হোম গদ্য সহি ইসলাম, ভ্রান্ত ইসলাম, আইএস ও আদুনিস

সহি ইসলাম, ভ্রান্ত ইসলাম, আইএস ও আদুনিস

সহি ইসলাম, ভ্রান্ত ইসলাম, আইএস ও আদুনিস
2.43K
0

ইসলামি উগ্রপন্থা এমন এক জিনিস যার নাটাই শেষ পর্যন্ত থাকে পশ্চিমের হাতে


সাম্প্রতিক বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ইসলামি উগ্রপন্থা, বিশেষত আইএস। বলতে গেলে আলকায়েদার অবলুপ্তির পর আইএস-ই এখন ইসলামি উগ্রবাদীদের শামিয়ানা। সাম্প্রতিক সময়ে লেখা ‘ভায়োলেন্স অ্যান্ড ইসলাম’ নামক বইয়ে সিরিয়ার স্বেচ্ছানির্বাসিত কবি আলী আহমেদ, যিনি আদুনিস নামে বিশ্বখ্যাত, তিনি বলছেন—আইএস উগ্রপন্থি ইসলামের পরিসমাপ্তির প্রতিনিধিত্ব করছে। আদুনিস আমার প্রিয় কবি। তিনি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিন্তকও বটে। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য চটকদার হলেও ধোপে টেকে না। কারণ, যতদিন মধ্যপ্রাচ্যে তেল আছে, যতদিন সেখানে পশ্চিমা স্বার্থ রয়েছে ততদিন কোনো না কোনো ফর্মে এক্সট্রিমিস্টদের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাবে পশ্চিমা দুনিয়া। ইসলামি উগ্রপন্থা এমন এক জিনিস যার নাটাই শেষ পর্যন্ত থাকে পশ্চিমের হাতে। ব্যাপারখানা ‘সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো’র মতো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন মুসলিমরা উগ্রপন্থায় জড়াচ্ছে? জড়াচ্ছে তো জড়াচ্ছে, কিন্তু কেন ধর্মীয় ব্যাখ্যাসহ তত্ত্ব হিসেবে হাজির করে ধর্মকে সন্ত্রাসী মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে? কেন? এমন প্রশ্নের একটি ঐতিহাসিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। আর সেটি করব আদুনিসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

মূল বিষয়ে ঢোকার আগে, সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমের দিকে চটজলদি একটু নজর ঘুরিয়ে আসতে চাই। ইসলামিক স্টেট, সংক্ষেপে আইএস, যার জন্ম ইরাক-সিরিয়ার ঊষর প্রান্তরে, ইরাক-আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে, আজ তারা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে। তাদের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফ্রান্স থেকে, জার্মানি থেকে, ব্রিটেন-অামেরিকা থেকে, বেলজিয়াম থেকে, এমনকি ভারত-বাংলাদেশ থেকেও মুসলিম যুবকরা জড়ো হয়েছিল ইরাক ও তথাকথিত সিরিয়ার মুক্তাঞ্চলে, প্রতিষ্ঠা করেছিল বিশাল ভূখণ্ডে তথাকথিত খেলাফত, সেখানকার তেলকূপগুলোর দখল নিয়ে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ তেল বিক্রি করে ভরে ফেলেছিল তথাকথিত বায়তুল মাল। সেই অর্থে সংগ্রহ হয়েছে অস্ত্র, হত্যা করা হয়েছে বিদেশি পর্যটক, গায়ক-বাদক, কবি, ভিন্ন মতাবলম্বী, এমনকি স্বগোত্রীয়কেও। আজ সবার জানা, আইএসকে শুরু থেকেই সহায়তা দিয়েছে সৌদি আরব, আর তারা এটা করেছে মার্কিন আগ্রাসন-পরবর্তী ইরাকে অব্যাহত ইরানের প্রভাবকে খর্ব করতে। ইরাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শিয়া মতাবলম্বী হলেও সাদ্দাম আমল, এমনকি তারও আগে ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল সুন্নিরা। সাদ্দামবিহীন ইরাকে শিয়াদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব মানতে চায় নি সৌদি আরব। তাই তারা তৈরি করেছে আইএস। যাতে প্রত্যক্ষ মদদ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। হিলারি ক্লিনটনের স্বীকারোক্তিও আছে এই ব্যাপারে। আইএস-কে মার্কিনিরা ব্যবহার করতে চেয়েছিল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদকে উৎখাতের হাতিয়ার হিশেবেও। পরে সেই আইএস আর কারো বাগে থাকে নি। তাদের দমাতে নতুন করে অভিযান শুরু করতে হয়েছে মার্কিন-ইরাকি যৌথবাহিনীকে। ওদিকে আসাদের স্বার্থ রক্ষা করতে আইএস অবস্থানে চলছে রুশ বিমান হামলা। এই অবস্থায় কোনঠাসা আইএসের বিদেশি রিক্রুটরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে শুরু করেছে মতাদর্শিক লড়াই, যাকে তারা জিহাদ দাবি করছে। কিন্তু নিরীহ মানুষকে টার্গেট করে তাদের ওপর মুহুর্মুহু প্রাণঘাতী হামলায় ক্ষুদ্ধ, বীতশ্রদ্ধ ও বিব্রত সাধারণ মুসলিমরা। আজকের এই উগ্রপন্থার জন্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী আরব মুসলিম সমাজের প্রজ্ঞা ও মনীষাহীনতাও। এমনটাই মনে করেন আদুনিস।


দেড়শ কোটি মুসলিম, কিন্তু একজনও স্কলার নেই, যা আছে তা কেবল-ই ধর্মগুরু আর ধর্মভীরু মানুষ


২০১৬ সালে কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় তিনি একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘Towards a New Religious Discourse’।  প্রায় বিশ বছর পর এটাই প্রথম মিশর সফর আদুনিসের। সেই আদুনিস, যিনি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ হিশেবে পরিচয় দেন। ধর্মের গন্ধ মুছে ফেলতে যিনি পৈতৃক নাম কতল করে গ্রিক সৌন্দর্যের দেবীর নামে নাম নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, আজকের এই মুসলিম উগ্রবাদ একদিনের সৃষ্টি নয়। আবর সংস্কৃতিতে সর্বদাই একটি উগ্রপন্থা ধারা ছিল, যার সর্বসাম্প্রতিক রূপ আইসিস (আইএস) ও জাভাত আল-নুসরা। আদুনিস আক্ষেপ করে বলছেন, ইসলামের গোড়াপত্তনের ১৪ শতাব্দী পরেও ধর্মীয় গুরু আর ধর্মীয় স্কলারের বিভাজন টানা সম্ভব হয় নি। তিনি বলেন—‘বিশ্বে প্রায় দেড়শ কোটি মুসলিম, কিন্তু একজনও স্কলার নেই, যা আছে তা কেবল-ই ধর্মগুরু আর ধর্মভিরু মানুষ।’

ধর্মগুরুরা যা ব্যাখ্যা দেন তাতেই সায় দেয় মুসলমানরা, ধর্ম রক্ষার নামে অনেকেই সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী পদক্ষেপকে সমর্থন দেন। এতে করে মুসলিম সম্প্রদায়ে বেড়েছে বিভাজন, ভুলুণ্ঠিত হয়েছে শান্তির বাণী। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে প্রয়োজন চিন্তাধারার পরিবর্তন। আর তাতে সহায়ক হতে পারে সাহিত্য ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা। আরবি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আবু নাওয়াস, যিনি নতুন ভাষাচিন্তার মাধ্যমে আজকের মেট্রোপলিটন সোসাইটিকে ভালোভাবে তুলে ধরেছেন, অথবা আবু তামাম কিংবা আল মারি যিনি ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী ধারণ করেছিলেন ইসলামের উন্মেষকালে। বড় প্রশ্ন হচ্ছে তারা সেসময়ে যা পেরেছিলেন, তা এখন কেন সম্ভব হচ্ছে না? এর উত্তরের আভাসও দিয়েছেন আদুনিস। আরবি কবিতা বিভিন্ন সময়ে পরিণত হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইরত জনগোষ্ঠীকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা কোনো না কোনোভাবে সমর্পিত হয়েছেন ধর্মের আবহে, এমনকি স্বাধিকারের যুদ্ধও চলছে ধর্মের নামে। ফিলিস্তিনি গেরিলা দল হামাসের সবসময়েই একজন সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ছিলেন। অথচ স্বাধিকার সবসময়েই একটি রাজনৈতিক ইস্যু। কিন্তু এ কথাও স্বীকার করতে হয়, আরব-ইসরায়েল ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ধর্মীয় কারণে। হাজার বছর পেরিয়ে গেছে, রাষ্ট্রচিন্তা ও কাঠামো বদলে গেছে, কিন্তু মুসলমানদের অনেকেই সেই ধর্মীয় দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যাকে আঁকড়ে আছেন। তাই আজ আমরা দেখি মধ্যপ্রাচ্যে জিহাদি সাহিত্য নামে একটি ধারা তৈরি হয়েছে। যেখানে তুলে ধরা হচ্ছে নানা বঞ্চনার কথা, দেয়া হচ্ছে প্রতিরোধের মন্ত্রণা। কিন্তু সমস্যা হলো—বিষয়টি ইন্টেলেকচুয়ালদের মাধ্যমে না হয়ে, হচ্ছে ধর্মগুরুদের মাধ্যমে। ফলে যখন তারা বিধর্মীদের হত্যায় উৎসাহিত করে পঙ্‌ক্তি রচনা করে এবং তাকে পবিত্র যুদ্ধ বলে আখ্যা দেয় তখন কবিতা ও রাজনীতি দুটোই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেখানে থাকে না নান্দনিকতা, মানবতাবোধ কিংবা চিন্তাশীলতা; কবিতার নামে ছড়িয়ে দেয়া হয় উগ্র উন্মাদনা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধর্ম, সাহিত্য ও রাজনীতি। আক্রোশ ও প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিণত হয় অন্যের ক্রীড়নকে। ওসামা বিন লাদেনের কবিতা নিয়ে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আদুনিসকে। তারা সাফ কথা—‘এগুলো কবিতা নয়। এগুলোকে কবিতা হিশেবে বিবেচনা করা ঠিক না—অবশ্যই না। কারণ, কবিতা তো একটা সামাজিক প্রপঞ্চ। সংস্কৃতি যখন প্রতিদিনের জীবনের অংশ, তখন প্রত্যেকেই কবি এবং প্রত্যেকেই ঔপন্যাসিক। হাজারো ঔপন্যাসিক আছে এখন। কিন্তু এর মধ্যে আপনি যদি পড়ার মতো পাঁচ জনকে পান তাহলে আপনি ভালো অবস্থায় আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার উপন্যাস আছে, কিন্তু পড়ার মতো উপন্যাস পাবেন মাত্র পাঁচ-ছয়টা, এর বাইরে আর যা আছে সব আবর্জনা। আরবদেরও একই অবস্থা। সব আরবই কবি, কিন্তু তাদের ৯৫ শতাংশই ছাইপাঁশ।’


সহি ইসলাম ও ভ্রান্ত বলে কিছু নাই। ইসলাম একটাই।


বলা হয়, একটা উদারনৈতিক সমাজে সব পক্ষের কণ্ঠস্বর থাকা জরুরি; যেখানে ভিন্ন মতের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, থাকবে পরমত সহিষ্ণুতা। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ধারণাকে অপ্রতুল বলছেন আদুনিস। তিনি বলছেন—‘আজকের বাস্তবতায় আর পরমত-সহিষ্ণুতায় চলবে না, প্রয়োজন সমতা। পরমত-সহিষ্ণুতা মানব-সভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবে আজ আমাদের প্রয়োজন সমতা। পরমত-সহিষ্ণুতা একটা উঁচু-নিচু শ্রেণিক্রম নির্দেশ করে। একজন—যিনি সহ্য করেন, অন্যজন—যিনি সহিষ্ণুতা লাভ করেন। কিন্তু এখন আমাদের অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশিমাত্রায় সমতা প্রয়োজন। চিরন্তন বা অন্ধ সত্যবোধের জায়গা থেকে নয়, বরং সমতার জায়গা থেকে কথা বলা প্রয়োজন।’

আদুনিসের এই বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আমরা দেখছি, আজকের বিশ্বে যা ঘটছে তা নিজের মতকে অ্যাবস্যুলুট বা ধ্রুব ধরে নেয়ার কারণেই ঘটছে। নিজেকে সহি ও অন্যকে ভুল প্রমাণের জন্য ঘটছে। আইএস বলছে—তারাই ইসলামের সহি পথে আছে। তারা অন্যায় ও ভিনজাতীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিপক্ষে পবিত্রযুদ্ধে লিপ্ত। অন্যদিকে, গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রসন চালানো পশ্চিমা শক্তি বলছে, তারাই সঠিক। অথচ তারা ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে উস্কে দিয়েছে ইসলামি চরমপন্থাকে, যার সবশেষ বিষফোঁড়া ইসলামিক এস্টেট—আইএস। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও মার্কিন সমর্থনপুষ্ট পাপেট সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে যে আইএস-এর উত্থান, সেই যোদ্ধারা খুব শিগগির রূপান্তরিত হয় স্বৈরাচারী খুনি গোষ্ঠিতে। তবু তারা বলতে চাইছে—তারাই ইসলাম বোঝে, তাদের ওহাবি মতবাদই ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা, যেখানে জিহাদের নামে যে কোনো বিধর্মীকে হত্যা বৈধ। তারা মানব-সভ্যতার স্মারক প্রাচীন মেসোপটেমীয় শহর নিমরুদের ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো ধ্বংস করছে, মূল্যবান সামগ্রী লুটপাট করেছে, ধসিয়ে দিয়েছে সব। এরপর তারা হানা দিয়েছে সিরিয়ায় পালমিরায়। সেখানে দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্মিত ত্রিমাত্রিক রোমান স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করেছে তারা। লুট করেছে মসুল জাদুঘর, নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে কালের সাক্ষী অনেক প্রত্ননির্দেশন। সুন্নি-মতাবলম্বী আইএস এখন শুধু শিয়া-মতাবলম্বীদের ওপরই খড়্‌গহস্ত নয়, তারা ওহাবি ছাড়া অন্য যে কোনো মাজহাবের লোকদেরও নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আর তারা এটা করছে তাদের মতাদর্শকে চিরন্তন সত্য ভেবে। আদুনিস বলতে চান, নিজের মত ও পথকে সত্য ও শ্রেষ্ঠ দাবির মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় ধর্মীয় আভিজাত্যবোধ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ; যা নিজেকে অন্যের থেকে আলাদা করে, উন্নততর দর্শনের দাবি করে, শেষ পর্যন্ত কখনো কখনো তা অন্য ধর্ম, মতামত ও চিন্তাস্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, এমনকি দমন-পীড়ন, যুদ্ধ, সন্ত্রাস চাপিয়ে দেয়। যেখানে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় যে কোনো পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়া হয়।

বিশ্বের বেশির ভাগ মুসলিমই দাবি করেন, আইএস যা করছে তা প্রকৃত ইসলাম নয়। এরা ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে না। প্রকৃত ইসলাম শান্তির ধর্ম, জিহাদের নামে নিরীহ মানুষ হত্যা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। আইএস ভুল বার্তা দিয়ে মুসলিমদের গুমরাহ করছে। প্রকৃত ইসলামের চর্চা হলে আইএস-কে মোকাবেলা সম্ভব। আদুনিস এই ‘সহি ইসলাম’ ও ‘ভ্রান্ত ইসলাম’ কনসেপ্টকে খারিজ করে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, ‘সহি ইসলাম ও ভ্রান্ত বলে কিছু নাই। ইসলাম একটাই। তাই উদারনৈতিক ইসলাম আর কট্টর ইসলামের বিভাজন সম্পূর্ণ ভুল এবং ক্ষতিকর।’

আদুনিসের অভিমত—পরিপূর্ণ কুরআন নয়, ইসলাম এখন এসে ঠেকেছে মাত্র দেড়শর মতো আয়াতে, যেখানে  শরিয়া আইন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং যৌন বিধিবিধান রয়েছে। অথচ কুরআনেই জোর দেয়া আছে ক্রিটিক্যালি চিন্তা করার, শব্দের ভেতরে নিহিত অর্থকে অুনধাবনের ওপর।


যদি মানবতা একটা সমাপ্তিতে পৌঁছায় তাহলে তো বিশ্বেরই ইতি ঘটে


বর্তমান আরববিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের সন্ত্রাস মোকাবেলায় কোনো দূরদৃষ্টি নেই বলেই মনে করেন আদুনিস। তার ওপর হাত ধুয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে বাজাবাজি তাদের দেউলিয়া করে দিয়েছে। তাদের জীবনধারা ও কর্মকাণ্ড দেখে সাধারণ মানুষ ইসলামের কোনো চিত্রই পায় না। এর ফায়দা নেয় উগ্রপন্থিরা। তারা খণ্ডিত ইসলাম ও এজেন্ডাভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিপথে নিচ্ছে।  আদুনিস বলছেন—‘আইসিস বা জাভাত আল-নুসরা তো আকাশ থেকে পড়েনি, তারা দীর্ঘ উগ্র ইসলামিক ইতিহাসের এক্সটেনশন ও ফলাফল। প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সহিংসতা ও অন্যকে বাদ দিয়ে, চৌদ্দ শতাব্দী পরেও সেই আরব–আবর যুদ্ধ আজও থামে নি, চলমান সন্ত্রাসবাদ সেই সুদ্ধের সহিংসতার ধারাবাহিকতার অংশও। আমরা ক্রিটিক্যালি ভাবতে পারি না, আমরা মনে করি আরবের মানুষ সবসময়ে সঠিক।’

আদুনিসের ব্যাখ্যা—ইসলাম কোনো রাষ্ট্রীয় বিষয় নয়। নবী মোহম্মদও কখনো ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে বলেন নি, তিনি এই বিষয়টি তাঁর অনুসারীদের সিদ্ধান্তের ওপরেই ছেড়ে গিয়েছিলেন। ইসলামকে রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে আনা মানেই আধ্যাত্মিকতাকে জেলখোনায় পুরে ফেলার চেষ্টা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কিংবা কিভাবে চিন্তার নবরূপান্তর ঘটানো যায় সে ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নেই আদুনিসের। তবে উগ্রবাদ ঠেকাতে হলে আরব দেশগুলোতে প্রকৃত গণতন্ত্র নিশ্চিতের ওপর জোর দেন আদুনিস। বলেন, ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও ধর্মীয় সব ক্ষেত্রেই সেন্সরশিপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর কে না জানে, যেখানেই লুকাছাপা, ফিসফিস—সেখানেই অপব্যাখ্যা, ভুল বোঝাবুঝি, ষড়যন্ত্র।

শেষ পর্যন্ত আদুনিস ভরসা রাখতে চান মানুষের ওপর। ২০১৬ সালে প্যারিসের শঁজেলিজের একটি ক্যাফেতে বসে জোনাথন গায়েরকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন—‘আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। তা কিভাবে? যদি মানুষ, যদি মানবতা একটা সমাপ্তিতে পৌঁছায় তাহলে তো বিশ্বেরই ইতি ঘটে। যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে ব্যক্তিরা আছেন—আমি এখন যা বলছি তা হচ্ছে আমি একা নই। মিসর এবং অন্যান্য দেশে অনেক ব্যক্তিই আছেন। তারা আমি যা বলছি তা বলছেন। এই কারণেই আমাদের আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে মানুষ আরো ভালো কোনো সমাধান পাওয়ার মতো একটা অবস্থায় পৌঁছবে। কিন্তু কখন ও কিভাবে হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে যতদিন পর্যন্ত আরবরা এই পুরনো, জিহাদি, ধর্মীয় ভিত্তিতে চিন্তা ও কাজ করবে ততদিন তারা সামনে এগুতে পারবে না। এটা সম্ভব নয়। এটা তো এমন কিছু যা লুপ্ত হয়ে গেছে, যা নিঃশেষ হয়ে গেছে। আইএসআইএস হচ্ছে সর্বশেষ হুঙ্কার। নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠা মোমবাতির মতো।

পুনর্জাগরণ ঘটতে সময় লাগে।… ’


সংশ্লিষ্ট পোস্ট : আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন : অ্যাডোনিস  ●  আদুনিসের কবিতা
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান