হোম গদ্য শহীদ কাদরীর একটি কবিতা : কবিতার আঙ্গিক ও অন্তর্জাল

শহীদ কাদরীর একটি কবিতা : কবিতার আঙ্গিক ও অন্তর্জাল

শহীদ কাদরীর একটি কবিতা : কবিতার আঙ্গিক ও অন্তর্জাল
1.42K
0

প্রেম
শহীদ কাদরী

 

We must Love one another or die.
–  W.H Auden

 

না, প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকো নয়—
যার চোখ মুখ, নাক ঠুকরে খাবে
তলোয়ার-মাছের দঙ্গল, সুগভীর জলের জঙ্গলে
সমুদ্রচারীর বাঁকা দাঁতের জন্যে যে উঠেছে বেড়ে,
তাকে, হ্যাঁ, তাকে কেবল জিজ্ঞেস ক’রো, সেই বলবে
না, প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকো নয়,
ভেঙে-আসা জাহাজের পাটাতন নয়, দারুচিনি দ্বীপ নয়,
দীপ্র বাহুর সাঁতার নয় : খড়কুটো? তা-ও নয়।
ঝোড়ো রাতে পুরনো আটচালার কিংবা প্রবল বৃষ্টিতে
কোনো এক গাড়ি বারান্দার ছাঁট-লাগা আশ্রয়টুকুও নয়।
ফুসফুসের ভেতর যদি পোকা-মাকড় গুঞ্জন ক’রে ওঠে
না, প্রেম তখন আর শুশ্রূষাও নয়; সর্বদা, সর্বত্র
পরাস্ত সে; মৃত প্রেমিকের ঠান্ডা হাত ধরে
সে বড়ো বিহ্বল, হাঁটু ভেঙে-পড়া কাতর মানুষ।
মাথার খুলির মধ্যে যখন গভীর গূঢ় বেদনার
চোরা স্রোত হীরকের ধারালো-ছটার মতো
বয়ে যায়, বড় তাৎপর্যহীন হয়ে ওঠে আমাদের
ঊরুর উত্থান, উদ্যত শিশ্নের লাফ, স্তনের গঠন।

মাঝে মাঝে মনে হয় শীতরাতে শধু কম্বলের জন্যে,
দুটো চাপাতি এবং সামান্য শব্জির জন্যে
কিংবা একটু শান্তির আকাঙ্ক্ষায়, কেবল স্বস্তির জন্যে
বেদনার অবসান চেয়ে তোমাকে হয়তো কিছু বর্বরের কাছে
অনায়াসে বিক্রি ক’রে দিতে পারি—অবশ্যই পারি।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই স্বীকারোক্তির পর মনে হলো :
হয়তোবা আমি তা পারি না—হয়তো আমি তা পারব না।

 


☼☼☼

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সৃষ্টির উদ্দেশ্য পাওয়া যায় না, নির্মাণের উদ্দেশ্য পাওয়া যায়। আর এটাও তো ঠিক, যা-কিছু নান্দনিক তার বৈষয়িক উপযোগিতাও কম। আর উপযোগিতা দিয়ে কবিতার সুরাহা হয় না। কেননা কবিতা সৃষ্টিধর্মী। পানির টেপ বা টিউবঅয়েলের নান্দনিক দিক নাই। কেননা এদের নির্মাণের বৈষয়িক উদ্দেশ্য আছে। আবার ঝর্নার পানিতে নান্দনিকতা অনেক বেশি। কিন্তু বৈষয়িক উদ্দেশ্যে সেই পানি খুব কমই ব্যবহৃত হয়। তবে উদ্দেশ্য না থাকুক, ঝর্নার পরিপার্শ্ব ঘিরে একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট বা শিল্পিত ব্যবস্থাপনা লক্ষ করি আমরা। সেটি হয়তো প্রাকৃতিকভাবেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই আনুপাতিক ব্যবস্থাপনাই তাকে নান্দনিক হতে সাহায্য করে। কবিতা পাঠ করতে গেলে সেই শিল্পিত অ্যারেঞ্জমেন্ট অবচেতনায় কাজ করে আমাদের মনে। তখন কবিতাটি আমাদের উজ্জীবিত করে। ভালোলাগার অনুভূতি জাগায়। বিষয় এবং আঙ্গিক মিলেই সেই ব্যবস্থাপনা। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কখনো বিষয় অথবা আঙ্গিক যে-কোনোটিই পাঠকের বিবেচনায় প্রধান হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বিষয় এবং আঙ্গিকের সুসমন্বয় অধিকতর কাম্য। কেননা তখন কবিতা উচ্চ মার্গে পৌঁছে যায়। কখনো বিষয় আঙ্গিক নির্বাচন করে দেয়। আবার আঙ্গিকও বলে দিতে পারে কোন বিষয়টি নিতে হবে। কবি তার অন্তর্গত তাগিদে সেটি বিবেচনা করেন। কিন্তু কবিতার আঙ্গিক বা অন্তর্লোক যা-ই হোক, কবির অভীষ্ট ছিল না এমন অনেক কিছুই পাঠকের নির্মিতিতে ধরা পড়েতে পারে। এভাবে একটি কবিতা পাঠকের পঠনের মধ্য দিয়ে বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। তাই হয়তো বোর্হেস বলেছেন, একটি বই তখনই প্রাণ পেয়ে যায় যখন তা উন্মুক্ত করা হয় এবং পাঠ করা হয়, তার মানে বইটিতে পাঠক অবদান রাখেন…পাঠক লেখককের সঙ্গে সহযোগিতা করেন এবং লেকককে সমৃদ্ধ করেন। মহাকবি গ্যেটে ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে দেখতেন তা কিভাবে সজ্জিত আছে। পাখির পালক ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখতেন ডানার উপর তার গ্রন্থন। পাঠকও সেভাবে কবিতাকে তথা তার সৃষ্টি-সংশ্লেষকে বিভিন্নভাবে ভেঙে বুঝে নিতে পরেন তার অন্তর্গঠন, তার বহিরঙ্গ। ফলে একটি কবিতায় কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন, কিভাবে বোঝাতে চেয়েছেন সেটি কখনোই খুব জরুরি বিষয় নয়। পাঠক কী বুঝেছেন এবং কিভাবে উপলব্ধি করেছেন কবিতাটি আজকের সময়ের প্রেক্ষিতে, সেটিই মুখ্য। কেননা প্রথম যে অভীষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কবি কবিতাটি লিখেন, কবিতা পাঠ করবার পর তার সেই লক্ষ্য নিজের কাছেই  পরিবর্তিত হয়ে যায়। অন্য এক অভিজ্ঞতায় নতুন নির্মিতির দিকে নিজের লেখা কবিতাটি তিনি আবিষ্কার করেন। কবি বিনে অন্য পাঠকের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি আরও সত্য হয়ে ওঠে। ‘সোনার তরী’ কবিতা নিয়ে অধ্যাপক আনোয়ার পাশা তার ছাত্রদের মাঝে নতুন বিশ্লেষণ তুলে ধরেছিলেন। ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই/ছোট সে তরী’—এর মধ্যে তিনি আধুনিক শ্রমক্লান্ত মানুষের ট্র্যাজেডিকে আবিষ্কার কিরেছিলেন । কর্মযজ্ঞে অতিব্যস্ত মানুষ শেষ পর্যন্ত যেন নিজেকেই খুঁজে পায় না। অথচ সভ্যতা নামক ‘সোনার ধান্য’ মানুষেরই কর্মপ্রেরণায় আজকের পর্যায়ে উপনীত। সেখানে কর্মব্যস্ততা আছে, কর্মক্লান্তি আছে, কিন্তু নিজের ঠাঁই নাই। ইত্তেফাক-এর এক নিবন্ধে কবি সাযযাদ  কাদির তার শিক্ষকের সূত্র ধরে ‘সোনার তরী’ কবিতার এই নতুন নির্মিতির কথা জানিয়েছেন। পাঠকের পঠনের মধ্য দিয়ে কবিতা এইভাবে নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। নতুন নির্মিতি পায়। সৃষ্টিসুখ নয়, পাঠকের আনন্দ তাই আবিষ্কারের আনন্দ। সেই আনন্দ নিয়ে পাঠ করলে কবিতা আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।


সামান্য আশ্রয় কিংবা শুশ্রূষার মতো মানবিক অনুষঙ্গে প্রেমকে খুঁজে পান নি তিনি।


শহীদ কাদরীর কোথাও ‘কোনো ক্রন্দন নেই’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। এই গ্রন্থের অন্তর্গত ‘প্রেম’ কবিতাটি যতবার পড়ি ততবারই উপভোগের নতুন প্রণোদনা আমাকে আবিষ্ট করে। কবিতার শুরুতে অডেনের কবিতার একটা উদ্ধৃতি জুড়ে দিয়েছেন তিনি : We must die one another or die—ভালোবাসা অথবা মৃত্যু—এই-যে নির্মম অনিবার্যতা তা কবিতার সারফেস লেভেলে কোথাও পরিলক্ষিত নয়। শুধু এর উপরিতলের বয়ান লক্ষ করলে বরং উল্টোই মনে হবে। কিন্তু গুরুত্ব বুঝতে হলে ওই উদ্ধৃতিকে পাশ কাটানোর কোনোই উপায় নেই। শুরু হয়েছে এভাবে :

না, প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকো নয়—
যার চোখ মুখ, নাক ঠুকরে খাবে
তলোয়ার-মাছের দঙ্গল, সুগভীর জলের জঙ্গলে
সমুদ্রচারীর বাঁকা দাঁতের জন্যে যে উঠেছে বেড়ে,
তাকে, হ্যাঁ, তাকে কেবল জিজ্ঞেস ক’রো, সেই বলবে
না, প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকো নয়,
ভেঙে-আসা জাহাজের পাটাতন নয়, দারুচিনি দ্বীপ নয়,
দীপ্র বাহুর সাঁতার নয় : খড়কুটো? তা-ও নয়।
ঝোড়ো রাতে পুরনো আটচালার কিংবা প্রবল বৃষ্টিতে
কোনো এক গাড়ি বারান্দার ছাঁট-লাগা আশ্রয়টুকুও নয়।
ফুসফুসের ভেতর যদি পোকা-মাকড় গুঞ্জন ক’রে ওঠে
না, প্রেম তখন আর শুশ্রূষাও নয়;

এই পর্যন্ত কবিতাটিতে প্রচল কোনো উপমায় প্রেমকে মহিমান্বিত করেন নি কবি। বরং তিনি শুরু করলেন বিপরীত ধারা থেকে। প্রেম কী কী নয়, তারই ফিরিস্তি দিলেন। ছিপছিপে নৌকোর মতো পারাপারের ভূমিকা নেবে না প্রেম। ‘ভেঙে-আসা জাহাজের পাটাতন’ দেখে যে-ভরসা পায় ঝড়ে আক্রান্ত নাবিক, প্রেম সেটুকুও নয়। দীপ্র বাহুর সাঁতার এমনকি খড়কুটোর মতোও স্বাবলম্বী নয় প্রেম। সামান্য আশ্রয় কিংবা শুশ্রূষার মতো মানবিক অনুষঙ্গে প্রেমকে খুঁজে পান নি তিনি। কাজেই নৌকা, পাটাতন, সাঁতার এবং খড়কুটোকে প্রতীক হিসেবে নিলে কবিতাটি’র তাৎপর্য বেড়ে যায়। নইলে প্রেমের মতো হার্দিক এবং গভীর সংবেদনশীল একটি বিষয়কে উপর্যুক্ত উপাদানগুলোর সঙ্গে তুলনা করে কবি কেন দেখাতে চাইবেন যে, প্রেম এসব নয়। এখন প্রশ্ন হলো প্রেম তাহলে কী? এই প্রশ্নের জবাবও খুব সরাসরি দিচ্ছেন না কবি। বলছেন :

…সর্বদা, সর্বত্র
পরাস্ত সে; মৃত প্রেমিকের ঠান্ডা হাত ধরে
সে বড় বিহ্বল, হাঁটু ভেঙে-পড়া কাতর মানুষ।

ঠিক এখানেই কবিতাটির সত্যিকারের আধুনিকতা। মধ্যযুগ এমনকি রোমান্টিক যুগেও প্রেমকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। প্রেমের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট করা হয়েছে মানুষের মহত্ত্বকে। প্রেম ছিল জয়ী। ‘স্বর্গ থেকে আসে প্রেম, স্বর্গে যায় চলে’—এরকম একটি ধারণা এই সেদিন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল আমাদের মধ্যে। সেই প্রচল ধারণাকে ভেঙে দিয়ে তিনি প্রেমকে দেখালেন পরাস্ত। পরাজিত প্রেমের পরিণতি তাই বেদনা। শুধু প্রেমের ক্ষেত্রেই নয়, আধুনিক মানুষ মানেই পরাজিত। কাফকার ‘মেটামরফসিস’-এর নায়কের মতো তার ব্যক্তিত্ব আরশোলায় সংকুচিত হয়ে যায়। শ্রেষ্ঠ জীব হিশেবে যে-খ্যাতি এবং মর্যাদার অধিকারী ছিল মানুষ, আধুনিক যুগে তা ভূলুণ্ঠিত। সর্বপ্রাণবাদের ধারণায় একটি ক্ষুদ্র কীটও তাই সমান গুরুত্ববাহী। মানুষের নিজের ব্যক্তিত্ব যেখানে ধুলোমলিন, সেখানে প্রেমের মহিমা কার্যকরী নয়। দুর্মর আধুনিক মননের অধিকারী কবি শহীদ কাদরী তা মর্ম দিয়ে বুঝেছিলেন। প্রথম স্তবকের শেষদিকে জানাচ্ছেন বেদনা থেকে উদ্ভুত পরিণতির কথা :

মাথার খুলির মধ্যে যখন গভীর গূঢ় বেদনার
চোরা স্রোত হীরকের ধারালো-ছটার মতো
বয়ে যায়, বড় তাৎপর্যহীন হয়ে ওঠে আমাদের
ঊরুর উত্থান, উদ্যত শিশ্নের লাফ, স্তনের গঠন।


যে দুর্বিনীত স্বীকারোক্তি তিনি করেছেন প্রেমিকাকে বর্বরের হাতে তুলে দেওয়ার, সেই  দুর্মর সিদ্ধান্তে সংশয় তৈরি হয় : হয়তো বা আমি তা পারি না, হয়তো আমি তা পারব না।


‘গূঢ় বেদনার’ কারণে এই-যে শারীরবৃত্তীয় কামনা তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে, এখানেই প্রেম, বিশেষত শহীদ কাদরীর প্রেম আধুনিক হয়েও মহৎ। এই মহত্ত্ব আছে বলেই সকল পরাস্ত পরিস্থিতির মধ্যেও প্রেম শেষ পর্যন্ত বিজয়ী। সেই বিজয় উল্লাসের মধ্য দিয়ে নিরূপিত নয়, বেদনার ভিতর দিয়ে জাগরিত। কিন্তু সেই জাগরণকে আবেগের স্রোতে অনিবার্য করে তোলে না আধুনিক কবি। বরং তাকে ধারণ করে। তাই আধুনিক কবিতায় আবেগ থাকে সংহত। প্রথম স্তবকে কবি প্রেম সম্পর্কে যা বলেছেন, তা বিশেষ নয়, নির্বিশেষ। সকল স্তরের আধুনিক মানুষের জন্য প্রযোজ্য প্রত্যয়। দ্বিতীয় স্তবকে এসে তিনি ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে ঢুকে পড়েন। শুধু প্রথম স্তবক অথবা দ্বিতীয় স্তবক নিয়েই দুইটি ভিন্ন ভিন্ন কবিতা হতে পারত। কিন্তু এই দুই স্তবকের সমন্বয়ে একটি পূর্ণতার স্বাদ আমার পেয়ে যাই। দ্বিতীয় স্তবকে তিনি বলেছেন :

মাঝে মাঝে মনে হয় শীতরাতে শধু কম্বলের জন্যে,
দুটো চাপাতি এবং সামান্য শব্জির জন্যে
কিংবা একটু শান্তির আকাঙ্ক্ষায়, কেবল স্বস্তির জন্যে
বেদনার অবসান চেয়ে তোমাকে হয়তো কিছু বর্বরের কাছে
অনায়াসে বিক্রি ক’রে দিতে পারি—অবশ্যই পারি।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই স্বীকারোক্তির পর মনে হলো :
হয়তোবা আমি তা পারি না—হয়তো আমি তা পারব না।

কবি পারবেন না, কেননা সেটি পারার অর্থই হলো উদ্ধৃতিতে উল্লেখিত Love or die—ভালোবাসা অথবা মৃত্যু। এই উদ্ধৃতির ভেতরই একজন প্রেমিকের অসহায়ত্বকে গাঢ় করা হয়েছে। ফলে তা কবিতারই অংশ হয়ে যায় । আপাতদৃষ্টিতে দ্বিতীয় স্তবক একটি বিচ্ছিন্ন অংশ মনে হয়। কিন্তু গূঢ়ার্থ বিবেচনা করলে এ দুই স্তবকের আন্তঃসংযোগ খুবই বলিষ্ঠ। প্রথম স্তবকে যা নির্বিশেষ, তা-ই বিশেষ দৃষ্টান্তের ভিতর দিয়ে পরিস্ফুট হয়। তিনি বিশেষ থেকে নির্বিশেষে যান নি। বরং নির্বিশেষ থেকে যাত্রা করে বিশেষের ভিতর দিয়ে কবিতাটির পরিণতি টেনেছেন। নিজের সিদ্ধান্তের পরাজয়কে মুখ্য করে তুলেছেন। যে দুর্বিনীত স্বীকারোক্তি তিনি করেছেন প্রেমিকাকে বর্বরের হাতে তুলে দেওয়ার, সেই  দুর্মর সিদ্ধান্তে সংশয় তৈরি হয় : হয়তো বা আমি তা পারি না, হয়তো আমি তা পারব না। এই সংশয় বা সিদ্ধান্তহীনতাও আধুনিকতার লক্ষণাক্রান্ত। Let us go then you and I—এই কথা বলেও প্রুফ্রক প্রেমের প্রস্তাব দেবার যে-সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা বাস্তবতা পায় নি। এলিয়ট লিখিত ‘জে আলফ্রেড প্রুফ্রকের প্রেমের গীতি’তে আমরা সেই সংশয় আবিষ্কার করি। প্রেম অথবা হৃদয়ানুভূতি সেখানে কোনো নিশ্চায়কের ভূমিকা নেয় নি। ‘হয়তো’ শব্দের ভিতর দিয়ে শহীদ কাদরী যেমন অনিশ্চিত করে দিয়েছেন। ‘হয়তো’ শব্দটি না থাকলে একটি নিশ্চিত লক্ষ্যে কবিতাটি স্থিত হয়ে যেত। বহুমাত্রিকতা হারাতো। হয়তো’র  জন্য তা হারায় নি। প্রেমিক-প্রেমিকার চিরায়ত মন ও মননের দোলাচল এই শব্দের মধ্য দিয়ে জাজ্জ্বল্যমান। তাই কবিতাটি অনাগত পাঠকের জন্যও উপাদেয় হবে। এখানেই এই কবিতা কালের সীমা ডিঙিয়ে যাবার সম্ভাবনা রাখে।

Kazi Nasir

কাজী নাসির মামুন

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩; মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
লখিন্দরের গান [কবিতা, লোক প্রকাশন, ২০০৬]
অশ্রুপার্বণ [কবিতা, আবিষ্কার প্রকাশনী, ২০১১]

ই-মেইল : kazinasirmamun@gmail.com
Kazi Nasir