হোম গদ্য লাকী আখন্দ : প্রেমে ধ্যানে বেদনায়

লাকী আখন্দ : প্রেমে ধ্যানে বেদনায়

লাকী আখন্দ : প্রেমে ধ্যানে বেদনায়
515
0

লাকী আখন্দ আমাদের বাংলা গানের এমন ভূখণ্ড যার সজীবতা আমাদের কেবল দিয়েই চলে নিরন্তর। ‘পরস্পর’ থেকে লাকী আখন্দের পরলোক গমনের বেশ কিছুদিন আগে বাংলা গান নিয়ে আমাকে লিখতে বললেন কবি তারিক ইমাম (টুকু), যিনি নিজে রাগ ও অন্য সংগীত গভীর ধ্যানে বোঝেন। ‘পরস্পর’-এর সেই অনুরোধে আমার মনে যাদের নাম এল তাদের মাঝে প্রথমেই লাকীর নাম খুব বিশিষ্ট হয়ে জ্বলে উঠল। লাকী আখন্দ স্বতন্ত্র এক স্রোতের নাম। লাকী আখন্দের বিশিষ্ট সুর আমাদের মনে নিত্য জাগে আর আমাদের নীরব করে দেয়। সেসব সুরের প্রান্তরে এমন জ্যোৎস্না খেলা করে যারা হাওয়া ও আলোর গুঞ্জন মিলিয়ে আমাদের ভিন্ন কোনো জগতে নিয়ে যায়। লাকীর অসুস্থতা, পরলোক যাত্রা এসব কথাবার্তার মাঝে আমার কাছে বারবার মনে হয়েছে লাকী চলে গেলে কেবল একজন নিভৃতচারী চলে গেলেন কিনা তার চেয়ে বড় হলো আমাদের যেসব প্রেম, ধ্যান ও বেদনা তিনি উপহার দিয়ে গেলেন তার বিস্তার।

তার সুরের দীর্ঘ তান, অল্প কিন্তু কুশলী যন্ত্রানুষঙ্গ শ্রুতিমধুরতার অধিক এক জগতে আমাদের প্রবাহিত করে। অর্কেস্ট্রেশান তার হাতে অসাধারণ খেলেছে। মনে পড়ে “কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে”, “আমায় ডেকো না”, “হঠাৎ করে বাংলাদেশ”, “তোমার স্বাক্ষর আকাশের” গানগুলো। পাশ্চাত্য আমেজ আর প্রাচ্যের ভাব মিলিয়ে অসামান্য সব সৃষ্টি। গানে যন্ত্রানুষঙ্গ যে কেবল শূন্যতাকে পূরণ করতেই আসে না তা লাকীর বিশিষ্ট সব কাজে খুব মুনশিয়ানা সহকারে উপস্থিত। অনুভব করুন “আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে” গানটির কথা।


লীন সুর স্মৃতির মূল থেকে কিংবা স্মৃতিকে গড়ে নিতে নিতে জেগে ওঠে লাকীর গানে। বিপুল নীরবতার মাঝে মন্দ্র এক স্বর নিজের জায়গা করে নেয়, আর আমাদের বলে—এই স্বপ্নের মোজাইককে, এই মৌনতাকে ছুঁয়ে দেখো।


শিল্পে পরিসর নিয়ে নানা রকম করে কাজ করা যুগ যুগ ধরে আলোচ্য ও চর্চিত। আমাদের এই অঞ্চলের, তথা ভারত উপমহাদেশের ললিতকলা পরিসরকে যেভাবে দেখেছে এবং এখানে আধুনিক শিল্পীরা পরিসরকে যেভাবে ঢুঁড়ে দেখেছেন আমি সেই ভূমি থেকে সুরকেও দেখি। এই চারু ও কারুকলা পরিসরকে অজস্র গুঞ্জনে যেমন ভরে দিয়ে মাধুর্য গড়েছে, আবার অল্প দুই একটি অবয়বকে, ধ্বনিকে বা দেহকে মোক্ষ করেছে। দুইই ধ্যানের রূপ, আনন্দের রূপ, উদ্‌যাপনের রূপ, গুম হয়ে স্রোতের ধারায় নিজেকে আবিষ্কার করার রূপও বটে। এখানে রেখা ও রং যেমন নিজেদের চারুতা নিয়ে যাপিত হয়েছে, ধ্বনিও তেমনি রং পেয়েছে গুণী শিল্পীর হাতে। এসব সুখ ও ধ্যান থেকে প্রেম যেসব বেদনা জন্ম দিয়েছে আমি আমাদের গানকে সেই অন্তর্লীন বিস্তারে অনুভব করি। আমি যখন লাকী আখন্দের সুর দিয়ে গড়া ধ্যানের কথা বলি তখন তার সুরে তৈরি হওয়া এসব নীরবতা, উচ্ছ্বাস, রং ও প্রেম আমার মাঝে যে বেদনা জাগায় তার কথাই মূলত বলি।

লীন সুর স্মৃতির মূল থেকে কিংবা স্মৃতিকে গড়ে নিতে নিতে জেগে ওঠে লাকীর গানে। বিপুল নীরবতার মাঝে মন্দ্র এক স্বর নিজের জায়গা করে নেয়, আর আমাদের বলে—এই স্বপ্নের মোজাইককে, এই মৌনতাকে ছুঁয়ে দেখো। স্মৃতির পরিসরে বেজে ওঠে “আগে যদি জানিতাম তবে মন ফিরে চাইতাম”। হায় প্রেম থেকে প্রেমই জাগে, অনুভব থেকে উপলব্ধি জাগে। আর ধ্যানে আমরা বয়ে যাই। আবারও সেই দীর্ঘ তান থেকে জাগা ধ্যানের কথাই এল। বলে রাখি, আমার চেতনায় ওই স্বর জেগে ওঠা ভিন্ন তাৎপর্য রাখে। স্বর মানেই উপস্থিতি, সর মানেই ধ্যান, স্বর মানেই জীবন।

“আগে যদি জানিতাম” গানের আরও একটি দিক আমি না বলে পারছি না। পাশ্চাত্য ধারার পরিণত শিল্পী লাকী আখন্দ এই গানে দেশি আত্মার স্বরূপ নিয়ে হাজির হলেন। “তোরই মতো কোনোদিন আমিও তো ভুলে যাব” কিংবা “ও মনরে কিসের তরে রয়ে গেলি তুই” এর সেই দুখী কণ্ঠ আমাদের আত্মার কোরকে পৌঁছে যায়। এই আবেদনের মূল আমাদের জলে, বাতাসে, সবুজে। নদীর স্রোতের মতো বহমান সুরে শান্ত ও বিরহবিধুর আবেশ ছাওয়া এক গান। অর্কেস্ট্রেশানের দিকে দেখুন, পরিসর এবং স্বর কিভাবে একে অন্যকে গ্রহণ করে মহৎ সংগীত জন্ম দিচ্ছে এই গানে। আশ্রয় জন্মায় এই সুরে।

আলো জেগে ওঠার মতো “এই নীল মনিহার এই স্বর্ণালি দিনে” লাকীর নিজের কণ্ঠে অসামান্য প্রতিভা ছড়িয়ে যায়। অ্যাকর্ডিয়ন-বেইজের অনুভব কত গভীর হতে পারে “এই নীল মনিহার” তার অন্যতম প্রকাশ। কত কবিকেই দেখি এই গান বাজলেই নির্বাক হয়ে যান। আশির দশকের কবিদের এক প্রধান ধারাকেও আমি জানি এই গানের আবেশে বিহ্বল হয়ে পড়তেন। কত রশ্মির জন্ম দিয়েছে এই গান। আমাদের গানের ইতিহাসকে অন্য আলোয় দেখার প্রান্তর এই গানটি। পরিসর, সুর, কণ্ঠ মিলে অনন্য ঐকতান। নিটোল স্বর আর বিশিষ্ট উচ্চারণ নিয়ে বাজনার মাঝে মাঝে লাকীর উপস্থিতি “শুধু আমায় ডেকো” বলে আজ কয়েক দশক ধরে আমাদের জাগিয়ে রেখেছে।

পরিসরকে গুঞ্জনে ভরে দিয়ে অজস্র নামের, অজস্র স্মরণের আনন্দ আমাদের দিয়েছেন লাকী। “আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়ল তোমায়” গানটি অনন্য হয়ে রয়েছে এই গুঞ্জনে। বৃষ্টির আবহ থেকে আবেশ জাগানো দীর্ঘ তান নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গভীর কণ্ঠে আকাশ ছুঁয়ে যায়। গানের শুরুতেই সন্তুর থেকে বৃষ্টির রং ছড়িয়ে পড়ে। লাকী জানতেন কী করে ধ্বনি ও সুরে রং আনতে হয়। চোখ বুঝে অনুভব করুন ওই গানে বাঁশি ও তবলার যুগলবন্দি। আর ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর কণ্ঠে দীর্ঘ আলাপ… হ্যাঁ, এভাবেই ধ্যান গড়ে দেন লাকী। যারা লাকীকে আধুনিক, পপ, রক সংগীতের মাঝেই চেনেন এই গান অবশ্যই তাদের ভিন্নভাবে ভাবায়। রাগের ওপর উনার করা ‘তোমাকে যেন ভুলে না যাই সে আশীষ দাও মোরে’ গানটিও মনে পড়ছে এখন। রফিকুল আলমের গলায় কত মমতায় বসিয়েছিলেন এই গান উনি। আবিদা সুলতানার গাওয়া কিছু ভিন্ন রকম গানও আছে লাকীর সুরে। আধুনিক, ধীর লয়ের, আরও নানা রকম গানই করেছেন ও করিয়েছেন লাকী। মনে রাখা ভালো খান আতাউর রহমান, সত্য সাহার মতো মহারথীরা আমাদের স্বাধীনতার আগেই উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছিলেন রাগভিত্তিক ও আধুনিক গানের সুরে। আলাউদ্দিন আলী এবং শেখ সাদী খানের মতো সুরকার তখন কীর্তিমান হয়ে উঠছেন—কিছু ব্যতিক্রমসহ—খান আতা, সত্য সাহাদের ধারাতেই। তাদের মাঝে পপ-রক ইত্যাদির বাইরে এসে উচ্চাঙ্গ ও আধুনিক বাংলা গানের সুরের ধারায় নিজের স্বাক্ষর আঁকা তাই লাকীর জন্য বিরাট অর্জন। আরও বড় কথা হলো তার সুর আমরা ভুলি নি এবং ভুলব না সেই খান আতাউর রহমান, সত্য সাহা, আলাউদ্দিন আলী, শেখ সাদী খান এর সুরের মতোই।


লাকী আখন্দ আমাদের দেখিয়েছেন ধ্যান থেকে, শেকড়ের প্রতি টান থেকে এবং যা কিছু বিশ্বসংগীতের তা থেকে গ্রহণ করে কিভাবে নিজের স্বরকে স্বতন্ত্র করে নিতে হয়, কেমন করে আবেদন তৈরি করতে হয়।


প্রেমময়তা, বিরহ, বিষণ্নতা, আকুতি কত বিভিন্ন অনুভূতি তার সুরে ধরা দেয়। কেমন মায়া মাখানো সুর “নীলা, কেন চোখ দুটি আঁখিজলে রয়েছে ভরে” কিংবা “কেন বলো” গানগুলোতে। আধুনিক সময়ের মধ্যবিত্ত মানস তার সুরে বেজে উঠল। আমাদের বিষণ্ন, একাকী ও প্রেমের আর্তিময় দিন ও রাত তার সুরের আশ্রয়ে বলে উঠল “এই বসন্তে গান ছাড়া যে কিছু ভালো লাগে না”, “কাল কী যে দিন ছিল”, “কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে”। সামিনা চৌধুরী উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠেন লাকীর সুরে।

প্রেমের এমন হৃদয়গ্রাহী সুর “যেখানে সীমান্ত তোমার” গানে বাজে। কিংবা “লিখতে পারি না কোনো গান আজ তুমি ছাড়া”। এখানে বলতে চাই, লাকীর নিজের কণ্ঠে গাওয়া তার সুরের গান আর ভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে সেই একই গানে মাধুর্যের ভিন্নতার কথা। আমার পক্ষপাত লাকীর দিকেই। কুমার বিশ্বজিৎ ও জেমসের কণ্ঠের গান দুটোর চেয়ে আমার শ্রুতিতে লাকীর কণ্ঠেই ওই গানের আবেদন গভীরতর।

সুরের অভিযাত্রায় বৈচিত্র্যের অভিসারী ছিলেন লাকী। “আনন্দ চোখ”, “স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে গান তো লিখেছি”, “জিপসীরা ঘর বাঁধে না ভালোবাসে নীল আকাশ”, “মামুনিয়া’, “তুমি কে বলো না” কী উজ্জ্বল সব সুর। হ্রস্ব দৈর্ঘ্য’র সুরেও অনন্য লাকী—“তুমি চেনা পথে ঘুরে ঘুরে অচেনা পথে এসে দাঁড়ালে” শিরোনামের এক গানে তার স্বরূপ মেলে।

লাকী আখন্দ আমাদের দেখিয়েছেন ধ্যান থেকে, শেকড়ের প্রতি টান থেকে এবং যা কিছু বিশ্বসংগীতের তা থেকে গ্রহণ করে কিভাবে নিজের স্বরকে স্বতন্ত্র করে নিতে হয়, কেমন করে আবেদন তৈরি করতে হয়। তার আনন্দ চোখ গানের একটি পঙ্‌ক্তি এমন, “তুমি কি সেই সোনালি হৃদয়, পৃথিবীকে ভালোবেসে দুঃখ পেয়েছিলে?” অভিবাদন, লাকী আখন্দ। আপনি শিল্পী, দুঃখ যদি পেয়েই থাকেন তবুও স্বর্ণালি দিন দিয়ে গেছেন আমাদের। আপনিই সেই সোনালি হৃদয়।

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ