হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
902
0

পর্ব-১২

১১শ পর্বের লিংক

কব্জিকাটা লোকটা এবার চড়াও হলো তার উপর। লাঠিটা মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে শাসাল, মেরে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাল। তালেবের মতো জুলফিকার দমে যায়। মুখ আর খুলতে সাহস পায় না। সারা পথ মাঝিদের সঙ্গে আর একটা কথাও বলল না। মঈনের ফাটা ঠোঁটে এখনো রক্ত লেগে আছে, নাকের ডগাটা এখানো লাল। লোকটাকে দেখে তার ভয় হয়, একই সঙ্গে মাথায় রক্তও চড়ে। মাথায় একটা বাড়ি মেরে খতম করে দিতে ইচ্ছে করে। তালেবের উদ্দেশে বলে, শালার বেটাকে ধাক্কা মেরে যদি নিচে ফেলে দিতে পারতাম। তালেব তাকে হুঁশিয়ার করে, পাগলামি করিস না, সাবধান! ওরা জানোয়ার একেকটা। দেখছিস না হাতে কী।

মঈন এতক্ষণে খেয়াল করে লোকটার হাতে লম্বা একটা লাঠি আর মাস্টারের হাতে চকচকে একটা রিভলভার। সিঁড়ি বেয়ে দুজনকে নিচে নামতে দেখে ভয়ে জোঁকের মতো কুঁকড়ে গেল। কয়েক পা পিছু হটে দাঁড়াল। ভিড়ের আড়াল হয়ে পড়ে তালেব। অস্ত্র দেখে শোরগোলে মত্ত যাত্রীরা চুপসে গেল, বিস্ময়ে অস্ত্রটির দিকে তাকিয়ে রইল, সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দিল। রিভলভার হাতে দারোগার মতো হাঁটতে হাঁটতে রনির মুখোমুখি দাঁড়াল মাস্টার। যাত্রীদের চোখ রনির দিকে ফেরে। রনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গালে একটা চড় কষিয়ে দিল মাস্টার। সঙ্গে সঙ্গে কব্জিকাটা লোকটা লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে যাত্রীদের কেউ হুড়মুড়িয়ে নিচে নামতে লাগল, কেউ নামতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল, আর কেউ শেষ দৃশ্যটি দেখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। স্টোর রুমের গলিতে দাঁড়ানো মহিলাদের মুখে কথা ফোটে না ভয়ে। কাশু বুড়ো বুঝি মজা পায়। বলে, ঠিক মতন আছে। আঁই ন কই আগে? ওস্তাদের মুখের উওর কতা কইয়ছদে কিয়ল্লাই? এখন বোঝ ঠ্যালা!


যে মানুষটিকে খানিক আগে হাঁটাচলা করতে দেখেছে, হৈহল্লা করতে দেখেছে, প্রতিবাদে ফেটে পড়তে দেখেছে, সে কিনা এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে! নাকি লড়াই ক্ষ্যান্ত দিয়ে প্রাণটাকে যমের হাতে তুলে দিয়েছে!


রনি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে কতক্ষণ মার সয়। প্রতিবাদহীন। সইতে না পেরে একলাফে হেজের ছাদে উঠে পড়ে। তার পিছে পিছে কব্জিকাটা লোকটা ওঠে আবার শুরু করে মার। রনি দু-হাতে আঘাত ঠেকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। হাতের আঙুলগুলোতে আর শক্তি পায় না। সানগ্লাসটি মাথা থেকে ছিটকে গলিতে পড়লে পায়ে গুঁড়িয়ে দেয় মাস্টার। লোকটি থামে না। শরীরের সব শক্তি বাঁ হাতে জমা করে লাঠি চালায়। ঠেকানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় রনি শুয়ে পড়ে। এবার বুঝি মার বন্ধ হবে। কিন্তু না, মাস্টার তাকে লাথি মারে আর কব্জিকাটা লোকটা সমানে পেটায়। মারের চোটে রনি গড়াগড়ি খায় আর আর্তনাদ করে।

মার খেতে খেতে যখন বুঝল ক্ষমা না চাইলে রক্ষা নেই তখন সে মাস্টারের পা দুটি জড়িয়ে ধরে। যেন অবাধ্য সন্তান বাবার কাছে কৃত অপরাধের ক্ষমা চাইছে। ঠিক তখন লম্বা একটা ডেগার হাতে স্টাফ কেবিন থেকে ছুটে এল এক লশকর। ডেগারের উল্টোপিঠে রনির দু-হাতে প্রচণ্ড একটা আঘাত করে বলে, পা ছাড় বাইঞ্চোত! এ্যান সাহস তুই পাইয়ছদে কডে? রনি পা ছেড়ে দেয়। তার বুকে ও পিঠে সমানে লাথি চালায় মাস্টার। ফুটবলের মতো গড়াগড়ি খেয়ে রনি আবার তার পা দুটি জড়িয়ে ধরে, মাথাটা তুলে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাই ভাই…মাফ করে দেন ভাই। যা বলবেন অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। মাফ করে দেন ভাই…ভাই। মাস্টার এক ঝটকায় পা-টা ছাড়িয়ে আরেক মাথায় জোরসে একটা লাথি মারে―মাফ চোদাস শুয়রের বাচ্চা। ভাল কথা ভাল লাগে না তোদের? শালা ফকিরের বাচ্চা, জাহাজে উঠে বাবুগিরি মারাস!

মাস্টারের কথা শেষ হওয়ার আগে ডেগারটা যতটা পারল উঁচিয়ে রনির মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করল লশকর। ভিড়ের মধ্যে যারা দৃশ্যটা দেখল মুহূর্তের জন্য তাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল। যেন দৈব কোনো শক্তি এসে তাদের মুখে তালা দিয়ে গেল। বিস্ফারিত চোখে তারা দেখল, মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরে, মুখটা হাঁ করে, দুবার নিজের রক্তে গড়াগড়ি খেয়ে, একবার উঠে বসার চেষ্টা করে, ঘোলা চোখে একবার মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রনি। পা দুটি একবার ভাঁজ করে আবার সিধা করে তারপর নিথর হয়ে গেল।

গালাগালি করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে কেবিনে উঠে গেল মাস্টার। আকাশে এক ঝাঁক শকুন ওড়ে, জাহাজের চারদিকে ডলফিনের ঝাঁক লাফাতে শুরু করে। যাত্রীরা নির্বাক। তারা শকুনের ঝাঁক দেখতে পায় না, মাথার উপর বিস্তীর্ণ আকাশ দেখতে পায় না, তেজোদীপ্ত সূর্যটাও দেখতে পায় না, চারপাশের বিপুল জলরাশি এবং মাছেদের লাফালাফিও দেখতে পায় না। বিশ্ব চরাচরের দৃশ্যমান সব বস্তু ও অবস্তু তাদের দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেছে। তাদের ঘোলা চোখ রনির নিথর দেহটার দিকে স্থির। যে মানুষটিকে খানিক আগে হাঁটাচলা করতে দেখেছে, হৈহল্লা করতে দেখেছে, প্রতিবাদে ফেটে পড়তে দেখেছে, সে কিনা এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে! নাকি লড়াই ক্ষ্যান্ত দিয়ে প্রাণটাকে যমের হাতে তুলে দিয়েছে!

মানবিক বোধের তাড়নায় রনির নিথর দেহটার দিকে এগিয়ে যায় মঈন। মাথার কাছে হাঁটুগেড়ে বসে। বুকে হাত রাখে। কানটাকে একবার বুকের ওপর ঠেকায়। বুকের ওঠানামা কি এখনো আছে? নিঃশ্বাস কি এখনো আছে? পাগলের মতোই সে এসব কাণ্ড করে। চোখের সামনে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখে তার বোধ এখন মানবিকতার সর্বোচ্চ চূড়ায়। ধীরে ধীরে তার শরীরে কাঁপুনি ওঠে। রক্তনালিতে রক্তের বান ডাকে। ঘোরের মধ্যে সে তালেবের ডাক শুনতে পায়―সরে আয় মঈন, সরে আয়। মঈন সরে না। কাঁপতে কাঁপতে বিপন্ন চোখে একবার রনির রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকায়, একবার তালেবের ভয়ার্ত মুখের দিকে। কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। বাক তার রুদ্ধ হয়ে গেছে। বন্ধুর চোখের ভাষা বুঝতে পারে তালেব। বলার চেষ্টা করছে―আয় তালেব, জলদি আয়। আমাদেরই মতো একটা মানুষ মরে যাচ্ছে। আয়, আমরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করি।


মঈনের আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল গুলির শব্দে। জাহাজের পিছে উড়ন্ত গাঙচিলেরা দূরে সরে গেল। ঢেউমত্ত সাগর মঈনকে টেনে নিল তার গভীর উদরে।


ডেগার হাতে ইঞ্জিনরুম থেকে হন্তারক লশকরকে ছুটে আসতে দেখে চিৎকার করে ওঠে মঈন, বাঘের কবলে পড়ে মানুষ যেভাবে চিৎকার করে। যাত্রীরা লোকটাকে থামানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ছুটে এসে ঠিক একইভাবে, রনির মাথায় যেভাবে আঘাত করেছিল, মঈনের মাথায়ও প্রচণ্ড একটা আঘাত হানল। আঘাতটা ফস্কে মঈনের বাহুতে লাগল। বাহুর হাড়গোড় যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেল! ভয়ার্ত মঈন হেজের সিঁড়ির দিকে ছুট লাগায়, কিন্তু মানুষের ভিড় ঠেলে সিঁড়ি পর্যন্ত যেতে পারে না, পেছন থেকে শার্টের কলারটা চেপে ধরল লশকর। যাত্রীরা সরে দাঁড়াল। যেন সার্কাস চলছে, তারা সার্কাসের নীরব দর্শক, দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই কারো। কী করবে? তারা তো আদম। তাদের হাত নেই, পা নেই, মুখ নেই―আছে কেবল পলকহীন দুটি চোখ। নিষ্পলক চোখে তারা দেখে, মঈনকে টানতে টানতে দেওয়ানি হলের ওপর দাঁড় করায় লশকর। কেবিন থেকে মাস্টার নামে। হেজের ছাদে দাঁড়িয়ে রিভলভারটা তাক করে দ্রুত ট্রিগার চাপে। গুলিটা কোথায় লাগল কেউ ঠাওর করতে পারল না। মাস্টারও না। লশকরও না। মঈনের আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল গুলির শব্দে। জাহাজের পিছে উড়ন্ত গাঙচিলেরা দূরে সরে গেল। ঢেউমত্ত সাগর মঈনকে টেনে নিল তার গভীর উদরে।

রনির ফাটা মাথার রক্তধারা গড়িয়ে হেজের গলিতে পড়ে। রক্ত দেখে কাশু বুড়ো ছোটাছুটি শুরু করে। হায় হায়, মরে গেল, হায় হায়―বলতে বলতে হেজে ছুটে গেল। খানিক পর একটা গামছা হাতে বেরিয়ে এসে রনির রক্তাক্ত মাথাটা বাঁধতে শুরু করল। কিন্তু এত রক্ত! রক্তে তার দু-হাত ভিজে যায়, লাল গামছাটা রক্তে আরো লাল হয়ে ওঠে। হঠাৎ কি যে হয় কাশুর, রক্তের ওপর বসে, রনির মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করে। একটা নিহত মানুষের জন্য শোক করাটাও জাহাজিদের চেখে অন্যায়। তারা জাহাজের মালিক, পাঁচ শ একাশিজন আদমের হর্তাকর্তা। তাদের যেমন খুশি আদমদের সঙ্গে তেমন ব্যবহার করবে। তুমি কে হে কাশু, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নিহতের জন্য শোক করছ? ইঞ্জিনরুম থেকে কব্জিকাটা লোকটা ছুটে এসে কাশুর পিঠে প্রচণ্ড একটা লাথি মেরে বলে, মায়া চোদাস মাদারচোদ। ভাগ এখান থেকে! কাশু নড়ে না। রনির মাথাটা বুকে নিয়ে আরো জোরে কাঁদতে শুরু করে, নিহত পুত্রের লাশ বুকে নিয়ে পিতা যেমন কাঁদে, সোহরাবের লাশ বুকে নিয়ে যেমন কেঁদেছিল রুস্তম। পাঞ্জাবির কলার ধরে টানতে টানতে লশকর তাকে ম্যানহোলের সিঁড়ির মুখে নিয়ে এল। কাশু সিঁড়িতে পা রাখবে, পেছন থেকে তখন মারল আরেকটা লাথি। কাশু মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। হামাগুড়ি দিয়ে উঠে সিঁড়ি বেয়ে হেজে নেমে গেল। বিস্মিত যাত্রীরা দ্বিগুণ বিস্ময়ে দেখল ডেগারধারী লশকরটা রনির পেটে ডেগারটা ঢুকিয়ে টান মারল। যেন কোরবানির গরুর ভুড়ি কাটছে। গলগল করে রক্ত বেরুতে লাগল। তালেবের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ধরার মতো হাতের কাছে কিছু খুঁজে পায় না, কেবিনের সিঁড়ির গোড়ায় ধপাস করে পড়ে গেল। জুলফিকার তার সিথানে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে মাথায় হাত বুলায়, মুখে ছিটা দেওয়ার জন্য এক মগ পানি চায়, কিন্তু কেউ নড়ে না। নড়বে কী করে! নড়ার মতো শক্তি তো থাকতে হবে শরীরে! কাঁপতে কাঁপতে আবার উপরে উঠে এল কাশু। সারা গায়ে রক্ত। যাত্রীরা সরে তাকে জায়গা করে দেয়। দুই লশকর রনির লাশটাকে টেনে তুলে দোলনার মতো দুলিয়ে সাগরে ছুড়ে মারে। কাশু হায় হায় করে ওঠে। ভিড় ঠেলে ইঞ্জিনরুমে গিয়ে একটা টেবিলে দাঁড়িয়ে ফোটবাড়ির ফোকর দিয়ে ঘূর্ণায়মান জলে রনির লাশটা দেখার চেষ্টা করে। পেটকাটা লাশ কি আর জলে ভাসে? অথৈ জলের অতলে এতক্ষণে তার লাশ হাঙর-কুমিরে খুবলাতে শুরু করেছে।


তাদের পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, সে কথাও ভুলে যায়। দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাদের সব ক্ষুধা তৃষ্ণা, সব চাওয়া-পাওয়া মিটিয়ে দিয়েছে।


জলের শরীর দু-ভাগ করে জাহাজ এগিয়ে চলে। মাস্টার তার রিভলভারটা আঙুলের ডগায় ঘোরাতে ঘোরাতে কেবিনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সবাইকে হুঁশিয়ার করে, জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছার আগে কেউ যদি অকারণে ছাদে ওঠে তার পরিণতিও এমন হবে। যেমন হয়েছে রনির, যেমন হয়েছে মঈনের। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সবাইকে সে ছাদ খালি করার হুকুম করে। কেউ কি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? যুদ্ধে পরাজিত সৈন্যদলের মতো একে একে সবাই নিচে নামতে থাকে। তাদের মুখ ধোয়ার দরকার ছিল, সে কথা ভুলে যায়। তাদের তৃষ্ণা লেগেছিল, সে কথাও ভুলে যায়। তাদের পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, সে কথাও ভুলে যায়। দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাদের সব ক্ষুধা তৃষ্ণা, সব চাওয়া-পাওয়া মিটিয়ে দিয়েছে। হেজের গুমোট অন্ধকারে তারা নির্বাক বসে থাকে। কেউ কথা বলার শক্তি পায় না। যেন তারা কথা বলতে ভুলে গেছে, যেন তারা আজন্মের বোবা, কোনোদিন তারা কথা বলে নি, ভবিষ্যতেও কোনোদিন বলবে না। জাহাজ গন্তব্যে না পৌঁছা পর্যন্ত তারা এভাবেই নির্বাক বসে থাকবে, ভুলেও কেউ ওপরে ওঠার চেষ্টা করবে না। কিন্তু নিচে তো কোনো টয়লেট নেই। তারা তো মানুষ। গোয়ালের গরু-ছাগলের মতো শোয়ার স্থানে তো হাগতে-মুততে পারে না। তাই উপরে তাদের উঠতেই হয়। ভয়ে ভয়ে। কাজ শেষ করে দ্রুত আবার নেমে যায়। লশকররা সামনে পড়ে গেলে মুখের দিকে তাকায় না। তাকালেও দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। যেন তারা চোর। ধরা পড়লে রক্ষা নেই।

আলোর রথে চড়ে বেলা এগোয়। কতটা এগুলো কেউ টের পায় না। দুপুর না বিকেল আন্দাজ করতে পারে না। হয়তো দুপুর। নইলে খাবারের ডাক পড়বে কেন? গত দিনের মতো আবার তারা পালা করে ইঞ্জিনরুমে যায়। বাবুর্চির চোখের দিকে কেউ ভুলেও তাকায় না। এক থালা ভাত আর দুটি করে পোড়া লঙ্কা গোগ্রাসে গেলে। একবারও কেউ জিজ্ঞেস করে না তরকারির কথা, ভুলেও কেউ দাবি না আরেক থালা ভাতের, বলার কেউ চিন্তাও করে না আরেক মগ পানি দাও। সারা দিনে যদি একটা দানাও খেতে না পায়, তবুও কিচ্ছু বলবে না কেউ। দু-একদিন না খেলে মানুষ মরে না, কিন্তু খেতে চাইলে মরে, কথা বললে মরে। অতএব চুপ। জুলফিকার চুপ, ওসমান চুপ, দীপঙ্কর চুপ, কমলও চুপ। থালাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তালেবও চুপচাপ খায়। ভাতের সঙ্গে অশ্রুও খায়। খাওয়ার সময় অন্তত চোখের অঝোর বর্ষণটা থামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু পোড়া চোখে এত জল, কিছুতেই থামে না, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ভাতের থালায়। কথা বলে শুধু একজন, কাশু বুড়ো। সে খায় আর বকে―এত গোস্ত খাইয়্যুমদে ক্যানে? দাঁতর নিচত খালি কাঁচা গোশতের টুকরা পড়ের। কাঁচা গোস্তা ক্যাংগরি খায়? এক্কানা ধোন দরকার ন আছিল? রক্ত লাগি রইয়্যে…রক্ত।

কেউ তার এসব অসংলগ্ন কথা শুনতে পায় না। শুনলেও পাত্তা দেয় না। ভাবে, লোকটার বুঝি মাথা খারাপ। নইলে কাঁচা গোশ্‌তের কথা বলবে কেন? জাহাজে যারা আগে উঠেছে তারা তার সম্পর্কে ভালো করেই জানে। সারাক্ষণ শুধু বকবক করে। প্রথম যেদিন জাহাজে উঠল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে যাত্রীদের সোহরাব-রুস্তমের কাহিনি শোনাল। শুনতে শুনতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল, তবু তার কাহিনি থামল না। সেদিনই তারা টের পেয়েছিল লোকটার মাথায় গণ্ডগোল আছে। নইলে রাত জেগে কেউ একা একা বকে?


জন্মগতভাবেই মানুষ বর্বর। রক্তের সঙ্গে মানুষ বর্বরতা বহন করে চলেছে। মানুষ আর একটা সিংহের মধ্যে, মানুষ আর একটা বাঘের মধ্যে, মানুষ আর একটা হায়েনার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই।


কাশুর গোশত খাওয়ার অন্তর্নিহিত ভাবার্থ বুঝতে কমলের অসুবিধা হয় না। খেতে খেতে সে তার মুখের দিকে তাকায়। জামা-কাপড়ে এখনো রক্তের চোপ লেগে আছে। ধুয়েছে। কিন্তু রক্তের দাগ কি আর সহজে মোছে? কাঁচা রক্তের চোপ দেখে খাবারে অরুচি আসে তার। অর্ধেক ভাত সে খেয়েছে, বাকি অর্ধেক আর গিলতে ইচ্ছে করে না। তবু গিলে। না গিলে উপায় কী? আবার কখন খেতে পাবে তার তো কোনো ঠিক নেই। জোর করে তাই শুকনো ভাতগুলো পেটে চালান করে। প্রতিটি গ্রাস মুখে তোলার সময় হাতটা থরথর করে কাঁপে। নিজের কম্পমান হাতের দিকে তাকিয়ে তার অবাক লাগে। ভাবে, আমি কি বুড়ো হয়ে গেলাম? আমার বয়স কি আশি-নব্বুই হয়ে গেল? আমি কি মুমূর্ষু মৃত্যুপথযাত্রী? আয়না থাকলে চেহারাটা একবার দেখে নিত একটি লাঠি, একটি রিভলভার আর সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা দুটি লাশ তাকে তাড়াতে তাড়াতে…তাড়াতে তাড়াতে জীবনের শেষপ্রান্তে নিয়ে এল কিনা। জীবনে সে অনেক মৃত্যু দেখেছে। বাসে চাপা পড়া মানুষের মাথা থেঁতলে মগজ ছিটকে যেতে দেখেছে, ট্রেনে কাটা পাড়া নারীর দ্বিখণ্ডিত লাশ দেখেছে, হাসপাতালের মর্গে দুর্ঘটনায় ভীবৎস বহু লাশ দেখেছে। কিন্তু নিজের চোখের সামনে এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এই প্রথম দেখল। মানুষ মানুষকে এভাবে মেরে ফেলতে পারে? এত নিষ্ঠুরভাবে? এত নির্মমভাবে? মানুষের জীবন কি তবে এতই মামুলি? ফু দিলেই উড়ে যায়?

খাওয়া শেষে অবসাদগ্রস্ত যাত্রীরা যখন ঘুমায়, অথবা ঘুমের ভান করে যখন চোখ বুজে থাকে, অথবা চোখ বুঝে অন্ধকারে যমের হাতছানি টের পেয়ে চোখ দুটি খুলে রেখে আকাশ-পাতাল ভাবে, কমল তার পিঠের ব্যাগ থেকে কলম আর ডায়েরিটা বের করে। একটা পাতায় লেখে―মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ এই প্রবাদ মিথ্যা। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এই প্রবাদও মিথ্যা। মানবসভ্যতা মিথ্যা। মানুষ কোনোকালে সভ্য ছিল না। জন্মগতভাবেই মানুষ বর্বর। রক্তের সঙ্গে মানুষ বর্বরতা বহন করে চলেছে। মানুষ আর একটা সিংহের মধ্যে, মানুষ আর একটা বাঘের মধ্যে, মানুষ আর একটা হায়েনার মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। বস্তুত মানুষ এখনো পশুত্বের সীমা অতিক্রম করতে পারে নি। কোনোদিন পারবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)