হোম গদ্য হুইটম্যানের একগুচ্ছ নোট 

হুইটম্যানের একগুচ্ছ নোট 

হুইটম্যানের একগুচ্ছ নোট 
326
0

সেই কবে কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান লিখে গেছেন এইসব নির্জনতার কথা!

তার কথাগুলি জীবনের প্রগাঢ়তার প্রতি যেন এক গভীর অনুধ্যান; পাতার পর পাতায় সেকালের আমেরিকার কবিজীবনের এক মনোরম প্যানারমা; জীবনকে, জীবনের উজ্জ্বলতাকে যা অঞ্জলিতে তুলে ধরে গেলাসে গেলাসে পান করবার এক তুমুল আকাঙ্ক্ষা আর এক তীক্ষ্ণ অবজারভেশন।

গদ্যগুলি পাঠ এবং তাদের কয়েকটি অনুবাদের পর হুইটম্যানের জীবন সম্পর্কে আরও বেশি কিছু জানার ইচ্ছা হলো। নেটে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম ‘হেনরি মিলার’কে! আলম খোরশেদের ভাষান্তরে হেনরি মিলারের ভাবনাগুচ্ছ। মিলার লিখছেন : ‘আমার বন্ধু অ্যাবে রাটনার আর আমি যখন আমাদের আমেরিকাব্যাপী ’এয়ারকন্ডিশন্ড নাইটমেয়ার’ যাত্রা শুরু করি তখন আমরা ছিলাম লং আইল্যান্ডে, ওয়াল্ট হুইটম্যান যে-খামারে জন্মেছিলেন সেটা থেকে খুব একটা দূরে নয়। আমরা ঠিক করি যাত্রা শুরু করার আগে তার জন্মস্থানের পাশ দিয়ে গিয়ে আমাদের শ্রদ্ধা জানাব। কথা মতো তার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা গাড়ির গতি কমিয়ে মাথার টুপি খুলে নিই, তারপর দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে, মৃদু হেসে আমাদের অভিযান শুরু করি।’

মিলারকে তখন মুগ্ধ হয়ে পড়ছি : ‘আমি হুইটম্যানকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম লেখক বলে মনে করি, এমনকি ইউরোপের যে-কোনো শ্রেষ্ঠতমর চেয়েও শ্রেষ্ঠ। লীভস্‌ অব গ্রাস একটি সত্যিকারের মাস্টারপিস, আত্মার সংগীতবিশেষ। তার কবিতা সং অব মাইসেল্ফএ স্বাধীনতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।’

হুইটম্যানের গদ্যগুচ্ছ সেইসব দিন বইটি প্রকাশ পায় ১৮৮২ সালে। বিচিত্র-বিষয়ে-ঠাসা এই বইটিকে তার ডায়েরিও বলা হয়, খসড়া নোটও বলা হয় যেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে উনিশ শতকি আমেরিকার জীবনধারা, একই সঙ্গে হুইটম্যানের সময়েরও এক বিশ্বস্ত ডকুমেন্টেশন। বোস্টন, হাডশন ভ্যালি, সেন্ট্রাল পার্ক, নায়াগ্রা ফলস, দি গ্রেট প্লেইনস, আরকানসাস রিভার, ডেনভার সিটি ভ্রমণকালীন সময়ে সঙ্গে থাকা নোটবুকে এই কথাগুলি টুকে রেখেছিলেন তিনি। অনূদিত গদ্যগুলি কবির সেইসব কথা।

… আহা! এখন এই শেষরাতে, নিজের সংগ্রহের পেপারব্যাক লীভস্‌ অব গ্রাস  বের করে পড়তে পড়তে অন্ধকার-ফিকে-হয়ে-আসা হ্যাম্পশায়ারের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা যায়!

পাঠের আমন্ত্রণ…

ভাষান্তর : এমদাদ রহমান


সেই আশ্চর্য রাত। আগস্ট ২৫, সকাল ৯-১০টা


সকাল থেকেই বসে আছি ডোবার পাশে—গভীর নৈঃশব্দ্য এখন চারপাশে। জায়গাটা প্রশান্ত। জলও নিস্তরঙ্গ, কাচের মতো; আকাশের সব রঙ আর সাদা মেঘদল জলের বুকে প্রতিফলিত। জলছবির সেই মেঘ উড়ছে, সঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে উড়ে চলা পাখি। গতরাতে আমি এই ডোবার জলে স্নানে নেমেছিলাম এক বন্ধুর সঙ্গে; মধ্যরাত পার হয়ে গিয়েছিল। পূর্ণকলা চাঁদ আর গুচ্ছ গুচ্ছ তারা আর মেঘদল, তাদের রুপালি আর তীব্র-তামাটে রঙ; সেই মেঘ বায়ুতাড়িত ধোঁয়াটে, বাষ্পময়—কিছুই যেন আর লৌকিক নয়, মিরাকল! আমি আর আমার বন্ধুর কাছে এই রাত্রি যেন তার সমস্ত আচ্ছন্নতা নিয়ে নেমে এসেছে। গাছেদের ছায়া, ঘাসের ডগায় চন্দ্রালোক, ধীরে বয়ে চলা বাতাস, আর যেন সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে থাকা পাকা গমের ঘ্রাণ।

এই একটি রাত, এই উদাসী আর অপার্থিব রাত তবে অবর্ণনীয়, প্রগাঢ়, আর্দ্র আর ব্যঞ্জনাময়—জীবনের সমস্ত কিছুর এমন এক সমন্বয়, আমাদের আত্মাকে যা পরিশ্রুত করে, আর আমাদের স্মৃতিগুলিকে করে তোলে আমৃত্যু বয়ে বেড়ানোর মতো চিরন্তন।


পাখি আর পাখি আর পাখি


একটু পর—ঝলমলে আলোয়—এক অদ্ভুত সঙ্গীত, এইসব দিনরাত্রি মুখর করে দেয় [এপ্রিলের শেষে, মে’র প্রথমে] কালোপাখির গান; অবশ্য সবজাতের পাখিই, অকস্মাৎ ছুটে চলে, শিস-ধ্বনি দেয়, লাফায়, স্থির হয়ে বসে, গাছেদের ডালেপাতায়। আমি আগে আর কখনোই এমনটা দেখি নি, শুনি নি কিংবা বলা যায় এই দেখা আর শোনার মাঝামাঝিও কিছু ঘটে নি। পাখিদের অবিরাম ছুটে চলা, বসা, গান গাইতে থাকা-জনিত এই যে ব্যস্ততা; এই যে গানপ্লাবন আর এই যে একাকার উন্মাদনা; আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, বছরের ঠিক এই সময়টায় আর কখনোই এমন হয় নি। মহাসমুদ্রের মতো, পাখিদের এই পরম্পরা। এইখানে আমি আজ যেসব পাখির গান শুনলাম, তাদের নামের একটা তালিকা দিচ্ছি :

কালোপাখি [অগুনতি], চড়ুই [অগুনতি],
চিত্রা ঘুঘু, ক্যাটবার্ড, পেঁচা,
কোকিল, কাঠঠোকরা, পানকৌড়ি,
রাজপাখি, কথক, কাক [অগুনতি]
কোয়াক, রেন, মাটিখোর,
মাছরাঙ্গা, দাঁড়কাক, কোয়েল,
ধূসরমুখা, টার্কিশ-বাজ, ঈগল,
মোরগ-বাজ, নাছোড়বান্দা, হলুদিয়া,
সারস, শরালি, চুচুক,
কীচকী, বন পায়রা।


পরে আরও যারা আসে, তাদের নাম :

নীল পাখি, টুনটুনি, কিলডার,
শাদাপেট-সোয়ালো, টিট্টিভ
গাঙশালিক, রবিন পাখি,
উইলসন থ্রাস, বনমোরগ, ফ্লিকার।


মাঝরাতে পাখির দেশান্তর 


কখনও কি তুমি মধ্যরাতে পাখিদের উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেয়েছ? মাথার ওপর দিয়ে, বাতাসে ভেসে, অন্ধকারে, গণনার অতীত তাদের ডানা, পাখসাট, বদলে ফেলতে তাদের গ্রীষ্মের শুরু কিংবা শেষের আবাস—শুনতে পেয়েছিলে? তাদের এই চলে যাওয়াটা এমন একটা ব্যাপার, কেউ কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। আমার এক বন্ধু রাত বারোটার পর জানিয়েছিলেন—গতরাতে উত্তরে পাড়ি জমানো সেই সব দেশান্তরি পাখিদের অদ্ভুত সেই ঘোরলাগা শব্দ, দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বিপুল পাখির ঝাঁক [যদিও এবছর কিছুটা দেরিতে যাচ্ছে], তারপর যে-গাঢ়-নীরবতা, ছায়া-প্রচ্ছায়া, আর ঘ্রাণ, পরের ঘণ্টাগুলিকে [পাখিদের শরীরের এই ঘ্রাণ নিঃসঙ্গ রাতের প্রসাধন] আমার মনে হলো এক অপার্থিব সংগীত। তোমাকে, অবশ্যই পাখির ঝাঁকের মহাকাব্যিক উড়াল-ধ্বনি শুনতে হবে। একবার কিংবা বার বার। বিপুল ডানার বেপরোয়া গতিবেগ। তাদের উড়ে চলার সেই ভঙ্গিটি, মুহুর্মুহু ডাক এবং কিছু গানের স্বরলিপি। আর এই সমস্ত কিছু স্থায়ী হয় রাত বারোটা থেকে শুরু করে তিনটার পর পর্যন্ত। যদি কখনও এই প্রজাতিটিকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা আলাদা করে দেখা যায়, তাহলে আমি তাদের চিনতে পারব, নামও বলে দিতে পারব—গানের পাখি বোবোলিংক, ট্যাঙার, উইলসন্স থ্রাস, সাদা-মুকুট চড়ুই এবং ওপরের বাতাস থেকে মাঝেমাঝে টিট্রিভদের গলা থেকে ভেসে-আসা সংগীতের নোট।


শেষবেলার দৃশ্যাবলি : ফেব্রুয়ারি- ২২


গতরাত, তারপর আজকের পুরোটা দিন ছিল বৃষ্টিমুখর। জল ছপছপ। অপরাহ্ণের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাতাস যখন ক্রমাগত ঘূর্ণি তুলে বয়ে চলছিল, সেই ঘূর্ণিতে উন্মত্ত মেঘদল কোথায় যেন অন্তর্হিত হয়ে গেল যেন কেউ টানানো পর্দা গুটিয়ে নিল শক্ত হাতে; আর তারপর দেখলাম, যেন এই জীবনে প্রথম এমন রামধনু দেখলাম, এমন এক বিস্তার, উজ্জ্বল, মহিমান্বিত এবং বিস্ময়কর! পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে ওপর প্রান্ত ছুঁয়ে, এমনই বিস্তৃত—আচ্ছন্ন করে দেওয়ার মতো তার সেই বেগুনি, নিষ্প্রভ সবুজাভা, হলুদ রঙের আলোকস্ফুরণ নিয়ে পুরোটা আকাশ জুড়ে, এবং আলোর এক অবর্ণনীয় প্রকাশ; জমকালো, যেন একটা কথাই বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে—দেখি নি এমনটা আর। দেখা হয় নি। পুরো একটি ঘণ্টা পার হয়ে গেল পৃথিবীর দু-প্রান্তের দুই বাহুর অদৃশ্য হওয়ার পর পুরোপুরি মিলিয়ে যেতে। কিনার ঘেঁষে চলা ছেঁড়া সাদা মেঘে মেঘে পেছনের আকাশ তখন আলোকপ্রবাহী কিন্তু অস্বচ্ছ নীল রঙের বিস্তার… তারপর যে সূর্যাস্ত হয়, অপার্থিব সৌন্দর্যে  আত্মা তখন পূর্ণ…

এই নোট আমি ডোবার পাশে বসে বসে টুকে রাখছি, বেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে তবুও যে আলো এখনও আছে কিছু লিখবার পক্ষে সে আলো যথেষ্ট; সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, স্ফটিকস্বচ্ছ জলের ওপর পশ্চিম থেকে পতিত হওয়া প্রতিফলন, জলে নুয়ে পড়া গাছগুলি, দেখতে দেখতে—এই নোট লেখা শেষ করছি আমি, শেষ করতে করতে জলে মাছের ভেসে বেড়ানো দেখছি। তাদের তেজি আলোড়ন জলে তরঙ্গ তুলছে।


রঙ : নানা মাত্রা


ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে, প্রতিদিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রঙ আর আলোর এমনধারা খেলা; দূর দিকচক্রবালের রেখাগুলো, ল্যান্ডস্কেপ যেখানে ক্ষীণ হতে হতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেখানেই আলো আর রঙের এমন খেলা চলে! যেভাবে আমি ধীরে ধীরে, লেন ধরে এসে পৌঁছই দিনের শেষ ভাগে, তখন—দীর্ঘজীবী ভুট্টার সারির ভিতর দিয়ে পশ্চিম আর আমার মাঝখানে এক অতুলনীয় সূর্যাস্ত!

অন্যান্য দিনগুলিতে টিউলিপ আর ওক-গাছগুলির প্রাচুর্যময় গাঢ় সবুজ, জলে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর উইলো, চিনার আর কালো-আখরোটের নানা অনুজ্জ্বল রঙ, [বৃষ্টির পর] চিরহরিৎ দারুবৃক্ষদের পান্না আর বিচফলের হালকা হলুদ।


ছোট্ট গানের পাখি : মার্চ ১৬


ঝকঝকে উজ্জ্বল সকাল। সূর্য উঠেছে ঘণ্টাখানিক আগে। বাতাস কিছুটা কটুস্বাদযুক্ত। আর দিনের সূচনাতেই শুনতে পাচ্ছি তৃণভূমির ছোট্ট পাখির গান মাত্র বিশ রড দূরত্বে বেড়ায় বসে গান গাইছে সে। দুই-তিনটি সুর একত্রে মিশিয়ে—একটু থেমে আবারও গাইতে শুরু করে তার বুনো আকাঙ্ক্ষা আর আনন্দময় উদ্‌যাপনের গানটি। পাখিটি কখনও ধীরে কখনও নৈঃশব্দ্যে পাখা মেলছে, উড়ছে, চলে যাচ্ছে, গিয়ে সেই বেড়ায় গিয়ে বসছে, কখনও উঁচু খুঁটির ওপর; সেইসঙ্গে গানটি গেয়েই চলেছে চলেছে সে।


দূরবর্তী শব্দেরা


কুঠার আর মাড়াইকলের ধুপধাপ, গোলাবাড়ির উঠোনে মোরগের ডাক [অন্য গোলাবাড়িগুলি থেকে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে সেই ডাকের উত্তর], সেই সঙ্গে গবাদিপশুদের বাজখাঁই গলা—কিন্তু কাছে দূরের সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে মত্ত বাতাস। উঁচু গাছগুলিকে আন্দোলিত করতে করতে, ঝোপঝাড় মাড়িয়ে দিয়ে আমাদের মুখ হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে মত্ত বাতাস এই উজ্জ্বল সুরভিত দুপুরকে দীর্ঘ সময়ের জন্য শীতল করে দিচ্ছে। এ যেন আমার সারা জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রতীক্ষার অবসানের এক দীপ্তিময় প্রকাশ; যেন ভিতরে গুঞ্জরিত হচ্ছে একটানা এক সুর—হয়তোবা বিষণ্নতার—যে সুর আমাদেরকে পৌঁছে দেয় জীবনের ক্ল্যাসিক কিছু উপলব্ধির কাছে, হতে পারে সে উপলব্ধি হালকা, হতে পারে গভীর; নানামাত্রিক।

পাইনের বনে বাতাস ঘূর্ণি তুলছে এখন, বন জুড়ে অদ্ভুত শিসধ্বনি যেন সুর থেকে জন্ম নিচ্ছে মন্ত্র। কিংবা সমুদ্রে যেমনটা ঘটে থাকে—ঠিক এই মুহূর্তে মনের চোখে সমুদ্রের দৃশ্যাবলি—ঢেউ আর ঢেউ, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফেনা; ঢেউ উঠছে, নামছে, দুলছে, ফেনা মাথায় ছুটে যেতে চাচ্ছে বহুদূর, আর কোথা থেকে ভেসে আসা হুইস্‌ল আর লবণের ঘ্রাণ, আদি নেই অন্ত নেই… আমরা যাকে চিরন্তন বলি।

প্রকৃতির এই সব খেয়াল, এইসব গড়া আর ভাঙা, এত ঘোরলাগা আর এই স্ববিরোধ—মানুষকে কোথায় দাঁড় করায়?

অন্যান্য অনুষঙ্গ :

দিনে উজ্জ্বল সূর্য, রাত্রিতে চন্দ্রালোক—আলোর আশ্চর্য বিস্তার। দিনটি তবুও তেমন আশ্চর্য ছিল না, এই গ্রহ উপগ্রহের রাজত্বে, এই অসীমতায়, এই নিবিড় উষ্ণতায় আজকের এই রাতটি তেমন উজ্জ্বল নয়, গত তিন-চারটি রাত যেমন ঝলছিল। এই যে গ্রহগুলি—মঙ্গলকে আগে আর কখনোই এমন অগ্নিপ্রভা দেখি নি, কেমন আলো ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো আকাশটায়, একটুখানি হলুদ রঙ এসে মিশে গেছে সেই আলোয় [জ্যোতির্বিদরা বলবেন—এটা কি সত্যি? গত শতাব্দীর চেয়ে মঙ্গল এবার আমাদের অনেক কাছাকাছি] এবং প্রভু জুপিটার [কিছুটা চাঁদের আড়ালে] এবং পশ্চিমে, সূর্য ডুবার পর নয়নাভিরাম ভেনাস—যার আলোকধারা ভেঙে গলে পড়ছে এমনভাবে যেন ঈশ্বর আজ তাকে নিয়ে খেলছেন।


শেষবেলার আলোছায়া : মে ৬


সমস্ত দিনের শেষ একটা ঘণ্টাটিতে আলো-ছায়ার সবচেয়ে অদ্ভুত সবচেয়ে আশ্চর্য রূপটি দেখা যায়। চিত্রকরকে এই রঙ বিভ্রমে ফেলে দিবে। শিল্পী ভুল করবে। এই এখন, দিনের শেষে গলিত রুপার দীর্ঘ এক প্রলেপ যেন গাছগুলির ওপর অনুভূমিক হয়ে পড়েছে [পাতাগুলি তাতে প্রগাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে], প্রতিটি পাতা প্রতিটি ডাল, সংবদ্ধ বুনট, নিজেদের নিয়ে তারা অলৌকিক আনন্দে মাতাল, তারপর সেই রঙ দেখি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে পরিপক্ব আলুবোখারার ওপর, দিগন্ত পরিব্যাপ্ত ঘাসে; ঘাসে সেই অদ্ভুত রঙ; প্রতিটি ডগা ভিন্ন ভিন্ন রঙে উজ্জ্বল।

দিনের আরও কখনও রঙের এই খেলাটা আর দেখা যাবে না। আর এই রঙ দেখবার জন্য আমার বিশেষ কিছু জায়গা আছে।

এমন সময়ে রঙ উছলে পড়ে জলের ওপর।  জল তখন কাঁপে—তরঙ্গে। দীপ্তি ছড়ায়। মুহূর্তে সে জল ঘন সবুজ হয়ে ওঠে যেন এ রঙ ঠিক সবুজ নয়, এ রঙ অন্ধকারের; যেন ছায়া পড়েছে।

জলে তরঙ্গে রঙের এত রেখা।

রঙ তারপর কিনারে চলে যায়, তখন মনে হয় দীর্ঘ সারিবদ্ধ গাছগুলি থেকে তীরের মাথায় আগুন লাগিয়ে উপড়ে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে, আর সূর্য নেমে এসেছে মাটির নিকটে।

এভাবে রঙের অদ্ভুত প্রকাশ হয় যেন মূর্ত হচ্ছে অদেখা ভুবন। অচিন রাগিণী।


পাখিদের গান


কতখানি সংগীত [বুনো, সরল, আদিম, নিশ্চিত কিন্তু এত মিষ্টি আর এত টক] যে এখানে বাঁশির মতো বাজছে! তার পাঁচ ভাগের চার ভাগই পাখিদের গলার। দুনিয়ার সমস্ত পাখি আর তাদের গলার ভঙ্গি! গত আধঘণ্টা থেকে, এখনও, আমি যখন থেকে এখানে বসে থেকেছি, দেখতে পেয়েছি, কয়েকগোছা ঝরাপালক একসঙ্গে এসে পড়ছিল ঝোপঝাড়ের ওপর, পড়তেছিল তারা উড়ে উড়ে, অবিরাম, আমার ইচ্ছা হলো ব্যাপারটাকে বলি স্পন্দময় শিস-ধ্বনি। আর এখন, ঠিক যেন একটি খুব ছোট্ট একটা পাখি চকিতে দেখা গেল, পুরোটাই মালবেরিরাঙা, ঝোপের চারপাশে—মাথা, ডানাগুলি, শরীর গাঢ় লাল, খুব উজ্জ্বলও নয়—গানও গাইছে না, যা এতক্ষণ আমি শুনছিলাম। ৪টার সময় : সত্যিকারের এক জমকালো কনসার্ট আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। এক ডজন নানাপ্রকারের পাখি যেন এক ইচ্ছাশক্তির বলে একসঙ্গে জড়ো হয়ে গেছে! হঠাৎ, বৃষ্টি এসে তাদের কোরাস বন্ধ করে দেয় তবু  পাখিদের উদ্দাম গান আর থামে না, তারা যেন যূথবদ্ধ এই জীবনে, কেউ কাউকে ছেড়ে চলে যেতে চায় না। এই দৃশ্যদেখা শেষ করে আমি ডোবার কাছের গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ি। বহুলস্বরের কিচিরমিচির আর তার পূর্ণান্তর হতে থাকে আমার থেকে একটু দূরত্বে আর তখন আমি দেখতে থাকি একটি পালক, সমস্ত সংগীত থেকে বিছিন্ন, নিঃসঙ্গ, জঙ্গলের ভিতর কোথায় জানি উড়ে যাচ্ছে—যেন গান গাইছে একাকিত্বের, যেন তার উড়ে যাওয়ার সঙ্গে মিশে গেছে মানুষের জন্য পৃথিবীতে নিয়ে আসা ভালোবাসার গান—যে-গান অনন্তজীবনকালের, যে-সময় চিরপ্রণম্য, শুধুই তার।

এমদাদ রহমান

গল্পকার ও অনুবাদক
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; বাদেসোনাপুর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল স্টাডিস অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প [গল্প, চৈতন্য, ২০১৪]

ই-মেইল : emdadrahman777@gmail.com