হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
517
0
২য় পর্বের লিংক

পর্ব-৩

বিশেষত হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুতে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সৈকতে সারাদিন এমনকি মধ্যরাতেও পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। কেউ শিকারি বকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে, কেউ দু-হাতে ঠেস দিয়ে দু-পা মেলে আরাম করে বসে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে, কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে কেউ হুটোপুটি খেলতে খেলতে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করে। সে-রাতে, সেন্টমার্টিন ট্র্যাজেডির প্রায় এক সপ্তাহ পর, দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিম সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা ছিল। তাদের অগোচরে অথবা গোচরে সে-রাতে মাঝসমুদ্রে অপেক্ষমান মালয়েশিয়াগামী জাহাজের উদ্দেশে ট্রলারে চড়ল আবু ওসমান। তখন তার বুকভরা স্বপ্ন, চোখে স্বপ্নের দোলাচল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে তার চেয়ে বেশি সুখী আর কেউ নেই। সুখী, কারণ, দুঃখের বিগত দিনগুলোকে সে মনে মনে চিরতরে বিদায় জানিয়েছে। মাত্র সতের বছর বয়সে বিয়ে করার পর তার দুঃখের দিন শুরু হয়। একুশ বছরের মধ্যে তিন সন্তানের বাবা হয়ে সংসারের ঘানি টানতে টানতে জীবনের প্রতি তার বিতৃষ্ণা এসে যায়। বিতৃষ্ণা তাড়াতে বাপের কথামতো সে সমুদ্রের দুর্গম পথে মালয়েশিয়া যাত্রা করেছে।


বছরটা ফুরানোর আগেই ষাট হাজার টাকা যৌতুক নিয়ে পাশের গ্রামের আরেক দিনমুজুরের পনের বছরের মেয়েকে ছেলেবউ করে ঘরে তুলল তার বাপ। ওসমান তো ওসমান, তার বাপও জীবনে একসঙ্গে ষাট হাজার টাকা চোখে দেখেনি


তার বাপ পেশায় ঘরামি। বছরের পাঁচ মাস মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরনো ঘর মেরামত অথবা নতুন ঘর তৈরির কাজ করে। দিনঠিকা মুজরি। যা পায় তা দিয়ে সাতজনের বিশাল সংসারটা টেনেখিঁচে কোনো রকমে চালিয়ে নেয়। বছরের বাকি সাত মাস তার কাজ বড়শি দিয়ে অথবা জাল মেরে খাল-বিলে মাছ শিকার। এ ছাড়া জীবনে আর কোনো কাজ শেখেনি। বর্ষা মৌসুমে, দিনের পর দিন বৃষ্টি লেগে থাকলে, করার মতো কোনো কাজ থাকে না তার। তখন সারা বছর পায়ের নিচে পড়ে থাকা বউটি হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। সারাদিন বসে বসে বউ বাঁশ-বেতের কুলা চাটাই সাঁজি চালনি পলো মোড়া ঝুড়ি ইত্যাদি বানায়, সপ্তাহশেষে সেগুলো সে রামগতি বাজারে বেচতে নেয়। কিন্তু বউ তো তার একা। একার পক্ষে সপ্তায় সে ক’টা জিনিসই-বা তৈরি করতে পারে! বড়জোর চার-পাঁচটা। তাতে কি এত বড় সংসার সমাল দেওয়া যায়? বাধ্য হয়ে সপরিবারে দিনের পর দিন সেদ্ধ খুদ, ডোবা-নালার ধারে গজিয়ে ওঠা লবণপানিতে সিদ্ধ মানকচু, কোনোদিন পড়শির কাছ থেকে চেয়ে আনা এক বাসন মাড় খেয়ে, অথবা কোনোদিন উপোস থেকে কোনোরকমে দিনগুজরান করে।

সংসারের এই অভাব-অনটনের কারণে স্কুলে যাওয়া তো দূরের কথা, মক্তবে গিয়ে ঠিকমতো আরবি কায়দাটাও শেষ করতে পারেনি ওসমান, তার আগেই তাকে রোজগারে নেমে পড়তে হলো। রোজগার আর কি, পেটে-ভাতে গেরস্তবাড়ির মুজুর অথবা মাসঠিকা রাখাল। ক্ষেতের আগাছা বাছতে বাছতে, ধান কাটতে কাটতে, আঁটি বেঁধে বাড়ি আনতে আনতে আর মাঠে গরু-ছাগল চরাতে চরাতে কবে সতের বছরে এসে দাঁড়াল সে নিজেও টের পেল না। বছরটা ফুরানোর আগেই ষাট হাজার টাকা যৌতুক নিয়ে পাশের গ্রামের আরেক দিনমুজুরের পনের বছরের মেয়েকে ছেলেবউ করে ঘরে তুলল তার বাপ। ওসমান তো ওসমান, তার বাপও জীবনে একসঙ্গে ষাট হাজার টাকা চোখে দেখেনি। বিয়ের সময় খরচ হয়ে গেল পঁচিশ হাজার, বাকি পঁয়ত্রিশ হাজার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওসমান মোটামুটি আরামেই ছিল। সংসার-জীবন কত কঠিন একবারের জন্যও টের পায়নি। বউ যখন যা আবদার করেছে বাপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এনে দিয়েছে। তার পরিবারের কেউ জীবনে কোনোদিন লাক্স বা কসকো সাবান ব্যবহার করতে পারেনি, বউকে সে তাও এনে দিয়েছে। কিন্তু যেদিন পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ফুরাল তার পরদিন বাবার কাছে সে টাকা চাইতে গিয়ে উল্টো ঝাড়ি খেল―বাল পাকি লাল হই যাওয়া এত বড় পোলা, কদিন আর বাপের মাথার মগজ খাবি? টাকা চাইতে তোর লজ্জা করে না হারামজাদা!

ব্যাস, শুরু হলো বাপ-বেটার সম্পর্কের টানাপড়েন। সতের বছর ধরে যে বাপকে দেখে এসেছে তার সঙ্গে এই বাপকে সে আর মিলাতে পারে না। বাপ বেটার কাছ থেকে অথবা বেটা বাপের কাছ থেকে মাইল মাইল দূরে সরে যেতে লাগল। রাগে-দুঃখে সারাদিন উপোস কাটাল সেদিন, রাতে খিদার চোটে বাধ্য হয়ে মায়ের কাছে গিয়ে ভাত চাইল। কি আশ্চর্য, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে একটা হুতোম প্যাঁচা দেখতে পেল। রাগের কি আর সীমা থাকে তার? মুহূর্তে খিদাটাও উবে গেল। কিন্তু পেটের টান বলে কথা, রাগটাকে মেলা কষ্টে হজম করে নিতে বাধ্য হলো। অল্প দিনের মধ্যে মা-ছেলের মধ্যেও একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল, মা-টাও বাপের মতো একটু একটু করে দূরে সরে যেতে লাগল, গাছের চারাটা ধীরে ধীরে যেভাবে মাটি থেকে দূরে সরে যায়। ওসমানের অবাক লাগে। কয়েক বছর আগেও মায়ের বকা খেয়ে বাপের, আর বাপের বকা খেয়ে মায়ের আদর-স্নেহ পেত পৃথিবীতে তারাই ছিল তার একান্ত আপন, মাথার উপরের সুশীতল ছায়া। অথচ বউটা ঘরে আসার পর থেকেই কিনা দুজন পর হয়ে গেল!

‘বাপ ভালো না মা ভালো, সবচেয়ে ভালো রুপিয়া’—নেংটোকাল থেকে লোকমুখে শুনে আসা এই প্রাচীন প্রবাদটার অর্থ বুজে উঠতে তার আর বেশি সময় লাগল না। বুঝে বেরিয়ে পড়ল টাকার খোঁজে। কিন্তু তখন কার্তিক মাস। রাস্তাঘাটে কুকুরের সুখসঙ্গম আর মানুষের উপোস থাকার কাল। গ্রামে কাজের এমনই অভাব, গোটা এক মাস ঘুরেও কোনো কাজের খোঁজ পেল না। উপায় খুঁজে না পেয়ে বউকে সে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিল। কিন্তু বিয়ের পর মেয়ে বাপের বাড়িতে কদিন থাকতে পারে! মেয়ে বিয়ে দিয়েছে বাবা-মায়ের দায়মুক্তি ঘটে গেছে, বিয়ের পর মেয়েকে দিনের পর দিন খাইয়ে-পরিয়ে পুষবে কেন? ফলে একটা সময় শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গেও তার মন কষাকষি শুরু হলো। এবার সে যায় কোথায়? দুশ্চিন্তায় রাতে তার ঘুম আসে না, খাবার-দাবারেও রুচি পায় না। মনে অরুচি থাকলে মুখে কি আর রুচি থাকে! শবে বরাতের রাতে মসজিদের পাকা মেঝেতে কপাল ঘষে কান্নাকাটি করেও যাওয়ার মতো কোনো পথের দিশা পায় না। দু-টাকার বিষ কিনে গলায় ঢেলে মরতে পারত, কিন্তু এমনই দুষ্কাল, বিষ কেনার টাকাটাও ছিল না তার কাছে।

শেষমেষ ধর্না ধরল রামগতি বাজারের এক মহাজনের, যার ঘরে তিনটা বউ এবং যে কুড়িটি রিকশার মালিক। কোনো অজুহাত ছাড়া তাকে রোজ পঞ্চাশ টাকা ভাড়া প্রদানের শর্তে একটা রিকশা ভাড়া নিয়ে নিল। শুরু হলো তার আসল কর্মজীবন, যে জীবন দুঃখের, সীমাহীন কষ্টের। সারাদিন প্যাডেল মারতে মারতে শরীরে লবণ বলতে কিছু থাকে না, কলিজাটা শুকিয়ে যায়, মাথাটা বারবার চক্কর দেয়। বাড়ি ফিরে বিছানায় শুলে সারা রাত আর হুঁশ থাকে না। শেষরাতে বউয়ের উষ্ণ আলিঙ্গনও তাকে জাগাতে পারে না। না জাগুক, তবু সংসারে স্বস্তি থাকুক। আগে পেট, তারপর অন্য কিছু―বউ নিজেকে সান্ত্বনা দেয়।

টানা সাত বছর রিকশার প্যাডেল মারতে মারতে পায়ের রগে গিঁট পাকিয়ে তুলল। ততদিনে গিঁট লেগে গেল তার সংসারেও। তিন ছেলেমেয়ে তিন বেলা ভাত খাওয়ার মতো বড় হয়ে উঠছে, সারা দিনে রিকশা টেনে যা রোজগার করে তা দিয়ে ঠিকমতো তিন বেলা খাবারের টাকা হয় না। একদিন শরীর খারাপ হলে তো হয়েছে, সারা দিন কারো পাতে আর ভাত জোটে না। বাপের সংসারের মতো তার সংসারেও শুরু হলো নিদারুণ টানাখিঁচা। সেসব দিনের কোনো একদিন গ্রামের হাটে হোমিওপ্যাথির এক ডাক্তার এল। পালোয়ানের মতো লম্বা-চওড়া, রামগতি বাজারের তিন বউঅলা মহাজনের মতো বিশাল বপু। দেখেই বোঝা যায় এলাকায় লোকটা আনকোরা, করো সঙ্গেই মেলে না। হাটের শেষ মাথায় টিনের চাপড়ার একটা দোকান ভাড়া নিয়ে কোথা থেকে পুরনো দুটি চেয়ার-টেবিল এবং গ্লাসঅলা একটা আলমিরা জোগাড় করে চেম্বার খুলে বসল। ওষুধের শিশিতে ভরিয়ে তুলল আলমিরার তাকগুলো। তার মুখটা যেন রসগোল্লার কড়াই। মানুষের সঙ্গে এমন মিষ্টি ভাষায় কথা বলে, যেন কথা নয়, মুখ থেকে সিরকা গড়িয়ে পড়ছে। মিষ্টি কথার গুণে কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রামবাসীর আস্থা অর্জন করে নিল, একইসঙ্গে ফিরিয়ে আনলো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি মানুষের কমতে থাকা আস্থাও। গ্রামের মোড়ল-মাতবরদের সঙ্গে খাতিরও জমিয়ে তুলল বেশ। শিক্ষিত মানুষ। কথার মধ্যে দু-একটা ইংরেজি শব্দও ঢুকে পড়ে। জেলাশহর থেকে প্রকাশিত একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা রাখে চেম্বারে, কোনো কোনোদিন ঢাকার দৈনিক পত্রিকাও দেখা যায় টেবিলটার ওপর। মূলত এ কারণেই গ্রামের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণরা তার চেম্বারে আড্ডা জমাতো। বয়স তার পঞ্চাশের কম নয়, তবু সতের বছরের তরুণটার সঙ্গে মিশতে কোনো অসুবিধা হতো না তার। মোড়ল-মাতবররা চেম্বারে এলে এক কাপ চা, অন্তত এক খিলি পান না খাইয়ে ছাড়ত না। আপ্যায়নেই তার খরচ হয়ে যেত রোজ চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা। এত টাকা সে পায় কোথায়? কোথায় আবার, তার কি টাকার অভাব আছে? খাগড়াছড়ি শহরের কাছে তার বাড়ি, নিজগ্রামের মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিল দু-দুবার। মোটামুটি ধনী লোক। ঝামেলায় পড়েছে বেচারা বিরোধীদলের নেতা হয়ে। সরকারদলীয় ক্যাডারদের গিরিঙ্গিতে অতিষ্ঠ হয়ে, হুমকি-ধমকি আর মামলার ভয়ে আপাতত কিছুদিন গা ঢাকা দিতে এলাকা ছেড়ে বহুদূরের এই অজগাঁয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। পরিবার থাকে খাগড়াছড়িতেই। বড় ছেলের সংসার দেখাশোনা করার মতো বয়স হয়েছে, বাবার অবর্তমানে সংসারটা সে চালিয়ে নিতে পারছে। বাড়িতে টাকা-পয়সা কিছু পাঠাতে হয় না, নিজের রুজিতে নিজে চলে, টান পড়লে বাড়ি থেকে আনে। ক্ষমতার পালা বদল না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চালিয়ে যেতে হবে।


গ্রামের মানুষদের ডাক্তার নানা গল্প শোনায়। কোন দেশের প্রেসিডেন্ট বাদাম বিক্রি করত, কোন দেশে গাছে মানুষ খায়, কোন দেশের মানুষ সাপ-ব্যাঙ-কুকুর-কেঁচো খায়, কোন দেশের কোন লোকের মাথায় সতের বার ঠাটা পড়ার পরও সেই বেহায়া লোকটা মরেনি―এরকম অদ্ভুত সব গল্প। মানুষ তার এসব গল্প সহজেই বিশ্বাস করে। কিন্তু এত কম টাকায় বিদেশ যাওয়া যায়, তাও মালয়েশিয়ার মতো একটা দেশে, যে দেশের এক টাকায় বাংলাদেশের পঁচিশ টাকা―প্রথমে কেউ ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি


নিজের সম্পর্কে লোকটার এসব কথা গ্রামের কেউ অবিশ্বাস করে না। দেখতে-শুনতে ভদ্রলোক, কথা বলে প্রায় শুদ্ধ ভাষায়—তার কথা অবিশ্বাস হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। অবিশ্বাস করে কোনো লাভও তো নেই। ক্ষতিই বরং। সে তো খারাপ কিছু করছে না। গ্রামের মানুষরা তো সারাক্ষণ একে অন্যের পাছায় আঙুল দিয়ে বসে থাকে। ওতেই তাদের সুখ। শেয়াল-কুকুরের মতো কামড়াকামড়ি সবসময় লেগেই থাকে। কারো সুখ কেউ সইতে পারে না। পারলে একজন আরেকজনকে ঠেঙিয়ে পগার পার করে দেয়। অথচ লোকটা প্রায় মাগনা গ্রামের ভুখানাঙ্গা মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। মাগনাই তো। রামগতি বাজারের ডিসপেন্সারি থেকে গ্যাস্টিকের একপাতা ট্যাবলেট কিনতে যেখানে তিরিশ টাকার কমে হয় না, সেখানে মাত্র বিশ টাকায় সে পেটের ব্যথা সারিয়ে তুলছে। টাকা কেউ বাকি রাখলেও কিছু বলে না, হাসতে হাসতে শুধু বলে, যখন হাতে আসে দিবেন। কিন্তু এই অজগাঁয়ের মানুষদের হাতে, সম্পদ বলতে মাটি ছাড়া যাদের আর কিছু নেই, নগদ টাকা কি সহজে আসে! এলেও ডাক্তারের বকেয়া পরিশোধের কথা কি আর মনে থাকে? পরিবারের কারো দাস্ত-বমি বা জ্বর-সর্দি হলেই তো বকেয়া টাকার কথাটা মনে পড়বে। তখনো যদি ওষুধ কেনার মতো টাকা না থাকে ওষুধ দিতে ডাক্তার একবারও আপত্তি করবে না। এমন একটা মানুষের কথা অবিশ্বাস করা লাভের চেয়ে তো ক্ষতিই বেশি।

একদিন শোনা গেল চট্টগ্রাম শহরে তার এক শালা না সম্মন্ধি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক। চৌদ্দতলা ভবনের বারো তলায় তার বিশাল অফিস। শত শত লোক বিদেশ পাঠাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন দুটি দেশেও নাকি তার শাখা অফিস আছে। দুবাই, বাহরাইন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান এমনকি ইউরোপের দেশগুলোতেও লোক যায় তার এজেন্সির মাধ্যমে। এছাড়া বড় হজ্ব আর ওমরা হজ্ব তো আছেই। ইদানীং সে মালয়েশিয়াতেও লোক পাঠাচ্ছে। এরই মধ্যে তার এজেন্সির মাধ্যমে কয়েক’শ লোক মালয়েশিয়া গিয়ে ভালো বেতনে চাকরি করছে। টাকাও খুব বেশি নেয় না, জনপ্রতি মাত্র ষাট হাজার।

গ্রামের মানুষদের ডাক্তার নানা গল্প শোনায়। কোন দেশের প্রেসিডেন্ট বাদাম বিক্রি করত, কোন দেশে গাছে মানুষ খায়, কোন দেশের মানুষ সাপ-ব্যাঙ-কুকুর-কেঁচো খায়, কোন দেশের কোন লোকের মাথায় সতের বার ঠাটা পড়ার পরও সেই বেহায়া লোকটা মরেনি―এরকম অদ্ভুত সব গল্প। মানুষ তার এসব গল্প সহজেই বিশ্বাস করে। কিন্তু এত কম টাকায় বিদেশ যাওয়া যায়, তাও মালয়েশিয়ার মতো একটা দেশে, যে দেশের এক টাকায় বাংলাদেশের পঁচিশ টাকা―প্রথমে কেউ ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। নিশ্চয়ই লোকটা গুল মারছে। ডাক্তার পরে আসল ঘটনা খুলে বললে বিশ্বাস না করেও পারেনি। কেন যাওয়া যাবে না? মালয়েশিয়া তো লন্ডন-আমেরিকার মতো অত দূরের দেশ নয়, কক্সবাজার থেকে জাহাজে চড়ে থাইল্যান্ড পৌঁছতে বারো দিন, থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়ায় পৌঁছতে বাকি দশ-পনের দিন। সাকুল্যে এক মাসের মধ্যে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর পৌঁছে যাওয়া তো অসম্ভব কিছু নয়।

তবু মানুষের খটকা যায় না। বিমানের এই যুগে মানুষ এখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় দেশ-বিদেশ করছে। যে মানুষটা সকালে ঢাকায়, বিকেলে লন্ডন-আমেরিকায়। শহরের বড়লোকরা তো মাসে মাসে মার্কেটিং করতে এমনকি সর্দিজ্বর হলে ডাক্তার দেখাতে সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক চলে যাচ্ছে। কেউ এখন জাহাজে চড়ে বিদেশ যায়? ডাক্তার বুঝিয়ে বলে, বিমানে যেতে তো টিকেটেই লেগে যাবে পঞ্চাশ-ষাট হাজার, পাসপোর্ট-ভিসায় আরো অন্তত লাখ দেড়েক। তা ছাড়া মালয়েশিয়ার ভিসা তো আজকাল সহজে পাওয়াও যায় না, ভিসার জন্য দৌঁড়ঝাপ করতে করতেই খরচ হয়ে যাবে আরো লাখ খানেক। সব মিলিয়ে তিন লাখে গিয়ে ঠেকবে। তার চেয়ে মাত্র ষাট হাজারে চলে যেতে পারলে মন্দ কি। ফারাক শুধু বৈধ আর অবৈধে। ভিসা নিয়ে যাওয়াটা বৈধ, আর ভিসা ছাড়া যাওয়াটা অবৈধ। হোক অবৈধ, মালয়েশিয়ার মাটিতে একবার পা রাখলে বৈধ হতে কতক্ষণ? সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনোভাবে সীমান্তটা পাড়ি দিয়ে শহরে ঢুকে পড়লেই হলো, মিল-কারখানার বড় বড় চাকার মতো ভাগ্যের চাকাটাও ঘুরতে শুরু করবে। পৃথিবীর সেরা দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া একটি। চোখ ধাঁধানো কত বড় বড় সব শহর, কত বিশাল বিশাল অট্টালিকা, কত দেশের কত মানুষ, কে কার খবর রাখে! মাঝেমধ্যে কেউ কেউ যে ধরা পড়ে না তা নয়। পড়ে। কিন্তু তাতে বড় কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না, শ্বশুরবাড়ির জামাইর মতো খাতির-যত্ন করে সরকারি খরচে বিমানে চড়িয়ে তাদের আবার দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রিমান্ডে নিয়ে পেঁদানি বা জেলের ভেতর পচে মরার ভয় নেই। মালয়েশিয়া তো আর বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশের কোট-কাচারিতে তো মামলার জট লেগেই থাকে। কেউ একবার চৌদ্দ শিকের ভিতরে ঢুকলে জামিনের খবর থাকে না। মালয়েশিয়ার আইন এ দেশের মতো নয়, একেবারেই আলাদা। কারো বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে রায় হতে লাগবে বড়জোর এক মাস। দোষী হলে সে জেলে যাবে, নির্দোষ হলে খালাস।

৪র্থ পর্বের লিংক
স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)