হোম গদ্য রুজিনার আবদার, এবং অতঃপর

রুজিনার আবদার, এবং অতঃপর

রুজিনার আবদার, এবং অতঃপর
914
0

ঈশান কোণে মেঘ জমেছে; বাদবাকি আকাশ পরিষ্কার। পশ্চিম আকাশ রক্তিম হয়ে আছে; যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের অজস্র দেহ থেকে রক্ত ঝরে প্রান্তর আর রক্ত একাকার হয়ে যায়, সেইরকম একাকার হয়ে যেন রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে! কেরামত আলি প্রতিদিন শেষ বিকেলের দিকে ইলেকট্রিক পিলারের নিচে একটু অসমান যে জায়গায় তার ঠেলাগাড়িটি নিয়ে বসে, চৈত্রের তীব্র বাতাসে চারদিক থেকে ঝরা পাতা এসে সেখানকার পানি-মাটিতে আটকে গিয়ে এক বেগতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।


অবিবাহিতা রুজিনাকে বিয়ে করতে কেরামত আলিকে কম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় নি। বিবি মঈরুন তো ভাইদের নিয়ে পঞ্চায়েতি সালিশ ডেকে রীতিমত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


 বৃষ্টি হয়েছে আজ সকালে।

কেরামত আলি একটু আগে তার ঠেলাগাড়িটি নিয়ে এসেছে। পানি আর পাতার স্তূপ দেখে ঠেলাটা একটু কায়দা করে বসিয়ে তারপর পানির কাছেই অবস্থান নিয়েছে; জায়গা ছেড়ে যায় নি। জায়গাটা তার কাছে বড় লক্ষ্মী। বেঁচে-বর্তে থাকার একটা উপায়। বেঁচে-বর্তে থাকার জন্যে এই এক জীবনে কিই-বা না করল কেরামত আলি! কিন্তু, মাস ছয়েকের বেশি কোনো কাজেই টিকতে পারল না। অথচ বছর পাঁচেক ধরে এই কারবারে টিকে আছে। তার ধারণা, জায়গার কারণে তার এই টিকে থাকা। আল্লাহ রিজিক দেন, তবে উছিলা লাগে। এই জায়গা বা মাটি তার সেই উছিলা। তাই রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে কেরামত আলি স্থান ত্যাগ করে না। একই স্থানে দাঁড়িয়ে কারবার করে যায়।

জামাল আজ কেরামত আলির কাছ থেকে হাত দশেক দূরে অবস্থান নিয়ে মাল-সামানা সাজাতে সাজাতে জিজ্ঞেস করল, ‘ও কেরামত আলি বাই, পানির তলে নু গাড়ি লইয়া উবাই (দাঁড়িয়ে) রইসো! থুরা হরিয়া (সরে) উবাও না। হালার এক কারবার কররায়! আর করতায় নানি, নয়াবিবির রস…।’

কেরামত আলি কোনো উত্তর করল না। বিড়বিড় করে আপন মনে একটা হিশেব-নিকেশ করে নিল। আজ মাল-সামানাও বেশি। পাশের কারবারি মসদ্দর আলি তার বন্ধু কেরামত আলির হয়ে একটা যুৎসই জবাব দেয়ার চেষ্টা করল। বলল, ‘তুইন হিদিন (দিন কয়েক আগের) কালোর কারবারি! ওউ কয়দিন অইলো কারবারো আইসোত। কেরামত আলির মাজেজা বুঝতে নায়।’ সত্যি, কেরামত আলির মাজেজা বোঝা বড় দায়! আক্রার দিনে সবাই যখন কাউকা (কাক) ডাকায়, কেরামত আলি তখন এক নাগাড়ে কারবার করে যায়।

জামাল ও মসদ্দর আলির কথা-বার্তা শুনে কেরামত আলি একটু চোখ তুলে তাকাল।

তার মনে এত রঙ নেই। তাই এইসব বারোয়ারি আলাপে প্রায়ই সে অংশ গ্রহণ করে না। চোখ বুজে শুধু শুনে যায়। চার মেয়ে আর বিবি মিলিয়ে ছয়জনের সংসারে একদিন বিক্রি-বাট্টা কম হলে রাজ্যির চিন্তা এসে তার মাথাকে আউলা-ঝাউলা করে দেয়। তার ওপর দিনসাতেক হয়, কত বিতি-কিচ্ছা করে রুজিনাকে বিয়ে করে অনত্র গিয়ে ওঠেছে।

অবিবাহিতা রুজিনাকে বিয়ে করতে কেরামত আলিকে কম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় নি। বিবি মঈরুন তো ভাইদের নিয়ে পঞ্চায়েতি সালিশ ডেকে রীতিমত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষ-মেশ, পঞ্চাইত মরম আলিকে ধরে কেরামত আলি উতরে যায়। পঞ্চাইত মরম আলির স্বার্থ, আর কেরামত আলির স্বার্থ এক হয়ে হ্যারিকেনের শক্তি সঞ্চয় করে সবকিছু ছাপিয়ে যায়।

কেরামত রুজিনাকে বিয়ে করে।

মাস ছয়েক হয়, কেরামত-রুজিনার প্রেম-পিরিতি—ভালোবাসা চাউর হয়ে হাট-ঘাট-মাঠ ছড়াচ্ছিল।


একদিন টের পায়, তার স্বামী মরম আলি রুজিনাকে গিলতে শুরু করেছে। বদ খাসলত মরম আলির দিন-মাদান রুজিনার স্বাদে মাঝে মধ্যে ঢেকুর গিলেও সুন্দরভাবে কাটছিল।


রুজিনা তখন পঞ্চাইত মরম আলির বাড়ির বান্দি। ঠেকায়-বেঠেকায় বাজারে আসে; বাজার-সদাই করে। পঞ্চাইত বাড়ির বান্দি হওয়ায় ঠাট-বাটও দেখায়; কাউরে তোয়াক্কা করে না। কেবল কেরামত আলির দ্বারে আসে, আনাজ-পাতি কেনে, আর রঙ-তামাশা করে। তার এই রঙ-তামাশার খবর এককান-দুইকান হয়ে মরম আলির কানেও যায়। মরম আলি কিচ্ছু বলে না, কেবল স্মরণে রাখে।

মরম আলি তখন রুজিনাকে নিয়ে জৈবিক চাষাবাদে ভীষণ ব্যস্ত।

বছর তিন-চারেক আগে রুজিনা যখন কাজের সন্ধানে কেরামতের বিবি মঈরুনের হাওলায় মরম আলির বিবি সুরতুন্নেসার দুয়ারে আসে, সুরতুন্নেসা তার রূপ-যৌবন দেখে স্বামীর বদ খাসলতের কথা ভেবে এক পা এগিয়ে যখন দুই পা পিছিয়ে যায়, মরম আলি তখন এগিয়ে আসে—বলে, ‘প্যারালাইসোর কারণে তুমার তো এমনেই সব শেষ! হি (ঐ) ছুটা বান্দি যে অইতো নায়। ওগুরে রাখো। বাপ-পুয়ায় চাইরটা বাত (ভাত) তো খাইতাম।’ সুরতুন্নেসা আর না করতে পারে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রুজিনাকে রাখে; বাড়িতে জায়গা দেয়।

তারপর একদিন টের পায়, তার স্বামী মরম আলি রুজিনাকে গিলতে শুরু করেছে।

বদ-খাসলত মরম আলির দিন-মাদান রুজিনার স্বাদে মাঝে মধ্যে ঢেকুর গিলেও সুন্দরভাবে কাটছিল, কিন্তু, দেশে থাকা একমাত্র ছোট ছেলে নেওর আলির মতিগতির কারণে তার জাবর কাটায় ব্যাঘাত ঘটে।

মরম আলির ধর্ম-নীতি-নৈতিকতা সবকিছু জাগ্রত হয়। ভেবে-চিন্তে বিবির সঙ্গে পরামর্শ করে সে কেরামতকে খবর পাঠায়। কিন্তু, বার্তাবাহক কেরামতকে খুঁজে পাওয়ার আগে তার বিবি মঈরুন এসে হাজির হয়। কান্নাকাটি করে আসন্ন সমূহ বিপদের কথা বিস্তারিত জানায়, সাহায্য চায়। স্বামী-স্ত্রী মিলে মঈরুনকে সহানুভূতি দেখালেও শেষ-মেশ মরম আলি নিজ স্বার্থে কেরামতের পেছনে শক্ত হাতে দাঁড়ায়।

কেরামতের জিত হয়।

জামালের কণ্ঠে রুজিনার কথা শুনে কেরামত আলির মুখে আনন্দের একটা ঝিলিক খেলে গেল। রাজ্যির সব চিন্তা বাদ দিয়ে মসদ্দর আলির দিকে তাকিয়ে আজ সে একটা উত্তর করল। বলল, ‘আবিতায় (অবিবাহিত) আর বেবুতায় (অবুঝ) সমান। ভাবনা-চিন্তা নাই তো, দেখো বেবাটোর গরোর বেবাটে কী জাত বিজালার (যন্ত্রণার) মাত মাতের!’

মসদ্দর আলিও কথা বলল। কেরামত আলি মসদ্দর আলির সঙ্গে টুকটাক কথা-বার্তা সেরে নিয়ে তার মাল-সামানায় হাত বুলালো। বামদিকের খোপে শুঁটকি তো সাজানোই আছে, শুধু ডানদিকের খোপে বড় আলুগুলো ওপরে রেখে ছোটগুলো ভেতরে ঢোকাতে হবে।

আজ কেরামত আলি আলু, বেগুন, ফুলকপি, বাধাকপি আর কাঁচা মরিচ নিয়ে এসেছে। শিম ইচ্ছে করে আনে নি। কদিন থেকে বৃষ্টি হচ্ছে, কাস্টমার আর শিম গিলবে না। ফরাশের বিচি এনেছে এক পাল্লা (পাঁচ কেজি)।


জামাল ও মসদ্দরকে বলে ঘণ্টাখানেকের জন্যে জিন্দা বাজারের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে কী মনে করে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। বাড়িতে তখন পঞ্চাইত মরম আলি রুজিনার আবদার মেটাচ্ছিল।


বান্ধা এক কাস্টমার কাছে এসে দাঁড়াতেই কেরামত আলি কাস্টমারকে উদ্দেশ করে এক সওয়াল করল। বলল, ‘বাইসাব, আফনার লাগি বড় সুন্দর গাগলা মাছোর শুঁটকি আইনছি। কইসলা নু আফনে, ওউ আফনার লাগি আইনছি।’

বান্ধা কাস্টমার হাত লাগিয়ে দেখে-শুনে তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘দাম কতবা?’

‘আফনার লাগি ষাইট টেকা শ, বাইসাব। চা ওয়ালাগ তো নায়। আমি বাসিয়া আইনছি।’

বান্ধা কাস্টমার তাতে আশ্বস্ত হলো না। ভালোভাবে দেখে-শুনে তারপর দরদাম শুরু করল। বলল, ‘ষাইট টেকা বেবাট। বাটো আনো। পঞ্চাশ টেকা লাগাও।’

শেষ-মেশ, পঞ্চান্ন টাকায় রফা হলো। কাস্টমার আড়াইশ গ্রাম গাগলা মাছের শুটকি কিনল। শুটকি দিতে দিতেই কেরামত আলি কাস্টমারকে বলল, ‘বাইসাব, মুন্সিগঞ্জি আলু আট টেকা করি লাগাইদিছি। পাঁচ কেজি নেউক্কাগি।’ কাস্টমারের সাড়া পেয়ে দুটো পলিথিন ব্যাগ এক করে পাঁচ কেজি আলু কাস্টমারের হাতে তুলে দিল কেরামত আলি। টাকা মিলাবার জন্যে তিন টাকার কাঁচা মরিচও দিল।

বান্ধা কাস্টমারের সঙ্গে কখনও নয়-ছয় করে না কেরামত আলি। তবে, জামাল-নঈমুদ্দিন-মজিরুদ্দিন-মসদ্দর আলির কাস্টমার কাঙ্ক্ষিত সবজি না পেয়ে হোঁচট খেয়ে এদিকে এলে ভাব বুঝে আট টাকার আলু ছয় টাকা, ত্রিশ টাকার ফরাশের বিচি বত্রিশ টাকা দরে গছিয়ে দেয়। কাস্টমার খুশি হয়ে বাড়ি যায়। পরদিন কেরামত আলির দ্বারে আসে।

বিক্রি-বাট্টা করতে করতে কাস্টমারের ভিড় একটু কমে এলে ফুরসত পেয়ে কেরামত আলি সিগারেট একটা ধরিয়ে সুখটান দিতেই তার নয়াবিবি রুজিনার আবদারের কথা মনে হলো। দিন দুয়েক ধরে রুজিনা আবদার করছিল।

অতঃপর, কেরামত আলি আর বিলম্ব করল না। পানি কাপড় দিয়ে মাল-সামানা ঢেকে রেখে জামাল ও মসদ্দরকে বলে ঘণ্টাখানেকের জন্যে জিন্দা বাজারের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে কী মনে করে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো।

বাড়িতে তখন পঞ্চাইত মরম আলি রুজিনার আবদার মেটাচ্ছিল।

iqbal@gmail.com'
iqbal@gmail.com'

Latest posts by ইকবাল তাজওলী (see all)