হোম গদ্য শুক্রবার, আমি ও পোষা বেড়াল

শুক্রবার, আমি ও পোষা বেড়াল

শুক্রবার, আমি ও পোষা বেড়াল
350
0

একেকটা দিন এমন, যখন আমি বলতে পারি, একটানা। আসলে আমাকে বলতে হয়, আর সাধারণত এটা ঘটে থাকে সকালের দিকে অথবা বিকেল শুরুর আগে; ঠিক যখন দুপুরের খাওয়া শেষ হয়, এবং আমি ও আমার পোষা বেড়ালটি আলসেমির আড়ালে একে অপরকে ঘৃণা করতে শুরু করি, কেউ কাউকে চিনতে পারছি না অথবা যথাযথ সঙ্গ দিতে পারছি না বলে। কিন্তু মজার বিষয় এই, দু’জনেই আমরা দু’জনের কাছাকাছি থাকি, সঙ্গে থাকি, অথচ কেউ-ই কারও সঙ্গ বা উপস্থিতি টের পাই না। ও হয়তো লক্ষ করে যে, আজ সে মাছ অথবা মাংসের কোনো একটা খেতে চাইছিল, অথচ আমি বরাবরের মতোই থালা ভর্তি ডালের মধ্যে দু’কাপ ভাত ও দেড়কাপ সবজি ঢেলে আনমনে নেড়ে-চেড়ে তুলে তুলে রাখছি মুখের মধ্যে। এ এক বিরক্তিকর সাবলীল প্রক্রিয়া বেশকিছু বছর ধরে, যখন অনীহা ও অর্থহীনতা দু’টোই আমাকে দু’পাশ থেকে জাপটে ধরে জানতে চায়, ‘আর কত বছর?’ আমার পোষা বেড়ালটি এইসব স্পষ্ট শোনে, আর অনেকটা প্রশান্তির হাই তুলে চোখ বন্ধ করতে করতে জানিয়ে দেয়, আমি নয়, সে-ই আমাকে ঘৃণা করে, প্রকৃত।


যেকোনো শীতের রাতেই তুমি মারা যাবে, যেকোনো মাঝরাত্রিতে তোমার নিশ্বাস ফুরিয়ে যাবে, আর তোমার মরদেহের পাশে আমার এই আলসেমির ঘুম ও ঘৃণা এমন সুন্দর ও নির্ভার রয়ে যাবে।


হয়তো প্রতীক্ষার সঠিক সংজ্ঞাটি ঘাপটি মেরে বসে থাকে দু’জনের মাঝখানে। হাঁ, এ এক প্রতীক্ষা-ই বটে। তবে কিসের, তা খুঁজে পেতে চাইলেই ঘুম আসে। হয়তো ঘুমিয়েও পড়ি, অথচ একটানা বলতে পারা বা চাওয়ার অভ্যাসটা জোর করে জাগিয়ে রাখে, আর পোষা বেড়ালটা পা অথবা চেয়ার ঘেষে তার প্রতিক্রিয়াহীন আচরণ ও স্বভাবজাত শীতলতায় জানাতে থাকে, ‘যেকোনো শীতের রাতেই তুমি মারা যাবে, যেকোনো মাঝরাত্রিতে তোমার নিশ্বাস ফুরিয়ে যাবে, আর তোমার মরদেহের পাশে আমার এই আলসেমির ঘুম ও ঘৃণা এমন সুন্দর ও নির্ভার রয়ে যাবে।’ বাড়িওয়ালি, যে কিনা আমার চেয়ে বছর দশেক ছোট, এবং আমার বেড়ালটাকেই বেশি ভালোবাসে ও পছন্দ করে, ওর ক্রমশ সাদা হয়ে আসা তুলতুলে শরীরেই যা কিছু লোভ তার, ফলে নির্লজ্জভাবেই বলে বসে, ‘মাগনা মাগনা না হোক, তবে না হয় অর্থেই দিন। বাকি মাসের ভাড়া গুনতে হবে না আপনাকে।’ আমার পোষা বেড়ালটা বেশ সচকিত হয়ে আমার দিকে তাকায়, যখন ওর সমগ্র অস্তিত্বই ডুবে থাকে বাড়িওয়ালির যথার্থ ও উর্বর বুকে।

এভাবে প্রলুব্ধ করা হলে আমিও বেড়াল হয়ে উঠি, আমার দাম বেড়ে কিছু মাসের ভাড়াতে গিয়ে দাঁড়ায়, এবং মাছ অথবা মাংসের লোভে বাড়িওয়ালির কাছে-পিঠে ঘুরতে ঘুরতে নিজেকে জানাই, আজ হয়তো সত্যি সত্যিই শুক্রবার, সুতরাং আরও খানিকটা কথা বলা যেতে পারে, এভাবে। ‘গত বছর পুরোটাই নিরোগ কাটিয়েছি’, এই সুসংবাদ এ বছর আমাকে কয়েকবার পাঠিয়েছি, অথচ পায়ুর চিনচিনে ব্যথাটা কিছুতেই তা গ্রহণ করতে নারাজ। একটা নড়বড়ে চেয়ারে, বড়জোর মেঝেতে সাবধানী পা ছড়িয়ে বসা যেতে পারে, কিন্তু দুই পা উপরে তুলে আরাম করে বসতে না-পারার যে ক্ষোভ, আসলে তা-ই ভয়, এবং চাই বা না চাই, সবসময়ই তা সচকিত রাখে। কিন্তু আমার কীই-বা করার থাকতে পারে, যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি ব্যথাটা কমে আসে, অথচ বসে পড়া-ই আমার মেঝেয় পা ছড়িয়ে রাখা, এবং আরও একটি বছর সম্পূর্ণ নিরোগ থাকার আশা।

আমার বউটা যেবার মারা গেল, সেবার অনেক মেয়ের পেটের মধ্যেই নাকি পাওয়া যাচ্ছিল অপুষ্ট মানুষের শরীর। এই তথ্যটি বেশ জোরেসোরেই নিয়মিত প্রচার হচ্ছিল কাগজে, আর আমার বন্ধু হায়দার, যে একজন গাইনোকলোজিস্ট, এবং আমি ও আমার বউ দু’জনকেই ভালোবাসে এখনও, জানিয়েছিল, অমন অপুষ্ট শরীর নাকি আমার সংসারেও কয়েক মাস বেঁচে ছিল। এটা চমকে দেয়ার  মতো তথ্য কিনা জানি না, তবে একটা বিছানা মাঝামাঝি দু’ভাগ হলে, অশান্তি নামক যে শান্তি ও সন্ধি চুপচাপ নেমে আসে, তাকেই আমি বা আমরা সাধুবাদ জানিয়েছিলাম, এবং আরও কয়েকমাস পর গোরস্থানের মাটি মুঠো করে গোরস্থানের দিকেই ছুড়ে দিয়ে হয়েছিলাম নির্ভার। সেই সময়গুলো ছিল আসলেই অগোছালো, যখন ওষুধ ও ডাক্তার দুটোতেই মানুষ মরছিল অকাতর। চার দেয়ালের মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ছিল অনেক সহজ ও সুন্দর, আর পার্কের বেঞ্চ, ফুটপাত, মার্কেট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে যে কোনো বহুতল ভবনের আশেপাশে খুব সহজেই দেখা যেত লাশ। সেই সময়েই আমার বাড়ি বদল হয়, এবং নতুন বাড়িতে এসে দেখি, আমার জামা-কাপড়, হাত-পা, চোখ-মুখ-কানসহ যাবতীয় কিছু ফেলে এসেছি, এবং এই নতুন আবাসে আমি ও আমার পোষা বেড়াল যে যার মতো উলঙ্গ হয়ে বসে আছি পাশাপাশি, একমাত্র জানালার ধারে।


অন্য মানুষের বউদের আমি খুব ভালোভাবে চিনতে পারছি, যেমন, পারভেজ, মুহিত, কামাল, সাব্বির এদের বউ, কিংবা আজমল সাহেবের প্রৌঢ়া বউটাকে অব্দি।


এই জানালার কথা বলা যেতেই পারে, কেন না কাঠের বানানো যে কোনো জিনিসের প্রতিই আমার ভালোলাগা এখনও দুর্বার। মিতা, আমার মৃত বউ, হয়তো তার কথা এখনও ঠিক, ‘কাঠের গভীরেই রয়ে গেছে প্রকৃতির আসল চিৎকার। কান লাগিয়ে বসে থাকো, প্রাণের মধ্যে দ্যাখো বেজে উঠবে ঠিক।’ বেজে আর উঠল কই? তিন বাই তিনের এই কাঠের জানালার পাশেই আমি বারবার কারণে-অকারণে সুস্থ হলাম, অসুস্থ হলাম, মারা গেলাম, আবার বেঁচেও উঠলাম। আমার পোষা বেড়ালটা জানে এইসব, তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলতে পারবে, বাড়ি বদলের পর আমার আর শীত করে নি কখনও, বিছানার আদরে আপ্লুত বা ওষুধের দিকে ফিরেও চাই নি আর, শুধু জলের পাত্রটা কাছাকাছি রেখেছি, আর প্রিয় চেয়ারটির পায়ায় চারটি যথাযথ মাপের পেরেক ঢুকিয়েছি। এসবই আমার পোষা বেড়ালটার মুখস্থ, কেননা সে এ, বি, সি, ডি যেমন শিখেছিল, তেমনি অ, আ, জানত পুরাদস্তুর। তাকে কখনও বলতে হয় না, এখন সময় কত, আজ বৃষ্টি হবে কিনা, ঝড়ের আশঙ্কা কতখানি, অথবা উজ্জ্বল রোদে কিভাবে ঝলসে যাচ্ছে বাইরের পৃথিবী।

গত কয়েক বছর ধরে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসগুলোর একটা তালিকা করছি। সবকিছু যে ঠিকঠাক মনে করতে পারছি এমনটা বলা যায় না নিশ্চিতভাবে, তবে তালিকাটা যত বড় হচ্ছে তত আমার স্মৃতিশক্তির উপর নতুন বিশ্বাস জন্মাচ্ছে। বিশ্বাসে বিশ্বাসে আমি ডুবে যাচ্ছি যেন, আর আমার ঘর-দোর, বিছানা-পত্তর সব ভরে উঠছে বিশ্বাসী গন্ধ ও বেড়ালে, যারা পরস্পরকে যত্ন করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, আবার জাগিয়েও তোলে। যতদিন মিতা বেঁচে ছিল, ততদিন লক্ষ করেছি, অন্য মানুষের বউদের আমি খুব ভালোভাবে চিনতে পারছি, যেমন, পারভেজ, মুহিত, কামাল, সাব্বির এদের বউ, কিংবা আজমল সাহেবের প্রৌঢ়া বউটাকে অব্দি। ওদের জামা-কাপড় থেকে শুরু করে পরিধেয় সবকিছুই আমার মুখস্থ, কেবল মিতাকেই মাঝে মাঝে মুখের উপর বলতে হতো, ‘ওহ গড, হু আর ইউ?’

ওর মুখের রঙ বদলে যেত কিনা লক্ষ করি নি, কিন্তু ও হাসতে পারত তখনও, এবং অন্যান্য বউদের মতোই আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারত, ‘ছি’! আরও অনেক কিছুই সে পারত, কেবল পারত না পোষা প্রাণীদের সহ্য করতে। আমি জানতাম, সে নিজেও ছিল পোষ্য, এবং ওর নিকট আত্মীয় ভাইগুলো ওকে পালা করে আদর-যত্ন করত, খাওয়াত, পড়াত। এসবের সাথে আমার যে কোনো সম্পর্ক নেই, ওকে তা বোঝাতে পারি নি, যেমন পারি নি, বাড়ি বদল করলেই মানুষ পারে না আসবাবপত্র ছেড়ে আসতে। ঘামের গন্ধ সবসময়ই শরীরের সাথে মিশে যেতে চায়, এবং শুকিয়ে যাবার আগ পর্যন্ত শরীর নিজেও ভুলতে পারে না যে, তা ঘাম। একটা ক্ষত মিলিয়ে যাবার পর, মানুষ কি রয়ে যাওয়া দাগের দিকে তাকিয়ে একবারও ভাবে না, এইখানে ছিল?


কেবল বিছানায় অভ্যাস মতো আমার শরীর থেকে ঝরতে থাকা ঘামের যে স্রোত ওর বুক, মুখ অথবা শরীরের অন্যান্য অংশ ভিজিয়ে দিত, সেই ঘামকে ও কখনোই ঘেন্না করে নি।


আজ সত্যিই শুক্রবার। আজ মিতা পুনরায় মারা যাবে, আর আমি বাড়িওয়ালির লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখান করতে করতে ভাবব, মিতা পারে নি, মিতারা পারে না, আমিই পারি কেবল সব পথ চিনে, সবকিছু কুড়িয়ে গন্ধ শুঁকে শুঁকে বদল হয়ে যাওয়া বাড়িতেও ফিরে আসতে। আমার বিছানার নকশা আমাকেই করতে হয়েছে বহু বছর ধরে, আমাকেই আনতে হয়েছে আমার বালিশের তুলা পরিচিত সেই বিশাল শিমুল গাছ থেকে, যেখানে আজও লাল ফুল ফোটে, পাখিরা মধু খায়, আর সময় হলে দল বেঁধে সবাই উড়াল দেয় আকাশে। এসব খুব তুচ্ছ ও স্বাভাবিক ঘটনা, যখন শিমুল গাছ কাঁটাময়, এবং মিতারা কখনও উড়তে পারে না। ওর প্রতি আমার যে অভিযোগ তা জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায়, অথচ প্রতিউত্তরে ও যা ফিরিয়ে দিত বা দেয়, তা চোখ বন্ধ করলেই মিলিয়ে যায়। ওর মরে যাওয়াই ঠিক ছিল, তাই সে মরে গেল এবং আমার পোষা বেড়ালটা সেদিনই প্রথমবারের মতো জানালো, ‘গোরস্থান থেকে ফিরে এলে আমিও নাকি বেড়াল হব, মস্ত।’

একেকটা দিন সত্যিই আমার কথা পায়। আহমেদ সাহেবের মেয়ে, নীতু, যে আমাকে দেখলেই বলত, ‘হাই হ্যান্ডসাম, লুকিং হট টুডে’, আর আমি ওর সমগ্র শরীর মুখস্থ করতে করতে শান্ত স্বরেই বলতাম, ‘নীতা, সময়ের দিকে খেয়াল রাখো? তোমার হাতে ঘড়ি নেই কেন বলো তো?’ কথাগুলো শুনে ও এমন করে হাসত আর পিটপিট করে তাকাত যে, আমার মনে হতো, আজ অফিস থেকে হয়তো জলদি ফিরতে হবে, আজ রাতে ভালো ঘুম হবে, আর কাল সকালে জেগে দেখব অফিস যাবার ইচ্ছে মরে গেছে। আমার পোষা বেড়ালটা তখনও আসে নি বদল করা বাড়িতে, কেননা মিতার মরতে তখনও বাকি ছিল তিন বছর। ‘তিন বছর পর মিতা মারা যাবে,’ এটা এখন যেভাবে ভাবতে পারি, সেভাবে তখন ভাবতে পারলে হয়তো সত্যিই আমি আনন্দিত হতাম, কেননা নীতুকে ভালো লাগতে লাগতেই অনেকগুলো বাস মিস হলো, এবং তা-ই আমাকে বাস ধরার নিয়মমাফিক তাগাদা থেকে মুক্তি দিল, চিরতরে। মিতা পারে নি আমাকে এমন কিছু দিতে, কেবল বিছানায় অভ্যাস মতো আমার শরীর থেকে ঝরতে থাকা ঘামের যে স্রোত ওর বুক, মুখ অথবা শরীরের অন্যান্য অংশ ভিজিয়ে দিত, সেই ঘামকে ও কখনোই ঘেন্না করে নি। দীর্ঘ এগার বছরের সংসারে মিতা আমাকে এটুকু দিয়েই মরতে পেরেছিল কেবল, আর আমি বদলকৃত বাসায় এসে দেখি, একটা শীতল বিছানা যেন আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, যার জন্য এতটা বছর এই শহর, এই জীবন, এমনকি দৈনন্দিন মৃত্যু থেকে সবকিছু কুড়িয়েছি, নীরবে। জীবনে একবারই মিতার শরীরের ঘ্রাণ সাহায্য করেছিল আমাকে তার প্রেমিক ভাবতে, কেননা, অমন শীতল আর একাগ্র মুখ সেবারই প্রথম সে আমাকে দেখতে দিয়েছিল প্রাণ ভরে।

পোষা বেড়ালটি সেই থেকেই আমার সাথে সাথে জেগে থাকে অথবা ঘুমায়, আর একেকটা দিন যখন আমি একটানা বলতে পারি, সে স্বাভাবিক ও শান্তভাবে আমার পাশে বসে থাকে। ওর গায়ের রঙ প্রথমে ছিল সাদা, পরে কেমন করে জানি কালো হতে শুরু করেছিল। মিতা জানত না, জানত না আমার পরিচিত কেউ, অথবা বন্ধু-বান্ধব। পশু-ডাক্তার আমার চাচা, সে হয়তো বলতে পারত এমন বিবর্তনের কারণ, কেননা শৈশবের বেশ কয়েকটা বছর আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি মানুষ কিভাবে পশুর চিকিৎসা করে। কিন্তু তিনি তো মারা গেছেন, কেবল তার নিরাময়কৃত পশুদের কেউ কেউ হয়তো এখনও বেঁচে আছে। বাকি থাকে হায়দার, তাকে তো আর জিজ্ঞেস করতে পারি না, যখন সে আর আমি উভয়েই মিতার মৃত্যু-বিছানার পাশে টানা পনের দিন পালা করে অপেক্ষা করেছি সম্পূর্ণ বিপরীত ভয় ও আশা নিয়ে। হায়দার শেষ পর্যন্ত পেরেছিল কাঁদতে, আর আমি মিতার মৃতদেহের পাশে একের পর এক শান্ত নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বুঝেছিলাম, আমার বেড়ালটা পুনরায় সাদা হতে শুরু করেছে, আর এমন একেকটা দিনে বাড়িওয়ালির বুকের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে, ও এমন সব শব্দ করে, যা আমাকে মুহূর্তেই ফিরিয়ে আনে তিন বাই তিনের জানালার কাছে।


আমার পোষা বেড়ালটা এই একটিমাত্র ঘটনা জানে না, ফলে সে এখনও ভাবে, আমি ফিরে যেতে পারব সেই কাঙ্ক্ষিত ঘরে।


এই একটি মাত্র ব্যাপার আমাকে দারুণ চাঙ্গা করে, যখন আমি ও আমার বেড়াল একসাথে, পাশাপাশি, জানালার ধারে। সে আমাকে দেখে, আমি তাকে, কিংবা উভয়েই জানালা দিয়ে দূরে। জানি এটার মাপ এখন দুই বাই দুই, যা শীঘ্রই এক বাই এক অথবা শূন্যে গিয়ে দাঁড়াবে। হয়তো আমরা দু’জনেই এই বিষয়ে সমান নিশ্চিত, অথচ কেউই গুরত্ব দিচ্ছি না দেখে সে ঘুমিয়ে পড়তে চাইলে, আমি যতদূর সম্ভব এগিয়ে একটা সরু পথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকি বহু পুরনো ও পরিচিত সেই বাড়িটার দিকে, যার প্রতিটি ঘর কেবল মাটি দিয়েই বানানো, যার যেকোনো একটির লোভ আমার সেই থেকে, যেদিন আমাকে ফিরে আসতে হয়েছিল মিতার কবরের কাছে, ক’ফোঁটা জল রেখে যেতে। আমার পোষা বেড়ালটা এই একটিমাত্র ঘটনা জানে না, ফলে সে এখনও ভাবে, আমি ফিরে যেতে পারব সেই কাঙ্ক্ষিত ঘরে। অথচ এভাবে বেশি দূর যাওয়া যায় না, কেননা নিশ্বাস ফুরিয়ে আসে। সেই সুযোগে কতগুলো দুষ্টু ছেলে আমার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে পড়ে, যাদের সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য ও বিদ্রূপের হাসি হেসে জানায়, ‘তোমার নাম কাটা গেছে। তোমার আর ফিরে যাবার অনুমতি নেই। তুমি এখন অন্য ঘরের, এবং তোমার একটি বেড়াল আছে।’

আমি চমকে উঠি, সাথে সাথে চমকে ওঠে আমার বেড়ালটিও! ও আমার দিকে, আমি ওর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি ঘৃণা ভরে। কে কাকে বেশি ফিরিয়ে দিতে পারি এই প্রতিযোগিতা সম্পন্ন হবার আগেই হঠাৎ সে লাফ দেয় জানালা দিয়ে, আর নিচের দিকে পড়তে থাকা ওর ধবধবে সাদা শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিশ্চিত হই, আজ শুক্রবার, বাতাসে লাশের ঘ্রাণ আছে!

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য