হোম গদ্য স্বপ্নের আত্মহনন

স্বপ্নের আত্মহনন

স্বপ্নের আত্মহনন
536
0

৫: ৫৯ এএম. উত্তর সুকদেবপুর

যখন মেম্বারের বাড়ি হতে রেডিও’য় ওপেনিং সুর ভেসে আসে আর ভোর উঠোনের কাছে ঘুরঘুর করে, তার ঘুম ভেঙে যায়। এখন শোনা যাবে, আস্‌সালামু আলাইকুম, বাংলাদেশ বেতার ঢাকা…। আনছু আরা কাঁথার ওমে হাঁটু ভাঙা দ’এর মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। তার উঠতে ইচ্ছে করে না। মা বলে,

‘আনছু ওঠেক মা, বেলা হয়া যাছে, হাট যাবা ন।’

অবশেষে আনছু আরা দুচোখ রগড়ে বাইরে তাকায়। কী সুন্দর ভোর! সূর্য টকটকে লাল হয়ে সবজি বাগানের বুক ফুড়ে বেরিয়ে আসছে। একটুপর কুয়াশার পর্দা ছেড়ে সকাল চকচক করে উঠবে। সে উঠে বসে। কাঁথার ভেতর থেকে আস্তে আস্তে বের হয়। বাইরে হিমেল বাতাস। শিহরে উঠে শরীর। তবু উঠতে হয়। তারপর কলতলায় গিয়ে ছাই দিয়ে ঘষে ঘষে দাঁত মাজে। সকাল ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়। মা এক চিলতে আঙিনা ঝাড়ু দিতে দিতে আবার বলে ওঠে,

‘ডেকচি থাকি পানতা উঠি নি খা, আইজ হাটবার নহায়? দড়ি ক গাছি বেচা নাগবে। টপ করি যা, টেরেন আসবার সমায় হইচে।’

‘আইজো ফির পানতা? গেল হাটবারে মোক আলুভর্তা দিয়া মাড়িভাত খাওয়াবু কইছিলু…ভুলি গেইচি না? মোর ক্ষিদা লাগে না? তামানটা দিন না খায়া থাকা যায়!’

‘নহায় মা, মুই ভুলো নি। ঘরোত্‌ চাইল নাই। রেল বাজারোত দড়িগুলা বেচাইয়া কিছু কিনি খাবু। চাইল আলু ডিম কিনি আনিবু। ওঠেক আর কত্থন কলপাড়োত বসি থাকিবু, শ্যাষে টেরেন ফেল করিবু নাকি?’

‘নহায় এ্যলা টাইম আছে। টেরেন কি ঠিকমতে চলে? খালি লেট আর লেট।’

‘শোনেক যাবার আগত উড়ানখান বুকোত দি যাবু। মাইনষের নজর খারাপ।’

‘হ্যাঁহ্‌ উড়না না ত্যানা, ছেঁড়া গামছাখান মুই পরো! একখান কিনি দিবা পারেছু না?’

‘দিম মা, দিম। দিবা তো লাগিবি। আইজ যদি তোর বাপ বাঁচি থাকিল হয়, মোক কাপড়া বাদে চিন্তা করি নাগিল ন হায়। লোকটা অসমায় মরি হামাগেও মারিছে। কোঠে ইস্‌কুলোত যাবু তা ন হায় প্যাটের তনে কি কি করা নাগছে। একটু পাইশা জড় হইলে সোন্দর দেখি উড়ান কিনি দিম, আর একটু সবুর কর।’


তবু মন বড় অবুঝ, অদ্ভুত আশাতে স্বপ্ন দেখে। বিলাসী কল্পনায় ভেসে যেতে চায়।


আনছু আরা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কেমন শিরশিরে লজ্জা পায়। চারপাশে সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দু সূর্যের আলোয় বর্ণিল হয়ে বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রক্তাভ হয়ে ওঠে গাল। হয় কি? শ্যামল মুখের উপর রক্তিমাভা জমে কি? সে জানে না। তবে বুঝতে পারে সে বড় হয়েছে। তার মধ্যে আকর্ষণ করার ক্ষমতা এসেছে। অনুভব করে ঘুম জাগানিয়া স্বপ্ন তার মনেও দোলা দেয়। সে স্বপ্ন দেখে।

 

৮: ৩৫ এএম. চিরি নদীর সাঁকো

সাঁকোর ধারে আমগাছের লম্বা ছায়া। সূর্য পুবদিক থেকে ডিমকুসুম হয়ে আলো ছড়ায়। জীবনকে ভারি মায়াময় মনে হয়। গাছ ফুল লতা পাতা নদী সবকিছু কত ভালো লাগে! এখনো সব শিশির রোদের তাপে উড়ে যায় নি। আনছু আরা এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। রেল স্টেশন হাল্কা কুয়াশার মধ্যে আবছায়া লাগে। আর একজন তাকে অপলক দেখে আছে, সে বেশ বুঝতে পারে। সালিম ভাই। মেম্বারের ছেলে। মনে পড়ে, গেল কোনো এক হাটবারে আবার তার মুখোমুখি হয়েছিল। মনেই হয় না একদিন সালিম তার খেলার সাথী ছিল! এখন একেবারে জোয়ান পুরুষ। কী সুন্দর চকচকে চোখ! কখনো হেসে কখনো গম্ভীর মুখে কথা বলে। সে রহস্য বোঝা যায় না।

‘তুমি আনছু আরা না? বাহ্‌ অনেক বড় হয়ে গেছ তো! কোথায় যাচ্ছ তুমি? তোমার মানে তোমাদের বাসায় যাব…যাব করে যাওয়া হয়ে ওঠে নি। তুমি ভালো আছো আনছু?’

‘হ্যাঁ…আপনি ভালো আছেন সালিম ভাই? অনেকদিন পর দেশে ফিরিলেন। ফের যাবেন?’

জড়তায় মাখামাখি কিছু অসংলগ্ন কথা। সে ওইদিন কি করে যে কথা বলেছিল বা বলতে পেরেছিল, ভেবে অবাক হয়। সালিম মনে করিয়ে দেয় বাবার কথা। হারানো দিনের কথা। ছেলেবেলার স্মৃতি। দুজনে কত হুটোপুটি করে কাটিয়েছে সে-সব দিন। পুতুল খেলায় সে হতো তার বউ। মেয়ে পুতুলের মা। পুতুল বিয়ে দিয়ে দুজনে জড়াজড়ি করে কত মিথ্যে কেঁদেছে। সে কান্না কাঁদতে কাঁদতে কতদিন সত্যি হয়ে যায়। তার দুচোখ বাষ্পাকুল হয়ে পড়ে। হারানো দিনের স্মৃতি কেন যে মন কাঁদায়! আজ যদি বাবা বেঁচে থাকত, হয়তো তার জীবন এমন হতো না। তার মায়ের কষ্ট থাকত না। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে মাকে মেম্বারের বাড়ি ঝি-এর কাজে যেতে হতো না। বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। আনছু আরার সব কথা মনে পড়ে… পড়ে না। কতই বা বয়স তখন তার! মায়ের উচ্চারিত অর্ন্তগত শোকোচ্ছ্বাস থেকে সে শুনেছে সে-সব স্বপ্নের কথা। আজ হয়তো সব অর্থহীন স্মৃতি।

সেদিন সালিমকে দেখে তার অজানা অনুভূতি হয়। সে রাত জেগে জেগে কল্পনা করে। সালিমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। পড়ন্ত বিকেল, তার কোলে ফুটফুটে শিশু; দুয়ারে দাঁড়িয়ে প্রিয় স্বামীর অপেক্ষা করছে। সালিম ফিরে আসবে। ফিরে এসে আদরে আদরে মন ভরে দিয়েছে তার। সেও সালিমকে জড়িয়ে ধরে। দুজনে ঠিক চড়ুই পাখির মতো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

আজ সে এই সাঁকোর কাছে দাঁড়িয়ে নানান ভাবনায় শিহরিত হয়। অচেনা অজানা লজ্জা চারপাশ ঘিরে ধরে। তখন আবার নিজেকে শাসন, কী যাচ্ছে-তাই ভাবছে! পেছন ফিরে একবার দোতলা বাড়ির দিকে দৃষ্টি ফেলে। দেখে সালিম ঝুল-বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। একপলক দুজনের চোখাচোখি হয়। আনছু আরা নিজের মধ্যে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। সে চোখের ভাষা বোঝে। হয়তো আর দশজন কিশোরীর চেয়ে বেশি। কিন্তু পাঁকানো দড়ির সঙ্গে দুঃখ-কষ্ট আর বেদনার দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে সে স্বপ্নসাধ… কল্পিত সুখ দুমড়ে ফেলে দিয়েছে। তার স্বপ্ন দেখার কয় পয়সা মূল্য আছে? জীবন পথে বেঁচে থাকার সংগ্রামে সে যে প্রতিদিন নানান অভিজ্ঞতায় শিখে চলে তিক্ততা। অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতা। বুঝতে পেরেছে উঁচুতলা আর নিচুতলার মানুষ।

 

৯:৪২ এএম. চিরিরবন্দর রেল স্টেশন

সিগন্যাল ডাউন হয়ে গেল। আনছু আরা বাঁ হাতের মধ্যে চুড়ি করে দশ-বারো গাছি দড়ি ধরে আছে। শীতের সূর্য স্বর্ণরেণু ছড়াতে ছড়াতে কী মধুর স্পর্শ দিয়ে চলেছে তার কপোলে! সে সালিমকে দেখতে পায়। এগিয়ে আসছে। আনছু আরা দেখে গ্রামের পরিত্যক্ত নির্জনতার মধ্যে ছোট স্টেশন আকস্মিক জনাকীর্ণ হয়ে গেছে। অদ্ভুত শিহরন তাকে বিহ্বল করে দিতে চায়। সে বুঝতে পারে চেহারায় কৈশোরের সেই রক্তাভা ফিরে আসছে। তার খুব লজ্জা লাগে। সে কী করবে? করার তো কিছু নেই। সালিম এগিয়ে এসে বেশ গাঢ়স্বরে জিজ্ঞেস করে,

‘আনছু, তুমি তো জবাব দিলে না। এই কদিন শুধু তোমার কথা ভেবেছি। একটুও ঘুমোতে পারি নি। তুমি কি বোঝো না? কিছু বলবে না?’

‘কী কবো? গরিব মানুষের বড় স্বপ্ন দেখবার হয় না, বোঝেন না আপনি? রাইত ভারি হয়া যায় তাতে।’

‘মানুষ স্বপ্ন দেখে। ধনী গরিব বিচার করে স্বপ্ন দেখা যায় না আনছু। আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখি…প্রতি রাতে দেখি। তোমাকে নিয়ে অনেক কথা আমার…কী করে তোমাকে বোঝাই! আনছু কিছু একটা বলো। আমাকে কেন তুমি আগের মতো ভাবতে পারো না। কেন…?’

‘সালিম ভাই, আমি অত বই পড়া কথা বুঝি না। অশিক্ষিত মূর্খ…গরিব ঘরের মানুষ। আপনি এখুন যান। টেরেন আইল।’

একটি সবুজ দীর্ঘশ্বাস ট্রেনের গর্জনের ভেতরে মিলেমিশে যায়। ট্রেন দুই নম্বর লাইনে ইন করে। একটু পর পান-বিড়ি-সিগারেট, গরম-চা, খবরের কাগজ ইত্যাদি সব হকারের চিৎকারে জায়গাটি প্রাণময় হয়ে ওঠে। আনছু আরা ইস্পাত কঠিন এক নম্বর লাইন পেরিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। মানুষের গিজগিজ ভিড় এড়িয়ে কোনো মতো ট্রেনের এক কামরায় ওঠে। সামনের আধভাঙা জানালার কাছে গিয়ে মাথা হেলিয়ে প্লাটফর্মের দিকে তাকায়। সালিমকে মরা মাছের মতো উদাস মনে হয়। ভীষণ মায়া লাগে তার। সালিম তাকে বলেছিল,

‘বিদেশ গেছলাম বাপের জমি বিক্রির টাকায়। চাকরি হয় নাই। দালালের খপ্পড়ে অনেক টাকা পানিতে গেছে। কয়েক মাস মালয়েশিয়ায় জেল খেটেছি। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে নি। তোমাকে দেখে হারানো দিনের কথা মনে পড়ে। বাঁচতে ইচ্ছে করে খুব। স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে আনছু।’

আনছু আরা জবাবে কিছু বলে নি। সে কী বলবে? সালিমের কথাগুলো মাথায় ঘোরাফেরা করে। সে এ কথা কেন বলে? কোন আবেগ বা ভরসায় বলে? আনছু আরা ভেবে ভেবে ক্লান্ত। কখনো এড়িয়ে যায়। গভীরে তলিয়ে দেখে না। কষ্টের দিন যাপনে সময় কোথায়? সে তেমন বুঝতেও পারে না। ধোঁয়াশা স্বপ্নের মতো তার শুধু মনে হয়, সালিম তার ছেলেবেলার খেলার সাথী; তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। তার কথা ভাবে। সেও কি তার মতো স্বপ্ন দেখে? ট্রেনের ঝিক্‌ঝিক্‌ ছন্দময় গতির সঙ্গে তার নিঃসঙ্গ মন কেন জানি স্বপ্নের দোলায় ভেসে যেতে চায়। অনেকদিন পর সালিমের সঙ্গে দেখা হলো। তার কিশোরী মন অজানা আবেগে বুঝি-বা পূর্ণ হয়ে ওঠে। দুচোখের দৃষ্টি ভালো লাগা রংধনু আচ্ছন্নতায় বিবশ হতে চায়। সে অস্বীকার করে কী করে? কখনো ভাবে সালিম সব কথা বলে নি। কেন সে বিদেশ থেকে ফেরত এসে হতাশায় ভোগে? কেন সে এত বিষণ্ন অস্থির?

সালিম আর সে-সব কথা বলে নি। অথচ দেখা হলে সেগুলো ভেসে ওঠে। কেন তাকে বলে? কেন? সে তার কে? নাকি তার কাছেই গচ্ছিত রেখে দেয় গোপন বেদনার কাহিনি? আনছু আরা শোনে। যতটুকু শোনে তার সবটুকু বোঝে কী বোঝে না, সে গল্প তার বুকে থেকে যায়। তখন মনে মনে অচেনা কোনো ঈশ্বরের কাছে সালিমের সুখ আবদার করে বসে।

 

১২:০৩ পিএম. দিনাজপুর শহর

শহরের পিচকালো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আনছু আরা আশেপাশে দেখে চলে। রিকশা সাইকেল গাড়ি বাঁচিয়ে রাস্তার এপার ওপার হয়। বহুক্ষণ ঘুরে ঘুরে কয়েকটি দড়ি বিক্রি করেছে। সেই টাকা কোমরে পায়জামার ফাঁসে লুকানো। সতর্ক মন যাতে না হারায়। তারপরও সে বারবার আনমনা হয়। সালিমের কথা মনে গুনগুন বাজতে থাকে। অনেক ধনী পরিবারের সন্তান সে। দশ গ্রামের মানুষ তাদের সমীহ করে। সেই পরিবারের ছেলে লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়েছিল। চাকরি হয় নি অথবা অন্য কোনো ঘটনা আছে। লক্ষ টাকা পানিতে পড়ে গেলে কী যায় আসে তাদের? ছেলে ফিরে এসেছে এই তো বড়! তবে কথা শোনা যায়। সালিমের বাবা নাকি খুব হিশাবি মানুষ। কেউ কেউ আড়ালে কৃপণও বলে।

একদিন সালিম তাকে ট্রেনে উঠতে দেখে। জেনে যায়, আনছু আরা শহরের রেল-বাজারে দড়ি বিক্রি করে। সালিমের নিষেধ নাকি অনুরোধ, আনছু আরা কী করে? সে কিছু বলতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য অনেককিছু করতে হয়। তারও ইচ্ছে করে সালমা, যুঁথি কিংবা জবার মতো স্কুলে পড়ে। তেল চুপচুপ চুলে প্রজাপতি বেণি বেঁধে হেসে খেলে বেড়ায়। কিন্তু…সব নিয়তির পরিহাস! অকালে বাবা মরে গেল। তারপর হাজার কষ্ট দেখেছে সে। এখন কখনো মায়ের সঙ্গে দুজনে মিলে পাটের দড়ি পাকায়। সময় করে শহরের রেলবাজারে বিক্রি করে। দোকানে দেয়। সালিম এসব শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার দুচোখ আরও বিষণ্ন হয়ে পড়ে। তারপর দড়িগুলো কিনে নিতে চায় সে। আনছু আরা সেই দয়া নেয় নি। ওতে তার ভীষণ অনীহা। সালিমের দৃষ্টিতে করুণা দেখে সে খুব কাতর হয়ে পড়ে। বুঝে নেয় পৃথিবী বড় বিচিত্র জায়গা। বারবার মনের কোণায় এই কথা বেজে চলে, সে কোথায় আর সালিম কোথায়! একই মাটির জল হাওয়ায় তারা আসলে দুই মেরুর মানুষ। তবু মন বড় অবুঝ, অদ্ভুত আশাতে স্বপ্ন দেখে। বিলাসী কল্পনায় ভেসে যেতে চায়। সালিম তাকে ভালবাসে। সে বুঝতে পারে চোখের ভাষা। একসময় সব মেয়ে বুঝতে পারে। সেও পারে। তাই টুটি চেপে স্বপ্নকে মেরে ফেলে। সেদিন আনছু আরা জানালা দিয়ে দূরে পাঠানো দৃষ্টিকে ভেতরে টেনে নেয়। ট্রেন দ্রুতবেগে সকল দৃশ্যাবলী ছেড়ে সামনে ছুটে চলে, হারিয়ে যায় সবকিছু।

 

২:৩৮ পিএম. রেলবাজার রোড

আনছু আরা কোতয়ালি থানার উত্তর পাশ ঘেঁষে পুবমুখি রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে। মশান কালি মন্দিরের সামনে এসে চমক ভাঙে তার। রাস্তার দু-পাশে বড় ছাতার মতো কয়েকটি গাছ। প্রাচীন অশ্বত্থ আর পাকুড়। দু-একটি ছাতিম। অদ্ভুত ছায়া-ম্লান অন্ধকার। উত্তরে এক বড় দিঘি। কাজল-কালো তার জল। হিমশীতল ঠান্ডা। গাছের উঁচু ডালে ঝুলে থাকে শত শত বাদুর। বিঁটকেলে গন্ধে আশপাশ নিস্তব্ধ আর ভারি। মন্দিরের মধ্যখানে বিশাল এক চামুণ্ডা মূর্তি। গলায় কৃত্রিম খুলির মালা। তার রক্তাক্ত দীর্ঘ জিহ্‌বা বেরিয়ে আছে। বড় বড় লাল চোখ। পায়ের তলায় মহাদেবের বুক। একটু দূরে পাঠা বলি দেয়ার বেদি। মূর্তির পেছনে চকচকে খাঁড়া। এখানে এলে মনে ভুতুড়ে ত্রাস জাগে। সে প্রায় ভাবে, এ রাস্তায় আসবে না। তবে বাজারে যেতে এটি সহজ আর শর্টকাট পথ। আজও মন্দির পেরোতে তার বুক ঢিপ্‌ ঢিপ্‌ করে ওঠে। সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়।


মৃত্যু হলো সেই পোশাক বদলানো।


সামনে তিনতলা এক বাড়ি। সে বাড়ির পাথরের বারান্দায় মাঝে মধ্যে কজন যুবকের জটলা থাকে। কী সুন্দর তাদের পোশাক! তারা হাতের সিগারেট থেকে মুখ ভর্তি ধোঁয়া ছাড়ে। হাত নেড়ে নেড়ে হেসে হেসে গল্প করে। আনছু আরা মাটির দিকে তাকিয়ে তাদের পেরিয়ে যায়। যেতে যেতে তার কেন জানি খুব লজ্জা লাগে। কেমন জুলজুল দৃষ্টি সেই চোখগুলোর। সে ছেঁড়াফাটা ওড়নায় আব্রু ঢাকতে পারে না। নিজের উপর অনেক রাগ হয়। এ ছাড়া কী করার আছে তার?

আনছু আরা আজ রাস্তা থেকে ভয়ে ভয়ে সেদিকে তাকায়। সেখানে অনেক লোকের ভিড়। কেউ কেউ মাটির সানকি পলিথিন ব্যাগ কলাপাতা নিয়ে ছুটোছুটি করছে। অগোছালো বেশবাসে হুটোপুটি চিৎকার করছে। কারও হাতের পলিথিন ব্যাগে ভাত আর মাংসের তরকারি। বাতাসে চনমনে সুবাস। তার কৌতূহল হয়। কী হচ্ছে ওই জায়গায়? সে ওদিকে দৃষ্টি রেখে হেঁটে হেঁটে গাছের ছায়া পেরিয়ে যায়। উজ্জ্বল রোদের মাঝখানে এসে পড়ে। আজকের রোদ বেশ মিষ্টি-মধুর। বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে আসে হাসিনা। সেও তার মতো দড়ি বিক্রি করতে রেলবাজারে আসে। হাসিনা বয়সে তার বড়। হাবাগোবা বেপরোয়া। আনছু আরা তাকে দেখে আর ভাবে বোকার কোনো লজ্জা-টজ্জা নেই। এত জোরে কেউ হাঁটে? ছন্দে-ছন্দে তার বুক কেমন দুলে ওঠে। সে হলে লজ্জায় মরেই যেত!

‘ওই আনছু, ওইঠে যাবু?’

‘কুণ্ঠে? কি হছে রে…বিয়া বাড়ি?’

‘হি হি বিয়া নহায়, চল্লিশা খাওয়াছে! শুন্‌নু দশখান গরু জবাই কইরছে। এ্যালায় গেইলে খাবা পারবু। পাছোত্‌ গেইলে শুকান পাত্‌। হি হি হি টপ করি চল্‌! খায়া আসি হাট করমো। মোক কেনবা ভাত দেখি বেশি ভোগ নাগছে!’

আনছু আরার মন্দ লাগে না কথাগুলো। সেই কত সকালে সামান্য পানতা খেয়েছে। এখন দুপুর। ক্ষুধা তারও লেগেছে। তারা হেঁটে দৌড়ে সেখানে এসে পড়ে। অনেক ভিড়…অনেক মানুষ খাচ্ছে। গোগ্রাসে গিলছে, চিৎকার চেঁচামেচি; একেবারে যুদ্ধ। লোভনীয় খাবারের সুগন্ধে তার জিহ্বা ভিজে ওঠে। পেট মোচড় দিতে থাকে। তারপরও কোত্থেকে একটু জড়তা এসে বাধা দেয়। সে মনের বাধা মানে না। গরিব মানুষকে হাত পেতে নিতে লজ্জা করলে চলে? এই হলো বেঁচে থাকা। জীবন বড় কষ্টের!

তিনতলা বাড়ির পাথরের বারান্দায় তিনজন যুবক কথাবার্তা বলছে। আনছু আরার মনে হয়, তারা কোনো গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। উঁচু স্বরে তর্ক বিতর্ক। মোটা গ্লাসের চশমা চোখে দেয়া যুবক হাত নেড়ে নেড়ে বলছে,

‘মুসলমানের মৃত্যুতে দেহত্যাগ শব্দ ছাপা ভুল হয়েছে বললে চলবে না; পরলোকগমন লেখাও জায়েজ। তুমি খামখা বাগড়া দিও না তো! কার্ডে ঠিক ছাপা হয়েছে। আফটার অল বাঙালি কালচারকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে না?’

‘সে কথা আমি বলছি না, কাদের ভাই। যারা পরজন্মে বিশ্বাসী তাদের মৃত্যুতে দেহত্যাগ বলা যায়। তারা বলে থাকেন, আত্মা হলো দেহের খোলস…পোশাক মাত্র। আর মৃত্যু হলো সেই পোশাক বদলানো। আত্মার মহানির্বাণ পর্যন্ত জন্মমৃত্যুর এই খেলা তাদের চলে।’

সরু গোঁফের টিংটিঙ্গে যুবক ভ্রু নাচাতে নাচাতে ভারিক্কি ভঙ্গিতে কথা বলে। তার বসে যাওয়া গাল চোয়ালকে সামনে ঠেলে দিয়ে চেহারাকে অদ্ভুত করে তুলেছে। চশমা পরা যুবকের মতো সবাই কৌতূহলী। মনোযোগের সঙ্গে শুনছে। টিংটিঙ্গের প্রভাব আছে মনে হয়। সে তখনো বলছে,

‘মুসলমানদের মৃত্যুতে তাই দেহত্যাগ শব্দের ব্যবহার হচ্ছে গিয়ে কবিরা গুনাহ্‌।’

‘আবে রাখ তোর গুনাহ্‌। তুই শালা আস্ত মাগিখোর। ওটাতে গুনাহ হয় না?’

অন্য একজন সিগারেটের একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে অস্থির গলায় বলে ওঠে। সমস্ত মুখে পক্সের দাগ। দুচোখ টকটকে লাল। একজন ঠোঁট যথাসম্ভব দু-পাশে টেনে তার কথায় সায় দেয়। লম্বু যুবকের মুখে হাসি কেমন কুৎসিত আর ভয়ংকর। আনছু আরা দূর থেকে দেখে একবার ভাবে চলে যায়। কিন্তু হাসিনা তখন এগিয়ে গেছে। হাতে চুড়ির মতো করে নেয়া দড়িগুলো রাখতে পারলে ভালো হয়। অগত্যা সে তাকে অনুসরণ করে।

চশমা চোখের যুবক এগিয়ে জিজ্ঞেস করে তারা চল্লিশা খেতে এসেছে কিনা। জবাবে দুজনে মাথা হেলিয়ে সায় দেয়। তারপর নির্দেশ মতো দড়িগুলো পাথরের বারান্দা পেরিয়ে ঘরের মধ্যে রেখে আসে। অদ্ভুত হিমশীতল ঘর। দিনে দুপুরেও ছায়াময় অন্ধকার। ছোট একটি বাল্‌ব খুব ম্লানভাবে অন্ধকার তাড়াবার অক্ষম চেষ্টা করছে মাত্র। আনছু আরার মনে অশুভ আশঙ্কা জেগে উঠেই মিলিয়ে যায়। তখন খাওয়ার সুযোগ পেয়ে ক্ষুধা বেশি হয়ে গেছে।

 

৩:২৫ পিএম. হিমশীতল ঘর

আনছু আরা কাড়াকাড়ি নাকি যুদ্ধ করে হলেও খেতে পেরেছে। অনেকদিন পর গরম ভাত আর গোস্ত জুটেছে কপালে। খেতে খেতে সে ভেবে রেখেছে, রেলবাজার হাটে পরিচিত দোকানে দড়িগুলো দেবে। যা পয়সা পাবে তা দিয়ে চাউল ডিম আলু কিনবে। তারপর উঠে বসবে বিকেলের পার্বতীপুর লোকাল ট্রেনে। সন্ধের আগে বাড়ি পৌঁছতে অসুবিধা হবে না। আগে ভেবেছিল দড়িগুলো হাতে ধরে নিজেই বিক্রি করবে, তাতে ভালো আয় হয়। দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি দিলে তেমন পয়সা আসে না। মা’ও নিষেধ করেছে। কিন্তু আজ আকস্মিক খাবার আয়োজনে বসে অনেক সময় চলে গেছে। দোকানে দেয়া ছাড়া উপায় নেই। রাতের ট্রেনে ভয় করে তার। সে খেতে খেতে কখনো হাসিনাকে তাগাদা দেয়। একসঙ্গে ফিরে যাবে। কিন্তু হাসিনার খাওয়া শেষ হয় না। অবশেষে আনছু আরা হাত ধুয়ে কামিজে মুছতে মুছতে পাথুরে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়।

শেষ পৌষের বিকেল ঠান্ডা বাতাস ছড়িয়ে দিয়েছে। দিনের আলো কুয়াশার চাদরে ম্লান-মেদুর। আকস্মিক হিমেল শিরশির দমকায় শরীর শিহরে ওঠে। গায়ে কাঁটা দেয়। আনছু আরার শীত লাগে। পরনে গরম কাপড় নেই। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। ঘরের বারান্দায় তিনজন যুবক তখনো হাত নেড়ে নেড়ে আলোচনায় ব্যস্ত। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘন হয়ে গেছে কুয়াশার স্তর। লম্বা করে যুবক তাকে দেখে দেয়ালে ঠেস দেয়া থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে,

‘কি পেট ভরে খেয়েছ তো? দোয়া করবে কেমন! আমার ভাই বাস অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে তারই চল্লিশা।’

‘জি মামা দোয়া করিম। আল্লায় যেন তাকে বেহেস্তবাসী করেন।’

‘ভালো মেয়ে। যাও ঘরের ভেতর তোমার জিনিসগুলো আছে নিয়ে যাও। বাড়ি কোথায় তোমার এ্যাঁ?’

‘জি মামা চিরিরবন্দর। পিত্তিক হাটবারে দড়ি বেচাবা আসো।’

‘ও আচ্ছা আচ্ছা, যাও নিয়ে যাও।’

আনছু আরা বেশ ভরসা পায়। তার সরল মুখে মৃদু হাসি ভেসে ওঠে। এরা ভদ্র ঘরের সন্তান। পরনে কত সুন্দর পোশাক! কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বলে! আহা এমন মানুষের ভাই কিনা মরেছে মটর গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে! আল্লাহ মানুষকে কত কষ্ট দেয়? অকৃত্রিম বেদনায় তার মন বিমর্ষ হয়ে পড়ে। বাবার কথা মনে আসে। বাবা বেঁচে থাকলে তার কষ্ট থাকত না। তার খুব কষ্ট। মায়ের কষ্ট। দুঃখ কষ্ট ঘেরা তাদের জীবন। সে ছোট একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিঁড়িতে ওঠে। পাথরের মতো হিমশীতল ঘরে এগিয়ে যায়।


অথচ তাকে বহন করতে হলো কলঙ্ক। কালকের সকালে সবাই আঙুল তুলে দেখাবে, এই সেই মেয়ে যে কিনা…


শীতের দিনকাল। একটুতে সন্ধে এসে যায়। পরিচিত কোনো দোকানে দড়িগুলো দিয়ে সে ছুটবে স্টেশন। যা টাকা পাওয়া যায় নিয়ে যাবে। এখন বাজার করার সময় নেই। তার মধ্যে চাপা অস্থিরতা নেমে আসে। বাড়ি ফিরবার তাগিদ। তখন পাথর ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ছায়া ছায়া আলো অন্ধকারে সে দেখে বিশাল এক দৈত্য রাক্ষুসে থাবা উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে। আনছু আরা কী করে? তার হাত পা স্থবির হয়ে পড়ে। গলা শুকিয়ে যায়। সে কোনোমতো ভয়ার্ত চিৎকার করে ওঠে,

‘মামা মোক যাবা দেন…মামা!’

‘চুউপ! অনেক টাকা দেব তোকে। চুপ…একদম চুপ।’

 

৬:৪০ পিএম. দিনাজপুর রেল স্টেশন

আনছু আরা যখন সন্ধের ট্রেনে বাড়ি ফেরার জন্য দিনাজপুর রেল স্টেশনে এসে দাঁড়ায়, প্লাটফর্মে মৃদু ভিড় বাড়ে। তার হতবিহ্বল চেহারা, গালে হায়েনাদের কামড়ের দাগ; ছিঁড়ে যাওয়া বেশবাস কে দেখে? দু-একজন কৌতূহলী বা নির্লিপ্ত দৃষ্টি তুলে তাকায় মাত্র। রাস্তায় কত মেয়ে ঘোরে। তাদের খারাপ মেয়ে বলা হয়। সেও খারাপ…নষ্ট মেয়ে। সে অসম্ভব ক্লান্তি আর যন্ত্রণার মধ্যে মানুষকে ভয় পেতে থাকে। পশ্চিমে বড় এক পিলারের অন্ধকার কোণায় নিজেকে লুকোয়। এখন আলোকে তার সবচেয়ে ভয়। মানুষকে প্রচণ্ড অবিশ্বাস। তিনজনের সঙ্গে পরে আর একজন যোগ দিয়ে চারজন। পশুগুলো তার সকল বিশ্বাস দুমড়ে মুচড়ে গুড়িয়ে দিয়েছে। তার একটি জীবন…ছোট ছোট স্বপ্ন…সব দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্কে হারিয়ে গেল। কী তার অপরাধ?

তখনো তার কানে বেজে চলে হিমশীতল ছায়ান্ধকারের উল্লাসী শীৎকার। নীরব অট্টহাসির স্খলিত ধ্বনি প্রতিধ্বনি দ্রিমি দ্রিমি ঢেউ হয়ে ভেসে যায়। পাশবিক তাণ্ডব দৃশ্য ভেসে ওঠে আলোর দেয়ালে। ওই ঘরে নয়, মনে হয় মানুষের চোখে চোখে ছড়িয়ে আছে সেই ছায়াছবি। দীর্ঘ প্রলম্বিত মন্থর গতিতে সে দৃশ্য তীব্র চিৎকারে তাকে বারবার আতঙ্কিত করে চলে। সে বোঝে হারাবার আর কিছু নেই। তবু বোবা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে। শোনে মানুষের গুঞ্জন। ভয়াবহ ত্রাস বিস্তারকারী অট্টহাসি।

আনছু আরা সমস্ত রাস্তায় বারবার এই ভেবেছে। এখন কী করবে? কোথায় যাবে? তার কি কোনো গন্তব্য আছে? সে আচ্ছন্নের মতো অজানা গন্তব্যের পথ ধরে। কাউকে অবলম্বন করে দুঃখের কথা বলার সাধ জাগে। বলতে ইচ্ছে করে স্বপ্নভঙ্গের কথা। ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের কথা। যন্ত্রণার কথা। তখন সালিমকে খুব মনে পড়ে যায়। তার মুখ ভেসে ওঠে বারবার। এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে মন চায়। আকাশে ভেসে থাকা চাঁদ কুয়াশা ভেদ করে মিষ্টি আলো ছড়াতে ছড়াতে জীবনের মায়া বাড়িয়ে দেয়। একবার চিৎকার করে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে তার…পারে না।

আশা-নিরাশার দোলায় তার কেবলই মনে হয়, সমস্ত শরীর-মন জুড়ে ক্লেদ আর পাপ। অথচ সে-সবের দায়ভার তার নয়। হয়তো তাই হতাশা তাকে নিয়ে যায় আরও অন্ধকারে। গুটিয়ে যায় নিজের ভেতর। তারপর ছোটবেলার পুতুলখেলার দিন খুব মনে পড়ে যায়। সালিমের চেহারা ভেসে ওঠে। শ্রুতিতে বেজে চলে ভালোবাসার স্বপ্নদোলা কোনো গান। কেন? তবে কি সেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল? এখন কোনো স্বপ্ন নেই। স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। সে নিজের কাছে কৈফিয়ত বা জবাবের দায়ভারে অর্থহীন ঝাপসা দৃষ্টি মেলে দূরে তাকিয়ে থাকে। অনেক দূরে লাল সিগন্যাল বাতি নির্নিমেষ দৃষ্টি হানে। তার মায়ের কথা মনে পড়ে। নিজের জন্য নয়, একান্ত আপন মানুষটির দুঃখে তার চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে যায়। পলায়নপর ভাবনায় অর্থহীন লাগে বেঁচে থাকা…অস্তিত্ব। ইচ্ছে হয় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে। ঘৃণাভরা এই জীবনের চেয়ে হয়তো সেটিই ভালো! তাই তার হাতে কয়েকটি দড়ি থেকে যায়। সে ওগুলো বিক্রি করতে এনেছিল।

 

৭:৫৫ পিএম. চিরি নদীর সাঁকো

আনছু আরা প্রিয় সাঁকোর কাছে এসে আকাশের দিকে তাকায়। চারিদিকের ফিকে কুয়াশা ঘন হতে শুরু করেছে। তার মধ্যে চাঁদ মায়াবী ফ্যাকাসে আলোয় জীবন আর এই পৃথিবীকে করে তুলেছে বড় রহস্যময়। সে ধীরে ধীরে ছেঁড়াফাটা কামিজ আর পাজামা খুলে ফেলে। জোছনায় সেই নগ্নতা কোনো অপার্থিব সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে চাঁদকে ইশারা করে নিজেকে দেখায়। এই সুন্দরতাকে মানুষ উলঙ্গ করে ফেলেছে। কলঙ্কিত করেছে। সে অস্ফুট স্বরে কোনো অলীক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। চাঁদ যদি বুকে কলঙ্ক নিয়ে গৌরবান্বিত হয়, সে কেন হতে পারে না? সে বিড়বিড় করতে করতে শীর্ণ নদীর হিম পানিতে নেমে যায়। সব ক্লেদ ধুয়ে পবিত্র হতে সাধ জাগে। আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্নিমেষ কাউকে খোঁজে। সে কি ঈশ্বর? কোথায় সে? আকাশ শুধু সীমাহীন ছায়াপথ অবিশ্বাস্য সৃষ্টির মায়াজাল মেলে ধরে আছে। তার মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে কোন্‌ নরক নাকি স্বর্গ কোথায় উঠে গেছে কে জানে!

আনছু আরা হু হু করে কাঁদতে থাকে। খুব বেশি কি চাওয়া ছিল তার জীবনে? নিজের গরিবি আর অবস্থান জেনেই তো সে নিজের মধ্যে গুটিয়ে ছিল। হাত বাড়িয়ে স্বর্গ ছুঁতে চায় নি। তেমন দুঃসাহস দেখায় নি। অথচ তাকে বহন করতে হলো কলঙ্ক। কালকের সকালে সবাই আঙুল তুলে দেখাবে, এই সেই মেয়ে যে কিনা…। সে তো অপরাধী নয়। তবে কেন প্রশ্নবাণ? কেন? দাপটি মানুষের এই পৃথিবীতে দুর্বলেরা কেন এভাবে মার খায়? সে মার খাবে না। সৃষ্টির প্রতি প্রতিবাদ করে যাবে। মানুষের প্রতি ঘৃণা রেখে যাবে। মানুষ, মানুষ নয়…শয়তান!

 

৫:৪০ এএম. চিরি নদীর পার্শ্ববর্তী আমবাগান

পরদিন খুব ভোরে স্বপ্নের আত্মহননে সালিমের চোখ ভিজে উঠেছিল কিনা দেখা হয় নি কারও। তখন রমরমা গল্পের উচ্চকণ্ঠ আলোচনা আর চাপা গুঞ্জনে চারপাশ ভরে গেছে। অচেনা কোনো গাছের পাশে ছড়িয়ে থাকা ক গাছি দড়ি তাকে শুধু উপহাস করতে থাকে। আনছু আরার মা যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা পুরোনো এক লাল শাড়ি আধভাঙা ট্রাংক থেকে বের করে আনে। তার বিয়ের শাড়ি। খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েকে বিয়ের সময় এই শাড়ি দিয়ে সাজাবে। সব ভুল। মিথ্যে স্বপ্ন। সে অগোছালো বেশে উচ্চস্বরে বিলাপ করতে করতে অকুস্থলে ছুটে আসে। মেয়ের বুকের উপর শাড়ি বিছিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে। লজ্জা এড়ানোর এই অসম্ভব প্রয়াসে গুঞ্জন জোরালো হয়। থমকে যাওয়া সময় অসহনীয় ম্লান হয়ে যায়। জটলা হাল্কা হতে শুরু করে। আনছু আরার মা ভেজা চোখে মানুষের মুখে মুখে কিছু খুঁজতে থাকে। সে কি বিশ্বাস নাকি করুণা কে জানে। তারপর আকস্মিক দমকা বাতাস। লাল শাড়ি দূরে সরে যায়। উদ্ভাসিত হয়ে পড়ে এক কিশোরীর ঘুমিয়ে থাকা শরীর।

তখন আনছু আরাকে স্বর্গের পতিত কোনো পরী মনে হতে থাকে।

মাহবুব আলী

জন্ম ৪ আগস্ট; দিনাজপুর। কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষা : রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : প্রভাষক, বেসরকারি কলেজ।

প্রকাশিত বই :
অস্তিত্বের পলায়ন [গল্প, ১৯৯২]

ই-মেইল : mahbubali.din@gmail.com

Latest posts by মাহবুব আলী (see all)