হোম গদ্য রাযীব কোরাইয়া’র মনোলগ : ১

রাযীব কোরাইয়া’র মনোলগ : ১

রাযীব কোরাইয়া’র মনোলগ : ১
401
0

রাযীব জানত না এই লেখা আমি ছাপবো। সে আমায় পড়তে দেয়ার নির্দোষ উদ্দেশ্যে কতগুলি লেখা পাঠায়। পড়ার পরে আমিই বলি, লেখাগুলি কবিতা বিভাগে ছাপতে চাই, আরও কিছু লেখা পাঠাও। রাযীব আঁতকে উঠল। এই লেখা সে কবিতা হিসেবে ছাপতে চায় না। তার কাছে কবিতার জায়গা আরও উঁচুতে। এগুলিকে সে সরাসরি আবর্জনা হিসেবেই উল্লেখ করে। যা-ই হোক, ‘পশুজন্মের ডায়েরি থেকে’ পড়তে গিয়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলাম; এই লেখাটার সময়কাল দেয়া সেপ্টেম্বর ৪, ১৯৮৮। আমি ভাবলাম এইটা কোনোভাবে ওর চোখ এড়িয়ে গেছে। কারণ রাযীব এখনো বুয়েটে পড়ছে, যদিও এই পরিচয়টা সে এড়িয়ে যায়। সে ছবিও আঁকে। আমি একবার ভাগ্যচক্রে একটা প্রকাশনী দিই, সেখানে ৩টা বইয়ের প্রচ্ছদ তার করা। যা-ই হোক, সময়কালটা ধরিয়ে দিতেই সে বলল, ওটা ভুল কিংবা চোখ এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং শেষের তারিখের ঐ অংশটাই তার টার্গেট ছিল। তারিখটা রাযীবের জন্মের কিছুদিন পরের। সে মাংসপিণ্ড হিসেবেই সান্তিয়াগো কারুসোকে কথাগুলি বলেছে। ইনফ্যাক্ট ওই সান্তিয়াগো কারুসোও সে নিজেই; ঘৃণাটা যাতে হারিয়ে না যায়। রাযীব অনুরোধ করল, লেখাগুলি ছাপলে যেন রাযীব কোরাইয়া’র মনোলগ নামেই ছাপি। এতে নাকি বাধ্যবাধকতা কমে যায়। তো রাযীবের বাধ্যবাধ্যকতা কমানোর উদ্দেশ্যেই রাযীব কোরাইয়া’র মনোলগ ছাপানো হলো। যে জন্মের কিছুদিন পরেই কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু কঠিন কঠিন কথা বলে ফেলে, তার লেখা ছাপতে অন্যরকম একটা আনন্দ হয়। সে আনন্দটা আমি পাচ্ছি।

—রাসেল আহমেদ

 

বাবার হাতের চামড়া পুড়ে গলে খসে গেলেও মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে হাতের কঙ্কালের ভেতর আমাকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, এই শিশু আমাদের, এই সদ্য মানুষটা আমাদের


সান্তিয়াগো কারুসোকে খোলা চিঠি

সান্তিয়াগো কারুসো তুমি জানো না…

আমার মা আগুন প্রসব করেছিলেন। প্রসবে যন্ত্রনা ছিল, প্রসবে আগুন ছিল, পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া মায়ের যোনি ছিল। গলিত লাভার ভেতর ভাসমান আমার কয়েক ইঞ্চি দীর্ঘ শরীর ছিল।
এত আগুন আর লাভার ছাইয়ের স্তূপে দাঁড়িয়েও আমার বাবার মুখে হাসি ছিল, ভালবাোসা ছিল। আর ছিল চোখে জল। লাভার ভেতর হাত ঢুকিয়ে বিবলিক্যাল-কর্ড-কাটা আমার সদ্য মানুষ-পরিচয়ের শরীরের মাংসপিণ্ডটাকে তুলে ধরতে গিয়ে বাবার হাতের চামড়া পুড়ে গলে খসে গেলেও মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে হাতের কঙ্কালের ভেতর আমাকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, এই শিশু আমাদের, এই সদ্য মানুষটা আমাদের।

সান্তিয়াগো,আমার খুব সাধ হয় তোমাকে ঐ পোড়া চামড়ার ধ্বংসস্তূপে হাড়গুলির ভেতরে দাঁড় করাই।

যুদ্ধের সৈনিক আমার বাবা যখন একের পর এক ফ্রন্টলাইন পেরিয়ে যাচ্ছেন লাশের মিছিলের ওপর দিয়ে, মা তখন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অন্ধকার সেলে। বারুদ আর রক্তের মাখামাখি পার হয়ে যুদ্ধশেষে যখন তারা একসাথে মিললেন ট্রেনস্টেশনে, বাবা কান্নায় ভেঙে পরেছিলেন। মায়ের চোখ ছিল শুকনো আর চোয়ালে কাঠিন্য। বাবা মাকে গল্প শোনালেন, কিভাবে প্রতিটা রাত তিনি হাজার হাজার লাশের ডাক শুনতেন। কতগুলো মৃত লাশের ডাক আর চিৎকার তাকে ঘুমাতে দেয় নি। দিনের পর দিন নির্ঘুম যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কত মাইল পথ পেরুলেন। আর মা শোনালেন ক্যাম্পের পিশাচদের দাঁতের বর্ণনা। সান্তিয়াগো তুমি জানো না, ঐ দাঁতগুলির শিরা উপশিরায় আমি তোমাকে আর তোমার নখের আঁচড় দেখতে পাই। সান্তিয়াগো তুমি জানো না ঐ দাঁতগুলি একদিন তুমি আস্তাকুড় থেকে উপড়ে নিয়ে পেরেক ঠুকে সভ্যতার দেয়ালে গেঁথে দিতে চাইতে পারো।

সান্তিয়াগো তুমি ইকারুসের গল্প জানো। ডিওডাস পুত্রের উড়ে বেড়ানোর স্বপ্নের কথা জানো। সূর্য আগুনে গলে যাওয়া ইকারুসের ডানার কথা জানো। সভ্যতার গল্প জানো। সান্তিয়াগো তুমি জানো এই সভ্যতায় এখন ডানাগুলি ধাতব। বোমারু বিমানের ধাতব ডানা আকাশে গলে পড়ে না। সূর্যের কাছ দিয়ে উড়ে বেড়ানো সারি সারি ধাতব ইকারুস এখন মাথা উঁচু করে থাকে। গলে পড়ে ইকারুসের ফেলে যাওয়া মাটি। সান্তিয়াগো তুমি হিরোশিমার গল্প জানো, তুমি নাগাসাকির পুড়ে যাওয়া সভ্যতার চিৎকার শুনতে পাও, তুমি পার্ল হারবারের ছিন্নমাংসের মোরালিটির কথা জানো। তেজস্ক্রিয়তায় ঢেকে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে তুমি হাজার হাজার শিশু ইকারুসের বিকলাঙ্গ শরীরের শবযাত্রা দেখ সান্তিয়াগো।

আমার জন্মকথা, আমার মায়ের পোড়া যোনি আর বাবার লাভায় খুলে আসা হাড়-চামড়া-মেশানো ছাইয়ের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সান্তিয়াগো, তুমি ওদের ঘৃণা কোরো।

rajib
রাযীব কোরাইয়া

পশুজন্মের ডায়েরি থেকে

তুমি তোমরা আর তোমাদের মানুষেরা জানো না, আমি আমরা আর আমাদের মানুষগুলি জন্মেছিলাম মেথরপট্টির শুয়োরের খোঁয়াড়ে। শুয়োরের খোঁয়াড়ের নোংরা গন্ধের ভেতরে আমরা আরো নোংরা হয়েছিলাম। দাঁতাল পশুগুলির সাথে সহবাসে আমাদের দাঁত গুলিও প্রতিদিন বদলে যাচ্ছিল একটু একটু করে। আমাদের মুখে খিস্তির তুফান ছুটত—বানের নতুন ঘোলা জলের মতন তীব্র স্রোতে—অবলীলায়।

এতটা নোংরা হয়েও আমরা জানতাম রক্তের সাথে সীসার গন্ধের পার্থক্য; শুধু তুমি তোমরা আর তোমাদের মানুষগুলি কোনদিন জানতে না শুয়োর আর মানুষের ভেতর কতটা তফাৎ। তবুও মানুষজন্মে তুমি তোমরা আর তোমাদের মানুষেরা মহাপুরুষ। আর পশুজন্মে আমি আমরা আর আমাদের মানুষেরা এখনো স্বীকার করি, নত হই, চিৎকার করে বলি… “তুমি তোমরা আর তোমাদের কাছে, আমি আমরা আর আমাদের অনেক ক্ষমা চাওয়ার আছে।”

বিদায় বন্ধু।

।। পশুজন্মের ডায়েরি থেকে
   সেপ্টেম্বর ৪, ১৯৮৮ ।।