হোম গদ্য হেলাল হাফিজের কবিতা ও বাঙাল লেখকের কাঙালপনা

হেলাল হাফিজের কবিতা ও বাঙাল লেখকের কাঙালপনা

হেলাল হাফিজের কবিতা ও বাঙাল লেখকের কাঙালপনা
2.38K
0

সে এককাল ছিল যখন কবিরা রাজরাজড়ার সভাসদে পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে কাব্যচর্চা করেছে। সেটা কাব্য নাকি স্তুতিকাব্য সে-বিচার বহুকথার। তো ওইসব রাজরাজড়ার শাসনের পর অর্থাৎ সামন্ত গেল, উপনিবেশ হলো, ভারতভূমি ভাগ হলো, পাকিস্তানি শাসক এল; দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল, লড়াই হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। এই যে-সময় কিংবা ইতিহাস ভারতভূমিতে এক চক্রে পাক খায় আর পশ্চিমে খায় আরেক চক্রে। পশ্চিমে বিজ্ঞানের প্রসার আর নয়া নয়া আবিষ্কারের ঢেউয়ে পুঁজিবাদের তিনটা ধরন তৈরি হয়। সময় হিশাবে এই ধরনগুলো ভাগ করলে পড়বে ১৮৬০-এর দশকে বাজারি পুঁজিবাদ যার নিয়ামক বাষ্পীয় ইঞ্জিন, ১৮৯০-এর দশকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ যার নিয়ামক বিদ্যুৎ আর ১৯৪০-এ বহুজাতিক সংস্থার পুঁজিবাদ যার নিয়ামক হলো পরমাণুশক্তি। বহুজাতিক পুঁজিবাদের যখন শুরু তখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয় নাই। তবে ভারত ভাগের একটা খসড়া তৈরি হয়। আর ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের ভাগে পড়লে আরেক ঔপনিবেশিক চক্রে আটকা পড়ে। যদিও এইসময় থেকেই বাংলাদেশ পৃথক রাষ্ট্র হওয়ার জন্য একটা পরিসর তৈরি করতে থাকে। আর এই সময়টাকেই বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস শুরু হিশেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিও কেউ কেউ হাল আমলে এটা নিয়ে একটা কুতর্ক তৈরির অপচেষ্টা চালায় তবে উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা হালে টিকে না। কারণ উপনিবেশ সৃষ্টির পর থেকেই তার প্রতিক্রিয়া হিশেবে উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট চালু হয়ে যায়। তো সেই বিচারে বাংলাদেশের সাহিত্য তখন থেকেই শুরু ধরা হয়। তো দেখা যায় যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে বহুজাতিক পুঁজিবাদের যুগে।


সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার স্রষ্টাদের মধ্যে কবি হিশেবে নামডাকটাই বেশি কানে আসে।


তো সময়টা যখন বহুজাতিক পুঁজিবাদের তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুঁজিবাদের আদলেই তৈরি হতে থাকে। যার প্রভাব দেশীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতেও পড়ে। আর বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত হিশাব করলে এখানে দেশীয় সাহিত্য যে-ঐতিহ্য কিংবা মিথকে আশ্রয় করে গড়ে উঠার কথা তা হয়ে ওঠে নি। ঔপনিবেশিক শাসন সেখানে একটা প্রভাববিস্তারী ভূমিকা রাখে। ফলে হিন্দু লেখকেরা হিন্দু মিথকে অবলম্বন করে যেমন সাহিত্য-রচনা করতে থাকে ঠিক তেমনি মুসলামন লেখকেরা মুসলমানি ঐতিহ্য কিংবা কাহিনিকে বিষয় হিশেবে ধরে। তো উভয়ের কেউ-ই এটা মাথায় রাখে না আসলে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যাপারটা নিজস্ব ভূমি কিংবা ঐতিহ্যের সঙ্গে কতটা যায়। তবে এক্ষেত্রে আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে-ইউরোপীয় রেনেসাঁসের ঢেউ এই অঞ্চলে আসতে অনেক সময় লাগে। ততদিনে ইংরেজ কলোনি হয়ে ভারত ভুগতে থাকে। আর এই কলোনিয়াল প্রেক্ষাপটে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সাহিত্যিকরা আমদানি করা মাল-মসলা দিয়ে তাদের সাহিত্যনির্মাণ শুরু করে। এর বাইরে যে-থাকে না তা কিন্তু নয়। তবে সেখানে ঈশ্বরগুপ্তকেই পাওয়া যায়। তো কলোনিয়াল এই লিগ্যাসি ধরে সাহিত্যচর্চা যখন চলে তখন একটা ব্যাপার লক্ষ করা যায় আর তা হলো, সাহিত্যিকদের খেতাব কিংবা তকমা দেওয়ার ব্যাপারটা। এই ব্যাপারটার মধ্যে একটা কলোনিয়াল প্রেক্ষাপট থাকে যেমন, রায় বাহাদুর, প্রিন্স, জমিদার, তালুকদার ইত্যাদি তকমা বা খেতাব দেওয়া হতো ইংরেজ শাসনামলে তেমনি সাহিত্যিকদের মধ্যেও ব্যাপারটা চলে আসে। তবে এখানে ব্যাপারটা একটু অন্যভাবে ঘটে। সেটা ঘটে সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম দ্বারা। আর সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটে এভাবে : ঈশ্বরগুপ্ত যুগসন্ধিক্ষণের কবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাববাদী কবি, কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি, জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার কবি, ফররুখ আহমেদ মুসলিম রেনেসাঁর কবি, জসীম উদ্‌দীন পল্লীকবি আরও কত নাম কত খেতাব কত তকমা। তো এসব খেতাব কিংবা তকমায় লেখক একটা চটকা সুড়সুড়ি পায় ঠিকই কিন্তু তার সাহিত্যকর্ম মার খায় অন্যভাবে। কারণ পাঠক তাকে সাধারণজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে ওই তকমা দিয়ে চিনতে যায় ফলে এর বাইরে তার অন্য সাহিত্যকর্ম কিংবা সাহিত্যিক ভাবনা আর নজরে আসে না কিংবা চাপা পড়ে যায়। যেমন, রায়বাহাদুর কিংবা রাজবাহাদুর খেতাবধারীরা ইংরেজের তাবেদারি করে এই খেতাব পাওয়ার পর নিজের অতীত নির্বাসনে দিয়ে রাজা ছাড়া আর নিজেকে কিছুই ভাবতে পারে না। ফলে ওই সকল বংশের লিগ্যাসি যারা বহন করে তারা এখনও বলে, আমার পূর্বপুরুষেরা জমিদার ছিল। ফলে তার অতীত কিংবা ইতিহাস আর থাকে না কারণ সে কলোনিয়াল খেতাব বা তকমা পাওয়ার দিন থেকেই তার পরিচিতি নির্মাণ করতে থাকে। তো কবি সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে এই তকমাটা ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়ায়। ওই সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম পাঠকের কাছে যেন ওই একটা নামেই বিবেচিত হয় যে-নামটার তকমায় বা খেতাবে তাকে আটকে ফেলা হয়। এইরকম একজন কবির নাম হেলাল হাফিজ। হেলাল হাফিজের কথায় পরে আসা যাবে।

২.
বহুজাতিক পুঁজিবাদের যে-যুগটা চলছে সেই যুগে কবিতার বেঁচে থাকা বড়োই কষ্টকর। কবিতা না-বাঁচলে কবিও বাঁচবে না। হিশাব তো তাই বলে। কারণ নদী না বাঁচলে জেলেও বাঁচবে না। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার স্রষ্টাদের মধ্যে কবি হিশেবে নামডাকটাই বেশি কানে আসে। কিংবা মিছিলে, স্লোগানে, আড্ডায়, পাঠের আসরে কবিতা-ই বেশি চলে। মহামতি এরিস্টটল কাব্যতত্ত্ব নামে যে-গ্রন্থথানি রচনা করেন তাতে সাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান বিশেষ করে নাটকের চরিত্র বিচার করার ক্ষেত্রে বেশি বার্তা প্রদান করেন কিন্তু তারপরও বইটার নাম কাব্যতত্ত্ব হয়। যদিও তিনি কাব্য বলতে সাহিত্যের সকল শাখাকে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তো কথা হচ্ছে যখন বহুজাতিক পুঁজিবাদের কালে কবিতা নিয়ে আর আমাদের সাহিত্যচর্চা গড়ে ওঠে কলোনিয়াল প্রেক্ষাপটে তখন কেমন হওয়া দরকার কবির কবিতাযাপন? কবিতাযাপন ব্যাপারটা এল হেলাল হাফিজের একটা কবিতার সূত্র ধরে। ‘যুগল জীবনী’ কবিতাটা লক্ষ করা যাক :

আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না।
বলে,—‘কি নাগর
এতো সহজেই যদি চলে যাবে
তবে কেন বেঁধেছিলে উদ্বাস্তু ঘর,
কেন করেছিলে চারু বেদনার এতো আয়োজন।
শৈশব কৈশোর থেকে যৌবনের কতো প্রয়োজন
উপেক্ষার ‘ডাস্টবিনে’ ফেলে
মনে আছে সে-ই কবে
চাদরের মতো করে নির্দ্বিধায় আমাকে জড়ালে,
আমি বাল্য-বিবাহিতা বালিকার মতো
অস্পষ্ট দু’চোখ তুলে নির্নিমেষে তাকিয়েছিলাম
অপরিপক্ব তবু সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়েছিলাম
অতোশতো না বুঝেই বিশ্বাসের দুই হাত বাড়িয়েছিলাম,
ছেলেখেলাচ্ছলে
সেই থেকে অনাদরে, এলোমেলো
তোমার কষ্টের সাথে শর্তহীন সখ্য হয়েছিলো,
তোমার হয়েছে কাজ, আজ আমার প্রয়োজন ফুরালো?

আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না।
দুরারোগ্য ক্যান্সারের মতো
কবিতা আমার কোষে নিরাপদ আশ্রম গড়েছে,
সংগোপনে বলেছে,—‘হে কবি
দেখো চারদিকে মানুষের মারাত্মক দুঃসময়
এমন দুর্দিনে আমি পরিপুষ্ট প্রেমিক আর প্রতিবাদী তোমাকেই চাই’।

কষ্টে-সৃষ্টে আছি
কবিতা সুখেই আছে,—থাক,
এতো দিন-রাত যদি গিয়ে থাকে
যাক তবে জীবনের আরো কিছু যাক।


সাক্ষাৎকারে তার বয়ান থেকে জানা যায়, প্রথম কাব্যগ্রন্থের পর তার স্বেচ্ছানিরুদ্দেশের কথা, তাসের জুয়ায় জীবনের খরচ-মেটানো, সুন্দরী নারীদের সময় বিকানো এমন অনেক তথ্য।


এখানে একজন কবির কবিতা বিষয়ক ভাবনা কিংবা তার যাপিত জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ দিয়ে কবিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। এটা এক দিক দিয়ে যেমন কবির ক্ষরণ সাপেক্ষে আর্তনাদ আবার আরেক দিক দিয়ে তার সাহিত্যিক বিপর্যয়। ‘আমি ছেড়ে যেতে চাই, কবিতা ছাড়ে না’—কথাগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেরালে একটা বিচ্ছেদের ব্যাপার লক্ষ করা যায়। যা পেতে এত ত্যাগ কিংবা ক্ষরণ হয় তাকে কেন ছাড়তে চায় কবি? এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে—এটা কবিতার ভাষা কিংবা বিষয়টা কবিতা। কবি তার ইচ্ছা মতো এটা লিখতে পারে তাই এটা যে-তার যাপিত জীবনের আস্ফালন কিংবা বাস্তব সত্য থেকে উচ্চারিত হয়ে শিল্প সত্যে রূপান্তরিত হচ্ছে এমন নাও হতে পারে। তো কথা থেকে যায় কবির নাম যখন হেলাল হাফিজ। আর কবিতাটি লেখার সময়কাল ১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর। এই সময়টা উপলব্ধি করা দরকার বাংলা ভাষায় বাংলাদেশে আর কারা কবিতাচর্চা করছেন সেটার একটা তুলনামূলক চিত্র ধরে। আরও খোলাসা করে বলা যায়, হেলাল হাফিজের সমকালীন যারা কবিতাচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা ওই সময়টায় কবিতার বিষয়কে কিভাবে নির্ধারণ করেছিলেন। ‘যুগল জীবনী’ কবিতায় হেলাল হাফিজ কবিতা ছাড়ার যে-প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন সেটা কি তার ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতা নাকি সমকালীন প্রভাব এটা একটা প্রশ্ন তৈরি করে। আর এই প্রশ্নটার উত্তরের জন্য ব্যক্তি হেলাল হাফিজের প্রসঙ্গ টানা যাক। হেলাল হাফিজের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তার বয়ান থেকে জানা যায়, প্রথম কাব্যগ্রন্থের পর তার স্বেচ্ছানিরুদ্দেশের কথা, তাসের জুয়ায় জীবনের খরচ-মেটানো, সুন্দরী নারীদের সময় বিকানো এমন অনেক তথ্য। হেলাল হাফিজের এসব কথা সত্য হলে তাকে আমার জীবনাচরণের দিক থেকে কবি শার্ল বোদলেয়ারের মতো লাগে। যদিও সময়, প্রেক্ষাপট, স্থান ভিন্ন তবুও যাপিত জীবনের একটা রেশ যেন থেকে যায়। বোদলেয়ার-এর কবিতায় তার যাপিত জীবনের প্রভাব পড়েছে এভাবে : মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের শিথিলতা, প্রেমিকার চলে যাওয়া, আর্থিক সংকট, হতাশা আরও নানাবিষয় যার সবই নেতিবাচক। তো হেলাল হাফিজের বেলা যদি এসব অনুষঙ্গের একটা মিল খুঁজি তাহলে পাওয়া যায় : শৈশবে মায়ের মৃত্যু, হেলেন নামের এক নারীর কথা, গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়চিত্র ও রাজনীতি। দুই কবির ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে মিল পাওয়া গেলেও দুইজনের লেখার বিষয়ের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক আর সময় প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। তো যে প্রসঙ্গে হেলাল হাফিজের ব্যক্তিজীবন টানা হলো আর তাতে বোদলেয়ার এসে যুক্ত হলো সেখানে একটা বিষয় কিছুটা খোলাসা হলো যে, শার্ল বোদলেয়ার কিংবা হেলাল হাফিজ কেউ সময় কিংবা ব্যক্তিজীবনের প্রভাবকে অতিক্রমণ করে কবিতাচর্চা করতে পারেন নি। আর শার্ল বোদলেয়ার ও হেলাল হাফিজ উভয়ের কবিতায় রোমান্টিসিজম-এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামক যে-কবিতাটা দিয়ে হেলাল হাফিজকে পরিচয় করানো হয় স্লোগানের কবি কিংবা এটা কবিতা না-হয়ে স্লোগান হয়েছে সেই সময়টা বিবেচনার দাবি রাখে। আর হেলাল হাফিজ তো ব্যক্তিজীবন দ্বারা তাড়িত এক কবি। তো তার সেই বৈশিষ্ট্য ধরে বলা যায় যে-ঘটনাটা দেখে তিনি লিখলেন,

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

সেই সময়টা ১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রয়ারি। সময়টা খেয়াল করলে বুঝা যায়, হেলাল হাফিজ যাপিত জীবন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তার কবিতার অনুষঙ্গ খুঁজলে কয়েকটি বিষয় ঘুরেফিরে আসে : মা হারার শোক, যুদ্ধ পরবর্তী সময়, হেলেন নামের এক নারী, রাজনীতির মামদোবাজি, মানবিক আস্ফালন আর শূন্যতাবোধ। এই বিষয়গুলো খেয়াল করা দরকার। এজন্যই দরকার যে, হেলাল হাফিজ প্রথম এসব বিষয় কবিতায় স্থান দিচ্ছেন তা কিন্তু না। কিন্তু হেলাল হাফিজ টিকে গেছেন। এবং এই টিকে যাওয়াটা একটা মাত্র কাব্য দিয়ে। যেটা প্রকাশিত হবার পর তিনি কবিতা প্রকাশ করা যেমন বন্ধ রাখেন তেমনি নিজেকেও আড়াল করেন। তো কথা হচ্ছে বহুজাতিক পুঁজিবাদের আগ্রাসনের সময়ে প্রচার আর প্রসারই যখন বাণিজ্যের প্রধান কলকাঠি হিশেবে জানান দেওয়া হচ্ছে তখন একজন কবি নিরুদ্দেশ কিংবা আর কবিতা প্রকাশ না করার পরেও কিভাবে টিকে থাকলেন পাঠকের কাছে? আর যে-সময়ে কবি নিরুদ্দেশ হচ্ছেন তখন ফেসবুক কিংবা ই-মেইল এসব মাধ্যমও ছিল না। তারপরও হেলাল হাফিজ এই প্রজন্মের কাছেও পরিচিত হলেন তার একখান মাত্র কবিতার বই দিয়েই। কোনো পাঠ্যক্রমে তাকে জায়গা দিয়ে পরিচিত করাতে হলো না পাঠকের কাছে। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা দরকার যে, বহুজাতিক পুঁজিবাদের বিস্তার বা আগ্রাসনে শিল্পকলার বিবিধ মাধ্যমকে তারা কব্জা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু সাহিত্যমাধ্যমটায় তাদের লাভ-লোকসানের হিশাবটা প্রভাব তৈরি করে না কিংবা বাজার ধরার যে-চটকা ফর্মুলা তাতে সাহিত্য কোনো সূত্র দেখায় না। কিন্তু প্রচার আর প্রসার যখন মূল হয়ে কাজ করছে তখন একশ্রেণির সাহিত্যিকরা নিজেই সেটাতে ধরা দিলেন। তাদের ধরা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে, তারা পৃষ্ঠপোষকতার দিকে ঝুঁকলেন। আর ব্যাপারটা লুফে নিল দেশীয় কর্পোরেট হাউস। ততদিনে দেশে মিডিয়া একটা ভালো পজিশন তৈরি করে ফেলেছে বিশেষ করে প্রচারণার জগতে। তো লেখকেরা মিডিয়ার কাছে নিজের প্রচারণার ক্ষেত্রে যে পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপার সেটা গ্রহণ করলেন আর কর্পোরেট হাউস ওই লেখকদের ‘তথাকথিত বুদ্ধিজীবী’ ইমেজটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা শুরু করলেন। তো সোসাইটিতে লেখালেখি করার ব্যাপারটাকে যেহেতু বুদ্ধিজীবীতা হিশেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে সেই জায়গা থেকে কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় বুদ্ধিজীবী নির্মাণ অর্থাৎ লেখক নির্মাণ শুরু হয়ে গেল। সেক্ষেত্রে সাহিত্য যেন আবার সেই সামন্ত যুগের একটা আদল পাওয়া শুরু করল যেখানে রাজরাজড়ার সাফাই কিংবা স্তুতির একটা ব্যাপার ছিল। যেহেতু সময়টা বহুজাতিক পুঁজিবাদের তাই ব্যাপারটা এখানে অন্যভাবে ঘটল। আর সেক্ষেত্রে লেখার বিষয় কী হবে সেটা কর্পোরেট হাউস তাদের এজেন্ডা কিংবা বাণিজ্যিক বিষয়াদি মাথায় রেখে ছক এঁকে দিলো। তখন লেখক শুধু বাণিজ্যিক লেখক হলেন না, হলেন প্রতারকও যেহেতু ওই সকল কর্পোরেট হাউসের নিজস্ব প্রচারণার জায়গা থাকে তাই তারা লেখকের লেখা দেশের পাঠকের কাছে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজ করলেন, ফলত পাঠকের কাছে লেখকের একটা তড়িৎ পরিচিতি তৈরি হলো। বিশেষ করে কেন্দ্র আর প্রান্তের যে-ডিসকোর্স সেখানে ঢাকার বাইরের পাঠকেরা ওই লেখককে খুব সহজে বড়ো লেখক ভাবতে শুরু করল। এই কাঠামো কিংবা প্রক্রিয়ায় সাহিত্যচর্চার যে-ধারা তৈরি হলো তাতে লেখক নিজের কী করলেন সেটা তার ব্যাপার কিন্তু সাহিত্যকে একটা পুঁজিবাদী প্রোডাক্ট হিশেবে প্রান্তের পাঠকদের কাছে পরিচয় করালেন। যেহেতু প্রচারই বাণিজ্যের কৌশল আর সেটা লেখকের হয়ে কর্পোরেট হাউস করে দিচ্ছে তো প্রবীণ-নবীন অনেক লেখক-ই এই দিকটায় ঝুঁকলেন। এসব ক্ষেত্রে দুইটা ঘটনা ঘটল : প্রথমত, দেশীয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ওইসব কর্পোরোট হাউসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া শুরু হলো; দ্বিতীয়ত, এই নিয়ন্ত্রণ করার কাজটা তারা সেইসব লেখক সাহিত্যিক যাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন তাদের দ্বারা করালেন। ফলে সাধারণ ভোক্তা ব্যাপারটা আঁচ করতে তো পারলেন না উল্টো ওইসব ব্যক্তিদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি ভেবে তাদের অনুসরণ, অনুকরণ করার একটা প্রবণতার দিকে ঝুঁকল। এসবের পাশাপাশি আরেকটা ব্যাপার ঘটল আর তা হলো : ওই লেখকের একটা সাহিত্যবলয় তৈরি হলো যা করল আরেক শ্রেণির লেখক যারা ওই লেখকের তাবেদারি কিংবা ফরমায়েশি করে লেখক হিশেবে নিজের নাম হাসিলের জন্য একটা উপায় হিশেবে ওই বলয়টাকে ব্যবহার করতে চাইল। তো যারা কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিল কিন্তু পেল না, তারা আবার আরেক ধরনের সাহিত্যিক গোষ্ঠী তৈরি করল। যেখানে নিজেরা নিজেদের নাম ডাক ছড়াতে লাগল। এইসব গোষ্ঠী ভাব-ভড়ংয়ে ‘কল্লোল’ হাওয়া প্রবাহিত করতে চাইল কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য তো নিজের প্রচার আর প্রসার ফলে ব্যক্তি হিশেবেই তারা পরিচিত হলেন নিজেদের মধ্যে সাহিত্যিক হিসেবে নয়। আর এইরকম অসংখ্য গোষ্ঠী বা বলয় বিভিন্ন লেখককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকল। ফলে সাহিত্য, সাহিত্যিক কোনোটাই ব্যক্তিকে অতিক্রম করতে পারল না। এক্ষেত্রে আরেকটা ব্যাপার ঘটতে থাকল, তারা নিজেরা নিজেদের বিভিন্ন তকমা দিয়ে পরিচিত করাতে চাইল। এইকথাগুলো ধান ভানতে শিবের মতো হয়ে গেলেও হেলাল হাফিজের প্রসঙ্গ টানার জন্যই এটা টানা হলো। হেলাল হাফিজ নামটার সঙ্গে এই-সকল বিষয় আশয় যুক্ত হয় নাই। কিন্তু তারপরও হেলাল হাফিজ টিকে গেল। এবার হেলাল হাফিজের কবিতার দিকে চোখ ফেরানো যাক।


কবি নিজেকে আরেক কবিতায় পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে—‘দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ’ বলে।


হেলাল হাফিজ যে বিষয়কে কেন্দ্র করে তার কবিতার জগৎ নির্মাণ করেন তা পরিচিত দৃশ্য। জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় বনলতা, সুরঞ্জনা, সবিতা আরও অনেক নারীর নাম নিয়েছেন আর হেলাল হাফিজ নিলেন হেলেনের নাম। হেলাল নামটার সঙ্গে হেলেন নামটার বর্ণমালার একটা মিল পাওয়া যায়। কবি কি সেজন্যই হেলেন নামটা ব্যবহার করলেন? ব্যাপারটা এমন নাও হতে পারে। কারণ হেলেন নামের এক নারী তার জীবনে এসেছিল এমন কথা শোনা যায়। তো সেই হেলেনকে ঘিরেই যদি তার বিচ্ছেদের জগৎ তৈরি হয় তাহলে পাঠক তাকে তকমা দিচ্ছে ‘কষ্টের ফেরিওয়ালা’। তবে হেলাল হাফিজের এই কষ্ট তো শৈশবে মাতৃবিয়োগের কষ্টও বটে। আবার একই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন হননের কষ্ট। তো এইসব কষ্ট তার কবিতায় ভর করছে। কবি নিহিলিস্ট হতে পারে। তবে পাঠক কেন তার কষ্টের ভাগীদার হবে? এই বিষয়টাই হেলাল হাফিজের কবিতাকে জীবিত রাখল। আর পাঠক তার কষ্টের ভাগীদার হলো নির্জ্ঞান মনে। নির্জ্ঞান মন আমাদের সচেতন মনের বহু কর্ম নির্ধারণ করে আর সেইসব কর্মের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তো হেলাল হাফিজ তার কবিতায় যে-কষ্ট ধরতে চেয়েছেন তা পাঠকের নির্জ্ঞান মন হতে উৎসারিত। ফলে পাঠক যখন হেলাল হাফিজের কষ্টের কবিতা পড়ছে তখন তার নির্জ্ঞান মন সংজ্ঞান চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে এবং কষ্টটাকেই আপন মনে করছে। এটা তার যাপিত জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা হতে পারে আবার হতে পারে নির্জ্ঞান মনের কোনো ফ্যান্টাসি।

সময় পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু হেলাল হাফিজ যে কষ্টটাকে নির্মাণ করেছেন পাঠকের এই নির্জ্ঞান মন সেই কষ্টের একটা লিগ্যাসি তৈরি করেছে। ফলে তার কবিতা কোনো বাণিজ্যিক প্রচারণা কিংবা কর্পোরেট আঁচড় না নিয়ে টিকে গেল। কিন্তু হেলাল হাফিজকে যখন কষ্টের ফেরিওয়ালা তকমা দিচ্ছে পাঠক তখনই সে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে কবি নিজেকে আরেক কবিতায় পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে—‘দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ’ বলে। এটা পাঠকের মনে একটা তকমার প্রভাব তৈরি করতে পারে। তার কবিতার ভাষা খুব সাধারণীকরণ হয়ে এসেছে ঠিকই কিন্তু আবেদনের জায়গা তাতে কমে নি। ফলে নিজের ভাবনার জগতের সঙ্গে পাঠকের ভাবনার জগতের একটা মেলবন্ধন তৈরি হয়ে গেছে। তখন প্রশ্ন উঠতে পার হেলাল হাফিজের কবিতা কোন শ্রেণির পাঠককে আকৃষ্ট করে? এই প্রশ্নের উত্তর হিশেবে দুইটা বিষয়কে দেখা যায়। একটা কেন্দ্র-প্রান্ত ডিসকোর্স আরেকটা সাবলটার্ন। মুখচোরা মানুষ কবি জীবননান্দ দাশও এটার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। ফলে তার কবিতা ওই সময়ে পাঠকপ্রিয়তা পায় নাই এবং সমালোচকের নেকনজরও পড়ে নাই। তো অবস্থাটা এমন হয় যে-জীবনানন্দ দাশ কবি হিশেবে সাবলটার্ন হয়ে পড়েন ওই সময়ে। তো হেলাল হাফিজ যেহেতু কোনো গোষ্ঠী কিংবা কর্পোরেট হাউসের সঙ্গে যুক্ত হোন নাই ফলে তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটাও এমন হয় যে তিনি কেন্দ্রে বাস করেও প্রান্তিক হয়ে পড়েন। কিন্তু তার কবিতা তাকে রক্ষা করে। ‘যেভাবে সে এলো’ কবিতার শেষ লাইনটার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক—

‘স্বাধীনতা সব খেলো, মানুষের দুঃখ খেলো না।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কে ধরার জন্য এর চেয়ে সহজ ব্যাখ্যা আর হয় না। এখানে একই সঙ্গে আছে হারানো আর প্রাপ্তির বোধ। তবে কবি তো আশা ভঙ্গের ব্যাপারটাকেই তুলে ধরেছেন। প্রাপ্তি হলো স্বাধীনতার আর সেটার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তা পূরণ হয় নি ফলে তার কবিতায় উঠে এলো—

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,
সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ
সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।

যে হেলাল হাফিজকে পাঠক কষ্টের ফেরিওয়ালা তকমা দিচ্ছে আর কবি নিজেকে দুঃখের অংশীদার বানাচ্ছে সেই হেলাল হাফিজের দুঃখটা যে ব্যক্তিক দুঃখ না-হয়ে সামষ্টিক দুঃখ হয়ে যাচ্ছে তার প্রমাণ ওপরের লাইনগুলো। কবি যখন বলছে, আমাদের সব দুঃখ, যৌথ-খামার, সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ তখন পাঠকের বুঝতে আর কষ্ট হয় না মার্ক্সসিজম দ্বারা তাড়িত ছিল তার স্বপ্ন। আর একটা সাম্যবাদী সমাজের আকাঙ্ক্ষা ছিল তার। কিন্তু এই কথাগুলো কবি হেলাল হাফিজ বলতে পেরেছিলেন কারণ তিনি করপোরেট বেনিয়ার খপ্পরে নিজেকে বাঁধেন নি। আর পুঁজিবাদের দালালি করে সাম্যের স্বপ্ন দেখা যায় না। আর এখানেই হেলাল হাফিজ টিকে গেছেন ফলে তার কবিজীবন নষ্ট হয় নি…

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই :
জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj