হোম গদ্য রাশিয়া বিপ্লব ও কাজী নজরুল ইসলাম

রাশিয়া বিপ্লব ও কাজী নজরুল ইসলাম

রাশিয়া বিপ্লব ও কাজী নজরুল ইসলাম
406
0

অক্টোবর বিপ্লব। পৃথিবীর ইতিহাসে রাশিয়ায় দুইটি বিপ্লবের মিলিত এটি এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই বিপ্লবের পর যে শুধু রাশিয়ার বিশ কোটি মানুষের দীর্ঘকালের অত্যাচার-বন্ধন-পীড়ন থেকে মুক্তি ঘটেছিল তাই নয়, একই সাথে পুরো পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের জীবনেও তাতে এক প্রচণ্ড আশা-আলোড়ন ও মুক্তির উৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বিশ্বাস সে-সময় তৈরি হয়েছিল, বিশ্বমুক্তির সম্ভাবনা অতঃপর আর দূরাগত হয়ে থাকতে পারে না। অক্টোবর তথা নভেম্বরের বিপ্লব যে-পথে অগ্রসর হয়েছে, বিশ্ববিপ্লবও একদিন সেই পথে এগিয়ে যাবে, সেই স্বপ্ন এ বিপ্লবের উত্তরাধিকারদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রয়েছে। এখানে প্রাসঙ্গিক, রাশিয়ার পুরাতন পঞ্জিকা অনুযায়ী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে। এতদিন তাই বিপ্লবকে ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামেই অভিহিত করা হয়ে আসছিল। কিন্তু সংশোধিত নতুন পঞ্জিকা অনুয়ায়ী বিপ্লবের তারিখ পড়ে নভেম্বর। কিন্তু মানুষের মনে এখনও ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে ব্যাপক পরিচিত রয়েছে।

রাশিয়া বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সে দেশের শ্রমিক ও কৃষকদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরণের জন্যে—জারতন্ত্রের উচ্ছেদ করে। প্রকৃতপক্ষে, রাশিয়া বিপ্লবের মহানায়ক মহামতি ভ্লাদিমি লেনিন এই বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিগত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে সচেতনভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠেছিলেন। একটির পর একটি ধাপে অগ্রসর হয়ে অবশেষে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর চূড়ান্ত আঘাত হেনেছিলেন। রাশিয়া বিপ্লবের ঐতিহাসিকদের মতে, লেনিনের সময়জ্ঞান ছিল ভীষণ নিখুঁত—তিনি তার অভিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে আঘাত হানার নির্ধারিত দিনটিকে একটি দিন এগিয়ে আনেন নি, একদিন পিছিয়েও দেন নি। সঠিক সময়ে কাজটি করে অত্যাচারী জার শাসনকে রাশিয়া মাটি থেকে চিরতরে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছিলেন। এবং তার জায়গায় সোভিয়েত বিপ্লবী সরকার—বলশেভিক (কমিউনিস্ট) সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশে দেশে যখন প্রচণ্ড অভিঘাতের সৃষ্টি করে, তখন একদিকে কোটি কোটি মানুষের মনে আনন্দ ও উদ্দীপনার ঢেউ বয়ে যায়, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদগোষ্ঠীর ধনিক শ্রেণির মনে আতঙ্ক, হতাশা ও বিহ্বলতা জাগে।


নজরুলের দেশপ্রেমে ভরপুর হৃদয় মুজফফর আহমদের সান্নিধ্য ও কর্মপ্রেরণায় শোষিত-নিপীড়িত মানুষের স্বার্থবাহী শ্রেণিচেতনা তথা সাম্যবাদী চিন্তাধারায় ঋদ্ধ হয়েছিল।


ভারতবর্ষের তখনকার ব্রিটিশ সরকার রাশিয়া বিপ্লবের খবর এদেশে চেপে রাখার জন্য সবধরনের চেষ্টা করছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সর্তকতার সমস্ত বেড়াজাল ভেদ করে এই সংবাদ ক্রমেই এ উপমহাদেশের জনগণের মধ্যে জানা হতে থাকে। স্বভাবতই জনগণ এই খবরগুলোতে প্রচণ্ডভাবে নাড়া খায়। এদেশের মানুষের কাছে বিশ্ব-কাঁপানো চারিদিকে ব্যাপক দাবানল সৃষ্টি হয়ে আলো হয়ে ওঠে, তার স্বপ্রকাশ এতটাই ক্ষমতাবান, দুরবিন দিয়ে তাকে দেখবার প্রয়োজন হয় না। রাশিয়া বিপ্লবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনায়, তাৎপর্যে ও পরিমাণে এতই বহ্নিমান ছিল যে, তা থেকে ছিটকে আসা দুই-একটা আগুনে ব্রিটিশরা সমস্ত চক্রান্ত ভেঙে দিতে কোটি কোটি যৌবন এক অখণ্ড অঙ্গার হয়ে জ্বলে উঠেছিল। যেখানেই কুটো থেকে আগুন জ্বলেছিল সেখানের মুক্তির তপ্ত বীজের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিয়েছে নতুন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি।

রাশিয়া বিপ্লবের মহানায়ক লেনিন থেকে শুরু করে অন্যান্য সহযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ম্লান করার জন্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অপ্রচার চালাতে লাগল। এভাবে প্রচার করা হচ্ছিল যে, লেনিন ও তার সহযোদ্ধারা একদল দস্যু। গোপন ষড়যন্ত্রের ছিদ্রপথে বলপ্রয়োগের সাহায্যে রাশিয়ার সিংহাসনের ন্যায্য অধিকারী জার নিকোলাসকে শাসনতন্ত্র থেকে উৎখাত করে তার জায়গায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। বিপ্লবীদের কাজে পেছনে যে গোটা দেশের শ্রমজীবী জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল—এ কথা সচেতনভাবে গোপন রাখা হয়। মিথ্যা প্রচারের প্রভাবে অনেক সময় সত্যসন্ধ মানুষও বিভ্রান্ত হয়। তার প্রমাণ উল্লেখ করতে গিয়ে এই উল্লেখটা যথেষ্ট হয় যে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার ভাবশিষ্য প্রমথ চৌধুরীর মতো মুক্ত মনের মানুষরাও ইংরেজের এই অপপ্রচারে গোড়ায় কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন (প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ রবীনন্দ্রনাথকৃত ওই বইয়ের ভূমিকা দ্রষ্টব্য)। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা তাদের ওই ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত রাশিয়া পরিদর্শনে যে অমর পত্রগুচ্ছ লেখেন (রাশিয়ার চিঠি) তাতে তিনি তার পূর্বকৃত ভুলের পুরোপুরিই প্রায়শ্চিত্র করেন বলা যায়।

রাশিয়া বিপ্লবের ঢেউ বাংলাদেশের তীরে এসেও আছড়ে পড়েছিল। দুটি ঘটনায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথম ঘটনা, কমরেড মুজফফর আহমদসহ কৃষক-শ্রমিক নেতা কর্তৃক ১৯২০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। দুই. বাংলা সাহিত্যে অক্টোবর বিপ্লবের প্রতিফলন। অবশ্য গোড়ার দিকে এই প্রতিফলন অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল, কিন্তু যতদিন যেতে থাকে ততই তার সময়প্রভাবে প্রবল আকার হতে থাকে। প্রথম দিকে কমরেড মুজফফর আহমদের সহযোগী-সুহৃদ কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনাতেই বিপ্লবী ভাবের স্ফুরণ সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। বিদ্রোহী কবি নজরুল তখনও বাংলা কথাসাহিত্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন নি, তখনও তিনি ৪৯ নং বাঙালি পল্টনের সৈনিক হিশেবে করাচিতে অবস্থান করছিলেন। তখন থেকেই তার রচনার মধ্যে রাশিয়া বিপ্লবের ছায়াপাত হতে থাকে। করাচিতে সৈনিক ব্যারাকে নজরুলের বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন সহ-সৈনিক জমাদার শম্ভু রায়। জমাদার শুম্ভু রায়ের এক পত্র (‘কাজী নজরুল’, প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, দ্বিতীয় সংস্করণ ও ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’, মুজফফর আহমদ দ্রষ্টব্য) থেকে জানা যায়, করাচিতে সৈন্য ব্যারাকে অবস্থানকালে নজরুল রাশিয়া বিপ্লবের ভাবের দ্বারা বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এই খবরগুলি তার মনকে ভীষণভাবে আন্দোলিত করে তোলে। সৈনিক জীবন তার বিশ্বচেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করেছিল। বিকশিত করেছিল কিশোর বয়স থেকে লালিত সাংস্কৃতিক চেতনা। পরবর্তী সময়ে এই চেতনাকে সাম্যবাদী আদর্শ ও দর্শনে আরো উন্নত ও ধারাল করে তুলেছিলেন মুজফফর আহমদ—অবিভক্ত বাংলার সাম্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ।

সে সময়ে কবি বা সাহিত্যিক হিশাবে নজরুলের সেরকম কোনো নামডাক হয় নি। তার যে কবিতাটি প্রথম পত্রিকায় ছাপানো হয় সেটির নাম ‘মুক্তি’। কবিতাটি ছাপানো হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য়। রাশিয়া বিপ্লবে সর্বহারার রাষ্ট্র গঠনের সংবাদে নজরুলের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হলো এই ভাষায়—‘সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।’ তার ‘মুক্তি’ কবিতায় ফকিরের মুক্তির মতোই সর্বহারা বিপ্লবের উজ্জ্বল শিখায় সব বাঁধন বা আগল খসে পড়ল। মুজফফরের উক্তি :

তার সিন্ধুপারের ‘আগল ভাঙা’ মানে রুশ বিপ্লব। তার প্রলয় মানে ‘বিপ্লব’। আর জগৎ-জোড়া বিপ্লবের ভেতর দিয়েই আসছে নজরুলের নূতন অর্থাৎ আমাদের দেশের বিপ্লব। এই বিপ্লব আবার সামাজিক বিপ্লবও (কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা)।

মুক্ত চেতনায় দেদীপ্য কবির হাত ধরল কলম, কণ্ঠ ধরল গান, হৃদয় উজাড় করে বেরোতে থাকল। ১৯১৮ সালে নজরুল তার ‘মুক্তি’ কবিতাটি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই সমিতির ও সাহিত্য পত্রিকার সংগঠক ও লেখক মুজফফর আহমদের সঙ্গে তার পত্রালাপ গড়ে ওঠে। ক্রমে এই পত্রালাপ পরিণত হয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে বন্ধু মুজফফরের পরামর্শেই নজরুল তার সৈনিক বৃত্তি ত্যাগ করে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় এসে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র দপ্তরে মুজফফর আহমদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করতে শুরু করেন। সার্বক্ষণিক সাহিত্য কর্মকেই পেশা হিশেবে বেছে নেন তিনি। বন্ধু মুজফফরসহ অন্য বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা নজরুলের মধ্যে বিরাট সাহিত্যিক সম্ভাবনার আভাস পেয়েছিলেন। মূলত সেই বন্ধুদের প্রেরণা ও উৎসাহেই নজরুলের সাহিত্য সাধনা প্রাণ পেল। পরিণামে বাংলা সাহিত্য লাভ করেছিল ফৌজি নজরুল থেকে বিবর্তিত ক্ষুরধার লেখনীসম্পন্ন শ্রেণি চেতনায় শাণিত বিদ্রোহী কবি ও সাহিত্যিক নজরুল ইসলামকে। নজরুলের দেশপ্রেমে ভরপুর হৃদয় মুজফফর আহমদের সান্নিধ্য ও কর্মপ্রেরণায় শোষিত-নিপীড়িত মানুষের স্বার্থবাহী শ্রেণিচেতনা তথা সাম্যবাদী চিন্তাধারায় ঋদ্ধ হয়েছিল। সেই চিন্তা ও চেতনার আগুন-ক্ষরা প্রকাশ ঘটেছিল সাংবাদিক, কবি ও প্রাবন্ধিক নজরুলের লেখায়—তার উদ্যোগে ও অংশগ্রহণে প্রকাশিত ও পরিচালিত ‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’, ‘গণবাণী’ প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায়।


‘শাত্–ইল্আরব’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে প্রথম পাশ্চাত্য-সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ উচ্চারণ এবং নজরুলের আন্তর্জাতিক সচেতনতার প্রামাণ্য দলিল।


নজরুল সৈনিক জীবন শেষে করাচি থেকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পর সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জীবনের সূচনাপর্বে যে কবিতাটি লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, সেটি হলো ‘শাত্–ইল্আরব’। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় এই শাত্–ইল্আরব নদীর তীরে তীরে তুর্কি ও ইংরেজ বাহিনীর তীব্র লড়াই চলেছিল। ইংরেজ বাহিনীতে ছিলেন ভারতীয় সেনারা, যাদের অনেকেই ছিলেন মুসলমান। এই যুদ্ধে তুরস্ক পরাজিত হয় এবং সমগ্র মেসোপটেমিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশে পরিণত হয়। নজরুলের কবিতায় ইংরেজ পদানত ভারতের এক কবি ইরাকের পরাধীনতায় গভীর বেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। ‘শাত্–ইল্আরব’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে প্রথম পাশ্চাত্য-সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ উচ্চারণ এবং নজরুলের আন্তর্জাতিক সচেতনতার প্রামাণ্য দলিল।

একথা যে কথার কথা নয়, তার ওই সময়কার রচিত ব্যথার দান  নামক উপন্যাস ও ‘হেনা’ নামক গল্পটি পড়লে বোঝা যায়। ‘ব্যথার দান’ উপন্যাসে আছে কাহিনির নায়ক নূরন্নবী (পরে পুস্তক আকারে প্রকাশের সময় এই নাম পরিবর্তন করে ‘দারা’ রাখা হয়) ও তার বন্ধু সৈফুলমুল্ক লালফৌজে যোগ দিয়েছিল এবং যে-বিপ্লববিরোধী শক্তি বিপ্লবকে পর্যস্ত করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, লালফৌজের সামিল হয়ে তারা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। ব্যথার দান উপন্যাসে বাংলা সাহিত্যে প্রথম তিনি লালফৌজ শব্দটি হাজির করেন।

মুদ্রিত বইয়ে অবশ্য ‘লালফৌজ’ কথাটির উল্লেখ নেই, তার জায়গায় আছে ‘মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল’। এর কারণ এই যে, এই উপন্যাসটি যখন ধারাবাহিকভাবে পর্ব অনুসারে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য়  প্রকাশিত হচ্ছিল তখন ওই পত্রিকার সম্পাদক মুজফফর আহমদ ইংরেজের চোখে ধুলো দেবার জন্য লালফৌজ কথাটি কেটে তার জায়গায় ‘মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল’ কথাটি বসিয়ে দেন। মুজফফর আহমদ তার স্মৃতিকথায়  লিখেছেন, পত্রিকাটি বাজেয়াপ্তকরণ এড়াবার জন্যই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিশেবে তাকে এই কৃত্রিম নামান্তরের আশ্রয় নিতে হয়েছিল—এখন আর ওই ছলটিকে টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

নজরুলের আন্তর্জাতিক চেতনা যে বিশ্বের সর্বহারাদের বিপ্লবের প্রতি কতটা আগ্রহী ছিল, তা বোঝা যায় ১৩৩৪ সালে ১ বৈশাখের সাপ্তাহিক ‘গণবাণী’ পত্রিকার জন্য রচিত তিনটি গানের বাণী থেকে, যার প্রথমটি রেডফ্ল্যাগ বা রক্তপতাকার গান—‘ওড়াও ওড়াও লাল নিশান/ দুলাও মোদের রক্তপতাকা/ ভরিয়া বাতাস জুড়ি বিমান/ ওড়াও ওড়াও লাল নিশান/…চিরবসন্ত যৌবন করে ধরা শাসন/ নহে পুরাতন দাসত্বের ঐ বদ্ধমন’।

দ্বিতীয় গানটি হলো, কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের প্রথম বঙ্গানুবাদ অন্তর ন্যাশনাল সংগীত, ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত/ যত অত্যাচারে আজি বজ্রহানি/ হাঁকে নিপীড়িত জন-মন-মথিত-বাণী’ …আর তৃতীয় গানটি হলো, ‘জাগর-তূর্য’ (শেলির ভাব অবলম্বনে) —‘ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী/ অলিখিত যত গল্প-কাহিনি তোরা যে নায়ক তারি’/ …নিদ্রোত্থিত কেশরীর মতো/ ওঠ্‌ ঘুম ছাড়া নবজাগ্রত/ আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী/ ঘুমঘোরে ওরে যত শৃঙ্খল/ দেহ-মন বেঁধে করেছে বিকল/ ঝেড়ে ফেল সব, সমীরে যেমন ঝরায় শিশির-বারি/ উহারা ক’জন? তোরা অগণন সকল শক্তি-ধারী।’

শ্রমিকশ্রেণি হচ্ছে সর্বহারা বিপ্লবের ভ্যানগার্ড বা অগ্রপথিক। নজরুল ওয়াল্ট হুইটম্যানের ও পাইওনিয়ার অবলম্বনে ‘অগ্রপথিক’ কবিতায় লিখেছেন—‘রৌদ্রদগ্ধ মাটিমাখা শোন্ ভাইরা মোর,/ বসি বসুধায় নব অভিযান আজিকে তোর!/ রাখ তৈয়ার হাথেলিতে হাথিয়ার জোয়ান,/ হান রে নিশিত পাশুপতাস্ত্র অগ্নিবাণ!/ কোথায় হাতুড়ি কোথা শাবল?/ অগ্রপথিক রে সেনাদল,/ জোর কদম / চল রে চল।’

নজরুলের একাধিক কবিতায় রাশিয়া বিপ্লবের প্রভাব পড়েছে। তার ‘বিদ্রোহী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘ফরিয়াদ’, ‘আমার কৈফিয়ৎ’, ‘সর্বহারা’, ‘প্রলোয়োল্লাস’ প্রভৃতি কবিতা ও একাধিক গান এ ধারণার যর্থাথতা নিশ্চয় আছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বিদ্রোহ তো বিদ্রোহ বিদ্রোহের একটি ভঙ্গিমায় প্রকাশমাত্র নয়, সে যে বিপ্লবেরই পূর্বাভাস। তার মধ্যে আমিত্বের অহংকারের যে ব্যঞ্জনা, তা তো জরাজীর্ণ প্রথাবদ্ধ পুরাতন যা কিছু তাকে গুড়িয়ে দেবারই নিশানা। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র দপ্তরে মুজফফর আহমদের সঙ্গে একত্রে বসবাসকালীন একদিন সারারাত জেগে নজরুল পেন্সিলে লিখে ফেললেন এই কবিতাটি। পেন্সিলে লেখার একটা কারণ ছিল, কালি-কলমে লিখতে গিলে বার দোয়াতে কলম ভিজাতে ভিজাতে তার মনোযোগ নষ্ট হবে। কবিতাটির প্রথম শ্রোতা ছিলেন মুজফফরই। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই বন্ধু মুজফফরকে তিনি সদ্য লেখা কবিতাটি পড়ে শোনান। কবিতাটি বাংলার বিপ্লববাদীদের ঘোষণাপত্রের ভূমিকা পালন করেছে, সবরকম ভীরুতা দীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সাহসের ও স্পর্ধার সাথে এগিয়ে চলার প্রেরণা জুগিয়েছে। ‘বিদ্রোহ’ কবিতাটি শোনানোর পরে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বুকে চেপে ধরেছিলেন।


কাজী নজরুল ইসলামের মাধ্যমেই প্রথম বাংলা সাহিত্যে অক্টোবর বিপ্লবের আবাহনী রচিত হয়।


‘সাম্যবাদী’ কবিতায়র প্রথম চার লাইন : ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান। যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম ক্রিশ্চান/ গাহি সাম্যের গান’—এটি ভারতের অনুষঙ্গে লেখা হলেও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এর পেছনে অক্টোবর বিপ্লবের সাম্যের দ্যোতনা রয়েছে। কিংবা ওই সুদীর্ঘ কবিতারই আর একটি স্তবকের প্রথম চার পঙ্‌ক্তি : ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান/ নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে সবকালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’ এর মধ্যে আন্তর্জাতিকতার সুরটি লুকিয়ে রয়েছে তারও মূল খুঁজতে গেলে রাশিয়া বিপ্লবের ভাবের ভেতরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। কিংবা ‘ফরিয়াদ’ কবিতার শেষ চার লাইন : ‘মুক্ত কণ্ঠে স্বাধীন বিশ্বে উঠিতেছে একতান—জয় নিপীড়িত প্রাণ!/ জয় নব অভিযান!/ জয় নব উত্থান!’—এ কোন অভিযান, কোন উত্থানের নান্দী গাওয়া হচ্ছে। সেই গণমানুষেররই জয়ধ্বনি কি উদ্‌গীরিত হয় নি রাশিয়া বিপ্লবের সাফল্যের মধ্য দিয়ে? অথবা ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার শেষ দুই পঙ্‌ক্তি : ‘প্রার্থনা করো—যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!’ এ কোন সর্বনাশের ইঙ্গিত চরণ দুটির মধ্য দিয়ে স্ফুরিত হচ্ছে? প্রকৃত পক্ষে রাশিয়া বিপ্লব একটি সর্বব্যাপী ভাবের পটভূমি রূপে নজরুলের কবিতার পিছনে বিদ্যমান রয়েছে।

১৯২২ সালের এপ্রিল মাসে নজরুল কুমিল্লায় অবস্থানকালে ‘প্রলয়োল্লাস’ নামে একটি কবিতা লেখেন। এটি পরে কোরাস গান হিশেবে বহুলভাবে প্রচারিত হয়।

তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে
কালবোশেখীর ঝড়।

জাতীয়তাবাদীরা দাবি করেন এই রচনাটি গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের সূত্র ধরে রচিত হয়েছিল। কিন্তু মুজফফর আহমেদ এই দাবিটি নাকচ করে বলেছেন, রচনাটির মূল প্রেরণা রাশিয়া বিপ্লব। অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা ১৯২০ সালে। আর এই কবিতাটি জন্ম ১৯২২ সালের ২২ এপ্রিল। মুজফফর আহমেদ লিখেছেন :

১৯২১ সালে শেষাশেষি তারা এদেশে কমিউনিস্ট পার্টিকে জোরদার করে তোলার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। তাদের এই পরিকল্পনার পেছনে কাজী নজরুল ইসলামও ছিলেন। তাদের এই পরিকল্পনা থেকেই ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির সৃষ্টি। কবিতাটির একাংশে আছে—

মাভৈঃ মাভৈ। জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে।
জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ওই বিনাশে।

মুজফফর মনে করেন জগৎ-জোড়া যে প্রলয়ের ইঙ্গিত করা হয়েছে তা রাশিয়া বিপ্লব ভিন্ন আর কিছু নয়।

কাজী নজরুল ইসলামের মাধ্যমেই প্রথম বাংলা সাহিত্যে অক্টোবর বিপ্লবের আবাহনী রচিত হয়। পরে অন্যান্য লেখকেরা সেই সূত্রটিকে তুলে ধরেন এবং আরও সম্প্রসারিত করেন। কিন্তু পথিকৃৎ-এর কৃতিত্ব নজরুলের সেই কথা বলতে হবে।

হাবীব ইমন

জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯৮০; মাইজদী, নোয়াখালী। এমবিএ। জার্নালিজমে ডিপ্লোমা। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
অন্ধকার, নীল গান [স্বরাজ প্রকাশনী, ২০১১]
কালো মেয়ের প্রতি ভালোবাসা [স্বরাজ প্রকাশনী, ২০১২]
কবি হয়ে জন্মাতে চাইনি [অভিযান পাবলিশার্স, ২০১৬]

গদ্য—
লেখা-অলেখা [কলামসমগ্র; দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
একুশে ফেব্রুয়ারি : আঁধারে বাঁধা অগ্নিসেতু [সাকী পাবলিকেশন্স, ২০১৩]
মুক্তিযুদ্ধের আগুনমুখো গল্প [সাকী পাবলিকশেন্স]
অধ্যক্ষ আবদুল জলিল [স্মারক, যৌথ সম্পাদনা; স্বরাজ প্রকাশনী, ২০০৯]

ই-মেইল : emonn.habib@gmail.com