হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
741
0

৫ম পর্বের লিংক

পর্ব-৬

.
সবাই যখন তার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, হঠাৎ একদিন বিরাট একটা লাগেজ নিয়ে হাজির! স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে বউ তো আত্মহারা। তার নিভু নিভু যৌবনে আবার জোয়ার এল। সারা বাড়িতে উৎসব লেগে গেল। কিন্তু কোথায় ছিল জামাই এতদিন? বিদেশ ছাড়া আর কোথায়। বাপের রেখে যাওয়া জমির যে টকুরোটা তার ভাগে জুটেছিল সেটি বেচে বিদেশ চলে গিয়েছিল। ছ মাসের ছুটিতে এসেছে, ছুটি ফুরালে আবার ফিরে যাবে। ছ মাস পর সত্যি সত্যি ফিরে গেল। দু-বছর পর আবার এল। এখনো সেই আসা-যাওয়ার মধ্যেই আছে। সংসারে এখন তার ছেলেমেয়ে এসেছে। বড় মেয়েটার বয়স সাত, ছোটটার তিন। একটা ছেলে হলে সন্তানাদি আর নেবে না। বেশি দিন আর বিদেশ থাকার ইচ্ছে নেই। শ্বশুরের ভিটায় একটা ঘর তুলে বিবি-বাচ্চা নিয়ে বাকি জীবনটা শ্বশুরের দেশেই কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছা।

সেদিন মওকা বুঝে তার কাছে নিজের হালহকিকত খুলে বলল জুলফিকার, কোনো কিছুই গোপন করল না। মনসুর শোনে আর মাথা দোলায়। মাথা দোলায় আর সমবেদনাসুলভ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। জুলফিকারে এসব দুঃখের কথা যেন সে আগে থেকেই জানে―মাথার দুলুনিতে তা-ই প্রকাশিত হয়। জুলফিকার বলল, আচ্ছা, ছোট ভাইটার জন্য একটা ভিসার ব্যবস্থা কি করা যায় না ভাই?
ভিসা! ভূত দেখার মতো চোখ বড় বড় করে মনসুর বিস্ময় প্রকাশ করে―সৌদির ভিসা তো ভাই মেলা দিন ধরে বন্ধ। বোঝেন না, সরকার যা শুরু করেছে…। এই সরকারের ওপর সৌদি সরকার খুব নাখোশ, বুঝলেন? কিছুতেই ভিসা ছাড়ছে না। কবে ছাড়বে আল্লামালুম।

জুলফিকারের হাসিমুখটা মলিন হয়ে যায়। সেদিন খুতবা পড়ার সময় যে বুদ্ধিটা মাথায় এসেছিল সেটি বলবে কিনা ভাবে। এক মন বলে, বলো। নিশ্চয়ই ব্যবস্থা একটা করে দিতে পারবে মনসুর। আরেক মন বলে, না। কেননা তুমি মসজিদের ইমাম। মানে রাহবার। পথপ্রদর্শক। মুসল্লিদের তুমি হেদায়েতের পথ দেখাবে। অবৈধভাবে তোমার সৌদি যাওয়ার কথাটা যদি তাদের কানে যায় তাতে তোমার ইমামতি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যেতে পারে।

মনসুরের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মন বুঝে ওঠার চেষ্টা করে জুলফিকার। নানা কথার পর মনের মধ্যে ঘুরতে থাকা কথাটা বলেই ফেলল―আচ্ছা ভাই, ওমরা-ভিসা নিয়া তো অনেকে যাচ্ছে, তাই না?
কিন্তু ভাই, মনসুর বলে, ওমরা-ভিসায় গিয়ে তো কেউ সুবিধা করতে পারছে না। ধরে ধরে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। নাহ্, মনসুর মাথা দোলায়, সৌদিতে কিছু সুবিধা করতে পারবেন না ভাই, আপনি বরং অন্য কোনো দেশে ট্রাই করুন। দরকার হলে আমি সহযোগিতা করব।


শয়ে শয়ে লোক এখন মালয়েশিয়া যাচ্ছে, ভালো বেতনের চাকরি পাচ্ছে। মালয়েশিয়া ছাড়া যাওয়ার মতো এখন আছে কোনো দেশ?


সহযোগিতা করবে মনসুর! কান্নাটা আবার উথলে উঠতে চায় জুলফিকারের। খোদা সত্যি তবে তার দিকে মুখ ফিরিয়েছেন! নইলে প্রায় অজানা-অচেনা লোকটা, যার সঙ্গে সম্পর্ক কেবল ইমাম-মোকতাদির, কেন তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছে! সবই খোদার ইশারা। সত্যি তিনি তার পেয়ারা বান্দাদের বড় বড় মুসিবতের মধ্যে ফেলে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় পাস করলে তারপর রহমতের হাত বাড়িয়ে দেন। সেও এতদিন পরীক্ষার মধ্যে ছিল। তার মন বলছে পরীক্ষায় সে পাস করেছে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের একটা স্বপ্নছায়া তার চেহারায় খেলা করতে থাকে। আবেগ সামলিয়ে বলে, আপনিই বলুন ভাই, কী করব আমি। দেশে আর একটা দিনও থাকতে ইচ্ছে করছে না। বিদেশের ব্যাপারে আপনার জানাশোনা আছে, কোন দেশে গেলে ভালো হয়? কী বোঝেন?
মালয়েশিয়া ছাড়া কোন দেশে আবার? শয়ে শয়ে লোক এখন মালয়েশিয়া যাচ্ছে, ভালো বেতনের চাকরি পাচ্ছে। মালয়েশিয়া ছাড়া যাওয়ার মতো এখন আছে কোনো দেশ? দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে বলল মনসুর।

টেকনাফের শাহপরীর জেটিঘাটে অপেক্ষমাণ ট্রলারে উঠে দু-রাকাত নামাজ পড়ে পাক-মাবুদের শুকরিয়া আদায় করল জুলফিকার। মুনাজাত ধরে সৌদি-প্রবাসী মনসুর ওরফে জামাইর জন্য খাস দোয়া করল। তার সহযোগিতা না পেলে হায়দর আলীর খোঁজ সে কোনোদিনও পেত না, সে-ই হায়দরের ঠিকানা ও ফোন নম্বর জোগাড় করে দিয়েছে। মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যাপারে হায়দরের সঙ্গে আলাপ করতে দুবার চট্টগ্রামে যাতায়াত ভাড়াটা পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই যে এখন সে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছে, এজন্য আপাতত একটা টাকাও দিতে হচ্ছে না হায়দরকে। দিতে হবে পরে, মালয়েশিয়া পৌঁছে চাকরি-বাকরি করে টাকা-পয়সা হাতে এলে। টাকা অগ্রিম চেয়েছিল হায়দর, কিন্তু অগ্রিম দেয়ার ক্ষমতা জুলফিকারের নেই বুঝে বাকিতে রাজি হয়। বলে যে, জুলফিকার হুজুর মানুষ, তার উপকার করতে পারলে আল্লা খুশি হবে। কিন্তু টাকা দেয়ার জন্য হায়দরকে পাবে কোথায় জুলফিকার? হায়দর বলেছে, সেটা কোনো সমস্যা নয়। তাকে পাওয়ার দরকার কী, মালয়েশিয়ায় তার পরিচিতি অনেক লোকজন আছে। তার চাচাতো ভাইও আছে দুজন। টাকা তাদের কাছে দিলেই সে পেয়ে যাবে।

মনসুরের প্রতি তো বটেই, হায়দরের প্রতিও কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না জুলফিকারের। কত বড় উপকারই না করছে হায়দর! মায়ের পেটের ভাইও তো এতটা করে না। সত্তুর হাজার টাকার দায় নিজের মাথায় নিয়ে তাকে সে মালয়েশিয়া পাঠাচ্ছে। ভালো মানুষ তবে দুনিয়ায় এখনো আছে! সবই আসলে খোদার ইশারা। তার ইশারায় মনসুরের মনে দয়া জেগেছে, সেই দয়া প্রবাহিত হয়েছে হায়দরের মনেও। নিজের এলেম ও আমলের কথা ভেবে গর্ববোধ করে জুলফিকার। সে একজন দ্বীনদার আলেম বলেই তো এই দুজন মানুষ, যাদের সঙ্গে তার আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই, ঠিকমতো যাদের চেনেও না, তার প্রতি এতটা সদয়। সে যদি অশিক্ষিত ভোটবাঙাল হতো, এত সহজে কারো সহযোগিতা কোনোদিনই পেত না। পৃথিবীতে কে কার!


ফারাক অবশ্য আরো একটা আছে, পশু হস্তমৈথুন করতে পারে না, সে পারে।


কিন্তু ট্রলার নোঙর তোলার আগে হায়দরের মুখোশটা খসে পড়ায় জুলফিকার চমকে ওঠে। রীতিমতো ভয় পেয়ে যায়। হায়দর কেন জোর করে মঈনকে ট্রলারে তুলল ভেবে পায় না। তালেবের বন্ধু মঈন। জুলফিকারের সহযাত্রীদের একজন তালেব, যে নগদ আশি হাজার টাকা হায়দরকে দিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্রযাত্রা করেছে। প্যান্ট-শার্ট পরা ক্লিনশেভ করা দেখতে আপদমস্তক একজন সাহেবের মতো তালেবকে দেখে কারো বোঝার উপায় নেই ভেতরটা তার মুলিবাঁশের মতো কতটা ফাঁপা। অলস, অকর্মা, ফাঁকিবাজ শব্দগুলো আবিষ্কার হয়েছে মূলত তার জন্যই। দেখতে মোটামুটি সে মানুষের মতো, কিন্তু তার এবং একটা পশুর মধ্যে বিশেষ কোনো ফারাক নেই। সে খায়, পশুও খায়, সে হাগে, পশুও হাগে, সে হাঁটে, পশুও হাঁটে, সে ঘুমায়, পশুও ঘুমায়। ফারাক শুধু এটুকু―পশু মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না, সে পারে। ফারাক অবশ্য আরো একটা আছে, পশু হস্তমৈথুন করতে পারে না, সে পারে।

শিক্ষার বাম্পার ফলনের এই যুগে তালেবের মতো একজন তরুণের, সিনেমার নায়কের মতো যার চেহারা, নিজের নামটা লিখতে কলম ভেঙে যায়, একথা কে বিশ্বাস করবে! মাঝেমধ্যে তারও বিশ্বাস হয় না। তার বন্ধুবান্ধব সবাই কমবেশি লিখতে-পড়তে জানে। তার ঘুমটি দোকানি বন্ধু মঈনউদ্দিনও যখন টালিখাতায় বাকির হিসাব লেখে অথবা তার সাংবাদিক বন্ধুটি যখন চোখের সামনে চৌদ্দ পাতার দৈনিকটি মেলে ধরে, তখন সে নিজের দিকে তাকায়, চোখ বন্ধ করে নিজের গভীরে ডুব দেয়। ডুব দিয়ে দেখতে পায় লেখাপড়া শেখার সময়টা সে কী হেলায় পার করে দিয়েছে। রেলওয়ের চাকরি ছিল তার বাবার। বদলির চাকরি। মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকত। এই সুযোগটাই সে কাজে লাগায়। স্কুলে তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল, কিন্তু দুদিন ক্লাস করে তৃতীয় দিন এক কোঁচা কটকটির বিনিময়ে ফেরিওয়ালাকে বইগুলো দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরল।

কি ব্যাপার, বই কই? তার মা জিজ্ঞেস করে।
উত্তর তো তার জিবের ডগাতেই রাখা ছিল, সঙ্গে সঙ্গেই বের করে দিল―কই আবার, খাল পার হওয়ার সময় পা ফসকে সাঁকো থেকে পড়ে গেলে বই আস্ত থাকে! বলতে বলতে সে চোখ মোছে। চোখে মোছে আর বইগুলোর জন্য আফসোস করে, আহারে, বইয়ের গন্ধটাও ঠিকমতো শোঁকা হলো না, পাতায় পাতায় সুন্দর সুন্দর ছবিগুলোও ঠিকমতো দেখা হলো না, পানিতে পড়ে সবকটি বই কিনা বরবাদ হয়ে গেল!

তার মা কী আর করে, পরদিন বড় ছেলেকে পাঠিয়ে দিল হেড মাস্টারের কাছে। কিন্তু বই আবার কিছুতেই দেবে না মাস্টার, তার এক কথা। শুনে তো তালেবের মনে খুশি ধরে না। এমন ভালো মাস্টারও তবে জগতে আছে! পারলে তো সে মাস্টারের পা ছুঁয়ে সালাম করে। খুশির চোটে লুঙ্গিটা মাথায় বেঁধে নদী সাঁতরে সোজা চলে গেল আখক্ষেতে, মঈনের মতো গ্রামের দস্যি ছেলেরা যেখানে আখ চুরি করে আরাম করে বাঁদরের মতো বসে বসে চিবুচ্ছে।

দড়িছাড়া বলদের মতো আখক্ষেতে ধানক্ষেতে ঘুরতে ঘুরতে আর আম জাম লিচু কাঁঠালগাছের ডালে ডালে কাঠবিড়ালের মতো লাফাতে লাফাতে তার নাকের নিচে রোম গজাল। আর কি বেকার বসে থাকা যায়! সীমান্তের কাছে তার বাড়ি, ঘরে বসে হাঁক দিলে ওপারে বিএসএফের টহলপার্টি শুনতে পায়। রোম গজিয়েছে মানে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার বয়স হয়েছে। ট্রেনের ছাদে চড়ে ঠিকঠাকমতো জেলাশহরে যেতে পারবে এবং ঠিকঠাকমতো ফিরিয়েও আসতে পারবে। বয়স হয়েছে, আর তো ভূত-প্রেতেরও ভয় নেই। রাতের অন্ধকারে, মানুষ আর পশুপক্ষী যখন নিশাঘুমে, একটা ঘরেও যখন আর কুপি জ্বলে না, তখন, পেনসিডিলের বস্তাটা মাথায় নিয়ে গঞ্জের বাস স্টেশনে চলে যেতে পারবে। সামনে বিডিআর-পুলিশ পড়ে গেলে কোনো সমস্যা নেই, তার দিকে তারা ভুলেও তাকাবে না। কেন তাকাবে? সপ্তায় সপ্তায় তারা হাজার হাজার টাকা কমিশন নেয় কিসের জন্য? উপরের চাপে কোনোদিন তাকে ধরেটরে ফেললেও তাকে ছাড়িয়ে আনার মতো লোকের অভাব নেই। ছাড়া না পেলেও কোনো অসুবিধা নেই, জেলের কষ্ট সহ্য করার মতো বয়স তো তার হয়েছে। অতএব বসে থাকা চলবে না। বাপের টাকায় কদিন? একদিন না একদিন রোজগার তো করতেই হবে। যত আগে শুরু করা যায় ততই উত্তম। কাজের কোনো অভাব নেই। গোপনে একজন চোরাকারবারীর সঙ্গে দেখা করে শুধু বলো তুমি তার বেগার খাটতে চাও। ব্যাস, হয়ে গেল। টাকা-পয়সা নিয়ে তোমার আর কোনো চিন্তা নেই।


কিছু না বাইঞ্চোত! এত রাতে যাস কোথায়?


টানা তিন বছর রাতের আঁধারে সীমান্তের এপার-ওপার করেছে তালেব, বিএসএফ তো দূরের কথা, সামনে কোনোদিন চকিদারও পড়ে নি। বিডিআর-পুলিশ তো নয়ই। মালের বস্তাটা মাথায় বয়ে গ্রামের পুবের সীমানায় প্রান্তরের আলপথ ধরে, যে পথে কুকুর-বিড়ালেরও চলাচল নেই, জায়গামতো পৌঁছে দিয়েছে। মাত্রা কয়েক ঘণ্টার শ্রমের বিনিময়ে পেয়ে গেছে এক শ টাকার কচকচে একটা নোট। অথচ গ্রামে তারই বয়সী ছেলেটা, যে মাটি কাটে, কামলা খাটে, রিকশা চালায় অথবা বাসের হেলপারি করে, যেমন মঈন, বলদের মতো ক্ষেতেখামারে খাটতে খাটতে যার পায়ের বুড়ো আঙুল দুটোয় পচন ধরেছে, সারাদিন খেটেও ঠিকমতো একশ টাকা রুজি করতে পারে না। সুতরাং তার মতো আরামে আর কে আছে! খায়, ঘুমায়, আড্ডাবাজি করে আর নিশিরাতে বাদুড়ের মতো সীমান্তের দিকে উড়াল মারে।

কিন্তু সব দিন কি আর সমান যায়! একদিন ফকফকা রোদ থাকলে পরদিন আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টি নামবে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসও আসবে―পৃথিবীর চিরায়ত নিয়ম এই। চন্দ্র-সূর্য ছাড়া কোনো কিছুই অপরিবর্তিত থাকে না। তালেবের আরামের দিনগুলোও অপরিবর্তিত থাকল না। শেষরাতে মালের বস্তাটা মাথায় বয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রান্তরটা পেরিয়ে জনপদে ঢুকে ঘুমন্ত মানুষদের নাক ডাকার শব্দ শুনতে শুনতে গঞ্জের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে হঠাৎ তার মুখে টর্চের আলো পড়ল। চমকে উঠল সে, ঠাটা পড়লে মানুষ যেভাবে চমকে ওঠে। চোখ ঝলসানো আলোয় সে পথ ঠাওর করতে পারে না।
কে? ভয়ার্ত কণ্ঠ তার।
মাথায় কী?
জি?
আরে বেটা তোর মাথায় কী?
জি না, কিছু না।
কিছু না বাইঞ্চোত! এত রাতে যাস কোথায়?

তালেব উত্তর দিতে পারে না। রক্ত হিম হওয়া ধরে, মাথার বোঝাটাকে দ্বিগুণ ভারী মনে হতে থাকে। মাল নেওয়ার সময় চোখের ওপর বিডিআরের টহলপার্টির টর্চের আলো এর আগেও পড়েছে, তবে পড়া মাত্রই সরে গেছে, মেঘলা আকাশে বিদ্যুৎ চমকের মতো। অথচ আজ আলোটা সরছেই না। নিশ্চয়ই তবে হেডকোয়ার্টার থেকে স্পেশাল এসেছে!
মাথার বস্তাটা চট করে পায়ের কাছে নামিয়ে শেয়ালের মতো দিল ভোঁ দৌড়। ঠ্যাং দুটো আর দেখা যায় না। কিন্তু দৌঁড়ে পালাবে কোথায়? অন্ধকার হলে কী হবে, গাছগাছড়ার আড়ালে সেপাইরা আগে থেকে বাঘের মতো ঘাপটি মেরে থাকে নি, তারা কি এত বোকা!

একটার জায়গায় তিনটা উকিল দাঁড় করিয়েও, ‘মাননীয় আদালত, আমার মক্কেল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার, সম্পূর্ণ নির্দোষ, সব পুলিশী ষড়যন্ত্র’―উকিলরা তার পক্ষে এ ধরনের বহু সাফাই গাওয়ার পরও আদালত তার জামিন মঞ্জুর করল না। অতএব সোজা লালঘরে। জীবনে প্রথমবারের মতো জেলখানায় এসে তার হাল তো একেবারে বেহাল। বন্দিরা জেলখানায় এত কষ্ট করে তার ধারণাতেই ছিল না। সে না পারে ঘুমাতে, না পারে খেতে। ঠিকমতো পায়খানা-পেশাব এবং গোসলটাও করতে পারে না। বয়স কম, দাড়ি-গোঁফ ঠিকমতো এখনো খসখসে হয় নি, তাই রাতের বেলায় লম্পট কয়েদিরা তার পেছনে কার্তিক মাসের কুকুরের মতো লেগে থাকে।


বুঝলা মিয়া, আইন-আদালত সবই বেটালোকের জন্য। ভয় পেয়ে মেয়েলোকের মতো চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকলে চলবে?


এক মাস কেটে গেল, জামিন হলো না। তিন মাস গড়িয়ে গেল, তবুও না। স্মাগলিং কেইসের জামিন কি এত সোজা! চাইল আর অমনি হয়ে গেল! চার মাসের মাথায় ঝানু এক উকিলের মাধ্যমে জর্জকোর্টে মামলা বদলি করিয়ে জামিন চাইল, তবু পেল না। কিন্তু জামিন তার চাই, যে করেই হোক। সত্বর জামিন না পেলে বেঁচে থাকার কোনো আশা নেই, এমনই দুরাবস্থা তার।

ভাগ্য ভালো, দশ দিন পর জর্জকোর্টে দ্বিতীয় বার আবেদন করলে জামিন মঞ্জুর হলো। ছাড়া পেয়ে সে তওবা করল, আর যাই করুক, জীবনে কোনোদিন আর চোরাকারবারে জড়াবে না। কিন্তু তওবা করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? মাসে দু-বার কোর্টে গিয়ে মামলার হাজিরা দিতে হয়। যাতায়াতে দুইশ টাকায়ও কুলায় না। দুপুরে তো আর উপাস থাকা যায় না, হোটেলে খেতে বসলে সত্তুর-আশি টাকা খসে যায়। উকিল-মুহুরির টাকা তো আছেই। মাসে অন্তত হাজার টাকা মামলার পেছনে চলে যায়। এত টাকা সে পাবে কোথায়? ক-টাকা বেতন পায় তার বাপ? সংসার চালাতেই তো তার অবস্থা কাহিল, ছেলের মামলার খরচ দেবে কোত্থেকে? খরচ যে একেবারে দেয়নি তা তো নয়। চারটা মাস সে জেলে ছিল, খরচ না দিলে উকিল-মুহুরিরা মামলা লড়লো কেমন করে? কোন উকিল কোথায় মুফতে কাজ করেছে?

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাপ তার সাফ সাফ বলে দিয়েছে একটা টাকাও তার পেছনে আর খরচ করতে পারবে না, তার জেল-ফাঁসি যা-ই হোক। কী আর করে সে, ধারকর্য করে কয়েক মাস চলল। কিন্তু কত ধার করা যায়। মানুষ কি তাকে ধার দেওয়ার জন্য টাকার বস্তা নিয়ে বসে আছে? গ্রামের মানুষ কারুনের কুটুম্ব একেকটা, মাথায় সাতবার মুগুর মারলেও সহজে এক টাকা খসানো যায় না।

যার বেগার খাটতে গিয়ে ধরা খেল একদিন সে বলল, বসে থেকে কী লাভ? স্মাগলিং আছে বলেই তো এত বিডিআর, এত পুলিশ। রাতভর তারা সীমান্ত পাহারা দেয় কেন, স্মাগলিং ঠেকাতেই তো, নাকি? তুমি এটাকে অপরাধ বলতে পারো। কিন্তু অপরাধ আছে বলেই তো এত এত পুলিশ-বিডিআর। অপরাধ না থাকলে তো করার মতো তাদের কোনো কাজ থাকবে না। মানুষ আইন ভাঙে বলেই তো আইন রক্ষার জন্য পুলিশ-বিডিআরের দরকার হয়। সুতরাং লেগে পড়ো আবার। মামলা-মোকদ্দামা তো থাকবেই, থাকতে হয়। নইলে তুমি পুরুষ কিসের? পুলিশ যে রোজ রোজ এত এত আসামি ধরে, কোর্টে যে এত এত আসামি হাজিরা দেয়, তার মধ্যে কটা মেয়েলোক? বুঝলা মিয়া, আইন-আদালত সবই বেটালোকের জন্য। ভয় পেয়ে মেয়েলোকের মতো চুড়ি পরে ঘরে বসে থাকলে চলবে?

৭ম পর্বের লিংক

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)