হোম গদ্য সমুদ্রের ডায়েরি থেকে : পর্ব ৪

সমুদ্রের ডায়েরি থেকে : পর্ব ৪

সমুদ্রের ডায়েরি থেকে : পর্ব ৪
289
0
10959455_797175847039405_4666096367253780409_n
সজল সমুদ্র; জন্ম : ০১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম

জীবনে আর সবই তো রাঙতায় মোড়ানো চকলেট! খেয়ে, ফুরিয়ে ফেলার গল্প

০২/০১/২০১৪

কোন অতীত নেই, এমন একটি শহরের কথা লিখবো বলে ভেবেছিলাম। প্রতিদিন যা যা ভাবি, কবিতায় তার ছিটেফোঁটাও লেখা হয় না। সময় চলে যায়। মন সরে যায়। চিন্তাক্ষেত্রটিও তখন কিরকম অপরিচিত লাগে, হায়!
লেখালেখি, তাই মনে হয়—এ শুধু অনন্তপথের ধুলো মাড়ানো। কোনদিন যদি একটি-দুটি হিরার নেকলেস মেলে, ভাণ্ডারে! জীবনে আর সবই তো রাঙতায় মোড়ানো চকলেট! খেয়ে, ফুরিয়ে ফেলার গল্প!
গ্রামোফোনে শোনা শেষ গানটির সুর, ওথেলো সিনড্রোমের ভেতর তোমার বেঁচে থাকা—না, আর কিছু লেখা হবে না।

****

হোয়েন আই ক্যান’ট লুক অ্যাট ইওর ফেস, আই লুক অ্যাট অন ইওর ফিট

০৬/০১/২০১৪

কিছুদিন আগে কবিতা নিয়ে আমার এক সহকর্মীর সাথে আলাপ হলো। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কবিতা নিয়ে নানান জিজ্ঞাসা তাঁর। একথা সেকথায় একটা পর্যায়ে তাঁকে বললাম, নিজের লেখার মধ্যে তেমন কোনো প্রথাগত ঘুম নেই আমার। নেই উচ্চকিত কোনো ধারণাও। ‘ওর মতো শুয়ে পড়ো, এর মতো হাঁটো, তার মতো দৌড়াও’…ইত্যাদি, শুনলে আজকাল খুব হাসি পায় আমার। ক্লিশেও মনে হয়। বাংলা কবিতায় ত্রিশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত এর বৈচিত্র্যহীন অতিব্যবহারই হতে পারে তার অন্যতম কারণ। ব্যাপারটা উপলব্ধি করার পর থেকে যতটুকু লেখালেখি করেছি, একবারও ‘মতো’ ব্যবহার করি নি। উপমাকে আরো নানাভাবে নির্মাণ করা যায়। সেই চেষ্টাটা আগেও অনেকে করেছেন। এখনও কেউ কেউ করছেন। এসব নিয়ে ভাবতে গিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কথাটাও মনে পড়ে মাঝেমাঝে; ‘উপমা মাত্রই ছেনালিতে ভরা। এর মতো ও, হয় কখনো?’

10956084_893435730701549_1225777871_nএভাবে ভাবা যেতে পারে, সেটা শুনে তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেন। ওনার জিজ্ঞাসাগুলো ছিল—‘এটার মানে কি,’ ‘ওটা এমন কেন’, ‘সেটা তো অভিধানে নেই!’—এই টাইপের। এমন সব পরিস্থিতিতে সাধারণত চুপচাপ থাকাটাই আমি শ্রেয় মনে করি। ফলে কারো সাথেই আমার দীর্ঘ আলাপ হয় না। তখন আহত পাখির মনস্তত্ত্বে বসে, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন ও নিরীহ রাস্তাটির কথা ভাবি আমি। যেন সে সাতশো কোটি মানুষের হাঁটাচলা, একা, নিঃশব্দে খেয়াল করছে। পড়তে পড়তে যদি ঘুমিয়ে পড়া যায়, অথবা পর-পর দু’তিন রাত নির্ঘুম থাকা যায়—নিজের লেখা নিয়ে আলাপ জমতে পারে তখন। সহকর্মী হতাশ হলেন, বুঝলাম।

কয়েকদিন আগে পথে দেখা আমার এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। ও এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। অনুমতি নিয়ে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলো সে। ‘দূরে গেছে’, এমন পছন্দের মানুষের সাথে শেষকথা কি হয়েছিল আমার? প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললাম। এসব মনে রাখা সহজ কাজ নয়! যদিও, জীবনে শেষবারের মত কোনো একজনকে আমি বলে দিয়েছি—’হোয়েন আই ক্যান’ট লুক অ্যাট ইওর ফেস, আই লুক অ্যাট অন ইওর ফিট’…

****

একটা ট্রাক-চাপা মৃত কুকুরের শেষ ম্লান মুখের কথা মনে পড়ে তখন

১১/০১/২০১৪

ঘূর্ণমান কোনো সিলিং ফ্যানের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় আমার। মনে হয়, পাখার আদলে মূলত আমার হাতগুলোই ঘুরছে! তখন বাতাস একটা গোলকধাঁধা তৈরি করে। শরীরের ভরকেন্দ্র সরে যেতে থাকে। মনে হয়, কেউ একজন অনবরত একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—তুমি কি আত্মহত্যার যোগ্য?

একটা ট্রাক-চাপা মৃত কুকুরের শেষ ম্লান মুখের কথা মনে পড়ে তখন। অমন করুণ মৃত্যুর আগে, হাইড্রোলিক হর্নে তারও কি শরীরের ভরকেন্দ্র সরে গিয়েছিল, একটু? বা এসেনিন? সিলভিয়া প্লাথ? জীবনানন্দ? শামীম কবীর?

এই অসীম মহাবিশ্বের অনন্ত স্তব্ধতার ভেতর আজ শুধু ঘাপটি মেরে বসে থাকতে ইচ্ছা হয়।

সমুদ্রের ডায়েরি থেকে : পর্ব ৩

সজল সমুদ্র

সজল সমুদ্র

জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
পত্রে রচিত ভোর [কবিতা, ২০০৫, চিহ্ন]
ডালিম যেভাবে ফোটে [কবিতা, ২০১৪, চিত্রকল্প]

ই-মেইল : sajalsomudro39@gmail.com
সজল সমুদ্র