হোম গদ্য উপন্যাস শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা

শেষ জাহাজের আদমেরা
529
0

পর্ব-১০

৯ম পর্বের লিংক

ওসমান তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাতে কান্না আরো উস্কে উঠে। কাঁদতে কাঁদতে সরু গলিতেই সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। দারুণ বিপন্ন বোধ করে ওসমান। অল্প সময়ে লোকটার সঙ্গে তার খাতির হয়ে গেছে। কথা একটু বেশি বলে, কিন্তু মনটা সাদা। শেষরাতে ট্রলারে দু-টুকরো পাউরুটি আর একটা সবরি কলা খেতে দিয়েছে। ওসমানের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। মঈনের ঘটনাটা শুনে এমনিতেই সে উদ্বিগ্ন, জুলফিকারের হাল দেখে উদ্বেগ আরো বাড়ে। যাত্রাতেই এমন গণ্ডগোল, কে জানে কী আছে ভবিষ্যতে! ভাবে, ডাক্তার কি তার সঙ্গে প্রতারণা করল? শিক্ষিত মানুষ এমন প্রতারক হতে পারে! কে জানে, প্রতারণা হয়ত করে নি, প্রতারণা করার মতো মানুষ নয় ডাক্তার। তার খারাপ কোনো মতলব থাকলে টাকা নিয়ে আগেই চম্পট দিতে পারত, চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিত না। নিশ্চয়ই কোথাও বড় কোনো ঝামেলা হয়েছে। একসঙ্গে এত মানুষ মালয়েশিয়া যাবে তার হয়ত জানা ছিল না। যাত্রী বেশি হয়ে যাওয়ায় ট্রাভেল এজেন্সির মালিকেরও হয়ত কিছু করার ছিল না।

জীবনে বড় হতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়―বাড়ি থেকে যাত্রার সময় মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিল তার বাপ। কথাটি ভেবে মনে কিছুটা জোর পায়। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়―এ আর এমন কী কষ্ট, এর চেয়ে কত কত কষ্টের অভিজ্ঞতা তার! কতদিন শুধু মাড় খেয়ে পার করে দিয়েছে, কত দিন উপোস কাটিয়ে দিয়েছে। সেসব দিনের কথা এখনো তো ভোলে নি। দু-একদিন উপোস থাকলে কি আর মরে যাবে? জাহাজটা তো চিরকাল সমুদ্রে থেমে থাকবে না, একদিন না একদিন মালয়েশিয়া পৌঁছবেই। কয়টা দিন কষ্ট না হয় করলই, তারপর তো কেবল সুখ আর সুখ।

যাত্রীরা হেজে নামার কিছুক্ষণ পর চটের একটা বস্তা হাতে দুজন লশকরসহ বাবুর্চি এসে জনপ্রতি একটি করে ঠোঙা বিতরণ করতে লাগল। রাতের খাবার হিসেবে ভেতরে এক মুঠো চিড়া আর এক টুকরো গুড়। খিদায় কাহিল যাত্রীদের মাথা কি আর ঠিক থাকে? শুরু হলো তুমুল হট্টগোল―ভাত না দিয়ে এসব কেন? এসব খেয়ে থাকা যায়? ভাত চাই ভাত, আমরা খাব না এসব। বিক্ষুব্ধ ক’জন যাত্রী ঠোঙাগুলো ছুঁড়ে ফেলল। বাবুর্চি চোখ পাকিয়ে তাদের শাসায়―কথা কম বলো মিয়ারা। এটা শ্বশুরবাড়ি পাইলা? ভাত এক বেলার বেশি পাবে না। যাত্রীরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। কয়েক মুহূর্তের জন্য হেজজুড়ে নীরবতা নামে। প্রত্যেকের চোখে-মুখে বিস্ময়। কী বলে বাবুর্চি এসব! এমন আশ্চর্য কথা যেন জীবনে কোনোদিন তারা শোনে নি। জুলফিকার বলল, এসব কথা আগে বলা হলো না কেন? এটা কোন ধরনের চিটারি!

বাবুর্চি তার কথা শুনেও শুনল না, ঠোঙা বিলাতে বিলাতে লশকরদের নিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। জুলফিকার সমানে বকতে থাকে―চিটারির আর জায়গা পাও না নাফারমানের বাচ্চারা! খোদার গজব পড়বে মাথায়। মানুষকে ঠকিয়ে বড়লোক হবে? কবরে মুগুর মেরে বড়লোকি বের করবে, হুঁ হুঁ…। ওসমান তার কথায় তাল দেয়, বাবুর্চির মা-বোন ধরে গালাগালি করে তালেব। এক যাত্রী নিজেদের ভাগ্যকে দোষারোপ করে―শালার কপালটাই খারাপ। মাথায় কিস্তি টুপিঅলা বুড়ো আবুল কাশেম ওরফে কাশুমিয়া, সোহরাব-রুস্তমের কাহিনি যার মুখস্থ, যে সকাল থেকেই জাহাজিদের পক্ষে সাফাই গেয়ে আসছে, বাবুর্চির কথার যৌক্তিকতা খুঁজে পায়। ইনিয়ে-বিনিয়ে একবেলা ভাতের পক্ষে সে নানা যুক্তি হাজির করে। বলে যে, তিন বেলা ভাত দেওয়া তো আসলেই অসম্ভব। এতগুলো মানুষের জন্য রান্না কি সোজা কথা? রান্নার জন্য চাল লাগে, তরিতরকারি লাগে। কাঁচা তরকারি কি জাহাজে একদিনের বেশি রাখা যায়? তা ছাড়া রান্নার জন্য লাকড়ি লাগে, নইলে সিলিন্ডার গ্যাস লাগে। ছোট্ট একটা জাহাজ, মানুষের মাথা মানুষে খাচ্ছে, এত মাল-সামান তুলতে গেলে তো জাহাজটা তলিয়ে যাবে।


জোর করে মানুষ মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়, জায়গা-জমি দখল করে, হামলা-মামলা করে, জেলে পাঠায়, জোর করে বিয়ে করে, ধর্ষণও করে। কিন্তু জোর করে কেউ কাউকে বিদেশ নেয় এমন কথা জীবনে কোনোদিন শোনে নি।


বিকেলে আন্নিতে দাঁড়িয়ে মোবাইলে যে তরুণটি ছবি তুলেছিল, রনি, রাতেও যার চোখে সানগ্লাস, কাশুর মুখের সামনে তর্জনী নাড়াতে নাড়াতে বলল, দালালি থামান চাচা! নগদ আশি হাজার টাকা দিয়েছি, বুঝলেন? এক টাকাও কম নেয় নি। টাকা নেওয়ার সময় তো বলে নি ভাত একবেলার বেশি দেওয়া হবে না। এখন এত নাটক কেন? কাশুর সব যুক্তি হাওয়ায় উড়ে গেল। মুখ আর খুলতে পারে না সে। এশার নামাজ পড়ার অজুহাতে হেজের কোণায় উপরে উঠার সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল। জুলফিকার ততক্ষণে এক কোনায় গামছা বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেছে। তার পেছনে বসে ফ্যাঁ ফ্যাঁ করছে মঈন। শাহপরীর জেটিঘাট থেকে সেই যে কান্না শুরু করেছে আর থামায় নি, অবিরাম চালিয়ে যাচ্ছে। কাঁদছে, কিন্তু চোখে পানি নেই। চোখে কি আর এত পানি থাকে? যা ছিল ট্রলারেই তো সব নিঃশেষ করে দিয়েছে। বিরক্ত জুলফিকার নামাজের সালাম ফিরিয়ে ধমকে ওঠে―ছাগলের মতো ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করো না তো ভাই! তুমি কি মিয়া শিশু? পুরুষ মানুষ, শরম লাগে না এভাবে কাঁদতে?

কথাগুলো মঈনের আঁতে গিয়ে বিঁধল। লজ্জা পেয়ে কান্না থামায়। সে আস্ত একটা পুরুষ এতক্ষণে বুঝি টের পেল। কান্না থামে, কিন্তু আতঙ্ক কাটে না। কাটবে কিভাবে? জোর করে কেন তাকে বিদেশ নেওয়া হচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর তো এখনো পায় নি। জোর করে মানুষ মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়, জায়গা-জমি দখল করে, হামলা-মামলা করে, জেলে পাঠায়, জোর করে বিয়ে করে, ধর্ষণও করে। কিন্তু জোর করে কেউ কাউকে বিদেশ নেয় এমন কথা জীবনে কোনোদিন শোনে নি। বিদেশ সে যেতে চায় না তা নয়। তালেবের মতো জমা টাকা থাকলে সেও চেষ্টা করে দেখত। কোনো চেষ্টাই করল না, কাউকে একটা পয়সাও দিল না, মুখ ফুটে কোনোদিন বিদেশ যাওয়ার কথা কারো কাছে উচ্চারণ পর্যন্ত করল না, অথচ তাকে কিনা জোর করে বিদেশ নেওয়া হচ্ছে! সারা দিন নানাজনের কাছে জিজ্ঞেস করেছে, কেউ ঠিক উত্তরটি দিতে পারে নি। মুরুব্বি মানুষ কাশুমিয়া, তার কাছেও জানতে চেয়েছিল একবার। সে হাসতে হাসতে বলেছে, মালয়েশিয়া যাইবা ইয়ান তো এক্কান খুশির কথা। তুঁই চিন্তা করদ্দে কিয়াল্লাই আঁই ত ন বুঝির! চিড়া-গুড় খাওয়া শেষ করার আগেই হঠাৎ হেজের দুই প্রান্তের বাল্ব দুটি নিভে গেল। নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। ছাদের চার কোনার চারটি ফোকড় দিয়ে আকাশটা দেখা যায়। আলো-বাতাস ঢোকার জন্য দেখতে টাইলস-এর মতো ছাদের হলকাগুলো তুলে ফোকড়গুলো করা হয়েছে। ফোকড়গুলো থাকায় দিনের বেলায় ভেতরে আলো-বাতাস ঢুকতে পারে। সব কটি হলকা সরিয়ে ছাদটা উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছিল যাত্রীরা, মাস্টার রাজি হয় নি।

আলোর জন্য সবাই শোরগোল শুরু করল―এটা কেমন কথা! রাত না নামতেই বাতি নিভিয়ে দিল কেন? মানুষের কি হাগা-মোতা লাগে না? এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসে? কেউ শিষ দিতে লাগল, কেউ জাহাজিদের গালাগালও করতে লাগল। কিন্তু কে শোনে তাদের গালাগাল? জাহাজিরা তো কেবিনে, শোনার মতো কে আছে? তারা বলে তারাই শোনে। বলতে বলতে শুনতে শুনতে যখন বুঝল ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছু করার নেই, ঘুমের দোয়া পড়তে পড়তে গাদাগাদি করে সবাই শুয়ে পড়ে। গাদাগাদি, কারণ, এখানে, পেছনের এই দুই নম্বর হেজে শুতে পারে বড়জোর দুই শ মানুষ, অথচ শুয়েছে প্রায় আড়াই শ। বাকিরা সামনের এক নম্বর হেজে। দুই নম্বর হেজের তুলনায় এক নম্বর হেজটা ছোট। মাঝখানে চটের পর্দা ঝুলিয়ে দুই ভাগ করা। এক ভাগে মহিলা এবং আরেক ভাগে আছে পুরুষরা। এক হেজ থেকে আরেক হেজে যাওয়ার পথ নেই। আলাদা ম্যানহোল, আলাদা সিঁড়ি।


আদম থেকে ঈসা পর্যন্ত যত নবী-রসুল দুনিয়ায় এসেছে তাদের কী দশা হবে, সূর্য মাথার কয় বিঘত উপরে থাকবে, মুমিনরা বিজলির গতিতে কিভাবে পুলসিরাত পার হবে, পাপীরা কিভাবে কাটা পড়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে ইত্যাদি।


অন্ধকারে কার পায়ের চাপ খেয়ে একজন ককিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ধমক―দেখে হাঁটতে পারো না মিয়া! এতক্ষণ চুপচাপ থাকা জুলফিকার বলল, আজব কথা শোনালেন ভাই, অন্ধকারে মানুষ চোখে দেখে? মানুষ কি বাদুড়? তার কথায় হাসির রোল উঠল। হাসি থামলে শুরু হলো তার বকাবকি, শুয়ে শুয়ে সে বকে চলে―মানুষকে তো দেখছি বিশ্বাস করা পাপ। মানুষ এতটা বিশ্বাসঘাতক হতে পারে! হায়দর আলী এমন চিটারি করল! কল্পনাও তো করতে পারি নি এমন চিটারের পাল্লায় পড়ব। কী ভেবেছ তুমি? মনে করেছ আল্লাহ কিছু দেখছে না? সব দেখছে, সব। কাল হাশরের মাঠে এই চিটারির জবাব দিতে হবে না ভেবেছ? ভুল, ভুল ধারণা তোমার। কড়ায় গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে।

তার কথাগুলো ধীরে ধীরে ওয়াজের সুর পায়। সুরে সুরে সে হাশর দিনের নানা অবস্থার কথা বয়ান করে। সেদিন আল্লাহ কোথায় থাকবেন, তার পেয়ারে হাবিবের স্থান কোথায় হবে, আদম থেকে ঈসা পর্যন্ত যত নবী-রসুল দুনিয়ায় এসেছে তাদের কী দশা হবে, সূর্য মাথার কয় বিঘত উপরে থাকবে, মুমিনরা বিজলির গতিতে কিভাবে পুলসিরাত পার হবে, পাপীরা কিভাবে কাটা পড়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে ইত্যাদি। শ্রোতাদের কেউ চুপচাপ শোনে, শুনতে শুনতে কেউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কাশু বুড়ো হু হু স্বরে একেকবার কেঁদে ওঠে। কেউ কেউ আবার বিরক্তও হয়। যেমন দীপঙ্কর। অন্য সময় হলে জুলফিকারের সঙ্গে সে তর্ক-বাহাস শুরু করে দিত, কঠিন সব যুক্তি দিয়ে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ত। কিন্তু এখন তার শরীরে ক্লান্তি, মনে উদ্বেগ। তর্ক-বাহাস তো দূরের কথা, মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করছে না। শুনতেও না। তবু কমল আতঙ্কে আছে কখন আবার সে বাহাস শুরু করে দেয়! ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বাহাস করার জন্য সে মুখিয়ে থাকে, সুযোগ পেলেই ধর্ম নিয়ে যার তার সঙ্গে বিতর্ক শুরু করে দেয়। কমল আবার তর্কে যায় না। ধর্মে তারও মতি নেই, ধর্ম নিয়ে আবার মাতামাতিও নেই।

কিন্তু জুলফিকারেরর ওয়াজ না থামলে তো ঘুমানো মুশকিল। সুনসান নীরবতা ছাড়া তার আবার ঘুম আসে না। হাঁচি-কাশির শব্দেও তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। গলাটাকে যথাসম্ভব নরম করে, কোনোভাবে যাতে বিরক্তি প্রকাশ না পায়, সে ডাক দিল―হুজুর!
জুলফিকার জবাব দেয় না।
ও হুজুর!
জি, বলুন।
রাত তো কম হয় নি, এখন ঘুমান। সকালে সবাই মিলে আপনার ওয়াজ শুনব।
জুলফিকার আরো কিছুক্ষণ চালিয়ে তারপর থামে। এবার শুরু হয় কাশু বুড়োর গুনগুনানি। কান্নার সুরে গুনগুন করে সে গজল গাইতে শুরু করে। বেসুরো গলা, কিন্তু সুরটা আসছে ভেতর থেকে। প্রাণ থেকে নির্গত সুর শ্রোতার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কি এক বেদনা ঝরে ঝরে পড়ে তার গুনগুনানিতে, যে বেদনা মুখে প্রকাশ করা যায় না, মুখের কথায় ঠিক ধরা যায় না।
তার বেদনাসিক্ত গজলের সুরে কমলের মাথার ভেতর আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে পূর্ববঙ্গ গীতিকার পঙ্‌ক্তিগুলো। বহুদিন আগে ঢাকার নীলক্ষেত থেকে অল্প দামে বইটির একটা পাইরেটেড কপি কিনেছিল। পালাগুলো এতই ভালো লেগেছিল বারবার পড়তে পড়তে বহু পঙ্‌ক্তি মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় জুলফিকারের কাছ থেকে যখন জানল জাহাজটি মালয়েশিয়া যাবে তারপর থেকেই পঙ্‌ক্তি কয়টি মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে―

সেই না সাইগরের মাঝে হার্ম্মাদ্যার দল
বাঁকে বাঁকে ঘুরে সদাই বড় বেয়াকল।
লুঠতরাজ করে তারা আর দাগাবাজি
সাইগরে হার্ম্মাদ্যার ডরে কাঁপে নায়র মাঝি।


রোহিঙ্গারা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে, বড় বড় পাহাড় ডিঙিয়ে চোরাইপথে বাংলাদেশে ঢুকছে না? জীবনের মায়ায় তারা ঝুঁকি নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি দিচ্ছে।


পঙ্‌ক্তিগুলো তাকে ইতিহাসের গভীরে টেনে নিয়ে যায়। চার শ বছর আগের সেই ইতিহাস, যে ইতিহাসের নজির সমগ্র পৃথিবীতে বিরল, যে ইতিহাস মগ-ফিরিঙ্গি হার্মাদদের ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস, মানবতা নিয়ে হোলিখেলার ইতিহাস। পশ্চিম দিগন্তে সোনালী আবীরের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে ইতিহাসের সেসব অধ্যায় সিনেমার দৃশ্যের মতো একে একে তার মানসপটে ভেসে উঠছিল। এতটাই বুঁদ হয়ে ছিল, সবাই হেজে নেমে যাওয়ার পরও সে একা আন্নির রেলিং ধরে আলো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।
মাইকটা আবার বেজে উঠল―কী মিয়া, কথা কানে ঢোকে না?
সে সাড়া দেয় না। শুনেছে বলেও মনে করে না।
মাইকে এবার ঝাঁঝাল কণ্ঠ―বয়রা নাকি এ্যাঁ? নিচে নামতে বলছি শুনছ না?

মগ্নতায় এবার ছেদ ঘটে, অতীত থেকে সে বর্তমানে ফেরে। কেবিনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে একা আবিষ্কার করে খানিকটা অবাক হয়। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা চলবে না বুঝে পশ্চিম দিগন্তে শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে ধীর পায়ে দুই নম্বর হেজের ম্যানহোলের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। সিঁড়ির গোড়ায় দীপঙ্করের দেখা পায়। দীপঙ্কর যারপরনাই উদ্বিগ্ন। ভেতরে মানুষ আর মানুষ। ভেতরে এত মানুষ আছে সে ধারণাও করে নি। এতগুলো মানুষ ছোট্ট এই জাহাজে চড়ে কিনা চোরাইপথে মালয়েশিয়া রওনা হয়েছে! অবাক লাগে তার। জীবনের মায়া কি নেই এদের? আবার ভাবে, জীবনের মায়াতেই হয়ত তারা এই ঝুঁকি নিয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে মানুষ তো চোরাইপথে বিদেশ যায়। বাঙালিরা কি চোরাইপথে ইউরোপ-আমেরিকার নানা দেশে যাচ্ছে না? মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরও তো যায়। রোহিঙ্গারা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে, বড় বড় পাহাড় ডিঙিয়ে চোরাইপথে বাংলাদেশে ঢুকছে না? জীবনের মায়ায় তারা ঝুঁকি নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি দিচ্ছে। তারা দেশহীন, তারা উদ্বাস্তু, তারা নিরন্ন। জাতিগত বিদ্বেষ ও সামরিক বাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নে নাস্তানাবুদ এক আসহায় জাতি। তাদের ওপর চলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। চলে বিটিএফ, ইউএমপি, শিউ কাই, নাগাজিন, মাইয়াট মন, সেব ও নাগামিন নামের ভয়াবহ অপারেশন। পূর্বপুরুষের বসতভিটা থেকে তাদের উচ্ছেদ করে প্রত্যাবাসন করা হয় মগ-রাখাইনদের, জবরদস্তিমূলক শ্রমদানে তাদের বাধ্য করা হয়, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় যাতায়াতে, বন্ধ করা হয় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাতের আঁধারে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের ঘর। চলে লুন্ঠন, অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা এবং গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের মসজিদ। দমন-পীড়নে অতীষ্ঠ হয়ে জীবনের মায়ায় চোরাইপথে তারা মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হতেই পারে। জুলফিকারের মতো যেসব বাঙালি মালয়যাত্রা করেছে তার পেছনেও নিশ্চয়ই কারণ আছে। হয়ত অভাব-অনটনের শিকার হয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্নে সমুদ্রের দুর্গম পথে তাদের এই যাত্রা। কিন্তু তাকে আর দীপঙ্করকে কেন জার করে জাহাজে তোলা হলো? কাউকে তো কখনো বলে নি মালয়েশিয়া যেতে চায় তারা।
দীপঙ্কর বলল, কিছু তো মাথায় ধরছে না, দাদা। মালয়েশিয়ায় নিয়ে কী করবে আমাদের?
কমল বলল, কেন যেন মনে হচ্ছে তারা আমাদের দাস হিসেবে বেচে দেবে।
ধুর ভাই, পৃথিবীতে এখন কি দাস বেচা-কেনার কারবার আছে?
কমল চুপ করে থাকে। উত্তর কিছু খুঁজে পায় না।
দীপঙ্কর উদ্বেগের স্বরে বলে, মেরে ফেলবে না তো আবার?
বিচিত্র কিছু নয়, মারতেও পারে।
আমাদের মেরে তাদের কী লাভ?

কমল চুপ করে থাকে। তারও একই প্রশ্ন―কী লাভ? কোন লাভে তাদের অপহরণ করে আনা হলো? কোন লাভে তাদের মালয়েশিয়া নেওয়া হচ্ছে? উত্তর খুঁজে পায় না। কে জানে, এমনও হতে পারে, তাদের হত্যা করে চোখ আর কিডনিগুলো বেচে দেবে আন্তদেশীয় কোনো চক্রের কাছে। এমন হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। পত্রপত্রিকায় এমন সংবাদ তো প্রায়ই ছাপা হয়। রাত গভীর থেকে গভীর হলো, চাঁদটা মাঝ আকাশে উঠে এল। কাশুর গুনগুনানি থেমে গেছে, যাত্রীরা ঘুমাচ্ছে অথবা ঘুমানোর চেষ্টায় চোখ বন্ধ করে রেখেছে। কমলও ঘুমাতে চেষ্টা করে, কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসে না চোখে। কিভাবে আসবে, ঘুম তো মস্তিষ্কের ব্যাপার। তার মস্তিষ্কটা তো দখল করে রেখেছে পূর্ববঙ্গ গীতিকার পঙ্‌ক্তিগুলো। মৌসুমি বায়ুকুণ্ডলির মতো ঘুরছে তো ঘুরছেই। যতই ঘোরে ততই তার উদ্বেগ বাড়ে। পঙ্‌ক্তিগুলো তাকে চার শ বছর আগের মগ-ফিরিঙ্গি হার্মাদদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কেবলই মনে হয়, যেন সে হার্মাদের কবলে পড়েছে। চার শ বছর পর হার্মদরা আবার ফিরে এসেছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেবলই এ-পাশ ও-পাশ করে। পঙ্‌ক্তিগুলো মাথা থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়, কিন্তু পারে না। পঙ্‌ক্তিগুলো পূর্ববঙ্গ গীতিকার কোন পালার মনে করার চেষ্টা করে। ভেলুয়ার, পরীবানুর হাঁহলার, নাকি নুরুন্নেহা ও কবরের কথার? নাহ, ঠিক মনে করতে পারে না। হার্মাদের ভয় মন থেকে তাড়াতে সে ভেলুয়ার চেহারাটা কল্পনা করে, তার চোখের ভঙ্গিমা কল্পনা করে, তার চিকন কেশের কথা কল্পনা করে। ভেলুয়ার ছবি কল্পনা করতে করতে কল্পনা ধাবিত হয় নুরুন্নেহার দিকে। নুরুন্নেহার মুখখানা কল্পনায় ধরতে গিয়ে, কি আশ্চর্য, ভেসে ওঠে লাবনীর মুখ। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। কে জানে লাবনী কী করছে এখন। নিশ্চয়ই সারাদিন সারা রাত তার নম্বরে ডায়াল করেছে। কোনোভাবে সংযোগ পাচ্ছে না বলে নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তায় ভুগছে। হয়ত তার ওপর রেগে আছে। কে জানে, হয়ত বসে বসে কাঁদছে বেচারি।


ডেকের ছাদে পায়ের আওয়াজ, মুহূর্তে খোলের ঢাকনাটা খুলে যায়, ছর-ছর শব্দে কে যেন পেশাব করে, মারাত্মক দুর্গন্ধ, অন্ধকার খোলে একটা লাশ, পাশে ভেদবমি, রক্ত, মল, পেশাবের গন্ধ মিশে যায় লাশের গন্ধের সঙ্গে।


এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখে তন্দ্রা নামে। জুলফিকারের নাক ডাকার শব্দে তন্দ্রাটা হঠাৎ কেটে যায়। আবার চাগিয়ে ওঠে পঙ্‌ক্তিগুলো, চোখে আবার ভেসে ওঠে হার্মাদদের ভয়ঙ্কর মূর্তিগুলো, পাল্লা দিয়ে আবার বাড়তে শুরু করে উদ্বেগ। সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করতে কৈশোরের রঙিন স্মৃতিগুলো জাগিয়ে তোলে। স্মৃতির সমুদ্রে সাঁতার কাটতে কাটতে সমস্ত উদ্বেগ মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। পঙ্‌ক্তিগুলো মাথা থেকে কিছুতেই সরে না। ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট, যাত্রীদের দুর্ভোগ, বন্ধুদের মুখ, লাবনীর মোহনীয় চোখ কল্পনা করে, তবু সরে না। সাহিত্য ও দর্শনের জটিল সব তত্ত্ব নিয়ে ভাবে, তবুও না। সব স্মৃতি, সব মুখ, সব চোখ এবং সব তত্ত্ব ছাপিয়ে পঙ্‌ক্তিগুলো মাথার ভেতর কেবলই ঘুরতে থাকে। ঘুর্ণয়মান পঙ্‌ক্তিগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ভেসে ওঠে কাঠের মস্ত নৌকা, বিশাল গলুই, উড়ন্ত পাল, লাল নিশান, কোমরের খাপে তলোয়ার গোঁজা একদল হার্মাদ, নৌকার অন্ধকার খোলে বন্দি শত শত মানুষের আর্তনাদ, ভাত ভাত বলে কাতরকণ্ঠের চেঁচানি, একটু জল দাও গো ভাই একটু জল―কার যেন আহাজারি। ডেকের ছাদে পায়ের আওয়াজ, মুহূর্তে খোলের ঢাকনাটা খুলে যায়, ছর-ছর শব্দে কে যেন পেশাব করে, মারাত্মক দুর্গন্ধ, অন্ধকার খোলে একটা লাশ, পাশে ভেদবমি, রক্ত, মল, পেশাবের গন্ধ মিশে যায় লাশের গন্ধের সঙ্গে। এক মুঠো ভাতের জন্য ক্ষুধার্ত বন্দিদের হাহাকার, ঢাকনাটা আবার খুলে যায়, কিছু চাল পড়ে উপর থেকে, হাঁস-মুরগির মতো বন্দিরা হুমড়ি খেয়ে চালগুলো কুড়াতে থাকে, কারো ভাগে এক মুঠো, কারো ভাগে আধমুঠো জোটে। চাল চিবানোর কুরকুর শব্দ, লাশটার গন্ধ তীব্র হয়ে ওঠে, কেউ একজন চিৎকার করছে ভয়ে, ঢাকনাটা আবারও খুলে যায়, দুটি ছায়ামূর্তি নামে, লাশটা টেনে উপরে তোলে, গলুইর কাছে নিয়ে দোলনার মতো দুলিয়ে নোনা জলে নিক্ষেপ করে।

শোয়া থেকে সে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ভয় পাচ্ছে ভীষণ, বুকের ভেতর হামানদিস্তার ঘা পড়ছে, কেমন শীত শীত লাগছে, শরীরের রোমগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে বারবার, কানের কাছটায় শাঁ-শাঁ করছে। জ্বর উঠল নাকি! এতক্ষণ কি জ্বরের ঘোরে ছিল? জ্বরের ঘোরেই কোনো দুঃস্বপ্ন দেখল? অন্ধকারে হাতড়ে পায়ের কাছে দীপঙ্করের উপস্থিতি নিশ্চিত করে নিচু গলায় ডাক দেয়―দীপঙ্কর!
সাড়া নেই।
এই দীপঙ্কর!
তবু সাড়া নেই।

বেকায়দায় শুয়ে থাকতে থাকতে ডান পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে তার। পা দুটো সোজা করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। পারবে কিভাবে? ডানে-বাঁয়ে মানুষ, সামনে পেছনেও মানুষ―চারদিকে মানবপ্রাচীর। ভ্যাপসা গরম, তার ওপর মানুষের গরম নিঃশ্বাস। ঘামের গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া দায়। পাদের গন্ধ তো আছেই। কতক্ষণ পরপরই টোঁস-টাঁস শব্দ শোনা যায়। গন্ধটা দূর হতে কয়েক মিনিট সময় নেয়। ছাদের ফোকড়গুলো দিয়ে তো বাতাস ঢুকছে না, গন্ধটা পাক খেয়ে ফোকড় পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগে। তার ওপর নাকডাকার শব্দ। অন্যদের যেমন-তেমন, ঠিক মটরবাইকের শব্দে নাক ডাকছে জুলফিকার। বদ্ধ হেজে শব্দটা দ্বিগুণ শোনায়। দুবার তাকে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ বন্ধ থাকল, তারপর আবার শুরু হলো খর খর…হিস…খর খর…হিস। বিরক্তি চরমে ওঠে তার। এ কেমন বদঅভ্যাস মানুষের! এত জোরে কেউ নাক ডাকে? সে আবারো তাকে ধাক্কা মারে। জুলফিকার নড়েচড়ে ওঠে, কয়েক মিনিট বিরতির দিয়ে যথারীতি আবার শুরু করে। কানের ফুটোয় দু-হাতের তর্জনী ঢুকিয়ে সে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করে। একটা শোঁ-শোঁ শব্দ টের পায়। যেন বৃষ্টির শব্দ। নাকি তুফানের? বাইরে কি তুফান হচ্ছে? কিন্তু এখন তো ঝড়-তুফানের মৌসুম নয়। শীত সমাগত, সমুদ্র এখন শান্ত। শব্দটা তবে কিসের? অন্ধকারে হাতড়ে ঝিঁঝিঁ ধরা পা-টা টানতে টানতে উপরে ওঠার সিঁড়ির কাছে এসে টের পায় জাহাজটি চলছে। ছাদের ফোঁকড় দিয়ে আলো ঢুকছে ভেতরে। ভোরের পবিত্র আলো।

১১শ পর্বের লিংক

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)