হোম গদ্য সেই শস্য অগণন মানুষের শব

সেই শস্য অগণন মানুষের শব

সেই শস্য অগণন মানুষের শব
855
0

মায়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আমাদের কি নৈতিক অধিকার থাকবে, যদি আমরা নিজের দেশে বৌদ্ধ কিংবা আর যে কোনো সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকে প্রশ্রয় দেই?

শুরুতেই তাই যে কথাটি বলে নেয়া দরকার, বাংলাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিপন্ন হওয়ার ঘটনা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনরক্ষার সংগ্রামের সামান্যতম উপকার করবে না, বরং মায়ানমারের সামরিক জান্তার গণহত্যাকে আড়াল করতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, বিশেষ করে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা প্রতিরোধে তাই সর্বোচ্চ সক্রিয়তা দেখাতে হবে। এমন যে কোনো হামলা রুখতে সজাগ ও সচেষ্ট থাকতে সকলের প্রতি অনুরোধ জানাই, একাজে প্রয়োজনে মুখের সাথে হাতও ব্যবহার করতে হবে।

সরকারের প্রতিও আমাদের দাবি থাকবে, এমন যেকোনো উস্কানি রোধে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যেন নিরাপত্তাহীনতা ও মর্যাদাহীনতার অনুভূতির শিকার না হন।

কোনো কিছুর সাপেক্ষে নয়, নিঃশর্তভাবেই যেকোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তা সমুন্নত রেখেই আমরা মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

১.
গত এক সপ্তাহে রোহিঙ্গা পরিস্থিতির কিছু বাঁকবদল ঘটেছে।

দিন কয়েক আগেও যে রোহিঙ্গার পাশে কেউ নেই বলে মনে হচ্ছিল, আজকে তার পক্ষে অনেকেই কথা বলছেন, সামনে আরও উচ্চকণ্ঠও হয়তো হবেন। রোহিঙ্গা এখনো অসহায় আছেন, কিন্তু এখন একা তারা নন। ভারত আর চিনের মতো ‘একটা পাগল একটা গোঁয়ার’ রাষ্ট্রও রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে বাধ্য হচ্ছে, মৃদু হলেও অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। বিশ্বজনমতের অন্তত এইটুকু শক্তি আছে।


‘রোহিঙ্গাদমন নীতি’ আসলে সামরিক জান্তার একটা কৌশলের অংশ, যে শয়তানি বুদ্ধির সাহায্যে তারা মায়ানমারের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চায়।


আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বদল বলা যেতে পারে, রোহিঙ্গার আত্মমর্যাদা আর নাগরিকত্বের সংগ্রামকে সন্ত্রাসী-জঙ্গি এই সব তকমা এঁটে অপদস্থ করার কৌশলে খুব সাফল্য মিলছে না। বরং বলা যায়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতারই একদা ঘনিষ্ঠ মিত্র হিশেবে আবির্ভূত বৈশ্বিক ধর্মীয় জঙ্গিবাদী তৎপরতা ভরবেগ হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক তার আর্থিক পৃষ্ঠপোষকরাও বেসামাল নানান মাত্রায়, তার সামরিক কেন্দ্র পাকিস্তান নিজেই বিপুল রক্তপাতের শিকার হয়ে, দুনিয়া জুড়ে একঘরে ও কোণঠাসা হয়ে আত্মসংশোধনের চেষ্টা করছে। এটা বিশ্বের মুক্তিকামী সকল মানুষের জন্যও একটা ইতিবাচক অগ্রগতি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য একটা অনেক বড় অর্জন হবে রোহিঙ্গা সমস্যাটাকে যথাযথভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হলে। এটা যেমন শরণার্থীদের দেখভাল করার বিষয়ে, তেমনি রোহিঙ্গার প্রতি মনোভাবের এই পরিবর্তনশীল ঢেউয়ে নেতৃত্বের স্থানে নিজেকে স্থাপন করে।

বিষয়টা যেমন কূটনৈতিক দক্ষতার, তেমনি একটা সুসমন্বিত ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার। শরণার্থীদের জন্য চিকিৎসা, শিশুদের জন্য শিক্ষা, নারীদের জন্য নিরাপত্তা এবং অতি অবশ্যই খাদ্য-পোশাকের বন্দোবস্ত করার জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সকল উদ্যোগকে কাজে লাগাতে হবে।

২.
মায়ানামার আমাদের এক অস্থির প্রতিবেশী।

মোটামুটি আধুনিক একটা সেনাবাহিনী মায়ানমারের আছে, কিন্তু এর উৎপাদন-বণ্টন-পরিবহন-শিক্ষা, প্রায় সব কিছুই আছে প্রায় প্রাক-আধুনিক জগতে। সেনাবাহিনী বছরের পর বছর দেশটাকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে বাকি দুনিয়া থেকে, ফলে একদিকে এর সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে খুবই সামান্য। এই এক অদ্ভুত রাষ্ট্র, বলা চলে আধুনিক রাষ্ট্রের খোলসে খুবই একটা পুরনো উৎপাদন ব্যবস্থা আর সনাতনী সামাজিক বৈশিষ্ট্য সেখানে টিকে আছে। একটা দেশে সাধারণত এটা তখনই ঘটে, অনেকগুলো জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মের মাঝে সমন্বয় করতে অক্ষম হয়ে কোনো একটা প্রাধান্যশীল একটা গোষ্ঠী যখন সামরিক কর্তৃত্বের জোরে বাকি সকলকে দমন করতে চেষ্টা করে—মায়ানমারে যেমনটা আছে বার্মিজ জাতি আর সামরিক বাহিনীর একটা জবরদস্তি। এর ফল অবশ্য মোটের ওপর কারও জন্যই ভালো হয় না। উৎপাদনের বিকাশ ঘটে না, কিন্তু যেখানেই যা কিছু মেলে, তা বরাদ্দ হয় ওই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতেই। দুর্নীতি আর জবাবদিহি-হীনতা ছড়িয়ে পড়ে সর্বস্তরে।

জনজীবনের রূপান্তরের এই অভাবের ফলে প্রচুর কলকারখানা মায়ানমারে আপাতত নেই। কিন্তু প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। সেই বিনিয়োগ প্রধানত খনিজ সম্পদ আহরণ, বনজ সম্পদ আহরণ, অবকাঠামো নির্মাণ এগুলোকে কেন্দ্র করেই। স্বাধীনতা দিয়ে বৃটিশদের চলে যাবার সময়ে মায়ানমারকে ভাবা হতো এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ আর ঊর্বরতার দিক দিয়ে দেশটির তুলনা খুব কমই মিলত। কিন্তু এত বছর পরও মায়ানমারকে নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে তার কারণ এই রাষ্ট্রনৈতিক সংকট অতিক্রম সে সফলভাবে করতে পারে নি, কারেন-শান-আরাকানসহ অজস্র বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠী ও তাদের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতার সংগ্রামকে মোকাবেলা করে বিপুল শক্তিক্ষয় করতে হয়েছে তাকে।

ফলে মায়ানমার নতুন যে বিদেশি বিনিয়োগকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, তাদেরকে উপহার হিশেবে দিচ্ছে সস্তায়, প্রায় বিনামূল্যে জমি। ‘পুঁজির আদিম লুণ্ঠন’ বলে অর্থনীতির ইতিহাসে যে পরিভাষাটি চালু আছে, মায়ানমারের অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য তাই। এর অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিটি স্তরে প্রতিটি পর্বে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিত্যনতুন চেহারা পাবে। প্রায় প্রতিটি জাতির মাঝে কেন্দ্রের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ প্রবল বলে এবং বলপ্রয়োগের চিহ্নগুলো দূর করে কোনো পারস্পরিক স্বার্থ ও যৌথ আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়াটাকে দেশটি সাবলীল করতে সক্ষম হয় নি বলেই সামরিকবাহিনী সেখানে একমাত্র বন্ধনশক্তি। নামমাত্র গণতন্ত্র আছে বটে, নির্বাচনও হয়েছে, কিন্তু সাংবিধানিকভাবেই সংসদে বড়সড় একটা সংরক্ষিত আসন সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ আছে, আছে কয়েকটা মন্ত্রিত্বের পদ।

‘রোহিঙ্গাদমন নীতি’ আসলে সামরিক জান্তার একটা কৌশলের অংশ, যে শয়তানি বুদ্ধির সাহায্যে তারা মায়ানমারের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চায়। রাষ্ট্রজুড়ে যত সামরিকায়ন, তত সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা। তবে বহু ক্ষেত্রে এই কৌশলটি শেষ বিচারে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। আপাতত এই মুহূর্তে রোহিঙ্গার পক্ষে শক্তিশালী কোনো প্রতিবেশীর স্বার্থ নেই, ফলে গণহত্যাটি নিশ্চিন্তে চালনা করা যাচ্ছে। চিন ও ভারতের মতো দুই বৃহৎ প্রতিবেশী কার্যত এতে খোলাখুলি সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু বহু জাতি আর জনগোষ্ঠীতে অধ্যুষিত মায়ানমার কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে না তুললে এই অসন্তোষ সর্বদাই বার্মিজ বাদে বাকি জাতিগুলোর মাঝে বিদ্রোহের ধোঁয়া কমবেশি জারি রাখবে। মায়ানমার ভারত-চিন এই দুই ধুরন্ধর প্রতিবেশীর মাঝে অবস্থিত, দেশটির অজস্র ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এখনও থাইল্যান্ডে নির্বাসিত। বিপুল সম্পদের অধিকারী হলেও যেকোনো কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরু হলে জাতিগুলোর রেষারেষি ও দাবির চাপ মোকাবেলা গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের পক্ষে খুব কঠিন হবে। কিন্তু রাষ্ট্র হিশেবে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার তার জন্য এটিই দেশটির জন্য একমাত্র পথ। খনিজ সম্পদ আহরণের বাইরে অন্য কোনো কলকারখানা ও উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে গেলে তাকে ন্যূনতম কিছু গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকার করে নিতেই হবে।

আরাকানে রোহিঙ্গা বাদে অন্য যে প্রধান জনগোষ্ঠী, আরাকানি বা রাখাইনদের মাঝেও সুদীর্ঘ ক্ষোভের স্মৃতি আছে দখলদারিত্বের। এটাকে চাপা দিতেই রাখাইন-রোহিঙ্গা দ্বন্দ্ব সামরিক বাহিনীর সহজ কৌশল হিশেবে কাজ করে। ভারতের মতো বহু জাতিগোষ্ঠী-অধ্যুষিত রাষ্ট্রে একটা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে শাসনতন্ত্রে, শত দুর্বলতা সত্ত্বেও ভারতের টিকে যাওয়ার রহস্য এটাই। এই ভারসাম্যের খানিকটা অভাব পাকিস্তানে সামরিক প্রভুত্বের আদি কারণ। কিন্তু মায়ানমারের বার্মিজ আধিপত্যের সাথে এদের কারও তুলনা হবে না, মায়ানমারে রাষ্ট্রবিকাশে সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক আবার এটিই।

৩.
মায়ানমারের সংকটে সু কি-র মতো একটি মহাতারকার, আমাদের সময়ের একটি রাজনৈতিক কল্পকথার পতন দেখলাম আমরা।

নীতিকে বিসর্জন দিয়ে তিনি সুবিধাকে প্রাধান্য দান করে জাতিসংঘের অধিবেশনেও মুখ দেখাতে পারছেন না লজ্জায়।


আমরা জানি না মায়ানমার আবার কখন জাগবে। তার আগ পর্যন্ত সারা দুনিয়ার বৈশ্য সম্প্রদায় সেখানে রক্তের হোলিখেলার রসদ জুগিয়ে যাবে।


সু কি কি ভবিষ্যতে কখনো মায়ানমারের সব জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন? মায়ানমারের সেনাতন্ত্রকে ন্যূনতম প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থায় রূপান্তরে নেতৃত্ব দিতে পারবেন? ইতিহাসে এমন সময় আসে, আশু লাভকে বিসর্জন দিতে হয় নিজের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট রাখার জন্য। সু কি সেই পরীক্ষায় চরমভাবে অনুত্তীর্ণ হয়েছেন। তার একটা বড় শক্তি ছিল বৈশ্বিক জনমত ও গণমাধ্যমের সমর্থন, সেটিও তিনি অনেকটাই হারিয়েছেন।

সু কি-র এই বশ্যতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপার গণহত্যাকে মায়ানমারে অনেকখানি প্রশ্নহীন ভাবেই হতে দেবে। বিদ্বেষের কিছু পরিচয় সু কি আগেই দিয়েছিলেন, এবার তিনি ঘৃণার মাত্রাটাও বুঝিয়ে দিলেন।

৯০ দশকেও মায়ানমার-বিরোধী রাজনীতি, ছাত্র অভ্যুত্থান এবং সশস্ত্র সংগ্রাম সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল। আন্তর্জাতিক সমর্থন আর পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ভাবমূর্তি সু কি-কে সেই সংগামের অবিসংবাদিত নেতার আসনটিতে বসিয়ে দিয়েছিল। অচিরেই আন্দোলন তার নিজস্ব বহুমাত্রিকতা হারায়, সু কি পথ ঠিক করে দিতে থাকেন। এক সময় সু কি-র বাইরে আর সকল বিরোধী শক্তিই অপস্রিয়মাণ হয়ে ওঠে। সু কি-র সমর্থকেরাও বহু নির্যাতন গ্রেফতার হত্যার শিকার হয়েছেন, কিন্তু বাকিরা আলোচনার বাইরে চলে গেছে প্রায়। অনেকেই প্রবাসী কিংবা খুন হয়েছেন অথবা বন্দি।

সু কি যে অহিংসার পথে মায়ানমারকে গণতন্ত্রের রাস্তায় আনতে চেয়েছেন, পরিণামে তা বহুগুণ বেশি রক্তপাতের বিনিময়ে মায়ানমারে সামরিকতন্ত্রকে পুষ্ট করে চলেছে, প্রলম্বিত করেছে। পরিণাম শুধু এই জীবনের ক্ষয় না, গণহত্যার অংশীদার হিশেবে ‘অহিংস সু কি’র সাথে সাথে মায়ানমারের পুরনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরও পতন, যদিও সেই আন্দোলনকে অহিংস কায়দাতেই সু কি নিজেই খতম করেছিলেন বলেই এই পরিণামটা সম্ভব হলো।

আমরা জানি না মায়ানমার আবার কখন জাগবে। তার আগ পর্যন্ত সারা দুনিয়ার বৈশ্য সম্প্রদায় সেখানে রক্তের হোলিখেলার রসদ জুগিয়ে যাবে।

৪.
মায়ানমার নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী?

সেটা সম্ভবত এই যে, মায়ানমার বিষয়ে আমাদের কোনো নীতি নেই। কার্যত অস্থায়ী ভিত্তিতে আমাদের সবচেয়ে অস্থির প্রতিবেশীটার সাথে আমরা লেনাদেনা করছি। আমাদের সকল কাজ প্রতিক্রিয়া, আমরা কখনো ক্রিয়া করি নি।

প্রতিবেশী আমরা বাছাই করতে পারব না। চাইলেই শান্তিপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবেশ আগে থেকে কেউ আমাদের বানিয়ে দেবে না। বরং অন্যভাবে, প্রতিটি দেশের ভেতরেই থাকে যেমন নিজস্ব সব বিকাশের সংগ্রাম, তেমনি থাকে প্রতিবেশীদের সাথে জটিলতা। কোনো দেশই তো বাইরের এই সংঘাতের হাত থেকে মুক্ত না, প্রত্যেকেরই তাই থাকে নিজস্ব নীতি, কিভাবে তার মুখোমুখি হবে তার কর্মকৌশল।

মায়ানমারের ঘটনাপ্রবাহ প্রথম থেকে যদি আমরা খেয়াল করি, দেখতে পাব, রোহিঙ্গাদের ঠেলে গণহত্যার মুখে ফেরত পাঠানো ছিল বাংলাদেশের অবস্থান। এই অবস্থান অমানবিক, একই সাথে অকার্যকরও। কেননা, লক্ষ লক্ষ প্রাণভয়ে ভীত মানুষকে বৈধ পথে আসতে না দিলে তারা অবৈধ পথে আসবেই। অন্তত বাংলাদেশে সেটা ঠেকাবার উপায় নেই। রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি হোক, মানুষ পাচারের বাণিজ্য হোক, তাদেরকে অবৈধ পথেই বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে সরকারের এই বাধা।

দ্বিতীয়ত আমরা দেখলাম, রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক নীতি কতখানি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। গণহত্যার তীব্রতম সময়ে বাংলাদেশ প্রস্তাব করল যৌথ অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের দমনের। বাংলাদেশ বার্তা দিল, মায়ানমার সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন অটুট আছে।

তৃতীয়ত আমরা আরও দেখলাম, চাল নিয়ে চালাচালি—রক্তের হোলি খেলা চলছে যে দেশটিতে, সেই সরকারটিকে আরও বেপরোয়া করল, উৎসাহিত করল এই হাস্যকর কাজটি।

চতুর্থত, শরণার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে দেশের ভেতরে আসবেই, অতীতের এতগুলো অভিজ্ঞতায় এটা জানার পরও আমরা বিনা নিবন্ধনেই তাদের ঢুকতে দিলাম, কিংবা নিবন্ধনের কাজ শুরু করলাম অনেক পর।

পঞ্চমত, কূটনৈতিক পর্যায়ে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার, উদ্বাস্তু সংক্রান্ত সংগঠনগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে আমরা যুক্ত করতে পারি নি। আমাদের তো প্রয়োজন ছিল এতগুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দেশে যাচ্ছেন, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন স্তরে কথা বলছেন, তাদের তথ্য দিচ্ছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন এমন একটা দৃশ্য দেখার। এখন হয়তো কাজটা হবে, কিন্তু একটা আনুষ্ঠানিক নীতি থাকলে একটা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াতে এটা চলত। শরণার্থীদের পেছনে খরচ এবং তা উসুলের একটা বাস্তবসম্মত হিশেবও সকলের সামনে হাজির থাকার কথা ছিল।

ষষ্ঠত, শরণার্থীদের জন্য ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থাপনা না করতে পারা। টানা কয়েকদিন হেঁটে বাংলাদেশে আসা মানুষগুলোর জন্য কোনো তাৎক্ষণিক খাদ্য-পানি না, না তাদের জন্য ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসা ও মহামারী রোধের ব্যবস্থা। আমাদের একটা দল সেখানে শৌচাগার নির্মাণের কাজ করছে, তারা খুবই অপ্রতুল চিকিৎসা-সেবার কথা জানিয়েছে।

সপ্তমত, রোহিঙ্গা প্রশ্নে দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িক উস্কানির বাস্তবতা, বিশেষ করে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রতি হুমকি বিষয়ে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ ও সতর্কতা গ্রহণ না করা।

কিন্তু এই সব কিছুর বাইরে আসল কথা হলো, মায়ানমারকে বার্তা দেয়া : রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন ও মর্যাদা কোনোভাবেই বিপদাপন্ন করা চলবে না, এটা বুঝিয়ে দেয়া। এই কাজটি কখনোই করা হয় নি। বরং আমরা রোহিঙ্গাদের চিত্রিত করেছি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হিশেবে, যা মায়ানমারের সামরিক জান্তার কথার থেকে একদমই ভিন্ন কিছু হয় নি।

প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানিয়েছি, বিলম্বে হলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক আশ্রয় প্রদানের জন্য। কিন্তু বলতেই হচ্ছে, এই কাজটিও করা হয়েছে একটা উপস্থিত সিদ্ধান্ত থেকেই। কোনো ধরাবাহিক নীতির প্রতিফলন এখানে নেই।


১৯৪২ সালে মগ-রোহিঙ্গা যে দাঙ্গা আরাকানে হয়েছিল, তার কারণ মুসলমানেরা গৌতম বুদ্ধকে অবমাননা করেছিলেন।


শুরু থেকে বাংলাদেশের চেষ্টাটি ছিল দায় এড়াবার। এই রকম দায়িত্বহীনতা বৈশ্বিক স্তরে আমাদের পেছনেই ঠেলে দেয়। বরং সংকটকে মোকাবেলা করার চেষ্টার মাঝেই থাকে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার, যোগ্যতর করে তুলবার সম্ভাবনা। রোহিঙ্গা সংকট কোনো তুচ্ছ ঘটনা না। এটা আরও বহু কিছুর সাথে মিলে দক্ষিণপূর্ব এশিয়াকে বদলে দেবে, অজস্র নতুন টানাপড়েন তৈরি করবে। বাংলাদেশ চাক বা না চাক, ঘটনাপ্রবাহের মাঝে আমরা ঢুকে পড়েছি।

বাংলাদেশের নদী-কৃষি-শিল্প-জ্বালানি-উপকূল-পরিবহন-ব্যাংক-শিক্ষা এমনকি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতি পর্যন্ত নানান আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ অনুযায়ীই আমরা চলি, যাকে বলে ‘যেমনে নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ’।

রোহিঙ্গা সংকটও সেই দৃশ্যপটই আমাদের সামনে আবার হাজির করেছে। আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলার যোগ্যতা অর্জন করব নাকি পরিচালিত হতে থাকব, সেটাই নির্ধারণ করবে আমাদের দেশটাকেও আমরা নিজেরা চালাব নাকি অন্যেরাই চালাতে থাকবে, সেটাও।

৫.
রোহিঙ্গা সংকটে পক্ষে বা বিপক্ষে চিন্তা করার যে সামর্থ্য আমাদের অধিকাংশ জনপ্রিয় চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গের দেখা গেল তাও উদ্বেগজনক। আমাদের লেখকেরা ভালো-মন্দ, আমরা-ওরা এই এই শাদাকালো বিভাজন থেকে সামান্যই বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। বলা উচিত, তাদের বৃহদাংশও নিতান্তই অনুভূতিপ্রবণ, চিন্তা করতেই তারা শেখেন নি। চিন্তা মানে কতগুলো তথ্য টোকানো নয়, তথ্যগুলোকে খতিয়ে দেখার ক্ষমতা। চিন্তাশীল মানুষ ভুলও করতে পারেন, সঠিকও হতে পারেন। কিন্তু চিন্তায় অক্ষমের কাজ ভুল শুদ্ধ যাই করুক, অন্ধবিশ্বাসই তার চালিকাশক্তি।

একজন সাহিত্যিক দেখলাম লিখেছেন, সংক্ষেপে এই দাঁড়ায় যে, ১৯৪২ সালে মগ-রোহিঙ্গা যে দাঙ্গা আরাকানে হয়েছিল, তার কারণ মুসলমানেরা গৌতম বুদ্ধকে অবমাননা করেছিলেন। কী অবমাননা সেটা লেখকের জানা না থাকলেও “তাদের এই অবমাননাটা ছিল মারাত্মক। নইলে তৎকালীন শান্তিবাদী বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এতটা ক্ষেপে ওঠার কথা নয়।”

চিন্তার যে পদ্ধতিটির সাথে এইখানে আমরা পরিচিত হলাম, সেটার মাঝে আছে একটা এসেনসিয়ালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি, যেহেতু বৌদ্ধ, সেহেতু শান্তিবাদী। এসেনশিয়ালিস্ট এর বাংলা জানি না, কিন্তু করা সম্ভব। ব্যাখ্যা করার দরকার নাই, উদাহরণেই সহজে বোঝা যাবে : সে যেহেতু নারী, সেহেতু সে আবেগপ্রবণ। ও অমুক জেলার বাসিন্দা, অতএব সে কিপ্টা। আগে বলবা না, অমুক খানের লোক, জিলাপির প্যাঁচ। হুম, ইহুদি, বুঝতেই পারতেছ ধুরন্ধর। মুসলমান মানে জঙ্গি, সুফি মানে সমন্বয়বাদী এইসবও এসেনশিয়ালিস্ট চিন্তার উদাহরণ। কৃষ্ণাঙ্গ তো গানবাদ্যে ভালো; অভিজাত, কাজেই সংস্কৃতিপরায়ণ—এমনি আরও উদাহরণ মিলবে। কাজেই মোটাদাগে এগুলো কখনো কখনো চলে, তবে কোনো বৈশিষ্ট্যকে কোনো জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য হিশেবে ধরে নেয়ার আগে তাই শতবার ভেবে নেয়া উচিত, প্রতিবার সতর্কও থাকা উচিত।

বস্তুত শান্তি এবং সংঘাত দুনিয়ার সকল জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য, উভয়গুণ না থাকলে কোনো জাতি কি টিকে থাকতে পারত? বৌদ্ধ ধর্মের ছায়াতলে থেকেই আরাকানি রাখাইন জনগোষ্ঠী উদ্ভূত জলদস্যুরা বাংলায় বিপুল দাসব্যবসা চালিয়ে অজস্র জনপদকে জনশূন্য করেছে, বাংলার ইতিহাসে তারা মগ হিশেবে পরিচিত। খুব সম্ভাবনা আছে যে, এই জলদস্যুতার পরিণামেই ধরে নিয়ে যাওয়া দাসদের সূত্রে রোসাঙ্গ বা আরাকানে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব ঘটে। এভাবে, বৌদ্ধধর্মাবলম্বী সম্রাট অশোক তার অতুল কীর্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রের আয়ত্তের বাইরে থাকা অরণ্যচারী জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে দমিয়ে রাখতে অনেকগুলো নিষ্ঠুর শাসন জারি করেছিলেন। একইভাবে পাদ্রি লঙকে যেমন আপনি পাবেন নীলকরদের বিরুদ্ধে কথা বলতে, তেমনি পাবেন অজস্র পাদ্রীকে, যারা যিশুর বাণীকে আধিপত্যের হাতিয়ার হিশেবেই ব্যবহার করতে চেয়েছেন।

অহিংসা পরম ধর্ম এই মহান বাণীর জন্ম ভারতবর্ষে সম্ভব হয়েছিল, কারণ প্রভূত রক্তপাতই এমন বাণীর চাহিদা সৃষ্টি করে। ঘটনার সাথে মানুষের সংঘাতেই চিন্তার এই বিদ্যুচ্চমকের জন্ম হয়। সুফিবাদ কিংবা আর যত ধাপ মানুষ অতিক্রম করেছে চিন্তার নির্মাণের, তাদের সকলেরই বৈচিত্র্যময় ও স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে। শুধু তাই না, সেই ইতিহাস স্থির-নির্ধারিতও না। ঘটনার টানাপড়েনই তার বিকাশ বিনাশ কিংবা বিবর্তনও ঘটে।

এই রকম চিন্তার নমুনা দেখেছিলাম কিছুদিন আগে এক পত্রিকার আলোচনায় উপস্থিত আরেক কথাসাহিত্যিকের ‘বিপন্ন বিস্ময়ে’, একটু কমিয়েই লিখছি এখানে, তিনি বলছিলেন : চিন্তা করেন, সেক্যুলার না, হিজাবপরা মেয়ে, আবার প্রেম করছে! এই বিস্ময়ের মাঝেও ওই একই এসেনশিয়ালিস্ট ভ্রান্তির প্রকাশ, হিজাব ধরেছিস, তাহলে তাকে তো এই সবই ত্যাগ করতেই হবে, তুই না করলেও আমাদের হিশেব আর চিন্তার ছক মেলাবার জন্য তোকে তা করিয়ে ছাড়ব।

ভুল এই পদ্ধতির শিকার হলে আপনি রোহিঙ্গাকে এমন একটা কিছু বানায়ে দিতে পারবেন, যার সাথে প্রতিবেশীর থাকা অসম্ভব। আমরা কি ভুলে যাব, ১৯২০-১৯৫০ দশক পর্যন্ত বাঙালি হিন্দু আর মুসলমান পরস্পরের বিরুদ্ধে এত ভয়াবহ সব দাঙ্গা করেছে, মসজিদের সামনে বাদ্য বাজানো আর গরু কোরবানির মতো তুচ্ছ ঘটনায়? সেই আমরা আরেক দলকে বলছি সালাফি, উগ্র, তা না হলে কেন তাদেরকে খুন করতেছে শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ?


রোহিঙ্গারা নিজের বাড়িতে আগুন জ্বেলে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু সেজেছে।


জাতিগত রেষারেষি প্রতিবেশীর মাঝে ইতিহাসে নতুন না। ১৯৪২ সালের মহাদাঙ্গাতে সেই রেষারেষির সাথে যুক্ত ছিল ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় নীতি, তারা জাপানিদের প্রতিরোধের জন্য এই ঘটনার সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু সেই দাঙ্গা কিংবা পরবর্তী আরও বহু ঘটনার পরও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, কোনো এক পক্ষকে অশুভ বা ক্ষতিকর হিশেবে দেখানোর কিংবা আরেক পক্ষকে চিরকালের শান্তিবাদী হিশেবে চিন্তাপদ্ধতির যে গোড়ায় গলতিটা আছে, তা শান্তিটাকে আসতে দেবে না কখনো। পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তটা দিয়েই তখনি বিচার করা হবে, রোহিঙ্গা নিশ্চয়ই কিছু করছিল আগে…

বরং যা দেখতে হবে, সেটা হচ্ছে ক্ষমতা কিভাবে রোহিঙ্গা-আরাকানি রেষারেষিকে তীব্র করে, জিইয়ে রাখে এবং তার নিজের স্বার্থটা হাসিল করে। দেখতে হবে কে কোন স্বার্থে গণমাধ্যমকে যেতে দিচ্ছে না, জাতিসংঘকে পরিদর্শন করতে দিচ্ছে না। এবং ক্ষমতার এই পরিচয়েও বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম না খুঁজে কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখার জন্য যেভাবে তারা ধর্মীয় পরিচয়গুলোকে ব্যবহার করছে, তার রূপটা বুঝতে হবে।

আর সবশেষে, আর যে কোনো বোঝার আগে কিংবা পরে, মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। যে গণহত্যার শিকার হচ্ছে, তাকে রক্ষা করাটাই প্রধান বা একমাত্র কাজ করতে হবে। গণহত্যার পক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করতে না পারলেও অনেকেই তাই ইনিয়ে বিনিয়ে শিকারকেই দোষী সাব্যস্ত করার কাজটা করে চলছেন।

একইভাবে জনপ্রিয় প্রবাসী একজন ব্লগার দাবি করেছেন রোহিঙ্গারা নিজের বাড়িতে আগুন জ্বেলে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু সেজেছে।

এই দাবিটা মায়ানমার সেনাবাহিনীও করছে। তারা গণমাধ্যমকে ডেকে জানিয়েছে রোহিঙ্গারাই নিজের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছে। বিবিসি অবশ্য অকুস্থলে গিয়ে তাজা আগুন দেখতে পেয়েছে—মানুষকে ভিটে-ছাড়া করা দশ সেপ্টেম্বর তারিখেও চলছে।

মায়ানমার সামরিক জান্তা আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী ব্লগারের বক্তব্য মোটামুটি একই। যদিও বিবিসির অনেকগুলো প্রতিবেদনে দেখা গেল, কিভাবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।

তথ্য কিংবা সত্য তৈরি করার এই একটা অদ্ভুত খেলা। আলাদা আলাদা করে আপনি হয়তো এদের সবগুলো তথ্যকে ভুল প্রমাণ করতে পারবেন। কিন্তু উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্বেষও ঠিকই তৈরি করতে সফল হবে এই প্রচারণাকারীরা। একেই বলে সম্মতি উৎপাদন।

যেমন, আরাকানিরা সবাই যে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন চায়, তাদের হত্যা বা খুন কিংবা ধর্ষণের শিকার হওয়াতে তারা আনন্দিত, তাদেরকে তারা প্রতিবেশী হিশেবে চায় না, মানুষ মনে করে না, এই ধারণাটা আমাদের মাঝে তৈরি করছে কে?

করছে মায়ানমারের সেনাবাহিনী।

বিশ বছর আগেও যা ছিল মায়ানমার আধিপত্য বিরোধী আরাকানের স্বাধীনতা আন্দোলন, আজকে তা রোহিঙ্গাবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। এই যে একটা ঘৃণা ও সংঘাত ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা আছে, তাতে তারা অনেকদূর সফল হতে পারে। কিন্তু তাদের এই লক্ষ্য যে পুরোপুরি হাসিল হয়েছে, তাও বলা সম্ভব না। কারণ এটাও একই রকম অবিশ্বাস্য যে, যতই বিদ্বেষ ছড়ানো থাকুক, আরাকানের সকল মানুষ, মায়ানমারের সকল মানুষ রোহিঙ্গার রক্ত চায়, এটা বিশ্বাসের অতীত। সু কি আত্মসমর্পণ করতে পারেন, সকল মানুষ তাই করেছে, এটা মানব ইতিহাসে কখনো হয় নি। কখনো ঘটে নি।

তাহলে অন্য মতগুলো কোথায়?

অন্যদের আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সেটা শুধু চাপা পড়ছে না, নিজেকেও চাপিয়ে রাখছে। কারণ দেশটা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে। তার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে। ফলে কেবল তৈরি করা মতটাই দেখানো সম্ভব হচ্ছে। আর শক্তিশালী বিদ্বেষটাই তো নিজেকে দেখিয়েই যাচ্ছে।

জাতিতে জাতিতে দ্বন্দ্বসংঘাত থাকে, এটা তো আমরা বাংলাদেশেও দেখি, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রতি যে বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো হয়, তা মোটামুটি বিশ্বজনীন একটা পদ্ধতি। যুক্তরাষ্ট্রে আদিবাসীদের জমি জবরদখলের জন্য তাদের বিরুদ্ধে একই রকম কুৎসিত প্রচারণা, তাদেরকে রক্তলোলুপ হিংস্র যুদ্ধোন্মাদ হিশেবে প্রচার করার রাজনীতি চলেছে।

বাংলাদেশের পাহাড়ে যারা জাতিসত্তার অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছেন, তাদের অনেককেও আমরা দেখতে পাচ্ছি নিপীড়িত রোহিঙ্গার জন্য সমবেদনা জানাচ্ছেন। যদিও আতঙ্ক, জমির ওপর দখলদারিত্ব এবং দুশ্চিন্তাও অনেককে আচ্ছন্ন করেছে। উভয় প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক। প্রথমটার মাঝে আছে দখলদারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে নিপীড়ক-নিপীড়িতের সংগ্রামের একটা বিশ্বজনীন উপলদ্ধি, দ্বিতীয়টির মাঝে আছে সহজাত আত্মরক্ষার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই দ্বিতীয় দলভুক্ত সকলেই, এমনকি অধিকাংশও যে রোহিঙ্গার ওপর নিপীড়ন কামনা করেন, তা কিন্তু না।

কিন্তু একটু বিবেচক সকলেই উপলদ্ধি করছেন মায়ানমার সামরিক জান্তার সকল প্রচারই মিথ্যা। এই মানুষগুলো নাগরিক অধিকারহীন দশায় এমনকি বাংলাদেশের আদিবাসীদের চেয়েও বেশি নিপীড়িত জীবন যাপন করছেন।

এই জন্যই কিন্তু সামরিক দখলদারিত্বের চেয়ে গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে ভালো। এই রকম একটা বর্বর গণহত্যা চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ত ন্যূনতম মত প্রকাশের একটা স্বাধীনতা মায়ানমারে থাকলে।

মায়ানমারের গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে সামরিক বাহিনীর এত প্রকাশ্য ও শক্তিশালী ভূমিকার কারণ এটাই।

কিন্তু যে চিন্তাহীনতার সংস্কৃতি গণমানুষের মাঝে কখনো কখনো উগ্র বৌদ্ধবিরোধী মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে এটা না ভেবেই যে, তাদের কাজটিও মায়ানমারের জান্তার কাজের হুবহু প্রতিক্রিয়া, সংস্কৃতিবান মহলেও চিন্তাহীনতার কারণেই জন্ম নিচ্ছে রোহিঙ্গার প্রতি তাচ্ছিল্য, ভীতি আর সন্দেহ।

৬.
আর একটা বিষয়েই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, সেটা হলো রোহিঙ্গা কি বাঙালি না বাঙালি না, তাকে কি মুসলিম হিশেবে চিহ্নিত করা হবে, নাকি আর কেউ, এ নিয়ে বিপুল দ্বিধা কাজ করছে। রোহিঙ্গাকে বাঙালি বলাটা বিপজ্জনক অনেকের মতে, কেননা তাতে বাংলাদেশের ঘাড়ে হয়তো রোহিঙ্গা এসে পড়বে। রোহিঙ্গাকে তাই আলাদা জনগোষ্ঠী হিশেবে পৃথক করাটা এই চিন্তায় জরুরি। এমনকি রোহিঙ্গাও নিজেকে বাঙালি বলে না, কেননা তাতে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হয় তার জন্য, মায়ানমারের নাগরিকত্বের স্বীকৃতির অধিকারটা পাওয়ার।


আধিকার ক্ষুণ্ন করে মায়ানমার রাষ্ট্র হিশেবে তার নিজের নৈতিক বৈধতাকে দুর্বল, এমনকি বিপন্ন করছে, এই ঘোষণাই আমাদের দিতে হবে।


উপসর্গগুলো নিয়েই আগে বলা যাক। রোহিঙ্গা যদি বাঙালি হয়, তাতেই-বা কেন সে বাংলাদেশের ওপর পড়বেই? মায়ানমারে তো এমন বহু জাতি আছে, যাদের বাস একাধিক দেশে—যেমন বাংলাদেশের নাগরিক বহু জাতি আছেন, যাদের বাস প্রতিবেশী দেশগুলোতেও আছে। জাতিপরিচয় তো নাগরিকত্বের মাপকাঠি হতে পারে না কোনোক্রমেই।

আলাওল রোসাঙ্গ বা আরাকানে বসে বাংলা কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু তার জন্ম ফরিদপুরে, সতের শতকে মগ জলদস্যুরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আরাকানে। এই সূত্রেই তো জানা যায়, নিছক জলদস্যুতার সূত্রে বহু মানুষকে আরাকানে যেতে হয়েছিল। তখনকার পর্যটকরা, পর্তুগিজ পাদ্রিরা অনেক উল্লেখ করেছেন বাংলা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া দাসদের ইউরোপে বিক্রি হবার কথা, আরাকানেও বিক্রি হবার কথা। উনিশ শতকেও মনিপুর লণ্ডভণ্ড করার সময়ে মায়ানমার রাজা বিপুল পরিমাণ মুসলমান কারিগরকে (পাঙ্গাল—প্রধানত বস্ত্র কারিগর, বাংলা থেকে অভিবাসী হয়েছিলেন মনিপুরে) বন্দি করে নিয়ে যান মায়ানমারে, আরাকানও ইতোমধ্যেই মায়ানমারের দখলে চলে গিয়েছিল। কৃষিকাজেও এই মানুষদের চাহিদা মায়ানমারে ছিল, তুলনামূলকভাবে অগ্রসর কৃষিপ্রধান অঞ্চল থেকে আসার কারণে। এর বাইরেও বিপুল পরিমাণ মানুষ সেখানে গিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র বলে। ব্রিটিশ আমলে তারা গিয়েছেন কৃষক হিশেবে। ব্যবসায়ী হিশেবে। বহু সূত্রেই তারা আরাকানের বাসিন্দা হয়েছেন, কখনো নিরুৎসাহিত করার সংবাদ আমরা পাই না।

এই যাওয়া ঘটেছে আসামে। এই যাওয়া ঘটেছে বিহারে, উড়িষ্যায়। নানান কারণেই বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এই গোটা অঞ্চলে। তার প্রভাব সর্বদা ভালো হয়েছে তা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ভাষার সাথে চট্টগ্রামের ভাষার, চাকমা জাতির ভাষার সাদৃশ্য বলে দেয় রোহিঙ্গারা এই বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ।

এই সাংস্কৃতিক ঐক্যের সূত্র ধরেই তাদের সাহায্য দেয়ার দাবি করি না। দাবি করি সে আমাদের নিকটতম বিপন্ন প্রতিবেশী বলে, এই সাহায্য তার ন্যায্য পাওনা।

কিন্তু রোহিঙ্গা কবে আরাকানে গিয়েছে, সেটা নিছকই ফালতু প্রশ্ন। যেমন ফালতু প্রশ্ন আদিবাসীরা বাঙালির আগে এসেছে কি না। একটা জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটা অঞ্চলের কৃষি-শিল্প-প্রতিবেশ-অর্থনীতি নির্মাণ করেছেন, এটাই সেখানকার আদিবাসী হবার জন্য যথেষ্ট ন্যায্য দাবি। এই সূত্রেই সাঁওতাল-মার্মা-চাকমা-মান্দি বাংলাদেশের আদিবাসী। এই সূত্রেই রোহিঙ্গা রাজনৈতিকভাবে মায়নামার ভূখণ্ডের বাসিন্দা। এবং এই আধিকার ক্ষুণ্ন করে মায়ানমার রাষ্ট্র হিশেবে তার নিজের নৈতিক বৈধতাকে দুর্বল, এমনকি বিপন্ন করছে, এই ঘোষণাই আমাদের দিতে হবে।

ফিরোজ আহমেদ

জন্ম ১৯৭৫, ২৮ ফেব্রুয়ারি; মাতুলালয়, বামনা, বরগুনা।

আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন কিছুদিন। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন। সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।

ই-মেইল : subarnadin@gmail.com

Latest posts by ফিরোজ আহমেদ (see all)