হোম গদ্য সন্ত কবীর রবীন্দ্রজীবনে কণ্টকহার

সন্ত কবীর রবীন্দ্রজীবনে কণ্টকহার

সন্ত কবীর রবীন্দ্রজীবনে কণ্টকহার
261
0

বাংলায় কবীরের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীক্ষিতিমোহন সেন ‘কবীর’ অনুবাদের ভূমিকায় লিখেছিলেন—‘শান্তিনিকেতনে যে সব সাধকের রচনাবলী সংগ্রহ করবার মানস আছে, কবীর তাহাদের মধ্যে একজন। ইহার নাম অবশ্য আমাদের দেশে অবিদিত নহে, কিন্তু ইহার মধুর রচনাবলী অল্প লোকই জানেন। আর তাহার নামে প্রথিত যে সব জঞ্জাল ও সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণ দোঁহা প্রভৃতি প্রচলিত আছে, তাহাতে তাহার সত্যকে আরও আচ্ছন্ন করিয়াছে।’ কাশী ও তার আশেপাশের হিন্দু সাধুদের আড্ডার পরিমণ্ডলে বেড়ে-ওঠার সুবাদে ক্ষিতিমোহনের মধ্যে শৈশবেই কবীর প্রেমের সূচনা হয়েছিল। শান্তিনিকেতন গ্রন্থমালার অংশ হিশাবে ‘কবীর’ প্রকাশের মাত্র কয়েক মাস আগে গীতাঞ্জলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কিন্তু নানা কারণে একটি তর্ক এড়ানো সম্ভব হয় না যে, কবীরের রচনাবলীর সঙ্গে পরিচয়ের পরে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি লেখার অন্তর-অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন। রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’ এবং প্রণতি মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্ষিতিমোহন সেন ও অর্ধশতাব্দীর শান্তিনিকেতন’ গ্রন্থে এর বিশদ আলোচনা রয়েছে। পাল লিখছেন :

কবীরের দোঁহাবলীর সঙ্গে গীতাঞ্জলী-র সম্পর্ক বিষয়ে বিতর্কটির প্রসঙ্গ আলোচনা করে নেয়া যেতে পারে।… গীতাঞ্জলি-র মূল পাণ্ডুলিপিতে কবীর তুলসীদাস প্রমুখ সন্ত কবিদের আঠারোটি দোঁহা লিখিত আছে।


রবীন্দ্রনাথ পারস্যের সুফী কবিদের দ্বারা আপ্লুত হয়েছিলেন। গীতাঞ্জলিতে একই সঙ্গে বৈষ্ণব-পদাবলী ও সুফীবাদের প্রেমসাধনার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়।


ডক্টর রামেশ্বর মিশ্র এগুলোকে রবীন্দ্রনাথের হস্ত লিখিত বলে দাবি করেছেন; যার সঙ্গে প্রশান্তপাল একমত হতে পারেন নি। তিনি বলেন—‘কবীরের জীবন ও রচনার সঙ্গেও যে তার কিছু পরিচয় ছিল তার প্রমাণ দুর্লভ নয়। ক্ষিতিমোহনের অনুবাদের পূর্বে কবীরের রচনা ও জীবন সম্বন্ধে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনেক কয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, যার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় থাকা অসম্ভব নয়। ক্ষিতিমোহন লিখেছেন ‘গীতাঞ্জলি ও কবীরের বাণীর ভারসাম্য দেখে তিনি রবীন্দ্রনাথকে সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করান। তিনি বলেন :

কবীর বাণী দেখিয়া তিনি গীতাঞ্জলি লেখেন নাই। গীতাঞ্জলি দেখিয়া আমি তাহাকে কবীর বাণী দেখাই।

সে যাই হোক, কবীর-মানসের সঙ্গে যে রবীন্দ্র-মানসের মিল ছিল তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। রবীন্দ্রনাথ পারস্যের সুফী কবিদের দ্বারা আপ্লুত হয়েছিলেন। গীতাঞ্জলিতে একই সঙ্গে বৈষ্ণব-পদাবলী ও সুফীবাদের প্রেমসাধনার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। কবিপিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হাফিজের ভক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই অনুরাগ উত্তাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। জীবনের শেষপ্রান্তে পারস্যভ্রমণে গিয়ে তিনি বলেছিলেন :

আমার পিতা ছিলেন হাফেজের অনুরাগী ভক্ত। তার মুখ থেকে হাফেজের কবিতার আবৃত্তি ও তার অনুবাদ অনেক শুনেছি। সেই হৃদয়ের মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল।

এ সময়ে তিনি সুফী ধর্মতত্ত্ব নিয়েও কিছু পড়াশোনা করেছিলেন। সুতরাং, গীতাঞ্জলি রচনার ক্ষেত্রে কেবল কবীর রবীন্দ্রনাথের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এ কথা বিশ্বাস হয় না। তবে কবীর যে রবীন্দ্রনাথকে কিছু সময়ের জন্য আচ্ছন্ন করেছিলেন—এখানে তার সবিস্তার কিছু আলোচনা করব।

রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি-র গান লিখতে শুরু করেন ১০ ভাদ্র ১৩১৬ এবং ক্ষিতিমোহনকে একই বছর ১৫ আশ্বিন লেখেন :

কবীরের প্রত্যাশায় পথ চেয়ে আছি—বিলম্ব ঘটাইবেন না।

পরের বছর ৪ জ্যৈষ্ঠ তারিখে লেখেন, ‘কবীরকে আমার নমস্কার জানাইবেন।’ এসব চিটিপত্র থেকে মনে হয়, কবীরের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল প্রবল। ক্ষিতিমোহনকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠির কিছুটা এখানে উল্লেখ করতে চাই—‘আপনাকে ত বলেছি—মূলকে সামান্য পরিমাণেও ছাড়িয়ে যেতে আমার ইচ্ছা হয় না, তাতে যদি ভাব অস্পষ্ট হয় সেও ভালো। ভাবের কিছুটা অস্পষ্টতাই দরকার—অতিস্পষ্ট হলে তার অর্থ ছোট হয়ে যায়— কবিতা ত তত্ত্ববিদ্যার ব্যাখ্যা নয় এই জন্য তার কাছে স্পষ্ট কথা দাবি খাটবে না।

কবিতায় কোনো abstract কথা মানায় না—এই জন্য কবীরের সাহেব কথাটি আমি বাংলায় স্বামী প্রভৃতি কোনো নিকট সম্বন্ধসূচক শব্দের দ্বারাই তর্জমা করা ভালো মনে করি—ঐ একটি কথাই নানা জায়গায় নানাভাবে প্রকাশ পাবে।… ‘শব্দ’ কথাকে সংগীত বললে খাটো হয়—এবং দেখেছি কবীর যে বিশেষ কবিতায় ‘শব্দ’ নিয়ে মেতেছেন সেখানে সংগীত কথাটা সব জায়গায় ভালো করে খাটে না—‘শব্দ’ কথার মধ্যে একটি আদিম ধ্বনির ভাব আছে—সে যেন সৃষ্টির প্রথম মন্ত্র, ভূমিষ্ট শিশুর প্রথম কান্না, তা ওঙ্কারের মতো—অর্থাৎ তা অত্যন্ত সহজ এবং ব্যাপক—তা গানের চেয়ে সরল এবং গভীর।’

কান্তিনিকেতন গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত কবীর প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় ক্ষিতিমোহন লেখেন :

যাহার উৎসাহ ও সাহায্য না পাইলে আমার এই গ্রন্থ প্রকাশ করাই হইত না, সেই পূজ্যপাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়কে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি।

কবীরের অনুবাদ ও প্রকাশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ অনেকখানি জড়িত ছিলেন। আর এই কাজটি ঠিক তখনই ঘটেছিল যখন তিনি গীতাঞ্জলি-র প্রথম খণ্ড প্রস্তুত করছিলেন। তাই ক্ষিতিমোহন লিখেছিলেন :

গীতাঞ্জলি-র মধ্যে মধ্যযুগের বাণীর কিছু ভারসাম্য দেখিয়া আমিই কবীরের বাণীর বিষয় তাহাকে প্রথম জানাই। তাতেই আমি কবির কাছে ধরা পড়ি। তাহা ঘটে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। তাহার কিছুকাল পরে আমার কবিরের প্রথম খণ্ড বাহির হয়। কবীরের বাণী দেখিয়া তিনি গীতাঞ্জলি লেখেন নাই। গীতাঞ্জলি দেখিয়া তাহাকে আমি কবীর বাণী দেখাই।

নাগরী প্রচারিণী সভা-সম্পাদিত কবীর গ্রন্থাবলীর ভূমিকায় দাবি করা হয়েছে :

বাংলার কবীন্দ্র রবীন্দ্রকেও কবীরের ঋণ স্বীকার করিতে হইবে। রহস্যবাদের (mysticsm) বীজ তিনি কবীরের কাছেই পাইয়াছেন। শুধু তাহাতে জমকালো পাশ্চাত্য পালিশটি দেওয়া হইয়াছে। ভারতীয় রহস্যবাদকে ইনি পাশ্চাত্য ঢঙে সাজাইয়াছেন ইহাতেই ইউরোপে তাহার প্রতিষ্ঠা।

যদিও এ ধরনের দাবি প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা বালখিল্যতা লক্ষ করা যায়; তবে এ কথা কেউ অস্বীকার করে না যে রবীন্দ্র-মানসে পারস্যের সুফী কবি এবং সধ্যযুগের ভারতীয় সাধক কবিদের চেতনা বিকাশ লাভ করেছিল। এছাড়া কালিদাস-বাণভট্টের কাব্যের প্রাচীন ভারত, ইউরোপীয় কাব্যের রোমান্টিক সৌন্দর্য-চেতনা তার সহজাত কাব্য প্রতিভার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। যৌবনে লোকসাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে বাউল কবিদের সন্ধান পান তিনি। এ কথা সবার জানা যে, শিলাইদহপর্বে ফকির লালন শাহ’র গান তাকে মোহিত করেছিল। ক্ষিতিমোহন সেন অবশ্য দাবি করেছেন :

রবীন্দ্রনাথ সন্তসাহিত্যের সঙ্গে একেবারে পরিচিত ছিলেন না। আমি যে সময়ে তাকে সন্তসাহিত্য সম্পর্কে কখনও কখনও পরিচিত করতে শুরু করলাম সে সময়ে তার গীতাঞ্জলি-র যুগ শেষ হয়ে আসছে।

অবশ্য ক্ষিতিমোহন এই বিতর্কের অবসান টেনেছেন এই বলে :

যারাই বাস্তবিক সাধক তাদের প্রত্যেকেরই একের অপরের সঙ্গে এক না এক প্রকারে যোগ চিরদিন আছে, অথচ কেউ কারো কাছে ঋণী নন।


খ্রিস্টের ভাবধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই কাব্য রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সব কথার জবাব দেবার জন্যই মূলত রবীন্দ্রনাথ মধ্যযুগের ভারতীয় মরমিয়া কবিদের পাশ্চাত্যে পরিচিত করবার তাগিদ অনুভব করলেন।


তবে গীতাঞ্জলি রচনাকালে কবীর যে রবীন্দ্রনাথের উপর ভর করেছিল নানা তথ্যে-উপাত্তে অস্বীকার করা যায় না। মনে করবার অনেক কারণ আছে যে রবীন্দ্রনাথ তার আত্ম-জাগরণের কাব্য গীতাঞ্জলি নিয়ে এ সময় যতখানি ব্যস্ত ছিলেন কবীর নিয়ে তারচেয়ে কম ছিলেন না। অর্থাৎ কবীর এবং গীতাঞ্জলি মিলেই অদ্বৈত ঈশ্বর সাধনার উপায় আবিষ্কার করছিলেন। এ সময়ে দু’টি ঘটনা খুবই উল্লেখযোগ্য—একটি হলো রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে অজিতকুমার চক্রবর্তী কর্তৃক কবীরের অনুবাদ; দ্বিতীয়টি তার স্বকৃত অনুবাদ। এ সময় রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় আকৃষ্ট হয়ে এজরা পাউন্ডও কবীরের দিকে ঝুকেছিলেন। প্রশান্তপালের বর্ণনায় বিষয়টি এভাবে এসেছে :

পাউন্ড কালীমোহসের সহযোগিতায় মধ্যযুগীয় ভারতীয় সন্ত কবীরের দোঁহা ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথই ভারতীয় মরমিয়াবাদ (mysticsm) সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে পাউন্ডকে কবীরের কথা বলেছিলেন; আর তাতেই উৎসাহিত হয়ে কবীর ও হিন্দি ভাষা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এজরা পাউন্ড কালিমোহন ঘোষ-কৃত crib অবলম্বনে দশটি দোঁহার ইংরেজি অনুবাদ প্রস্তুত করেন।

এগুলো ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি সংখ্যা ‘মডার্ন রিভিয়্যু’তে certain Poems of Kabir/ Translated by Kali Mohan Ghos and Ezra Pound/ From the edition of Mr. kshiti Mohan sen শিরোনামে মুদ্রিত হয়।

কবীর নিয়ে রবীন্দ্র-জীবনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল কিংবা হতে পারতো অজিতকুমতার চক্রবর্তীর কবীরের ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে। ‘উড়িষ্যার সমুদ্রতীরবর্তী চাঁদিপুরে পিয়ার্সনের সঙ্গে গ্রীষ্মাবকাশ কাটানোর সময়েই অজিতকুমার ক্ষিতিমোহনের ‘কবীর’ গ্রন্থের চারটি খণ্ড থেকে বেছে ১১৪টি দোঁহা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। পিয়ার্সন ছিলেন অজিতকুমারের এই অনুবাদের কর্মসহায়ক। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির পর দেশের মতো বিদেশেও তার কীর্তিকে খাটো করে দেখানোর জন্য নানা রকম বিরূপ আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। বিশেষ করে নোবেলপ্রাপ্তির কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথ যখন আমেরিকা হয়ে ইংল্যান্ড গেলেন তখন প্রায়শই তাকে গীতাঞ্জলি-র মিস্টিসিজম নিয়ে কথা বলতে হতো। এমনকি ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হলে পাশ্চাত্যের কিছু ধর্মব্যবসায়ী বলতে শুরু করলেন—এসব তো যিশুখ্রিস্ট আগেই বলেছেন। খ্রিস্টের ভাবধারা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এই কাব্য রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সব কথার জবাব দেবার জন্যই মূলত রবীন্দ্রনাথ মধ্যযুগের ভারতীয় মরমিয়া কবিদের পাশ্চাত্যে পরিচিত করবার তাগিদ অনুভব করলেন। এমনকি ক্ষিতিমোহনকেও সেখানে নেবার চেষ্টা করতে লাগলেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও কবীরের দোঁহা অনুবাদে প্রবৃত্ত হলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ইংরেজ যাবার বহু আগে থেকে সেখানকার মরমিয়া সাধক কবিরা এই বাণীর প্রচার করে আসছে। গীতাঞ্জলি রচনায় যদি কিঞ্চিত ঋণ স্বীকারের প্রয়োজনীয়তা থাকে তাহলে সে তার ঘরেই রয়েছে। ভারতীয় কবিতায় গীতাঞ্জলি কোনো নবসৃষ্ট নয়—এটি ভারতীয় সাধনারই অংশ। তবে রবীন্দ্রনাথের কবীর অনুবাদকর্ম খুব বেশিদূর অগ্রসর হয়েছিল বলে মনে হয় না। অজিতকুমারের অনুবাদের প্রতি রবীন্দ্রনাথ নির্ভর করেছিলেন।

আমেরিকায় যাবার প্রাক্কালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইভলিন আন্ডারহিল নামে এক ধর্মযাজিকার পরিচয় হয়—যিনি যিশুখ্রিস্ট এবং ভারতীয় মিস্টিসিজমের ঘোর অনুরাগী ছিলেন। মিস্টিসিজম নামে তিনি একখানি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। লন্ডন থেকে জগানন্দকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে মহিলাকে ‘খুব ক্ষমতাশালিনী বিদুষী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষিতিমোহনকেও তিনি ঐ একই কথা লিখেছিলেন যে, এদের সহায়তায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবীরের গ্রন্থ ও জীবনী প্রকাশ করা সম্ভব হবে। রবীন্দ্রনাথ তাকে প্রকাশ উপযোগী মাল মসল্লা সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এর কিছুদিন পরে তিনি অজিতকুমারকে ইভলিন আন্ডারহিলের কথা জানিয়ে বলেন, তার সহযোগে কবীরের দোঁহাগুলো ইংরেজিতে প্রকাশ করা সম্ভব হবে। অজিতকুমারের অনুবাদগুলো রবীন্দ্রনাথ এবং আন্ডারহিল মিলে পরিমার্জন করে মুদ্রণযোগ্য করে তুলবেন বলে জানান এবং অজিতকে একটি প্রবন্ধ লিখে পাঠাতে বলেন। রবীন্দ্রনাথের এ যাবৎ কালের চিঠিপত্র পর্যালোচনা করে এটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, কবীরের ইংরেজি অনুবাদ অজিতকুমার চক্রবর্তীর নামেই প্রকাশিত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয় নি। আন্ডারহিলের ভূমিকা এবং রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ হিশাবে One Hundred Poems of Kabir নামে প্রকাশিত হয়। এ ধরনের একটি অপ্রত্যাশিত বিষয় নিয়ে অজিত এবং ক্ষিতিমোহন উভয় মনক্ষুণ্ন হন এবং বিরক্তি প্রকাশ করেন। কেন এমনটি হয়েছিল তা পরিষ্কারভাবে জানার কোনো উপায় নেই—আন্ডারহিল উপযাচিকা হয়ে এটা করেছিলেন, না রবীন্দ্রনাথের সায় ছিল তা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের চিঠি থেকে অনুমান করবার যথেষ্ট কারণ আছে যে, তিনিও ভেবেছিলেন এটি অজিতকুমারের নামে প্রকাশিত হবে। আজিতকে লেখা একাধিক চিঠিতে তিনি তাকে সে আশ্বাসও দিয়েছিলেন। আন্ডারহিল অজিতের নাম বাদ দিতে পারেন এই আশঙ্কার জবাবে রবীন্দ্রনাথ তাকে লেখেন :

কবীর গ্রন্থ সম্বন্ধে তুমি একটু ভুল বুঝেছ। প্রথমত গ্রন্থ থেকে তোমার নাম বাদ দেয়া হবে Evelyn underhill এমন ইচ্ছা করেন না। দ্বিতীয়ত আর্থিক হিশাবে তোমাকে এবং ক্ষিতিমোহনকে বাদ দেয়া হবে এমন ইচ্ছাও আমার নয়।

আরেকটা চিঠিতে তিনি অজিতকে লেখেন :

তোমার এ বইয়ের অর্থালাভের সম্ভাবনা কতদূর তা বলতে পারি নে। অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি হবে না কিন্তু বেশি আশা করো না। যা পাও তাই যথেষ্ট।

কিন্তু এমন কি ঘটেছিল যে কারণে অজিতকুমারের নাম বাদ দেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে অনুমান ছাড়া আমাদের হাতে তেমন কোনো তথ্য নেই। আন্ডারহিল ভূমিকায় অজিত এবং ক্ষিতিমোহনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ছাড়া তেমন কিছু প্রকাশ করেন নি।

প্রসঙ্গত বলতে হয়, অজিতকুমারকে বঞ্চিত করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অভিযোগ করা হয় এবং এ নিয়ে কিছুটা বিতর্কেরও সূত্রপাত হয়।


কবীর প্রকাশের কৃতিত্ব প্রায় ষোলআনা রবীন্দ্রনাথের এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার স্নেহাষ্পদ যশোগ্রাহী অতিকুমারের নাম বর্জন অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি। তারা বলতে চেয়েছেন, অন্তত বরীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে অজিতের নামটিও যুক্ত হতে পারতো।


One Hundred Poems of Kabir-এ অজিতের নাম না থাকার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ কৈফিয়ত হিশাবে পেশ করেন যে, অজিতকে বর্জন ইচ্ছেকৃত নয়। এমনকি তিনি শেষপর্যন্ত জানতেও পারেন নি যে অজিতের নাম বাদ দেয়া হবে। কিন্তু প্রকাশক ম্যাকমিলান কোম্পানি তাদের ব্যবসায় বুদ্ধি-তাড়িত হয়ে অজিতের নাম বাদ দেয়। রবীন্দ্রনাথ বলেন, তিনি অজিতের নাম লেখার নিচে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকাশক তার নাম বাদ দিয়েছে। তিনি এটিকে পশ্চিমের ‘দোকানদারী’ হিশাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন :

এখানকার সাহিত্য দরবারে প্রবেশ করা বিষম হাঙ্গাম।

নামগাম না থাকলে এরা সহজে জায়গা দিতে চান না। তবে কৈফিয়ত যা-ই হোক, এটি অনেকেই সুনজরে দেখেন নি। রবীন্দ্রনাথের পত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে অনেকে বলতে চেয়েছেন, অজিতের পাণ্ডুলিপি সংশোধন ও পুনর্লিখন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন নতুন কিছু করে ফেলেছিলেন তেমনি এই অনুবাদ কর্মের প্রতি তার একটি মোহ তৈরি হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে অজিতকুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠির প্রতি ইঙ্গিত করা যায় :

তোমার কবীর এতদিনে শেষ করেছি। আমি নিজে যদি আগাগোড়া তর্জমা করতুম তাহলে এর চেয়ে অনেক কম পরিশ্রম করতে হতো। অনেক কবিতাই আমাকে প্রায় পনের আনা লিখতে হয়েছে অথচ তালি দেবার ভাব রয়ে গেছে।

ম্যাকমিলানের কবীর প্রকাশের কৃতিত্ব প্রায় ষোলআনা রবীন্দ্রনাথের এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার স্নেহাষ্পদ যশোগ্রাহী অতিকুমারের নাম বর্জন অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি। তারা বলতে চেয়েছেন, অন্তত বরীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে অজিতের নামটিও যুক্ত হতে পারতো।

মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। এম.এ (বাংলা), ১৯৮৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখালেখি ঠিক রেখে কখনো সাংবাদিকতা, কখনো শিক্ষকতা; আর পাশাপাশি সমাজসেবা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), কাঁটাচামচ নির্বাচিত কবিতা (২০০৯), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১১), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), গ্রামকুট (২০১৫), কবিতামালা (২০১৫)।

প্রবন্ধ ও গবেষণা—
নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ-সাহিত্য (২০১১), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)।

গল্প-উপন্যাস—
মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬), মেমোরিয়াল ক্লাব।

শিশু সাহিত্য—
বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭)

সম্পাদনা—
বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০), জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩); পর্ব (সাহিত্য-চিন্তার কাগজ)

অনুবাদ—
অজিত কৌড়ের গল্প (২০১৬), মরক্কোর ঔপন্যাসিক ইউসুফ আমিনি এলালামির নোমাড লাভ এর বাংলা অনুবাদ ‘যাযাবর প্রেম’

ই-মেইল : mozidmahmud@yahoo.com
মজিদ মাহমুদ