হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
306
0
৩য় পর্বের লিংক

পর্ব-৪

রোজ সন্ধ্যায় হাটের চা-দোকানে বসলে এসব কথা ওসমানের বাপের কানেও আসে। এসব কথা তার স্বপ্নের মতো মনে হয়। মনে আফসোস জাগে। বয়স হয়েছে তার, নইলে সেও ডাক্তারকে ধরে বিদেশ চলে যেতে পারত। তারুণ্যে একবার অবশ্য হাঁটাপথে করাচি যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তখন দলে দলে মানুষ করাচি শহর যাচ্ছে, কাড়ি কাড়ি টাকা রোজগার করে বাড়িতে পাঠাচ্ছে। নসিব খারাপ তার, ইন্ডিয়ার বর্ডারে বিএসএফের হাতে ধরা খেয়ে পাঁচ মাস জেল খেটে আবার দেশে ফেরত এসেছে। জেলের সেই দুর্ভোগের কথা মনে পড়লে এখনো তার ভয় করে। কতদিন আগের কথা, জেলখানার সেই দিনগুলোর ভয় এখনো মন থেকে মোছে নি। জেলের নাম শুনলে এখনো কলিজাটা শুকিয়ে যায়, বুকটা ধপধপ করে। বাইরে উপোস থেকে মরতে রাজি, তবু জেলে যেতে রাজি নয়। জেলের ভয়ে সারা জীবন থানা-পুলিশ এড়িয়ে চলেছে, বাকি জীবনটাও চলবে। পুলিশ মানে মামলা, আর মামলা মানেই জেল। মামলার ভয়ে কারো সঙ্গে কখনো বিবাদে জড়ায় না। কেউ নটির পুত গালি দিলেও গালিটা থুথুর সঙ্গে গিলে ফেলে। গালিই তো, জেল তো নয়। সেদিন দোকানে বসে কড়া লিকারের দুধ-চা খেতে খেতে তার মাথায় হঠাৎ বুদ্ধিটা এল। বিদেশে যাওয়ার মতো তার বয়স নেই তাতে কী, তার বেটার তো আছে। দেশগ্রামে কত কষ্ট করছে ছেলেটা, রিকশা টানতে টানতে শরীর আর শরীরের জায়গায় নেই। ডাক্তারকে ধরে কোনোভাবে তাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিতে পারলে তার কপাল তো খুলবেই, সেই সঙ্গে বাপ হিসেবে তার কপাল খুলে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। বিদেশ মানে টাকা। হাজার হাজার টাকা। মাসে যদি তার নামে হাজারখানেক টাকাও পাঠায়, তাই-বা কম কি?

হঠাৎ পাওয়া বুদ্ধিটার উৎপাতে চায়ের কাপ খালি না করেই সে বাড়ি ফিরল। বউয়ের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে গোপনে আলাপ করতে বসল। কিন্তু বউ তার কথা ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিল―ফকিরের বেটার আবার বিদেশ! এত টাকা সে পাবে কোথায়? তিন তিনটা লেদাগেদা তার ঘরে, দিনে একেকটা আধাসের চালের ভাত খায়। তারা না থাকলে বউটাকে তালাক দিয়ে কিছু যৌতুক নিয়ে বেটাকে আরেকটা বিয়ে করিয়ে গতি একটা করা যেত। সেই সুযোগ তো এখন আর নেই। জেগে জেগে খামোখা স্বপ্ন দেখে কী লাভ?
ওসমানের বাপ বলে, স্বপ্ন নয় রে বউ স্বপ্ন নয়। আমার মন কইছে টাকার ব্যবস্থা একটা হবেই।
টাকার ব্যবস্থা হবেই! ওসমানের মায়ের চোখ আর জায়গা মতো থাকে না। বলে কী ওসমানের বাপ! এত টাকা সে পাবে কোথায়! পঁচিশ হাজার টাকা কি বাড়ির কাছের কথা!
হ্যাঁ, বাড়ির কাছের কথাই। বাড়ির পেছনে পতিত ভিটাটা, যেটার দলিল-পর্চার কোনো হদিস নেই, কোনো কাজেই তো আসে না। উঁচু বলে চাষাবাদ করা যায় না। বছরের ছ মাস পানিতে ডুবে থাকে, বাকি ছ মাস শুকিয়ে ঠনঠন। এখন তো জমির দাম বেড়েছে, অন্তত ষাট-সত্তুর হাজারে বেচা যাবে। কিন্তু ওসমানের মায়ের তাতে ঘোর আপত্তি। বিয়ের পর মোহরানা বলতে কিছু সে পায় নি। ওসমানের বাপ আজ চক্ষু বুজলে কাল সে পথের ভিখারিনি। দিনকাল যা পড়েছে, ছেলেরা মায়ের দেখাশোনা করবে এ দুরাশা। বাপ মরার পর ছেলেরা চল্লিশার অপেক্ষাও করবে না, বাড়ি ভাগ-বাটোয়ারার জন্য সালিস ডেকে আনবে। তার বহুদিনের স্বপ্ন ভিটাটা ওসমানের বাপের কাছ থেকে নিজের নামে লিখিয়ে নেবে, যদিও কথাটা তাকে বলার মতো সুযোগ কখনো পায় নি।

বউয়ের চোখ দেখে তার মনের কথা টের পায় ওসমানের বাপ। বলে, শোনো বউ, বেটা আমার একবার যদি বিদেশের মাটিতে পা রাখে, এরকম গণ্ডায় গণ্ডায় ভিটা তখন কেনা যাবে। ওসমানের মা আর কথা বাড়ায় না। কেন বাড়াবে? কথা তো অযৌক্তিক কিছু বলছে না ওসমানের বাপ। ওসমানের একটা গতি হলে তার ছোট ভাইদের নিয়েও আর চিন্তা থাকবে না। ঠিকঠাক মতো ওসমান যদি বিদেশ পৌঁছে যেতে পারে ভাইবোনের কথা কি ভুলে যাবে? সে টাকা পাঠাতে শুরু করলে কিছু টাকা জমিয়ে ডাক্তারকে ধরে ছোট ছেলেটাকেও যদি পাঠিয়ে দেওয়া যায় তখন তাকে আর পায় কে! সে হবে রাজমাতা। সেগুনকাঠের খাটে পায়ের ওপর পা তুলে বসে বসে সুগন্ধি জর্দা দিয়ে খিলি খিলি পান খাবে আর ছেলেদের জন্য নামাজ পড়ে মন ভরে দোয়া করবে।

ওসমান বুঝল, যত যাই হোক, বাবা-মা কোনোদিন পর হয় না। সাময়িক দূরে ঠেলে দিলেও সময়মতো ঠিকই সন্তানকে বুকে টেনে নেয়। গত সাত বছরে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার যে দূরত্বটা তৈরি হয়েছিল ধীরে ধীরে তা কেটে যেতে লাগল। এখন আর হাট থেকে বাড়ি ফেরার সময় মায়ের জন্য পোয়া বিড়া পান, এক হালি কাঁচা সুপারি, নিদেনপক্ষে দু-টাকার সাদাপাতা আনতে ভুল করে না। ওসমানের বউও শাশুড়িকে সরাক্ষণ ‘আম্মা আম্মা’ ডাকতে ডাকতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। সংসারে এত সুখ দেখে ওসমানের বাপ ডাক্তারের হাত ধরে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল, টাকাটা রাখেন ভাই। যেটুকু সম্বল ছিল বেচে দিলাম। ছেলেটাকে আপনার হাতে সোপর্দ করলাম। খোদা আপনার হায়াত দরাজ করুক। কেবল ওসমানের বাপের একার নয়, এরকম দোয়া গ্রামের আরো অনেকের কাছ থেকে পেয়েছে ডাক্তার। গ্রামের মোড়ল-মাতবরদের সাক্ষী রেখে আশপাশের তিন গ্রামের আরো সাত যুবক ষাট হাজার করে চার লাখ বিশ হাজার টাকা তার হাতে তুলে দিয়েছে। টাকা নিয়ে একদিন সে চট্টগ্রাম চলে গেল। সপ্তাহখানেক পর ফিরে সবাইকে মালয়েশিয়া যাত্রার দিন-তারিখ জানিয়ে দিল। প্রথম দফায় যাবে তিনজন, বাকি পাঁচজন যাবে পরের দফায়। সারা দেশ থেকে লোক যাচ্ছে, এক জাহাজে তো কুলাবে না, তাই ধাপে ধাপে যেতে হবে।


কিন্তু সেদিন সেন্টমার্টিন সৈকত থেকে ট্রলারে চড়ে পাটাতনের মাঝখানে পুলিশের প্যাঁদানি খাওয়া খুনের আসামির মতো ওসমান যখন গুটিসুটি মেরে বসল তখনই তার খটকা লাগল। বিস্ময়ে সে বলেই ফেলল, এ তো দেখি নৌকা! কোথায় জাহাজ?


ওসমানকেও প্রথম দফায় পাঠিয়ে দিতে পারত, কিন্তু যেদিন তার রওনা হওয়ার কথা তার আগের দিন বড় মেয়েটা পায়খানার গর্তে পড়ে একটা পা ভেঙে ফেলল। কী করে ওসমান! মেয়েটার এমন বিপদ রেখে সে বিদেশ-বিভূঁই পাড়ি দেয় কেমন করে! ডাক্তার বলল, চিন্তার কিছু নাই, পরের দফায় যে জাহাজটা ছাড়বে সেটা অনেক বড়। ভেতরে ঢুকলে তুমি বুঝতেই পারবা না জাহাজে আছ নাকি ফাইভ স্টার হোটেলে আছ। দ্বিতীয় জাহাজটা ছাড়বে পনের দিন পর। এই কদিন ওসমানের আর ঘুম হয় না। বালিশে মাথা রাখলেই লাল-নীল বাতির বিরাট একটা শহর ভেসে ওঠে চোখে। হাজার হাজার বাতি। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতটা বাতির আলোয় দিনের মতো ফকফকা হয়ে ওঠে। খানিক পর বাতিগুলো মিলিয়ে যায়, ভেসে ওঠে সমুদ্রে ভাসমান একটা মস্ত জাহাজ। ওসমান কখনো সমুদ্র দেখে নি, শুনেছে সমুদ্রের কোনো কূল-কিনার নাই। তার ভয় ভয় করে। পরক্ষণে ফাইভ স্টার হোটেলের দৃশ্যটা ভেসে উঠলে ভয়টা কেটে যায়। ফাইভ স্টার হোটেলও সে কখনো দেখে নি। বিশাল একটা দালান ঘর, পাকা মেঝে, বড় বড় খাট-পালঙ্ক, ইচ্ছে মতো খাও আর পাকা পায়খানায় গিয়ে ঢালো―তার কল্পনায় ফাইভ স্টার হোটেলের ছবিটা এমনই। কিন্তু সেদিন সেন্টমার্টিন সৈকত থেকে ট্রলারে চড়ে পাটাতনের মাঝখানে পুলিশের প্যাঁদানি খাওয়া খুনের আসামির মতো ওসমান যখন গুটিসুটি মেরে বসল তখনই তার খটকা লাগল। বিস্ময়ে সে বলেই ফেলল, এ তো দেখি নৌকা! কোথায় জাহাজ? মাওলানা জুলফিকার বলল, সাগর কি মিয়া দিঘি? সাগরকূলে কখনো জাহাজ ভিড়তে পারে? জাহাজ তো থাকে সাগরের মাঝখানে। যেতে অনেক সময় লাগবে। বসে বসে জিকির করেন ভাই, আল্লার কাছে পানা চান।

জুলফিকারের দিকে তাকায় না ওসমান, তার চোখ পাশের গ্রামের চার যুবককে খুঁজে বেড়ায়―এই যাত্রায় যারা তার সহযাত্রী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু না, চাঁদের আলোয় যে তিন যাত্রীকে দেখছে তাদের একজনকেও সে চেনে না। কী তাদের নাম, কোথায় সাকিন, তার কিছুই জানে না। তাহলে কোথায় গেল তার পরিচিত বাকি চারজন? ওসমান জানে না। এই বৃত্তান্তের কথক সিতারাবানুও জানে না। জানে না বলেই বৃত্তান্তে তাদের সম্পর্কে কোনো কথা থাকবে না। থাকবে ওসমানের সহযাত্রী বাকি তিনজনের কথা, যাদের একজন জুলফিকার, সমুদ্রযাত্রার পঞ্চম দিন রাহাত কমলের ডায়েরিতে যে নিজের পরিচয় লিখেছিল এভাবে : নাম- মাওলানা মোঃ জুলফিকার আলী, পিতা- মরহুম আক্কাস আলী, সাং কলমা, থানা- কাহালু, জেলা- বগুড়া। ঘরে বুড়ো মা আর বউকে একা রেখে কেন সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রা করেছিল জুলফিকার, বিস্তারিত কারণ বর্ণনা করেছিল জাহাজে তার কয়েকজন সহযাত্রীর কাছে। সেসব যাত্রীর মধ্যে রাহাত কমল ছিল একজন। সমুদ্রযাত্রার সময় নিজের ডায়েরিতে কমল ‘এমভি সাউথ বেঙ্গল-৩’ জাহাজের যাত্রীদের সম্পর্কে কমবেশি লিখে রাখত। সবচেয়ে বেশি লেখে মাওলানা জুলফিকার সম্পর্কে। লেখে যে, একটা আতঙ্ক সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াত জুলফিকারকে। হয়ত মার্কিনিদের নির্যাতনের কথা তখনো সে ভুলতে পারে নি। মার্কিনবাহিনী কর্তৃক আফগানিস্তান আক্রান্ত হওয়ার পর পাকিস্তানে বসবাসরত যেসব বাংলাদেশি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তালেবানদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের একজন মাওলানা জুলফিকার। আফগান যুদ্ধের দু-বছর আগে করাচি দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদিস পাস করে একবার দেশে ফিরেছিল। মাহমুদা, বিয়ের বয়স পার হয়ে যাওয়ার পরও যে মেয়েটি প্রেমিকের ফেরার প্রতীক্ষা করছিল, দেশে ফিরে বিয়ে করল তাকেই। বউয়ের খোঁপার ঘ্রাণে এতটাই বুঁদ হয়ে পড়েছিল, বাকি জীবনটা দেশেই থেকে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পারে নি। কারণ, বহু বছর পাকিস্তানে বসবাসের ফলে দেশটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে আর খাপ খাওয়াতে পারছিল না। বাংলাদেশকে তার নিজের দেশ বলেই মনে হচ্ছিল না। গ্রামে পাকিস্তানি রীতিনীতি চালু করতে গিয়ে গ্রামবাসীর হাতে একবার লাঞ্ছিতও হলো। অপমানের জ্বালা বুকে নিয়ে এগারো মাসের মাথায় বউকে বাবা-মায়ের আমানতে রেখে আবার ফিরে গেল পাকিস্তান।


পাঁচ মাস পর বৃষ্টিমুখর এক চাঁদনি রাতে ইঁদুর মারার ওষুধ খেয়ে স্বামীর আগেই সে আজরাইলের সঙ্গে মোলাকাত করল


স্বামী জেহাদে যোগ দিয়েছে, প্রায় এক বছর পর পত্র মারফত সংবাদ পেয়ে নফল নামাজ বাড়িয়ে দেয় মাহমুদা। জায়নামাজে কপাল ঠেকিয়ে বেহেস্তের মেশক-আম্বরের সুঘ্রাণ পায়। কিন্তু সমস্ত যুদ্ধ ও শান্তির মালিক তার খোদা, কত যে কুদরত তার, পত্র পাওয়ার দু-মাসের মাথায় তার মাথায় গণ্ডগোল দেখা দেয়। আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে। রাতবিরাতে বাড়ির ঘাটায় নির্জন পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে থাকে এবং সময়-অসময়ে জায়নামাজে পড়ে থাকে। একবার সেজদায় গেলে মাথা আর তোলার কথা খেয়াল থাকে না। কখনো কখনো কাঁদতে কাঁদতে নামাজের পাটি ভিজিয়ে দেয়। পেট ভরে খায়, তবু কী এক গোপন কারণে শুকাতে শুকাতে প্রায় কঙ্কালে পরিণত হয়। পাঁচ মাস পর বৃষ্টিমুখর এক চাঁদনি রাতে ইঁদুর মারার ওষুধ খেয়ে স্বামীর আগেই সে আজরাইলের সঙ্গে মোলাকাত করল। পরদিন ভোরে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে পুকুরপাড়ের বাঁশবাগানে তার লাশের সন্ধান মেলে।

কান্দাহার রণাঙ্গনে তিন-তিনবার মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া জুলফিকার সেদিনই, সেই তুমুল বৃষ্টির ভোরে, মার্কিন সৈন্যদের হাতে আটক হয়। তার চোখের সামনে ছয় মুজাহিদের মাথায় গুলি করে যেভাবে খুলি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, একইভাবে তার খুলিটাও উড়ে যেতে পারত, বেঁচে গেল নসিবের জোরে। বড় শখ ছিল ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে একবার মোলাকাত করবে। বন্দুকটা উঁচিয়ে, সামরিক কায়দায় স্যালুট ঠুকে, লাদেনকে, যাকে সে আমিরুল মুজাহিদিন মনে করে, সম্মান জানাবে। অথচ তার আগেই নিক্ষিপ্ত হলো গুয়ান্তানামো বে কারাগারে, শতাব্দীর ভয়াবহ মানবসৃষ্ট নিষ্ঠুর কূপে, বন্দিদের ওপর নির্যাতন যেখানে পাশবিকতাকেও ম্লান করে দেয়। পরে, মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে, জাহাজের লশকররা যেদিন দুজন যাত্রীকে হত্যা করে পেট চিরে লাশ সাগরে ফেলে দেয়, সেদিন জুলফিকার তার সহযাত্রীদের গুয়ান্তানামো বে কারাগারের নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিয়েছিল এইভাবে―পৃথিবীর উল্টো পিঠে গুয়ান্তানামো বে কারাগার। আমেরিকার দক্ষিণে গভীর সমুদ্রের মাঝখানে, কাফের সৈন্যরা ছাড়া যেখানে পৃথিবীর কেউ যেতে পারে না। চারদিকে কাঠের তৈরি ওয়াচ টাওয়ারে সৈন্যদের সশস্ত্র পাহারা। আকাশে একটা পাখি উড়লেও সৈন্যরা সন্দেহের চোখে তাকায়। এমন এক জিন্দানখানা, যেখানে বন্দিদের কারো সঙ্গে কারো যোগাযোগের কোনো উপায় নেই।

জুলফিকার বলে, গুয়ান্তানামো বে কারাগারে বন্দিত্বের দ্বিতীয় দিন তাকে খেতে দেওয়া হয়েছিল কয়েকটা ঝলসানো ব্যাঙ। সে এমনই ক্ষুধার্ত ছিল, সাপ-ব্যাঙ তো তুচ্ছ, গোটা দুনিয়াটাই পেটের ভেতর চালান করে দিতে পারে। কিন্তু তখন কী যে হলো হঠাৎ, খাবারের দিকে তাকিয়ে পেট উল্টে বমি এল। অন্ত্রনালি দুমড়ে-মুচড়ে বেরিয়ে আসা ঘোলা জলটুকু পড়ল একেবারের খাবারের থালায়। পথের ধারে বৃষ্টিতে ভেজা থিকথিকে মলের মতো ঝলসানো ব্যাঙ দুটির দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে হলো না তার। কিন্তু খেতেই হবে―সৈনিকরা জবরদস্তি শুরু করল। কিন্তু সে খাবে না তো খাবেই না। বহু চেষ্টা করেও তাকে রাজি করাতে না পেরে একটা আস্ত ইঁট বেঁধে দিল তার শিশ্নে। যন্ত্রণায় চোখ উল্টিয়ে চাতকের মতো সে আকাশের দিকে তাকায়। পাক পরওয়ারদিগার, এই বুঝি তার রহমত নামল! তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড়ে ব্যথা ধরে যায়, অথচ রহমত নামে না। কে জানে, শ্রোতাদের উদ্দেশে জুলফিকার বলে, খোদা হয়তো তার পেয়ারা বান্দাদের এভাবেই পরীক্ষা করেন। তারপর নিজের বোকামির কথা বলে জুলফিকার। নির্যাতনে অতীষ্ঠ হয়ে একদিন সে বোকার মতো ‘নারায়ে তাকবির’ বলে এক সৈনিকের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিল। বোকার মতো, কারণ সে জানত না এরপর কী নির্মম শাস্তি অপেক্ষা করছিল তার জন্য। নাইলনের দড়ি দিয়ে কোরবানির গরুর মতো তার হাত-পা বেঁধে ফেলা হলো। তখন, নাহনু আকরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওয়ারিদ। মৃত্যু আমাদের ঘাড়ের রগটিরও নিকটে অবস্থান করে―কোরানের উক্তিটি মনে পড়ে তার। মৃত্যু ঘাড়ের কাছে টের পেয়ে সে জিকির শুরু করে দিল। ‘স্টপ বাস্টার্ড’―এক সৈনিক কুঁদে উঠল। তবু সে চুপ করল না, বরং আরো জোরে জিকির করতে লাগল। সৈনিকটি তার মুখে টেপ এঁটে দিল। জিকিররত মুসল্লিদের মতো চোখ বন্ধ করে সে মুণ্ডুটা দোলাতে লাগল। সৈনিকটি আবার কুঁদে উঠল, ‘মাথা দোলাচ্ছিস কেন হারামজাদা?’ কিন্তু সেদিকে তার কান নেই, মুণ্ডুটা সে দুলিয়েই যায়। তার মুণ্ডুর দুলুনি থামাতেই হয়ত উপড়ে ফেলা হলো তার মাথার চুল, মুখের দাড়ি-গোঁফ, এমনকি চোখের পাপড়িগুলোও। চোখে সিসার কালি লাগিয়ে রাবারের মোটা বেল্ট দিয়ে চোখ দুটি বেঁধে ফেলল। নাকে পরিয়ে দিল মাস্ক এবং কানে শ্রবণশক্তি বিনাশকারী এক যন্ত্র। মুখে টেপ আঁটা না থাকলে দেখা যেত চৈত্রের ঠাঠা দুপুরে ক্লান্ত কুকুরের মতো তার জিবটা বেরিয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছিল সে বুঝি মরে গেছে, কবর-আজাব বুঝি শুরু হয়ে গেছে। চোখের সামনে ইউনিফর্ম পরা যে সৈনিকটিকে দেখতে পাচ্ছিল সে বুঝি মনকির অথবা নকির। কাতরকণ্ঠে সে পানি খেতে চাইল। সৈনিকটি একটানে তার মুখের টেপটা খুলে ফেলল। তারপর প্যান্টের জিপারটা খুলে তার মুখ বরাবর পেশাব করতে লাগল। জুলফিকারের বুক তো তখন কারবালার ময়দান, বাধ্য হয়ে সে গিলতে লাগল দুর্গন্ধযুক্ত সেই নোনাজল।

৫ম পর্বের লিংক

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)