হোম গদ্য শামশের আনোয়ার : প্রকৃত একঘরে কবি

শামশের আনোয়ার : প্রকৃত একঘরে কবি

শামশের আনোয়ার : প্রকৃত একঘরে কবি
366
0

‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’—আর কবি শামশের আনোয়ার তো (১৯৪৪-১৯৯৩) নক্ষত্র হতে পারেন নি। নক্ষত্র হওয়ার জন্য যতটা জ্বলজ্বল করা দরকার শামশের আনোয়ার-এর বেলা সেটা জোটে নি। ‘তার কবিতা কোনো প্যাটার্নে পড়ে না। অনুসৃত হয় না। স্বীকৃতি পায় না সমকালে।’ যদিও শামশের আনোয়ার পশ্চিম বঙ্গের ষাটের দশকের অন্যতম কবি। মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে (১৯৭৩), মূর্খ স্বপ্নের গান, শিকল আমার গায়ের গন্ধে (১৯৯১) এই তিনটি কাব্য আর কিছু প্রবন্ধ-ই তার সম্বল। কেমন কবিতা লিখতেন শামশের কিংবা কী ছিল তার কবিতায় যা তাকে ষাটের কবিতার জগতে স্বতন্ত্র নাম দেয়?


নতুন ভাবনা আর শব্দের সন্তরণ মিলিয়ে তার কবিতা ষাটের দশকে এক নতুন ভঙ্গি নিয়ে হাজির হয়।


২.
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা দিয়েই শুরু করা যাক :

শামশের আনোয়ার বিশুদ্ধ শব্দ নির্মাণের কবি। … কোনো কবিকেই সম্পূর্ণভাবে চেনা যায় না। মানুষ হিশেবে, কবি হিশেবে। প্রত্যেক প্রকৃত কবিই আস্তে আস্তে নিজের চারপাশে একটা অস্বচ্ছ বৃত্ত তৈরি করে নেন, স্বেচ্ছায় কখনো তার থেকে বেরিয়ে আসেন, আবার অনেক সময় অগোচর থাকতেই পছন্দ করেন। কখনো কখনো বৃত্তে সংঘর্ষও লাগে।

শামশের আনোয়ার কবি হিশেবে অগোচরে থেকে গেছেন। কিন্তু তার কবিতার ভেতরের বয়ান দৃশ্যমান প্রেক্ষাপট। এই প্রেক্ষাপট বিট জেনারেশন দ্বারা প্রভাবিত কলকাতার ষাটের কবিদের মধ্যে যে হাংরি আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করে তারই ফলশ্রুতিতে নির্মিত। নতুন ভাবনা আর শব্দের সন্তরণ মিলিয়ে তার কবিতা ষাটের দশকে এক নতুন ভঙ্গি নিয়ে হাজির হয়। এই ভঙ্গিটার মধ্যে নৈরাশ্য, নৈরাজ্য, অবক্ষয়, হাহাকার, রাগ, কাম, রাজনীতি, স্যাটায়ার, অস্থিরতা, মাতৃকথা, নারী ভর করেছে। এইসব বিষয়-আশয় ঘিরে তার কবিতার জগৎ কোনো রোমান্টিক প্রবাহমানতা তৈরি করে না। কিংবা তার ইতিহাসবোধ এবং চেতনা এন্টি-এস্টাব্লিশম্যান্ট-এর নতুন আখড়া হিশেবে হাজির হয় কবিতায়।

কবির প্রথম কাব্য মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে-এর একটি কবিতা ‘এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা’ প্রসঙ্গে বলা যাক।

কোনো বিদর্ভ নগরী আমার স্বপ্নের ভিতর জেগে ওঠে না
ইতিহাসে কোনো অর্থ নেই মূঢ়তা ও ভ্রান্তি ছাড়া
যে নারী আমাকে পথে বসালো তার ক্রূর হাসির ছাপ
                                                        লেগে আছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়
আমি জানি মানুষের কোনো উত্তরণ ক্লিওর আঁচলে বাঁধা নেই
এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা ছেড়ে কোনো সত্যের
                                                                      অপেক্ষা আমি রাখি না

কবি শামশের আনোয়ারের এই বয়ান এন্টি-জীবনানন্দীয় এক বয়ানের সঙ্গে পরিচিত করে। অর্থাৎ জীবনানন্দ দাশ যখন বলেন :

কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে
তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়
(সুচেতনা)

তখন শামশের আনোয়ার-এর কলকাতা ভিন্ন চিত্র নিয়ে হাজির হয়। জীবনানন্দ দাশ যখন ‘তোমার কাছে আমার হৃদয়’ উল্লেখ করছেন তখন শামশের বলছেন, ‘নিঃসঙ্গ বিছানা’। আর তখন কলকাতায় ষাটের হাংরি আন্দোলন-এর প্রেক্ষাপটকে ইতিহাসের পাতায় খোঁজ করতে হয়। হাংরিদের রাজনৈতিক ভাবনাপ্রসূত কবিতা ও জীবনাচরণ এবং দর্শন, শাসকগোষ্ঠী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজে এমনকি সাহিত্যিক মহলেও একটা আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে তৎকালীন রাষ্ট্রীয় শাসক কর্তৃক কবিদের গ্রেফতার এবং নির্যাতনের ঘটনা সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য চিহ্ন হিশেবে জারি থাকে। ষাটের ওই হাংরিদের উত্তর-ঔপনিবেশিক মনোজগতে যে-নৈরাশ্য ভর করে তার প্রভাব হলো হাংরি আন্দোলন। এটার প্রভাবও পড়ে শামশের আনোয়ার-এর কবিতায়।

প্রেম আর স্মৃতি আমি উড়িয়ে দিয়েছি সিগারেটের ধোঁয়ায়
জ্বর আসে নি তবুও আমি জ্বরের ঘোরে বাঁচি
মদের ঘোরে ভাড়ামো ক’রে আমার দুপুর কাটে
মাড়ওয়ারি দম্পতির নির্লজ্জ সংগম দেখে ছাদের ওপর
                                                        রাত্রির প্রহর পুড়ে যায়

ফলে ব্যাপারটা সর্বদা একটা অবক্ষয়ের মোটিফ হাজির করে। সেখানে একধরনের হাহাকার আর নিঃসঙ্গতার বিচরণ লক্ষ করা যায়। এটা কবি শামশের আনোয়ারের মনোজাগতিক ভাবনাপ্রসূত।

যে সৃষ্টি আর সভ্যতা আমার বুকের বাইরে গ’ড়ে উঠেছে
তার প্রতি আমার বুকের কোনো মায়া নেই
কলকাতা আর আমার এই নিঃসঙ্গ বিছানা ছাড়া কোনো সত্যের
                                                                      অপেক্ষা আমি রাখি না।

বুকের বাইরে গড়ে ওঠা যে-সভ্যতা তা যদি জীবনানন্দ দাশের ‘কল্লোলিনী তিলোত্তমা’ হয় সেটা শামশের আনোয়ারের কাছে স্মৃতিশূন্য। কারণ পশ্চিমবঙ্গ মানে কলকাতা তখন এক আধা ফ্যাসিস্ট শাসকের অধীন।

শামশের আনোয়ারের কবিতাভাবনা কিংবা কবিতাযাপন তার নিজের জবানিতে এভাবে আসে :

ইনসমনিয়া নাইট মেয়ার, নার্ভাস ব্রেকডাউন অর্থাৎ ফিয়ার অব সাইকোসিস ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব হতো না কবিতা লেখা আর এটাই প্রকাশ করে একজন প্রকৃত কবির লেখার অথেন্টিক প্রসেস।

শামশের আনোয়ারের কবিতায় তার কথাগুলো কিভাবে ভর করেছিল কিংবা তার কাব্যপ্রবণতা খোঁজ করা দরকার। তখন দেখা যায় মৃত্যুচেতনা তার কবিতা জুড়ে থাকে।

ক) খোলা ব্লেড দেখলে তৃষ্ণায় আমার গলা জ্বলে
              পাখার হুক দেখলে মনে প’ড়ে যায় সোনালি ফাঁসের কথা
                                                 (এই কলকাতা আর আমার নিঃসঙ্গ বিছানা)

খ) হতাশার লোমে ভর্তি, কদাকার হাত
              আমার গলা চেপে ধরে
                            (জীর্ণ ছবি)

গ) আজ আমি খুরপি নিয়ে শুয়েছি
কোপাবো নিজেকে
              (পৌরাণিক )

তখন লক্ষ করা যায় তার কবিতায় ‘আমি’ উপস্থিত হয় বারবার।

আমি ঐ রূপবান যুবকের হঠাৎ, বিহ্বল হয়ে উড়ে
                                                        যাওয়া দেখেছি


সে একজন প্রতিভাবান যুবক
সে একজন অসুস্থ, মিথ্যুক, নেশাগ্রস্ত মানুষ
আসলে সে আগুনের বন্ধু এবং কবি
                                          (কবি)

এখানে কবি যে-যুবকটির কথা বলেছেন সে যুবকটি তো কবি নিজেই। তো তার কবিতায় ‘আমি’ দুইভাবে আসে—একবার সরাসরি ন্যারেটিভ হয়ে উত্তম পুরুষে, আরেকবার বয়ানের ভেতর দিয়ে। নিচের কবিতাটি লক্ষ করা যাক :

আমি তাকে চশমার উল্টো দিক আর ও বাঘের হাঁ-এর এপাশ থেকে দেখতে পাই,
তাকে মানে শামশেরকে, আমি কখনো সোজা কি মুখোমুখি হাঁটতে দেখি না।
খুব গোলমেলে জায়গায়, একেবারেই প্রত্যাশা করছি না যখন হঠাৎ তার ছায়া
বা পিঠের খানিকটা চোখে পড়ে। আমি ঝর্নার পাশে থাকলে সে বালুর
গর্ভের কাছাকাছি চলে যায়। বালুর গর্ভের কাছাকাছি গেলে সে ঝর্নার পাশে।
তার নামে যে প্রশংসা হয় সেগুলো ভুল এবং যে নিন্দা রটে সেগুলোও।
জিজ্ঞাসাবাদ করে লাভ নেই; কেননা প্রতিটি উত্তর জানা আছে আমার।
ধরুন তাকে শুধোলাম : আপনি কি একজন চালিয়াৎ প্রকৃতির মানুষ?
উত্তর : কিছুটা ঠিক।
              : আপনি কি স্পষ্ট ও খোলামেলা ধরনের?
              : কিছুটা ঠিক,
              : আপনি কবিতা না লিখেই স্রেফ হুজুগে কবি হয়েছেন?
উত্তর : কিছুটা ঠিক।
              : আপনি কি যথার্থই শক্তিশালী?
              : কিছুটা ঠিক।

আমি খাদের নিচে থাকলে সে চড়াই-এর ওপর থেকে টুকি দ্যায়, যখন
চড়াই দিয়ে হাঁটি, সে খাদের নিচে ঘুমিয়ে থাকে। আমি তাকে অসমান কাঁচা
বা গরিলার কালোমাড়ির ওপাশ থেকে দেখতে পাই… মানে শামশেরকে
আমি কখনো সোজা কি মুখোমুখি হাঁটতে দেখি না।
                                                                      (অল্টারইগো)


প্রচলিত চিত্রকল্পময়তার এক বৈপরীত্য ভর করে থাকে তার কবিতায়, যা একইসঙ্গে একটা পরাবাস্তব ভঙ্গি নিয়ে টান টান ঝংকার তোলে।


এই ‘আমি’ ব্যক্তির ভেতর থেকে উচ্চারিত হলেও তা উৎসারিত হয়েছে একটা সময়ের যন্ত্রণাকে চিহ্নায়নের প্রতীক রূপে যা সমকালীন সমাজে সৃষ্ট। ‘আধা সামন্ততান্ত্রিক ও আধা ধনবাদী সমাজব্যবস্থা যে সভ্যতার সংকট সৃষ্টি করে ও ভারসাম্যহীনতার জন্ম দেয় এবং তার কবলে পড়ে মানুষ যে দুঃস্বপ্নগুলি দেখে, বহন করে যে মুক্তির আকুতি, তারই রক্তক্ষরণের গান ও স্বপ্ন শামসেরের কবিতা।’ ফলে শামশের আনোয়ারের এই ‘আমি’ নিছক আমিত্বের মধ্যে বন্দি থাকে না। শামশের আনোয়ারের এই আমি ক্ষোভ-ক্রোধ-বিবমিষার সংমিশ্রণ। যা তার ব্যক্তিজগৎ থেকে উঠে আসা কিন্তু রাষ্ট্রপ্রসূত। শামশের বলেছিলেন :

একজন খুনির সাথে একজন কবির এক জায়গায় সূক্ষ্ম মিল আছে। আসলে, খুনির মতো রাগ না থাকলে কবিতার টুটি চিপে ধরা যায় না।

তোতার এই ব্যক্তি জগতের সময়টা কিন্তু হাংরি জেনারেশরন-এর কাল। এই ব্যক্তি শামশের সম্পর্কে কবি ভাস্কর চক্রবর্তী বলেন :

শামশেরের সঙ্গে বন্ধুত্বটা ছিল একটা বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো। এতটাই উদ্দাম, সজীবতা, দুঃসাহসিকতা ছিল শামশেরের—এতটাই আক্রমণাত্মক, বিষণ্ন আর ক্ষুব্ধ—এতটাই আন্তরিক ছিল শামশের—এতটাই আন্তরিক যে প্রকৃত শামশেরকে খুঁজে পাওয়াই ছিল মুশকিল। …মা আর প্রেমিকার এক মিশ্রিত বন্ধনে শামসের এক দীর্ঘ সময় আচ্ছন্ন ছিল। …সত্তরের এই মহাসময়ে তার জীবন ছিল যেমন বেপরোয়া, তার কবিতাও তেমনি। এমন সশস্ত্র এত আধুনিক কবি, সত্যিই খুঁজে পাওয়া ভার।

যদিও শামশের আনোয়ারের কবিতায় পাওয়া যায় কবি আর্তুর র‌্যাঁবোর প্রভাব। সময়ের যন্ত্রণা উভয়কে বিদ্ধ করেছে। তবে র‌্যাঁবোর এই প্রভাবের বাইরে শামশের তার যুগ-যন্ত্রণাকে নিজস্বতায় গেঁথেছেন। ফলে র‌্যাঁবো যখন অস্থির আর বোহেমিয়ান জীবনের পথে পথে চলেছেন তখন শামশের আনোয়ার স্লিপিং পিল নিয়ে নিথর হওয়ার বাসনায় মত্ত। ‘আমার পছন্দ, শাদা ছটফটে বিছানায় শুয়ে মুঠো মুঠো স্লিপিং পিল খেয়ে, ধীরে ধীরে মৃত্যু উপভোগ করতে করতে নিঃশব্দে চলে যাব।’ আড্ডায় মৃত্যু নিয়ে বলা এই কথাগুলো রেখেছিলেন শামশের আনোয়ার।

৩.
শামশের আনোয়ার কোনো পেলব ভাষা দ্বারা কবিতার দেহাবয়ব নির্মাণ করেন নি। কিংবা তার কবিতায় নিছক কোনো বর্ণনার খাতিরে চিত্রকল্প আসে নি। প্রচলিত চিত্রকল্পময়তার এক বৈপরীত্য ভর করে থাকে তার কবিতায়, যা একইসঙ্গে একটা পরাবাস্তব ভঙ্গি নিয়ে টান টান ঝংকার তোলে। যেমন :

ক) আক্রোশে চিবাই পাথর

খ) আক্রোশে চিবাই জ্যোৎস্না

গ) …অজন্তার পাথরে দেখি
মাটি ও মলের বিপ্লব

ঘ) পরস্পরের হাসির ঝড় উড়িয়ে দিচ্ছে পরস্পরের মুখ
              ভিতরটা ন্যাংটো

এসব পঙ্‌ক্তি ছাড়াও তার ‘জন্ম এবং মৃত্যু’ কবিতাটা খেয়াল করা যাক :

পাতা ঝরে পড়ল গাছ থেকে
শিশির ঝরে পড়ল ঠান্ডা পাথরের গায়ে
—আসলে পাথরের ওপর ঝরল পাথর।
পাখির ডানা ঝরে পড়ল নুড়ি হয়ে—
তারপর নেমে এল বন্যা, শুধু একটি জ্যান্ত চিল
ঘুরপাক খেয়ে ফিরল জলের ওপর।
জলে দেখা গেল ঘূর্ণি, ঘূর্ণির বুকে ধরা পড়ল মাছ
চিল শূন্যে উড়ে গেল একটি মাছ ঠোঁটে নিয়ে :
আকাশে বদলাতে লাগল রঙের পর রঙ।
পতাকা উড়ল গর্জন ক’রে…
আলিঙ্গনে বদ্ধ হলো সবাই
কৃমি, কেঁচো, গাছের পাতা, কঠিন শিলা এবং
মানুষ-মানুষী লিপ্ত হলো সঙ্গমে—।
আনন্দ হেঁটে গেল বিরাট সুবিশ্বাসী পা ফেলে
হেঁটে গেল সে বহুদূর :
তারপর নিজেকে ডুবিয়ে দিল আবার।
ভেসে থাকল দু-চারটে নুড়ি, জেগে উঠল পাথরের চাঁই
ঝরে পড়ল শিশির পাথরের গায়ে
আসলে পাথরের ওপর ঝরল পাথর…
সবকিছু নিথর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল জন্মের জন্য
আর একটি পতাকা—তার গানের উল্লাস… ছোট্ট
কিন্তু তীব্র অঙ্কুর হয়ে পাথর ফাটিয়ে দিল।

এই কবিতার বয়ানটা বিশেষভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এখানে জীবনানন্দ দাশের কবিতার অনুষঙ্গ বিদ্যমান তবে কবিতার কোথাও জীবনানন্দের কোনো প্রভাব নেই তো নেই এমনকি জীবনানন্দীয় চিত্রকল্প থেকে যোজন যোজন বৈপরীত্যসূচকতা দেখা যায়। শিশির, পাথর, পাখির ডানা, চিল, জল, মাছ, কৃমি, কেঁচো—এইসব অনুষঙ্গ একটা জীবনানন্দীয় বলয় তৈরি করে কিন্তু কবি শামশের আনোয়ার তার কবিতায় এগুলো দিয়ে এমন একটা আবহ তৈরি করলেন যা তাকে স্বতন্ত্র হিশেবে পরিচিত করাল। এবং এজন্য তাকে জীবনানন্দ-উত্তর বাংলা ভাষার কবিতায় এক নতুন প্রকাশভঙ্গির কবি হিশেবে ধরা হয়। আর কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস থেকে প্রথম যে-তরুণ কবিকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল তার নাম শামশের আনোয়ার।


শামশের প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙেছেন, চূর্ণ করেছেন তার কবিতায়।


সময়ের প্রবাহে শামসের-এর কবিতা আরও রাগী ভাষা নিয়ে হাজির হয়েছে। প্রথম কাব্য মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে থেকে মূর্খ স্বপ্নের গান তারপর শিকল আমার গায়ের গন্ধে নামগুলোর মধ্যেই সেই ক্রোধের আভাস। শামশের-এর কবিতা যেন  তার বেপরোয়া জীবনের মতোই ছটফট করে।

দ্বিতীয় কোনো লোক না থাকায় নিজেকে লক্ষ
ক’রেই আমার সমস্ত শাসন, আঘাত, অভিমান ও ভালোবাসা
বিষণ্ন বোধ করলে নিজের দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নেই
নিজেদের সঙ্গে দীর্ঘকাল কথা বলি না।
সংগমের ইচ্ছে হলে নিজেকে জড়িয়ে ধ’রে সংগম করি
অন্ধকারের নর্দমায় আমি কীট হয়ে অন্ধকার খুঁড়ে খাই
                                                                             (ঘর)

শামশের প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙেছেন, চূর্ণ করেছেন তার কবিতায়। এই ভাঙন যেন ‘চোখের সুড়ঙ্গ দিয়ে উড়ে যায় মাথার জঙ্গলে।’ শামশের-এর কবিতায় এক ধরনের অস্থিরতাবোধ লক্ষ করা যায়। হয়তোবা বলা যেতে পারে—এই অস্থিরতা না থাকলে তার কবিতা আরও বহুরৈখিক স্বর নিয়ে হাজির হতো। কিন্তু ‘স্বদেশ-সমাজ-ইতিহাসের পালাবদলের দিনগুলিতে চরম বিচ্ছিন্নতার সর্বগ্রাসী অন্ধকারই সে দিনের বহু তরুণ কবির কাছে সার্বভৌম ও অবিকল্প হয়েছিল। নাস্তির তিমির তখন এতই দুর্ভেদ্য যে দান্তের নরকও সম্ভবত কাম্য তার চেয়ে।’ তপোধীর ভট্টাচার্যের এই কথাগুলো শামশের আনোয়ারের কাব্যচর্চার সময়কালকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। ফলে ওই সময়ের কবিতা শুধু শিল্প কিংবা সাহিত্য হয়ে আবদ্ধ থাকে নি এক একটা অস্ত্র হয়ে হাজির হয়েছে। তাই কবিতার প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক উপরি কাঠামো সযতনে উপেক্ষা করে ভেতরের বয়ানটাকেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর এই ভেতরের বয়ানটা কবির যাপিত জীবনের পরিমণ্ডল থেকে যতটা এসেছে তার চেয়ে অধিক যেন কবিতা-ই কবির যাপিত জীবনকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে-শামশের খুনির রাগ নিয়ে কবিতার টুটি চিপে ধরে কবিতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন সেই কবিতার কাছেই খুন হলেন তিনি। শামশের-এর মৃত্যু প্রসঙ্গে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তার ডায়েরিতে লিখেন :

‘আজ সকাল ৮ টায় শামশের আনোয়ার শামশেরকে মেরে ফেলল। আত্মহত্যা করার কথা থাকে, অনেকেই করে না। প্রয়োজনও থাকে না। কারণ মৃত্যু তো আগেই হয়ে গেছে, শামশের ভীষণভাবে বেঁচে ছিল। তাই কলকাতার সাহিত্য-সংসারে সে ছিল একজন প্রকৃত একঘরে কবি।’

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই :
জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj