হোম গদ্য হারু

হারু

হারু
489
0

নৈরিৎ ইমু

claires-art-06-03-1024

হারু তিনখানা কবর খুঁইড়ে কাফন লইয়া গেছে। তার কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার

—হারুরে আমি লাল বোর্ডে (দ্রুতগামী বাস) কইরে গঞ্জে যাইতে দ্যাখছি।

উঠতি বয়সের ছোকরা মজলিসে জানান দেয়।

—এই কাম হারুর, কোন সন্দেহ নাই। পুরা গেরামে গজব নামাইবো হারু। সব কয়টা দোযখি হইবা মিয়ারা।

পান চিবাতে চিবাতে গ্রামের মৌলবি সাহেব সতর্কবাণী দেয়।

সুয়াবিল গ্রামে ঈদগা প্রাঙ্গণে বেশ বড়সড় জমায়েত। গ্রামবাসীর চোখেমুখে আতঙ্ক—আতঙ্কের কারণ কেবল হারু নামের লোকটা নয় বরং তাঁর কৃতকর্ম। হারু, জীবনের অর্ধেক আয়ু ক্ষইয়ে দিয়েছে ট্রাক ড্রাইভার হিশেবে। তারও আগে সে একটা ডাকাত দলের সাথে ঘোরাঘুরি করত। সাপের মতো শীতল মানুষ সে। চুপচাপ থাকে।

গ্রামে রাস্তা-ঘাটে তাকে সচরাচর দেখা যায় না। অনেকে বলে হারু মধ্য রাতে বের হয়। তখন অন্ধকারে তার চোখ থেকে আগুন বের হয়। কিন্তু হারু কেবল রাতেই ভয়ঙ্কর, দিনের বেলায় মাঝে মাঝে তাকে চা-দোকানে বাংলা সিনেমা দেখতে ও লোকজনের সাথে খোশগল্প করতে দেখা যায়।

হঠাৎ হঠাৎ হারু গঞ্জে যায়। আবার ফিরেও আসে। এর মধ্যে সে যতবার গঞ্জে গেল, ততবারই একই ঘটনা ঘটল। পরপর দু’বার ধরা পরেও হারু সহজ হাস্যোজ্জ্বল স্বীকারোক্তি দেয়।

—মনু বুড়ি যখন মইরা গ্যালো, হুজুর মাইকে জানাযার ডাক দিল। আমি বাইরাইলাম গঞ্জের দিকে। গঞ্জ হইতে আতর আনতে যাই। এই আতর সৌদি শেখ মিয়ারা কানের চিপায় তুলা দিয়া গুইজা রাখে। সেই রাইতেই ফিরা আইসা গা-গোসল করি। কবরস্থানে ঢোকার সময় শইলে আতর মাখি। ফেরেস্তারা আতর খুব পছন্ করে। তাঁদের লগে জান্নাত জাহান্নামের কথা কইতে কইতে কবর খুঁড়ি। কাফনে হাত দিবার আগে মুর্দারে জিগাই, ‘কেমুন আছ মাটি?’

—চুপ! নালায়েক বেত্তমিজ! তোর তওবাও আল্লা মাফ কইরবে না। জাহান্নামি… জাহান্নামি…

উত্তেজিত হয়ে উঠলেন মৌলবি সাহেব। সকলেই বিস্ফারিত চোখে একে অপরের দিকে তাকায়। মুর্দার কাফনের কাপড় পরে চুরি করতে গেলে গৃহস্থের কোনো হুঁশ থাকে না। ফলে চুরির সুবিধা ভোগ করতে কাফন-কাহিনি বেশ পূর্ব প্রচলিত।

সমাজের সর্দার কলিম দফাদার। পুরনো পাঞ্জাবিতে তার বিড়িতে পোড়া ছিদ্র। থুতনির দিকে সামান্য দাড়ি। চোখ দেখলেই ভেতরের জটিলতা বা চালাক ভাব বেশ ধরা পড়ে। দফাদার গম্ভীর মুখে বললেন,

—হারু তিনখানা কবর খুঁইড়ে কাফন লইয়া গেছে। তার কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। এইরম কইরে গেরামের বেবাক ময়-মুরব্বির লাশ খুইলা কবরের বেইজ্জতি আমাগো গেরামে খোদার গজব নামাই আনবো। হারু শুধু চোর না, একটা বেধর্মী বজ্জাত।

—ধম্ম-কম্ম উপরওয়ালা জানে। আপনেরা কি পুলসেরাত পার হৈয়া হাসর বসাইছেন? মনুর মা তিন-দশ বছর ধইরে একখান কাপড় জোড়া-তালি দিয়া সত্তর বছরে আইসা মরিল। মরণের পরে আপনাগো চিন্তা হইল গজব লইয়া। তার আগে কী করছিলেন মিয়ারা? মাটি হইয়া গ্যালে আর সুতার দাম নাই…

হারু কথা শেষ করার পূর্বেই জইল্লা নামের যুবক কষে একটা চড় দিল তার গালে। দাঁতে কেটে মুখে রক্ত আসলো। বিচারে শেষ পর্যন্ত হারুর শাস্তি ঘোষণা করা হলো। বয়োজ্যেষ্ঠর সম্মতিতে গ্রামবাসীর সামনে মেম্বার রহমত হাত তুলে একটি বক্তব্য রাখলেন গর্জে গর্জে। এবং পরিশেষে জানালেন,

—বিধর্মী কামের জইন্যে হারুরে তিনশ বাড়ি মারা হইব। তারপরে ঈদগার মাঠের মাঝখানে খুঁটির লগে পাঁচ দিন বাইন্ধা রাখা হইব। এই পাঁচ দিন হারুরে খাওন-পরন দেওন যাইব না। রাস্তা দিয়া লোকে যাওন-আসোনের সময় হারুর শাস্তি দেখব। কাইল যেন এই কাম আর কেউ করবার হিম্মত না পায়।

—মেম্বার সাব, আপনের ছোটবিবি একটা সোনার চামচ পাইছিল। আমার শখ আছিল সেই চামচে কইরে চিনি-পানি খাওনের। সোনার চামচে দুধ খাইলে হায়াত বাড়ে। আপনে আপনার বিবির হাতে পত্তেকদিন সোনার চামচের দুধ খাইয়েন।

হারুর এমন বাক্য শুনে একটা চাপা গুঞ্জন হলো। মেম্বার রহমত বিনা কারণে পরপর ঢোঁক গিলল বেশ ক’টা।

মধ্য-বয়স্ক নন্না মিয়ার হাতে তেলমাখানো লাঠি। তার আচরণ জাঁদরেল স্বভাবের। কুচকুচে কালো ঠোঁটের উপরে বাহারি মোচ। লোকটি খোয়াড়ে কাজ করে। হারুকে তিনশ ঘা দেওয়ার জন্য লোকটি তেলমাখা লাঠি জোগাড় করে নি, নন্না মিয়া সবসময় হাতে তেলমাখা লাঠি নিয়ে ঘুরেন।

—নন্না ভাই। কামের মইধ্যে মইজা না গ্যালে কাম কইরা শান্তি নাই। আমি কাফনে মইজছিলাম, তুমি লাঠিতে। মইজা যাওন সহজ কথা না। মইজা গ্যালে পরে গুয়েও যাওন যায়।

হেসে হেসে হারু বলে ওঠে। নন্না মিয়া কঠিন চোখে তাকায়।

শ-দেড়েক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে। খবর পেয়ে আশেপাশের গ্রাম থেকেও বেশ কজন এসে ভিড় বাড়ায়। লাঠি-কার্য শেষ করে নন্না মিয়া মুখ মোছে গামছায়। রক্তমাখা হারু মাথাটা একটু কাৎ করে আছে খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায়। তাকে কেন্দ্র করে বৃত্তের মতো লোকজন। সবাই হারুকে দেখে উৎসাহের সীমা ভাঙিয়ে ফিরে যাচ্ছে আবার। প্রথম দুদিন হারুর আশেপাশে লোকজন দেখা গেলেও পরে মানুষ ঈদগার মাঠ থেকে হারুর হাসি শুনতে পেত। কখনও সে গান ধরে ক্ষীণকণ্ঠে, কখনও সে কথা বলে ফেরেস্তা বা জিনের সাথে। চতুর্থ দিনে কেউ একজন আবিষ্কার করল ‘হারু মইরে ভূত হইয়ে গ্যাছে। তার লাশের গন্ধ ছড়াইছে।’ আর মুহূর্তেই সারা গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেল। কোনো রকম অনুতাপ ছাড়াই হারুকে দাফন করা হলো। মৌলবি সাহেব সফেদ দাড়িতে হাত বুলিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

—হারু যদি আল্লার নাফরমানি না কইরতো, তাইলে তার শাস্তির পর আল্লা তারে নিশ্চয় মাফ কইরত। আফসোস! মউতের ডর আছিল না নালায়েক নাভক্তের।

পরদিন সকালের নামাজের পর পুনরায় গ্রামবাসী দেখল নতুন কবরের মাটি আলগা হয়েছে। কবরস্থান থেকে তীব্র আতরের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। হারুর কবর থেকে চুরি গেছে কাফন।

noi@gmail.com'
noi@gmail.com'

Latest posts by নৈরিৎ ইমু (see all)