়নাবাজি’র নির্দেশনা সম্পর্কে বলতে গেলে আমাকে বরং জনাব অমিতাভ রেজার নিজস্ব মন্তব্য থেকেই শুরু করতে হয়, যেখানে তিনি স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন, ‘আয়নাবাজি’ বানানোই হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য এবং সেটা মাথায় রেখেই তিনি সিনেমাটি তৈরি করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল দর্শকের কথা ভেবে নয়, কেননা ইন্টারন্যাশনাল সিনেমার একটা আলাদা ল্যাংগুয়েজ রয়েছে।

খুব ভয়াবহ রকমের মন্তব্য। তবে কি ‘আয়নাবাজি’ একটি ইন্টেনশনাল প্রোডাক্ট, একটি বিশেষ শ্রেণির দর্শকদের জন্য, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সেই শ্রেণিকে স্ট্যাডি করেছেন, তারা কী গ্রহণ করতে পারে বা পছন্দ করে। তার এমন মন্তব্য আমাকে বেশ দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে, কারণ শিল্প এমন বিষয় কখনোই নয়, যে তা নির্দিষ্ট গোত্র বা শ্রেণির জন্য তৈরি হবে, শিল্পের নিজস্ব দাবি চিরকালই সর্বজনীন, সেখানে তিনি এমন মন্তব্য দ্বারা বরং নিজেকেই অনেকখানি নিচে নামিয়েছেন।

মোদ্দা কথা, ‘আয়নবাজি’ টিমওয়ার্ক হিশেবে সন্দেহাতীতভাবে সফল, কিন্তু পরিচালনার দিক থেকে এটাকে বরং আমার দুর্বলই মনে হয়েছে। বিশেষ করে যে সব জায়গাগুলোতে পরিচালক সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারতেন, সেখানে অধিক মনোযোগ দেন নি। যেমন, সিনেমাটিকে অনেকে বলছেন ‘মেট্রো থ্রিলার’, কেউ-বা ‘ক্রাইম থ্রিলার’ কিংবা ‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’, যা থেকে এই অনায়াসেই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, এটা একটি থ্রিলার সিনেমা, অথচ সিনেমা শুরুর দৃশ্য থেকে পরের এক ঘণ্টায় এর কাহিনি আমাদের থ্রিলার সিনেমার কাঙ্ক্ষিত গতি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া একটা থ্রিলার সিনেমার যে উপাদান, কাহিনির যে বাঁক বা ট্যুইস্ট থাকা জরুরি, তা আমি সমস্ত সিনেমা জুড়েই অনুপস্থিত দেখেছি। শুধুমাত্র একজন মানুষের বহুবিধ চরিত্রে অভিনয় করা ও তার ব্যক্তিগত প্রেমের অংশগুলো দেখব বসে বসে, তা হতে পারে না। যদি আমি থ্রিলার সিনেমা দেখি তবে অবশ্যই থ্রিল অনুভব করব, প্রয়োজন বোধ করব সামনে এগিয়ে যাবার, টের পাব একটা গতির, যা থ্রিলার সিনেমার জন্য অতীব জরুরি। মুখ্যত ঢাকা শহর ও একজন মানুষের বহুমাত্রিক চরিত্রকে তুলে ধরার দারুণ প্রয়াসের কারণে থ্রিলার সিনেমার এইসব অতি প্রয়োজনীয় দাবিগুলো দর্শক এড়িয়ে গেলেও যেতে পারে, কিন্তু সিনেমার নিজস্ব প্রয়োজনে পরিচালকের কাছে এগুলো এড়িয়ে যাবার বিষয় নয় মোটেও।


‘আয়নাবাজি’র সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো এর সংলাপ। এর কাহিনির দাবিই ছিল আরও বলিষ্ঠ সংলাপ।


দেশের আইন ব্যবস্থার অবনতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুরবস্থা কিংবা সাংবাদিকদের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া নৈতিকতার প্রশ্ন ইত্যাদি জোর করে সংযোজন করার মতো মনে হয়েছে, যদিও তা আমাদের জীবনের প্রকৃত বাস্তবতা, কিন্তু যেদিকে বা যেভাবে আমরা এগুচ্ছিলাম, সেখানে এগুলোর সমাবেশ আমার কাছে স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয় নি। বস্তুত, ‘আয়নাবাজি’র কাহিনি যেভাবে এগিয়েছে তাতে এই বিষয়গুলো স্বাভাবিক প্রয়োজনে আসে নি, আসলে নির্যাতিত মেয়েটির বাবা ক্রাইম রিপোর্টারের সাথে ওভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারতেন না। এছাড়া কোর্টরুম যেভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, তা বরং না তুলে ধরলেই ভালো হতো। কোর্টরুমের এই অধ্যায়টি এড়িয়ে গেলে সিনেমা বা কাহিনির তেমন কোনো ক্ষতি হতো না, তার চেয়ে এমন দায়সারাভাবে চিত্রায়ণ বড় বেশি দুর্বল আর অস্বাভাবিক লেগেছে, কারণ সেটা খণ্ডচিত্রের মতো সামনে এসে অনর্থক ও অসফলভাবে আমাদের সামনে থেকে সরে গেছে। এমনকি গানসহ জেলের ভেতরের ঘটনাসমূহের যে চিত্রায়ণ করা হয়েছে, তা শুধুমাত্র যেন আয়না জেলে গেছে এই ব্যাপারটুকু দেখাতে হবে বলেই সংযোজন করা হয়েছে কিংবা ঐ পার্টিকুলার গানটি জেল জীবনের প্রেক্ষাপটে দৃশ্যায়ন করা হবে বলেই চিত্রায়ণ করা হয়েছে, নয়তো আমাদের অভিজ্ঞতায় জেলখানা বা তার পরিবেশ এমন কখনও ছিল কি—এই প্রশ্ন থেকে সরে আসা যায় না। প্রকৃত অর্থে আমাদের জেলখানা বা কোর্টরুম অভিজ্ঞতা নিতান্তই শাদামাটা, আর সেই শাদামাটাকে ভিন্নরূপে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন পরিচালক, যা আমার কাছে নতুন কোনো সার্থক অভিজ্ঞতা হিশেবে ধরা দেবার পরিবর্তে নতুন বিভ্রান্তি হিশেবেই উপস্থিত হয়েছে। তবে ‘আয়নাবাজি’ দেখার পর নতুন একটি উপলব্ধি মাথায় এসেছে, যদি কখনও সার্থক কোনো কোর্টরুম ড্রামা এ দেশে তৈরি হয়, তবে তা হবে আমাদের সিনেমার জন্য বিশাল এক বাঁক ও গতানুগতিক অভিজ্ঞতার বিপরীতে সম্পূর্ণ নতুন এক পরিমণ্ডল, যা আমাদের সিনেমাকে সমৃদ্ধ করবে অবশ্যম্ভাবীরূপে।


সংলাপ


‘আয়নাবাজি’র সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো এর সংলাপ। এই সিনেমাটির সংলাপগুলো আরও গোছানো ও গভীর হওয়া জরুরি ছিল। বিষয়টি এমন নয় যে, সিনেমাটি তার সংলাপের এমন প্রকরণের কারণে সার্বিক প্রশংসা প্রাপ্তির জায়গা থেকে সরে এসেছে, বরং বলা চলে ‘আয়নাবাজি’ বাস্তবিক যা, সংলাপের কারণেই এটি সেখান থেকে সরে এসেছে, এবং এর কাহিনির দাবিই ছিল আরও বলিষ্ঠ সংলাপ। অবশ্য পরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন, সিনেমাটি তিনি বাংলাদেশের মানুষের কথা মাথা রেখেই বানিয়েছেন, সেক্ষেত্রে এরচেয়ে ভালো সংলাপ হয়তো এই সিনেমা বা তার কাহিনির জন্য নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়।


অভিনয়


‘আয়নাবাজি’ নিয়ে লিখতে বসার আগে আমাকে ‘মনপুরা’ সিনেমাটি দেখতে হয়েছে, বিষয়টি একটু অন্যরকম শোনালেও ‘আয়নাবাজি’ যেহেতু একটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের দিকে বা একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র ঘিরেই বিকশিত, সেহেতু চঞ্চল চৌধুরীর পূর্বের কাজ দেখা জরুরি হয়ে পড়েছিল আর বলতে দ্বিধা নেই, চঞ্চল চৌধুরী অন্তত ‘মনপুরা’তে নিজের ক্ষমতার প্রতি সুবিচার করেছেন, যার দরুণ তার অভিনীত সিনেমার একটা আলাদা দর্শক তৈরি হয়েছিল আজ থেকে সাত বছর আগে, যা ‘আয়নাবাজি’কে দর্শক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে অনেকটাই সাহায্য করেছে।

ফলে ‘আয়নাবাজি’র প্রতি আমারও মূল আগ্রহের কারণ ছিল চঞ্চল চৌধুরী। যদিও মোশাররফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরী, এই দুই অভিনেতার অভিনয় আমি প্রায় সহ্য করতে পারি না বললেই চলে, যেমন পারি না শাহরুখ খানের অভিনয় সহ্য করতে। আজীবন ধরে দেখার পরও মনে হয়, একই জিনিস একইভাবে বারবার একই মানুষের কাছ থেকে পাচ্ছি, বিষয়টি এত বেশি মনোটোনাস যে, আগ্রহ নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তারপরও যেহেতু এটাই তাদের পেশা, সেহেতু সাধারণ ক্ষমা তারা পেলেও পেতে পারেন, কিন্তু শিল্পের খাতিরে এই ধরনের অভিনেতাদের ক্ষমা করার সাধ্য অন্তত আমার নেই। তারপরও চঞ্চল চৌধুরী আমার মনোযোগ দাবি করেছেন তার কিছু টুকরো টুকরো অভিনয়ের কারণে, যা কলকাতা যাবার সময় বাসে বাধ্য হয়েই দেখেছিলাম, আর তাতে এই অভিনেতাকে আমার ক্যামেরার সামনে যথেষ্ট সাবলীল মনে হয়েছিল, যা একজন অভিনেতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমি নিশ্চিত ছিলাম, আর যাই হোক তিনি অভিনয় বিষয়টি জানেন আর যেদিন সুযোগ আসবে তিনি তার জাত চেনাতে ভুলবেন না, যা তিনি ইতোমধ্যেই ‘মনপুরা’তে প্রমাণ করেছেন। তবে এ কথা  বাজি ধরে বলতে পারি, ‘মনপুরা’ বা ‘আয়নাবাজি’তে যে চঞ্চল চৌধুরী সেটা তার প্রকৃত জাত নয়, বরং অপেক্ষা করুন, যথার্থ কাহিনি ও নির্দেশনা পেলে তিনি আমাদের যা উপহার দেবেন, তা দেখে একদিন আমরা কেবল মুগ্ধই হব না বরং বিস্মিত হব, ভীষণভাবে। তাছাড়া এই কথাটি অস্বীকার করা উপায় নেই যে মানুষটি তুচ্ছ, কারণ ও যথেচ্ছভাবে হাস্যকর হয়ে উঠতে পারে, আবার সেই মানুষটিই অনায়াসে হয়ে উঠতে পারে সার্থক ও যথার্থভাবে সিরিয়াস। ধন্যবাদ জনাব চঞ্চল আপনি আমার বিশ্বাসটা এখনও পোক্ত রেখেছেন এবং আমি অবশ্যই অপেক্ষা করব নিজস্ব ক্ষমতার প্রতি আপনার সুবিচার দেখার জন্য। তবে প্লিজ, ভুলেও ভাববেন না, ‘আয়নাবাজি’তে আপনি বাজিমাত করেছেন, বরং মনপুরা থেকে দীর্ঘ সাত বছরের যে পরিক্রমা আপনার, সেখানে আপনি আপনার সর্বোত্তমটা থেকে এখনও অনেক দূরে।

অভিনয়ের জন্য ‘আয়নাবাজি’র কাউকে যদি অক্লেশে ধন্যবাদ দিতে হয়, সেটা নাবিলা। প্রথম সিনেমাতেই ক্যামেরার সামনে এমন জড়তাহীন উপস্থিতি আমাকে আকৃষ্ট করেছে। চরিত্রের প্রতি তিনি সুবিচার করেছেন, ফলে ‘আয়নাবাজি’তে আমার তাকেই সবচেয়ে সাবলীল মনে হয়েছে। সামনে আরও কিছু ভালো সিনেমায় তাকে দেখব, এই আশাই করছি, আপাতত।


এডিটিং


‘আয়নাবাজি’ বড় পর্দায় দেখার ইচ্ছা এখনও আমার তীব্র, কেননা এর চিত্রায়ণ অংশটির পর যে বিষয়টি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সেটি এডিটিং। বেশ লোভ হচ্ছিল সিনেমাটির বেশ কিছু দৃশ্য’র এডিটিং এর পেছনের ঘটনা জানতে। টেকনিক্যাল এই বিষয়গুলোর প্রতি আমার লোভ সীমাহীন। তবে একটা বিষয় কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, কিছু অদ্ভুত রকমের অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে এর এডিটিং-এ এবং কেন সেদিকে কেউ লক্ষ করে নি সেটা আমাকে চরম বিরক্ত করেছে। এমন ভুলগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়, যেমন, আয়নাকে যখন অটো রিকশা থেকে ফেলে দেওয়া হলো, তখন অটো রিকশার পেছন থেকে জায়গাটিকে সম্পূর্ণরূপে জনশূন্য দেখানো হলো এবং আয়না যখন পড়ল, তখন দেখা গেল তার পড়া আর পেছন থেকে ২/৩জন যুবকের দৌড়ে আসা বিষয় দুটো একই সাথে ঘটল। যুবকদের দৌড়ে আসা আর আয়নার পড়া যুগপৎ ঘটেছে, বিষয়টি নিতান্তই আনকোরা। জনশূন্য একটি জায়গায় মুহূর্তেই এতগুলো মানুষের হঠাৎ আবির্ভাব অদ্ভুতুড়েই বটে।

এছাড়া আয়না ও নায়িকার বাসা খুঁজতে বের হওয়া, যেখানে তারা এক কাপড়ে বের হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পোশাক বদলে গেল। ধরে নিলাম আয়না ছদ্মবেশ নিয়েছিল, তাই মানা যায় যে, সে হয়তো কোনো এক সময় তার পোশাক বদলে নিয়েছে, কিন্তু নায়িকা, সে নিশ্চয় আরেক সেট সালোয়ার কামিজ সাথে নিয়ে বের হয় নি, অথচ এত দ্রুত নায়িকার সালোয়ার কামিজ এমনকি ওড়না পর্যন্ত বদলে গেল, রীতিমতো ভেলকি বাজি বটে।

আরও রয়েছে, যেমন ট্রেন চলে যাবার পর কমলাপুর স্টেশন সম্পূর্ণ ফাঁকা দেখানো কিংবা সেলুনে দাঁড়িয়ে রিপোর্টারের চিৎকার করে আয়নাকে ভয় দেখানো। এই বিষয়গুলো অবশ্যই এডিটিং এর সময়ে খেয়াল রাখা জরুরি ছিল। তারপরও সবমিলিয়ে ‘আয়নাবাজি’র এডিটিং আমাকে খুশিই করেছে অধিক।


আমাদের জন্য ‘আয়নবাজি’ সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজন ছিল।


পরিশেষে, বলতে বাধ্য হচ্ছি, ‘আয়নাবাজি’ আমাদের ভালো লাগা বা গ্রহণ করার কারণ এর সিনেমা হয়ে উঠার জন্য নয়, কেননা যাদের সত্যিকার সিনেমা অভিজ্ঞতা ও বিশ্ব সিনেমার সাথে ভালো পরিচয় রয়েছে, তারা ‘আয়নাবাজি’কে কোনো অবস্থাতেই ১০ এর মধ্যে ৬ এর বেশি রেটিং প্রদান করবেন না (অবশ্য দেশীয় সিনেমা বলে কেউ কেউ ৭/৮ ও করতে পারে, সেটা ভিন্ন)। এমনকি চঞ্চল চৌধুরীর যে অভিনয় এত প্রশংসিত হয়েছে, সেখানে আমার কাছে আয়না ও নেতার চরিত্র ছাড়া তাকে যথেষ্ট পরিপূর্ণ মনে হয় নি, অন্তত যে অভিনয় আমি দেখেছি তার ‘মনপুরা’তে, সেখান থেকে তিনি ‘আয়নাবাজি’তে অনেক দূরে সরে গেছেন। তারপরও ‘আয়নাবাজি’র বাজিমাত করার কারণ, আমরা চরমভাবে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমরা অপেক্ষা করছিলাম বদলের, ভিন্ন কিছুর। মাঝে মাঝে যে দুচারটে ভালো সিনেমা আমাদের সামনে এসেছে, সেগুলো আমাদের এভাবে নাড়া দিতে সক্ষম হয় নি। ‘মনপুরা’ আমাদের যে মনোযোগ কেড়েছিল, সেটাও থিতু হয়ে এসেছিল গত সাত বছরে, ফলে বিরক্ত ও বিমুখতা থেকে বিদেশি যে সিনেমাগুলোর মাধ্যমে আমরা সমৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠছিলাম বা উঠেছি এতদিনে, সেখানে ‘আয়নাবাজি’ আমাদের সেই অভিজ্ঞতার সমান্তরাল দারুণ এক প্রয়াস, আর সেই প্রয়াসকে পরিচালক ইচ্ছাকৃতই দেশীয় হিশেবে আমাদের কাছে বাজারজাত করেছেন, যা আমাদের জন্য সাবলীলভাবে গ্রহণ করা ছিল স্বাভাবিক ও চিন্তাকর্ষক। বলতে দ্বিধা নেই দীর্ঘদিন পর এমন প্রয়াস বলেই জনাব রেজা উতরে গেলেন, নয়তো ‘মনপুরা’র অভিজ্ঞতায় যে দর্শক বা শ্রেণি সমৃদ্ধ তাদের সামনে এমন প্রয়াস সামনের দিনগুলোতে অবশ্যই মুখ থুবড়ে পড়বে।

তারপরও আমাদের জন্য ‘আয়নবাজি’ সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজন ছিল, একটা দরজা যা পুরোপুরিভাবে বন্ধ হতে চলেছিল, যেটা খুললে আমরা আকাশ, বিশুদ্ধ বাতাস, পরিবেশ কিংবা নিজেদের নিজস্বতা ফিরে পাব, সেই দরজা ‘আয়নাবাজি’ সম্পূর্ণরূপে না হলেও অধিকাংশরূপেই খুলেই দিয়েছে। এটা এত বেশি জরুরি ছিল যে, এই কারণে ‘আয়নাবাজি’কে আমি অজস্রবার সাধুবাদ জানাতে রাজি আছি। নয়তোবা এত সহজেই একজন প্রহরীকে কনভিন্স করে আয়নার জেল থেকে বেরিয়ে একটা সাইকেলে চড়ে পলায়ন, নিতান্তই হাস্যকর। সিনেমা শেষ করার পরও যখন আমরা বুঝতে পারি না যে, সিনেমাটি খুব বাজে ও হাস্যকরভাবে শেষ করা হয়েছে, তখন আয়না নিজে উচ্চস্বরে হেসে আমাদের দীনতাকেই স্মরণ করিয়ে দেন। কারণ আয়না বরং মৃত্যুকেই গ্রহণ করেছিল, মুক্তির কোনো আশা তার নিজের কাছেই ছিল, না আমাদের কাছে, এমনকি সে যে মুক্তি পাবে বা মুক্তি পাবার মতো কোনো সম্ভাবনাও রয়েছে, তারও বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত ছিল না কাহিনিতে। নিতান্তই অকস্মিকভাবে মৃত্যু থেকে বেঁচে আসা কোনো মানুষ এভাবে হেসে বোঝাতে পারে না যে, সে চতুর ও নিশ্চিত ছিল এই পালানোর ব্যাপারে।

আমরা অতিশয় আবেগী জাতি, যার রেশ আমাদের সকল কর্মকাণ্ড এমনকি আলোচনা, সমালোচনা, ঝগড়া কিংবা পক্ষপাত করার ব্যাপারেও সমানভাবে পরিলক্ষিত, নয়তো ‘আয়নাবজি’র যতগুলো রিভিউ বা আলোচনা (যদিও তা নিতান্তই হাতে গোনা ও অতি প্রশংসায় জর্জরিত) পড়লাম, সেখানে আমাদের সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন সেভাবে দেখতে পাই নি। অথচ আামদের বিশাল একটা অংশ সমসমায়িক বিশ্ব সিনেমার সাথে, বিশেষ করে এশিয়ান দর্শকরা আর যাই হোক ইরানি ও কোরিয়ান ঘরানার সিনেমার সাথে খুব ভালোভাবেই পরিচিত, অথচ সেই পরিচিতি থাকার পরও ‘আয়নাবাজি’ সম্পর্কে যেসব বিশেষণ তারা তুলে ধরছেন, তা আমার কাছে বরং অতিশয় মনে হয়েছে, অথচ প্রশংসা করার গ্রাউন্ড অবশ্যই পোক্ত হওয়া জরুরি, নতুবা বিভ্রান্তি আসাতে পারে। কোনো বিষয় বা বস্তুতে যদি যথাযথ ম্যাটেরিয়ালস থাকে, তবে যে পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হোক না কেন, ধীরে ধীরে তা আরও পরিষ্কার ও গভীরভাবে ধরা দেবেই দেবে। কিন্তু বাস্তবতা এটাও যে, ‘আয়নাবাজি’ দর্শকরা খুব দ্রুত ভুলে যাবে এবং অনেক অনেকদিন পর হলেও ‘মনপুরা’ বরং ফিরে ফিরে আসবে, নিঃসন্দেহে।

‘আয়নাবাজি’ সিনেমাটি আমার যে একদম ভালো লাগে নি তা বলব না, বরং একটি সিনেমা থেকে আমি যা যা আশা করি তার ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ‘আয়নাবাজি’ আমাকে দিতে সক্ষম হয়েছে, আর এখানেই হয়তো ‘আয়নাবাজি’ সফল। এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই, সমসাময়িক বাংলাদেশি দর্শকদের দেশীয় সিনেমার যে অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা ‘আয়নাবাজি’র দ্বারা এক ঝটকাতেই অনেকখানি সামনে চলে এসেছে, যা আমাদের সিনেমার জন্য শুভ, যার জন্য পরিচালক অমিতাভ রেজা অবশ্যই আলাদাভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে দর্শকদের সেই অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য, যা আমাদের নিজস্ব বাতাবরণে অনেক বেশি ব্যতিক্রমী ও আধুনিক। আরও ভালোভাবে বললে বলা চলে, সিনেমা যা বহুমাত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়েই এগিয়েছে এবং প্রতিটি নিরীক্ষারই রয়েছে আলাদা দর্শক ও সমজদার, ফলে শিল্পের এই প্রয়াস কখনও যেমন থেমে থাকে নি, তেমনই সামনের দিনগুলোতেও থেমে থাকবে না, তারই সূত্র ধরে ‘আয়নাবাজি’ নিঃসন্দেহে আধুনিক বাংলাদেশি সিনেমার জন্য একটি মাইলফলক।

সবশেষে বলব, ‘আয়নাবাজি’র কাছে আমি কৃতজ্ঞ, ব্যতিক্রমী একটি সিনেমা হয়ে উঠার জন্য নয়, বরং এর দারুণ সাফল্য ও তাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ‘মনপুরা’ সিনেমাটি আমাকে অধিক মনোযোগ ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয়েছে বলে। বাংলাদেশি সিনেমা দেখা ছেড়েছি বেশ কিছু বছর। শেষ যে বাংলা সিনেমা দেখেছি সেটা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। শুধুমাত্র ‘আয়নাবাজি’র কারণেই আমি ‘মনপুরা’তে আকৃষ্ট হয়েছিলাম এবং বলতে দ্বিধা নেই, সমসাময়িক বাংলাদেশি সিনেমায় যদি কোনো সার্থক ও কমপ্লিট সিনেমা যুক্ত হয়ে থাকে, সেটি ‘মনপুরা’। যেখানে সিনেমাটি কেবল একদম শুরুর দৃশ্য থেকেই সার্থক সিনেমা হিশেবে এগিয়ে যায় নি, বরং কাহিনি যত এগিয়েছে, ততই আমাকে বিস্ময়াভূত করেছে পরিচালকের সিনেমা জ্ঞান দেখে, যা ‘আয়নবাজি’তে অনুপস্থিত। আয়নাবাজি নিতান্তই বাজিমাত করেছে আমাদের বর্তমান রুচিবোধ ও মানসিকতা থেকে, সিনেমা অভিজ্ঞতা থেকে নয়। তারপরও খুশি মনেই ‘আয়নাবাজি’র জন্য দাঁড়িয়ে একরাশ করতালি আমি আনন্দ চিত্তেই দেবো, কেননা এমন প্রয়াস অবশ্যই আমাদের জন্য জরুরি ছিল, জরুরি ছিল আমাদেরকে টেনে বের করে আনা, যখন আমরা চূড়ান্তরূপেবিমুখ হয়ে ফিরে এসেছিলাম বন্ধ দরজার এপাশে।

আন্তরিক ধন্যবাদ টিম ‘আয়নাবাজি।’

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য