হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
378
0

ফেইসবুক ব্যবহারকারী এক আধুনিক মাওলানা, যে দ্বিতীয় শ্রেণির একটি খবরের কাগজে ধর্ম বিষয়ক কলাম লেখে, টুকুর স্ক্রিনশর্টটি শেয়ার নিয়ে মন্তব্য করেছিল―মৃত্যু আগাম টের পায় মানুষ।


পর্ব-২

চার’শ বছর আগে সিতারাবানুর দেখা স্বপ্নের প্রায় কাছাকাছি একটা স্বপ্ন দেখেছিল কুমারী নূরনিসা―তার এক শিশুপুত্র তার কোল থেকে ধনেশ পাখি হয়ে আকাশে উড়ে গেছে। ছেলেটা ডানা মেলে উড়ছে, নূরনিসা বুক চাপড়াতে চাপড়াতে তার পিছে পিছে ছুটছে, গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছে, ধনেশরূপী ছেলেটা চেষ্টা করছে মায়ের কোলে ফিরে আসতে, অথচ কোনোভাবেই পারছে না, নিয়তি তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল।

এই দুঃস্বপ্ন নূরনিসাকে প্রায় সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়ায়। সংসারজীবনে সে আট সন্তানের জননী হয়েছে―প্রথমে দুই মেয়ে, তারপর দুই ছেলে। কয়েক বছর বিরতি দিয়ে পরপর তিনটি মেয়ে। সর্বশেষ চল্লিশ বছর বয়সে জন্ম দেয় আরো একটি ছেলের, পরবর্তীকালে যে এই বৃত্তান্তের অন্যতম চরিত্র হয়ে ওঠে। নূরনিসা যখন শিশুপুত্রদের কোলে নিত কোমরের তাগার সঙ্গে তার আঁচলের কোণটা গিঁট দিয়ে রাখত। দোলনাতে শোয়ানোর সময়ও দড়ি দিয়ে এক পা বেঁধে রাখত―কোনোভাবেই যাতে উড়ে যেতে না পারে। এসব করত সে একান্ত গোপনে, কেউ কোনোদিন টের পায় নি, পেলেও কিছু আন্দাজ করতে পারে নি। পারবে কি করে, তার সেই গোপন স্বপ্নের কথা তো কেউ জানত না, কাউকে তো কোনোদিন সে বলে নি। বলেছিল শুধু একবার তার স্বামীকে, প্রথম পুত্রের জন্মের পর। স্বামী গুরুত্ব দেয় নি। স্বপ্নে তেমন বিশ্বাস নেই তার। ঘুমের ঘোরে মানুষ কত স্বপ্নই তো দেখে, কটাই-বা ফলে। বহু বছর আগে সেও একটা স্বপ্ন দেখেছিল, মানুষের কাছে সে লাখ লাখ টাকা ঋণী, অথচ সারা জীবনে তাকে খুব একটা ধারদেনা করতে হয় নি। বিশেষ কোনো দরকার পড়ে নি। ক্ষেতগেরস্তির গুণে অভাব কোনোদিন নাগাল পায় নি তার।

তারপর নূরনিসা আর কোনোদিন স্বপ্নটার কথা কাউকে বলে নি। সর্বশেষ পুত্রের জন্মের পর স্বপ্নটা মৃত্যুচিন্তার মতো এমন ভয়াবহ আতঙ্কের রূপ নিল, বাধ্য হয়ে সে এমন এক গুনিনের কাছে গেল, কবরগুনিন হিসেবে যার পরিচিতি, যে পুকুরের জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে মেরে বসে থাকতে পারে এবং পুঁটি কই ও বোয়াল মাছের পেট থেকে জীবনঘাতী তাবিজ বের করে আনতে পারে, যেসব তাবিজের ভেতরে থাকে মানুষের নখ, কাফনের টুকরো, মাথার চুল আর শ্মশানের কয়লা। একটি পুরনো কবরের কাছে গুনিনের আস্তানা, যে কবরটি একজন মজ্জুবের, লোকের মুখে যে এখন ইলিয়াসপীর নামে পরিচিত। জীবৎকালে সে নেংটি পরে থাকত, প্রচণ্ড শীতের রাতেও তার গায়ে সুতাটি পর্যন্ত থাকত না এবং তীব্র গরমের দিনেও কেউ কোনোদিন তাকে গোসল করতে দেখে নি। তার কবরের কাছে মস্ত এক বটগাছ ছিল, দিনের বেলায় তাকে দেখা যেত গাছটির তলায়। রাতে ঘুমাত পুবের জঙ্গলে, যেখানে এখন শ্রীপুর উপজেলা সদর। রোজ ভোরে একটা বাঘের পিঠে চড়ে বটতলায় আসত এবং সন্ধ্যায় বাঘটির পিঠে চড়েই আবার জঙ্গলে ফিরে যেত। তার মৃত্যুর পর বাঘটি প্রায় কুড়ি বছর তার কবর পাহারা দিয়েছিল।

আদি ও আসল সোলেমানি খোয়াবনামার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে গুনিন বলেছিল, এই স্বপ্ন মিথ্যা হতে পারে না। শয়তান নয়, ফেরেশতারা দেখিয়েছে এই স্বপ্ন। দুষ্ট গ্রহের আছর আছে তার ছেলেদের ওপর। এই আছর কাটাতে বড় একটা জেয়াফত দিয়ে পাঁচ গ্রামের মানুষ খাওয়াতে হবে। গুনিনের কথামতো সে পৈর্তৃকসূত্রে পাওয়া একখণ্ড জমি বেচে, গরু-খাসি জবাই দিয়ে ছেলেদের আকিকার নামে বিরাট এক জেয়াফতের আয়োজন করে পাঁচ গ্রামের প্রায় সাড়ে এগার হাজার মানুষকে দাওয়াত করে খাওয়াল। সেই জেয়াফতের কথা বহুদিন মানুষের মুখে মুখে ছিল। জেয়াফতের গুণেই কিনা কে জানে, ছেলেরা বড় হওয়ার পর সেই দুঃস্বপ্নের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, প্রায় দশ বছর খুব একটা মনে পড়ে নি। ততদিনে তার বড় ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায়, মেয়েদেরও বিয়ে হয়ে গেছে, মেজ ছেলে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছে এবং ছোট ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। সেদিন সেন্টমার্টিন দ্বীপে ভ্রমণে গিয়ে তার ছোট ছেলে, যাকে সে আদর করে টুকু বলে ডাকত, সমুদ্র স্নানের সময় উত্তাল জোয়ারে ভেসে গেলে সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি আবার তার মাথায় চাড়া দিয়ে উঠল।

সমুদ্র স্নানের সময় টুকুসহ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্র এবং অজ্ঞাত পরিচয় দুই যুবক ভেসে যাওয়ার সংবাদটি সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। সব কটি জাতীয় দৈনিক সংবাদটি একযোগে শীর্ষ শিরোনাম করে এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোও গুরুত্বসহকারে সম্প্রচার করে। সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল ভ্রমণযাত্রার আগের রাতে ফেইসবুকে দেওয়া টুকুর একটি স্ট্যাটাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারের সামনে বুকে হাতমুড়ে দাঁড়ানো থ্রি-কোয়াটার একটি ছবিসহ সে পোস্ট দিয়েছিল, ‘চলে যাচ্ছি, একদম নেটওয়ার্কের বাইরে।’ লাইক পড়েছিল বিরাশিটি এবং কমেন্টস সাতাশটি। সেন্টমার্টিন ট্রাজেডির সংবাদটি গণমাধ্যমে প্রচার হলে পরে তার ফেইসবুক বন্ধুরা তার ওয়ালে গিয়ে পোস্টটির স্ক্রিনশর্ট নিয়ে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা পোস্ট দিয়েছিল। অনেকেই বিস্ময়ে মন্তব্য করেছিল―মানুষ তো তার ভবিষ্যৎ জানে না, এই ক্ষমতা মানুষের নেই, টুকু তবে কিভাবে জানল? কিভাবে সে বুঝতে পারল আসলেই সে নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাচ্ছে? ফেইসবুক ব্যবহারকারী এক আধুনিক মাওলানা, যে দ্বিতীয় শ্রেণির একটি খবরের কাগজে ধর্ম বিষয়ক কলাম লেখে, টুকুর স্ক্রিনশর্টটি শেয়ার নিয়ে মন্তব্য করেছিল―মৃত্যু আগাম টের পায় মানুষ। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই আজরাইল ফেরেশতা তাকে মৃত্যুর কথা ঈশারায় জানান দিয়ে যায়। প্রমাণ হিসেবে সে বাদশা সোলায়মানের আমলের এক যুবকের কাহিনি উল্লেখ করে, আজরাইলের হাত থেকে বাঁচতে যে সোলায়মানের আশ্রয় নিয়েছিল। বাদশার আজ্ঞাবাহী বাতাসে সওয়ার হয়ে সে জেরুজালেম থেকে সুদূর হিন্দুস্তান পালিয়ে গিয়েছিল। তবু শেষ রক্ষা হলো না, হিন্দুস্তানেই তার জান কবয করে আজরাইল।

বন্ধুদের সঙ্গে তিন দিনের ভ্রমণে গিয়েছিল টুকু। অক্টোবরের সতের তারিখ শুক্রবার রাতে ঢাকা থেকে একটা চেয়ারকোচে রওনা হয়ে শনিবার ভোরে তারা কক্সবাজার পৌঁছে। ফেরার কথা ছিল সোমবার রাতে। কিন্তু রোববার বিকেল থেকে টুকুকে মোবাইলে পাওয়া যাচ্ছিল না। সকালেও তার সঙ্গে কথা বলেছে তার মা, অথচ বিকেলে থেকে যতবারই ডায়াল করছিল ততবারই বন্ধ পাচ্ছিল। আশ্চর্য! টুকু তো কখনো মোবাইল বন্ধ রাখে না, গভীর রাতে ফোন এলেও ঘুম থেকে জেগে রিসিভ করে। সন্ধ্যায় নূরনিসা আবার ডায়াল করে। বন্ধ। আবার করে। বন্ধ। সারা রাত ডায়ালের পর ডায়াল করে যায়, অথচ সংযোগ কোনোভাবেই পায় না। যতবারই ডায়াল করে ততবারই তার অস্থিরতা বাড়ে, অজানা আতঙ্কে হাতে-পায়ে কাঁপুনি ধরে। নানা দুশ্চিন্তা ভিড় করে তার মাথায়। কী হলো টুকুর? মোবাইলটি হারিয়ে গেল, ছিনতাই হয়ে গেল, না চার্জ ফুরিয়ে গেল? নাকি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলো তার বেটা? সড়ক দুর্ঘটনা তো প্রায় লেগেই আছে, রাস্তাঘাটে প্রতিদিনই পিঁপড়ার মতো মানুষ মরছে। দুশ্চিন্তায় নূরনিসা হাই পাওয়ারের ঘুমের ওষুধ খেয়েও রাতে এক মুহূর্তের জন্য চোখে ঘুম নামাতে পারল না। টুকুর বাবা তাকে সান্ত্বনা দেয়―সেন্টমার্টিন রিমোট এরিয়া, হয়ত সেখানে এখনো মোবাইল কোম্পানির কোনো টাওয়ার বসে নি। টুকু হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ-ফূর্তি করছে। নিশ্চয়ই কাল রাতে ফিরে আসবে। এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই। পরদিন দুপুরে রান্নার জন্য এক ফালি কুমড়া কাটতে গিয়ে বটির পোঁছ লেগে নূরনিসার ডান হাতের একটা আঙুল কেটে গেল। কে জানে কেন, সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে গেল তামাদি সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। এমনই দুর্বার গতিতে স্মৃতিটা হানা দিল, শরীরের রক্তপ্রবাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না, বোরখাটা গায়ে চড়িয়ে ছুটতে ছুটতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা অটোরিকশায় চড়ে সোজা চলে গেল কবরগুনিনের আস্তানায়। নিশ্চয়ই তার ছেলের কোনো বিপদ হয়েছে। বিপদের কারণ হিসেবে যথারীতি সে দায়ী করল অজানা শত্রুর করা তাবিজকে। তাবিজ-কবজে তার অতিমাত্রায় বিশ্বাস। তার মতে, যেখানে আল্লাহ সেখানেই শয়তান, যেখানে মুসা সেখানেই ফেরাউন। আল্লাহর কালাম থাকলে কুফুরি কালামও থাকবে। সংসারের বহু ধান-চাল সে ফকির-গুনিনের পেছনে ঢেলেছে। পরিবারে অশুভ কিছু ঘটতে দেখলেই তার পেছনে সে কুফুরি কালামে লেখা তাবিজ-কবজের কারসাজি খুঁজে পায়, যে তাবিজের স্রষ্টা মগ জাতির গুনিন-তান্ত্রিকরা। তাবিজ-কবজে বিশ্বাস তার এমন মাত্রায় পৌঁছে গেছে, বন্যায় ফসলের ক্ষতি হলে বা শিলাবৃষ্টিতে আমের মুকুল ঝরে গেলে, এমনকি বাড়ির কারো অসুখ হলে সে তাবিজ-কবজকে দায়ী করে। নিশ্চয়ই শত্রুরা তাবিজ করেছে। নইলে হঠাৎ এমন বিপদ আসবে কেন? একবার টুকুর বাবার খুব জ্বর হলো। হাই অ্যান্টিবায়েটিক খেতে দিয়ে ডাক্তার বলল কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে। তিন দিন পর জ্বর নামল, কিন্তু শুরু হলো প্রচণ্ড কোমরব্যথা। এমনই ব্যথা, লেজকাটা টিকটিকির মতো বিছনায় গড়াতে লাগল। নূরনিসা কি আর চুপ করে বসে থাকতে পারে? কোথা থেকে ডেকে আনলো এক গুনিন। বাড়ির পেছনে মজা পুকুরে ডুব দিয়ে গুনিন টাকি মাছের পেট থেকে বের করে আনলো চকচকে তামার খোলের একটি তাবিজ। কে করতে পারে এই তাবিজ? জমি নিয়ে গ্রামে যার সঙ্গে মামলা চলছে সে ছাড়া আর কে! আরো একবার তার একটা সোনার আংটি হারিয়ে গিয়েছিল। যথারীতি ডাক পড়ল গুনিনের। তার বিশ্বাস ছিল গুনিন ঠিকই জাদুবলে আংটিটা বের করে আনতে পারবে, কিন্তু তুলারাশির জাতকের মাধ্যমে বাটিচালান দিয়ে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বহু চেষ্টা-তদবির করেও আংটিটা উদ্ধার করতে পারল না গুনিন। পারে নি তাতে কি, তাবিজ-কবজে নূরনিসার বিশ্বাস বিন্দুমাত্র কমে নি, বরং বেড়েছে। কেননা গুনিন বলেছে আংটিটা চুরি করার সময় চোর এমন এক তাবিজ পরেছিল যে তাবিজ কামরূপ কামাখ্যা থেকে আনা। এই আংটি উদ্ধারের ক্ষমতা তার নেই, আছে একমাত্র কবরগুনিনের। বহুদিনের পুরনো অল্প দামের আংটির জন্য কবরগুনিনের পেছনে হাজার টাকা ঢালার চিন্তা সে বাদ দিল।


দেখে, একটা কাক মুখে এক টুকরো সাবান কি একখানা হাড় নিয়ে উড়ছে। কাকটাকে ধনেশপাখি বলে মনে হয় তার। ‘বাবা বাবা’ বলে পাখিটার দিকে হাত দুটো বাড়িয়ে সে ছুটতে থাকে।


পড়ন্ত দুপুরে নূরনিসা পৌঁছল কবরগুনিনের আস্তানায়। ততদিনে ইলিয়াস পীরের কবরটির চেহারা পাল্টে গেছে। কবরের উপর পেয়াজের মতো গম্বুজঅলা দালান উঠেছে। কবরের একদিকে ছোট্ট একটা পাকা মসজিদ, আরেক দিকে গুনিনের চৌচালা টিনের ঘর। গুনিন তখন ভাত খেয়ে পান চিবুতে চিবুতে কোলবালিশে হেলান দিয়ে টেলিভিশনে দুপুরের সংবাদ দেখছিল, খবর পেয়ে বৈঠকখানায় এসে তার গদিঅলা চেয়ারটিতে বসল। নূরনিসাকে সে চিনতে পারল না। চিনতে পারার কথাও তো নয়। রোজ কত মানুষ কত ধরনের সমস্যা নিয়ে তার কাছে আসে, কতজনের কথা মনে রাখবে! দশ বছর আগে একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে তার কাছে এসেছিল―নূরনিসা তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, তবু ঠিক স্মরণে এল না তার। নূরনিসা তার বর্তমান বিপদের কথা জানালে গুনিন কতক্ষণ চুপ করে থাকে। আরেক খিলি পান মুখে দেয়। হঠাৎ চেয়ার থেকে এক লাফে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল। উত্তেজনায় নূরনিসাও দাঁড়িয়ে গেল। কেন হাসছে গুনিন? নিশ্চয়ই কোনো সুসংবাদ। যাক, টুকুর কোনো বিপদ হয় নি তবে। নাকি কোনো দুঃসংবাদ?

হাসি থামাল গুনিন। ঝড়শেষের নীরবতা নামল কামরাজুড়ে। চেয়ারে বসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল―মালেকুল মউত! তারপর বেতনার্ত কণ্ঠে বলল, দুষ্ট গ্রহের আছর, সব দুষ্ট গ্রহের আছর। বলে সে মাথাটা এদিক-সেদিক দোলায় আর মুখে চুক-চুক শব্দ করে। তারপর আতঙ্কিত নূরনিসার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে―দরিয়া দেখেছেন কখনো?

আমি কোত্থেকে দেখব! কখনো তো যাই নি। কাঁপা গলায় জবাব দিল নূরনিসা।

গুনিন বলল, গ্রহের আছরে দরিয়ায় জোয়ার-ভাটা হয়, বিরাট বিরাট ঢেউ ওঠে। ঢেউয়ের চূড়ায় বসে খোয়াজ খিজির তখন দরিয়াকে শাসন করেন। বলে চুপ করল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলল, টুকু আর কোনোদিন ফিরবে না, দয়াল খিজির ঢেউয়ের চূড়ায় চড়িয়ে তাকে টেনে নিয়ে গেছেন। তার আশা করে আর লাভ নাই, বাড়ি গিয়ে বরং তার কুলখানির ব্যবস্থা করেন। গুনিনের মুখ এবং মুখের ভেতর লাল দাঁতগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নূরনিসার কেমন যেন লাগে, বুকের মাঝখানে কী একটা যেন চরকির মতো ঘুরতে থাকে। যেন একটা পাখি চক্কর দিচ্ছে বুকের খাঁচায়। চক্কর দিতে দিতে পাখিটা মাথার দিকে উঠতে থাকে। উঠতে থাকে…উঠতে থাকে। এই বুঝি নাকের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আকাশে উড়াল দেবে! কাঁপা হাতটা সে নাকের দিকে টানতে থাকে। নাকটা চেপে ধরার আগেই পাখিটা উড়াল দিল। একটা গোঙানির স্বর বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে। এক লাফে সে দাঁড়িয়ে গেল। দ্রুত গুনিনের কামরা থেকে বেরিয়ে মাজারপ্রাঙ্গণ মাড়িয়ে বটতলা দিয়ে প্রথমে পশ্চিমে গিয়ে কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে মোড় নিয়ে আবার দক্ষিণে ঘুরে সর্ষেক্ষেতে নামে। তারপর বিমর্ষ চোখে আকাশের দিকে তাকায়। দেখে, একটা কাক মুখে এক টুকরো সাবান কি একখানা হাড় নিয়ে উড়ছে। কাকটাকে ধনেশপাখি বলে মনে হয় তার। ‘বাবা বাবা’ বলে পাখিটার দিকে হাত দুটো বাড়িয়ে সে ছুটতে থাকে। মাজারপ্রাঙ্গণে যেসব ছেলেমেয়ে খেলছিল তার দশা দেখে তারা ইলিয়াসপীর অথবা কবরগুনিনের অলৌকিক কোনো কারামতি টের পায়। পেয়ে তারাও তার পেছনে ছুট লাগায়। তাদের হৈচৈ শুনে বুড়োরাও ছোটায় যোগ দিল। মানুষের বিশাল স্রোত ছুটতে লাগল তার পিছু পিছু। কেউ তাকে থামায় না, থামানোর চেষ্টাও করে না, একবার জিজ্ঞেসও করে না কেন সে এভাবে পাগলের মতো ছুটছে। ছুটতে থাকা মানুষদের মনে কিছুটা কৌতূহল, বাকিটা ভয়। শেষ বিকেলে ক্লান্ত সূর্য যখন পশ্চিমে গাছগাছালির আড়াল হলো, ছুটতে থাকা উৎসুক মানুষরাও যখন ক্লান্ত হলো, মস্ত আরেক বটগাছের তলায় নূরনিসাকে তারা মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে দেখল। ভয়ে কেউ তার কাছে ঘেঁষার সাহস করল না। নিশ্চয়ই জিনের কাণ্ড। বটগাছে জিন থাকে। আস্তানার বটগাছ থেকে জিনটা উড়াল দিয়ে এই বটগাছে চড়েছে। নইলে ঠিক ঠিক বটগাছের নিচে এভাবে সে পড়ে যাবে কেন? বেঁহুশ নূরনিসার বুকে সওয়ার হয়ে পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামে। জিন-ভূতে অবিশ্বাসী কলেজপড়ুয়া দুই যুবক সাহস করে বটতলার দিকে এগিয়ে যায় এবং অজ্ঞান নূরনিসাকে একটা রিকশায় তুলে শ্রীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।

রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টুকুর দুঃসংবাদটি জেনে তার মেজভাই এক মুহূর্তও দেরি না করে তূর্ণানিশিথা এক্সপ্রেসে চড়ে ভোরে চট্টগ্রাম এবং বিকেল নাগাদ সেন্টমার্টিন পৌঁছে। কোস্টগার্ড ও স্থানীয় জেলেদের প্রচেষ্টায় ঘটনার দিন দুজনের এবং পরদিন আরো একজনের লাশ উদ্ধার করা গেলেও টুকুসহ বাকি তিনজনের লাশের হদিস পাওয়া গেল না। ভাই আর কোনোদিন ফিরবে না জেনেও সৈকতে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করেছে, জোয়ারের সঙ্গে পচাগলা হলেও যদি লাশটা ভেসে আসে। সৈকতে ঢেউয়ের পর ঢেউ ভাঙল, স্থানীয় জেলেরা পরদিনও ট্রলার ভাসিয়ে যথাসাধ্য খুঁজল, কিন্তু না, টুকুর লাশের হদিস মিলল না। ফেইসবুকে আগাম বার্তা দিয়ে বুঝি সে চিরতরে চলে গেছে একদম সীমানার বাইরে।

১ম পর্বের লিংক    ● ○ ●  ৩য় পর্বের লিংক

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)