হোম গদ্য ‘সভ্য’ না হয়েও টিকে আছে তারা ষাট হাজার বছর ধরে

‘সভ্য’ না হয়েও টিকে আছে তারা ষাট হাজার বছর ধরে

‘সভ্য’ না হয়েও টিকে আছে তারা ষাট হাজার বছর ধরে
1.19K
0

এক প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর বংশধারা এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত এসেছে সভ্য দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক না রেখেই। কেউ বলে তারা পাথরযুগের মানুষ। প্রায় ৬০ হাজার বছর ধরে সভ্য মানুষের সাথে তাদের আপস হয় নি। এখনও না। ঔপনিবেশিক কায়দায় প্রচুর খাবার উপহার সামগ্রী নিয়ে গিয়েও তাদের সাথে একটু মহব্বত পয়দা করে গবেষণা করবার বা দ্বীপটি একটু ঘুরে ফিরে দেখবার, একটু তাদের ভাষা সংস্কৃতি বুঝবার একটুও সুযোগ তারা দেয় না কাউকে। সভ্য মানুষ দেখলেই তির মারতে মারতে মেরে ফেলে। কখনও মেরে খায়ও সভ্য মানুষ। মারতে পারলে খুব খুশি হয় তারা।

চতুর্দিকে প্রবাল আর নীলকান্তমণি রঙের শান্ত সমুদ্রজল, বিশাল বনভূমি—সবুজ-শ্যামল ঘন বৃক্ষের শামিয়ানা—মনোহর দৃশ্য; যা কেবল উড়োজাহাজে নির্দিষ্ট দূর দিয়ে যেতে যেতে দেখা যায়। সেখানে, সেই সবুজ বৃক্ষ সমারোহের অভ্যন্তরে শত শত বছর ধরে সভ্য দুনিয়ার কেউ যায় নি, একটু মন খুলে ঘুরে বেড়াতে পারে নি। কারণ ঐ দ্বীপের বাসিন্দারা সভ্য মানুষদের এলাও করে না একদম।

ভারত মহাসাগরের উপসাগর বঙ্গোপসাগরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপের কথা বলছি। ৫৯.৬৭ স্কয়ার কিলোমিটারের সে-দ্বীপের বাসিন্দারা দ্বীপের নামানুসারে সেন্টিনেলি (সেন্টিনেলিজ) নামে পরিচিত। ভারতের এই দ্বীপ সাউথ আন্দামান জেলা প্রশাসনের অধীন।

সেন্টিনেলিসহ আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের অন্য আদিবাসী এবং পৃথিবীর আরো বহু আদিবাসী মানবগোষ্ঠী যে সভ্য দুনিয়ার বাইরে থেকে, সভ্যতার প্রতি আগ্রহী না হয়ে, সভ্য মানুষের মতো টিকে থাকার সংগ্রাম না করে, তাদের বংশ পরম্পরাও জারি রাখতে পারার ব্যাপারটি কি বিস্ময়কর নয়? যেন তারা বোঝায়—জীবন এভাবে এবং ঐভাবে দুইভাবেই বংশধারা জারি রাখছে। সেন্টিনেলিদের সম্পর্কে জানতে জানতে, অন্য আদিবাসীদের জানতে জানতে প্রাসঙ্গিক কিছু আলাপ করা যাক।


৫৭০ দ্বীপ, ৩৮টিতে মানুষ


তামিল চোলা রাজবংশের রাজা রাজেন্দ্র চোলা দশম শতকে আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপগুলো আবিষ্কার করেছিলেন। পরে দ্বীপগুলোকে নৌ অভিযানের বেইস বানায় রাজা সুমাত্রাভিত্তিক শ্রীউইজায়া বৌদ্ধ রাজ্যের রাজার সাথে লড়াই করতে। পরে আন্দামান ও নিকোবারের অন্য দ্বীপগুলোতে আসা যাওয়া বসতি এখন পর্যন্ত জারি থাকলেও সেন্টিনেলিদের ঐ দ্বীপে কেউ যাইতে সাহস করে না। কারণ এর আগে যারা গেছে তারা ফিরে আসে নি।

আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে, পোর্টব্লেয়ার অনলাইনের তথ্যানুযায়ী ছোট বড় ৫শ ৭০ দ্বীপ আছে। এর মধ্যে ৩৮টিতে মানুষ থাকে। সাউথ আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার সমগ্র দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী। সমুদ্রপথে রাজধানী থেকে ৫৪.৩ কিলোমিটার দূরে দুর্গম ঐ উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপটি। ভারতের মেইনল্যান্ড থেকে আন্দামান ১৪০০ কিলোমিটার কিন্তু থাইল্যান্ড থেকে ১০০০ কিলোমিটার।


ত্রিলোকি নাথ যেদিন গেলেন


১৯৯১ সালের ৪ জানয়ারি ভারতের এনথ্রপলজিস্ট ত্রিলোকি নাথ পণ্ডিত ঝুঁকি নিয়ে গিয়ে একটু শান্তিপূর্ণ অবস্থান করতে পেরেছিলেন তাদের সাথে প্রথম কিছুক্ষণের জন্যে। তার আগে ২৪ বছর ধরে এই নৃতত্ত্ববিদ চেষ্টা করে আসছিলেন সেখানে পৌঁছতে। কিন্তু ওরা তির মারার কারণে বার বার ফিরে যেতে হয়েছে। সেদিন নির্বিঘ্নে পৌঁছতে পারার কারণ তিনি নিজেও বলেন—’জানি না কেমনে ও কেন পৌঁছতে পারলাম’। প্রতিবেশী দ্বীপের জারাওয়া ভাষায় খুশি প্রকাশের ভাষায় চিৎকার করতে করতে, অঙ্গভঙ্গিও সেরকম করতে করতে পানিপথে এগুচ্ছিল টিম। এক পর্যায়ে নিরাপদ দূরত্বে লঞ্চ নোঙর করে ইঞ্জিনচালিত ডিঙিতে চড়ে তিরের দিকে আগায়। ঠাঁই জলে গিয়ে তাদের জন্যে নেয়া নারিকেল পানিতে বেশি বেশি ছাড়ে। সেন্টিনেলিরা প্রথমে দৌড়ে বনের ভিতরে চলে যায়। পরে তাদের জন্যে কিছু এনেছে দেখে, এবং অঙ্গভঙ্গী ও ভাষা বুঝেই হয়তো ২৮জন নারী পুরুষ শিশু খুশিতে নাচতে নাচতে এসে পানি থেকে নারিকেল নিতে থাকে। তখন তাদের হাতে তির ধনুক ছিল না। তাই ত্রিলোকি নাথ টিম সৈকতে গিয়ে নামেন। টিম সৈকতে নামার আগে ভিডিও-তে দেখা গেল, মধ্যবয়সী এক নারী জঙ্গলের ভিতর থেকে কিছু বলতে বলতে দৌড়ে এসে হাঁটু পানিতে থাকা মধ্যবয়সী পুরুষটিকে টেনে নিয়ে যায়। ভাবটা এমন প্রকাশ পেল যেন, ‘হেই তুমি জলদি পানি থিকা উইঠা আও, জলদি আও, এই সভ্যদের কাছে যাইও না, তোমারে ধইরা নিয়া যাইব গো! আও আও জলদি ভাগ।’ এই ভাবটাতে নারীটির মায়া প্রকাশ পেল পুরুষটির জন্যে। মানে, ভালোবাসা আছে তাদের মাঝেও।

22281346_1909411269075359_1648283037_o
মধ্য আন্দামানে ট্রাংক রোডে সেন্টিনেলিদের মতোই জারাওয়া আদিবাসী

আফ্রিকার নিগ্রো গড়নের আদিবাসী আজীবন নেংটা থাকা সেন্টিনেলি কয়েকজন এসে ত্রিলোকি নাথের পোশাকের ভিতর কী রাখা খুঁজছিল। মানে, পোশাক দেখে তারা মনে করেছে পোশাকের ভেতর কিছু লুকিয়ে রাখা। তারা পণ্ডিতকে নেংটা করে দেখে পোশাকের ভিতর কিছু নাই। তারা তার চশমা নিয়ে যায়। তাদের সাথে ছবি তোলেন তিনি। তার আগে ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটি টিম গিয়েছিল সেখানে। সাথে একজন ফিল্ম ডিরেক্টর ছিলেন। এক সেন্টিনেলি তির মারে ফিল্ম ডিরেক্টরের উরুতে। মারার পর তির উরুতে ঢুকেছে দেখে তারা খুশি হয় খুব। পুরা টিম দ্রুত তাদের ইঞ্জিনচালিত ডিঙি নিয়ে পালিয়ে যায়। বর্তমান মধ্য আফ্রিকার উগান্ডা, কেনিয়ার মানুষদের মতো দেখতে সেন্টিনেলিরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মানুষদের গঠনের সাথেও মিলে।


‘ওরা অসভ্য, আমরা সভ্য’


সেন্টিনেলিরা আগুন জ্বালাতে পারে না। সমুদ্রের মাছ, কচ্ছপ আর বনের শূকর মেরে খায়। তাদের নারী-পুরুষের শরীর তেলতেলে শক্তিশালী বেশ, ছবি দেখলেই আন্দাজ করা যায়। তারা দাঁত দিয়ে নারিকেল ছুলতে পারে। সভ্য দুনিয়ার জীবন যাপনের সংজ্ঞা ও অর্থ তাদের কাছে কোনো অর্থ দেয় না। কিন্তু তাদের শিল্পচর্চা হলো, শরীরে নানা নকশা আঁকা। তাদের ভাষা বোঝার উপায় নাই। তবে উত্তর সেন্টিনেল-এর প্রতিবেশী দক্ষিণ আন্দামান দ্বীপের আদিবাসীদের জারাওয়া ভাষার সাথে কিছু মিলে। ঐ দ্বীপের পাশ দিয়ে যাওয়া সাউথ আন্দামান ও মধ্য আন্দামানের ট্রাংক রোডে দেখা মিলে জারাওয়া নেংটা জঙ্গলবাসী আদিবাসীদের। জারাওয়ারা মধ্য আন্দামানে থাকে নিজস্ব পরিমণ্ডলে। কখনও সভ্য মানুষের মতো পোশাক পরতেও দেখা গেছে। আর সাউথ সেন্টিনাল ছোট দ্বীপ, মাত্র ১.৬১ স্কয়ার কিলোমিটার। সেখানে মানুষ থাকে না।

22281370_1909413319075154_177226408_o
সেন্টিনেলি

সেন্টিনেলিদের কথা বললে জারাওয়াদের কথা কিছু বলা প্রাসঙ্গিক। মূলত মধ্য আন্দামানের বিশাল বনাঞ্চলে জারাওয়ারা থাকে। এর ভিতর দিয়ে গেছে ট্রাংক রোড। জারাওয়া আদিবাসীরা ক্ষুধার জ্বালায় মধ্য ও দক্ষিণ আন্দামানের ভারতীয় অভিবাসীদের নজরের আয়ত্তে এসে দূরে থেকেই পেট নাড়া দিয়ে খাবার দেওয়ার ইশারা করত। তখনও তাদের সাথে তির ধনুক থাকত। ভারতীয়রা ভয়ে ভয়ে কাছে ডেকে ওদের খাবার দিত। এভাবে সভ্য মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক হয়। কিন্তু বহিরাগতরা ধীরে ধীরে জারাওয়া মেয়েদের নেশা পান করিয়ে যৌনসংসর্গ করে। তাদের জঙ্গলের ঘরে গিয়ে থাকে। তারা এতে অসন্তোষ। এ নিয়ে মামলা হয় ভারত সরকারের সাথে। এক জারাওয়া মেয়ে বলেন, ‘আমরা ভালো, সভ্য, ওরা খারাপ, অসভ্য।’

উল্লেখ্য, সেন্টিনেলি নারী পুরুষের শরীরের রং রূপ জারাওয়াদের মতোই নিগ্রো গঠনের।


সংবেদনশীল ছয়টি আদিবাসী গ্রুপ


আন্দামান ও নিকোবার দীপপুঞ্জে সংবেদনশীল ছয়টি আদিবাসী গ্রুপ আছে। তারা হলো, বৃহত্তর আন্দামানি স্ট্রেইট দ্বীপের, বৃহত্তর নিকোবারের নিকোবারি, দক্ষিণ ও মধ্য আন্দামানের জারাওয়া, ছোট আন্দামানের অঙ, বৃহত্তর নিকোবারের শমপেনি, আর সেন্টিনেল দ্বীপের সেন্টিনেলি। এই ছয় জাতের মধ্যে দুই এথনিক বংশধারার ছাপ দেখা যায়। এক, আফ্রিকার নিগ্রো, দুই, মঙ্গোলীয়। ধারণা করা হয় নিগ্রো আকারের ওদের পূর্বপুরুষ ৬০ হাজার বছর আগে এই দ্বীপপুঞ্জে এসেছিল। সেন্টিনেলিরা বাদে বাকি সব আদিবাসী আন্দামানের ভারতীয় অভিবাসীদের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে সীমিত পর্যায়ে। ইশারা-ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় হচ্ছে। শুধু সেন্টিনেলিরা সভ্য দুনিয়ার কারও সাথে যোগাযোগ করতে আগ্রহী না। শত্রু মনে করে তারা।


বৃটিশ দখল


১৮৫০ সালে বৃটিশ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ঢুকে বিভিন্ন দ্বীপের অনেক আদিবাসীদের জানে মেরে ফেলেছিল। উত্তর সেন্টিনেলে যেতে পারে নি। এখন অনুমান করা হয় দ্বীপটিতে ৫০—৫০০ জন সেন্টিনেলি বসবাস করছে। ১৯৯৭ সাল থেকে ভারত সেখানে যাওয়া নিষেধ করে দিয়েছে। ভারত চাইলে মিলিটারি অপারেশন চালিয়ে সেটা দখল করে টুরিস্ট স্পট বানাতে পারত। সেটা না করা বরং প্রশংসনীয়। থাক্ একটা আদিগোষ্ঠী তাদের মতো করে একটি ভূখণ্ডে।


আরো কতগুলো বিপদজনক দ্বীপ


পৃথিবীতে আরও কয়েকটি দ্বীপ আছে যেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ নিরাপত্তাজনিত কারণে। যেমন : ইস্ট রেনেল (সালোমন দ্বীপপুঞ্জ)। এটি ইউনেসকো-র ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিশেবে ঘোষিত। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। কারণ হলো, এখনও ওখানে দৈত্যরা বসবাস করে মানুষের মাংস খায়। গবেষকরা মাঝে মাঝে যান। এছাড়া, ইলহা দা কুয়েইমাডা গ্রান্ডে দ্বীপ। ব্রাজ়িলের সাও পাউলো উপকূলে এটি সাপের ভরা দ্বীপ। সেখানে পা রাখার জায়গা নেই, এত সাপ। নানা প্রজাতির সাপ। শুধু বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্যে যাওয়ার অনুমতি নাই। আর পোভেগ্লিয়া (ইটালি) নামে ভেনিস ও লিডোর মধ্যে রয়েছে একটি ছোট একটি দ্বীপ। অনেক আগে এই জায়গাটিতে মানুষের আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ওখানে গেলে অসুস্থ হয়ে পরে মানুষ মারা যায়। লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে সেখানে। তাই সেখানে মানুষ যাওয়া বন্ধ।

এছাড়া চিলি থেকে বেশ দূরে ইস্টার দ্বীপ, প্রশান্ত মহাসাগরে। ওটার অন্য নাম রাপা নুই। দূরবর্তী ও নির্জন এলাকায়। ওটা চিলির টেরিটরি। পৃথিবীর আদি মানুষের বংশ আছে। সেখানেও সাধারণ ভিজিটর যেতে পারে না।


সভ্যদের মতো স্বাস্থ্য সচেতনতা নাই কিন্তু…


আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীসহ এসব দ্বীপের মানুষদের, এমনকি মহাবন আমাজনের আদিবাসীদের জীবনের কাছে এসে সভ্য মানুষদের জীবন যাপনের অনেক হিশাব-কিতাব, তত্ত্ব-সত্য, ভালো-মন্দ, ইত্যাদি ভেঙে পড়ে—মানে, ওসব জ্ঞান ছাড়াও জীবন চলে। তারা সভ্যদের সত্য মিথ্যার মর্ম বুঝতেও আগ্রহী না। আধুনিক মেডিকেশনের ধারে-কাছে না থেকে, প্রকৃতির অনিরুদ্ধ আলটিমেইট ফ্যাক্টসের মাঝে তারা কী সতেজ সুঠাম সহজ স্বাভাবিক! বিজ্ঞানের সুফল কুফল নিয়ে কোনো হাঙ্গামায় তারা জড়ায় না। সভ্য মানুষের জীবন যতভাবে বিপন্ন, অত বহুমুখী মসিবতে না তাদের জীবন। স্বাস্থ্য সচেতন না হয়েও জঙ্গলের নেংটা মানুষগুলো ৮০/৯০ বছর বাঁচতে পারে।  সভ্য মানুষেরা অনেক বিষয় জেনে বুঝেও আতঙ্কিত হতাশাগ্রস্ত আর গড় আয়ু ৬০/৭০ বছর। তারা অনেক ক্ষেত্রে অসহায়। আমরা সভ্যদের জীবন জ্ঞান বিজ্ঞানে বিস্তর সফল তবু অসহায়তা কি নেই? আমরা ডিপ্লোমেসি হিপোক্রেসি দিয়েও, ধার্মিক ও ধর্মবিরোধী ‘প্রগতিশীল’ হয়েও বিপদের সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে দিন কাটাই। তারা রাগ উঠলে প্রতিবাদ করতে নুনু দেখায়, আমাদের উচ্চশিক্ষিতরাও স্ল্যাং ভাষা ব্যবহার করে—নাক ফুলিয়ে মধ্যমা আঙুল দেখায়। সভ্যরা যৌনতাকেন্দ্রিক শয়তানি করে, সহিংস রাজনীতি করে। মারাত্মক মারণাস্ত্র বানায়। তারা ওসব করে না। তারা দেহঘড়ির স্বাভাবিক হিশাবেই বলা যায় সকল দরকারি কাজ সারে। তবে আমাজনের আদিবাসীদের মধ্যে, সব গোষ্ঠী না হয়তো, দেখা গেছে, এক ধরনের ধর্মীয় অনাচার করে, জীবিত শিশু খুন করে মাটিচাপা দেয়। আমাজনিরা আগুনে পুড়ে বন্য প্রাণী খায়।

উল্লেখ্য, আধুনিক যুগের পৃথিবীর নগ্ন আদিবাসীরা সভ্য দুনিয়ার ব্রাজিলীয়দের মতো গোলমালভরা (noisiest) না, এবং নরওয়েজীয়দের মতো যৌনসঙ্গকামী (the most lustful country) না।


দেহঘড়ির ছন্দে তাদের জীবন ও বেঁচে থাকা


আমি লিখছি ইউএই-র রাজধানী আবুধাবিতে বসে। এটি একটি দ্বীপ। প্রাচীনকালে এখানেও আদিবাসী থাকত। আরব বদ্দুরা (বেদুইন) আদিবাসীই। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বদ্দুদেরই বংশধারা। বলা হয় At our core, we humans are tribal. সকল সভ্য মানুষ অতীতে আদিবাসী ছিল। আফ্রিকা থেকে ৭০ হাজার বছর আগে প্রায় ২ শ মানুষ লোহিত সাগর পার হয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে কালো মানুষগুলোর পরবর্তী প্রজন্ম শ্যামলা ও ফর্সা হতে থাকে। মাত্র সাড়ে আট হাজার বছর আগের ইউরোপের নানা প্রান্তের শিকারি উপজাতিরা কালো চামড়ার ছিল। sciencemag.org—‘How Europeans evolved white skin’ বর্তমান সভ্য দুনিয়ার আধুনিক হোমো সেপিয়েন্স, মানে মানুষদের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকারই। জেনিটিক এনালিসিস দেখাচ্ছে এশিয়া আফ্রিকা ইউরোপ উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মানুষদের অভিন্ন এনচেস্টরস আফ্রিকা থেকে আগত। প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে নাটকীয়ভাবে সমুদ্র লেভেল নেমে গিয়েছিল বলে আফ্রিকা থেকে সেই যুগের মানুষ শুকনা লোহিত সাগর পাড়ি দিয়েছিল। আর হাজার হাজার বছর পরে ইস্তাম্বুলের বসফরাস প্রণালিও পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢুকেছিল মানুষ সমুদ্র লেভেল নেমে যাওয়ার কারণেই। (দ্য ইনক্রেডিবল হিউম্যান জার্নি— বিবিসি)।

22290356_1909429229073563_1688825884_n
মানচিত্রে সেন্টিনেলের অবস্থান

জেনেটিক ও আর্কিওলজিক্যাল গবেষণা দেখায়, ৫০/৬০/৬৫ হাজার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে মধ্য এশিয়া ও পরে অস্ট্রেলিয়াতে মানুষ পৌঁছে। (দ্য টেলিগ্রাফ, আফ্রিকান ট্রাইব পপুলেইটেড রেস্ট অব দি ওয়ার্ল্ড)।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আফ্রিকার সেই আদি মানুষগুলোর বংশধর যারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে গিয়ে নানা রূপে সভ্য হয়েছে, তারা তো হয়েছেই, তারা টিকে আছে এখনও ‘উন্নত জীবন’র স্বাদ নিতে নিতে। কিন্তু আদি সেই মানুষদের প্রায় সেই আদি রূপ, আদি জীবনবোধ, আদি ভাষা, আদি স্বভাব নিয়েই বংশ পরম্পরায় পৃথিবীর বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জে ও গহিন পাহাড় অঞ্চলে এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত টিকে আছে নানা সভ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করেই! আন্দামানের সেন্টিনেলি আদিবাসীরা সেই আফ্রিকার পূর্বপুরুষের বংশধর। সংখ্যায় কম হলেও নানা প্রান্তের এই বুনিয়াদি মানুষগুলো তো সভ্যতার উন্নতির ছোঁয়া না নিয়েই টিকে আছে। তারা তাদের মতো থাকে। নানা সভ্যতার লড়াই নিয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নাই।

সেন্টিনেলিরা তো পাথর যুগের মানুষের মতো। আগুন চিনে না, রান্নাবান্না নাই, হান্ডিবাসন, বিছানা নাই, পোশাক নাই, বাতি নাই। দিনের আলো কেবল তাদের আলো। তাদের ঘড়ি নাই। বানানো ঘড়ির টাইমের হিশাব তারা রাখে না। তারা তাদের দেহের ভিতরের বায়োলজিক্যাল ঘড়ির হিশাবে চলে। ঘুমে ধরলে ঘুম, ভুখ লাগলে গাছের লতাপাতা ফল সমুদ্রের মাছ, বন্য প্রাণী যা পায়, খায়। ২০১৭ সালে যে-তিন বিজ্ঞানী দেহতত্ত্বের (ফিজিওলজি) উপর নোবেল পেলেন, (Jeffrey C. Hall, Michael Rosbash and Michael W. Young), তারা দেখালেন উদ্ভিদসহ মানুষের দেহে আছে ইনার বায়োলজিক্যাল ক্লক। এই ঘড়ি বরাবর টাইমে চলছেই। চলতে চলতে বহিরাঙ্গের বিবর্তনের সাথে ধারার মিলও রাখছে। বিজ্ঞানীরা দেখান the self-sustaining clockwork inside the cell. এই ঘড়ি সেন্টিনেলিদের ভিতরেও আছে, পৃথিবীর অন্য সব সভ্য মানুষদের ভিতরেও আছে।

সারওয়ার চৌধুরী

জন্ম ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম। নানাবাড়িতে। কবি, গল্পকার, প্রবন্ধিক ও অনুবাদক। প্রাক্তন সদস্য, সিলেট প্রেসক্লাব। পড়াশোনা করেছেন ‘ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ’-এ (বিকম পরীক্ষা দেন নি)। সহকারী সম্পাদক হিশেবে কাজ করেছেন ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এ (১৯৯৩- ১৯৯৭)। বিশ বছর ধরে প্রবাসে। একটি পারফিউম কোম্পানিতে সেলস এগজিকিউটিভ হিশেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com