হোম গদ্য সৈয়দ হক-এর খেলারাম খেলে যা ও আমদানিসমাচার

সৈয়দ হক-এর খেলারাম খেলে যা ও আমদানিসমাচার

সৈয়দ হক-এর খেলারাম খেলে যা ও আমদানিসমাচার
704
0

আখ্যানের নিজস্ব একটা প্রবাহ আছে। এই প্রবাহে বাধা দিলে তা স্বরূপে না থেকে লেখকের উপস্থিতিকে পাঠকের মধ্যে জানান দেয়। ফলত আখ্যানের সধর্মচ্যুতি ঘটে আর পাঠক হয় অসহায়। আখ্যানের এই প্রবাহটা কেমনে আসে সেই উত্তর খোঁজ করা দরকার। এটা ইতিহাসের সামগ্রী নিয়ে নির্মিত হতে পারে আবার জীবনাভিজ্ঞতার ভেতরে যে-নিম ইতিহাসের বয়ান নির্মিত হয় তার ভেতর থেকেও হাজির হতে পারে। এর বাইরে আসলে কিছুই নাই। যদিও কার্ল মার্ক্সের ইতিহাসের সন্ধান আর পোস্ট মডার্নিস্টদের চোখ তা আপাত বিরোধী। প্রভু-সামন্তদের যুগ কিংবা কাল ফুরিয়েছে বলে যে-ঢেঁকুরতোলা ইতিহাস নির্মাণ চলে আদতে কী তা শেষ হয়েছে এমন প্রশ্ন জাগে যখন সমাজে কিংবা রাষ্ট্রকাঠামোয় অর্থনৈতিক শ্রেণিবৈষম্য দিনকে দিন বাড়ার এক ঊর্ধ্বচিত্র চোখের সামনে পাক খায়। তখন মোটা দাগে বলা যায়, হ্যাঁ সেই যুগ কিংবা কাল গেছে বটে তবে ইহা বহুজাতিক পুঁজিবাদের যুগ। এইকালে একক কোনো শাসক নাই যাকে প্রভু বলে কুর্নিশ করে বেঁচে থাকা যায়। ফলত একচরম অস্তিত্ব সংকট এসে ভর করে কুর্নিশ করার কৌশল বদলাতে তাগাদা দেয়। এই তাগাদায় অভ্যস্ত হতে না হতে আরেক ধরনের সংকট এসে হাজির হয়। জীবন তখন আর অভ্যস্ত হতে না চেয়ে সংগ্রামী হতে চায়। কিন্তু এই সংগ্রাম কিংবা বিপ্লব পরিবর্তনের কোনো হাকডাক নিয়ে আসে না। ইহা নিজের মনের ভেতর প্রবাহিত হওয়া দমকা বাতাসের ন্যায় কখন যে আসে আর কখন যে বন্ধ হয়ে যায় তার দিশা পাওয়া যায় না। না পাওয়ার কারণও বিস্তর। ভারতভূমির (ভারতবর্ষের) ইতিহাস খুঁড়লে আমাদের অসভ্য(!) হয়ে থাকার ব্যাপারটা বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায় ভূমি জবরদখল করে শাসনকার্য চালানো প্রভুরা। কতকিছুই চুরি হয়ে গেছে কিন্তু তারা নিজেদের সভ্য ভেবে ভূমিপুত্রদের অসভ্য বলে সভ্যতা শেখাবার পাঁয়তারা করেছে, আজও করছে। এইসব ব্যাপার খালি ইংরেজ আমলেই ঘটেছে তা নহে। মোগল, তুর্কিরা দখল করে ফারসি ভাষার যে-রাজনীতি চালু করেন তার ধারাবাহিকতা চালায় ইংরেজরা। তবে ইংরেজরা কফিনে শেষ পেরেক মারে ফলে হাতুড়ির বাড়িটা অধিকতর জোরে এসে পড়ে। উইলিয়াম জোন্স যে-এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করে ভারতভূমির সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার জাদুঘর খোলেন তখন ইহা একপ্রকার বালখিল্যকর ব্যাপার হয়েছে বলে মনে হয়। উপনিবেশিত হয়ে যখন জানমাল সবই জবর দখল হয়ে গেছে তখন সংস্কৃতির সন্ধান ‘কোথায় পাব তারে’ অবস্থায়।


ইতিহাসের এই পর্যায়ে আমরা উপনিবেশিত হয়ে সাহিত্য পেলাম।


সংস্কৃতি প্রকৃত অর্থেই সংস্কৃতি হয়ে গড়ে উঠতে দীর্ঘকাল লেগে যায়। যাতে ভূমিপুত্রদের-ভূমিকন্যাদের হাত থাকে। কিন্তু সংস্কৃতি মিটাতে সময় লাগে না। এক শাসকের একটা আওয়াজই যথেষ্ট। উপনিবেশিত হয়ে দিন গুজরানোর ফলে সংস্কৃতির উপর এই আঘাতটাই প্রবল হয়েছে। ফলস্বরূপ ভূমি তার নিজস্বতা হারিয়েছে। তখন একটা প্রশ্ন এসে সামনে খাড়ায়—কী পেলাম আর কী হারালাম! এই দেনাপাওনার হিশাব মেলাতে গেলে বিস্তর কথা চলে আসে। বিশেষ করে ইতিহাস তখন দণ্ড ধরে খাড়া হয়। কিন্তু এখানে আলোচনার বিষয় সাহিত্য আরও খোলাসা করে বললে সৈয়দ শামসুল হক-এর খেলারাম খেলে যা আখ্যান। আলোচনার গতি সেইদিকে ঘুরালে দেনাপাওনার ইতিহাসকে সাহিত্যের দিকেই নিতে হবে। তো ইতিহাসের এই পর্যায়ে আমরা উপনিবেশিত হয়ে সাহিত্য পেলাম। উপনিবেশিত হওয়ার আগে কি আমাদের সাহিত্য ছিল না? ইহার উত্তরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ঘাটতে হয়। তখন আরও একটি প্রশ্ন এসে খাড়া হয়, আমাদের বলতে কী কিংবা কতটুকু বুঝানো হবে? চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে-ইতিহাস রচিত হয়েছে আর তাতে প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ, আধুনিকযুগ কালকেন্দ্রিক যে-বিভাজন করা হয়েছে সেটা তো ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের আদলে। বাঙালির সংস্কৃতিতে আরব আর পারস্যের প্রভাব পড়েছে আর সাহিত্যে পড়ল ইউরোপীয়দের। প্রাক্ইউরোপ আমলের ভারতভূমির সাহিত্য উপাদানে যে কাব্যকাহিনি ছিল ইউরোপ উপনিবেশে তা পাল্টে গেল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, মৈমনসিংহগীতিকা শুধু কাব্য-না আবার কাহিনিও না। এসবের মধ্যে কাহিনির বিস্তরণ আছে আর সেটা ঘটেছে কাব্য মাধ্যমে। তার মধ্যে মৈমনসিংহগীতিকার ব্যাপারটা আবার আরেকটু ব্যতিক্রম মনে করলে এটাকে কাব্যনাট্যও বলা চলে। রাশিয়ান হেরোসিম লেবেডেফ বাংলা নাটকের যে ইতিহাস দেখান তা ভেঙে দেন সেলিম আল দীন মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য ইতিহাস তুলে ধরে। ফলে বাংলা নাটকের একটা ভারতীয় পটভূমির নাগাল পাওয়া যায়। তবে পুরো ইউরোপিয়ানা হয়ে গেল বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলা গদ্যের যে চল শুরু হলো তাতে বাংলা গদ্য ইতিহাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকেই এর পিতৃভূমি মনে করা হলো এবং এখনও এই ইতিহাসটাই চলছে। আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো তুখোড় প্রতিভা ‘নভেল’ লিখে তা সরস করে তুললেন। সেই সঙ্গে তার তুড়িতে উড়ে গেল ‘আলালের ঘরে দুলাল’, ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ টাইপের গদ্য। বঙ্কিম ইউরোপীয় আদলে নভেল লিখলেন এবং সেটাই প্রতিষ্ঠিত হলো। তবে এই বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন :

‘বাঙ্গালার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালি তাহাকেই লিখিতে হইবে। মা যদি মরিয়া যান, তবে মার গল্প করিতে কত আনন্দ। আর এই আমাদের সর্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গালাদেশ, ইহার গল্প করিতে কি আমাদিগের আনন্দ নাই? আইস, আমরা সকলে মিলিয়া বাঙ্গালার ইতিহাস অনুসন্ধান করি।’

বঙ্কিম যে-ইতিহাস লেখার এবং অনুসন্ধান করার কথা বলেছেন তা যদি সাহিত্যে থাকে তাহলে ব্যাপারটা সহজ হতো। বিশেষ করে উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্য যদি পাওয়া যেত তাহলে আসলেই আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের রূপরেখার নির্মিতি সহজ হতো। তেমনটা ঘটে নাই। ইংরেজ উপনিবেশের বাংলায় উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্য গড়ে উঠে নাই। বিশেষ করে বঙ্কিম যে-সময়টায় উপন্যাস লিখেছেন তার উপন্যাসের মাল-মশলা মানে উপাদান হয়ে আছে সামন্তরা। বঙ্কিম ইউরোপীয় ফর্মে আখ্যান লিখলেন আর সামন্তদের চরিত্রায়ণ করলেন। তার মানে বাঙ্গালার ইতিহাসকে বঙ্কিম সামন্তদের মধ্যেই বাঁধতে চেয়েছেন। যদিও পরে আখ্যানে জগদীশ, শরৎ, বিভূতি, মানিক, তারাশঙ্কর নিম্নবর্গকে ধরেছেন আর সেখানে কারও কারও আখ্যানে উত্তর ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট হাজির হয়েছে। বিশেষ করে বিভূতিভূষণ এখানে বেশি জ্বলজ্বলে। এইসব বিষয়আশয় আর কথার মাঝে বিশ্বদরবারে শিল্প সাহিত্যের জল অনেক গড়ায়। এনলাইটমেন্ট, শিল্পবিপ্লব আর বাষ্পীয় ইঞ্জিনের যে-ঢেউয়ে রেললাইন বসে ভারতভূমিতে আর মরে যাওয়া শুরু হয় নদীপথের তখনই নীলচাষে বন্ধ্যা হয় এইভূমি আর কৃষক। বঙ্কিমের উপন্যাসে এইসব বিষয়আশয় আসে নাই। যা হোক আসে নাই বলে যে আসে নি তা নয়। এসেছে তবে পরে। বঙ্কিম তার উপন্যাসে যে-ইউরোপীয় ফর্ম আমদানি করলেন এখনও এটা চলছে। এইবার দেখা যাক সৈয়দ শামসুল হক খেলারাম খেলে যা আখ্যানে কী আমদানি করলেন?


আখ্যানের প্রধান চরিত্র বাবর আলী খান দিয়েই শুরু করা যাক। বাবর আলী খান-কে ঘিরেই আখ্যানের নির্মিতি। তার চরিত্রের বিষয়আশয়ে দুইটি ব্যাপার লক্ষ করা যায়। একটি হলো উপরিতল আরেকটি হলো গভীরতল। উপরিতলে পাওয়া যাবে তার যৌনতার খবর কিংবা আরও খোলাসা করে বললে খেলারাম কীর্তি। আর গভীরতলে পাওয়া যায় stream of consciousness-এর খবর। উপরিতলে এটা যৌনতা নির্ভর উপন্যাস হিশেবে উপস্থাপিত হয় যখন আখ্যানের প্রধান চরিত্র বাবর আলী খান কেবলই যৌনতা দ্বারা তাড়িত হন। যৌনতা তো পৃথিবীর আদিম প্রবৃত্তি, সেটা নিয়ে আখ্যানের কাহিনি নির্মিত হলে এত হুল্লোড়ের কী আছে! কিংবা ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বের শৃঙ্গার রস তো সংস্কৃত সাহিত্যে অনেক আগেই প্রচলিত। তাহলে খেলারাম খেলে যা-আখ্যানে এমন কী ঘটল যা এটাকে উপরিতলে যৌনতা নির্ভর আখ্যান হিশেবেই পরিচিত করল? খেলারাম খেলে যা-এর আগেও তো বাংলা সাহিত্যে যৌনতা নির্ভরউপন্যাস এসেছে। বুদ্ধদেব বসুর রাত ভরে বৃষ্টি, সমরেশ বসুর বিবর, প্রজাপতি যৌনতাকেন্দ্রিক উপন্যাস। খেলারাম খেলে যা-এর বেলায় সময় একটা গুরুত্ব বহন করে। এটা বাংলাদেশের সাহিত্যের উপন্যাস আর রচনাকাল ১৯৭০-১৯৭৩। উপন্যাস রচনার এই সময়টা বাংলাদেশের জন্মমুহূর্ত। তো ওই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সাহিত্যে এমন যৌনতাভিত্তিক চরিত্র নিয়ে সাহিত্য কাহিনি নির্মাণ হয় নি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্যে কৃষ্ণ চরিত্রের এমন প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়।


একটি প্রশ্ন আসে, বাবর আলী খান-এর এই ব্যক্তিবিচ্ছিন্নতা কি ইউরোপ থেকে আমদানি করা?


যখন সৈয়দ হক তার খেলারাম খেলে যা-এর বাবর আলী খানের মুখ দিয়ে খেলারাম খেলে যা কথাটা বের করান তখন সেটা কেবল অশ্লীল হয়ে পাঠকের কাছে ধরা পড়ে। এমন হওয়ার কিছু কারণ খোঁজ করা দরকার। আমাদের স্কুলের মাস্টার কিংবা বাড়ির মুরুব্বিরা বাংলা পাঠ্যবই পড়াতে গিয়ে সাহিত্য নিয়ে যে-বয়ান বালকের মনে গেঁথে দেয় তাতে সাহিত্য মানে একটা নীতি নৈতিকতার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে—সদা সত্য কথা বলিবে, সৎ পথে চলিবে এইসব নীতিকথা দিয়েই সাহিত্য স্কুল বালকের মনে এমন একটা প্রেক্ষাপট কিংবা সংজ্ঞার্থ নির্মাণ করে যা পরবর্তীকালে বালক থেকে যুবক বয়সে উতরে গেলেও সাহিত্য পাঠে মনটা বালক-ই থেকে যায়। আর এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য বালক মন হাঁশ-ফাঁশ করলেও পারে না। বালকের অবচেতন মন এতটাই প্রভাবিত হয় যে, চেতন মনও সেখানে নাকাল। আর তখনই খেলারাম খেলে যা অশ্লীল উপন্যাস হিশেবে তার কাছে ধরা খায়। উপরন্তু সাহিত্য বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি এমন কথা বললেও যৌনতাও যে বাস্তব জীবনের একটা বড় সত্য সেটাকে তারা সাহিত্যে দেখতে চায় না। সাহিত্য ওইসব পাঠক মনে সকল সংস্কার নিয়ে টিকে থাকতে চায় যেখানে যৌনতাবিষয়ক আলাপ নিষিদ্ধ। এমনকি ন্যাচারালিজম দ্বারা প্রভাবিত ঔপন্যাসিক জগদীশ গুপ্ত যখন তার কথাসাহিত্যে ‘ফিজিওলজিক্যাল ম্যান’-এর সৃষ্টি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এটাকে গ্রহণ করতে চান নি। এটাকে ‘রিয়ালিটির কারিপাউডার’ বলে তিনি লক্ষ করেছেন ‘লালসার অসংযম’। তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কথা ধরে প্রশ্ন চলে আসে খেলারাম খেলে যা-এর বাবর আলী খান কি ‘লালসার অসংযম’ প্রবৃত্তি দ্বারা নির্মিত ক্যারেক্টার। আর তখনই আখ্যানের গভীরতলে প্রবেশ করতে হয়। এই আখ্যানের গভীরতলে কয়েকটি বিষয় এসে কড়া নাড়ে। তার মধ্যে দেশভাগ মানে ভারতভাগ আর ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতা অন্যতম। একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক রয়েছে এই আখ্যানে। বর্ধমানে জন্ম নেওয়া বাবর আলী খান দেশভাগের কারণে ঢাকার বাসিন্দা হন। বাবর আলী খান বর্ধমান ছেড়ে আসলেও বর্ধমান তাকে ছাড়ে না। দেশভাগের ফলে তার মনে যে-ক্ষত তৈরি হয় সেটার বিনির্মাণ চলে stream of consciousness-এর মধ্য দিয়ে তার হারিয়ে যাওয়া ছোট-বোন হাসনুকে বহন করার চিহ্নে।

‘কোথায় গিয়েছিল দুজন, মনে নেই। মনে রাখার কোনো প্রয়োজনও নাই। যেন জন্মের পর থেকেই সে আর হাসনু অবিরাম দ্রুত পায়ে সেই অন্ধকার ভাঙতে ভাঙতে চলেছে।
কে যেন পেছনে আসছে।
কই না।
আবার তাকিয়ে দেখল বাবর। কাউকে দেখল না, তবু মনে হলো কেউ তাদের অনুসরণ করছে। তার হাত ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ধরবার জন্যে। চট করে হাসনুকে টেনে সে পোলের পাশে ঝোঁপের মধ্যে লুকাল। …হাসনুর মুখ চেপে ধরে বাবর কান পেতে রাখল শব্দের ঐ উৎসের দিকে। তার মেরুদণ্ড দিয়ে হঠাৎ ঠান্ডা তরল কী যেন নামছে অতি দ্রুত। তারপর হঠাৎ উরুর ভেতরটা ভিজে গেল উষ্ণতায়।
ঘড়ঘড় একটা শব্দ হলো সেই মুহূর্তে, ওপারে।
ফিসফিস গলায় কে যেন জিজ্ঞেস করল, বল শালা, হিন্দু না মুসলমান?
উত্তরে দ্বিতীয় লোকটা হিহি করে হেসে উঠল যেন।
বল?
চাপা গলায় গর্জে উঠল প্রথম।
আঁ করে একটা শব্দ করল দ্বিতীয়।
তারপর শোনা গেল, হি হি না, হি হি না না।
চুপ শালা।
… বাবর হাসনুকে টেনে তুলে দৌড় দিতে যাবে, একবারে সামনে পড়ে গেল লোকটার। হাতে রক্তমাখা ছুরি। গলায় একটি মাদুলি চকচক করছে। আর কিছু চোখে পড়ল না তার।
আর কিছু মনে নেই বাবরের।
কেবল মনে আছে বাবর মাঠের ভেতর দিয়ে প্রাণপণে দৌড়ুচ্ছে।
আর পেছনে হাসনুর আর্তচিৎকার আকাশে বাতাসে হা হা করছে—দা-দা।
আরো খানিকটা হুইস্কি ঢালল বাবর।
হাসনুকে আর পাওয়া যায় নি।
কেন সে হাসনুকে ফেলে পালাল। কেন লড়াই করল না। কেন? কেন?
কোনটা স্বাভাবিক? পালিয়ে আসা? না, লড়াই করা? গল্পে উপন্যাসে মানুষের আদর্শে রুখে দাঁড়ানোটাই চিরকাল নন্দিত। সিনেমা হলে তালি পড়ে। বই পড়তে পড়তে প্রশংসায় পাঠকের মুখ লাল হয়ে ওঠে। কিন্তু সে নিজে, নিজের প্রাণ নিয়ে, পালিয়ে এসেছে।
আমি কি ঘৃণিত বলে চিহ্নিত হবো?
মানুষ যা পারে না তাই বড় করে দেখতে চায়, দেখানো হয়।…
হাসনু, আর কোনোদিন আসিস না। তুই যা।’

আখ্যানের এই অংশটুকু গভীরতলকে হাজির করে। আপাতভাবে যে-টা বাবর আলী খান-কে লালসার অসংযমী হিশেবে হাজির করে এখানে এসে তা পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাবর আলী খানের চেতনা প্রবাহে হাসনুর উপস্থিতি তা আরও গভীর করছে। ‘আমি কি ঘৃণিত বলে চিহ্নিত হবো?’ বাবর আলী খানের এই প্রশ্নের উত্তর কী? বাবর নিজেকে ঘৃণিত হিশেবেই চিহ্নিত করেছে। এটা থেকেই তার ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার সূত্রপাত। তখন একটি প্রশ্ন আসে, বাবর আলী খান-এর এই ব্যক্তিবিচ্ছিন্নতা কি ইউরোপ থেকে আমদানি করা? কিংবা যে-ঘটনা তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল সেটা ধরেই কেন সে নির্মাণ করল নিজেকে? এখানে করতে হয় অবদমনের খোঁজ। ‘যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজ-অননুমোদিত চিন্তা, আবেগ ও ইচ্ছাকে চেতন মন থেকে সরিয়ে মনের গভীরতম স্তরে নির্বাসিত করা হয়, সেই প্রক্রিয়ার নাম ‘অবদমন’।’ তো বাবর আলী খান-এর ওপর এটার আছর কিভাবে পড়ল সেটাও খোঁজা দরকার। ছোট বোন হাসনুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা তার মধ্যে রুদ্ধ হয়ে একটা রোগলক্ষণ তৈরি করেছে। তার রুদ্ধ এই আবেগকে সে মুক্ত করতে পারে নি। ফলে সে নিজে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিশেবে অবদমনের একটা প্রক্রিয়ায় নামে। ব্যক্তির মন যখন নানারকম ইচ্ছা যেটাকে প্রচলিত সমাজে অনৈতিক, অসামাজিক, অসঙ্গত বলে চিহ্নিত করা হয় তেমনটি আকাঙ্ক্ষা করে তখন তা নিয়ে ব্যক্তি সচেতন হয়, নানা প্রক্রিয়ায় সেটাকে অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু বাবর আলী খান সেটা অস্বীকার করে নি কিংবা তার সচেতন মন সেটা থেকে নিজেকে প্রত্যাহারও করে নি। ফলে সচেতন মন যেটা চাপা দিয়ে অবদমন করে বাবর আলীর বেলায় তা ঘটে নি। বরং বাবর আলী নিজের ইচ্ছাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।


খেলারাম খেলে যা পেয়েছে অশ্লীলতার তকমা কিংবা বলা হলো সৈয়দ হক সাহিত্যে অশ্লীলতা আমদানি করলেন।


না কিছুতেই সে প্রশ্রয় দেবে না। তার কেউ নেই। কেউ হবেও না কোনোদিন। মানুষের যত জ্বালা এই মানুষে মানুষে অন্ধবন্ধন থেকে।

হা। খেলারাম। চোখে স্পষ্ট দেখেতে পায় দেয়ালে সেই অপটু হাতে বড় বড় করে লেখা—খেলারাম খেলে যা।  এই তার দর্শন, এই তার সত্য।’

এখানে ব্যাপারটা খোলসা হয়ে যায়। নিজেকে খেলারাম বলে আখ্যায়িত করে সে তার যৌনতাকামিতাকে মনের গভীরতর স্তরে নির্বাসন করে নি। বরং সেটাকেই তার দর্শন কিংবা সত্য হিশেবে মেনে নিয়েছে। বাবর আলীর এই মেনে নেওয়াটাই বিতর্কিত হয়েছে কিংবা খেলারাম খেলে যা পেয়েছে অশ্লীলতার তকমা কিংবা বলা হলো সৈয়দ হক সাহিত্যে অশ্লীলতা আমদানি করলেন। তবে পাঠক এই আখ্যান পাঠ করতে করতে উপরিতলে সুড়সুড়ি অনুভব করছেন ঠিকই কিন্তু এই সুড়সুড়ি অনুভব করার কারণটাও যে তার ভেতর অবদমিত থেকে যাওয়া আকাঙ্ক্ষারই একটা চিত্র এটা কি তিনি বুঝতে পারছেন? কারণ অভিজ্ঞতার বাইরে কখনওই ইচ্ছা তৈরি হয় না।


খেলারাম খেলে যা আখ্যানে কিছু কিছু ঘটনা লেখক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন। আর এখানেই পাঠকের সঙ্গে বোঝাপড়ার সংকটটা তৈরি হয়েছে। আখ্যানের প্রধান চরিত্র বাবর আলী খান নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর জন্য যে-কৌশল বা ফাঁদ তৈরি করেন সেটার বর্ণনার চেয়ে নারীদের সঙ্গে তার যৌনতার সময়ের বর্ণনাকে বেশি ডিটেইলস করা হয়েছে। বিশেষ করে জাহেদার সঙ্গে কাটানো সময়ের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটেছে। আর তখন পাঠকের মনে ওইসব বর্ণনা পড়ার সময়দৃশ্যটার একটা ভিজ্যুয়াল ইমেজ তৈরি হয়েছে। আর তাতে আখ্যানের গভীরতলের কাহিনির চেয়ে উপরিতলের কাহিনিটাই পাঠককে আখ্যান নিয়ে ভাবাচ্ছে এবং আখ্যানের মোটিফ হিশেবে যৌনতাকেই বেছে নিচ্ছে। আর পাঠক মন যখন এই প্রেক্ষিতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তখন আখ্যানে বাবর আলী খানের যে-সংকট সেটা পাঠক মনকে নাড়া না দিয়ে কিংবা ভাবনার মধ্যে না এনে তার খেলারাম ভাবটাই ক্রিয়া করে। ফলে হাসনুকে নিয়ে যে চেতনা প্রবাহে আক্রান্ত হয় বাবর আলী খান এবং আখ্যানের শেষে জাহেদাকে বাঁচানোর জন্য যে চেষ্টা সেটা আখ্যানের কাহিনির মূলভাবকে খোলাসা করলেও পাঠক সেটাকে কতটুকু গ্রহণ করে এটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যদিও বাবর আলী খানকে আখ্যানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হাসনুকে বাঁচানোর জন্যই লেখক তাড়িত করেছেন। ‘জাহেদা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তাকে মাটির ওপর টেনে হেঁচড়ে নিতে নিতে বাবর বলে, হাসনু আয়। হাসু আয়।’ এইখানে সকল অশ্লীলতা ঘুচে আখ্যান হয়ে ওঠে মানবিক। তখন থাকে না কোনো অশ্লীলতা আমদানি সমাচার।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই :
জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj