হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
388
0

৮ম পর্বের লিংক

পর্ব-৯

অক্টোবরের শুরুর দিকে, গরমের দাপট যখন ধীরে ধীরে কমে আসছিল, যেসব জেলে মাছ শিকারে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে গিয়েছিল তারা দেখেছিল পাশাপাশি নোঙর করা ট্রলারের একটি বহর। কোস্টার জাহাজও ছিল তিনটি। জেলেদের মনে খটকা লাগে। এখানে সমুদ্র গভীর, কোনো ট্রলার বা জাহাজ নোঙর করার কথা নয়। সাধারণত করে না, করতে কখনো দেখা যায় না। ট্রলারগুলো হয়তো জেলেদের, কিন্তু কোস্টার জাহাজগুলো এল কোথা থেকে? এই ধরনের জাহাজ সাধারণত ঢাকা-চট্টগ্রাম নৌরুটে মালামাল পরিবহনে ব্যবহৃত হয়, গভীর সমুদ্রে খুব কমই দেখা যায়। কোথা থেকে এল জাহাজগুলো, কোথায় যাবে, এখানে নোঙর ফেলল কেন, তেল পুরিয়ে গেল, নাকি পথ হারিয়ে ফেলল―একটিতেও কোনো মানুষ ছিল না যে জিজ্ঞেস করে নেবে। যেন ভুতুড়ে জাহাজ, সাগরের তলদেশ থেকে মৃত তিমির মতো ভেসে উঠেছে। হয়তো মানুষ ছিল, জেলেরা ভয়ে কাছে যায়নি বলে দেখতে পায়নি। ভয়, কারণ, অপহরনের ঘটনা শুধু নাফ নদীতেই ঘটে না, এদিকেও ঘটে। কখনো জলদস্যু, কখনো বিজিপি হানা দিয়ে জেলেদের ধরে নিয়ে যায়। দস্যুরা দাবি করে মুক্তিপণ, বিজিপি চালান করে দেয় কারাগারে। জায়গাটা মিয়ানমারের জলসীমার কাছে, যে কোনো সময় বিপিজি হানা দিতে পারে। তা ছাড়া ট্রলার বা জাহাজগুলো তো দস্যুদেরও হতে পারে। কৌতুহল মেটাতে গিয়ে যদি বিপদে পড়ে!


মাছ নিয়ে তাদের কারবার। সমুদ্রে কত ট্রলার কত জাহাজ চলাচল করে, কোথাকার ট্রলার কোথায় গেল, কোনো পণ্য নিয়ে গেল, না ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে গেল, নাকি আবার অস্ত্র খালাস করে গেল, এত খোঁজ রাখার সময় কোথায়?


বহরে ট্রলার ছিল মোট আটটি। ধীরে ধীরে ট্রলারের সংখ্যা কমতে লাগল। আট দিন পর কমে থাকল পাঁচটি। তারও সাত দিন পর কমে গেল আরো চারটি। থাকল কেবল একটি ট্রলার এবং তিনটি জাহাজ। অক্টোবরের শেষের দিকে এসে দেখা গেল মাত্র একটি জাহাজ, আদিগন্ত অথৈ জলে একটা বিন্দুর মতো ভাসছে। জেলেদের মনের খটকাটা গভীর হয়। এভাবে একটি দুটি করে কোথায় গেল ট্রলারগুলো? খালি গেল, না কোনো পণ্য বোঝাই করে নিয়ে গেল? নেওয়ার মতো কী আছে? এদিকে তো কোনো ঘাট নেই, সেন্টমার্টিন এখান থেকে অন্তত দশ মাইল দূরে। ঘাট নেই তো নেওয়ার মতো কিছু নেই। তার মানে খালিই গেছে। নাকি আবার জলের অতলে তলিয়ে গেছে!

না, এসবের কিছুই জানে না জেলেরা। জানার কথাও নয়। মাছ নিয়ে তাদের কারবার। সমুদ্রে কত ট্রলার কত জাহাজ চলাচল করে, কোথাকার ট্রলার কোথায় গেল, কোনো পণ্য নিয়ে গেল, না ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে গেল, নাকি আবার অস্ত্র খালাস করে গেল, এত খোঁজ রাখার সময় কোথায়? জানে কেবল একজন, সিতারাবানু। সে সর্বজ্ঞ। এই বৃত্তান্তের কোনো ঘটনাই তার অজানা নয়। সে বলছে, আটটি ট্রলারে মানুষ ছিল, দুটি কোস্টার জাহাজেও মানুষ ছিল। সেই মানুষরা কোথা থেকে এসেছিল, গন্তব্য কোথায় এবং তাদের দেশ ও জাত পরিচয়ও তার অজানা নয়। কিন্তু জানলেই যে বলতে হবে এমন তো কোনো শর্ত নেই।

সিতারাবানু এই বৃত্তান্তের কথক, সে যা বলবে লেখক তাই লিখবে। সে যা বলেনি লেখক তা বানিয়ে লিখবে না। আটটি ট্রলার ও দুটি কোস্টার জাহাজে যাত্রী ছিল প্রায় সাড়ে সাত হাজার, এই তথ্য সিতারাবানুর। সর্বশেষ জাহাজটিতে যাত্রী আছে পাঁচ শ তিরাশি জন, এই তথ্যও সিতারাবানুর। সে যা হিসাব দিচ্ছে ঠিক তাই লেখা হচ্ছে। সংখ্যার কোনো গড়মিল নেই। সে হিসাব দিচ্ছে সর্বশেষ জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে বাঙালি আছে শ দেড়েক, বাকিরা রোহিঙ্গা। যাত্রীদের মধ্যে শিশু আছে, কিশোর আছে, তরুণ আছে, যুবকও আছে, বুড়োও আছে কয়েকজন। বয়স যাদের পঞ্চাশের বেশি নয়, অথচ দেখে মনে হয় ষাটের বেশি। সত্তুরও মনে হতে পারে। জীবনের সঙ্গে লড়তে লড়তে শরীরকে তারা বয়সের বৃত্তে রাখতে পারেনি। শিশু আর বুড়োদের আলাদা করলে সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র আঠারোজন। বাকি থাকে পাঁচ শ পঁয়ষট্টিজন। তাদের মধ্যে বয়সে কেউ তরুণ, কেউ যুবক। চল্লিশের বেশি নয় কারো বয়স। নারী-পুরুষ আলাদা করলে নারীর সংখ্যা দাঁড়াবে তেইশ। সব যাত্রীর বয়স আন্দাজ করা যায় কেবল নারীদের ছাড়া। পায়ের পাতা ও হাতের কব্জি দুটি বাদে সর্বাঙ্গ তাদের বোরকায় ঢাকা। শরীর যেন তাদের মণি-মুক্তায় গড়া। কাউকে দেখাতে নেই। দেখালে চুরি হয়ে যেতে পারে, ডাকাতি হয়ে যেতে পারে। শরীরের উদোম অংশটুকু দেখেই বয়স আন্দাজ করে নিতে হয়। আন্দাজে বলা যায় তেইশজনের মধ্যে যুবতীর সংখ্যা অন্তত পাঁচ, বয়স যাদের তিরিশের বেশি নয়। সাতজনও হতে পারে, বেশিও হতে পারে। তবে তা দশের কোটা ছাড়াবে না।


হাত দুটো বাড়িয়ে জুলফিকার বলল, ভাইজানের সফরও কি মালয়েশিয়ায়? কমল চমকে ওঠে। অন্ধকার রাতে টর্চের আলোয় ফণা তোলা সাপ দেখে পথিক যেভাবে চমকায়।


পাঁচ শ পঁচাত্তরজন যাত্রী নিয়ে, জাহাজিদের ভাষায় যারা আদম, সর্বশেষ কোস্টার জাহাজটি, অর্থাৎ এমভি সাউথ বেঙ্গল-৩, মালয়েশিয়ার উদ্দেশে নোঙর তোলার কথা ছিল অক্টোবরের আটাশ তারিখ ভোরে। কিন্তু রাতে জাহাজ-মাস্টারের মোবাইল ফোনে জরুরি খবর এল, কক্সবাজারের ইনানি থেকে একটি ট্রলার রওনা হয়েছে, যেটি পৌঁছতে পরদিন দুপুর হয়ে যাবে এবং ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। বাধ্য হয়ে যাত্রা বাতিল করল মাস্টার। কিন্তু দুপুরেও ট্রলারটি পৌঁছল না। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সূর্য যখন পাটে নামল আটজন আদম নিয়ে ট্রলারটি পৌঁছল।

জাহাজের আন্নিতে, হেজের ছাদে এবং দু-পাশের দুই গলিতে তখন বহু যাত্রী দাঁড়িয়ে। আশিজন হতে পারে, এক শ বা দেড়শজনও হতে পারে। কারো চোখে আনন্দ, কারো চোখে আতঙ্ক। কারো চোখ দূর সমুদ্রে, কারো চোখ সন্ধ্যার আকাশে উড়ন্ত পাখিদের দিকে, কারো-বা অস্তগামী সূর্যের দিকে। কেউ আলাপ করছিল, কেউ বিড়ি টানছিল। চোখে সানগ্লাস পরা এক তরুণ আন্নির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে মোবাইলে ছবি তুলছিল। সিঁড়ি বেয়ে আন্নিতে উঠে লিস্টার ইঞ্জিনের কাছে দেখতে মোড়ার মতো আলাত বাঁধার একটা মোটের ওপর বসল কমল, তার পাশে দাঁড়াল দীপঙ্কর। গভীর সমুদ্রে দূরযাত্রায় অপেক্ষমাণ জাহাজটিতে তোলার পর তারা এতটাই বিস্মিত, মুখ দিয়ে একটা কথাও সরছিল না। কেন তাদের এই জাহাজে তোলা হলো ভেবে কুল পাচ্ছিল না। জাহাজটির গন্তব্য কোথায়, কাউকে জিজ্ঞেস করার সাহসও পাচ্ছিল না।

সিঁড়ি বেয়ে আন্নিতে ওঠে জুলফিকার। এক হাতে তসবি জপতে জপতে আরেক হাত লম্বা দাড়িতে বুলাতে বুলাতে কমলের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। আড়চোখে বারবার তার মুখের দিকে তাকায়। হিন্দু না মুসলমান চেহারা দেখে বোঝার চেষ্টা করে। আচমকা চোখাচোখি হয়ে গেলে মুচকি হেসে সালাম না দিয়ে পারল না। কমল মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়। হাত দুটো বাড়িয়ে জুলফিকার বলল, ভাইজানের সফরও কি মালয়েশিয়ায়? কমল চমকে ওঠে। অন্ধকার রাতে টর্চের আলোয় ফণা তোলা সাপ দেখে পথিক যেভাবে চমকায়। চোখে আজন্মের বিস্ময় নিয়ে হাঁ-মুখে জুলফিকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাহাজটির গন্তব্য কোথায় বুঝতে তার দেরি হয় না। তবু নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করে―আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?
খোদা চাহে তো মালয়েশিয়া।
সবাই?
সেটা তো বলতে পারছি না ভাই। মালয়েশিয়া ছাড়া যাবে আর কই?
মাস্তুলের নিচে মাইক বেজে উঠল। হেজে নামার জন্য যাত্রীদের তাগাদা দেয় বাবুর্চি। একটু পর খাবার দেওয়া হবে। খেতে চাইলে সবাইকে নিচে নামতে হবে। কেউ উপরে থাকলে খাবার পাবে না।

জুলফিকার নেমে গেল। খাবারের কথা শুনে অন্যরাও ব্যস্ত হয়ে ওঠে। খিদার টান তাদের হেজে নামিয়ে আনে। সেই দুপরে একবার খাবার দেওয়া হয়েছে। ঠিক দুপুরেও নয়, বেলা এগারোটাকে তো আর দুপুর বলা চলে না। এক থালা ভাত, খানিকটা আলুভর্তা আর দু-চামচ ডাল―খাবার বলতে এই। পেটের অর্ধেকও ভরেনি। ওসমান ফিরতি এক থালা ভাত চেয়েছিল, বাবুর্চি ধমক দিয়ে বলেছে―জীবনে কোনোদিন ভাত চোখে দেখস নাই ব্যাটা? ওসমান ভড়কে যায়। খারাপ তো কিছু বলেনি, বাড়তি এক থালা ভাত চেয়েছে, তাতেই বাবুর্চির এমন ঝাড়ি! একবার তাকে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল―ভিক্ষা তো চাইছি না মিয়া, পেটে খিদা আছে তাই ভাত চাইছি। পেট ভরে ভাত খেতে না পেলে ষাট হাজার টাকা দিয়েছি কিসের জন্য? কিন্তু বাবুর্চির চেহারার দিকে তাকিয়ে বলার সাহস পায়নি। চেহারাটা মগ-চাকমাদের মতো, নাকটা বোঁচা, নেশাখোরের মতো লাল চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের ফোলা, কোটর থেকে যেন যে কোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে। আর শরীরখানা ঠিক রামগতি বাজারের রিকশার মহাজনের মতো। বপুটাও একই সাইজের। মাথায় তেলচিটচিটে বাবরি চুল। লুঙ্গির ওপর মলিন একটা গামছা পরে প্লাস্টিকের একটা চেয়ারে বসে থালায় থালায় ভাত বেড়ে দিচ্ছে। কতক্ষণ পর পর মুগুরের মতো বাঁ-হাতে নাক ঝাড়ছে, পাছায় হাতটা মুছে আবার পাতিল ধরছে। ঘৃণায় যাত্রীদের গা রি-রি করে, কিন্তু মুখে কেউ কিছু বলে না।


আবার বুঝি খেতে হবে হারাম কোনো পশুর মাংস! আবার বুঝি শুরু হবে নিষ্ঠুর নিপীড়ন! ভাবতে ভাবতে চেহারায় অপমানের ছাপটা মিলিয়ে আতঙ্কের ছাপ ভেসে ওঠে।


কে তাকে বলবে, খবরদার, ঐ ময়লা হাতে পাতিল ছুঁয়ো না। কার এত সাহস! কাউকে শায়েস্তা করার জন্য ঐ হাতের একটা ঘুষিই তো যথেষ্ট। তার সঙ্গে কথা বাড়িয়ে যেচে বিপদ ডেকে আনবে কেন ওসমান? এমনিতেই সব কিছু তার কাছে গোলমেলে ঠেকছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি এমন জীর্ণদশার একটা মালবাহী জাহাজে চড়ে তাকে বিদেশ যেতে হবে। সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথাটা প্রথম যেদিন ডাক্তারের মুখে শোনে তারপর থেকে জাহাজের যে ছবিটা কল্পনায় এঁকে নিয়েছিল, সাউথবেঙ্গল-৩-এ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কল্পনার সেই জাহাজটি সাগরে তলিয়ে গেল। গেল তো গেলই, কোনোভাবেই আর খুঁজে পাওয়া গেল না। সেন্টমার্টিন থেকে তাকে তুলে ট্রলারটি টানা পাঁচ ঘণ্টা চলার পর জাহাজটির কাছে পৌঁছে। সারা রাত জেগে থাকায় মাথা ব্যথা করছিল খুব, খিদাও লেগেছিল প্রচণ্ড। কিন্তু শোয়ার ব্যবস্থা কোথায়, খাবার কোথায় পাওয়া যাবে―জিজ্ঞেস করার মতো জাহাজের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না। সবাই তো আদম। তার মতোই তাদের দশা। জাহাজের পাছার দিকে তিনতলা কেবিনে জাহাজিরা আছে। তারা মোট এগারজন। একজন মাস্টার, দুজন করে সুকানি ও গ্রিজার, এক বাবুর্চি এবং পাঁচ লশকর। জুলফিকার এক লশকরের কাছে জানতে চেয়েছিল―নাস্তা কখন দেবে ভাই? লোকটা মুখ ঘুরিয়ে নিল। চেহারায় এমন একটা ভাব আনল কথাটি যেন শুনতে পায়নি, শুনলেও উত্তর দিতে যেন বাধ্য নয়। সঙ্কোচে নাস্তার প্রসঙ্গ এড়িয়ে জুলফিকার এবার জানতে চাইল―আচ্ছা ভাই, আমরা যে জাহাজে চড়ে যাব সেটা কি আরো দূরে?

এবার মুখ ফিরাল লোকটা। যেটুকু ফাঁক না করলেই নয় ঠোঁট দুটো ঠিক সেটুকু ফাঁক করে খনখনে গলায় বলল, কেন, এটা কি ঠেলাগাড়ি মনে হচ্ছে?
হে হে হে…। কী যে বলেন ভাই!
কী বলি?
না, বলছি যে এটা তো যাত্রীবাহী জাহাজ না।
তোমার ধারণা এই জাহাজে গরু-ছাগল আনা-নেওয়া হয়?
জুলফিকার উত্তর দেয় না। উত্তর দেওয়ার মতো কোনো কথা আসলে খুঁজে পায় না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে, তারপর হাসতে হাসতে বলে, কিছু মনে করবেন না, হায়দর ভাই আমাকে ফাইভ স্টার হোটেলের মতো জাহাজের কথা বলেছিল তো, তাই…।
এবার ক্ষেপে উঠল লোকটা। চোখের কোণা দুটো কুঁচকিয়ে, ঠোঁট দুটো যতটা পারে চ্যাপ্টা করে কণ্ঠস্বর বিকৃত করে বলল, এঁহ্‌, ফাইভ স্টার হোটেল! ঘরে ভাতের পাতিল আছে ব্যাটা?
এটা কেমন কথা ভাই!
চুপ! হুজুর মানুষ এত কথা বলিস কেন?

জুলফিকারের মুখটা মলিন হয়ে গেল। তার মতো এমন একজন আলেমকে তুই-তোকারি করায় কয়েকজন যাত্রী হৈহৈ করে উঠলে সিঁড়ি বেয়ে কেবিনের দোতলায় উঠে গেল লোকটা। হেজের গলিতে গিয়ে দেওয়ানি হলের ওপর হাত রেখে দূর সমুদ্রে তাকায় জুলফিকার। খুব চোট পেয়েছে মনে। বিদেশের কথা আলাদা, দেশে ফেরার পর কেউ কোনোদিন তার সঙ্গে আঙুল তুলে কথা বলেনি, মসজিদের ইমাম হিশেবে কমবেশি সবাই ইজ্জত-সম্মান দিয়েছে, অথচ বয়সে তার চেয়ে অন্তত দশ বছরের ছোট জাহাজের আদনা একজন লশকর কিনা তার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করল! আপমানে সে দমে যেতে থাকে। দমতে দমতে, দূর সমুদ্রে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, গাঙচিলদের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে হঠাৎ টের পায় বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। কেন কাঁপছে? ঠান্ডা বাতাসে, নাকি ভয়ে? ঠিক বুঝতে পারে না। লোকটার দুর্ব্যবহার তাকে গুয়ান্তানামোর স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, বুদ্বুদের মতো ভেসে উঠছে দুঃসহ সেসব দিনের স্মৃতি। ভাবে, আবার বুঝি তেমন কোনো কারাগারে বন্দী হতে যাচ্ছে! আবার বুঝি খেতে হবে হারাম কোনো পশুর মাংস! আবার বুঝি শুরু হবে নিষ্ঠুর নিপীড়ন! ভাবতে ভাবতে চেহারায় অপমানের ছাপটা মিলিয়ে আতঙ্কের ছাপ ভেসে ওঠে। মাথার ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগে, বুকের কাঁপুনিটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মনে হয় শক্ত কোনো হাত এখুনি বুকটা চেপে ধরবে। চোখ বন্ধ করে সে বসে পড়ে। বসে বসে কাঁদে। কাঁদে আর বলে, মাবুদ, আমি তোমার নাফারমান বান্দা, সমস্ত গুনাখাতা মাফ করো আমার। তুমি হেফাজত করো আমাকে, মাবুদ।

১০ পর্বের লিংক

 

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)